শিশিরকুমার দাশের কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
১।    কাঠবিড়ালী     
২।    
বট       

ছোটদের জন্য লেখা ছড়ার বই "চাঁদমামা আর বাঘের মাসি" থেকে নেওয়া :-  
৩।   
শা                  
৪।   
দিব্যি ছিল বাঙালি        
৫।   
ভাষাতাত্ত্বিক        
৬।   
শাশুড়ি ও জামাই       

কাব্যগ্রন্থ "হয়তো দরোজা আছে অন্য দিকে" থেকে নেওয়া :-   
৭।   
প্রতিযোগিতা              
৮।   
প্রাচীন কবির কাছে              

৯।   
কাব্যগ্রন্থ "অবলুপ্ত চতুর্থ চরণ" থেকে নেওয়া ১১টি কবিতা               
 
    
   
  
*
*
দিব্যি ছিল বাঙালি

মদনপুরের কাঙালি
দিব্যি ছিলেন বাঙালি |
হঠাত্ এলো মাথায় প্ল্যান্
ভাতের সঙ্গে খাবেন ফ্যান,
ঠিক সাড়ে তিন ঘন্টা পরে
হলেন তিনি চীনাম্যান |

কবিরাজের কাছে যেতেই
খেতে দিলেন পচা চিজ
দিব্যি ছিলেন চীনাম্যান,
এবার হলেন পর্তুগিজ |

ডাক্তারেতে দিলেন ওষুধ
পাঠিয়ে দিলেন মোজাম্বিক,
দিব্যি ছিল পর্তুগিজরে
রাতারাতি হলেন গ্রিক |

হাকিম বলেন রেগে গিয়ে
এই খেয়ে নে তিন গোলি,
দিব্যি ছিল গ্রিক ভাইরে
এবার হল সিংহলি |

কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকেন
মদনপুরের কাঙালি,
হে ভগবান, আমায় তুমি
আবার করো বাঙালি |

.         ***********                                              
উপরে
ছোট্ট একটা মশারে ভাই
রাজবাড়িতে থাকে |
বসবি তো বোস বসল এসে
মহারাজেক নাকে |

দৌড়ে এল লোকলশকর
নিয়ে লাঠি ঝাঁটা
রাজার নাকে কেমন করে
লাগায় জোরে চাঁটা!

দৌড়ে এলেন মন্ত্রীমশাই
এলেন সেনাপতি
সবাই বললে, "মশারে, তোর
কেন এ দুর্মতি?"

রানি বললেন,"আহা বাছা
ছেলেমানুষ মশা
থাকনা বাপু একটুখানি
নাকের ওপর বসা ;

রাত্রে যখন নাক ডাকবে
নানারকম সুরে
ভয়ের চোটে মশা তখন
নিজেই যাবে উড়ে |"
*
ভাষাতাত্ত্বিক

বোসেদের মেজছেলে গৌরভজন
শিখে ফেলেছেন ভাষা আড়াই ডজন

কখন বলেন কোন ভাষা কোন দিন
করে ফেলেছেন তারও একটা রুটিন

রবিতে তামিল বলে, বুধে পারসিক
শনিতে ল্যাটিন আর শুক্কুরে গ্রিক

ঘুম থেকে উঠে চীনা, ঘুম পেলে রুশি
জ্বর হলে জার্মান, চেক হলে খুশি

তুর্কি বলেন শুধু ব্যাথা হোলে পেটে
বর্মি বলেন যদি আসে কোনো বেঁটে

হাই পেলে থাই বলে, ক্ষিদে পেলে উর্দু
প্লেনে বলে সাঁওতালি, ট্রেনে বলে পুস্তু

চোস্ত স্প্যানিস বলে হলে হাঁপানি
হাঁচি পেলে থেমে থেমে বলে জাপানি

তিব্বতি বলে হলে রাত্রি নটা
তারপর কন্নড় তিনঘন্টা

হিব্রু বলেন গেলে ডিব্রুগড়ে
মৈথিলী বৈকালে বোশেখি ঝড়ে

পুলিশ দেখলে ভয়ে বলে নেপালি
কেউ যদি গালি দেয় বলে সে পালি

ফ্রেঞ্চ বলে সন্ধ্যায় বাজে পিয়ানো
ফুটবল মাঠে গেলে ইতালিয়ানো

ইংরেজী বলে তেজে তেড়ে এলে ঘোড়া
লস্যি খাবার পর হিন্দিও থোড়া

একটু সময় যদি মাঝরাতে পায়
ভাট্য়ালি গান গায় খাঁটি বাংলায় |

.                ***********                                            
উপরে
*
বদ্যি বললেন, "দিচ্ছি ওষুধ
একান্ন বার হাঁচি
শুনেই মরবে এই রাজ্যের
সকল মশামাছি |"

রাজা রইলেন অচল অটল
নেইকো নড়ন চড়ন
সবাই বললে, "পালা মশা
নইলে হবেই মরণ |"

স্থির চোখেতে তাকিয়ে দেখে
বললে মহারাজা,
"হতভাগা মশাটাকে
দেব কঠিন সাজা |"

"হাত তুললেই উড়ে যাবে
সে তো আমি জানি ;
করব না তা, ও করেছে
রাজার মানহানি |"

"সেনাপতি দিলাম ওকে
আমি মৃত্যুদণ্ড
তরোয়ালে মশাটাকে
কর খণ্ড খণ্ড |"
এগিয়ে এসে সনাপতি
মারলে একটা কোপ
মশা উড়ল ফুড়ুৎ করে,
রাজার নাকটি লোপ |

সবাই দেখে মহারাজের
শরীর ভরা রক্ত
চেঁচিয়ে বলে "জয় মহারাজ"
রাজার যত ভক্ত |

ছোট্ট মশা এবার থেকে
হবে যে সাবধান ;
নাক দিয়ে আজ শ্রীমহারাজ
রাখলেন সম্মান |









.             ***********       
উপরে
মশা
জামাইকে ডেকে বলে শাশুড়ি
ভালোবাসো ইলিশের পাতুড়ি?
ভালোবাসো চিতলের মুইঠ্যা?
আনাই চিতল তবে দুইটা |
ভালোবাসো মাগুরের ঝোল কি?
কই, শিঙি, ট্যাংরা বা শোল কি?
মাংসের কোফ্তা বা ভেটকি?
চিংড়ি মাছের কাটলেট কি?

নাকি তুমি নিরামিষ খাবা?
লজ্জা কোরো না মোটে বাবা |

বাঁধা কপি, চাও ঝিঙে পোস্ত
এঁচোড় এনেছি কিনে মস্ত,
চাও যদি কুমড়োর পাঁপড়ি
থোড়ের ঘন্ট চাও তা করি
আলুদম, ফুলবড়ি ভাজা
এনেছি পালং কিনে তাজা
বাটি চচ্চড়ি আর লাউ
বসিয়েছি পনির-পলাউ |

নাকি তুমি ভালোবাসো মিষ্টি
ওদিকেও আছে বাবা দৃষ্টি |
চাও ছানা, কমলার বরফি?
আতাক্ষীর, পায়েশের সরকি?
ভালোবাসো রাবড়ি কি তালক্ষীর,
পুলিপিঠে লালদই পয়োধির?
সরভাজা, মালপোয়া, দরবেশ,
কালোজাম, চমচম, সন্দেশ?

জামাই বললে শুনে, মা-খুড়ি
তাঁদেরই সমান হল শাশুড়ি,
তাঁর নির্দেশ সদামান্য
পদ যদি হয় পঞ্চান্ন
খেয়ে নেব প্রসন্ন চিত্তে
চিন্তা করেন কেন মিথ্যে |
প্রথমে তো আমি খাই সবজি,
আমিষ ডুবিয়ে খাই কবজি,
তারপরে খাই আমি মিষ্টি
নিরামিষামিষে সমদৃষ্টি
তারপরে খাই আমি ফলমূল
আম জাম লিচু কলা জামরুল
যা দেবেন খাবই সমস্ত
আমি কলিকালের অগস্ত্য |


.        ***********                        
উপরে
শাশুড়ি ও জামাই
*
   প্রতিযোগিতা
(হয়তো দরোজা আছে অন্য দিকে - থেকে নেওয়া)


তাকে কি ধরতে পারবি কখনও, টলোমলো পায়
সে তোর আগেই পৌঁছে যাবেই বটের ছায়ায় |
     অবশেষে ঐ ছায়াও যে তাকে ছাড়িয়ে পালায়
     শূণ্য মাঠের রোদের ভিতরে চির ব্যবধান
     কিছুতে কমে না অনভিজ্ঞতা - অভিজ্ঞতায় |
তাকে কি হারাতে পারবি কখনও টলোমলো পায়
সে তোর আগেই পৌঁছে যাবে মাঠের সীমানায় |
     অবশেষে ঐ সীমান্তরেখা নিজেকে হারায়
     আর এক মাঠের শরীরে, হে পিতা, চিরপ্রতারণা
     কিছুতে কমে না বিদেহ এবং দেহময়তায় |
তাকে কি কখনও পারবিরে ছুঁতে, টলোমলো পায়
সে তোর আগেই মৃত্যুকে ছুঁয়ে অমরতা চায়
      অবশেষে ঐ অমরতা ফের, মরে মরে যায়
      হলুদ পাতার মতন, হে শিশু, স্থায়ি ব্যবধান
      কিছুতে কমে না এই অভিনব প্রতিযোগিতায় |

.                          ***********
                                    উপরে
*
প্রাচীন কবির কাছে
(হয়তো দরোজা আছে অন্য দিকে - থেকে নেওয়া)


আমি কোনো প্রাচীন কবির কাছে
গিয়েছিলাম নবীন অহংকারে,
বসেছিলেম একেবারেই একা
অমরত্বের আদিম অন্ধকারে |

ছুঁড়ে দিলাম কবির মুখে সজোরে এই কথা
"আমাকে তাঁর দেবার কিছু আছে ?"
আসনখানি এগিয়ে দিয়ে হেসে
বলেছিলেন তিনি,
            "নিরবতা" |

.              ***********  
                                          উপরে
*
অবলুপ্ত চতুর্থ চরণ - থেকে নেওয়া


              || ১ ||

প্রথম চরণে তোলো বিদ্যুতের সুর
দ্বিতীয় চরণে তোলো মৃদঙ্গ মেঘের
এবার নর্তক রাখো তৃতীয় চরণ


              || ৪৬ ||

কেউ কেউ রাগ করে   গেছে অন্যখানে
কেউ লুঠে নেয় সব,    কেউ উদাসীন
থেকে গেল অন্ধকারে তবু একজব |


              || ৪৯ ||

স্বদেশে পূজ্যতে রাজা,   সর্বত্র বিদ্বান্
তাই বিদ্বানেরা আজ     ছেড়েছে স্বদেশ
নিয়েছে আশ্রয় বিশ্বব্যাপ্ত সেমিনারে |


              || ৫০ ||

বাউল, তোমার মাঠ নেই,   তাই ট্রেনে ----
ওরা ভাবে ভিক্ষা চাও       একতারা হাতে
আমি জানি তুমি চাও       উদার প্রান্তর


              || ৫২ ||

পুত্র, কী দেব তোকে,   অবিশ্বাস ছাড়া ?
কন্যা, কী দেব তোকে,  প্রতাড়ণা ছাড়া ?
তাই দিই শুধু স্বপ্ন,   স্বপ্নের ব্যর্থতা ?


              || ৫৫ ||

সমী বৃক্ষে কেন খোঁজো পোশাক তোমার ?
নগ্নতা-ই বলে দেবে পুরুষ কি নারী |
নপুংশক,  পোষাকের তাই প্রয়োজন !


              || ৫৬ ||

ঊর্ধ্ব থেকে ঊর্ধ্বে যাওয়া স্বর্গে অসম্ভব
কেন না ওখানে নেই অপার আকাশ
স্বর্গ তাই সীমাবদ্ধ,  পৃথিবী অসীম |

              || ৬২ ||

লুকিয়ে রেখেছি আমি এখানে তোমাকে
আবার তোমাকে খুঁজে নেব এক দিন |
তুমি কি নিজেকে খোঁজো এই কবিতায়


              || ৬৩ ||

কখনও কি কাঁদো তুমি,   আর্ত যন্ত্রণায়
পৃথিবী যখন হয় উদ্দেল অস্থির,
না তুমি করেছ অন্ধ নিজেকে নখরে |


              || ৭৪ ||

মন্দিরে মিথুন মূর্তি ? নিষেধ ছিল না ?
না কি ছিলো, নিষেধ মানো নি শাসকের ?
না কি দেবতারা বলেছিল, কী সুন্দর !


              || ৮৬ ||

সন্তানকে বলে যাবো, ঘৃণা কোরো তাকে
যে তোর পিতার আত্মা কিনে নিয়েছিল
যে পিতা রক্তাক্ত অন্ন দিয়েছিল মুখে


              || ১০০ ||

তিনটি ঘোড়ায় টানে এই ভাঙা রথ
প্রথমের নাম মৃত্যু, দ্বিতীয় সংগ্রাম
তৃতীয় পশুর নাম মৃত্যুহীন স্মৃতি |


              || ১০১ ||

তিন চরণেরও পরে ছিল কি প্রত্যাশা ?
শুনেছ কি পদধ্বনি ? খুঁজে দেখো আছে
শুভ্রতায় অবলুপ্ত চতুর্থ চরণ |


.              ***********  
                                          উপরে
*
কাঠবিড়ালী

ছোট্ট একটা কাঠবিড়ালী
.       দুপুর বেলায় রোজ সে আসে
কী যেন সে খুঁজে বেড়ায়
.        লেজ দুলিয়ে ঘরের পাশে |

চারদিকে শালবনের ছায়া
.         ঝিঁঝি ডাকে সারা দুপুর
কাঁপছে পাতা লেবু ডালের
.          শুয়ে আছে, অসুখ খুকুর |


.              ***********  
                                                       উপরে
*
বট

সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়াই, বট
এত গহন ডালের নীচে, এত তোমার ছায়া
জটিল বয়স, কঠিন বয়স তোমার
চারদিকেতে এত অন্ধকার
পাতায় পাতায় এত সুখের এত দুখের আলো
রৌদ্র তোমার এত নিকট সখা
তবু তোমার ঝুরির নীচে ছায়া
তবু তোমার শরীর ভরা আঁধার !


.              ***********  
                                                       উপরে