স্বর্ণকুমারী দেবীর কবিতা যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
|
হাস একবার
হাস একবার, সখী, সে মোহন হাসি ! ভস্মময় হৃদে যাহা ঢালে সুধারাশি | বিষাদ-তিমিরে, সই, একটি আলোক ঐ, আঁধার সংসারে উহা ধ্রুবতারা মম ! সঙ্কট-কণ্টকগণে ও হাসির পরশনে শোভে হৃদে সুখময় কুসুমের সম | অনন্ত বিপদে, প্রিয়ে, ডরায় না এই হিয়ে, যা লাগি লভেছি তোমা অমূল্য রতন | তোমার কোমল বুকে বাজিল অভাগা-দুখে, তাই ত, সদয়া বালা ! দিলে নিজ মন ! বার বার শত শত ঘেরিল তরঙ্গ যত যতই নিবিড় ঘন বিষাদের রাতি ; ততই দ্বিগুণ, প্রিয়া, উজলিল দুই হিয়া, ততই বিমলতর প্রণয়ের ভাতি ! যতদিন মোর লাগি সোহাগে উঠ্বে জাগি, সখি লো! অধরে তোর মধুময় হাসি--- ততদিন, প্রিয়ে, শোন, আমার হৃদয় মন সুখ বলি মনিবে লো বিপদের রাশি !
********
|
সে কেমনে চলে যায়
সে কেমনে চলে যায় !
আমার ত দেখিলে তাহায়, শুধু দেখিলে তাহায়
শুধু মুখপানে চেয়ে, প্রাণ উঠে উথলিয়ে,
শতবার হৃদিমাঝে বিদ্যুতের লহরী খেলায় |
সদা ভয়ে ভয়ে সারা, বুঝি পড়িলাম ধরা,
হৃদয়ের ভাব বুঝি নয়নে প্রকাশ পায় |
সে ত বুঝিতে না পারে, শুধু যাই যাই করে
মনে মন না বুঝিলে কে বোঝাবে কায় |
আমি বড় ভালবাসি সে মুখের হাসি,
মলিন দেখিলে মুখ বুক ফেটে যায় ;
তবু সাধ যায় সখি, এক বার দেখি,
সে প্রাণে বেজেছে ব্যাথা না দেখে আমায়!
দেখিতে পাইনে বলে হৃদয়ে বেদনা জ্বলে,
সখি এ হেঁয়ালি বল কে বোঝায়!
********
যামিনী
এমন যামিনী, মধুর চাঁদিনী
সে শুধু গো যদি আসিত |
রাণে এমন আরুল পিয়াসা ;
যদি সে শুধু গো ভালবাসিত!
এ মধু বসন্ত ; এত শোভা হাসি,
এ নব যৌবন, এত রূপরাশি,
সকলি উঠিত পুলকে বিকাশি,
সে শুধু গো যদি চাহিত!
মিথ্যা তুমি বিধি! মিথ্যা তব সৃষ্টি,
বৃথা এ সৌন্দর্য্য নাহি যদি দৃষ্টি
যদি হলাহলে ভরা প্রেমসুধা মিষ্টি,
কেন তবে প্রাণ তৃষিত!
********
প্রতিদান
প্রতিদান প্রতিদান! কি দিবে গো প্রতিদান ?
আদর, চুম্বন, হাসি, ভালবাসা, মনপ্রাণ ?
তোমার যা কিছু আছে,
সবই ত আমার কাছে,
কি দিয়ে পুরাবে তবে বৃথা এই অভিমান ?
বুঝিয়াছি মাঝে মাঝে তাই এই তিরস্কার,
ধার করা ধন তব নিয়ে আস উপহার |
কেন, সখা, যাও ভুলে, প্রাণের এ অন্তঃপুর
তোমাতেই তন্ময়, তোমাতেই ভরপুর!
তোমার যা কিছু নয়
নাহি স্থান হৃদিময়,
হৃদয়ে পশিতে গিয়ে ফিরে যায় অতি দূর!
আঘাত-বেদনাটুকু শুধু তার প্রাণে লাগে |
সে কি না তোমারি দান,
তৃপ্ত তাহে অভিমান,
আদরেরি মত তাই হৃদয়েতে সদা যাগে!
********
কেমনে ভুলি
সে ভুলেছে, আমি কেমনে ভুলি!
নূতন বসন্তে নূতন হাওয়া,
মধুর নয়নে মধুর চাওয়া,
ফুল তুলে চুলে পরাইয়া দেওয়া,
থাকিয়া থাকিয়া পাপিয়া বুলি,---
হায়! সে ভুলেছে বলে কেমনে ভুলি !
গাছের তলায় খেলার ভাণ,
প্রাণের মাঝারে প্রেমের টান,
কথায় কথায় মান অভিমান,
ভালবাসে কিনা এই আকুলি,---
হায়! সে ভুলেছে তাই কেমনে ভুলি!
ধীরে ধীরে বলা মনের কথা,
নয়নের নীরে প্রেম-আকুলতা,
পুরাতন ছলে নূতন ব্যাথা---
আবেগে দেখান হৃদয় খুলি,---
হায়! সে ভুলেছে বলে কেমনে ভুলি!
স্বপনেতে যেন আত্ম-বিনিময়,
সুখের সাগরে মগন হৃদয়,
মুহুর্তের মাঝে অনন্ত বিলয়,
স্বর্গে পরিনত মরত-ধূলি!
সে কি ভোলা যায় ! কেমনে ভুলি!
*****************
ভাবিও না
উথলিত অশ্রুবারি এ পোড়া নয়নে হেরি
ভাবিও না আমারে যে ভুলে গেছ কাঁদি তাই |
তুমি আছ শান্তি-সুখে, কাঁদিব আমি কি দুখে ?
কে আমি করিব আশা আরো হৃদে পেতে ঠাঁই ?
ভাল যে বাস না মোরে, ভুলেছ যে একেবারে,
ভালই করেছ, সখে, আর কি ভাবনা তবে ?
ভাবি দুখিনীর কথা, আর ত' পাবে না ব্যথা
তুমি ত' নিশ্চিন্ত হলে, হোক যা আমার হবে |
পাছে সমদুখী জনে, আমি ব্যথা দিই মনে,
আমা দুখে পাছে তব মুখানি মলিন হয়---
এই যে আশঙ্কা ছিল, সে আশঙ্কা দূরে গেল,
আর ত বস না ভাল, হয়েছ পাষাণময় |
তবে আর কিসে ডরি, যাহা ইচ্ছা তাহা করি,
নাহি ত মমতা-ডোর, কে আর রাখিবে বাঁধি!
নিশ্চিন্তে মরণ-বুকে, ঘুমাতে যেতেছি সুখে,
সুখ-অশ্রু পড়ে তাই, ভেবো না দুখেতে কাঁদি |
******************
শত কণ্ঠে কর গান
শত কণ্ঠে কর গান, জননীর পূত নাম,
মায়ের রাখিব মান---লয়েছি এ মহাব্রত |
আর না করিব ভিক্ষা, স্বনির্ভর এই শিক্ষা,
এই মন্ত্র, এই দীক্ষা, এই জপ অবিরত |
সাক্ষী তুমি মহাশূণ্য, না লব বিদেশী পণ্য,
ঘুচাব মায়ের দৈন্য,---করিলাম এ শপথ |
পরি ছিন্ন দেশী সাজ, মানি ধন্য ধন্য আজ |
মায়ের দীনতা-লাজ হবে দূর-পরাহত,
এই আমাদের ধর্ম, এই জীবনের কর্ম,
এই বস্ত্র, এই ধর্ম, এই আমাদের মুক্তিপথ |
নমো নমো বঙ্গভূমি, মোদের জননী তুমি,
তোমার চরণে নমি, নরনারী মোরা যত |
**************
তবু তারা হাসে
তবু তারা হাসে! মাগো! ম্লান তব চন্দ্রানন, অশ্রুপূর্ণ দু'নয়ন, ব্যথিত সুতনু লৌহপাশে--- তবু তারা হাসে! তবু তারা খেলে--- তুমি ক্ষুধাতৃষ্ণাতুর, গৃহ ধনবাদ্যপূর, অন্নজল তবু নাহি মেলে--- তবু তারা খেলে | কেন মরেনা তাহারা? এহাসি এ খেলাধূলা শুধু যে জ্বলন্ত চুলা দেখিতে সুন্দর শুভ্র বালুক সাহারা! কেন মরেনা তাহারা! এস, ভাই, ম'রে তবে বাঁচি! ধর্মহীন কর্মহীন, হেয়, পদানত, দীন ; বাঁচিয়া যে মরিয়াই আছি--- এস, ভাই, ম'রে তবে বাঁচি! আয়, ভাই, আয় তবে আজি--- সাধিতে মায়ের কাজ, মহূর্ত না করি ব্যাজ এক সূত্রে মরিবারে সাজি--- আয় তবে আয় সবে আজি!
******************
|
শারদ জ্যোত্স্নায়
শরতের হিম জ্যোছনায়
নিশীথিনী আকুল নয়নে চায়,
বহুদিন পরে যেন পেযেছে প্রণয়ী জনে
অশ্রুর লহরী মাখা সুখের আলোক ভায়!
বসন্তের প্রথম বাতাস---
সুখের মাঝারে যথা জাগায় হুতাশ,---
প্রাণ কেঁদে ওঠে হেরি নিশার ও ম্লান হাসি,
হারান স্মৃতির ছায়া বেড়ায় সমুখে ভাসি |
ও ছায়া কহার ছায়া ? মুরতি কার মায়া ?
চিনিতে পারিনে যেন চিনি চিনি যত করি!
আকুল ব্যাকুল প্রাণ ধরিবারে আগুয়ান,
যতই ধরিতে যাই ধীরে ধীরে যায় সরি!
বড় যেন আপনার ছিল রে সে এ জনার!
আজ কি ভাবিছে হেথা পাবে না আশ্রয়?
কাছে এসে তাই কিরে পর ভেবে যায় ফিরে?
ফুটন্ত জোছনা-হাসি করি অশ্রুময়!
তাই প্রাণ কেঁদে ওঠে বুঝি এ সময়!
**************
বসন্ত জ্যোত্স্নায়
জোছনা-হসিত নিশা, বসন্ত-পূরিত দিশা, প্রকৃতি-নয়নে ঘুম-ঘোর ; কুসুম-সুবাস-হিয়া উঠিতেছে উথলিয়া, চাঁদ পানে চেয়ে ভাবভোর! উদাস মলয় বায় আনমনে বহে যায়, প্রাণে মেশে প্রাণের পিয়াস ; সে মধু পরশ লাগে, তটিনী চমকি জাগে, ধীরে বহে সুখের নিশ্বাস! উপকূলে তরুগণ নেহারিয়ে কি স্বপন কে জানে হরষে মাতোয়ারা ; সুনীল অম্বর পাশে তারাটি মুচকি হাসে, কোথা থেকে বহে গীতধারা! মধুর স্বপন-বেশ, মধুর স্বপন-দেশ, সঙ্গীতের মধুর উচ্ছ্বাস ; বিহ্বল চাঁদিনী নিশি, বিহ্বল বাসন্তী দিশি, প্রাণে জাগে আকুল পিয়াস!
**************
|
শ্রাবণ
সখি, নব শ্রাবণ মাস! জলদ-ঘনঘটা, দিবসে সাঁঝছটা, ঝুপ ঝুপ ঝরিছে আকাশ! ঝিমিকি ঝম ঝম, নিনাদ মনোরম, মূহুরমূহু দামিনী-আভাষ! পবন বহে মাতি, তুহিন-কণাভাতি, দিকে দিকে রজত উচ্ছ্বাস! উছলে সরোবর, পত্র মরমর--- কম্পে থর থর পান্থ নিরাশ! যুবতী-যুবাজনা, পরম প্রীতমনা, দুঁহু দোঁহে বাঁধা ভূজপাশ | বিরহে যাপি যামী, ঘুমায় ছিনু আমি স্বপনেতে মিলন-উল্লাস! সহসা বজ্রপাত কড়াক্কড় নিনাদ কাঁপি উঠি, হৃদয়ে তরাস! নয়ন মেলি চাই, কোথায় কেহ নাই, উথলিত আকুল নিশ্বাস! আমার বঁধুয়া পরবাস!
**************
|
সুন্দরী
তুমি গো সুন্দরী, প্রাতে জীবনের তব
আছিলে একটি কলি গোলাপের নব
প্রণয়ী সূর্যের করে
সে মুকুল সারা ডরে,
খুলিতে কুমারী হৃদি সাহস না পায় ;
অধীর কোমল লাজে
সবুজ পাতার মাঝে
রাঙ্গা মুখখানি যথা লুকাইতে চায় |
অথবা মরতে বুঝি নাহি সে তুলনা,
স্বরগ ঊষাটি তুমি আছিলে ললনা!
প্রভাত পরশে যথা
প্রতি ফুল লতা পাতা,
হাসিয়া জাগিয়া উঠে ঝারি অশ্রুজল ;
তোমার রূপের জ্যোতি
বিমল প্রশান্ত অতি,
তপ্ত মরু স্পর্শ পেয়ে স্নিগ্ধ সুশীতল |
সেদিন গিয়াছে, তবু দ্রুতগামী কাল
হরিতে পারেনি তব সুধা রূপ-জাল |
অতুল অফুট সেই সৌন্দর্য্য লাজের,
সহিতে নারিত তাহা আঁখি অপরের!
কাল শুধু পূর্ণতম মোহিনী প্রভায়
ফুটায় তুলেছে তাহা যৌবন-শোভায়!
ফুটন্ত কুসুম যথা পাতার মাঝারে
আকুল আবেশে ভরা সৌরভের ভারে!
দিবাকর দ্বিপ্রহরে যথা পূর্ণ শোভা ধরে,
তেমনি কোমল তব আধ-ফুট রূপ নব,
বিকশিত অপরূপ প্রদীপ্ত আকারে!
************************