অঞ্জন দত্তর জীবনমুখী গান
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
*
আলীবাবা
কবি অঞ্জন দত্ত

নাম আমার আলীবাবা, বয়স আমার দশ,
আজকে দিনটা বড়, আজকে যিশু দিবস।
চারটে মুরগী ছাড়ালে, একটা টাকার নোট,
ওই কালো ড্রামের ভেতর ওরা করছে যে ছট্ ফট্।
নাম আমার আলীবাবা, বড়দিনের ভীড়।
তাই রক্তে মাখা মাখি আমার সারাটা শরীর।
শীত যে আমার করছে না কো, নেই যে অবকাশ,
আটতিরিশটা পাখি মানে ন টাকা পঞ্চাশ।
রাতের বেলায় ফিরে এসে চাচার পিঠ মালিশ,
নেই যে আমার বিছানা, নেই যে বালিশ।
তবু ঘুম যে আমার চলে আসে ডিসেম্বর মাসে।
স্বপ্ন দেখি, ঘুড়ি ওড়াই টানা আকাশে।
কান্না আমার যাচ্ছে কমে, বাড়ছে যে সাহস,
নাম যে আমার আলীবাবা, বয়স এখনো দশ।

.           *************************      
.                                                                               
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর   
*.
রঞ্জনা
কবি অঞ্জন দত্ত


পাড়ায় ঢুকলে ঠ্যাং খোঁড়া করে দেব
বলেছে পাড়ার দাদারা
অন্য পাড়া দিয়ে যাচ্ছি তাই ।
রঞ্জনা, আমি আর আসবো না।

ধর্ম আমার, আমি নিজে বেছে নিই নি, পদবীতে ছিলনা যে হাত।
মসজীদে যেতে হয়, তাই যাই বছরে দু এক বার।
বাংলায় সত্তর পাই আমি একজ্যামে, ভালো লাগে খেতে মাছ ভাত।
গাঁজা সিগারেট আমি কোনটাই খাই না, চড়তে পারি না আমি গাছ।

চশমাটা পড়ে গেলে মশকিলে পড়ি, দাদা আমি এখনো যে ইস্কুলে পড়ি।
কবজির জোরে আমি পারবো না।
পারবো না হতে রোমিও, তাই দুপুর বেলাতে ঘুমিও।
আসতে হবে না আর বারান্দায়।
রঞ্জনা, আমি আর আসবো না।

বুঝবো কি করে আমি তোমার ঐ মেজ দাদা, সুধু যে তোমার দাদা নয়।
আরো কত দাদাগিরি, কবজির কারিগরি, করে তার দিন কেটে যায়।
তাও যদি বলতাম হিন্দুর ছেলে আমি নীলু বিলু কিম্বা নিতাই,
মিথ্যে কথা আমি বলতে যে পারি না, ভ্যাবাচ্যাকা খাই।

চশমাটা পড়ে গেলে মশকিলে পড়ি, দাদা আমি এখনো যে ইস্কুলে পড়ি।
কবজির জোরে আমি পারবো না।
পারবো না হতে রোমিও, তাই দুপুর বেলাতে ঘুমিও।
আসতে হবে না আর বারান্দায়।
রঞ্জনা, আমি আর আসবো না।

সত্যিকরের প্রেম জানিনা তো কি সে তা জাচ্ছে জমে হোম টাস্ক,
লাগছে না ভাল আর মেট্রো চ্যানেল টা, কান্না পাচ্ছে সারা রাত।
হিন্দু কি জাপানী, জানি না তো তুমি কি, জানে ঐ দাদাদের গ্যাং,
সাইকেলটা আমি ছেড়ে দিতে রাজি আছি, পারবো না ছাড়তে এ ঠ্যাং।

চশমাটা পড়ে গেলে মশকিলে পড়ি, দাদা আমি এখনো যে ইস্কুলে পড়ি।
কবজির জোরে আমি পারবো না।
পারবো না হতে রোমিও, তাই দুপুর বেলাতে ঘুমিও।
আসতে হবে না আর বারান্দায়।
রঞ্জনা, আমি আর আসবো না।

পাড়ায় ঢুকলে ঠ্যাং খোঁড়া করে দেব
বলেছে পাড়ার দাদারা
অন্য পাড়া দিয়ে যাচ্ছি তাই ।
রঞ্জনা, আমি আর আসবো না।

.           *************************      
.                                                                               
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর   
*.
শেষ বলে কিছু নেই
কবি অঞ্জন দত্ত

যখন মনের ভেতর সূর্যটা হটাত্ ডুবে যায়,
যখন আশা ভরসা সব রাস্তা হারায়।
যখন ভর দুপুরে পথের ধারে একলা করে ভয়,
যখন বাসের ভিড়ে গলার ভিতর কান্না চাপতে হয়।
জেনো তোমার মতই আমি ঠাকরে বেড়াই
জেনো তোমার মত আমার বন্ধু একটা চাই।
যেমন মাঝ দরিয়ার নৌকো ফিরে আসে কিনারায়,
ওরে মানুষ যথন আছে তখন হাত জুটে যায়।
শেষ বলে কিছু নেই।
শেষ বলে কিছু নেই।
শেষ যেখানে, জেনো শুরু সেখানে

.           *************************      
.                                                                               
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর   
*.
বসে আছি স্টেশনে
কবি অঞ্জন দত্ত


বসে আছি ইস্টিশানেতে, লেবু লজেনসের শিশিটা হাতে,
বোকা কোকিলটার গলা শুকিয়ে কাঠ, গাড়ী আজ লেটে দৌডোচ্ছে।
বাড়ী ছেড়েছি ডিসেমবর মাসে, পালাতে হয়নি দাদা তাড়িয়েছে,
ফিরতে হলে আড়াইশো টাকা, দিতে হবে মাসের শেষে।
অঙ্কতে আশি পেয়েছিলাম একবার, মা ভেবেছিল হব ইঞ্জিনিয়ার,
বাবা কিছুই ভাবতে পারেনি, বাবা ছিল না যে আমার।
কালো ঘর বাড়ী শন্ শন্ যায় সরে, ট্রেনের দোলাতে রোজ দুপুরে,
মায়ের কোলের সেই দোলাটা, যায় মনে পড়ে যায় আমার।
কু ঝিক্ ঝিক্ করে যথন রাত আসে, চাঁদটা মনে হয় এলুমিনিয়ামের,
কারখানার ঐ কালো ধোঁওয়াটা, কেন যে আমায় কাঁদায়।
"দাদা, একটা মিনি হবে কি ? একটাও লেবু হয়নি বিক্কিরি,
গত কালের পনেরো টাকা থেকে চেকার কে দিতে হবে দশ।"
একবার ভেবেছিলাম গলাটা যায় যদি যাক ট্রেনের তলাতে,
কিন্তু ঐ এলুমিনিয়ামের চাঁদ, দেয় নি পালাতে আমায়।
একটু আগে গড়িয়ার শিবু, দম দিতে বলল বম্ শংকরে,
মাথাটা তাই কেমন ঝিম ঝিম করছে, গলাটা শুকিয়ে কাঠ।

"দাদা, একটা মিনি হবে কি ? একটাও লেবু হয়নি বিক্কিরি,
গত কালের পনেরো টাকা থেকে চেকার কে দিতে হবে দশ।"

বসে আছি ইস্টিশানেতে, লেবু লজেনসের শিশিটা হাতে,
বোকা কোকিলটার গলা শুকিয়ে কাঠ, গাড়ী আজ লেটে দৌডোচ্ছে।
বাড়ী ছেড়েছি ডিসেমবর মাসে, পালাতে হয়নি দাদা তাড়িয়েছে,
ফিরতে হলে আড়াইশো টাকা, দিতে হবে মাসের শেষে।
অঙ্কতে আশি পেয়েছিলাম একবার, মা ভেবেছিল হব ইঞ্জিনিয়ার,
বাবা কিছুই ভাবতে পারেনি, বাবা ছিল না যে আমার।
বসে আছি ইস্টিশানেতে।


.           *************************      
.                                                                               
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর   
*.
বৃষ্টি
কবি অঞ্জন দত্ত


আমি বৃষ্টি দেখেছি, বৃষ্টির ছবি এঁকেছি,
আমি রোদে পুড়ে ঘুরে ঘুরে অনেক কেঁদেছি।
আমার আকাশ কুসুম স্বপ্ন দেখার খেলা থামে নি,
শুধু তুমি চলে যাবে আমি স্বপ্নেও ভাবিনি।
আমি বৃষ্টি দেখেছি...
চারটে দেয়াল মানেই নয়তো ঘর, নিজের ঘরেও অনেক মানুষ পর।
কখন কিসের টানে মানুষ পায় যে খুঁজে বাঁচার মানে,
ঝপসা চোখে দেখা এই শহর ...
আমি অনেক ভেঙেচুরে, আবার শুরু করেছি,
আবার পাওয়ার আশায় ঘুরে মরেছি।
আমি অনেক হেরে গিয়েও হারটা স্বীকার করিনি,
শুধু তোমায় হারাবো আমি স্বপ্নেও ভাবিনি।
আমি বৃষ্টি দেখেছি...
হারিয়ে গেছে তরতাজা সময়, হারিয়ে যেতে করেনি আমার ভয়।
কখন কিসের টানে মানুষ পায় যে খুঁজে বাঁচার মানে,
ঝপসা চোখে দেখা এই শহর ...
আমি অনেক শ্রোতে বয়ে গিয়ে, অনেক ঠকেছি,
আমি আগুণ থেকে ঠেকে শিখে, অনেক পুড়েছি।
আমি অনেক কষ্টে অনেক কিছুই দিতে শিখেছি,
শুধু তোমায় বিদায় দিতে হবে, স্বপ্নেও ভাবিনি।
আমি বৃষ্টি দেখেছি।
আমি বৃষ্টি দেখেছি।

.           *************************      
.                                                                               
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর   
*.
মাসের প্রথম দিন
কবি অঞ্জন দত্ত


মাসের প্রথম দিনটা এই ধর্মতলার মোড়ে,
লালচে আলো কালচে হয়ে যাওয়া অশোকা বারে,
তিনটে বড় হুইস্কি, পেপসিতে নেড়ে চেড়ে,
চেনা চেনা সেই চোখ, চীনে খাবার।
এই মাইনে পাওয়ার দিনটা, গড়ের মাঠটা ঘুরে,
ফিরবো আজকে আমি, একা ট্যাকসিতে চড়ে।
ছেলেটা আমার থাকবে জেগে, আসবে যে তেড়ে ফুঁড়ে,
পকেটে আমার পিস্তল খেলনা।
আজ অন্ধকার এই গলির গন্ধ নাকে আসবে না,
বড় রাস্তার মাস্তানরাও কাছে ঘেঁষবে না।
ট্যকসিটাকে সোজা নিয়ে, দোরগোড়াতে লাগিয়ে দিয়ে
সব হয়ে যাবে সিনেমা।
চিকেনটা ভাই প্যাক করে দাও, বাড়ী নিয়ে চলে যাই।
যাবার আগে ওয়ান-ফর-দ্য-রোড হবে নাকি ভাই ?
আবার তো সেই তিরিশটা দিন, হাঁড়িকাঠে জবাই।
ছোটোখাটো হয়ে থাকার যন্ত্রণা।
নামটা শুনেছি পড়িনি আমি, জীবনানন্দ দাশ,
লাশকাটা এই শহরে, আমি জীবন্ত লাশ।

নামটা শুনেছি পড়িনি আমি, জীবনানন্দ দাশ,
লাশকাটা এই শহরে, আমি জীবন্ত লাশ।
দশটা পাঁচটা মনটা আমার করে শুধু হাঁস ফাঁস।
মাসের প্রথম দিনটার অপেক্ষায়।
চেপে চেপে রেখে মান অভিমান, টিপে টিপে খরচা।
চারটা চৌকো মধ্যবিত্ত বাঁচার প্রচেষ্টা,
পাল্টে যাবেনা কোনোদিন এই দুয়ে দুয়ে চার নামতা আমার
ক্যাবলাকান্ত কেরানীর কবিতা।

মিসেস আমার গুন গুন করে গাইছে আজকে গান।
ভুলে গেছে সে ছেঁড়া ব্ লাউজের লজ্জা অপমান,
সত্যি হবেনা জেনেও করছে, বন্ধক রাখা গয়নাগুলোর
উদ্ধার করে আনার নানান প্ল্যান।
একটা দিনের জন্যেও সব উল্টোপাল্টা হোক,
চুলোয় যাকগে আপোস অভাব লাভ লোকসান ক্ষোভ।
একটা রাতের জন্যেও সেই হারানো সুর বাজুক,
এই রাতটা তোমার আমার।
বেঁচে থাকি যদি তিরিশটী দিন আবার আসবো ফিরে,
নিয়ন আলো করে এলোমেলো, ধর্মতলার মোড়ে,
হৃদয়ের সব যন্ত্রণা আমি দেব ঊজার করে,
মাসের প্রথম দিনটায় আবার।


.           *************************      
.                                                                               
সূচিতে . . .     



মিলনসাগর