জলবাসের কবিতা
যে কোনো কবিতার উপর ক্লিক করলেই তা আপনার সামনে চলে আসবে
১।    অভিমানী    
২।    
দুই প্রে
৩।   কটা ছোট্ট শ্রদ্ধাঞ্জলী
৪।   গো কাজল বরণা বালা
৫।   এক টুকরো রোদ
৬।   তোর যে কি হবে মুনু
৭।   কুঊ ঝিক্ ঝিক্             
৮।   
সাগরকন্যা      
৯।   
কে বাঙালী?   
১০।   
নতুন রাষ্ট্রপতির খোঁজে
১১।  হে সুধীজন---     
১২।  
মধুর বাংলা   
১৩।  
জানি আমার ধৃষ্ট কবিতা বেসুরো এই আসরে     
                   

একটি অনুরোধ - এই সাইট থেকে আপনার ব্ লগ্ বা সাইটে কবিতা
নিলে, আমাদের
http://www.milansagar.com/index.html মূল পাতায় দয়া করে
একটি ফিরতি লিঙ্ক দেবেন আপনার ব্ লগ্  বা সাইট থেকে |  
দুষ্ট কবির ধৃষ্ট কবিতা -- পড়তে এখানে ক্লিক্ করুন
*
*
*
ওগো কাজল বরণা বালা

ওগো কাজল বরণা বালা,
সাগর হতে তোমায় পরাই
আমার প্রেমের মালা |
ওগো কাজল বরণা বালা |

বহুদিন পর আবার এসেছে
ঘরেতে ফেরার পালা |
সাগরের মাঝে, বিরহের আঁচে,
তোমারই তরে মন প্রাণ ভরে
সাজিয়ে আনছি ডালা |
ওগো কাজল বরণা বালা |

তাতে নাই আরবী আতর,
নাই রেশমী জাপানী চাদর,
শুধু আছে মোর হৃদয় খানি
প্রেমের মাধরি ঢালা |
ওগো কাজল বরণা বালা |

*********
২৪-১১-২০০২ তারিখের সকালে আমীরশাহীর
জেবেলধান্নার কাছে এম টি ন্যাভিক্স
এডভেনচার জাহাজ থেকে মোবাইল ফোনে
নিবেদন করা |
*
*
*
কুঊ ঝিক্ ঝিক্

কুঊ ঝিক্ ঝিক্
রেল গাড়ী ঠিক্ ঠিক্,

ছোট বেলা এই সুরে,
মন উড়ে যেত দুরে।
কত কবি এই তালে
গান গেয়ে গেছে চলে।

নির্বাক যুগ হতে
সাদা কালো সিনেমাতে,
অপু দূর্গার পাশে
সাদা কাশবন হাসে,
সেই পটভুমিকায়
রেল গাড়ী চলে যায়,
কুউ ঝিক্ ডাক ছেড়ে
আমাদের মন কেড়ে।

সেই যুগ চলে গেছে।
রেলগাড়ী আজও আছে।
কুউ ঝিক্ বন্ধ
নেই সেই ছন্দ।
বদলেতে আজ শুনি,
সংক্ষেপে পোঁ ধ্বনি।

মেনে যুগ ধর্ম,
করে তার কর্ম,
কুউ ঝিক্ হাত নেড়ে,
চলে গেছে স্টেজ ছেড়ে।

রেখে গেছে জগতের,
একরাশ মানুষের,
নিরবেতে পাতা কান--
যদি শোনে সেই গান।

এই আশ মনে মনে,
আরবার যদি শোনে,
সেই হারানো সুরে
রেলগাড়ী যায় দুরে,
মধুরিত দিবানিশি
সেই মাতোয়ারা বাঁশি,
কুউ ঝিক্ ঝিক্
রেলগাড়ী ঠিক্ ঠিক্।

*********
*
সাগরকন্যা                         

নাম সাগরকন্যা

দিয়ার সোনাই, মার মুনু,  
চোখের মণি ঠাম্মার।
নাচ, গান, খেলা ছাড়া
আর কিছুই চান না।

বসলে খেতে খাবার দাবার,
পাক্কা হবে দিনটি কাবার,
পাখির মতন খুটেন খাটেন,
মুখে কিছুই দেন না।

ঘটা করে স্কুলে  যাওয়া,
বিশাল সে ব্যাগ কাঁধে নেওয়া,
পড়ার চাপ আর বইয়ের ভারেই,
হাওয়ায় উড়ে যান না।

বাবন কাকুর ট্যাকসি চড়ে,
বিজন সেতু পারটি করে,
যাতায়াতেই ঘন্টা তিনেক,
স্কুলের নামটি দোলনা।

পৌঁছে সেথা, দুনিয়া ভুলে
দেবলীনা, সেবন্তি, কোয়েল এবং আরও মিলে
ভারি সুখে দিনটি কাটে,
পড়াশুনায় মন না ।

বাবা লোকটা বাউন্ডুলে,
ঘুড়ে বেড়ান জলে জলে,
ন মাস, ছ মাস না গেলে পর,
বাড়ী মুখো হন না।

আসছে বছর মাধ্যমিকে,
ফল কি হবে সেইটে ভেবে,
মা বেচারি একলা হাতে,
কূল কিনারা পান না।

**********

ন্যাভিকস এডভেনচার
২৪শে জানুয়ারী ২০০২
*
কে বাঙালী?

আমার ভারতে, বাংলা রাজ্যে
ঘর ক'রে যাঁরা আছে,
তাঁরা মাতৃভাষা যেটাই বলুন
সবাই বাঙালী, দুষ্ট কবির কাছে |
বাংলাকে ভালবেসে যে মানুষ
এখানেই থেকে গেছে,
তাঁরা সবাই মহান বা সবাই ইতর
নিশ্চিত জানি মিছে |
ভালোয়ে মন্দে মিশিয়ে মানুষ
এ সত্য মানতে হবেই,
এই তিরিশ বছর চুপটি থাকার
মূল্য দিতে হবেই ||                     


**********     কলকাতা ২২/৪/২০০৭                               
উপরে

এই কবিতাটি এই সাইট এর পাঠকের মতামতের পাতায় দুষ্ট কবির মতামত
হিসেবে প্রকাশিত হয় |

মিলনসাগর
*
হে সুধীজন---
খুব বেশী কি গরম লাগছে ? বিষয়টা খুব গরম ?
এই পাতায় যখন এলেনই, হাভাতে নন ! হাঘরে নন !
কমপিউটর ছুঁতে পারেন, এমন রেস্ত আছে
নিদেন পক্ষে ইনটারনেট কাফে আছে ধারে কাছে !
যদি তৃতীয়-বিশ্ব-জন অথবা ভারতীয় মূল হন,
আগ্রহটা আছে ঠিক, হাতে সময়ও কিছুক্ষণ |
তবে চুপ করে কেন আছেন ? এ বিষয়ে একটু ভাবুন |
নিজ ভাবনা চিন্তা লিখে রাখার, একটু কষ্ট করুন !
যদি ভাবেন মোরা ঠিক, তা জানিয়ে রেখে যান |
যদি ভাবেন মোরা ভুল, লিখে ভুত ছাড়িয়ে যান !
হাত গুটিয়ে দর্শক হয়ে আর কতকাল কাটাতে চান ?
নিজের পদচিহ্ন জগতে --- কিছু করুন, কিছু লিখে রেখে যান ---
"সন্তান" ছাড়া অন্য কিছুও এই দুনিয়ায় রেখে যান !
যখন মানুষ হয়ে এসেছেন, ভেড়া হয়ে কেন যেতে চান ?!
এই কাব্য পড়ে হচ্ছে কি রাগ ? সম্ভ্রম গেছে অক্কা ?
দুষ্ট কবির ধৃষ্ট লিখন, পদে পদে দেয় ধাক্কা !

Dear learned Visitor---
Do you feel this page too hot ?
Since you have reached this page, you arn't a popper !
Surely you have a PC or at least Internet is within reach.
If you are from the third world or of Indian origin
You have the quest and also time.
Then why do you keep quiet ? Think a bit !
At least take the trouble to put down your thoughts here.
If you think we are right, be honest to write so.
If you think we are wrong, don't hesitate to blast us !
How long do you want to be an Onlooker or just be aloof !
Leave your foot prints here --- do something --- write something
Leave something more than just your "children" in this world !
You entered this world as a Human. Why do you want to leave like a Sheep?!


.            **********  কলকাতা ২০/০৬/২০০৭                                    উপরে

এই কবিতাটি এই সাইট এর পাঠকের মতামতের পাতায় দুষ্ট কবির মতামত হিসেবে
প্রকাশিত হয় |
This was written for the various reader's feedback (Blog) pages of this site.

মিলনসাগর
*
নতুন রাষ্ট্রপতি খোঁজার
কাজ হয়েছে শুরু।
"জো হুজুরী"নাহি ছিলেন,
তাই, কুঁচকে সবার ভুরু।
একে একে যে সব নামের
প্রকাশ পাচ্ছে শুনি,
সে সব কিন্তু নয়তো এত
মহান এবং গুণী।
ভোটের স্বার্থে তাঁকে নিয়ে
সেদিন কি নাচ নাচন,
আজকে সবার অপছন্দ
"জী হুজুর" নাহি কন।
এই কালাম এর কাছেই সারা
ভারত শিখলো আবার,
পচন ছাড়া এই দেশেতে
মানুষ কেমন হবার ।

.     ******     কলকাতা ১৫/০৬/২০০৭                           
উপরে

এই কবিতাটি এই সাইট এর পাঠকের মতামতের পাতায় দুষ্ট কবির
মতামত হিসেবে প্রকাশিত হয় |

মিলনসাগর
তোর যে কি হবে মুনু

গতবারের রেসাল্টটা
মোটেও ভাল হয় নি |
ক'দিন আগেও তোর মার সাথে কথা বলে জানলাম যে
এবারেও কি হবে কে জানে ?!
মনটা দমে গেল |
ভাবছি, তোর যে কি হবে মুনু |

মনে পড়ে বহুদিন আগে এক কিশোরের কথা |
দুচোখে তার বিস্ময় ! আর একরাশ স্বপ্ন !
ক্লাসে গিয়ে বসলেই মনটা
কোথায় যেন হারিয়ে যেত |
তার স্কুলের বিশাল গণ্ডির বাইরে
ছোট্ট ছোট্ট গ্রাম |
অপূর্ব সুন্দর লালল মাটির দেশের আকাশে
বর্ষার দিনে ঘন কালো মেঘ |
দূরে অর্জুন গাছের সারি,
যেখানে দোল আর নবান্নের দিনে
হৈ হৈ কারবার |
লাল মাটির আলের ঘেরায়
সবুজ, স-বু-জ ধানের ক্ষেত |
আর সব ছাপিয়ে দূরে,
দূর আকাশের গায়ে দাঁড়িয়ে
নীল অযোধ্যা পাহাড় |
মুনু তুই ই বল,
এসবের পরে কি আর
ডিফারেনশিয়াল ক্যালকুলাস ভালো লাগে ?!
সেই কিশোরেরও লাগতো না |

মনে মনে ছবি আঁকি,
আমার মুনু,
"দোলনার" ক্লাসে গালে হাত দিয়ে বসে আছে |
জ্যোতিষ্কদার ক্লাস |
কিন্তু মনটা যেন
ভেসে চলে গেছে কোথাও,
অন্য কোথাও |
যেখানে আর কেউ নেই,
পড়া নেই, শোনা নেই,
"দোলনা" নেই, জ্যোকিষ্কদা নেই,
মা নেই, বাবা নেই |
আছে
সুদূরের হাতছানি,
পশু পাখীর কলকাকলি,
নীল মহার্ণবের সজোর আমন্ত্রণ |
হয়তো কোনো স্বর্গীয় প্রকৃতির আকূল আহ্বান |
ভাবছি, তোর যে কি হবে মুনু |

কি ভাবিস রে মা তুই
ঐ ঐশ্বরিক অনুভূতির সময়গুলিতে ?
সেই কোন হারিয়ে যাওয়া দিনের
সেই কিশোরটাও ভাবতো...
দূর গাঁয়ের মেয়ে বৌদের এক সারিতে কলসি কলসি-কাঁখের
ছবি তুলবে বন্ধুর কাছ থেকে চেয়ে নেওয়া ক্যামেরায় |
অথবা ঐ নীল অযোধ্যা পাহাড়ে
ট্রেকিং করতে যাবে |
ওর ওপারেই তো ভূগোলে পড়া বিখ্যাত টাটানগর |
জানিস, সেই কিশোরটার
তো সবটাই উড়ু উড়ু মন !
মাঝে মাঝেই মন চলে যেতো
তার স্বপ্নের রাজকন্যার কাছে !
কোনো জাহাজের ডেক-এ,
নীল সমুদ্রের মাঝে তাদের দেখা হোতো !
আশ্চর্য তাই না ?
সে কি সেই স্বপ্নের জগতে চলে গিয়ে
ভবিষ্যত দেখতে পেত ?!
বাস্তবে ফিরতে হোতো স্যারের ধমকানিতে |
তুইও কি দেখা পাস কোনো স্বপ্নের রাজপুত্রের ?
এখনই তো দেখা পাবার সময় !
ভাবছি, তোর যে কি হবে মুনু |

গতবারের রেসাল্টটা
মোটেও ভাল হয় নি |
ক'দিন আগেও তোর মার সাথে কথা বলে জানলাম যে
এবারেও কি হবে কে জানে ?!
মনটা দমে গেল |
ভাবছি, তোর যে কি হবে মুনু |
সেই কিশোরের তো তবু
খেলার সময় ছিল, মাঠ ছিল |
তোর যে তার কোনোটাই নেই রে |
এই বৈদ্যুতিন প্রযুক্তি,
কমপিয়ুটারের জয়যাত্রা,
লালসার লাগাম ছাড়া অর্থনীতি,
ভোগবাদের ঢেউয়ে ভেসে যাওয়া মূল্যবোধ,
পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণ,
যা কিছু পুরাতন, সবেরেই নিঃসর্তে বিসর্জন দিয়ে
জাতে ওঠার হিড়িকের যুগে জন্মে
তোর যে কি হবে মুনু |

অন্যরা যখন ভবিষ্যত নামক কোনো তাজমহল গড়ার তাগিদে
শৈশবে ও কৈশোরের বেহেস্ত দূরে ঠেলে দিতে বাধ্য হচ্ছে,
তখন তুই ক্লাসে অন্যমনস্ক হবার সাহস রাখিস,
পরীক্ষা আসন্ন জেনেও নাচ আর গানটা চালিয়ে যাস |
মুনু তুই নিয়ম ভাঙছিস |
হয় তুই হারিয়ে যাবি,
নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবি এই আধুনিক কালের জাঁতাকলে পড়ে |
অথবা তৈরী করবি নিজের জগৎ,
নিজের উদার নিয়মে |
যেখানে হারিয়ে যেতে কেউ মানা করবে না |

যদি তাই করিস,
জানবো যে আমার মুনু এই পৃথিবীতে মানুষের মত বেঁচে আছে |

*********************
১০ জানুয়ারী ২০০২
এম টি ন্যাভিক্স এডভেনচার
সিঙ্গাপুর
*********************

অপূর্ব লাল মাটির দেশ - পুরুলিয়া
দোলনা - মুনুর স্কুলের নাম
*
মধুর বাংলা

আমি সাত সাগর আর তেরো নদী
পার হয়ে এসেছি ।
অবিশ্রান্ত অকূল পাথারে
ঢেউয়ের চূড়ায় ভেসেছি ।
এই পৃথিবীর কত বন্দরে
কত তরী নিয়ে ভিড়েছি ।
কত জনপদ কত প্রান্তর
কত ঊষা নিশা ঘুরেছি ।
কত কুহকিনী কত মায়াজাল
কত ছলনায় মেতেছি ।
বসে পাশাপাশি কত হাসাহাসি
কত ভাষাভাষী শুনেছি ।

তবুও প্রাণের কোন্ এক কোণে
হু হু করে আমি কেঁদেছি ।
বাংলা, আমি যে তোমাকে শুনতে
এক মনে দিন গুণেছি ।
বিদেশ বিভুঁইয়ে হঠাত্ শ্রবণে
চকিতে শিহরে উঠেছি ।
মধুর বাংলা, তোমাকে শুনেই
নিজেকে ফেরত পেয়েছি ।

তোমাকে না শুনে কি যে জ্বালা মনে
পরভূমে গিয়ে বুঝেছি ।
বাংলা, তোমাকে রোজ যারা শোনে
তারা এর মানে বোঝে কি ?

.     ******     কলকাতা ০১/০৯/২০০৭                           
উপরে


মিলনসাগর
জানি আমার ধৃষ্ট কবিতা
বেসুরো এই আসরে |
তবুও বন্ধু, শোনো আজ, যাই
আমার দু-কলি কবিতা পড়ে  |

তুমি
কাজের ফাঁকে পাতো যখন
আসর --- বন্ধু পাশে,
আপন জনের মাঝে কাটাও
গৃহে --- দিন শেষে,
তখন আমি দিবা রাত্রি
সাগর জলে বাঁধা যাত্রি
নিঃসঙ্গ হাতড়ে বেড়াই
বিশ্ব, ঘন আঁধার মেশা |
শত কাজের অকাজ মাঝে
মনকে রাখে ব্যস্ত কী যে
জিজীবিষার নেশা |

আমার
ক্ষ্যাপা মনকে চাবুক মেরে
একাকী মোর ক্যাবিন ঘরে
শুনি অশেষ মহার্ণবের
ঢেউয়ের আস্ফালন |
মেঘের ফাঁকে সন্ধ্যাতারায়,
বা সূর্য যখন উর্দ্ধে গড়ায়,
কোলম্বাসের ছকেই ক’ষে
খুঁজে দেখি, নিজের অবস্থান |
আবার,
সাগর থেকে মহাসাগরের
ঢেউয়ের থেকে ঢেউয়ে চলে
অনন্ত, অশান্ত, অক্লান্ত, প্রবাহন |
লক্ষ সুনামী আছড়ে পড়ে
প্রত্যহ অগণন |
এই পৃথিবীর মাপা সম্পদ ---
গবেষণা চলে | ইন্ধন জ্বেলে
শক্তির করি আরাধন |
আমি “ইঞ্জিন রুম” কোলাহল-ধামে,
পাই “ডিজেল”-এর স্পন্দন |
পাই বাষ্প চালিত জলযানময়
বন্ধু “ওয়াট” আর “পারসন”  |

পরিহাস ক’রে ভাগ্য বিধাতা
কপালে লিখে গেছে ---
শক্ত জমিতে ভাত নেই তোর
তুই বাঁচবি জলে ভেসে !
ঘরে আমার অবীরা বউ
অনাথ শিশু কোলে।
শুধু গুনে দিন, চোখের উপর
যৌবন গেছে চলে।
পূজা পার্বনে হু হু করে বুক
বাঁচতে শুধু, বিকিয়েছে সুখ।
পাশের খালি আধেক শয্যা---
যেন বয়ে যাওয়া যৌবন
করে সজোরে বিদ্রুপ।
আষাঢ়ের ধারা, শরতের ঢাক,
কোকিলের সারা, চেনা দাঁড়কাক,
সবাই কেমন তাঁর উঠোনেই
পৌঁছে নিশ্চুপ।

আর আমি!
ভেসে ভেসে প্রহর গুনি।
মহাসাগরের ভীম গর্জ্জন
কান পেতে শুধু শুনি।
আশায় থাকি,
যদি কানে আসে,
ঢাকের বাদ্য-ধ্বনি।
আর আপন জনকে চোখে দেখার
শুধু বসে দিন গুনি।
আর বসে বসে দিন গুনি।

তাই আমি
চলিনি কখনও তোমাদের চলা
পথে হেঁটে পায়ে পায়ে |
বাঁচতে নিয়েছি ভিন্ন জীবন
অশ্রু, ঘাম আর শ্রমের বিনিময়ে |
থাকিনি আমি সবার প্রিয়
কফি হাউসের বাসরে |
কত গান, কত কবিতা আমাকে
তাই অভিমানে পরিহারে।
কত বন্দরে, কত ছন্দ রে,
কত প্রেয়সীর প্রেম-অন্তরে,
থেকে গেছে যা শুধু অঙ্কুরে,
প্রস্ফুটিত কুসুম না হয়ে
পড়েছে হেলায় ঝরে |
তাইতো আমার ধৃষ্ট কবিতা
বেসুরো এই আসরে |
এরই মাঝে,
বাংলা জুড়ে জ্বললো আগুন
বাঁচন মরণ লড়াই |
পুঁজির পদলেহন আর
বৃথা ক্ষমতার বড়াই |
ঠাণ্ডা মাথায় ডাণ্ডা মেরে,
ছক্ কষে সর্বস্য কেড়ে,
ব্যস্ত রাজা হাওয়ায়
প্রাসাদ গড়তে |
অনেক সয়েছি, আর পারি নি
সুখে থাকা, দুধে ভাতে |
ছন্দ-ছাড়া কড়া-পড়া হাত
ধৃষ্ট কাব্যে করে কড়াঘাত
বিদ্রোহ কশাঘাতে |

জানি আমার ধৃষ্ট কবিতা
বেসুরো এই আসরে |
যা খুশী বলো, রাখবো নিজে
গায়ে না মেখে, শিরোপায় গুঁজে
পালক মনে ক’রে |

কিন্তু !
যদি মনে কাটে দাগ !
অথবা অন্তরে জ্বলে আগ !
সেটাও খুলে বলো হে আজ কবি !
দেখি,
এত কথা পার,
সততা কতটা বাকি আছে আর,
যার করছো তোমরা
অহর্নিশি দাবী !

আমি দুষ্ট কবি,
চেয়েছি আমার ধৃষ্টতা দিয়ে
বাংলার যত অসহায়দের
মনের কথা বলতে |
তাঁদের পাশে চলতে |
আমি আসিনি তোমার
সাজানো বাগানে
উড়ে এসে জুড়ে বসতে !

********************
.          কলকাতা ০৫/১২/২০০৭
জানি আমার ধৃষ্ট কবিতা বেসুরো এই আসরে
.--------------------------------------------------------------------------------------------------------------------সূচির পাতায় ফেরত

ওয়াট -   জেমস্ ওয়াট, স্টীম ইঞ্জিনের অবিষ্কারক | এই আবিষ্কার দিয়েই ইংল্যাণ্ডের শিল্প বিপ্লবের সূচনা!
ডিজেল -  রুডল্ফ ডিজেল, বিখ্যাত জার্মান ইঞ্জিনিয়ার | থার্মোডায়নামিকস্ এর ডিজেল সাইকেল এবং  
.           প্র্যাক্টিক্যাল ডিজেল ইঞ্জিন-এর আবিষ্কারক |
পারসন -  চার্লস্ পারসন, বিখ্যাত ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ার, রিএকশন টারবাইন-এর আবিষ্কারক |

মিলনসাগর  
*
*
অভিমানী

পাখী এক পথ ভুলে, বসেছিল মাস্তুলে, তার আর ঘরে ফেরা হয় নি |
সে কথাই বলি শোনো, দুখের কাহিনী জেনো, গল্প না ঘুম-পাড়ানি ||

প্রথমে বোঝেনি সে, নিজেকে হারিয়েছে, মোহিত করেছে নেচে নাচ |
কখনও বা মাস্তুলে, কখনও বা ফক্সেলে
, ছোঁ মেরে ধরেছে সে মাছ ||

জাহাজের ছোট বড়, সব্বাই হয়ে জড়, উল্লাসে দেখেছে সে নাচ |
যে যেমন পারে তারে, দিয়েছে খাবার ছুঁড়ে, ভালবেসে, ফেলে সব কাজ ||

দিন গিয়ে দিন আসে, জাহাজ তো জলে ভেসে, এগিয়েছে নিজ পথে ঠিক |
বহুদূর চলে এসে, নতুনের উদ্দেশে, পাখী তার ভুলে গেল দিক ||

এরই মাঝে ঘোর সাজে, ধাইলো সাগর মাঝে, ভীম রণ হুংকারে ঝড় |
পবন তীব্র বেগে, দেবরাজ ধায় রেগে, নিক্ষেপে বাজ কড়্ কড়্ ||

দিবসে আঁধার করে, মেঘেরা আকাশে ভরে, বাঁধ ভাঙা বরষার জল |
সহস্র ফণা দিয়ে, গিলে খাবে সব নিয়ে, ঠাঁই বুঝি অতলের তল ||

সমুদ্র মন্থনে, দেব দানবের রণে, এমনই কি উঠেছে প্রলয় ?
কেমন এ দহন মনে ? স্রষ্টাই ত্রাস হানে ! নিজ সৃষ্টি কে করে লয়!

শীতল পাটির মত, ছিল যে সাগর পট, সহসা ভীষণ ধরে রূপ |
তরঙ্গ বেড়ে ধায় আকাশের পানে | হায়! প্রলয়ের এই কি স্বরূপ ?

ক্যাপটেন
ব্রিজে ঠায় | ইঞ্জিন সামলায়, ইঞ্জিনরুমে চীফ্ নিজে |
সুকানি
সুকান ধ’রে, দোলানি চরমে বাড়ে, নোনা ঢেউয়ে সব কিছু ভিজে ||

উনোনে বসে না হাঁড়ি, সব যায় গড়াগড়ি, গ্যালি
-তে চাপে না আর ভাত |
শুকনো খাবার মেখে, কোনো মতে দেয় মুখে, সেলুনে
পড়ে না আর পাত ||

এমন দোলানি ওঠে, বমনের রোল ছোটে, পোড়-খাওয়ারাও কুপোকাৎ !
ঈশ্বরে কেউ ডাকে, কেউ বা সজোরে হাঁকে --- এ বারটা পার কর নাথ!

প্রাচীনেরা সন্দেহে, ভুরু কুঁচকিয়ে কহে, এই বেলা সাচ্ বল বাপ্প
১০ !
কোন্ বেটা বন্দরে, এসেছো ফুর্তি করে, চুকিয়ে আস নি তার প্রাপ্য !?

ঝট্ পট্ ট্যাক খুলে, দাও কড়ি নির্ভুলে, সাগরের জলে দাও ফেলে |
বন্দরে অবলাকে, নাবিকেরা যদি ঠগে, সাগর এভাবে শোধ তোলে ||

এই ঘোর দুর্ভোগে, প্রকৃতির দুর্যোগে, কোনো মতে প্রাণে বাঁচা দায় |
কোথা গেল সেই পাখী, দেখে নি তো কোনো আঁখি, ছিল না সে কারও ভাবনায় ||

শুরু হলে শেষ আছে, রাত গেলে দিন আসে, ঝড়ও শেষে এল অন্তে |
ধ্বস্ত জাহাজ খানি, ফিরে পায় হালে পানি, নাবিকেরা ফেরে ছন্দে ||

এমন সময় দেখে , পাম্প রুমে
১১ পড়ে এ কে ? সতেজ সে পাখী অসহায় !
করুণ দৃষ্টি চোখে, এক কোণে প’ড়ে ডেক্
১২-এ, কি যেন বলতে সে চায় ||

ঘিরে ধরে সবে মিলে, দয়ালু সারেঙ
১৩ বলে --- তোরা পাখীটাকে জল দে |
দেখ্ যদি খেয়ে দেয়ে, গায়ে ফের জোর পেয়ে, উড়ে যায় নিজ দেশেতে ||

একে একে বারি বারি, নাবিকেরা সারি সারি, খেতে দিল জল আর খাদ্য |
স্নেহভরে কতজন, ভোলাতে পাখির মন, গুন গুনে ভাজে যাহা সাধ্য ||

অনুরোধ উপরোধ, কত বাবা বাছা বোধ, সবই হল শেষমেশ ব্যর্থ |
কিছুই খেল না সে, ঠোঁটেও ছুঁলো না যে, এক ফোঁটা জল পর্যন্ত ||

মুখের গ্রাসের খোঁজে, সাগর-শোভায় মজে, দিতে হবে এত বড় মুল্য ?
পাখী কি বিধির দিকে, অনসন ক’রে তাকে, প্রতিবাদে বিঁধে সমতুল্য ?
     
দূরদেশে গৃহে তার, একাকিনী প্রিয়ার, হাল কি হয়েছে তা কে জানে |
যাবেনা ঘরেতে তার, পাবে না পিয়াকে আর, সাথিহারা জীবনের কী মানে ||

তাই কি সে আহার, করেছে পরিহার, এ জীবন চায় না সে বইতে |
বাঁচতে যদি হয়, তাঁর প্রিয়াকেই চায়, সে আর কিছু পারবে না সইতে ||

আকাশের পানে চেয়ে, জাহাজের ডেক্-এ শুয়ে, পাখিটির সে কী দৃঢ় প্রত্যয় |
এক পলকের তরে, শ্রষ্টা পরখ করে, কত অভিমান তাঁর সৃষ্টির সত্তায় ||

বাঁচা মরা এ জগতে, নাকি দেবতারই হাতে, সবই নাকি তারই ইচ্ছায় নড়ে |
বোঝালো পাখীটি আজ, হলেই বা দেবরাজ, নিজ ইচ্ছায় যাবে শেষ কাজ করে ||

শেষ কদিনের ছবি, দেখেছিল এই কবি, মহাসাগরের মাঝে তরীতে |
শেষ শয্যায় পাখী, দৃঢ় অপলক আঁখি, কাছে সদা কেউ ব’সে পরি
১৪ তে ||

পাখীটি নয়ন মেলে, না বলা ভাষায় বলে --- ওগো বন্ধু আমার, এই সংকটে,  
আমি তোমাদের হাতে, খাইনি খাবার তাতে, অপরাধ নিও না গো মোটে ||

ভাবছো জানি না কি, যদি বেঁচে থাকি, নতুন জীবন ফিরে পাবো |
যে দেশেই নিয়ে যাবে, হয়তো দারুণ হবে, হয়তো পুনঃ বেঁচে যাবো ||

হয়তো নতুন দেশে, নব সঙ্গিনী ব’সে, নব রং রূপ রসে শ্রেয়সী |
কিন্তু হা সেথায়, সে দেশে পাবো কোথায়, মোর প্রিয়তমাসম প্রেয়সী ||

তাই হে বন্ধুরা, ত্যাগি জীবন-জরা, চলেছি আমি আজ চিরতরে |    
নাই যদি ফিরি ঘরে, কি লাভ এ প্রাণ ধ’রে, বাকি জীবন যাবে জ্বলে পুড়ে ||

দিবস  ঘনিয়ে আসে, মৌসুমী বায়ু ভেসে, কোন দূর দেশী মৃদু গন্ধে ভরায় |
দিগন্তে লাল আমেজ, স্তিমিত রবির তেজ, ক্লান্ত দিনের শেষে সাগরে জুড়ায় ||

নামল সন্ধ্যা ধীরে, তারারা এক এক করে, ফুটে উঠে আকাশকে দেয় প্রাণ |
ধ্রুবতারা তাক্ ক’রে, নাবিক হিসাব করে, মহাসাগরের মাঝে কোথা তার স্থান ||
 
এমনই মধুর পলে, চিরনিদ্রায় ঢলে, অভিমানী সেই পাখি জাহাজের প’রে |
শেষ মুহুর্তে পাশে, নীরব রুদ্ধশ্বাসে, ছিল পরিওয়ালা
১৫ ছাড়া আর সবে ঘিরে ||

যেন, জাহাজেরই একজনে, অনন্ত শয়নে, বিমুঢ় স্তব্ধ শোকে সব |
পাখী আর ফিরবে না, মাস্তুলে বসবে না, উড়ে নেচে করবে না আর কলরব ||

রাত্রি গভীর হল, ইন্দু গগনে এল, ইন্দুমতির শোভা চোখ ঝলসায় |
দিগন্তে চুপিসারে, যায় কোনো তরী দূরে, সাদা-লাল-সবুজের-আলো
১৬ দর্শায় ||

শান্ত সাগর শোভা, চাঁদনীতে মনলোভা, ঢেউয়ে প্রতিবিম্বিত পূর্ণশশী |
মন্দ মৃদুর বায়ু, করে চঞ্চল স্নায়ু, থর থর ইঞ্জিন কাঁপে হরষি ||

জলকেলি ছল ছলে, হাওয়া ফিস্ ফিসে বলে, ফানেলের
১৭ ধোঁয়া উড়ে চাঁদ পরশে |
তারার জগত হাসে, ছায়াপথ নেমে আসে, মহাকাশ অবারিত যায় দরশে ||

আকাশ ফরসা হয়, পূব ফোটে লালিমায়, তারারা নীলিমায় মিলিয়ে যায় |
তরীর পিছুটায়, সকলে মিলিত হয়, পাখি কে জানাতে তাঁরা শেষ বিদায় ||

পরম স্নেহ ভরে, সারেঙ নিজ করে, পাখিকে প্রবাহ করে সাগরে |
দুদণ্ড রয় সব, দাঁড়িয়ে সেথা নীরব, তারপর ফিরে যায় যে যার ঘরে ||

সাগরে মিলায় পাখী, অরুণোদয় দেখি, উদিত সূরজে দিয়ে এই বারতা ---
‘বলিয়ো প্রিয়াকে মোর --- খুলিয়া রেখো গো দোর, আর জনমে গিয়ে কব কথা’ ||




.       ********  এস. এস. রিভার এম্বলে, উইপা থেকে গ্ল্যাডস্টোন, অস্ট্রেলিয়া, ১৪/১১/২০০৯



   ফক্সেল - জাহাজের সামনের অংশ যেখানে নোঙ্গর রাখা থাকে
   ক্যাপ্টেন - জাহাজের কর্নধার
   ব্রিজ - যেখান থেকে জাহাজকে পরিচালনা করা হয়
   ইঞ্জিনরুম - যেখানে জাহাজকে চালিত করার ইঞ্জিন এবং অন্যান্য যন্ত্র থাকে
   চীফ - চীফ ইঞ্জিনিয়ার, ইঞ্জিন বিভাগের অধ্যক্ষ
   সুকানি - যে ব্যক্তি জাহাজের স্টিয়ারিং হুইল নিয়ন্ত্রণ করে
   সুকান - জাহাজের স্টিয়ারিং যন্ত্র,
   গ্যালি - জাহাজের রান্নাঘর
   সেলুন - জাহাজের খাবার ঘর
১০   বাপ্প - বাপু শব্দের অপভ্রংশ
১১   পাম্প রুম - যে ঘরে পাম্প বসানো থাকে
১২   ডেক্ - জাহাজের যে কোনো তলের মেঝে বা পাটাতন
১৩   সারেঙ - জাহাজে ক্র্যু বা কর্মিদের সর্দার
১৪   পরি - ওয়াচ বা শিফ্ট ডিউটি
১৫   পরিওয়ালা - ওয়াচকীপার
১৬   সাদা-লাল-সবুজের-আলো - রাতের বেলায় চললে জাহাজের মাঝাখানে সাদা,
   বাঁদিকে(পোর্ট সাইড) লাল এবং ডান দিকে(স্টারবোর্ড সাইড) সবুজ আলো
   জ্বালানো থাকে আন্তর্জাতিক নিয়মানুসারে
১৭   ফানেল - জাহাজের ইঞ্জিনের ধোঁয়া বেরিয়ে যাবার চিমনি


.                                                                                                        উপরে




এই কবিতাটি কবির জীবনের অতীতের একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে রচিত |


মিলনসাগর