কবি ভারতচন্দ্র রায় - অষ্টাদশ শতকের শ্রেষ্ঠ বাঙালী কবিদের মধ্যে অন্যতম | উনবিংশ
শতাব্দীতে মাইকেল মধুসূদন দত্তর আবির্ভাবের পূর্ব পর্যন্ত তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল অপ্রতিহত | ভারতচন্দ্রের
জীবন উপন্যাসের মতো বৈচিত্রময় | তিনি ছিলেন বহুভাষী, বহু অভিজ্ঞতা সম্পন্ন এক প্রতিভাবান ঐতিহাসিক
চরিত্র |

তিনি জন্ম গ্রহণ করেন হুগলি জেলার, আমতার কাছে (ভুরশুট পরগণায়), পেঁড়ো-বসন্তপুর গ্রামে | পিতা
নরেন্দ্রনারায়ণ রায় ঐ গ্রামের জমিদার ছিলেন | মাতা ভবানি | তাঁদের উপাধি মুখোপাধ্যায় | ভারতচন্দ্রের
শৈশবে তাঁদের জমিদারী বর্ধমান রাজ-পরিবার খাস-দখল করে নিলে তাঁরা সপরিবারে কবির মামাবাড়ী
মণ্ডলঘাট পরগণার নওয়াপাড়ায় আশ্রয় নেন | কাছেই তাজপুর গ্রামের টোলে পাঠ আরম্ভ করেন এবং
তাজপুরের নরোত্তম আচার্যের কন্যার সাথে তাঁর বিবাহ দেওয়া হয় | এই সময় তাঁর পিতা জমিদারী ফিরে
পান |

এরপর ভারতচন্দ্র দেবানন্দপুরে গিয়ে সেখানকার মুনশিদের বাড়ীতে থেকে সংস্কৃত ও ফারসি ভাষা শেখেন |
একদিন সেখানে "সত্যনারায়ন"-কথা পাঠ করবার ভার তাঁর উপর পড়ে |  তিনি প্রচলিত পুঁথি থেকে পাঠ না
করে নিজের লেখা সত্যনারায়ণের কথা থেকে পাঠ করে সবাইকে অবাক করে দেন | এই ব্রতকথা
(সত্যনারায়ণের পাঁচালী) রচিত হয় ১৭২৭ সালে, কবির মাত্র ১৫ বছর বয়সে |

খাজনা বাকি পড়ায় বর্ধমান-রাজ কবির পিতার উপর আবার অত্যাচার শুরু করেন | রাজাকে সন্তুষ্ট করতে
ভারতচন্দ্রকে বর্ধমান যেতে হয় | বর্ধমান-রাজ তাঁর কোন কথা না শুনে তাঁদের জমিদারীর ইজারা শেষ করে
দেন এবং তাঁকে কারারুদ্ধ করা হয় | তিনি ৩৯ বছর বয়সে কারাধ্যক্ষের সাহায্যে কারাগার থেকে পালিয়ে
পুরুষোত্তমে ( পুরী ) গিয়ে  সন্ন্যাসীর বেশে দিনযাপন করতে থাকেন | সেখানে তিনি বৈষ্ণবদের প্রভাবে
আসেন | তাঁর ভায়রাভাই সেখানে তাঁর খোঁজ পেয়ে তাঁকে তাঁর শশুরবাড়ীতে নিয়ে আসেন |

কবি ২৫ বছর পর স্ত্রীর সাথে পুনর্মিলিত হন |  এর পর ফরাসডাঙার দেওয়ান ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরীর আশ্রয়ে
থাকেন | এই সময় ইন্দ্রনারায়ণ, নবদ্বীপের মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের সাথে তাঁর পরিচয় করিয়ে দিলে, মহারাজ
তাঁকে ৪০টাকা বেতনে নিজের সভাকবি নিযুক্ত করেন, এবং কবিকে তাঁর রাজধানী কৃষ্ণনগরে নিয়ে যান |
সেখানেই মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের আদেশানুসারে ভারতচন্দ্র রচনা করেন অনন্দামঙ্গল এবং বিদ্যাসুন্দর কাব্য |
সম্ভবত অন্নদামঙ্গল কাব্য রচনার পরেই মহারাজ তাঁকে "রায়গুণাকর" উপাধিতে ভূষিত করেন |

এরপর মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র কবির সাংসারিক অবস্থা জানতে পেরে  কবিকে ২৪পরগণার মূলাজোড় গ্রাম
বার্ষিক ৬০০ টাকায় ইজারা দেন এবং সেই গ্রামে গঙ্গার তীরে  বসতবাড়ী তৈরী করতে ১০০ টাকা সাহায্য
দান করেন | এখানেই কবি রসমঞ্জরী গ্রন্থ রচনা করেন |

বর্ধমানের মহারাণী--- রাজা তিলকচন্দ্রের জননী, কৃষ্ণনগরের মহারাজের কাছ থেকে বামদেব নাগের নামে
কৌশলে মূলাজোড় পত্তনি নেন | এই বামদেব যখন ভারতচন্দ্রের উপর অত্যাচার শুরু করে, সেই অত্যাচারে
ব্যথিত হয়ে ভারতচন্দ্র নাগাষ্টক কাব্য রচনা করেন | মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র সেই কাব্য পাঠ করে ভারাক্রান্ত
হৃদয়ে তা বর্ধমানের মহারাণীর কাছে পাঠিয়ে দেন | এর পরই ভারতচন্দ্রের প্রতি অত্যাচার বন্ধ করা হয় |
পিতার মৃত্যুর পর তিনি আবার কৃষ্ণনগরে চলে আসেন এবং পাদপুরাণ প্রভৃতি কাব্য রচনা করেন |

১৭৬০ সালে মাত্র ৪৮ বছর বয়সে বহুমুত্র রোগে
(Diabetes) তাঁর মৃত্যু হয় |

অন্নদামঙ্গল কাব্য রায়গুণাকর ভারতচন্দ্রের প্রধান রচনা  | নিঃসন্দেহে এটি বাংলা সাহিত্যের একটি
স্মরণীয় রচনা | এর প্রথম অংশ পৌরাণিক কাহিনী, দ্বিতীয় অংশ বিদ্যাসুন্দর কাহিনী বিহ্লনের
"চৌরপঞ্চাশিকা" ভিত্তিক, তৃতীয় ভারতচন্দ্রের স্বকীয় --- মানসিংহের সঙ্গে প্রতাপাদিত্যের যুদ্ধ ও প্রতাপের
পরাজয় | অন্নদামঙ্গল কাব্যে তিনি পুরাতন কাব্যবস্তুকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে উজ্জ্বল করে তুলেছেন | তাঁর
চরিত্ররচনা যেমন নিপুণ (ঈশ্বরী পাটনী কিংবা হীরা মালিনী) তেমনই নিপুণ তাঁর বিচিত্র ঘটনা-সংস্থান-ক্ষমতা
এবং ভাষা ও ছন্দের কুশলতা | সংস্কৃত-আরবি-ফারসি-হিন্দুস্তানীর মিশ্রণে তিনি এক নতুন বাকভঙ্গি সৃষ্টি
করেছিলেন | তাঁর ছন্দের নৈপুণ্য, ভাষার কারুকার্য যেমন প্রশংসা পেয়েছে, তেমনই তাঁর কাব্য (বিশেষত
বিদ্যাসুন্দর) নিন্দিতও হয়েছে অশ্লীলতার জন্য | শৃঙ্গার ফেনিলতরঙ্গে উদ্বেলিত বিদ্যাসুন্দর নায়ক-নায়িকার
উদ্দীপ্ত কামবিলাসের স্তর পরম্পরার অতি শিল্পিত বিবরণ |

ভারতচন্দ্রের কাব্যের প্রভাব পরবর্তী বাংলা সাহিত্যে বিশেষ স্পষ্ট | বিদ্যাসুন্দর কাহিনী অবলম্বনে অনেক
রচনা লিখিত হয় | নাটক ও যাত্রায় বিদ্যাসুন্দর কাহিনী ছিল সবিশেষ জনপ্রিয় |  ভারতচন্দ্রের বাকভঙ্গি
এবং ছন্দ কুশলতা দীর্ঘদিন বাঙালী পাঠকের মন অভিভূত করে রেখেছিল |

রসমঞ্জরী রচনায় মৈথিল কবি ভাণুদত্তের নায়ক-নায়িকা-লক্ষ্মণ সম্পর্কিত গ্রন্থের অনুবাদ |

শেষ জীবনে রচনা করেন সংস্কৃত ও বাংলায়
নাগাষ্টক কাব্য  এবং সংস্কৃতে গঙ্গাষ্টক কাব্য | নাগাষ্টকের
মূল শ্লোকগুলি সংস্কৃত শিখরিণী ছন্দে, বঙ্গানুবাদেও এই শিখরিণী ছন্দের অনুসরণ করা হয়েছে | ভারতচন্দ্র
বাংলায় সংস্কৃত ছন্দের প্রয়োগ করেছেন |   


.                                      --- উত্স:  সুকুমার সেন, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস
.                                                  আশুতোষ ভট্টাচার্য, বাংলা মঙ্গলকাব্যের ইতিহাস
.                                                  মদনমোহন গোস্বামী, রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র ১৯৫৪
.                                                  
ডঃ শিশির কুমার দাশ, সংসদ সাহিত্য সঙ্গী ২০০৩
.                                                  
দুর্গাদাস লাহিড়ি সম্পাদিত "বাঙালীর গান" ১৯০৫  
.


আমাদের যোগাযোগের ঠিকানা :-
srimilansengupta@yahoo.co.in