নবীনচন্দ্র সেনের কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
*

কৃতঘ্ন, মা বঙ্গভূমি! এত দিন তব
       কবিতা-কানন,
যেই পিকবর-কল উছলিল, বনদল
উছলিত, ব্রজে শ্যাম বাঁশরী যেমন |

সে মধু-সখারে আজি পাষাণ পরাণে,
    ( কি বলিব, হায়! )
অযত্নে মা অনাদরে, বঙ্গকবিকুলেশ্বরে
ভিক্ষুকের বেশে, মাতা, দিয়াছ বিদায়!

মধুর কোকিল কণ্ঠে --- অমৃত লহরী ---
     কে আর এখন,
দেশদেশান্তরে থাকি, কে 'শ্যামা জন্মদে' ডাকি'
নূতন নূতন তানে মোহিবে শ্রবণ?

তোমার মানস-খনি করিয়া বিদার,
      কাল দুরাচার,
হরিল যে রত্ন, হায়! কত দিনে পুনরায়,
ফলিবে এমন রত্ন? ফলিবে কি আর?

শুণ্য হ'ল আজি বঙ্গ-কবি-সিংহাসন,
       মুদিল নয়ন
বঙ্গের অনন্য কবি, কল্পনা-সরোজ-রবি,
বঙ্গের কবিতা-মধু হরিল শমন |

.           ***********                                            
উপরে
*
হতাশ

অকস্মাত্ কেন আজি জলধর-প্রায়,
বিষাদে ঢাকিল মম হৃদয়-গগন?
দুর্বল মানসতরী,                   ছিল আশা ভর করি,
চিন্তার সাগরে কেন হইল মগন?
দুঃখের অনলে বুঝি আবার জ্বালায়!

কেন কাঁদে মন আহা! কে দিবে বলিয়া?
কে জানে এ অভাগার মনের বেদন?
অন্তরে আছেন যিনি,             কেবল জানেন তিনি,
যে অনলে এ হৃদয় করিছে দাহন ;
কেমনে বাঁচিবে প্রাণ এ তাপ সহিয়া?

কেন কাঁদে মন আহা! ভাবি মনে মনে,
অমনি মুদিয়া আঁখি নিরখি হৃদয়,
চিন্তার অনল তায়,           জ্বলিতেছে চিতাপ্রায়,
দীনতা পবনবেগে প্রবাহিত হয়,
দ্বিগুণ আগুন জ্বলে বাঁচিবে কেমনে?

অমানিশাকালে যেথা শোভে নীলাম্বর
খচিত-মুকুতাহারে,                  তারার মালায়
তেমতি এ অভাগার,           হৃদয়েতে অনিবার,
শোভিত শতেক আশা, নক্ষত্রের প্রায়,
আজি দেখি সকলেই হয়েছে অন্তর |

বিষাদ-জলদ-রাশি আসি আচম্বিতে,
ঢাকিয়াছে আশা যত দেখা নাহি যায়,
দরিদ্রতা ভয়ঙ্কর,             পিতৃশোক তদুপর,
কেবল জ্বলিছে ভীম দাবানল প্রায়,
তারা সাজাইবে চিতা জীয়ন্তে দহিতে?


.               .                       ***********                                  
উপরে
g]çc÷OãEõ_ ]WýÇaÉVX Vwø
*
অশোকবনে সীতা

চিত্র-নভঃ-কিরীটিনী সচন্দ্র রজনী,
চিত্রি' বিকসিত নৈশ কুসুম-মালায়
উদ্যান, সরসী-নীর ; অযুত রতনে
চিত্রি' সচঞ্চল চির নীল নীরনিধি,
ভাসিছে নিদাঘাকাশে | বিশ্ব চরাচর
নীরবে শান্তির সুধা করিতেছে পান |
চন্দ্রের একটি রশ্মি শিবিরের দ্বারে
রহিয়াছে শতরঞ্চি উপরে পরিয়া,
যেন স্থির উল্কাখণ্ড, স্থিরতর জ্যোতিঃ |
নিরখিয়া সেই রশ্মি বিমল উজ্জ্বল,
উদাস হইল প্রাণ, পর্যঙ্ক ত্যজিয়া
শিবির-বাহিরে নব-শ্যাম দূর্বাদলে
বসিলাম মন-সুখে ; সন্মুখে আমার
অনন্ত অসীম সিন্ধু! চন্দ্রের কিরণে
খেলিছে অনিলসহ সলিল-লহরী,
চুম্বি' মৃদু কলকলে মম পদতলে
রজত-বালুকাকীর্ণ ধবল সৈকত |
দক্ষিণে আমার --- মৃদু সুমধুর কলে
ছুটিয়াছে কল্লোলিনী@ নাচিয়া নাচিয়া,
আলিঙ্গিয়া প্রতিকুল তীরে গিরিচয় ;
ধবল উত্তরী যেন মাধবের গলে!
অপূর্ব প্রকৃতি শোভা! অদূর ভূধর
শোভিছে মেঘবত্ আকাশের গায়ে ;
কেবল কোথায় কোন উচ্চ তরুবর
অরণ্য হইতে তুলি' উচ্চতর শির,
করিতেছে আকাশের সীমা নিরুপণ |
চিত্রিত আকাশ-চন্দ্র- ভূধর-সাগর,
চিত্তবিমোহিনী শোভা! মরি কি সুন্দর!

'এমন সময়ে' আমি ভাবিলাম মনে
নিশাহন্তা 'মেকবেত' সাধিল মানস
সুপ্ত 'ডনকেনের' রক্তে ; এমন সময়ে
নিভাইল অশ্বত্থামা, ভজিয়া ধূর্জটী,
পাণ্ডব বংশের পঞ্চ প্রদীপ উজ্জ্বল ;
এমন সময়ে লঙ্ঘি উদ্যান প্রাচীর,
ভেটিল 'রোমিও' প্রাণ-প্রিয় 'জুলিয়েটে',
নিরখিল চন্দ্র-সূর্য একত্র উদয় ;
এমন সময়, হায়! প্রণয় যন্ত্রণা
নিবাইতে সাগরিকা উদ্যান-বল্লরী
লয়োছ্ল করে, দিতে কোমল গ্রীবায়,
উদ্বন্ধনে বিনাশিতে দুঃখের জীবন ;
এমন সময়ে সুপ্ত কনক-লঙ্কায়,
একাকিনী শোকাকুলা পতির বিরহে
কাঁদিলা অশোক বনে সীতা অভাগিনী ;

'এমন সময়ে' সেই সমুদ্রের কূলে
ভাবিতে ভাবিতে দেহ হইল অবশ ;
ক্রমে অজানিত সেউ সমুদ্র-বেলায়
শুইলাম, সুকোমল দূর্বাদলময়ী
শ্যামল শয্যায়! স্নিগ্ধ সমুদ্র-নীরজ
অনিল বহিতেছিল অতি ধীরে ধীরে ;                          
উপরে
পশিলাম ক্রমে নিদ্রা-স্বপন-মন্দিরে |

রত্ন-সৌধ-কিরীটিনী স্বর্ণলঙ্কা জিনি,
দেখিনু শোভিছে রাজ্য জলধি-হৃদয়ে
শত লঙ্কা পরিসরে ; বাঁধা ছিল বলে
এক চন্দ্র, এক সূর্য রাবণ-দুয়ারে,
এইখানে সুকুমার প্রণয়-শৃঙ্খলে
কত চন্দ্র, কত সূর্য প্রতি ঘরে ঘরে
রহিয়াছে শৃঙ্খলিত | বহিতেছে বেগে
যেই রম্য রখশ্রেণী বাষ্পে, হুতাশনে,
অতি তুচ্ছ তার কাছে পুষ্পকের গতি |
চপলা সন্দেশবহা ; যাহার পরশে
মরে জীব, সে বিদ্যুত্ দেশদেশান্তরে,
কভু ছায়া-পথে, কভু জলধির তলে,
বহিতেছে রাজ-আজ্ঞা | অপূর্ব কৌশল
বিরাজিয়া স্থানে স্থানে গণে অনায়াসে
সময়ের গতি, কিংবা আকাশের তারা |
লঙ্কার অমৃত ফল বানরের করে
হইল নিঃশেষ, কিন্তু এ অপূর্ব পুরে
জাতীয়-গৌরব রূপে যে অমৃত ফল
ফলিতেছে অনিবার, বিনাশিতে তা'রে
পারিবে না নরে কিংবা সমরে অমরে |
এমন অমৃত পানে পুরবাসিগণ,
আনন্দে শান্তির কোলে করিয়া শয়ন,
নিদ্রা যায় মন-সুখে, হায় রে! কেবল
অন্ধকার কারাগারে বসি, একাকিনী
একটি রমণীমূর্তি করিছে রোদন |
কতকাল রমণীর নয়নের জল
ঝরিয়াছে, কে বলিবে? সেই অশ্রজলে
হইয়াছে দুঃখিনীর অঙ্কিত কপোল ;
কবরী অবেণীবদ্ধ, জটায় এখন
হইয়াছে পরিনত ; হায়! করাঘাতে ক্ষত
বিক্ষত ললাট, স্থানে স্থানে কলঙ্কিত |
বহুমূল্য পরিধেয় নীল-বস্ত্রখানি
হইয়াছে জীর্ণ শীর্ণ --- নিতান্ত মলিন,
ততোধিক রমণীর মলিন বরণ |
বহুমূল্য রত্নরাজি আছিল যথায়,
চরণে, প্রকোষ্ঠে, অংসে, উরসে, গ্রীবায়,
উদ্বন্ধন-লতিকার চিহ্নের মতন,
শ্বেতরেখামাত্র এবে সর্ব কলেবরে
রহিয়াছে বিদ্যমান, বাম করোপরে
রক্ষিত বদন-চন্দ্র ; --- ফাটিল হৃদয়
এই মূর্তিমতী শোক করি দরশন ;
জিজ্ঞাসিনু--- 'বল মাতা! কে তুমি দুঃখিনি?
এমন বিষাদ-মূর্তি কিসের কারণ?'
বলিলা রমণী অশ্রু মুছিয়া অঞ্চলে,---
'দুঃখিনী ভারত-লক্ষ্মী আমি, বাছাধন!
আমিই অশোক-বনে সীতা বিষাদিনী |'


.             ***********                                            
উপরে

@ কর্ণফুলী নদী