*
চাষা
কবি অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
কল্লোল পত্রিকা, ১৩৩১ অগ্রহায়ণ (নভেম্বর ১৯২৪) সংখ্যা থেকে নেওয়া |


মাটির ছেলে, মাটির মতন প্রীতি-শীতল বুকখানি,
মাটির বাতির ম্লান-শিখাটির মতন মৃদুল মুখখানি !
মাটি-মায়ের হৃদয় উজার করছ তুমি প্রেম দিয়ে,
মাঠের কবি, বন্দনা মা’য় কর্ ছ খুশীর গান গেয়ে |
ধূ-ধূ ধূসর যে ক্ষেত ছিল শুক্ নো ধুলোর আস্তানা,
যাদুকরের ছোঁয়াচ্ লেগে রঙ্-চন্ডী তার ভাব্ খানা !
রঙ্-সোহাগী নীল-বিলাসী ক্ষেতের তুমি হো রাজা,
ভুঁয়েতে ভুঁই-চম্পা ফোটাও, ফুল-মুলুকের নওরোজা !
শণের ক্ষেতে সোনার আঁজন যখন বুলায় ভাস্করে,
বানাও মাটির আলি, সবাই ভাবে ---এ কোন্ ভাস্কর এ !
লাঙ্গলেতে ছন্দ বাজাও, মাটির মেদুর বুক মাতে,
শ্যামার শীসের জল্ সা চলে ক্ষীর্ রি-শালিক-পিক সাথে !
নীল-বেগুনী-জর্দা-লালের-পাখ্ না মেলে মেঘ-পরী,
আলোর বীণায় বিভাস বাজায় বেড়ায় বিভোল্ সন্তরি !
কাঠ্-বেরালী ঠোকর মারে, শিশির পড়ে ঠিক্ রিয়া,
সির্ সিরানির ঝুমুর বাজায় বাতাস আলোর মদ পিয়া !
ফড়িঙ্ আসে পাখ্ না মেলে মৌমাছিদের মজ্ লিসে,
প্রজাপতির পাখার রঙে গাঁদার রঙটি রয় মিশে !
ঘুম-সিষমায় ঘুমিয়ে চলে সুষমা নদী ঢেউ তুলি,
রূপার আঁচল শিথিল–শীতল, আল্ পনা দেয় লাল গুলি’ !
আলোর নূপুর বাজ্ ল যখন, ফিঙে যখন গান গাহে,
মাটির মালী মাঠের মুকুট মাটির মালিক বাদ্ শা হে,
ছন্দ বাজাও পেশীর তালে, বাজাও লাঙল-তান্ পুরা,
ছন্দ শুনে চক্ষু খোলে মাটির জীবন-তন্তুরা |
প্রাণ-পতাকা বহন করি, মাতাল তৃণের মঞ্জরী,
মন্ত্র শুনি তোমার কবি, উঠ্ ছে পুলক গুঞ্জরি !
মরুর বুকে ঐন্দ্রজালিক, বহাও বাদল-ঝর্ণাকে,
যৌবনেতে পেলব কর তাপসী অপর্ণাকে !
সুর-খেয়ালী, কি সুর বাজাও ! তোমায় করে বন্দনা
বন-শালিক আর দোয়েল চড়ুই তিতির পাখী চন্দনা |
গৈরিকেতে ধ্যান-উদাসী নয়ন মুদি চুপ করে’
বসুধা আজ সুধায় উছল উঠ্ ল বিহ্বল রূপ ধরে’ |
সে কোন্ রাজার দুলাল তুমি ! জীয়ন্-কাঠির চুম্ লাগি’
চোখ্-জানালার খিল্ টি খুলি গেল তাহার ঘুম ভাগি’ !
এলিয়ে দিল অলক-গুছি, রাঙালো চোখ সুর্মাতে,
হাতছানি দেয় আকাশকে নীল, চোখে অলখ্ সুর মাতে |
শ্যাম-কিশেরী ফুর্তি-আতর ছড়ায় মুহু দিল্-ভোলা,
দিল্ দরিয়া খিল্ খোলা আজ চোখে স্বপন-নীল-গোলা !
দৃষ্টিটি তার চোখ্ জুড়ানো, গন্ধ ভারী মিষ্টি সে,
মাঠের কবি, এই কবিতা---তোমার মোহন সৃষ্টি সে !

কলের ধোঁয়ায় আকাশ কালো করছে ওরা মিস্তিরি,
তুমি বহাও মাটির বুকে রঙের সুরের পিচ্ কিরি !
ভূত-বাদুড়ের ছানা ওড়ায় উড়ো জাহাজ অম্বরে,
তুমি তখন চর্ কা ঘুরাও ঘুর্ ন্-চাকীর মন্তরে !
ঘুঘু ডাকে ঘুমপাড়ানি, নিঝুম দুপুর থম-থমে,
টহল মারে, ব্যস্ত ওরা, জাঁক-জমকী জম্-জমে |
ওরা যখন মানুষ মারে ‘হাউইট্ জার’ ও বন্দুকে,
অশথ্ তলার অধর পরশ দাও বাঁশরী-বন্ধুকে !
পান্সী চলে ঠুংরী তালে, খেম্ টা তালে বয় হাওয়া,
মেঘের ফাঁকে সজল-শীতের একটি তারায় রয় চাওয়া !
ওরা যখন মরক লাগায়, কান্নাতে দেশ দেয় ভরি,
মঞ্জু তুমি বিনিদ্ কবি, কাটাও জোছন-শর্বরী |
সুষ্ মী নদীর ও তীরটিকে পীড়ছে হাজার বস্তিতে,
তুমি হেথায় পাতার কুঁড়ে বানাও নীরব স্বস্তিতে |
হাউই ছাড়ে, পাহাড় উড়ায়, ‘ডিনামাইটের’ কারখানা,
রাজ-কারিগর, লাঙল-কাছে সকল যন্ত্র হারমানা !
লাল ইমারৎ গড়্ ছে বটে,---- সকলই কুকীর্তি যে,
দীর্ঘশ্বাস ও কান্না আছে অসংখ্য তার ভিত্তিতে |
লক্ষ শোণিত বিন্দুতে হায় একটি পাথর হয় রাঙা,
তবু শুনি সে কুঠিতে খুঁত্ থেকে যায়, রয় ভাঙা !
পাতারকুঁড়ে, মাটির বেড়া, একটি ছোট দীপ তাতে,
দীপটি তুমি দাও নিবিয়ে ফুলেল হাওয়র জ্যোত্স্নাতে !
যে নীলাকাশ মঞ্জু-করা চমত্কারের ফাগ দিয়ে,
কলঙ্কিত কর্ ল ওরা ধূম-দানবের দাঁত দিয়ে |
সওদা কর মাটির তুমি, হাট কর না ঢাক পিটে,
বন কাপসে কাপড় বানাও, রাঙাও নাক’ মারপিটে |
স্বাস্থ্য এবং শক্তি বলি দাও না হেয় লুব্ধতায়,
মাটির বুকে বুক পেতে শোও, নওক’ কিছু ক্ষুদ্ধ তায় !
মিনার-মহল চাও না কিছু, মোহর পাবার নেই আশা
পিয়াল-ফুলী স্নিগ্ধ মাটির আঙ্গিনাতেই সুখ-বাসা |
যন্ত্রাসুরের যন্ত্রণাতে গোঙায় ওরা দিনরাতি,
তুমি তোমার জীবন কাটাও মাটির গলার হার গাঁথি
মাটির দুলাল, মাঠের কবি, ক্ষেতের তুমি হও রাজা,
সবখানে পাপ বীভত্সতা, হেথায় ফুলের নওরোজা

.                    ****************  
.                                                                                  
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
কবি অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত-র কবিতা
*
অনাগত কবি
কবি অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
কল্লোল পত্রিকা, ১৩৩১ অগ্রহায়ণ (ফেব্রুয়ারী ১৯২৫) সংখ্যা থেকে নেওয়া |


ওই যেথা তারায় তারায় কাঁপে জ্যোতির আনন্দ,
কাননের দীর্ঘশ্বাসে আন্দোলিয়া ওঠে ফুল্ল-মল্লিকা সুগন্ধ,
.        ব্রীড়ায় রক্তিম অর্ধ প্রস্ফুটিত চম্পার কম্পনে,
.        মধুর-মদিরামুগ্ধ চঞ্চরীর মঞ্জুল গুঞ্জনে,
.                শ্রাবণের বৃষ্টি-ছন্দ-মুখরিত
.                শ্যামস্নিগ্ধ আনন্দ-কম্পিত
.                                রাত্রির হৃদয়ে,
কিম্বা কোন্ মুগ্ধ শুভ্র সুকোমল জ্যোত্স্নার বিস্ময়ে,
.        প্রচ্ছন্ন ধূসর ব্যথা গোধূলি-বেলায়,
.        বিশ্রদ্ধ বিমুগ্ধ-রাত্রি-প্রভাত-খেলায়,
পুষ্পগন্ধঘন সৌম্য কল্পনা-নিবিড় অন্ধকারে,
হেমন্ত-প্রদোষে-কিম্বা নবঘন-আন্দোলিত লুন্ঠিত আষাঢ়ে,---
.                কোথা তুমি ওগো কবি
.                অনাগত যুগের সম্রাট্
.                                হে বিরাট,
নিঃশব্দ নিষ্কম্প আর্ত অন্ধকার-তলে,
সৃষ্টির তরঙ্গ-মন্দ্র-নৃত্য-কলরোলে,--
.                কোথা তুমি লুক্কায়িত অমর সন্ন্যাসী,
.                                আনন্দ-বিলাসী !----
নত-চক্ষু নিবিড় ব্যথায় নম্র সন্ধ্যা-ম্লানিমায়,
কিম্বা কোন্ যৌবন-চঞ্চল-তনু পূর্ণ পূর্ণিমায়,
বিষণ্ণ দিগন্ত-প্রান্তে, কুজ্ঝটিকা-লীন ক্লান্ত নভে,
কিম্বা কোন্ স্বপ্নাতুর অর্ধস্ফুট পুষ্পের সৌরভে,
.        বন্ধহীন নিরুদ্দেশ মেঘের যাত্রায়,
.                             দুর্মদ দুরন্ত ঝটিকায়,
কিম্বা কোন্ কলকন্ঠা তটিনীর লোলনৃত্য-ছন্দিত সভায়,
.                              শীত-রিক্ততায়—
কোথা তুমি সর্বকাল-স্থানের পশ্চাতে
.                              মৌনতাতে
.        একমনে করিছ ধেয়ান,
.                               সাধিতেছ বীণা,  
তিমিরান্ধ কোন রাত্রি পথ-চিহ্নহীনা
.        মুঞ্জরিছে, শুনে তব জ্যোতি-অভিনন্দনের গান ?
.                মোদের এ অশ্রুস্নাত ধরণীর ধূলির প্রাঙ্গণে,
.                                কখন গোপনে
.                নীরব নিশার মত একান্ত নিভৃতে,
.        হেথায় আসিবে তুমি কি গান গাহিতে
.                                কত দিনে ?
.        নীলাভ্র-নিবিড় নব-শেফালিকা-সুরভি আশ্বিনে,
.        শ্যামল সুস্নিগ্ধ-মোহ ম্লান বরষায়,
.        কিম্বা কোন্ পুষ্পিত ফাল্গুন-ফুল্লতায়
.        হায়
ধরিত্রীর দুই চোখে ব্যথা মূরছায় ;
.                ক্লান্ত বেদনায়
যুগে যুগে চেয়ে আছে তব প্রতীক্ষায়,
.                কখন্ বাজিবে তব চরণের ধ্বনি,
.                আমিবে অমৃত-সঞ্জীবনী |

.                হে কবি, হেথায় আসি
.                কোন্ সুরে বাজাইবে বাঁশী,
.                                কোন নব ছন্দের আঘাতে,
.                                কি ভৈরব সুরের আহ্লাদে
.                খুলি দিবে ধরিত্রীর বন্ধ দ্বার, আবদ্ধ অর্গল,
.                সুরের সান্ত্বনা দিয়া মুছাইবে তপ্ত অশ্রুজল !
অশুচি কলঙ্ক-কন্টকিত ধরিত্রীর বুকে
.                                আবার জাগিবে সুখে
.                মৃত্যুহীন অপরূপ উদ্দাম যৌবন ;
.                তায় দুই রিক্ত হস্তে পরাইবে কল্যাণ কঙ্কন,
উজ্জ্বল সিন্দুর-বিন্দু আঁকি দিবে সীমন্ত-সীমায়,
.                ওষ্ঠাধর উলসিবে রাগ-রক্তিমায়,
.        চুম্বনে মুছিয়া লবে দুঃখে-দগ্ধ ললাটের রেখা,
হাসিতে উদ্ভাসি তুলি’ আনন্দ-চপল শশী-লেখা,
.                নীলাম্বুধি-ঊর্মি-জালে গড়িবে মেখলা,
.                                নবস্ফুটশষ্পশ্যামাঞ্চলা,
.        পরিবে মহিমালক্ষ্মী শিরে শত সূর্যের মুকুট,
.        পূর্ণ করি নক্ষত্র-কুসুমে যুগ্ম করপুট !
.                কোন্ শুচি বরমাল্যখানি
.                উপহার দিবে তার কন্ঠতটতলে,
.                                সাজাইয়া কোন শতদলে
.                                তাহা নাহি জানি |
এই ম্লান দুঃখী ধরিত্রীরে
.        হতভাগিনীরে
মুঞ্জরিবে কোন্ গানে ওহে কবি দরদিয়া,
.        দীর্ঘ-নিশ্বসিত ক্লান্ত ধরিত্রীর হিয়া
.        বিগত-তিমির-ঝঞ্ঝা প্রভাতের মত
.                        হবে প্রস্ফুটিত ?
.        ছিন্নবাসা এ দীনারে
.        কোন্ নব সজ্জা-উপহারে
.        সম্রাজ্ঞী করিবে তুমি কোন্ নব মন্ত্র-গুঞ্জরণে ?
.        তোমার মৃদুল-ছন্দে নিষ্করুণ সুরের স্ফুরণে,
.                পৃথিবীর যত দুঃখ যত দৈন্য গ্লানি
.                                মৃত্যু অনুমানি’
.                লোলবৃন্ত জীর্ণ পত্রসম যাবে উড়ে
.                তব ঝঞ্ঝা-ঝঙ্কারিত তীব্র সুরে সুরে !

.        হেথা আসি কোন্ মহামিলনের গানে
.        উল্লাস হিল্লোলাকুল ছুটাইবে ধরণীর প্রাণে,
.                তাহার সকল ক্ষতে বুলাবে প্রলেপ,
.                সস্নেহে মুছিয়া লবে বিক্ষোভ আক্ষেপ,
.                                ঘুচাবে সকল ক্ষুধা তার !
.                                        তাই বসুধার
.                                দুই দীর্ঘ নেত্রপ্রান্ত বাহি
.                একখানি অশ্রুসিক্ত মলিনপ্রতীক্ষা রহে চাহি
.                                সুদূর আকাশে,
.                                     দীর্ঘশ্বাসে !

.        হে কবি, আসিবে বলে’,
মোরা এই তপ্ত ধূলি সিক্ত করি আদ্রআঁখিজলে
.                                      নিরালায়,
.                পাছে এ ধূলায় কাঁটায়
.        তোমার চরণপ্রান্তে ব্যথা বিঁধে যায় !
.        কন্টকিত এ-পথের ‘পরে
.        সাজয়ে রেখেছি স্তরে স্তরে
.                মোদের এ ব্যর্থ চিত্তগুলি,
.        তুমি আস দেরি করে’ যদি
.                হে দরদী,
.        তবে ঝরে’ পড়ে’ হয়ে যাব ধূলি,
.        বিক্ষত বিদগ্ধ প্রাণে নামিবে যে মরণ-গোধূলি !
.        তুমি যবে আসিবে হেথায়
.                মিলন-মেলায়,
.                দুটি হাতে নিয়ে তুলি
.        তোমার পায়ের কাছে যেটুকু রয়েছে ধূলি ;
.        মোদের কি পারিবে চিনিতে তার মাঝে ?
.                যে অশ্রুত হাহাকার বাজে
.                                পঞ্জরের ঝঞ্ঝা-রাগিণীতে,
.                তাহারে কি পাইবে শুনিতে ?
.        দেখিতে পাইবে কি গো মোর অশ্রুজল
.                পাষাণ হইয়া আছে সুকঠিন,
.        সব আয়োজন দুর্বল নিস্ফল
.                ধূলাতে বিলীন !
.        বুঝিবে কি মোদের যন্ত্রণা,
.        জীবনের বিফল সাধনা,
.        শুনিবে কি সকরুণ দীর্ঘশ্বাস,
.                পিপাসা পঙ্কিল যত আশ ?

তবু একবার দুটি ফোঁটা আঁখি-নীরে
.        ধন্য করো কলঙ্কী-ধূলিরে,
.                তার পরে ফেলে দিও ;
             বাজাইও
.        নববীণাতন্ত্রীলীন নবমন্ত্রগান
হে কবি হে মহীয়ান্
.        আমাদেরে যদি কভু পড়ে মনে,
.        একবিন্দু অশ্রু শুধু এনো ডাকি’
.                                থাকি’ থাকি’
.                                নয়নের কোণে ;---
.                এই শুধু সাধ,
.        হে সন্তান, তব তরে এই আশীর্বাদ |

.                    ****************  
.                                                                                  
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
ফাল্গুনের গান
কবি অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
কল্লোল পত্রিকা, ১৩৩১ ফাল্গুন (ফেব্রুয়ারী ১৯২৫) সংখ্যা থেকে নেওয়া |


.            ফাল্গুন এসেছে রে, উল্লাস হিল্লোল,
.            চমকের ঝলকের পুলকের হিন্দোল !
দখিনের হাওয়া,                                 কী যে সুখ পাওয়া !
.            জ্যোছনায় চান করে’ পরাণের খিল্ খোল্ ,
.            সব ভুলে আজ ভোলা হও খোলা দিল্ ভোল !

.             আজ শুধু আব্দার, সোহাগের বায়না !
নেমে আয় চাঁদনী                         নিয়ে বুক-বাঁধনি
.             নয়নের কাছে আন্ নয়নের আয়না,
.             আঁখির জ্যোছনা ছাড়া আঁখি যে গো না’য় না !

.             এক হাতে আন্ বীণা, আর হাতে পিয়ালা,
.             চোখ ভরে’ নিয়ে আয় খুশীর ঐ দিয়ালা !
মুহু মুহু মহুয়ায়,                                কুহু কহি কে যে গায়,
.              প্রাণ যে চায় না হায় থাক্ তে গো নিরালা,
.              চুমুতে চুমুক দিই আন্ ঠোঁট-পিয়ালা !
.              ফাজিল মাতাল হাওয়া ঝিরিঝিরি বইছে,
.              চাঁপার গোপন কথা মালতীরে কইছে !
চটুল হাসুন্-হানা                         দখিনারে করে মানা,
.              তবু তার মাত্ লামি বুক পেতে সইছে !
..              চাঁদের নিঝুম আলো প্রেমে থই থইছে !

.               কাঁদ্ ব না আজ আর, আজ শুধু ফুর্তি,
.               ঠোঁট চায় মাখ্ তে যে চুম্বন-সুর্তি,
প্রাণ চায় কইতে,                         বুকে বুক বইতে,
.                ফাগ-রঙে গান লিখে অনুরাগ-সুর দি’
.                নীল নিশা নিংড়ে যে নেশা, আজি ফুর্তি !

.                নেচে নেচে আয় সখি দোল্ দুল ঝর্ণা,
.                রক্তিম সুখ নিয়ে চম্পক-বর্ণা |
আঁখিজল মোছ্ না,                          ঝুরুঝুরু জোছ্ না
.                 ঝরিয়ে ভরিয়ে দে অন্তর-ভর্ণা,
.                 আজ শুধু জ্যোত্স্নায় প্রেম-ঘর-করনা !

.                পাপিয়ারা পিউ-কাঁহা কহি কারে খুঁজ্ ছে,
.                কেতকীর কানে-কানে দখিনা কি পুছ্ ছে |
তারকারা মিটিমিটি                           লিখিছে প্রেমের চিঠি
.                এই লেখে এই ফের লজ্জায় মুছ্ ছে,
.                  মেঘেরা মলিন মুখ জ্যোত্স্নায় ধুচ্ছে !

.                 পারিজাত-পাপ্ ড়ি, আয় উড়ে চঞ্চল,
.                 আকাশের নীল পরী, ওড়া নীল অঞ্চল !
প্রজাপতি-পিয়া লো,                           তোর চোখে কি আলো !
.                  নেশাতে ঘায়েল্ করি’ পেয়ালায় মন ছল্ ,
.                  খুশীর ফড়িঙ্ আয় পাখ্ মেলে চঞ্চল !

.                    ****************  
.                                                                                  
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
ধরা-তে চরণ রাখি আকাশেরে লইব মাথায়
কবি অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
কল্লোল পত্রিকা, ১৩৩১ ফাল্গুন (ফেব্রুয়ারী ১৯২৫) সংখ্যা থেকে নেওয়া |


ধরাতে চরণ রাখি’ আকাশেরে লইব মাথায় |
.                মৃত্তিকার ধূসর ধূলায়
.        আমার এ ছিন্ন ম্লান শয্যাখানি বিরচিয়া,
.        ক্ষুধার্ত মাটির বক্ষ তপ্ত বক্ষে স্নেহে আঁকড়িয়া,
.        র’ব শুয়ে মার মৃত্যু-সুশীতল ম্লান অঙ্কটিতে
.                মার বুকে মরণের স্তন্য করি পান,
আর মোর প্রাণের প্রদীপখানি প্রেমে প্রজ্বলিয়া
.        দীপ্ত শিখা কল্পনায় লেলিহান---
.        পাঠাইব ঊর্দ্ধে হায় আকাশেরে পরশিতে |

বসুধার নেত্র-কোণে পুঞ্জিত করিয়া রাখি’ মোর অশ্রু গ্লানি,
.                অবশেষে অনন্ত আনন্দ-খনি
.                আকাশের নীলিমায়,
.        জ্যৈত্স্নার বিলোল সুর-সুরভি-সুধায়,
.        রৌদ্রের ঝুলন-দোলে রাখিব দুলায়ে
.                থাকি থাকি |
.        আমি যেন নামহারা তৃষাতুর পাখী
.        আকাশে মেলিয়া ডানা খুঁজিতেছি অজানারে
.                সঙ্গীতের স্বপ্ন-পারাবারে ;
.        তরপরে ক্লান্তপক্ষ নেমে আসি ধরণীর ধূলির কুলায়ে
.                ঊষার ধূসর বুকে হায়,
.        কন্ঠে আর গান নাই, হা হা বাজে ঝঞ্জার মৃদঙ্গে,
.                পঙ্কে পঙ্কে
জীবনের ভিক্ষাভাণ্ড পূর্ণ করি কলঙ্ক-কলুষ-কালিমায় !

কুৎসিত কামনাখানি ধূলাতে ঢাকিয়া রাখি,
প্রেমের আকাঙ্ক্ষা মোর অন্তহীন আকাশের ভালে
.                মেঘের বিচিত্রবর্ণে রাখি আঁকি’
স্নিগ্ধ শ্বেত শীতল চন্দনে |
.                কামনা যে-দীপখানি জ্বালে,
নিজে তাতে দগ্ধ হয়ে করে যে আলোক বিতরণ,
তাই এই মৃত্তিকার কুশ্রী ইচ্ছাখানি প্রেম হয়ে আকাশে যে
.                        করে আরোহণ
.                        প্রার্থনার মত !
এ ধরণী প্রসারিয়া ব্যগ্র বাহু ফণা শত শত
আমর এ শরীরেরে রয়েছে আঁকড়ি ;
কিন্তু ওই মহোজ্জ্বল আকাশ অবাক্
আমার আত্মারে আজি দিয়েছে যে ডাক,
.                জাগায়েছে প্রেমেরে আমার !
এ দেহে পেয়েছে খুঁজে ধরা তার বাসের আগার,
.        এ দেহে পেয়েছে তার কামনার খনি ;
.        আর ওই শান্তজ্যোতি স্নিগ্ধচক্ষু আকাশ আমার
.        প্রাণে প্রাণে খুলেছে যে প্রেমের বিপণী !
কামনা ও প্রেমের যে বাঁধিয়াছি এক বীণা-তারে |
ধরণী ও আকাশের আমি-ই যে মিলায়েছি মোর তপ্ত বুকে
.                                                তৃষাতুর ;
.                এ-নিকট আর ও-সুদূর !

.        একজন বিরহিণী নিদারুণ ভুখে
.        পিপাসার দূরন্ত উত্সুকে
.                পঙ্কেরে করিছে পান ;

আরজন তাম্রবর্ণ গেরুয়া করিয়া পরিধান
.                উদাস সন্ন্যাসী---
তপস্যার অগ্নিকুণ্ডে দগ্ধ করে তমিস্রার রাশি
.                বিস্তারিয়া একখানি দাহ |
আমি-ই ত’ আকাশ ও ধরণীর দিলাম বিবাহ
.        মোর এই অঙ্গের অঙ্গন-তলে ;
.                আনন্দ ও অশ্রুজলে
আমি-ই বাঁধিনু রাখী ধরণী ও আকাশের হাতে,
.                অপসৃত-অন্ধকার পবিত্র প্রভাতে
.                        মোর বক্ষ মাঝে |
.                সে-মিলন-বাদ্য সদা বাজে
.                মোর প্রতি স্নায়ুতে শিরায় !----

.        পিপাসা-জর্জর মোর বুকের পঞ্জর,
এক পার্শ্বে রাক্ষসের অন্য পার্শ্বে দেবতার ঘর !
.                মোর বুকে তারা আজ হ’ল প্রতিবেশী
.                যারা ছিল যাযাবর দূরের বিদেশী,
.                একসাথে তারা আজ বাঁধিয়াছে বাসা মোর বুকে
.        একজন যাতনায়, আরজন ক্লান্তিহীন সুখে
.                                        অপরূপ ;
.                একজন আগ্নি হ’ল আর জন ধূপ,
.                আমি হ’নু ধূলার ধূপতি |
.                        আমি যদি না থাকিতাম,
.        তবে হায় ঘুচিত না আকাশ ও ধরণীর এ বিরহ অবিরাম,
.                ঘুচিত না এই ব্যবধান |
আমি আসি পূর্ণ করি দিয়া গেনু উহাদের শূন্যতার স্থান
.                মুছায়ে ক্রন্দন |
.                        তাই শুনি দিবারাতি,
.                মোর বুকে বাসক-শয়ন পাতি

.                এই দুই বর-বধূ
.        করে নব-প্রেম-বার্তা, মৃদু গুঞ্জরণ,
.                আকাশ মধুপ হয়,
.                আর ধরা বক্ষে ভরি বয়
.                পঙ্কের কলুষ-মধু
.                                মৃত্যুর সঙ্গীত ;
উহাদের মিলনের যজ্ঞে আজ আমি হ’নু পুরোহিত ;
.                প্রসারিয়া প্রীতি
ডাকিয়াছি মোর ঘরে এই দুই ঘরছাড়া পথিক অতিথি |

.                    ****************  
.                                                                                  
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
সূর্য
কবি অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
কল্লোল পত্রিকা, ১৩৩২ বৈশাখ (এপ্রিল ১৯২৫) সংখ্যা থেকে নেওয়া |


হে মার্তণ্ড,
প্রদীপ্ত প্রচণ্ড,
আজি বারম্বার
তোমারে করিব নমস্কার |

.                হান হান রুদ্র অগ্নিবীণা,
.                আকাশে আবর্তি’  তোল’ ধ্বংসের ঝঞ্ঝনা,
.                রৌদ্রের প্রলয়,
.                হে দুর্জয় !
.                দীপকে আন্দোলি’
.                খেল আজ আগুনের হোলি ;
.                বিদ্ধ কর হে নির্মম, আকাশের বুক,
.                হে সূর্য, হে সর্বভূক্,
.                প্রলয়-উজ্জ্বল নেত্রে উদ্দীপ্ত আক্রোশে

দুর্দম সাহসে
তোমার ধনুকে দাও টান ;
কর খান্ –খান্
তিমিরের তীক্ষ্ণ যন্ত্রণায় ;
হে জ্বলন্ত, দুরন্ত জ্বালায়
উড়াইয়া দাও উচ্চে অগ্নির পতাকা,
বহ্নি-সুর-স্ফুলিঙ্গ-বলাকা !
হে প্রখর,
জ্যোতির শাণিত অস্ত্রে কর হে অর্জর
যাহা জড়
স্থবির অনড়
নিশ্চেতন ;
তোমার অগ্নির মন্ত্র কর উচ্চারণ
ভৈরব উল্লাসে,
ত্রাসে ত্রাসে
প্রকম্পিয়া পঙ্গু হিম কুঞ্চিত জরারে
হান মন্দ্র রুদ্র হাহাকারে,
ধ্বংসের মদিরা কর পান
বিবস্বান !
হান হান ঝনন- রণন,
ছিঁড়ে ফেল তমিস্রার সহস্র বন্ধন,
অশুচি জঞ্জাল,
হান করবাল !
হে উদ্ গাতা, তোমার জ্বলন্ত নেত্র হ’তে
প্রস্রবণ-স্রোতে
পাবক-পবিত্র উদ্বোধন
ঝরিয়া পড়ুক সারাক্ষণ
প্রতপ্ত ভাষায় ;
রুদ্র রুক্ষ ভীষণ ক্ষুধায়
আগুন উদ্ গারি,
বীণাযন্ত্র যন্ত্রণায় তোলহে ঝঙ্করি
হে দীপ্ত ভাষ্কর !

.                 হে উত্তপ্ত ভয়ঙ্কর,
.                 দিগম্বর,
.                 আন তব তীব্র তরবারি,
.                আকাশের বস্ত্র নাও কাড়ি
ধরিত্রীরে নগ্ন করি দাও,
হে নির্লজ্জ দুঃশাসন,
ছিঁড়ে ফেল কুহেলি-গুন্ঠন,
যাহা কিছু সঙ্গোপন
মুক্ত করি তাহারে দেখাও !
তব দগ্ধ আতপ্ত চুম্বনে
যৌবন উঠুক দুলি’ উচ্ছ্বসিয়া ধরিত্রীর স্তনে |
সঙ্কোচ লজ্জিত ম্লান যত ব্যথা জমেছিল শীতে,
বাষ্প হয়ে যাক্ উড়ে তব সৌম্য নয়ন-ইঙ্গিতে |
আন আন অগ্নির ঝটিকা,
মরণের যজ্ঞে জ্বাল যৌবনের দীপ্ত হোমশিখা
হে পবিত্র !
রহস্য যবনিকা
ছিন্ন কর দীর্ণ কর সব কুজ্ঝটিকা,
হে নির্মম
অমিতবিক্রম !
লুক্কায়িত যা কিছু লজ্জায়,
উগ্র মত্ততায়
তাহারে প্রদীপ্ত কর তোমার জ্যোতিতে ;
বুকের শোণিতে
রঞ্জিত সুন্দর কর তাহার কলঙ্ক !
নটরাজ হে উলঙ্গ,
ছন্দি তোল বহ্নিসুরে রৌদ্রের বিষাণ,
জ্যোতিষ্মান্,
নমো নমো নমো হে কল্যাণ !

.                    ****************  
.                                                                                  
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
বিরহ            
কবি অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
কল্লোল পত্রিকা, ১৩৩২ আষাঢ় (জুন ১৯২৫) সংখ্যা থেকে নেওয়া |


ওগো প্রিয়া,
শ্যামলিয়া,
মরি মরি,
অপরূপ আকাশেরে কি বিস্ময় রাখিয়াছ ধরি’
নয়নের অন্তর-মণিতে ; নীলের নিতল পারাবার |
বাঁধিয়াছ কি অপূর্ব লীলাছন্দে জ্যোতি মূর্ছনার
.                        সুকোমল স্নেহে |
মরি মরি কি আনন্দ রচিয়াছ তনু        সুশ্যাম স্নিগ্ধ শুচি দেহে
সুগন্ধ সুষমায়
পিপাসার দারুণ ব্যথায়
অহর্নিশি ভঙ্গুর ভাণ্ডে কি অমৃত আনিয়াছ বহি ;
.                        রহি রহি
কেমন বর্ণ কি আনন্দ কম্পমান অধর সীমায় !
পাখির পাখায়
দেহের প্রদীপখানি         আনন্দেতে প্রজ্বলিয়া,
.                        সৌরভে সৌরভে,
এলে প্রিয়া
লীলামত্ত নির্ঝরের ভঙ্গিমা-গৌরবে
শিহরিয়া ধরিত্রীকে,
আনন্দের স্ফুলিঙ্গ স্খলিয়া দিকে দিকে
মুহুর্মুহু !
আলোক-নির্মাল্য ভাসে পুণ্য তব শুভ্র করতলে |
শ্রাবণের লাবণ্যের মৌন অশ্রু জলে
মমতায় বাঁধিয়া রাখিয়া,
বক্ষের ভাণ্ডারে কোন দগ্ধ দুঃখ কিম্বা তৃপ্তি শান্তি স্নেহ নিয়া
.                                এলে প্রিয়া
.                        বৈশাখের প্রভাতের মত |
আমি শুধু ভবি বসে’ বসে’
বেদনা-বিধৌত দুঃখ মলিন প্রদোষে
.                        আকাশের স্তিমিত তন্দ্রায়,---
অন্তহীন যে অক্লান্ত বিরহ-ব্যথায়
আচ্ছন্ন হইল মোর পৃথিবী, আকাশ,
অন্ধকার, রৌদ্র, বৃষ্টি, বাত্যা, মন্দ ফাল্গুন-বাতাস,
.                        সমুদ্রের কল্লোল-উচ্ছ্বাস,
নক্ষত্রের জ্যোতি-স্বপ্ন আনাগোনা পথ,
.        এ সৌরজগৎ,
.        ধ্বংসলীন নামহারা সদ্যোজাত  
.        সে কি প্রিয়া, তোমার বিরহ ?
.                                      অহরহ
বিরহের মেঘে এ যে অশ্রুর আষাঢ় ঝরে প্লাবিয়া
সে কি শুধু তোমা তরে, প্রিয়া,
ব্যথার লেলিহ তীক্ষ্ণ কাঁপে যে পিপাসা এই
.        সে কি শুধু চায় তোমারেই
.                তোমারেই করে বিবদনা ?
.                মোর এই নিজ বেদনা ?
আজ যদি প্রচণ্ড উত্সুকে
.        সৃষ্টির উন্মত্ত সুখে
তোমার ওই বক্ষখানি দ্রাক্ষাসম নিষ্পেষিয়া লই মম বুকে,
.        কানে কানে মিলনের কথা কই ;
অধরে অধরে রাখি ধরিত্রীর অঙ্কতলে লীন হয়ে রই,
তোমার দেহের শুচি মধুরীর মঞ্জু সমরোহে
আনন্দ-মদিরা-মোহে
আচ্ছন্ন করিয়া দাও স্পর্শে, গানে, চুম্বনে, ব্যথায়,
.        সুখঘন ম্লান-স্তব্ধতায়,
.        তবে কি তোমার পাওয়া হয়ে শেষ ?
.        পূর্ণিমার ইন্দ্রজালে রচিবে আবেশ
.        অনাদি আকাশ,
.        দক্ষিণের নিমন্ত্রম নিয়ে নিয়ে দক্ষিণা বাতাস
.        আসিবে মালতী চাঁপা যূথিকার বনে,
.        স্বপ্ন হতে জাগাইবে চুম্বনে চুম্বনে,
.        বুকের গুন্ঠন খুলি কিশোরীরা বিলাবে সৌরভ
.        দক্ষিণের দিকে দিকে |
.        তুমি, প্রিয়া, মোর পানে চেয়ে অনিমিখে
সহসা জড়াবে কন্ঠে স্নিগ্ধ বাহু দুটি, পেলব |
.        বন্টন করিবে  কাঁধ হতে বুকে,
কভু মনসুখে ব্রীড়ায় কৌতুকে !
তোমরে পাওয়া শেষ হয়ে যাবে কি গো প্রিয়া ?
.        আবার কভু বা আন্দোলিয়া
.                ঝরঝর বরিষণ,
.                বাঁধি উতলা শ্রাবণ
.                        সুখে দেবদারুবনে |
.                গগনে গগনে
বাজিয়া উঠিবে মত্ত যৌবনে গুরুগুরু ;
তেমনি মোদের বক্ষ   আনন্দে কাঁপিবে দুরুদুরু
.                বর্ষার সজল সুষমায়
.        তপ্ত এই সান্নিধ্যের সুখ-মত্ততায়
.        আনন্দ বন্টন লুব্ধতায়
.        কাটিবে রজনী বারে বারে ;
তবে, প্রিয়া সাঙ্গ হবে পাওয়া কি তোমারে ?
না না, তবু, দেখি চেয়ে অহরহ,
.        কি প্রকাণ্ড প্রচণ্ড বিরহ
.                ক’রে আছে গ্রাস
আমাদের মাঝেকার অনন্ত আকাশ |
.        নিদারুণ নির্মম শূন্যতা
.        একান্তে বহিছে তার ব্যঞ্জনার ব্যথা
.                মুহ্যমান !
এই মোর জীবনের সর্বোত্তম সর্বনাশী ক্ষুধা
মিটাইতে পারে হেন নাহি কোন সুধা
.        দেহে প্রাণে ওষ্ঠে প্রিয়া তব ;
.                অভিনব
.        এ বিরহ আকাশের সমান –বয়সী |

.        ভাবি বসি
তোমারেই শুধু আমি ভালবাসি নাই,
.        তোমারে ত সদাই হারাই
জীবনের প্রতি রক্ত বিন্দু দিয়া যারে চাই |
যুগে যুগে চাহিয়াছি আমি যারে,
বাসিয়াছি ভাল যারে গ্রহে গ্রহে তারে
.        আজি এই নব জন্মে এই         বসুধায়
.        বিরহের তীব্র হাহাকারে
.        তাহারেই         বেসেছি   যে ভাল !
.        অন্তরজ্যোতিতে দীপ্ত যে জ্বালাল
পূরবের                দিক্-দিগন্তে আনন্দের শিখা,
জ্যোত্স্না চন্দনে স্নিগ্ধ যে আঁকিল টীকা
.        আকাশের ভালে,
ফাল্গুনের স্পর্শ-লাগা মুঞ্জরিত নব ডালে ডালে
.        সদ্যফুল্ল কিশলয় হয়ে
.        যে হাসে শিশুর হাসি,
কল্যাণী নারীর মত একখানি দিত্সা বয়ে
যে তটিনী কলকন্ঠে উঠিছে উচ্ছ্বাসি
.                বক্ষে দিয়া দুরন্ত পিপাসা,
.                সে আজি বেঁধেছে বাসা
.        হে প্রিয়া, তোমার মঝে |
তাই শুনি মুহুর্মুহু তব দেহে ঝঙ্কারিয়া বাজে
.                অসীমের রুদ্র মহাগান,
.        ঘুচিতে চাহে না তাই এই ব্যবধান |
.                মরি মরি
.        তোমারে হয় না পাওয়া তাই শেষ করি |
.        চেয়ে দেখি অনিমিখ
.        তুমি মোর অসীমের সসীম প্রতীক,
.        ক্ষুদ্র ওই দেহের আড়ালে কি আশ্চর্য সাবধানে
.        বাঁধিয়াছ মহাকাশের ভগবানে !
তাই
.        শুধু আমি তোমাদেরই নিয়া
.        উত্তপ্ত নাহি হই
অহর্নিশি ব্যথা কাঁদে, কই কই
.                কোথায় সে ভগবান
.                কোথা পাব দূরের সন্ধান ?

.        হে ঈশ্বর তোমারে তাই
.                বারে বারে চাই
খুঁজিবে সে ভগবানে ;
.        তাই প্রাণে প্রাণে
বিরহের দগ্ধ কান্না        ফুকারিয়া ওঠে অবিরাম,
তাই মোর সব প্রেম হইল প্রণাম |

.                    ****************  
.                                                                                  
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
সুদূর
কবি অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
কল্লোল পত্রিকা, ১৩৩২ শ্রাবণ (জুলাই ১৯২৫) সংখ্যা থেকে নেওয়া |


.        হে অবগুন্ঠিত মৌনী, অনাদ্যন্ত, বিরহ-বিধুর,
.                                অপরূপ সুন্দর সুদূর |
মোরে তুমি ডাক দিলে নিদ্রহীন নক্ষত্রের নিঃশব্দ ভাষায়,
যেথা রাত্রি বিরহিণী  প্রেমোজ্জ্বল প্রভাতের জ্যোতির আশায়
.                চলে’ যায় দিগন্তের শেষে,
যেথা নব-জীবনের বিদ্যুৎ খেলিছে সদা নৃত্যপরা মরণের কেশে,
.        যেথা বাজে এক সঙ্গে নৃত্যচ্ছন্দ জীবন মৃত্যুর,
.                                সেথা ডাক দিয়েছে, সুদূর !         


অতৃপ্তির অগ্নিশিখা জ্বলাইলে মর্মের প্রদীপে,
.                                ক্ষুদ্র এ আয়ুর দুঃখ-দ্বীপে |
সীমায় সঙ্কীর্ণ যাহা, সরল সহজলভ্য তাহে নাহি সুখ,
তাই ক্ষুদ্র বাহু মেলি নিরন্তর আলিঙ্গিতে রয়েছি উত্সুক,
.                হে আকাশ নিঃসঙ্গ বিরহী,
তাই শুধু ইচ্ছা হয় সুদূর নীলিমা হয়ে তোমার মহিমাটুকু বহি,
.        নব নব বর্ণে বর্ণে আঁকি মোর বিরহ-বারতা,
.                                  ঘুচাইয়া লই নিঃসঙ্গতা !

সেথা যাব তব ডাকে বন্ধহীন নিত্য নিরুদ্দেশ,
.                                ওগো মোর চঞ্চল, অশেষ !
আকন্দ কুন্দের গন্ধ মৃত্যুর আনন্দে যেথা মেশে অন্ধকারে,
যেথায় তারার দল লক্ষ্যহীন পথে ছোটে দূর অভিসারে,
.                যেথা সব দীপ নির্বাপিত,
রহস্য-রজনী সেথা করিয়াছে নব নব বিস্ময়ের অঞ্চল বিস্তৃত ;
.        প্রাণের বুদ্বুদ যেথা সৃষ্টি করে সৃষ্টির খেয়ালি,
.                                যেথা নিত্য মৃত্যুর দেয়ালি !

তব ডাকে নিকটেরে ব্যঙ্গ করি, যাব বন্ধহীন,
.                                ওগো দূর চির-সম্মুখীন !
হেরিব তোমার রূপ, হে অরূপ, মরণের খুলিয়া গুন্ঠন,
আমার বিরহ দিয়া তোমার বক্ষের দ্বার করি উদ্ঘাটন,
.                সেথা দেখি বিপুল বেদনা,
সেথা নিত্য বিরহের গুঞ্জরণে মোর তবে উচ্ছ্বসিছে তোমার প্রার্থনা ;
সেথা আমি তব কাছে অমূল্য ও দুষ্প্রাপ্য, সুদূর,
.                                অনাদ্যন্ত, বিরহ-বিধুর !

দিকে দিকে লিখে রাখ তব গাঢ় বিরহ-লিপিকা,
.                                হে মধুর দূর-মরীচিকা !
মোরে চাও এই কথা আঁক, কবি, সে সৃষ্টির রহস্য-অক্ষরে,
তাই আমি দিবারাত্রি চঞ্চল অশান্ত, তাই চলি তব তরে
.                বিরহিণী বধূ স্বয়ম্বরা,
বক্ষে নিয়া আকাঙ্ক্ষা-দুলানো দুঃখ-স্রোতস্বিনী নিত্য উদ্বেলিত কলস্বরা ;
তবু হে অদৃশ্য দূর, নাহি পাই মিলনের সাড়া,
.                                শুধু কর চলার ইসারা !

তাই যাত্রা, যাত্রা তাই নব নব জীবন-মৃত্যুতে,
.                                গান গাহি বিরহ-বেণুতে !
প্রাণের প্রাচুর্য নিয়া তৃণ যেথা যাত্রী হল প্রবল বিদ্রোহী,
জ্যোতিষ্কের যাত্রী যথা এ-যাত্রার জ্বলন্ত আনন্দখানি বহি,
.                তেমনি আমার অভিযান,
অনিশ্চিত চলিয়াছি বক্ষে জ্বালি চিররাত্রি দুঃখের প্রদীপ অনির্বাণ ;
.        মম চিত্তে তব তরে তাই নিত্য ব্যথার উত্সব,
.                                হে সুদূর, দুর্লভ বল্লভ !

.                    ****************  
.                                                                                  
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
চিত্তরঞ্জন দাশ
কবি অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
কল্লোল পত্রিকা, ১৩৩২ ভাদ্র (অগাস্ট ১৯২৫) সংখ্যা থেকে নেওয়া |


যেই প্রাণ-মহানন্দ ছুটিয়াছে গ্রহ হতে তৃণের তরঙ্গে,
আগ্নেয় পর্বতোদ্গারে, বিহঙ্গে আর শার্দূলে, ভুজঙ্গে,
সূর্যের তূর্যের ছন্দে, উল্বাসিনী কল্লোলিনী-হিল্লোল-লীলায়,
নটিনী সে ঝটিকার উন্মত্ত নর্তনে, তারে তুমি বেঁধেছিলে
তোমার দুর্বল ক্ষীণ মৃণ্ময় দেহের প্রতি স্নায়ুতে শিরায়
ক্ষুদ্র এই আয়ুকুণ্ডে ; রক্তে রক্তে আবর্তিয়া তুমি তুলেছিলে
শক্তি-মুক্তধারা ! তাই শৃঙ্খলের আলিঙ্গন করি উল্লঙ্ঘন
কৃত্রিমেরে চূর্ণ করি’ বাহিরিয়া এলে হে সন্ন্যাসী বিবসন,
জ্বলন্ত জটার তলে গঙ্গার তরঙ্গ নিয়া এসেছিলে, শিব,
সে তরঙ্গ রঙ্গ ভঙ্গে মূর্ছাহত মৃত্তিকার নিষ্প্রভ নির্জীব
যত গুল্ম তৃণ-বত্স স্তন্য পিয়া’ স্কন্ধে তুলি’ প্রাণের পতাকা
করেছিল যাত্রা হায় দুর্ধর্ষ উদ্ধতভরে ; বীজের বলাকা
তব মুক্তি-বীজমন্ত্রে জন্ম লভি’ মৃত্তিকার গর্ভ দীর্ণ করি’
রৌদ্রের প্রসাদ পেল | তোমার দৃষ্টির ত্রাসে উঠিত শিহরি’
হে বব্ধনহীন বাত্যা, হে আদিত্য, যত মিথ্যা দৈত্য—কারাগার,
হে বিভঙ্গ, তবপক্ষ-সঞ্চালনে চূর্ণ যত পিঞ্জরের দ্বার ;---
কে তোমা রাখিবে রুধি ? রুধিরে বারিধি তব উন্মত্ত উধাও !
হে করাল, হে কালবৈশাখী, অবশেষে তাই তুমি ভেঙ্গে যাও
ভঙ্গুর দেহের কারা চিরমুক্তি-তীর্থমুখে, ওগো তীর্থম্ভূত !
মন্দার-সুগন্ধ নিয়া প্রাণানন্দে বন্ধহারা নন্দন-বিচ্যুত
এসেছিলে মর্ত্যভূমে ; হিমালয় হল তব নব পীঠস্থান
হে মহেন্র মানবেন্দ্র | প্রাণের আগুন জ্বালি তপ্ত লেলিহান
খাণ্ডব দাহন করি’ দানবেরে দলিয়াছ তাণ্ডবে তাণ্ডবে
জ্বলজ্জটা হে ধূর্জটি ! হে দুর্জয় শম্ভু, তব শঙ্খ-হাহারবে
জাগালে বাত্যা ও বন্যা | হে উদাত্ত উত্তাল বিশাল অম্বুনিধি,
কে মাপিবে অঙ্ক কষি তব ভাব-উচ্ছ্বসিত প্রাণের পরিধি,
শবের শ্মশানতলে তব নগ্ন তপস্যার কে বোঝে মহিমা ?
তুমি যে সমুদ্র রুদ্র, তাই লঙ্ঘি’ ক্ষুদ্র দিউ বদ্ধ তটনীমা
বিদীর্ণ বিকীর্ণ করি আপনাদের চতুর্দিকে বিচূর্ণ করিয়া
পরিপূর্ণ পান করি প্রাণের মদিরা, এলে তুমি উত্পাটিয়া
মহীদ্র ও মহীরুহ | হে বিদ্রোহী মেঘনাদ, হে নিত্য-জাগ্রত
আবার প্রশান্ত তুমি নিশান্তের স্নিগ্ধজ্যোতি আকাশের মত,
তোমার নয়নে জ্বলে শত সূর্য আর শত শতদল সৌরভ-মাধুর্যে,
বুকে মরুভূর জ্বালা, আর তৃণ-মঞ্জরীর শ্যামল প্রাচুর্যে
নিত্য নিত্য নব নব জন্মের উত্সব | তুমি কৃষ্ণ চক্রধারী
হনি অক্ষৌহিণী সেনা, আমার প্রেমের বেণু হে কবি, ফুকারী’
আনন্দের বৃন্দাবন করিলে সৃজন ; গীতার উদ্গাতা নব,
শিখাল ব্রহ্মণ্যতেজ অকর্মণ্যে, বহ্নিদীপ্ত রুদ্র অস্ত্র তব |
ভুজঙ্গেরা তব অঙ্গস্পর্শ লভি’ হয়েছে যে লবঙ্গ-লতিকা,
শৃঙ্খল হয়েছে স্বর্ণ, ধরা দেয় মায়াবিনী মরু-মরীচিকা
তোমার দৃষ্টির তলে ; ওগো ক্ষিপ্ত দৃপ্তজ্বালা দীপ্ত সর্বভূক,
ধূলায় নামিয়া আসি, হে সন্ন্যাসী, ভিক্ষুশ্রেষ্ঠ, সেজেছ ভিক্ষুক,
কমণ্ডলু ভরিযাছ মুক্তি-তীর্থোদকে, করিয়াছ প্রাণ-ভিক্ষা
বজ্রেতে বোধন যার, কন্টক তপস্যা তীব্র, দুঃখ বহ্নি-দীক্ষা,
যে প্রাণ প্রহ্লাদ সম দূরন্ত আহ্লাদে নাচে উত্তপ্ত কটাহে,
তারে তুমি ডাক দিয়া ফিরিয়াছ পথে পথে অশ্রান্ত উত্সাহে
ভূষাহীন ওগো মুসাফের ! আহর্নিশি ওগো তাই তুমি ঋষি-রাজ,
মুক্তি চেয়েছিলে, তাই সঞ্চিত নিষ্ফল যত ঐশ্বর্য্যের লাজ
নিক্ষেপিয়া ঘৃণ্য আবর্জনা সম সেজেছিলে নগ্ন নিঃসম্বল
মুক্তির নিঃশ্বাস ফেলি ;  তাতেও ছিল না তৃপ্তি, তাই অনর্গল
প্রাণের পবিত্র হবি রূদ্র মুক্তি যজ্ঞাগ্নিতে আহুতি দিয়াছ
দেহের বন্ধন টুটি’ চিরমুক্তিতীর্থ তুমি তাই লভিয়াছ |
এ আয়ুর আয়তনে কে তোমা’করিবে বন্দী, হে দুর্ধর্ষ বীর,
মৃত্যুতেও নাই নাই তোমার সমাপ্তি, কবি, তুমি যে অস্থির
সৃষ্টির যাত্রার ছন্দে মিশাইলে তব মত্ত নৃত্যের কিঙ্কিনী,
মৃত্যু-অমাবস্যা মাঝে বহাইলে বিদ্রোহের প্রাণ-প্রবাহিনী,
অজস্র অশ্রুর সাথে সহস্র আনন্দ ! তুমি বঙ্গের অঙ্গনে
আরম্ভিয়া গেলে যজ্ঞ, সেই অগ্নি উল্লম্ফিয়া উঠিছে গগনে
হেরিতে তোমার মুখে সর্বশেষ বিজয়ের নিঃশব্দ আহ্লাদ !
মৃত্যুতে, হে পুরোহিত, রেখে গেলে এই মন্ত্র, এই আশীর্ব্বাদ !

.                    ****************  
.                                                                                  
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
ঝটিকা
কবি অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
কল্লোল পত্রিকা, ১৩৩২ কার্তিক (অক্টোবর ১৯২৫) সংখ্যা থেকে নেওয়া |


মুক্ত করে দিনু মোর রুদ্ধ দ্বার বন্ধ বাতায়ন,
এস দৃপ্ত প্রভঞ্জন,
উচ্ছৃঙ্খল দুর্মদ বিদ্রোহী
দুরন্ত আনন্দখানি বহি,
চূর্ণ আজি কর গো আমারে ;
মৃত্যুর ফুত্কারে
নির্বাপিত কর দীপ, ভগ্ন কর ভাণ্ডের ভাণ্ডার |
হে ঝটিকা, অতিথি আমার,
নটবর, হে ভোলা ভৈরব,
শুরু কর ধ্বংসের তাণ্ডব
মোর সুপ্ত জীর্ণ বক্ষতলে,
স্পন্দনে স্পন্দনে তারে
আন্দোলিয়া তোল তুমি ক্রন্দনের আনন্দ-কল্লোলে !
ক্রদ্ধ অহঙ্কারে
বন্ধনেরে পদতলে করি’ নিষ্পেষণ,
এস মোর ক্ষ্যাপা, বিবসন,
দৃঢ়হস্তে কাড়ি যত সঞ্চয়ের মিথ্যা আড়ম্বর
এস হে ঈশ্বর,
চূর্ণ করি’ প্রাচীরের ক্ষুদ্র পরিসীমা
সুন্দর ভীষণ তব উলঙ্গ মহিমা
আমারে দেখাও ;
মোরে তুমি নিঃসম্বল নগ্ন করি’ দাও
বন্ধহীন বিরহী বৈরাগী ;
প্রলয়ের প্রেমে অনুরাগী
এস হে অপরিমিত, অশান্ত, ব্যাকুল,
মোরে কর গৃহহীন পথের বাউল
হে চির-পথিক সহচর !
হে মোর অশেষ,
নিত্য অগ্রসর,
অনির্ণীত, এস নির্নিমেষ,
নেত্র হতে মুছে নিয়া নিদ্রার কুজ্ঝটি
এস হে ধূর্জটি !
ওই যেথা শুরু হল প্রলয়ের আনন্দ-উত্সব,
তোমার তাথৈ-থৈ নৃত্যের তাণ্ডব
সেথা মোরে নিয়ে যাও
নিরুদ্দেশ করি’ ;
হাত ধরি’ ধরি’
নটরাজ, মোরে তুমি নাচিতে শেখাও
তোমারি বাত্যার তাল তালে,
মোর পায়ে বাঁধি দাও ঝঞ্ঝার মঞ্জীর |
এস হে অস্থির,
বিদ্রোহের জয়টীকা পরাইয়া মোর দীপ্ত ভালে
মোরে তুমি নিয়ে যাও,
হে উধাও,
যেথায় বজ্রের নিত্য বিজয়-উল্লাস,
বিদ্যুতের তীক্ষ্ম অট্টহাস,
যেথা পান্থ নিরাশ্রয় মেঘেদের যাত্রা-সমারোহ,
মিশাইব সেথা মোর প্রাণের বিদ্রোহ
প্রতন্ত, প্রচুর |
এস দস্যু দুর্দান্ত, নিষ্ঠুর,
মোরে তুমি ছিন্ন করে’ নিয়ে যাও
তোমার কেতন-তলে ;
সেথা নিত্য রুদ্র কোলাহলে
তব সাথে দিব করতালি |
এস-কাল-বৈশাখী বৈকালী,
শিষ্য করে’ নিয়ে যাও মোরে হে সন্ন্যাসী,
সর্বনাশী
তোমার যাত্রায় ;
আমার পায়ের ছন্দ ধ্বনিয়া উঠুক তব
বন্ধহীন নৃত্যের লীলায় |
চূর্ণ করি’ অচলায়তন,
সজ্জার লজ্জার হ’তে মুক্তি দাও মোরে, বিবসন,
নিয়ে যাও জ্যোতিষ্কে জ্যোতিষ্কে গ্রহে সূর্যে,
নব নব ছন্দের মাধুর্যে !

.                    ****************  
.                                                                                  
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
রম্যাঁ রলাঁ
কবি অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
কল্লোল পত্রিকা, ১৩৩২ পৌষ, ৯ম সংখ্যা থেকে নেওয়া |

বিলাসের স্তব নহে, রচিয়াছ বেদনার বেদ,
হে সৌম্য, সন্ন্যাসী, তুমি গাহিলে সাম্যের সামগান ;
নর-নারায়ণে তুমি হেরিয়াছ অখণ্ড অভেদ,
কলহের হলাহল ফেলি’ কর শান্তি-সোম-পান !
দুঃখের দহন-যজ্ঞে বোধিসত্ত্ব লভিলে নির্বাণ,
তোমার চরণ স্পর্শে মুক্তি পায় সভ্যতা অসতী ;
ভূমারে চিনেছ তুমি অমৃতের পুত্র মহীয়ান,
ব্যাথার তুষার পূঞ্জে বহাল আনন্দ-সরস্বতী !
লহ এই ভারতের অকুন্ঠ অম্লান-নম্র প্রেম ও প্রণতি |

.                    ****************  
.                                                                                  
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর