অজিত দত্তের কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
১।  রাঙা সন্ধ্যা            
২।  
যেখানে রুপালি       
৩।  
কটি কবিতার টুকরো              
৪।  
মিস্   
৫।   
ইলে               
৬।  
নেট             
৭।  
চরৈবেতি     
৮।  
উল্টো রথ  
*
রাঙা সন্ধ্যা

রাঙা সন্ধ্যার স্তব্ধ আকাশ কাঁপায়ে পাখার ঘায়
ডানা মেলে দুরে উড়ে চলে যায় দুটি কম্পিত কথা,
রাঙা সন্ধ্যার বহ্নির পানে দুটি কথা উড়ে যায় |

পাখার শব্ দে কাঁপে হৃদয়ের প্রস্তর-স্তব্ ধতা,
দূর হতে দূর---তবু কানে বাজে সে পাখার স্পন্দন,
ক্ষীণ হতে ক্ষীণ, ঝড়ের মতন তবু তার মত্ততা |

চলে যায় তারা চোখের আড়ালে, লক্ষ কথার বন
অট্টহাস্যে কোলাহল করে, তবু ভেসে আসে কানে
পাখার ঝাপট, বজ্র ছাপায়ে এ কি অলিগুঞ্জন?

যাযাবর যত পক্ষী-মিথুন আসে তারা কোনখানে?
মানুষের ছায়া সে আলোর নিচে পড়েছে কি কোনদিন?
তুমি ত আমারে ভুলে যাবে নাকো যাই যদি সন্ধানে?

তুমি নীড়, তুমি উষ্ণকোমল, পাখার শব্ দ  ক্ষীণ |
তবু সে আমাকে ডাকে, ডাকে শুধু ছেদহীণ ক্ষমাহীণ ||

            *************
*
 যেখানে রুপালি  

যেখানে রুপালি ঢেউয়ে দুলিছে ময়ূরপঙ্খী নাও,
যে-দেশে রাজার ছেলে কুমারীকে দেখিছে স্বপনে,
কুঁচের বরন কন্যা একাকী বসিয়া বাতায়নে
চুল এলায়েছে যেথা --- কালো আঁখি সুদূরে উধাও;
যে-দেশে পাষাণ-পুরী, মানুষের চোখের পাতাও
অযুত বত্সরে যেথা নাহি কাঁপে ইষত্ স্পন্দনে,
হীরার কুসুম ফলে যে-দেশের সোনার কাননে,
কখনো, আমার পরে, তুমি যদি সেই রাজ্যে যাও;

তাহ'লে, তোমারে কহি, সে-দেশে যে-পাশাবতী আছে,
মায়ার পাশাতে যেই জিনে লয় মানুষের প্রাণ,
মোহিনী সে-অপরূপ রূপময়ী মায়াবীর কাছে,
কহিয়া আমার নাম শুধাইও আমার সন্ধান;
সাবধানে যেও সেথা, চোখে তব মোহ নামে পাছে,
পাছে তার মৃদু কণ্ঠে শোনো তুমি অরণ্যের গান |
         
               *************
*
একটি কবিতার টুকরো  

মালতী, তোমার মন নদীর স্রোতের মতো চঞ্চল উদ্দাম;
মালতী, সেখানে আমি আমার সাক্ষর রাখিলাম |

জানি, এই পৃথিবীতে কিছুই রহে না;
শুক্ল কৃষ্ণ দুই পক্ষ বিস্তারিয়া মহা শূণ্যতায়
কাল-বিহঙ্গম উড়ে যায়
অবিশ্রান্ত গতি |

পাখার ঝাপটে তার নিবে যায় উল্কার প্রদীপ,
লক্ষ-লক্ষ সবিতার জ্যোতি |
আমি সেই বাউস্রোতে খ'সে-পড়া পালকের মতো
আকাশের নীল শূণ্যে মোর কাব্য লিখি অবিরত;
সে-আকাশ তোমার অন্তর,
মালতী, তোমার মনে রাখিয়াছি আমার সাক্ষর |

*************
*
        মিস্  

কলঙ্ক-কঙ্কণ ভাঙো! ও কেবল ভূষণ তোমার |
বার-বার সকলের চোখের উপরে তাই বুঝি
সেই তব কলঙ্কের ঐশ্বর্য্যের মহামূল্য পুঁজি
ঢঙে আর ন্যাকামিতে নানা ভাবে করিছ প্রচার |
দ্রৌপদীর কথা ভাবি' মনে আনিও না অহংকার
ঊষাকালে তব নাম মানুষ স্মরিবে চোখ বুজি',
দুর্ভাগ্য, দুর্ভাগ্য তব, রাহুময় তোমার ঠিকুজি,
সেথায় নক্ষত্র নাই অনির্বাণ স্মরনীয়তার |

কলঙ্ক-ভূষণ খোলো! বহু-প্রেম-গর্ব যদি চাহ---
যদি ভালবাসিবার শক্তি থাকে, প্রিয়তম-মাঝে
দ্যাখো তবে পার্থ-ভীম-যুধিষ্ঠিরে, পঞ্চপাণ্ডবেরে;
যে কলঙ্কে লুব্ধ  করি বহু হূ'তে বহুকরদেরে
ঊর্ণায় টানিতে চাও--- সে-ভূষণ নারীরে না সাজে,---
বিশ্বাস করিতে পারো, এর চেয়ে উত্কৃষ্ট বিবাহ |

              *************
*
      নইলে  

প্যাঁচ কিছু জানা আছে কুস্তির?
ঝুলে কি থাকতে পারো সুস্থির?
নইলে
রইলে
ট্রাম না-চ'ড়ে---
ভ্যাবাচাকা রাস্তায় প'ড়ে বেঘোরে |

প্র্যাকটিস করেছ কি দৌড়ে?
লাফিয়ে ঝাপিয়ে আর ভোঁ-উড়ে?
নইলে
রইলে
লরিতে চাপা,
তাড়া ক'রে বাড়ি থেকে বাড়িয়ো না পা |

দাঁত আছে মজবুত সব বেশ?
পাথর চিবিয়ে আছে অভ্যেস?
নইলে
রইলে
ভাত না-খেয়ে,
চালে ও কাঁকড়ে আধাআধি থাকে হে |

স্হির ক'রে পা দুটো ও মনটা,
দাঁড়াতে পারো তো বারো ঘন্টা?
নইলে
রইলে
না-কিনে ধুতি---
যতই দোকানে গিয়ে কর কাকুতি |

            *************
*
        সনেট  

এক বার মনে হয়, দূরে---বহু দূরে---শাল, তাল,
তমাল, হিন্তাল আর পিয়ালের ছায়া-ম্লান দেশে
প্রেম বুঝি নাহি টুটে, অশ্রু বুঝি কোনোদিন এসে
আঁখি হ'তে মুছে নাহি নেয় স্বপ্ন | বুঝি এ বিশাল
ধরণীর কোনো কোণে ফুল ফুটে রয় চিরকাল,
বসন্ত-সন্ধ্যার মোহ দক্ষিণ বাতাসে আসে ভেসে,
বুঝি সেথা রজনীর পরিতৃপ্ত প্রেমের আবেশে
প্রভাত-পদ্মের ভরে কেঁপে ওঠে তারার মৃণাল |

যদি তাই হয়, তবু সেই দেশে তুমি আর আমি
বাহুতে জড়ায়ে বাহু নাহি যাবো শান্তির সন্ধানে
মোদের জানালা-পথে ব'য়ে যাক পৃথিবীর স্রোত |
সে-স্রোতে কখনো যদি ভেসে আসে নীলাভ শরৎ
তোমার চোখের কোলে, মেঘ যদি কভু মোহ আনে,
স-চোখে আমার পানে চেয়ো তুমি অকস্মাৎ থামি' |

          *************
*
 চরৈবেতি  

কীর্তির সীমা উত্তোরণের পরে
অজ্ঞাতবাসে যাত্রারম্ভ করো,
রাজৈশ্বর্য পশ্চাত বন্দরে
ফেলে চল খুঁজি রাজ্য বৃহত্তর |

জীবনের পুঁথি যতোটা হয়েছে পড়া
নতুন গ্রন্থে চলো খুঁজি তার মানে!
এসো শুরু করি নতুন কুটির গড়া---
স্থাপত্য যার বিশ্বকর্মা জানে |

পিরামিড্ আর সৌধের জঞ্জালে
দিগন্ত আজ অর্ধেক গেছে ঢাকা |
আকাশের রং ছেয়েছে ধোঁয়ার জালে,
পাঁকে বসে গেছে ধর্মরথের চাকা |

জীবন উহ্য জীবনের আয়োজন,
প্রেমোপকরণে প্রেম অনুপস্থিত,
কীর্তির প্রেত রাজ্য ফেঁদেছে মনে,
বাক্যের জালে মগ্ন প্রাণের গীত |

কতো সম্পদ, কতো সোনা-রূপো-হীরে
জমেছে ঝাঁপিতে সারা দিন তাই গোনা,
এই অবসরে প্রেম এসে যায় ফিরে,
মুছে যায় ক্রমে হৃদয়ের আল্পনা |

চলো ফেলে দিই জীবনের জঞ্জাল,
নতুন মাটিতে নতুন ফসল বুনি,
পৃথিবী এখনো যৌবনে উত্তাল,
হৃদয় এখনো অপূর্ব ফাল্গুনী |

এখনো নয়নে নয়নের আলো খোঁজা,
জীবন গড়ার এখনো সময় আছে,
দীর্ঘপথের সোনালী নুড়ির বোঝা
যতো ফেলে যাওয়া, মুক্তি ততোই কাছে ||

        *************
*
উল্টো রথ

উল্টো রথের বাজনা বাজে শুনতে পাও?
               শুনতে পাও,কেউ কোথাও?
বাজনা বাজে উল্টো রথের নতুন পথের বাদ্যি,
আদ্যিকালের রাজপথে আর রথ টানে কার সাধ্যি?
চলতি সড়ক রয় পিছনে সামনে রথচক্রে
নুন পথের দাগ কেটে যায় দিগন্ত ইস্তক রে!
দর্গম পথ হয় সমতল রথের চাকার নিচে
রথ চলে আজ সামনেটাকে উল্টে ফেলে’ পিছে।
উল্টো পথে রথের রশি টানছে কা’রা দেখতে পাও?
                     দেখতে পাও, কেউ কোথাও?


বাজনা বাজে হাওয়ায় রে ভাই বাজনা বাজে শূণ্যে,
উল্টো পথে চল্লো রে রথ উল্টো দেশের পুণ্যে।
ঘুম ভরা চোখ হঠাৎ জাগে সামনে নতুন দৃশ্য,
গংগা থেকে জন্মালো কি লক্ষ কোটি ভীষ্ম?
জগন্নাথের স্থবির রথে প্রতিষ্ঠা আজ আত্মার,
রথের রশি টানবে না যে আজকে যাবে জাত তার।
উল্টো পথে রথ চলে আজ কোন্ আবেগে জানতে চাও?
                 জানতে চাও, কেউ কোথাও?

বাজনা বাজে হুংকারে ভাই বাজনা বাজে শংখে,
রথ নেমেছে উল্টো পথের জঞ্জালে আর পংকে।
অংগীকারের দুন্দুভি ওই জগন্নাথের ভক্তের
-চন্দনে আর চলবে না কাজ তিলক কাটো রক্তের !
শক্ত হাতে পড়বে কড়া রথের রশি টানতে
জাঙাল ভেঙে রাস্তা গড়ার সুখ যদি চাও জানতে
ঘুম-ভাঙানো জয়োল্লাসে রথের রশি টানতে চাও?
         টানতে চাও, কেউ কোথাও?

রথের তারিখ ফুরিয়ে গেছে,উল্টো রথের যাত্রা আজ,
শুনছো না কি রথের চাকায় সুদর্শনের ভীম আওয়াজ?
প্রচন্ড সে খন্ড করে বিঘ্নরূপী দম্ভাসুর,
উল্টো রথের উত্সবে তাই চিন্তা কি ভয় নেই কিছুর ।
সুপ্ত মনের শান্ত হ্রদে গর্জে শোনো সিন্ধু ।
উল্টো রথের শ্রীক্ষেত্রে নেই অহিন্দু কি হিন্দু।
উল্টো রথের বাজনা বাজে -বাজনা বাজে শুনতে পাও?
               শুনতে পাও, কেউ কোথাও?


.                          *************