কবি সমর হালদারের কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
*
কঠিন জীবন

সুখ গহনে অশান্তি দহনে
মন সে মৃত্যু চায় |
দগ্ধ হৃদয় ঝরে ঝরে কয়
এ জীবন ভালো নয় |
গন্ধ বিহীন শিমুল ফুল
গাছেতে শোভা পায় ---
ঝরিয়া পড়িলে মানুষ তাহা
মারায়ে চলিয়া যায় |
ছোট্ট শিশু ফুলটি কুড়ায়ে ---
কহিছে কাতর ব্যথায় ---
গন্ধবিহীন বলে
পড়িয়া রহিছে হেথায়
বল তোমা নিয়ে গিয়ে ফেলিব আমি
পুস্করিনী সেথায় ---
দখিনা হাওয়ায় ভাসিয়া যাইবে
দাঁড়ায়ে দেখিব দূরে
অদৃশ্য হইলে চলিয়া আসিব
যাইব না আর ফিরে
উদাস পৃথিবীতে উদাসীন যাঁরা
মায়ার বাঁধন ছিঁড়িয়াছে তারা |
মনের এই আশা বাধিবে না বাসা
ভ্রমণে কাটাবে দিন |

************
ময়লা কাগজ

ময়লা কাগজের বস্তা পিঠে
ভোর থেকে উঠে হাঁটে
সকাল থেকে সারাটা দিন জঞ্জাল ঘাঁটে
শহরের ফুটপাতে, মাথার উপরে খোলা আকাশ
অথবা সেতুর নিচে
এখনো অনেক মানুষের জীবন কাটে |

আমরা দূষণ দেখে ভয় পাই,
ওরা দূষণের সাথে লড়াই করে
বলে, আমরাও বাঁচতে চাই |
আমরা জঞ্জাল দেখে এড়িয়ে যাই,
ওরা জঞ্জালকে বন্ধু ভেবে
ময়লা কাগজ পিঠে করে বয় তাই |

ফুটপাতের উপর উনুনটাতে
মাটির হাড়িতে ভাত ফোটে,
ভোরের আলো যখন ফোটে
বাসায় পাখি জেগে ওঠে |

ছোট্ট শিশু সেতুর নীচে,
ঘুমিয়েছিল মায়ের কাছে
সুনিরমল আকাশ দেখে
আনন্দেতে হেসে ওঠে
নিষ্পাপ শিশু যানে না সে কিছু
কোথায় কিভাবে কেমন করে
তার বর্তমান জীবন কাটে |

*******
সুনামির উদ্দেশ্যে

২৬শে ডিসেম্বর আন্দামান ভেসে জলে-জলাকার
সুনামির মানুষ প্রিয়জনকে হারায়ে করেছে হাহাকার
এখনও যেকানে মাটি মাটি খুঁজলে পাওয়া যাবে
মৃত মানুষের হাড় |
আন্দামান তুমি কাঁদছো, আজ তোমার চোখে জল |
ছোট্ট কিশোরী বাবা মাকে হারিয়ে
উদাস মনে বারে বারে বলে আমার তো কেউ নেই এখন,
কি ভয়াবহ সেই দিনটা
ঘড়ির টাইম তখন সকাল সাড়ে ছটা |
গৃহহারা মানুষ এখনও বেঁচে আছে
       উন্মুক্ত আকাশের নিচে |
       জানিনা কিভাবে বাঁচবে তাদের প্রাণটা |
বিশ্বের মানুষ মর্মাহত ও দুঃখিত
করুণ কণ্ঠে বলে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেব সুনামিতে |
প্রার্থনা করি, আর কোনদিন যেন ফিরে না আসে
       সেই ভয়াবহ দিনটা
এখনও মনে ভেসে ওঠে ---
সুনামির সেই মর্মান্তিক দৃশ্যটা |||

***********  
কবি, কলকাতায় ২৬শে ডিসেম্বর ২০০৪ তারিখের সকালে,
সচোক্ষে দেখেছিলেন ভূমিকম্পের চোটে পুকুরের জল ছলকে
বেরিয়ে আসার দৃশ্য |
সুকান্ত ভট্টাচার্যের উদ্দেশ্যে

হে কিশোর কবি সুকান্ত
তুমি আজও অসীম অনন্ত,
লুপ্ত হয়ে যায় নি তব নাম
সাহিত্যের ইতিহাসে ||

দিপ্তী দীবালোকে, মেঘ মুক্ত আকাশে
জ্যোতির্ময় মহাপুরুষ
তুমি এসেছিলে এই ধরনিতে |

তোমাকে আমি ভুলবো না কেন দিন
তুমি যে আমার প্রাণ
লুপ্ত হয়ে যায়নি তব নাম ||

এসেছিলে ঊল্কাসম শূণ্য আকাশে
জাগরিত করেছিলে দীন হীন জনে
তোমার সুতীক্ষ্ণ লেখনির অগ্রভাগে
প্রকাশিত হয়েছিল
শাসক আর শোষকের নিষ্ঠুরতার যে কাহিনী |
শুধু মানব জাতিকে করেনি অপমান
করেও রোমাঞ্চিত করে বিস্মিত ||

তুমি শুধু কবি নও বিংশ শতব্ দির  প্রকৃত মানুষ
তুমি প্রথম প্রকাশিলে বঞ্চিতের ব্যথা
তুমি বুঝেছিলে ব্যথিতের সুখ দুঃখের ইতিকথা |

হে কবি কোনা সংশয় কিছু
করোনা সন্দেহ কিছু মনে
স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে
বিশ্ববাসীর মনে ||

***********
শিক্ষার বোঝা

রানার বোঝা উঠেছে আজ,
ছোট শিশুদের পিঠে |
বই খাতা ব্যাগ পারে না বইতে
মা নিয়ে যায় হেঁটে |

বলে বাবা তুমি তাড়াতাড়ি চলো,
পড়ে আছে অনেক কাজ |
ইংরাজীতে পরীক্ষ---
মনে আছে তো আজ?

শিশু বলে মাগো অঙ্ক খাতাটা,
নিয়েছি আমি হাতে |
যোগ-বিয়োগ আর শূণ্য ভুল
একটাও নেই তাতে |

রাইট দিয়েছে দিদিমণি,
দেখেছি বিকেল বেলায় |
বলতো মা ---
সন্ধ্যা হলে পড়তে বসি
ইংরাজীটি ভুল হয় কেন
আমার সকাল বেলা?

ইস্কুলেতে দিদিমণি আমায় ডেকে বলে,
বাংলা ভাষা, মাতৃভাষা, লেখো তুমি ভালো |
ইংরেজীটা বানান তোমার ভুল হয় কেন বলো?
এবার বানান ভুল হলে, মারবো ছড়ি তুলে
পড়া তুমি তৈরী করে আসবে ইস্কুলে |

***********
এই কবিতাটি এই প্রথম প্রকাশিত হল |
গুরুমশাই

গুরুমশাই ছিল আমার
লক্ষ্মীচরণ বাবু |
পাঠশালাতে গিয়ে আমি
ভয়ে হতাম কাবু |
ঘুমের প'রে বিকালেতে
কাকার সাথে যেতাম হাটে |
ধারাপাত কিনবো আমি,
বর্ণপরিচয়ের সাথে |
শ্রীপঞ্চমী পূজা হবে
গুরুমশাই সঙ্গে নেবে
বলছে আমায় বারে বারে
বানান তুমি ভুল করো না,
মারবো ছড়ি তুলে |
এবার তুমি ভর্তি হবে
প্রাইমারী স্কুলে |
সবুজ ক্ষেত আর বাবলার কুঁড়ি
গ্রামের রাস্তার ধারে |
বাল্যকালে হেঁটে যেতাম
বই নিয়ে স্কুলে |
শষ্য শ্যামল পরিপূর্ণ
এই ধরণীর প'রে |
কাদাজলে মিশে ফসল ফলিত
উঠিত সবার ঘরে |
পৌষ মাসে আনন্দেতে
উঠত যে মন ভরে |
নতুন ধানে নবান্ন
খেতাম বসে ঘরে |
বাল্যকালের কথা
যাইনি এখন ভুলে |
ছাত্র জীবন সুখের জীবন
গুরুমশাই বলে |

***********
মাতৃসম দিদি

মনে আমার অনেক কথা
জমা হয়ে আছে হৃদয়ে ব্যথা
শেষ মুহুর্তে দিয়েছে সাহস
সেই ত আমার মাতা |
হাতে দিয়ে সঞ্চিতা, বলে তুমি ভিরু নও
আবার বল বিদ্রোহী, শুনবে বহু শ্রোতা |
এ বিশ্ব মাঝারে প্রকাশ হবে
তোমার মনের কথা |
আসুক দুঃখ আসুক কষ্ট ঘাত প্রতিঘাতে কাটুক দিন,
এ জীবনে মাগো তোমার কথা ভুলবো না কোন দিন |
কিছু ত নেই মা দেবার মতো, নয়নের জল নাও,
তোমার চরণ স্মরণ করি লিখতে আমায় দাও |
কলম হাতে লিখতে বসে ভাববনা কোন কথা,
দাও মা শক্তি, দাও মা জ্ঞান তোমার চরণে নোয়াই মাথা |
হাসি কান্না, কান্না হাসি প্রকৃতির সব দান,
প্রতি নিয়ত বইছে নদী জোয়ার ভাঁটার টান |
মৃত্যুর আগে ভুলবো না মাগো
তোমার অবদান |

***********
পূজনীয় দিদি

আমি কোন দিন ভাবিনি মনে
আমার লেখা কেউ পড়বে,
কেউ জানবে, কেউ শুনবে---
আমি ভাবতাম পড়ে থাকবে
ছোট্ট ঘরের কোণে
২৫ অক্টোবর ২০০৪ এ
মধুসূদন মঞ্চে প্রকাশ হবে
শ্রাবনী সংগীতায়তনে
আমি কোন দিন ভাবিনি মনে
আমি দুঃখের দুঃখী
ব্যথার ব্যথী
আনন্দেতে হাসি,
পূর্ণ বয়সে প্রণাম করি
মঞ্চে যখন আসি---
ক্লান্ত শরীর রিকশা টানি
যাত্রী নিয়ে যাই যখন
মনে মনে ভাবি তখন
পূজনীয় দিদির সাথে
আমার দেখা হবে কখন
হঠাত্ দেখি বাজারেতে
দিদি আমার সম্মুখেতে
নত হয়ে প্রণাম করি
চরণখানি দেখি তখন
উদাস মন তখন ভাসে
দুনয়নে জল আসে
হৃদয় বলে বর্তমানে
নবীন কবি ভাবছ কেন
আবার তুমি লিখবে কখন
নত হয়ে প্রনাম করি
চরণখানি দেখি তখন

***********
        প্রলয়

দু হাজার ছয় ঊনিশে সেপ্টেম্বর
       গ্রামাঞ্চল ভেঙ্গে গেছে অনেক মানুষের ঘর |
রাত বারোটায় বনস্পতি ভেঙ্গে পড়েছে মাটির প'রে
       ছোট্ট শিশু কেঁদে উঠেছে মা নিয়েছে বুকে ধরে |
শরতের আকাশে প্রচণ্ড ঝড় বৃষ্টি আসে
       দক্ষিণবঙ্গ গেছে ভেসে |
উত্তরবঙ্গের মানুষ গৃহহারা
       একটু আশ্রয় খোঁজে বাঁচার প্রয়াসে |
পূর্ব মেদিনীপুর কংশাবতী
       উত্তল তরঙ্গে জলের গতি |
গরবেতা পাশকুড়ার মানুষ
       কলার ভেলায় যাতায়াত করে দিবারাতি |
নদীয়া, হুগলী বর্ধমান
       সেখানে মানুষ আশ্রয় নিয়েছে ত্রাণ শিবিরে
ব্যথা বেদণায় কাঁদিছে তাদের প্রাণ |
       জলমগ্ন হাওড়া, বন্ধ হয়েছে গাড়ী ঘোড়া,
শহরের রাজপথ জলে জলাকার
       খাল-বিল পুকুর সব একাকার |
ভেসে গেছে কত জেলা
       বহু মানুষ খবরের কাগজ পড়ে দেখে সকাল বেলা |

                 ***********
      সন্ন্যাসী

সন্ন্যাসী সনাতন ধর্মে লিপ্ত হয়ে,
       নিয়েছ কঠিন দায়িত্ব ভার
অনন্ত প্রেমের মাঝে ডুবেছ এবার |
       মায়ার খেলাঘরে বাঁধিয়াছ বাসা
চিরকাল থাকে যেন ভক্তি ভালবাসা |
       সনাতন ধর্ম শ্রেষ্ঠ ধর্ম, শ্রী রামকৃষ্ণের বাণী
আনন্দ সহকারে বয়ে চলিয়াছ তুমি |
       মাতৃকোলে সন্তান যদি না পায় সীতা,
পড় যদি বাইবেল, পুরাণ, বেদ, গীতা
       শাস্ত্র মতে কয় তব এ জীবন বৃথা |
ধ্যান জ্ঞান তপ জপ রেখ সব মনে
       অমৃতের সন্তান যদি আসে জীবনে |
পিতৃ পরিচয় রবে এই ধরাধামে
       সংসারেতে সুখি হয় রমণীর গুণে |
মনুষ চলিয়া যাবে পড়ে থাকে স্মৃতি
       ঘর বাড়ি পড়ে রবে থাকিবে প্রকৃতি |
আসা যাওয়া হাসি কান্না
       সুখ দুঃখের মেলা |
পূর্ণ জোয়ার স্বর্ণ ভাটা
       প্রকৃতির খেলা |

               ***********
                    ১৫/০১/২০০৭,কলকাতা
অন্নপূর্ণা ও মহাদেব সংলাপ

নিঃস্ব, রিক্ত ও অসহায় হয়ে
                    ঘুরিয়া বেড়ায় ভিখারী,
দ্বারে দ্বারে মাগিছে ভিক্ষা
                    উঠিছে ফুকারি ফুকারি |
গিরি-জায়া আজ গৃহকাজ সারি,
                    কূলবধু রূপ ধরি,
তন্দুল হাতে সমুখে আসিয়া,
                    বলে আহা মরি মরি |
ভোলানাথ আজ একি তব সাজ
                    ব্যথা লাগে মোর প্রাণে
ভিক্ষাপাত্র হাতে ঘুরিয়া বেড়াও
                    খোঁজ কারে নিশিদিনে |
নীরবে শুনিছে, কহিছে না কোন কথা,
                    বসন্ত সমাগমে তুমি অন্নপূর্ণা |
ভিখারী হয়েছি আমি হেথা
                    বোঝ নাকি হৃদয়ের ব্যথা |
বুঝিয়াছি মহেশ্বর, কৈলাশেতে বৈষ্ণব তুমি
                    বৃন্দাবনে গোপেশ্বর |
মর্তধামে অন্নপূর্ণা যদি হই আমি
                    তুমিও তো অন্নদাতা পরমেশ্বর |

            ***********