মৈমনসিংহ গীতিকা অন্তর্গত পালা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
দৈর্ঘ্যের কথা ভেবে আমরা এখানে সব কটি পালারই অংশবিশেষ তুলে দিলাম | এখানে পালাগুলি
আংশিক দিলেও স্তবকগুলি পুরোপুরি দেওয়া হয়েছে | উত্স: সুখময় মুখোপাধ্যায় এবং সুখেন্দু
শেখর গঙ্গোপাধ্যায় এর সম্পাদিত গন্থ "ময়মনসিংহ-গীতিকা"|

কবি চন্দ্রাবতীর (বাংলার প্রথম মহিলা কবি) রচনা |
এইখানে ক্লিক করে কবি চন্দ্রাবতীর পাতায় তাঁর "মলুয়া" "দস্যু কেনারামের পালা" পড়ুন

কবি দ্বিজ কানাই রচিত "মহুয়া" পালা
১।  
প্রেমের জয় (স্তবক ১)     

কবি দামোদর দাস, রঘুসুত, নয়ানচাঁদ ঘোষ এবং শ্রীনাথ বানিয়া রচিত
"কঙ্ক ও লীলা" পালা
২।  
গোপন দীক্ষা (স্তবক ৮)
৩।  সত্যপীরের পাঁচালী (স্তবক ৯)
৪।  কঙ্ককে জাতিতে তোলা (স্তবক ১০)
৫।  কঙ্কের বিরুদ্ধে ব্রাহ্মণগণের ষড়যন্ত্র (স্তবক ১১)            

অজানা কবির রচনা
"কাজলরেখা" পালা | এই পালাটি গদ্য, পদ্য ও গানের সমন্বয়ে রচিত |
৬।  
স্তবক ১৪    

কবি নয়ানচাঁদ ঘোষ রচিত
"চন্দ্রাবতী" পালা
৭।  
ফুল-তোলা (স্তবক ১)     
৮।  
প্রেমলিপি (স্তবক ২)
৯।  দুঃসংবাদ (স্তবক ১০)
১০। চন্দ্রার অবস্থা (স্তবক ১১)

কবি দ্বিজ ঈশান রচিত "কমলা" পালা
১১।  
কমলা যৌবনাগমে (স্তবক ৩)              

অজানা কবির রচনা
"দেওয়ান ভাবনা" পালা | দীনেশচন্দ্র সেনের মতে এটি চন্দ্রাবতীর রচনা |
১২।  
স্তবক ৩             

মুসলমান কবি জালাল গাইন রচিত "
দেওয়ানা মদিনা" বা "আলাল দুলালের পালা"  
১৩।  
স্তবক ২

অজানা কবির রচনা "রূপবতী" পালা |
১৪।  
স্তবক ১


একটি অনুরোধ - এই সাইট থেকে আপনার ব্ লগ্ বা সাইটে, আমাদের লেখা বা কবিতা
নিলে, আমাদের http://www.milansagar.com/index.html মূল পাতায় দয়া করে একটি ফিরতি লিঙ্ক
দেবেন আপনার ব্ লগ্  বা সাইট থেকে, ধন্যবাদ!
  
*
মহুয়া
|| ১৬ ||
প্রেমের জয়

পাষাণে বান্ধিয়া হিয়া বসিল শিওরে |
নিদ্রা যায় নদীয়ার ঠাকুর হিজল গাছের তলে ||
আশমানের চান্দ যেমন জমিনে পড়িয়া |
নিদ্রা যায় নদীয়ার চান্ অচৈতন্য হইয়া ||
একবার দুইবার তিনবার করি |
উঠাইল নামাইল কন্যা বিষলক্ষের ছুরি ||
"উঠ উঠ নদ্যাঠাকুর কত নিদ্রা যাও |
অভাগী মহুয়া ডাকে আঁখি মেইল্যা চাও ||
পাষাণ বাপে দিল ছুরি তোমায় মারিতে |
কিরূপে বধিব তোমায় নাহি লয় চিতে ||
পাষাণ আমার মা ও বাপ পাষাণ আমার হিয়া |
কেমনে ঘরে যাইবাম ফিইরা তোমারে মারিয়া ||
জ্বালিয়া ঘিয়ের বাতি ফু দিয়া নিবাই |
তুমি বন্ধুরে আমার আর লইক্ষ্যা নাই ||
তুমারে মারিয়া আমি কেমনে যাইবাম ঘরে |
পাষাণ হইয়া মা ও বাপে বধিল আমারে ||
কাজ নাই ভিন দেশী বন্ধুরে দুঃখ নাইরে করি |
আমার বুকে মারবাম আমি এই বিষলক্ষ্যের ছুরি ||"
কি কর কি কর কন্যা কি কর বসিয়া |
কাঞ্চা ঘুম জাগে ঠাকুর স্বপন দেখিয়া ||
শিওরে বসিয়া দেখে কান্দিছে সুন্দরী |
হাতে তুইল্যা লইছে কন্যা বিষলক্ষ্যের ছুরি ||
"শুন শুন ঠাকুর আরে শুন মোর কথা |
কঠিন তোমার প্রাণ পিওয়া কঠিন মাতা পিতা ||
শানে বান্ধা হিয়া আমার পাযাণে বান্ধা প্রাণ |
তোমায় বধিতে বাপে করিল সইন্ধান ||
হাতেত আছিল মোর বিষলক্ষের ছুরি |
তোমারে ছাড়িয়া বন্ধু আমার বুকে মারি ||
পালাইয়া মায়ের ধন নিজের দেশে যাও |
সুন্দর নারী বিয়া কইরা সুখে বইসা খাও ||
বরামনের পুত্র তুমি রাজার ছাওয়াল |
তোমার সুখের ঘরে আমি হইলাম কাল ||
কি করিতে কি করিলাম নাহি পাই দিশা |
অরদিশ হইয়া আমি...................||

মাও ছাড়ছি বাপ ছাড়ছি ছাড়ছি জাতি কুল |
ভমর হইলাম আমি তুমি বনের ফুল ||
তোমার লাগিয়া কন্যা ফিরি দেশে বিদেশে |
তোমারে ছাড়িয়া কন্যা আর না যাইবাম দেশে ||
কি কইবাম বাপ মায়ে কেমনে যাইবাম ঘরে |
জাতি নাশ করলাম কন্যা তোমারে পাইবার তরে ||
তোমায় যদি না পাই কন্যা আর না যাইবাম বাড়ী |
এই হাতে মার লো কন্যা আমার গলায় ছুরি ||

"পইড়া থাকুক বাপ মাও পইড়া থাকুক ঘর |
তোমারে লইয়া বন্ধু যাইবাম দেশান্তর ||
দুই আঁখি যে দিগে যায় যাইবাম সেইখানে |
আমার সঙ্গে চল বন্ধু যাইবাম গহীন বনে ||
বাপের আছে তাজি ঘোড়া ঐ না নদীর পারে |
দুইজনেতে উঠ্যা চল যাইগো দেশান্তরে ||
না জানিবে বাপ মায় না জানিবে কেহ |
চন্দ্র সূর্য সাক্ষী কইরা ছাইড়া যাইবাম দেশ ||
আবে করে ঝিলিমিলি নদীর কুলে দিয়া |
দুইজনে চলিল ভালা ঘোড়ায় সুয়ার হইয়া ||
চান্দ সূরুজ যেন ঘোড়ায় চলিল |
চাবুক খাইয়া ঘোড়া শণেতে উড়িল ||

********************
কঙ্ক ও লীলা
 || ৮ ||
গোপন দীক্ষা

জুহরী জহর চিনে বেনে চিনে সোনা |
পীর প্যাগাম্বর চিনে সাধু কোন জনা ||
পীরের অদ্ভুত কাণ্ড সকলি দেখিয়া |
কঙ্কের পরাণ গেল মোহিত হইয়া ||
সর্ব্বদা নিকটে কঙ্ক ভক্তিপূর্ণ মনে |
চরণে লুটায় তার দেবতার জ্ঞানে ||
তার পর জাতি ধর্ম সকলি ভুলিয়া |
পীরের প্রসাদ খায় অমৃত বলিয়া ||
দীক্ষিত হৈলা কঙ্ক যবন পীরের স্থানে |
সর্ব্বনাশের কথা কঙ্ক কিছুই না জানে ||
জাতি-ধর্ম নাশ হইল রটিল বদনাম |
পীরের নিকটে কঙ্ক শিখিয়ে কালাম ||
পীরের নিকটে যায় কেউ নাহি জানে |
গতায়তি করে কঙ্ক অতি সংগোপনে ||
ভক্তি-মুক্তি-তন্ত্র-মন্ত্র-দেহ মন প্রাণ |
অচিরে গুরুর পদে কৈল সমর্পণ ||
গুরুতে বিশ্বাস আর গুরু ইষ্ট ধন |
দামোদর দাস কহে এই ভক্তের লক্ষণ ||

*********************
কঙ্ক ও লীলা
|| ৯ ||
সত্যপীরের পাঁচালী

দেখিয়া শুনিয়া পীর,          কঙ্কেরে করিলা স্থির,
উপযুক্ত ভক্ত এহি জন |
সত্যপীরের পাঁচালী,          কঙ্কেরে লিখিতে বলি,
একদিন হৈল-অদর্শন ||
গুরুর আদেশ মানি,          লিখিয়া পাঁচালী আনি,
পাঠাইলা দেশে আর বিদেশে |
কঙ্কের লিখন কথা,              ব্যক্ত হৈল যথা তথা,
দেশ পূর্ণ হৈল তার যশে ||
কঙ্ক আর রাখাল নহে,          কবিকঙ্ক লোক কহে,
শুনি গর্গ ভাবে চমত্কার |
হিন্দু আর মোসলমানে,      সত্যপীরে উভে মানে,
পাঁচালীর হৈল সমাদর ||
যেই পূজে সত্যপীরে,            কঙ্কের পাঁচালী পড়ে,
দেশে দেশে কঙ্কের গুণ গায় |
বুঝি কঙ্কের দিন ফেরে,          রঘুসুত কহে ফেরে,
দুঃখিতের দুঃখ নাহি যায় ||

*********************
কঙ্ক ও লীলা
|| ১০ ||
কঙ্ককে জাতিতে তোলা

জানিয়া শুনিয়া কানে,          ভাবে গর্গ মনে মনে,
নহে কঙ্ক সামান্য মানব |
ভক্তিমান অতি ধীর,          গর্গ কৈলা মনে স্থির,
কঙ্ক ঘরে তুলিয়া লইব ||
পণ্ডিত সমাজী গণে,          একত্র করিয়া ভণে,
"এই কঙ্ক ব্রাহ্মণ-তনয় |
জ্ঞন মানে নাহি রয়,          চণ্ডালের অন্ন খায়,
ঘরে নিতে নাহিক সংশয় ||"
এতেক শুনিয়া নন্দু,          আর যত গোড়াহিন্দু,
কয় সবে মাথা নাড়াইয়া |
"আমরা সম্মত নহি,          আরও শুন সবে কহি,
লহ কঙ্কে মোদের ছাড়িয়া ||
জন্মিয়া চণ্ডালের অন্ন খায় যেই জন |
যে তারে সমাজে তুলে নহে সে ব্রাহ্মণ ||
অনাচারে জাতি নষ্ট, নষ্ট হয় কুল |
মটিতে পড়িলে কেহ নাহি তুলে ফুল ||"

আর এক দল ভয়ে গর্গে ডরাইয়া |
গর্গের কথায় শুধু গেল সায় দিয়া ||
আদেখা হইলে গর্গ করে কত ফন্দি |
কঙ্কে না তুলিতে গর্গে করে অন্দি সন্দি ||
কত তর্ক-যুক্তি গর্গ সকলে দেখায় |
তবু নাহি সে বিধি দিল পণ্ডিতসভায় ||
কেহ বলে তুলি  ঘরে কেহ বলে নয় |
এই মতে নানা স্থানে বহু তর্ক হয় ||

চারি দিকে দাউ দাউ অনল জ্বলিল |
জ্বলিলেন গর্গ মুনি কঙ্ক ভস্ম হইল ||
এমন সুখের ঘর পুড়ে হল ছাই |
নিয়তি খণ্ডিতে পারে হেন সাধ্য নাই ||
আছিল চণ্ডাল কঙ্ক হইল ব্রাহ্মণ |
কঙ্কেরে নাশিতে যুক্তি করে দ্বিজগণ ||

    *********************
কঙ্ক ও লীলা
|| ১১ ||
কঙ্কের বিরূদ্ধে ব্রাহ্মণগণের ষড়যন্ত্র

নানামত ভাবি তারা উপায় করিল |
মাপের চোখেতে যেন ধুলা-পড়া দিল ||
রটে কঙ্ক নহে শুধু চণ্ডালের পুত |
মোসলমান পীরের কাছে হৈল দীক্ষিত ||
হিন্দু যত সবে কঙ্কে মোসলমান বলি |
কেহ ছিড়ে কেহ পুড়ে সত্যের পাঁচালী ||
জাতি গেল মোসলমানের পুঁথি নিয়া ঘরে |
যথাবিধি সবে মিলি প্রায়শ্চিত্ত করে ||

আর এক কথা রটে না যায় কথন |
"কঙ্কেরে সঁপেছে লীলা জীবন-যৌবন ||"
সন্ধ্যামন্ত্র নাহি ঝানে বেদাচারহীন |
দুরন্ত দুর্জন যারা সমাজেতে ঘৃণ ||
মদ্য-মাংস খায় সদ্য পাষণ্ড-আচার |
জন্মি ব্রাহ্মণ-কুলে যত কুলাঙ্গার ||
মিথ্যা বদনাম তারা দিল রটাইয়া |
"কলঙ্কী হইয়াছে লীলা কুল ভাঙ্গাইয়া ||"
একে ত কুমারী কন্যা অতি শুদ্ধমতী |
কলঙ্ক রটাইল তার যত দুষ্টমতি ||

*********************
কাজলরেখা  
|| ১৪ ||
     বাপ মায়ের কথা, বংশের কথা না সুধাইয়াই, একমাত্র প্রাণ-দাতা বলিয়া রাজকুমার তাকে
বিয়া করতে প্রতিজ্ঞা করল |

গান--
ঘরে আছিল ঘিরেত বাতি সদাই অগ্নি জ্বলে |
তারে ছুইয়া কুমার পরতিজ্ঞ যে করে ||
   ঠিক এমন সময় ছান কইরা ভিজা কাপড়ে কাজলরেখা মন্দিরে প্রবেশ করল | ঢুইকাই দেখে যে
তার স্বামী বাঁইচ্যা উঠছে |
গান--
গ্রহণ ছাড়িলে যেমন চান্দের প্রকাশ |
কুমারে দেখিয়া কন্যা পাইল আশ্বাস ||
প্রভাতের ভানু যিনি ছুরত সুন্দর |
একে একে দেখে কন্যা সর্ব্ব কলেবর ||
কন্যারে দেখিয়া কুমার লাগে চমত্কার |
এমন নারীর রূপ না দেইখ্যাছে আর ||
পরথম যৌবনে কন্যা হীরা-মতি জ্বলে |
কন্যারে দেখিয়া কুমার কহে মিঠা বুলে ||
"কোথা হতে আইলা কন্যা কি বা নম ধর |
কিবা নাম বাপ মার কোন দেশে ঘর ||
কিসের লাগিয়া কন্যা ভ্রম বনে বনে |
স্বরূপ উত্তর দাও এই অভাজনে ||
মাও ত নিঠুরা তোমার বাপ ত নিঠুর |
ঘরের বাইর কইরা তোমায় দিল বনান্তর ||"
আগু হইয়া পরিচয় কহে কঙ্কণ দাসী |
"কঙ্কণে কিন্যাছি ধাই নাম কাঙ্কণ দাসী |"

রাণী হইল দাসী আর দাসী হইল রাণী |
কর্মদোষে কাজলরেখা জন্ম-অভাগিনী ||
 সন্ন্যাসীর আদেশ মতে কাজলরেখা স্বামীর নিকট আত্ম-পরিচয় দিতে পারিল না | স্বামীর সঙ্গে
দাসী হইয়াই স্বামীর রাজ্যে চলিয়া গেল |

                                            ***********************
চন্দ্রাবতী   
|| ১ ||
ফুল-তোলা

"চাইরকোণা পুস্কুনির পারে চম্পা নাগেশ্বর |
ডাল ভাঙ্গ পুষ্প তুল কে তুমি নাগর ||"
"আমার বাড়ী তোমার বাড়ী ঐ না ঐ না নদীর পার |
কি কারণে তুল কন্যা মালতীর হার ||"

"প্রভাতকালে আইলাম আমি পুষ্প তুলিবারে |
বাপেত করিব পূজা শিবের মন্দিরে ||"

বাছ্যা বাছ্যা ফুল তুলে রক্তজবা সারি |
জয়ানন্দ তুলে ফুল ঐ না সাজি ভরি ||
জবা তুলে চম্পা তুলে গেন্দা নানাজাতি |
বাছিয়া বাছিয়া তুলে মল্লিকা মালতী ||
তুলিল অপরাজিতা আতসি সুন্দর |
ফুলতুলা হইল শেষ আনন্দ অন্তর ||
এক দুই তিন করি ক্রমে দিন যায় |
সকালসন্ধ্যা ফুল তলে কেউ না দেখতে পায় ||
ডাল যে নোয়াইয়া ধরে জয়ানন্দ সাথী |
তুলিল মালতী ফুল কন্যা চন্দ্রাবতী ||
একদিন তুলি ফুল মালা গাঁথি তায় |
সেইত না মালা দিয়া নাগরে সাজায় ||

   *********************
চন্দ্রাবতী   
|| ২ ||
প্রেম-লিপি

পরথমে লিখিল পত্র চন্দ্রার গোচরে |
পুষ্পপাতে লেখে পত্র আড়াই অক্ষরে ||
পত্র লেখে জয়ানন্দ মনের যত কথা |
"নিতি নিতি তোলা ফুলে তোমার মালা গাঁথা ||
তোমার গাঁথা মালা লইয়া কন্যা কান্দিলো বিরলে |
পুষ্প বন অন্ধকার তুমি চল্যা গেলে ||
কইতে গেলে মনের কথা কইতে না জুয়ায় |
সকল কথা তোমার কাছে কইতে কন্যা দায় ||
আচারি তোমার বাপ ধর্ম্মে কর্ম্মে মতি |
প্রাণের দোসর তার তুমি চন্দ্রাবতী ||
মাও নাই বাপ নাই থাকি মামার বাড়ী |
তোমার কাছে মনের কথা কইতে নাহি পারি ||
যেদিন দেখ্যাছি কন্যা তোমাল চান্দবদন |
সেইদিন হইয়াছি আমি পাগল যেমন ||
তোমার মনের কথা আমি জানতে চাই |
সর্ব্বস্ব বিকাইলাম পায় তোমারে যদি পাই ||
আজি হতে ফুল তোলা সাঙ্গ যে করিয়া |
দেশান্তরি হইব ক্ন্যা বিদায়ে লইয়া ||
তুমি যদি লেখ পত্র আশায় দেও ভর |
যোগল পদে হইয়া থাকবাম তোমার কিঙ্কর ||"

 *********************
চন্দ্রাবতী   
|| ১০ ||
দুঃসংবাদ

ঢুল বাজে ডাগর বাজে জয়াদি জুকার |
মালা গাথে কুলের নারী মঙ্গল আচার ||
এমন কালে দৈবেতে করিল কোন কাম |
পাপেতে ডুবাইল নাগর চৈদ্দ পুরুষের নাম ||
কি হইল কি হইল কথা নানান জনে কয় |
এই যে লোকের কথা প্রত্বয় না হয় ||
পুরীতে জুড়িয়া উঠে কান্দনের রোল |
জাতিনাশ দেখ্যা ঠাকুর হইল উতরুল ||
"কপালের দোষ, দোষ নহে বিধাতার |
যে লেখা লেখ্যাছে বিধি কপালে আমার ||
মুনির হইল মতিভ্রম হাতীর খসে পা |
ঘাটে আস্যা বিনা ঝড়ে ডুবে সাধুর না ||
পাড়া পড়সি কয়, ঠাকুর কইতে না জুয়ায় |
কি দিব কন্যার বিয়া, ঘটল বিষম দায় ||
অনাচার কৈল জামাই অতি দুরাচার |
যবনী করিয়া বিয়া জাতি কৈল মার ||"

শিরেতে পড়িল বাজ মঠের মাথায় ফোড় |
পুরীর যত বাদ্যভাণ্ড সব হৈল দূর ||
ধূলায় বসিল ঠাকুর শিরে দিয়ে হাত |
বিনা মেঘে হইল যেন শিরে বজ্রাঘাত ||

*********************
চন্দ্রাবতী   
|| ১১ ||
চন্দ্রার অবস্থা

"কি কর লো চন্দ্রাবতী ঘরেতে বসিয়া |"
সখিগণ কয় কথা নিকটে আসিয়া ||
শিরে হাত দিয়া সবে জুড়য়ে কান্দন |
শুনিয়া হইল চন্দ্রা পাথর যেমন ||
না কান্দে না হাসে চন্দ্রা নাহি বলে বাণী |
আছিল সুন্দরী কন্যা হইল পাষাণী ||
মনেতে ঢাকিয়া রাখে মনের আগুনে |
জানিতে না দেয় কন্যা জল্যা মরা মনে ||

এক দিন দুই দিন তিন দিন যায় |
পাতেতে রাখিয়া কন্যা কিছু নাহি খায় ||
রাত্রিকালে শর-শয্যা বহে চক্ষের পানি |
বালিস ভিজিয়া ভিজে নেতের বিছানি ||
শৈশবের যত কথা আর ফুল তুলা |
নদীর কুলেতে গিয়ে করে জলখেলা ||
সেই হাসি সেই কথা সদা পড়ে মনে |
ঘুমাইলে দেখিব কন্যা তাহারে স্বপনে ||
নয়নে না আসে নিদ্রা অঘুমে রজনী |
ভোর হইতে উঠে কন্যা যেন পাগলিনী ||
বাপেত বুঝিল তবে কন্যার মনের কথা |
কন্যার লাগিয়া বাপের হইল মমতা ||
সম্বন্ধ আসিল বড় নানা দেশ হইতে |
একে একে বংশিদাস লাগে বিচারিতে ||

চন্দ্রাবতী বলে "পিতা মম বাক্য ধর |
জন্মে না করিব বিয়া রইব আইবর  ||
শিবপূজা করি আমি শিবপদে মতি |
দুঃখিনীর কথা রাখ কর অনুমতি ||"
অনুমতি দিয়া পিতা কয় কন্যার স্থানে |
"শিবপূজা কর আর লেখ রামায়ণে ||"

*********************
কমলা   
|| ৩ ||
কমলা--যৌবনাগমে

দেখিতে সুন্দরী কন্যা পরথম যৌবন |
কিঞ্চিত্ করিব তার রূপের বর্ণন ||
চান্দের সমান মুখ করে ঝলমল |
সিন্দুরে রাঙ্গিয়া ঠুট তেলাকুচ ফল ||
জিনিয়া অপরাজিতা শোভে দুই আখি |
ভ্রমরা উড়িয়া আসে সেই রূপ দেখি ||
দেখিতে রামের ধনু কন্যার যুগল ভুরু |
মুষ্টিতে ধরিতে পারি কটিখানা সরু ||
কাকুনি সুপারি গাছ বায়ে যেন হেলে |
চলিতে ফিরিতে কন্যা যৌবন পরে ঢলে ||
আষাঢ় মাস্যা বাশের কেরুল মাটি ফাট্যা উঠে |
সেই মত পাও দুইখানি গজন্দমে হাটে ||
বেলাইনে বেলিয়া তুলিছে দুই বাহুলতা |
কণ্ঠেতে লুকাইয়া তার কোকিলে কয় কথা||
শ্রাবণ মাসেতে যেন কাল মেঘ সাজে |
দাগল-দীঘল কেশ বায়েতে বিরাজে ||
কখন খোপা বান্ধে কন্যা কখন বান্দে বেণী |
কূপে রঙ্গে সাজে কন্যা মদনমোহিনী ||
অগ্নি-পাটের শাড়ী কন্যা যখন নাকি পরে |
স্বর্গের তারা লাজ পায় দেখিয়া কন্যারে ||
আযাইঢ়া জোয়ারে জল যৌবন দেখিলে |
পুরুষ দূরের কথা নারী যায় ভুলে ||
*********************
দেওয়ান ভাবনা   
|| ৩ ||

গাঁথ গাঁথ সুন্দর কন্যালো মালতীর মালা |
ঝইরা পড়ছে সোনার বকুল গো ঐনা গাছের তলা ||
তোমার বিয়ার ঘটক আইছে লো কালুকা বিহানে |
কেমন করে দিব বিয়াগো ভাবে মনে মনে ||
বরমা যে লেখ্যাছে কলমরে কপালে তোমার |
ভাবিয়া চিন্তিয়া মায় দেখে অন্ধকার ||
এইতনা ঘটক ফির্ য়া গেলগো পছন্দ না হয় |
চান্দের সমান কন্যাগো বর যে কালা হয় ||

এই ঘটক ফির্ য়া গেলরে আর ঘটক আইল |
সোনাইর বিয়া দিতে মায়ের গো মন না উঠিল ||
যেমন সুন্দর কইন্যা গো তেমন না আইল বর |
তার মধ্যা থাকব জামাইর বারবাংলার ঘর ||
সোনার কার্ত্তিক অইবো জামাই গো যেমন চান্দের ছটা |
কুলে শীলে বংশে ভালা গো জমিদারের বেটা ||
যতেক সম্বন্ধ আইল গো সোনাইর মায়ে নাই সে বাসে |
এহি মতে আইল ঘটক পরতি মাসে মাসে ||

*********************
দেওয়ানা মদিনা বা আলাল দুলালের পালা   
|| ২ ||

আওরতের লাগ্যা কান্দে দেওয়ান সোনাফর |
আলাল দুলাল কাইন্দা অইল জর্ জর্ ||
কান্দিয়া কান্দিয়া তারা ভূমিতে লুটায় |
দানা পানি ছাড়্যা কেবল করে হায় হায় ||
মায়ের জানে পুতের বেদন অন্যে জান্ ব  কি |
মায়ের বুকের লৌ পুত্র আর ঝি ||
দুই না ছেউরা ছাওয়ালে বুকেতে করিয়া |
সোনাফর মিঞা কান্দে মাথা থাপাইয়া ||
দুধের ছাওয়ালে কেমনে বাঁচাই পরাণে |
অনাধারে মরে কেমনে দেখিব নয়ানে ||
মা মা বল্যা যখন আরে আলাল দুলাল কান্দে |
বুকেতে আমার হয়রে ছেল যেমন বিন্ধে ||
কি দিয়া বুঝাইয়া রাখি চেউড়া পুত্রেরে |
কে বা খাওন দেয় আরে পরিলাম ফেরে ||
মর্ য়াত না গেছ আওরাত গিয়াছ মারিয়া |
তিনলা পরাণি মার্ য়া গেছ পলাইয়া ||
কি দুষ্মনি কইর্ য়াছিলাম আর জনমে আমি |
তার পর্ তিশোধ লইয়া এই না জন্মে তুমি ||
বান্যাচঙ্গের দেওয়ান আমি নাহি মোর সমান |
অদুন্যাই ধন দৌলত গোলাভরা ধান ||
পন্থের ফকির অইল আরে আমার থাক্যা সুখী |
দুনিয়াতে নাই আর আমার মত দুখী ||
কি করিব ধন দৌলতে আর কি ছার দেওয়ানি |
দিলের দুঃখেতে যদি চক্ষে ঝরে পানি ||
কেবা খাইব আমার যে এই ধন দৌলত |
শূণ্য অইল ঘর মোর মরিয়া আওরাত ||
বুকে ছেল দিয়া গেলা তুমি কোন্ পরাণে |
দুনিয়া যে দেখি আমি আন্ধাইর নয়ানে ||
তুমি যে আছিলা আন্ধাইর ঘরের বাতি |
তুমি যে আছিলা আমার হৃদ-পিঞ্জরার পংখী ||
তোমারে ছাড়িয়া আমি বাঁচি কোন পরাণে |
তেজিতাম পরাণি আমি তোমার কারণে ||
তোমার পিছ লইতাম আমি এই আছিল মনে |
দুধের বাচ্চা রাইখ্যা গিয়া ফালাইলা বে-নালে ||

এইনা কানেদে দেওয়ান আরে বুক না কুটিয়া |
পাড়া পরশী পরা'ব পাইল তারে না বোঝাইয়া ||
ঘর খালি অইল আর গুরজান না চলে |
সোনার সংসার বের্ত্তা হায়রে যায় যে বিফলে ||
ঘরের লক্ষ্মী জননা আরে তার যে লাগিয়া |
বান্ধা সংসার মিঞার যায় যে ভাসিয়া ||
দিবা নিশি চিন্তে মিঞার দুঃখ অইল দিলে |
দরবার বিচার হায়রে কিছু না চলে ||
কিসের সংসার কিসের বাস কেমনে সুখ মিলে |
মনসুর বয়াতি কয় সুখ না থাকলে দিলে ||

উজীর নাজীর সবে আরে এই না দেখিয়া |
মিয়ার নিকট কয় দরশন দিয়া ||
"শুন্ খাইন  দেওয়ান সাহেব শুন্ খাইন  আমার কথা |
সোনার সংসার আপনারে নষ্ট অইল বির্থা ||
আর এক সংসার কর্ য়া  রাখ্যুয়াইন দেওয়ানি বজায় |
এক জনের লাগ্যা কেন সগল জলে যায় ||"
কান্দিয়া দেওয়ান কয় আরে উজীরে নাজীরে |
"দুধের বাচ্চা আলাল দুলাল আছে মোর ঘরে ||
তারার দুঃখ দেখ্যা আমার ফাট্যা যায় বুক |
সাদি করিলে অইব দুঃখের উপর দুখ ||
সতাই না বুঝে সতীন-পুতের বেদন |
সতির-পুতে দেখে সতাই কাঁটার সমান ||
সেই কাঁটা তুইল্যা সতাই দূরেতে ফালায় |
এরে দেখ্যা মন নাই সে সাদি করতে চায় ||
কলিজার লৌ মোর আলাল দুলাল |
দুঃখের উপর দুঃখ দিয়া না বাড়াই জঞ্জাল ||
আলাল দুলালে বিবি আমায় সপ্যা দিয়া |
সাদি না করিতে গেল মানা যে করিয়া ||
বিয়া নাই সে করবাম আমি সংসারের লাগিয়া |
কিসের সংসার আলাল দুলালে মারিয়া ||
তারা মুখ দেখ্যা আছি আরে বাঁচিয়া পরাণে |
রাক্ষসের হাতে নাই সে দিবাম জীবমানে ||

এই কথা শুনিয়া উজার কয় মিঞার কাছে |
কান্দিয়া কাটিয়া সাহেব ফয়দা নাই  সে আছে ||
সতাই সকল সাহেব আরে না হয় সমান |
সতীন্ পুতের লাগ্যা কেউ দেয় জান পরাণ ||
আলাল দুলালে যতন করিবাম সকলে |
দুঃখ নাই সে পাইব কিছু সতাই বাদী অইলে ||
দিলের দুঃখ দূর কইরা কর্ খাইন  এক বিয়া |
সোনার সংসার পাল্ খাইন  যতন করিয়া ||

এই কথা শুনিয়া মিয়া চিন্তে মনে মনে |
কিছু ফয়দা নাই মোর সংসার ছাড়নে ||
সোনার কলি আলাল দুলাল রহিলে বাঁচিয়া |
সংসার না থাকলে তারা খাইব করিয়া ||
সংসার নষ্ট অইলে পরে অইব তারার দুঃখ |
চিরদিন দুঃখে হায় ফাটিব যে বুক ||
আমার বুকের ধন রাখবাম যতন করিয়া |
কি সাধ্য সতাই নেয় তারারে কাড়িয়া ||
এই মতে দেওয়ান আরে চিন্তে মনে মনে |
উজীর নাজীর লাগা পাছে বিয়ার কারণে ||
মনস্থির কইরা দেওয়ান অইলা সম্মত |
সাদি অইলা গেল পরে যেমন বিহিত ||

*********************
রূপবতী   
|| ১ ||

রাজ্য করে রাজচন্দ্র রামপুর শহরে |
বারবাংলার ঘর বান্ ছে ফুলেশ্বরীর পারে ||
গড় খন্দর রাজার লাখের জমিদারী |
হস্তি ঘোড়া আছে রাজার পাইক পটুয়ারী ||
ঢুলী নাগারচী রাজার রাজ্যে বাস করে |
রসুনচকি বাজায় তারা হাফার খানা ঘরে ||
সেইত গীত না শুনিয়া রাজা জাগে বিয়ান বেলা |
দরবারে বসিল রাজা সহিত আমলা ||
সভাজনেরে রাজা ডাক দিয়া কয় |
"নবাবের দরবারে যাইতে উচিত যে বোধ হয় ||"

গণকে ডাকিয়া রাজা দিন স্থির করে |
অষ্ট দিন বাকি আছে যাইতে নবাবের সরে ||
কানা চইতা উভুতিয়া তারা দুইটি ভাই |
পানসী সাজাইতে তারা পাইল ফরমাই ||
ষোল দাঁড় জুইত করে আরও তুলে পাল |
পানসীতে ভরিয়া রাজা তুলে মালামাল ||
আবের কাঁকই লইল রাজা আবের চিরুনী |
আবেতে রাঙ্গিয়া লইল খাড়ি আর বিউনী ||

হাত্তির দাঁতের পাটি লইল গজমতি মালা |
ভেট দিতে নবাবের করিল যে মেলা ||
খাজনা উগাইয়া তঙ্কা লইল দশ হাজার |
গাউইয়া বাজুইয়া লইল সঙ্গে এক ঝাড় ||

উজান পানি বাইয়া রাজা পানসী বাইয়া যায় |
নাগরীয়া যত লোক করিল বিদায় ||
দানদক্ষিণা আদি পূণ্যকার্য করি |
রাণীর কাছে সঁপিয়া গেল কুলের কুমারী ||

চারিদিকে নানা গ্রাম নেহালিয়া দেখে |
ফুলেশ্বরী উথারিয়া পড়ে নরসুন্দার মুখে ||
সেই নদী ছড়াইয়া যায় ঘোড়া-উত্রা বাইয়া |
মেঘনা সায়রে পানসী চলিল ভাসিয়া ||
ঢেউয়ের করে বাইড়াবাইড়ি কাছাড় ভাইঙ্গা পড়ে |
এই মতে যার রাজা নবাবের সরে ||

তিন মাসথাক্যা রাজা জলের উপর |
চাইর মাসে গেল রাজা নবাবের সর ||
সঙ্গের যতেক দ্রব্য যত লোকজনে |
একে একে ভেট দিল নবাবের স্থানে ||
পূবইয়া আবের কাকই আবের চিরুনী |
চক্ষে না দেখেছি শুধু লোকমুখে শুনি ||
শীতল পাটি পাইয়া তবে শিতল হইল মন |
পাইল ভেটের দ্রব্য যত আয়োজন ||
দশ হাজার তঙ্কা পাইয়া খুসী হইল মিঞা |
রাজচন্দ্রে দিলা ঘর বাছাই করিয়া ||

নবাবের সরে রাজা আছে খুসী মন |
ঘরেতে থাকিয়া রাণী দেখিল স্বপন ||

*********************