মোক্ষদায়িনী মুখোপাধ্যায়ের কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
১।  প্রোষিত ভর্তৃকা  
২।  
মিলনে          
৩।  
বিরহে     
৪।  
 গোলাপ ফুল      
  

 
 
*
আসি' গুণমণি,          প্রফুল্লিত মনে,
আর কি আমায় লবে?
সে হ'ল সাহেব,          আমি যে বাঙ্গালি,
আর কি লো আছে আশা?
লয়ে ইংরাজিনী,          করিবে সঙ্গিনী,
ভুলে যাবে ভালবাসা!
না ভুলেছে যদি,          দেখ সে অবধি,
না লয় সংবাদ কেন!
আমার বিরহে,          কাতর সে নহে,
মনে জ্ঞান হয় হেন |
তাঁহার বিচ্ছেদ,          হৃদি করে ভেদ,
জ্বালা আর সহি কত?
মনে ইচ্ছা হয়,          নদী-তীরে যাই,
গিয়া হই জলগত |
দেখিলে লো জল,          যাতনা অনল,
বাড়ায়ে দ্বিগুণ করে ;
জল যে জীবন,          জ্বালাতন কেন,
করে মম জীবন রে?
যার লাগি দুখ,          সেই জন মুখ,
পানে যদি নাহি চায়,
তবে কেন বল,          উন্মত্ত বিকল,
হ'য়ে মন তাঁরে চায়?
প্রেমপান আশে,          হৃদয় আকাশে,
রাখিনু যতনে শশী,
রাহু নানা ফাঁদে,          হরিল সে চাঁদে,
চাতুরি করিয়া পশি' |

*************************
*
(৩)
স্হানান্তরে মুখশশী
তব, বিরলেতে বসি
ভাবিতাম, দিবা নিশি
সখি তুমি মম তরে
ভাবিতে কি সেই মত, দুখ-মগ্ন অন্তরে?
(৪)
কেন সখি, মনোমত
হয়েছিলে মম এত
বলনা ; নহিলে চিত
কভু এত ভাবিত না ;
একাধারে এত গুণ ধরে কত ললনা?
(৫)
মনে সদা ইচ্ছা করে
রাখি কণ্ঠহার কোরে,
দিবানিশি হেরি তোরে,
কিন্তু তাহা হইল না
ইহাতেই স্ত্রৈণ বলি', লোকে দেয় গঞ্জনা |
(৬)
রহিলে তোমার সনে,
কত সুখ শান্তি মনে,
আনন্দ-লহরী, ঘনে
ঘনে উঠে উথলিয়া
সব প্রলোভন হতে সুখ, কাছে থাকিয়া |
(৭)
যৌবনে আছিলে নারী,
এবে তুমি সর্বেশ্বরী,
মাতৃভাব অধিকারী
হইলে যে ক্রমে ক্রমে,
সহায় আমার তুমি, এই ধরণী-ধামে |
(৮)
গৃহলক্ষ্মী পূর্ণশশী,
কখন বা হও দাসী,
প্রকৃত বন্ধু প্রেয়সী
হও হে তুমি আমার,
পরামর্শে মন্ত্রী তুমি, জীবনের আধার |
(৯)
তোমারে ছাড়িয়া যাই,
এমন বাসনা নাই,
কি করি, যাইতে চাই
সংসার-তীব্র তাড়নে,
শ্রম দুঃখ বিনা অর্থ, নাহি মিলে ভূবনে |
(১০)
সখি! করমের তরে,
ছাড়ি যবে যাই দূরে,
রহ তুমি এ অন্তরে,
দিনে সে মুরতি দেখি,
তব বাক্য শুনিহে স্বপনে, অমিয়মুখি!

*************************
                             ---"বনপ্রসূন" কাব্য থেকে নেওয়া
*
হৃদয়-মন্দিরে,          গেঁথেছি আদরে,
যত্নে তাঁর যত গুণ,
সে সব পাসরি
',          থাকিব কি করি',
সর্ব গুণে সে নিপুণ
|

লুব্ ধ, মুগ্ধ, প্রেমে,          হয়েছিনু ভ্রমে,
কত আশা ছিল মনে
!
এতই কেন লো,         সই মন্দ হ'ল
অভাগীর ভাগ্যগুণে
?

সাক্ষাতে সবার,               দুখের বিস্তার,
কিন্তু কারে
'দুখ কই?
কা
'র সাধ্য পারে,          সান্ত্বনিতে মোরে,
ইহার ঔষধ কই
?

যে আমারে সুখী             করেছিল সখি,
সে যদি সমুদ্র-পারে,
এ দুখ অনল                  নিবাইবে বল,
কে বা আছে এ সংসারে
?

কহিব কাহায়,               সহি য়ে একাই,
দুখ-শর-বরিষণ,
সুহৃদ কে আছে?      আনি তা'রে কাছে,
দিবে মোর প্রাণদান |

বধিতে এ প্রাণ,          হইয়াছে পণ
সুদৃঢ়, নিশ্চয় তাঁর,
সফল সে পণ          হ
'ক নিবারণ
হবে মম দুখ-ভার
|

*************************
                          ---"বনপ্রসূন" কাব্য থেকে নেওয়া
*
ফুটন্ত গোলাপ ফুল হয় যে সময়,
যেন কত লজ্জা-ভরে,               মুখখানি হেঁট করে,
একটি একটি করে খোলে দলচয় ;
ভয়ে যেন ঘোমটা খোলে,     পাছে কেহ দেখে ফেলে,
লজ্জা-ভরে মৃদু হেসে আড়ে যেন চায়,
লজ্জা-মাখা মুখখানি নত করে রয়
|

সকল ফুলের শ্রেষ্ঠ সৌরভ উহার,
এত যে সুগন্ধ ধরে,              তবু না ছড়ায় দূরে,
নিকটে রইলে ঘ্রাণ যেন সুধাধার,
সুশীতল সুমধুর গন্ধ কিবা তার!

শুখালেও নাহি যায় গোলাপের গন্ধ ;
মৃদু মৃদু কি শীতল,              সুগন্ধ গোলাপ জল,
গোলাপ আতরে কিবা বাস মৃদু মন্দ!
গোলাপ আতরে কত,          সৌরভ অপরিমিত,
ধুইলেও বহুকালে  না যায় সে গন্ধ,
সে আতরে মানবের কতই আনন্দ!

পুত্রবতী সাধ্বী সতী নারী যদি মরে,
মরিয়া সে নহে মৃতা,          সতত থাকে জীবিতা,
তার নাম চির কাল থাকয়ে সংসারে ;
সেইরূপ গোলাপের গুণে মুগ্ধ নরে |

এতেক সদগুণ যেবা ধরে একাধারে
তার (ও) এবে হায় হায়!         বয়সে আদর যায়,
বাসি হ'লে কেহ নাহি ছোঁয় গোলাপেরে ;
অভিমানে পাতাগুলি যায় সব ঝরে |

কেহ আর ফিরে নাহি করে দরশন,
যৌবন গিয়াছে হায়,         নিঃশব্ দে  ঝরিয়া যায়,
এ সময় কেবা আর করে সম্ভাষণ?
যৌবন হয়েছে গত,              তবুও সৌন্দর্য কত!
ঝরে পড়ে তবু নাহি মলিন বদন ;
সুন্দু গোলাপ ফুল নয়ন-রঞ্জন |


*************************
                        ---"বনপ্রসূন" কাব্য থেকে নেওয়া