দীনবন্ধু মিত্র-এর জন্ম হয় ১৮৩০ সালে নদীয়ার চৌবেড়িয়া গ্রামে| পিতা কালাচাঁদ মিত্র| পিতৃদত্ত নাম "গন্ধর্ব নারায়ণ" নিজেই বদলে করেন "দীনবন্ধু"| গ্রামের পাঠশালায় পঠন শুরু করে পরে কাকা নীলমণি মিত্রের কাছে থেকে, রেভারেন্ড জেমস লং এর স্কুলে পড়ে ১৮৫০ সালে কলকাতার হিন্দু কলেজে ভর্ত্তি হন| ১৮৫৫ সালে কলেজের ফাইনাল পরীক্ষায় না বসে পাটনায় পোস্ট মাস্টারের চাকরি শুরু করেন| ডাক বিভাগে নানা জায়গায় কাজ করার পর ১৮৭০ সালে কলকাতায় বদলি হয়ে আসেন| ১৮৭১ সালে আসামে লুসাই যুদ্ধের সময় আসাম অঞ্চলে ডাক ব্যবস্থা একদম ভেঙ্গে পড়ে| তখন তিনিই নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাছাড়ে গিয়ে পুনরায় ডাক ব্যবস্থা সচল করেন| এই কাজের কৃতজ্ঞতা স্বীকার হিসেবে বিটিশ সরকার তাঁকে রায় বাহাদুর উপাধিতে ভূষিত করেন| মধুমেহ বা ডায়াবেটিসের রোগের কারণে মাত্র ৪৩ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়| কবি ঈশ্রচন্দ্র গুপ্তের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে দীনবন্ধু মিত্র ছাত্রাবস্থা থেকেই কবিতা লিখতে শুরু করেন| তাঁর কাব্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে সুরধুনি কাব্য(প্রথম ভাগ-১৮৭২,দ্বিতীয় ভাগ-তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত), দ্বাদশ কবিতা(১৮৭২)| তাঁর নাটকের মধ্যে আছে "নবীন তপস্বিনী"(১৮৬৩), "বিয়ে পাগলা বুড়ো" (১৮৬৬), "সধবার একাদশী"(১৮৬৬), "লীলাবতী"(১৮৬৭), জামাই বারিক(১৮৭২),"কমলে কামিনী"(অসুস্থ শরীরে লেখা ১৮৭৩), "জমালয়ে জীবন্ত মানুষ" এবং "নীলদর্পণ"(১৮৬০)| নীলদর্পণ নাটকে তিনি নীলচাষীদের উপর নীলকর সাহেবদের অত্যাচারকে সর্বসমক্ষে তুলে ধরে ছিলেন| পুলিশের সকর্কতা সত্বেও "ন্যাশনাল থিয়েটারের" ব্যানারে নাটকটি চারবার অভিনীত হয়| নীলচাষীদের উপর অত্যাচারের অভিনয় দেখতে বসে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর উত্তেজিত হয়ে মঞ্চে অভিনেতাদের দিকে তাঁর চটি খুলে ছুড়ে মেরেছিলেন! সেই চটিজুতাকে অভিনয়ের পুরস্কাররূপে তাঁরা গ্রহণও করেছিলেন| মাইকেল মধুসূদন দত্ত এই নাটকের ইংরেজী অনুবাদ করলে রেভারেন্ড জেমস লং তা প্রকাশিত করেন যার জন্য সাহেবকে জরিমানা করেন আদালত| এই জরিমানার ১০০০ টাকা দেন কালীপ্রসন্ন সিংহ| বঙ্কিমচন্দ্র চট্ট্যোপাধ্যায় তুলনা করে লেখেন যে Uncle Tom's Cabin আমেরিকায় দাসপ্রথা নির্মূলে যে ভূমিকা নিয়েছিল, নীলদর্পণ নাটক ভারতে নীলচাষীদের উপর ব্রিটিশদের অত্যাচার নির্মূলে একই ভূমিকা পালন করেছিল| দীনবন্ধু মিত্র এর জন্যই চিরস্মরনীয় হয়ে থাকবেন| তিনি রোমান্টিক কবি ও সাহিত্যিক হিসেবে সফল না হলেও, দরিদ্র কৃষক, সমাজের তথাকথিত নিম্ন স্তরের মানুষ তাঁর লেখায় জীবন্ত হয়ে ফুটে উঠেছে| উত্স: ক্ষেত্র গুপ্ত, বাংলার মনিষা