নির্মলেন্দু গুণ
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
১।  পূর্ণিমার মধ্যে মৃত্যু       
২।  
এপিটাফ
৩।  আমার সংসার
৪।  আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসি নি
৫।  হুলিয়া  
*
পূর্ণিমার মধ্যে মৃত্যু

একদি চাঁদ উঠবে না, সকাল দুপুরগুলো
মৃতচিহ্নে স্থির হয়ে রবে;
একদিন অন্ধকার সারা বেলা প্রিয় বন্ধু হবে,
একদিন সারাদিন সূর্য উঠবে না।

একদি চুল কাটতে যাব না সেলুনে
একদিন নিদ্রাহীন চোখে পড়বে ধুলো।
একদিন কালো চুলগুলো খ'সে যাবে,
কিছুতেই গন্ধরাজ ফুল ফুটবে না।

একদিন জনসংখ্যা কম হবে এ শহরে,
ট্রেনের টিকিট কেটে
একটি মানুষ কাশবনে গ্রামে ফিরবে না।
একদিন পরাজিত হবো।

একদিন কোথাও যাব না, শূন্যস্থানে তুমি
কিম্বা অন্য কেউ বসে থেকে বাড়াবে বয়স।
একদিন তোমাকে শাসন করা অসম্ভব ভেবে
পূর্ণিমার রাত্রে মরে যাব।

একদিন সারাদিন কোথাও যাব না।

********
উপরে
**
এপিটাফ

করতল ভরা এই ম্লান রেখাগুলো তোমাদের জন্য
রেখে গেলাম। হাড়গুলো থেকে সার হবে,
সার থেকে জন্ম নেবে হাড়ের গোলাপ।
আমার যে ছেলেটির জম্ন হয় নি, তাকে দিও
এই দুর্বিনিত শীসের কলম।

যে শব্ দটি আমি উচ্চারণ করতে পারলুম না---
তোমাদের প্রচণ্ড ঘৃণায়, সন্দেহে, তার আত্মা
রক্তাপ্লুত হয়েছে বারবার।
যে গান গাইতে পারি নি, তার সুর বেজেছে চৈতন্যে।
যে কবিতা লেখা হল না সে-ও ছিল
সংগঠিত সীসার ভিতরে।

এই কবরগুলো সাক্ষ দেবে, ভালবেসেছিলাম।

********
উপরে
**
আমার সংসার

সংসার মানে সোনার কাঁকনে জীবনের রঙ লাগা,
সংসার মানে রক্তে-মাংসে সারারাত্তির জাগা।

সংসার মানে অপেক্ষমাণ একজোড়া চোখে দাবি,
সংসার মানে সাজানো ভুবন, আঁচলের খোঁটে চাবি।

সংসার মানে অনাগত শিশু, পুতুলে সাজানো ঘর,
সংসার মানে মনোহর নেশা, ঈশানে-বিষাণে ঝড়।

সংসার মানে ব্যর্থ বাসনা, বেদনার জলাভূমি,
সংসার মানে সংসার ভাঙা, সংসার মানে তুমি।

********
উপরে
**
আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসি নি

সমবেত সকলের মত আমিও গোলাপ ফুল খুব ভালবাসি,
রেসকোর্স পার হয়ে যেতে এই সব গোলাপের একটি গোলাপ
গতকাল আমাকে বলেছে, আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।
আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।

শহিদ মিনার থেকে খসে পড়া একটি রক্তাক্ত ইট গতকাল আমাকে বলেছে,
আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।
আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।

সমবেত সকলের মত আমিও পলাশ ফুল খুব ভালবাসি, 'সমকাল'
পার হয়ে যেতে সদ্যফোটা একটি পলাশ গতকাল কানে কানে
আমাকে বলেছে, আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।
আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।

শাহাবাগ এভিন্যুর ঘূর্ণায়িত জলের ঝর্ণাটি আর্তস্বরে আমাকে বলেছে,
আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।
আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।

সমবেত সকলের মত আমারও স্বপ্নের প্রতি পক্ষপাত আছে,
ভালবাসা আছে- শেষ রাতে দেখা একটি সাহসী স্বপ্ন গতকাল
আমাকে বলেছে, আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।
আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।

এই বসন্তের বটমূলে সমবেত ব্যথিত মানুষগুলো সাক্ষী থাকুক,
না-ফোটা কৃষ্ণচূড়ার শুষ্কভগ্ন অপ্রস্তুত প্রাণের ঐ গোপন মঞ্জরীগুলো
কান পেতে শুনুক, আসন্ন সন্ধ্যার এই কালো ককিলটি জেনে যাক-
আমার পায়ের তলার পুণ্য মাটি ছুঁয়ে
আমি আজ সেই গোলাপের কথা রাখলাম, আজ সেই পলাশের কথা
রাখলাম, আজ সে স্বপ্নের কথা রাখলাম।

আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসি নি,
আমি আজ ভালবাসার কথা বলতে এসেছিলাম।


********
উপরে
**
হুলিয়া

আমি যখন বাড়িতে পৌঁছলুম তখন দুপুর
চতুর্দিকে চিক্ চিক্ করছে রোদ্দুর
আমার শরীরের ছায়া ঘুরতে ঘুরতে ছায়াহীন
একটি রেখায় এসে দাঁড়িয়েছে।
কেউ চিনতে পারেনি আমাকে
ট্রেনে সিগারেট জ্বালাতে গিয়ে একজনের কাছে থেকে
আগুন চেয়ে নিয়েছিলুম,
একজন মহকূমা স্টেশনে উঠেই আমাকে
জাপটে ধরতে চেয়েছিল,
একজন পেছন থেকে কাঁধে হাত রেখে চিত্কার করে উঠেছিল।
আমি সবকেই মানুষের সমিল চেহারার কথা
স্মরণ করিয়ে দিযেছি।
কেউ চিনতে পারেনি আমাকে, একজন রাজনৈতিক নেতা
তিনি কম্যুনিস্ট ছিলেন মুখোমুখি বসে দূর থেকে
বার বার চেযে দেখলেন
কিন্তু চিনতে পারলেন না।
বারহাট্টায় নেমেই রফিজের স্টলে চা খেয়েছি,
অথচ কী আশ্চর্য পুনর্বার চিনি দিতে এসেও
রফিজ আমাকে চিনল না।
দীর্ঘ পাঁচ বছর পর পরিবর্তনহীন গ্রামে ফিরছি আমি।
পুকুরের জলে শব্ দ উঠলো মাছের, আবার জিভ দেখালো সাপ
শান্ত স্থির বোকা গ্রামকে কাঁপিয়ে দিয়ে একটি
এরোপ্লেন তখন উড়ে গেল পশ্চিমে-
আমি বাড়ির পেছন থেকে শব্ দ করে দরোজায় টোকা দিয়ে
ডাকলুম--মা।

বহুদিন যে দরোজা খোলে নি
বহুদিন যে দরোজায় কোনো কন্ঠস্বর ছিল না
মরচে পড়া সেই দরজা মুহুর্তেই ক্যাচ ক্যাচ শব্ দ ক'রে
খুলে গেলো
বহুদিন চেষ্টা করেও গোয়েন্দা বিভাগ আমাকে ধরতে পারে নি
চৈত্রের উত্তপ্ত দুপুরে
অফুরন্ত হাওয়ার ভিতরে সেই আমি
কত সহজেই একটি আলিঙ্গনের কাছে বন্দি হয়ে গেলুম সেই আমি
কত সহজেই মায়ের চোখে চোখ রেখে
একটি অবুঝ সন্তান হয়ে গেলুম।

মা-আমাকে ক্রন্দনসিক্ত একটি চুম্বনের মধ্যে লুকিয়ে রেখে
অনেক জঙ্গলের পথ অতিক্রম করে পুকুরের জলে চাল ধুতে গেলেন
আমি ঘরের ভিতরে তাকালুম, দেখলুম দু'ঘরের মাঝামাঝি
যেখানে সিদ্ধিদাতা গণেশের ছবি ছিল সেখানে লেনিন
বাবার জমা-খরচের পাশে কার্ল মার্কস
আলমিরার একটি ভাঙা কাচের অভাব পূরণ করছে
স্কুপস্কায়ার ছেঁড়া ছবি।

মা পুকুর থেকে ফিরছেন, সন্ধ্যায় মহকূমা শহর থেকে
ফিরবেন বাবা, তাঁর পিঠে সংসারের ব্যাগ ঝুলবে তেমনি।
সেনবাড়ি থেকে খবর পেয়ে বৌদি আসবেন
পূনর্বার বিয়ে করতে অনুরোধ করবেন আমাকে।
খবর পেয়ে যশমাধব থেকে আসবেন ন্যাপকর্মী ইয়াসিন,
তিন মাইল বিষ্টির পথ হেঁটে রসুলপুর থেকে আসবে আদিত্য।
রাত্রে মারাত্বক অস্ত্র হাতে আমতলা থেকে আসবে আব্বাস।
ওরা প্রত্যেকেই জিজ্ঞেস করবে ঢাকার খবরঃ

আমাদের ভবিষ্যত্ কী ?
আইয়ুব খান এখন কোথায় ?
শেখ মুজিব কি ভুল করছেন ?
আমার নামে কতদিন আর হুলিয়া ঝুলবে ?

আমি কিছুই বলবো না, আমার মুখের দিকে চেয়ে থাকা
সারি সারি চোখের ভিতরে
বাংলার বিভিন্ন ভবিষ্যতকে চেয়ে দেখবো
উত্কন্ঠিত চোখে নামবে কালো অন্ধকার,
আমি চিত্কার ক'রে কন্ঠ থেকে অক্ষম বাসনার
জ্বালা মুছে নিয়ে বলবোঃ 'আমি এসবের কিছুই জানি না,
আমি এসবের কিছুই বুঝিনা। '

********
মিলনসাগর
উপরে