কবি আবু সয়ীদ আইয়ুব – জন্মগ্রহণ করেন কলকাতায়। পিতা আবুল মুকারেম আব্বাস ছিলেন
বড়লাটের মহাকরণে করণিক। তাঁর বড় ভাই ডঃ আবদুল গণি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন এবং একসময়
ভারতের রেলমন্ত্রী হয়েছিলেন।

কবির শৈশবের কিছুদিন কাটে সিলেটে। তারপর শিক্ষা শুরু হয় কলকাতার সেন্ট অ্যান্টনিজ স্কুলে, যেখান
থেকে তিনি এন্ট্রান্স পরীক্ষা পাশ করেন। তাঁরা ছিলেন অবাঙালী এবং তাঁর মাতৃভাষা ছিল উর্দু। এই স্কুলে
ইংরেজী, উর্দু এবং ফারসি ভাষায় তাঁর দক্ষতা জন্মায়। এই সময় তাঁর উর্দু-ফারসি ভাষার শিক্ষক ছিলেন
মনজুর আহমেদ যিনি ছিলেন একজন কাব্যপ্রেমী মানুষ। তাঁর হাত ধরেই আইয়ুবের গালিব, মীর, দর্দ,
মোমিন, ওমর খৈয়ামের সাথে পরিচয় হয়। এর সাথে ছিল তাঁর বড় বৌদির স্নেহের বন্ধুত্ব। তিনি আয়ুবকে
পরিচয় করিয়ে দেন পশ্চিমী সাহিত্যের সঙ্গে। পড়তে দেন চার্ল্স ডিকেন্স, জর্জ এলিয়ট, শার্লোট ব্রন্টি প্রভৃতি
রত্নসম্ভার।

এত সাহিত্যের মধ্যেও তাঁর বাংলা ভাষাই তখন পর্যন্ত শেখা হয়নি। তেরো বছর বয়সে, রবীন্দ্রনাথের সাথে
পরিচয় হয় গীতাঞ্জলীর একটি উর্দু অনুবাদের মধ্য দিয়ে। বাংলায় রচিত মূল গ্রন্থটি পড়বার জন্য তিনি
আকুল হয়ে ওঠেন এবং বাংলা শিখতে শুরু করেন।  

আই.এসসি পাশ করেন সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে। এখানে দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের মতো আরো
কয়েকজন সহপাঠী বন্ধুর সংস্পর্শে এসে বাংলা সাহিত্যে অবগাহন করলেন। তিনি বিজ্ঞানে স্নাতক হন
প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে। পদার্থ বিজ্ঞান নিয়ে পড়ার সময় কিছুদিন সি.ভি. রমনের সঙ্গে গবেষণাও করেন।
এম.এসসি পড়ার সময় তিনি প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের অধীনে কাজ করার সুযোগ পান। কিন্তু ঘোর
অসুস্থতার কারণে তাঁর এম.এসসি ফাইনাল পরীক্ষা দেওয়া হয়ে ওঠে নি।

এবার তিনি বিজ্ঞান ছেড়ে দর্শন নিয়ে পড়ে ফার্স্ট ক্লাস নিয়ে উত্তীর্ণ হন। তিনি ফেলোশিপ পান
“Error in
Perception and Thought”
নিয়ে কাজ করার জন্য অধ্যাপক রাধাকৃষ্ণন এবং কৃষ্ণচন্দ্র ভট্টাচার্যের অধীনে।
কর্মজীবনে তিনি প্রেসিডেন্সী কলেজ, কৃষ্ণনগর কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশ্বভারতী তে অধ্যাপনার
কাজ করেছেন।

তিরিশের দশকে তিনি “পরিচয়” ও “চতুরঙ্গ” তে লিখতে শুরু করেন। ১৯৪২ সালে তিনি কলকাতার
ফ্যাসিবাদ বিরোধী লেখক ও শিল্পী সমাবেশের প্রেসিডিয়ামের সদস্য হন। ১৯৫৪-৫৬ সাল পর্যন্ত তিনি
রকফেলার ফাউন্ডেশনের ফেলো ছিলেন।

১৯৫৬ সালে তিনি বিবাহ করেন ধীরেন্দ্রমোহন দত্তর কন্যা ও নিজের ছাত্রী গৌরী দেবীকে।
কবির সাহিত্যকর্মে স্ত্রী গৌরী আইয়ুবের সহায়তা উল্লেখযোগ্য। দীর্ঘকাল পার্কিনসন্স রোগে শয্যাশায়ী হয়ে
থাকা পর ১৯৭৮ সালে তাঁর মৃত্যু হলেও আমৃত্যু তাঁর সাহিত্যকর্ম চালিয়ে যেতে পেরেছেন।

১৯৬১ সালে তিনি মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের “ইন্ডিয়ান স্টাডিজ” এর প্রথম বিভাগীয় প্রধান নিযুক্ত হন।

১৯৬১-৭১ সাল পর্যন্ত তিনি, অধুনা হিমাচল প্রদেশের শিমলায় অবস্থিত “ইন্সটিটিউট অফ অ্যাডভান্সড্
স্টাডিস”-এর ফেলো ছিলেন। শিমলায় তখন তাঁর সঙ্গে ছিলেন বন্ধু ও সহ অধ্যাপক, প্রখ্যাত ছান্দসিক ও
চর্যাপদ বিশেষজ্ঞ
ডঃ নীলরতন সেন

১৯৭১ এর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়, তাঁর, বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের সাহায্য ও সমর্থন আজও
স্মরণীয় হয়ে আছে।

১৯৩৪ সালে তাঁর প্রথম বাংলা প্রবন্ধ “বুদ্ধিবিভ্রাট ও অপরোক্ষানুভূতি” প্রকাশিত হয় পরিচয় পত্রিকায়, যা
রবীন্দ্রনাথ, অতুলচন্দ্র গুপ্ত ও প্রমথ চৌধুরীদের মতো মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পরিচয় পত্রিকার
সম্পাদক কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তর অনুরোধে ১৯৩৪ সালেই লেখেন “সুন্দর ও বাস্তব”, যা করতে গিয়ে
রবীন্দ্রনাথের লেখার প্রতি তাঁর আগ্রহ শতগুণ বৃদ্ধি পায়।

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে “আধুনিকতা ও রবীন্দ্রনাথ” (১৯৬৮), রবীন্দ্রনাথের কবিতার উপর
“পান্থজনের সখা” (১৯৭৩),
“One Hundred and One Poems by Rabindranath Tagore” (১৯৬৬), “Tagore’s
Quest”
(১৯৮০)।  এছাড়াও রয়েছে “পথের শেষ কোথায়”, “পূর্বপ্রকাশিত কয়েকটি প্রবন্ধ : ১৯৩৪-৬৫”
(১৯৭৭),
“Varieties of Experience” (১৯৮০), “ব্যক্তিগত ও নৈর্ব্যক্তিক” প্রভৃতি।

আবু সয়ীদ আয়ুবের সম্পাদিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে “আধুনিক বাংলা
কবিতা” (১৯৪৭), “পঁচিশ বছরের প্রেমের কবিতা” (১৯৬৩), অম্লান দত্তর সঙ্গে
“10 Years of Quest” (১৯৬৬)।

তাঁর উর্দু সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা থেকে আমরা পেয়েছি আসাদউল্লা খান গ়ালিব এর গজলের বঙ্গানুবাদ
“গালিবের গজল থেকে” (১৯৭৬) ও মীর তাকি মীর এর গজলের বঙ্গানুবাদ “মীরের গজল থেকে”। জীবনের
বেশিরভাগ সময় তিনি রবীন্দ্র চর্চা করে কাটিয়েছেন।

এক উর্দুভাষী উদারমনা মানুষের বাংলা ভাষার প্রতি এত টান ও ভালোবাসা, যা অনেকাংশেই বাংলা
মায়ের আপন গর্ভজাত সন্তাদের থেকেও বেশি, সত্যিই বিস্ময়কর। তিনি বাঙালী রবীন্দ্রনাথকে নতুন
আলোকে বাঙালীর কাছেই উপস্থাপন করে গিয়েছেন।  

তিনি ভূষিত হয়েছেন বিভিন্ন সম্মান ও পুরস্কারে। তার মধ্যে রয়েছে “রবীন্দ্র পুরস্কার” (১৯৬৯), “সাহিত্য
আকাদেমি পুরস্কার” (১৯৭০), বিশ্বভারতী থেকে প্রাপ্ত “দেশিকোত্তম” উপাধি (১৯৭১), টেগোর রিসার্চ ইন্সটিউট
প্রদত্ত “তত্ববাণীধি” উপাধি।

আমরা তাঁর  “গালিবের গজল থেকে” কিছু শের এর বঙ্গানুবাদ এখানে তুলি দিচ্ছি।


আমরা
মিলনসাগরে  কবি আবু সয়ীদ আইয়ুবের কবিতা তুলে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে
আমাদের এই প্রয়াস সার্থক মনে করবো।


উত্স – মাহমুদ শাহ কুরেশী, বাংলাপেডিয়া       
.         রবিবারোয়ারি, এই সময়, গালিব, খৈয়াম থেকে রবীন্দ্রনাথের পথে, ১৬ জুন ২০১৩

  
কবি আবু সয়ীদ আইয়ুবের মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন।    


আমাদের ই-মেল -
srimilansengupta@yahoo.co.in     


এই পাতার প্রথম প্রকাশ - ১৩.১১.২০১৩
...