*
বাসর-রাত্রি
কবি অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
কল্লোল পত্রিকা, ১৩৩২ ফাল্গুন (ফেব্রুয়ারী ১৯২৬) সংখ্যা থেকে নেওয়া |


আজি এ মাধবী রাতে যে প্রফুল্ল ফুল-শয্যা করেছি রচনা,
অন্তরালে সঞ্চিত রয়েছে কত ক্ষুধার্তের বঞ্চিত কামনা---
.        শীতার্ত বিবস্ত্র কত পীড়িতের করুণ তিয়াষ,
.        মুমূর্ষু মূর্ছিত কত হতাশের শেষ অভিলাষ !
গৃহহীন পথিকের তন্দ্রাহীন নিষ্ঠুর রোদন
সিক্ত করে’ দেয় মোর ব্যাকুল-বকুল-গন্ধ বাসক-শয়ন ;
.        সদ্যোজাত যত শিশু মরেছিল হিম মৃত্তিকায়,
.        আমার গলার মালা জ্বলে’ গেল তাহাদের বুকের জ্বালায়
.                                             পর্ণপুট-স্ফুটন-ব্যথায় !

যে অমূল্য বস্ত্রখানি করিয়াছি পরিধান আজ,
তার মাঝে হেরি আমি বহুশত রমণীর লাজ,
.        কুরূপ কঙ্কালসার পুরুষের কুশ্রী কাতরতা,
.        লালসা-লাঞ্ছিত কত বিধবার বিষণ্ণ ব্যর্থতা ;
.                কত গর্ভ-ধারিণীর বীভত্স কাকুতি,
.        কুসুম কুসুম-সম কুমারীর কদর্য বিচ্যুতি ;
.                কত শত সতীত্বের নির্মম নির্লজ্জ বলিদান,
.                কত মা’র কামের নিশান !

.        যত দুঃখী ভিখারিণী চীর ফেলি সেজেছে পতিতা,
.        সর্বঅঙ্গে জ্বালিয়াছে নব নব পিপাসুর চুম্বনের চিতা ;
নিজেরে উলঙ্গ করি নারী গ্রীবাতটে বেঁধেছিল ফাঁসি,
.                তাহাদের প্রেত-অট্টহাসি
.        এ-বস্ত্রের প্রতি সূত্রে উঠিছে উচ্ছ্বাসি’ |
.        বীভত্স পাপের আর পিপাসার গ্রন্থ --- এ বসন,
.        প্রতি সূত্রে শোনা যায় কতদূর দূরান্তের অশান্ত ক্রন্দন |
আমার মুখের কাছে তুলিয়াছি পরিপূর্ণ যে অন্নের গ্রাস,
তার মাঝে শুনি যেন কত শত ক্ষুধার্তের দীন দীর্ঘশ্বাস |
.        শীর্ণ দুটি হাত মেলি তারা সবে উত্সুক উত্সাহে
.        মোর কাছে এক মুষ্টি ভাত ভিক্ষা চাহে ;
যত শিশু জননীর শুষ্ক জীর্ণ নিঃশেষিত স্তনে
বিন্দু দুগ্ধ পেল না’ক তৃষ্ণাতীক্ষ্ণ দংশনে দংশনে ;
.        দুর্ভিক্ষে জননী যত পুত্রের মুখের গ্রাস নির্বিবাদে কাড়ি,
.        তাতেও না পেয়ে তৃপ্তি নিজের গর্ভের পুত্রে স্বহস্তে বিদারি’
.                  ক্ষুণ্ণিবৃত্তি করে আপনার,
.        ভেবে আসে সেই সব শেফালি-শোভন শুভ্র শিশুর চীত্কার |
জঠরজ্বালায় অন্ধ যত নারী করিয়াছে শরীর বিক্রয়,
ক্ষুধার অসহ্য মূল্যে করিয়াছে সতীত্বের সুধা-বিনিময়,
.        সাজিয়াছে ঘৃণ্য বারঙ্গনা,
.        বুকে জ্বালি সন্তানের সন্তপ্ত কামনা ;
বন্ধ্যা গিরি-মৃত্তিকায় আপনার স্বেদবিন্দু করিয়া সেচন,
নির্ভীক কৃষাণ যত সুশ্যামল প্রাচুর্যের করি উদ্ঘাটন
.                উপবাসী রহে আপনারা,
.        সবুজের চারিধারে প্রসারিয়া প্রজ্বলিত ক্ষুধার সাহারা ;
.                তাহাদের বিদীর্ণ বিলাপ
.                হানে অভিশাপ !
.        অন্ন আর রোচে না’ক, প’ড়ে থাকে একান্ত বিস্বাদ,
.        যেন শুধু মনে হয় করিয়াছি ঘোর অপরাধ |
আমার শকট চলে রাজপথে মহোল্লাসে মাতি,
মনে হয় যেন কারা চক্রতলে বুক দেছে পাতি—
.        কোটি কোটি পদাহত ধূলায় বিলীন ;
তাদের সকল অশ্রু শুষ্ক স্তব্ধ উদাসীন প্রস্তর কঠিন !
.        কলুষিত নগরীর ভূষা-কৃত্রিমতা
লুকাইয়া রাখিয়াছে অগণন জীবনের ভীষণ ব্যর্থতা ;
এর যান, পথ, সেতু, অট্টালিকা, খনির খনন,
লুকায়েছে সংখ্যাহীন মানবের প্রাণ-বিসর্জন ;
.        প্রাচীরের প্রতিটি প্রস্তর
.        যেন কার বুকের পঞ্জর !
ওগো প্রিয়া, উদাসিয়া, তোমারে যে করেছি চুম্বন,
প্রচুর প্রবল সুখে তব ওই দেহলতাখানি
.                ক্ষুধাক্লিষ্ট তপ্ত বুকে টানি’
.                করি যে নিবিড় নিপীড়ন,
.        জান তুমি, কত মূল্য তার ?
কোটি ব্যর্থ প্রেমিকের মূক হাহাকার !
যাহারা না পেয়ে প্রেম ব্যভিচারী সেজেছে পিশাচ,
মণির বিহনে যারা কুড়াইল কামনার কাচ ;
.        নিদ্রাহীন রাত্রি জাগি’ নেত্রে যারা নিরাশ্বাস ভরি’
.        স্তব্ধ এক জ্যোত্স্না রাতে চলে গেল আত্মহত্যা করি,
.                পঙ্কিল কদর্য রোগে পঙ্গু হল যারা,
.                অপ্রচুর প্রাণ নিয়ে যারা তৃপ্তিহারা ;
.        তাদের বুকের রক্ত--- যারা ব্যর্থকাম,
.        ওগো প্রিয়া, আমাদের মিলনের দাম |
তাই শুধু মনে হয় সব মিথ্যা, যেন মোর কাছে নাই তুমি,
আমি একা, ব্যর্থ, পঙ্গু, সঙ্গীহীন, হতাশ্বাস, নিঃস্ব মরুভূমি ;
.        শুধু খেদ, হাহাকার , তাপ, অশ্রুজল,
.        মোদের বাসর রাত্রি মলিন, বিফল !

.                    ****************  
.                                                                                  
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
কবি অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত-র কবিতা
*
মরুভূমি                       
কবি অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
কল্লোল পত্রিকা, ১৩৩২ চৈত্র (মার্চ ১৯২৬) সংখ্যা থেকে নেওয়া |


হে মরণ মূর্ছাহতা, পিপাসিনী, হে ভৈরবী মরু,
বাজাও বাজাও তব পিপাসার প্রচণ্ড ডমরু,
.                         যন্ত্রণার কর্কশ ঝঙ্কার ;
হে করালী, নৃত্য কর দাবদগ্ধ রৌদ্রের আহ্লাদে,
চিত্তেরে বিচ্ছুরি’ তোল বালুকা-বিক্ষিপ্ত আর্তনাদে,
.                        হান হান ধূলির ফুত্কার |
তৃষ্ণার অনলকুণ্ডে স্নান করি’ হে রুদ্রা তাপসী,
পবিত্র পাবক-স্তোত্র দিগ্বিদিকে তুলিছ উচ্ছ্বসি’
.                        দুর্দাম জ্বালায় জয়োল্লাসে ;
নবসূর্যে জন্ম দিলে আকাঙ্ক্ষার উদীপ্ত অগ্নিতে,
তৃষার নির্ঘোষ ঘোষ’ নিষ্ঠুর সে সূর্যের স্তুতিতে,
.                        নিদারুণ তপ্ত দীর্ঘশ্বাসে |
জলজ্জটা, বিবসনা, খুলেছ কৃত্রিম আবরণ,
বৈরাগিণী, দিয়াছ যে দুর্বল লজ্জারে বিসর্জন,
.                        কি সুন্দর জ্বলন্ত নগ্নতা !
বন্ধন বিচূর্ণ করি’ দেখায়েছ গুপ্ত ভয়ঙ্করে
বাহিরে এনেছ, প্রিয়া, লুক্কায়িত লোলুপ অন্তরে,
.                        বিস্তীর্ণ বিপুল ব্যাকুলতা |
হে নির্লজ্জা, জরাহীনা, আপনারে করি উন্মোচন,
দেখাইলে তৃষাদগ্ধ ভীষণ সে অনন্ত যৌবন,
.                        নবোদ্ভিন্ন পুষ্প কামনার ;
বক্ষ ভরি’ কার তরে সঞ্চিয়াছ বিস্তীর্ণ বিরহ,
বিদগ্ধ ললাটে নাহি বর্ষার সজল অনুগ্রহ,
.                        নাহি নাহি অশ্রুর আষাঢ় !
কোনো শষ্প তৃণাঙ্কুরে স্তন্য নাহি দিলে , হে পাষাণী,
হে বন্ধ্যা, তোমার বক্ষে দুর্ভিক্ষের হাহাকারখানি
.                        কাঁদে রুক্ষ রিক্ততায় ;
অতন্দ্র আকাঙ্ক্ষা জ্বালি’ ধ্যান কর কা’রে সন্ন্যাসিনী,
রৌদ্রের অক্ষরে লেখা দুঃখের অলক্ষ্য লিপিখানি,
.                        পাঠ কর তীব্র ব্যগ্রতায় !
মায়াবিনী, হে ছলনাময়ী মরু-ভূমি-মালবিকা,
বুকে কাঁপে দিশাহারা পথভোলা তৃষা-মরীচিকা—
আপনারে দেখাও স্বপন ;
হে প্রিয়া, পিপাসাক্লিষ্টা, কা’রে তুমি করিছ সন্ধান,        
হেথা এস দুঃখ নিয়ে, এই বুকে অগ্নি-অনির্বাণ
.                        পাতিয়াছি বাসক-শয়ন !
হেথা এস এই বুকে তোমার বিরহখানি নিয়া,
নিগূঢ় সৌন্দর্যখানি নগ্নতায় দাও প্রজ্বলিয়া
.                        অশ্রুহীন অশান্ত উত্সাহে ;
বন্ধহীন বেদনার দীর্ঘশ্বাসে হান সর্বনাশ,
বহ্নি-প্রিয়া, ধন্য কর, ---আনন্দ-বিদীর্ণ অট্টহাস---
.                        প্রত্যাশার প্রখর প্রদাহে !

.                    ****************  
.                                                                                  
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
গাব আজ আনন্দের গান
কবি অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
কল্লোল পত্রিকা, ১৩৩৩ আষাঢ় (জুন ১৯২৬) সংখ্যা থেকে নেওয়া |


মৃন্ময় দেহের পাত্রে পান করি’ তপ্ত তিক্ত প্রাণ,
.                গাব আজ আনন্দের গান |

বিশ্বের অমৃত-রস যে আনন্দে করিয়া মন্থন,
লভিয়াছে নারী তার সুখোদ্বেল তপ্ত পূর্ণ স্তন ;
লাবণ্য-ললিত তনু যৌবন-পুষ্পিত পূত অঙ্গের মন্দিরে,
রচিয়াছে যে আনন্দ কামনার সমুদ্রের তীরে,
.                সংসার শিয়রে ;---
যে আনন্দ আন্দোলিত সুগন্ধ-নন্দিত স্নিগ্ধ চুম্বন-তৃষ্ণায়,
বঙ্কিম গ্রীবার ভঙ্গে, অপাঙ্গে, জঙ্ঘায়,
লীলায়িত কটিতটে ললাটে ও কটু ভ্রূকুটিতে,
.                চম্পা অঙ্গুলিতে ;---
পুরুষ-পীড়নতলে যে আনন্দে কম্প্র মুহ্যমান,
.                গাব সেই আনন্দের গান |
যে আনন্দে বক্ষে বাজে নব নব দেবতার পদনৃত্যধ্বনি,
যে আনন্দে হয় সে জননী |
যে আনন্দে সতেজ প্রফুল্ল নয়, দম্ভদৃপ্ত, নির্ভীক, বর্বর,
ব্যাকুল বাহুর বন্ধে কুন্দকান্তি সুন্দরীরে করিছে জর্জর,
শক্তির উত্সব নিত্য যে আনন্দে স্নায়ুতে শিরায়,
.                যে আনন্দ সম্ভোগ-স্পৃহায়;---
যে আনন্দে বিন্দু বিন্দু রক্তপাতে গড়িছে সন্তান,
.                গাব সেই আনন্দের গান |

.        যে আনন্দে ঝটিকার নগ্ন অভিসার,
.                সমুদ্রের কল্লোল-উদ্ গার ;
যে আনন্দে আকাশের মাতৃদেহ জর্জরিয়া প্রসব-ব্যথায়,
.        অন্ধকার গর্ভ হ’তে তারা বহিরায় ;
যে আনন্দে জ্যোতির্মঞ্চে সূর্য চন্দ্র নীহারিকা নিত্য নৃত্যশীল,
.                যে আনন্দে এ মত্ত নিখিল
.                ছুটে চলে ক্ষ্যাপা, দিশাহারা ;
যে আনন্দে কদম্ব-জাগানো নব শ্রাবণের ধারা
আনে ডাকি’ কাজল-মেঘের সনে সজল সলিল নীল
.                        নয়নের মোহ ;
.                আনে তৃণ-মঞ্জীরর প্রাণ-সমারোহ ;---
যে আনন্দে ঋতুতে ঋতুতে এত বর্ণ-বিলাসিতা,
.                সে আনন্দে রচিব কবিতা !

যে আনন্দে পিঞ্জরের দ্বার টুটি’ মুক্তি পায় বন্দী বিহঙ্গম,
শিবের তপস্যা ভাঙ্গে যে আনন্দে মন্মথের মিলিলে সঙ্গম ;
যে আনন্দে ভস্ম করে আগ্নি যত সম্ভারের স্তূপ,
যে আনন্দে গন্ধ দেয় দগ্ধ ম্লান ধূপ ;---
.                নিরানন্দ বন্দরের অন্ধকার ছাড়ি’
.                যে আনন্দে দেয় দীর্ঘ পাড়ি
ছিন্নপাল ভগ্নহাল জীর্ণ তরী কাণ্ডারী-বিহীন,
.                শুধু জানে মৃত্যু সম্মুখীন ;---
যে আনন্দে সৈন্যদল জিঘাংসু লোলুপ মাতে শত্রুর হত্যায়,
শোণিতের প্রস্রবন প্রবাহিত যে আনন্দে কৃপাণ কৃপায় ;---
.        মদিরার পাত্র ভরি’ যে আনন্দ নিত্য টলমল
.                সৌরভ-বিহ্বল,
দ্রাক্ষা আর রমণীর বক্ষ হতে যে মদিরা হয় নিষ্কর্ষণ :--
যে আনন্দে বৃদ্ধ পিতা করেছিল ভিক্ষা হায়, সন্তানের প্রফুল্ল যৌবন ;
যে আনন্দ পূর্ণ হয়ে অশ্রুজলে আপনারে করি যায় দান,
.        গাব সেই আনন্দের গান |

যে আনন্দে পতঙ্গেরা পাখা মেলি আগুনেরে করে আলিঙ্গন
যে আনন্দে চঞ্চরীরা গুঞ্জরিয়া করে পুষ্প-মঞ্জরীর, মদিরা ভুঞ্জন,
যে আনন্দে উপবাসী, পতিতার শুষ্ক ওষ্ঠে করে লুব্ধ ক্ষুধার্ত চুম্বন,
যে আনন্দে প্রেয়সীর নব অবগুন্ঠনের লজ্জা উন্মোচন,
.        যে আনন্দে পত্রে পত্রে দীপ্ত করতাল,
.        সে আনন্দে হইব মাতাল !

যে আনন্দে সন্ন্যাসীরা দেহ হ’তে জীর্ণ বস্ত্র ফেলে দেয় টানি |
.                স্কন্ধে বহে বৈরাগ্যের একতারাখানি ;
যে আনন্দে ভিখারিণী আপনারে নগ্ন করি’ দিয়াছিল চীর,
যে আনন্দে মৃত্তিকার গর্ভলীন তৃণদল প্রকাশ-অস্থির ;
যে আনন্দে মানুষেরা নিজ নিজ ভাব দিয়া গড়ে ভগবান
.                গাব সেই আনন্দের গান |

.                    ****************  
.                                                                                  
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
রবীন্দ্রনাথ
কবি অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
কল্লোল পত্রিকা, ১৩৩৩ মাঘ (জানুয়ারী ১৯২৭) সংখ্যা থেকে নেওয়া |


আমি আজো দেখি নাই সাজাহান গড়িয়াছে যে তাজমহল,
.                আমি শুধু পড়িয়াছি তোমার কবিতা ;
আমার কল্পনাবধূ তাই আজি উচ্ছ্বসিত, উদ্দাম, চঞ্চল,
.                        অনবগুন্ঠিতা !
তোমার বেদনা তারে উদাসিনী করেছে উতলা,
নাহি জানে কারুকার্য, নাহি জানে চারুশিল্পকলা,
শুধু তব আঁখি হতে চুরি করি’ আনি’ অশ্রুজল
আমার অন্তরলোকে গড়িয়াছে শুভ্র সমুজ্জল
.                        এ তাজমহল |
যে প্রিয়ারে চিনি নাই আজিকে চিনায় তারে তব দগ্ধ ব্যথা,
তাহারে হারায়ে তুমি বুঝায়েছ হে প্রেমিক তার অমূল্যতা |
ছন্দের বন্ধন ত্যজি’ অন্তর-দুঃখ তব হোল চিরন্তন,
মন চিত্ত-অন্তঃপুরে উদ্বেলিছে মৌনতায় সে দূর-ক্রন্দন |
---তোমার প্রার্থনা-সাথে আমারো ব্যাকুল কান্না ঊর্দ্ধপানে
.                                        উঠিছে ধ্বনিয়া
.        ‘ভুলি নাই ; ভুলি নাই, ভুলি নাই প্রিয়া !’

সে কান্নার মম চিত্ততীর্থে তুমি গড়িয়াছ আজ
.                বিশ্বব্যাপ্ত বিরহের তাজ্ !

.                    ****************  
.                                                                                  
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
আমারে ভুলিও ভাই
কবি অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
কল্লোল পত্রিকা, ১৩৩৪ বৈশাখ (এপ্রিল ১৯২৭) সংখ্যা থেকে নেওয়া |


আমি এসেছিনু পথ ভুল করি’ তোমাদের খেলা-গেহে,
স্নান করিবারে তোমাদের ভিজা অশ্রুজলের স্নেহে ;
.        আমারে ভুলিও ভাই,
ভালো যদি বাস, ভুলিবার মত সহজ কিছুই নাই |
দিনের আলোকে আঁধার ভুলেছ, ভুলেছ রাতের তারা,
নিদয় আলোকে আঁধার ভুলেছ, ভুলেছ রাতের তারা,
নিদয় নিদাঘে ভুলেছ যেমনি নেমেছে শ্রাবণ-ধারা |
ঘুমের ঘোম্ টা টানিয়া ভুলেছ জাগর-জ্বালার দাহ,
নীলিমা ভুলেছ মেলিয়াছ পাখা যবে কালো বারিহাত |
.        আমারে যাইও ভুলি’,
শীতের শিয়রে দখিনার তরে বাতায়ন দিও খুলি’ |
ঘরে নিও নাক’ শুকাল যা মাঠে নীবারের মঞ্জরী,
তুলো না সে ফুল কাঁটায় যাহার বৃন্ত গিয়াছে ভরি |
.        যে পাখী ভুলিল গান,
পিঞ্জর হতে তোমরা তাহারে দিও গো পরিত্রাণ |
তোমরা হেথায় অশ্রুবেলায় বাঁধিও বালির বাসা,
প্রিয়ার নয়নে হেরিও গোপনে সে ভালোবাসার আশা
.        আমি আসিবনা ফিরে,
আমি চলে যাই তীর্থপথিক তিমিরতমসাতীরে ||

.                    ****************  
.                                                                                  
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
ধর্মঘট
কবি অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
কল্লোল পত্রিকা, ১৩৩৪ জ্যৈষ্ঠ (মে ১৯২৭) সংখ্যা থেকে নেওয়া |


চামারের ছেলে চাম্ ড়া ছোঁবে না,
.              কসাই ছেড়েছে ছুরি ;
মুটে মোটে আর মোট্ বহিবে না—
.              নামায়ে রেখেছে ঝুড়ি |

অথই অথির দক্ষিণা-ভরা
.              আজিকে দক্ষিণায়,
ধূলা ঝেড়ে ফেলে গাও মেলে দিয়ে
.              মজুর জুড়াতে চায় |

গাড়োয়ান আর গাড়ী হাঁকাবে না,
.              শস্য নেবেনা হাটে ;
অশথের তলে গাঢ় চোখ মেলে
.              গরুরা জাবর কাটে |

জাহাজ আজিকে বেজান্ হয়েছে,--
.               মাস্তুল চৌচির ;
ভিড় লেগে গেছে সাগরের তীরে
.               খালি-গায়ে খালাসীর |

হাল আর হল হয়েছে বিকল ;
.               কলু আর কালো কুলি
আজ দখিণায় ঘেঁষে গায়-গায়
.                করিতেছে কোলাকুলি |

ঝাড়ুদার-ঝি’র লজ্জা হয়েছে
.                 চালাবে না পথে ঝাড়ু;
একেলা বসিয়া পারুলের ফুলে
.                বানায় পায়ের খাড়ু |

হাতের সঙ্গে হাতুড়ি থেমেছে
.                ছুতোর করেছে ছুতো ;
হঠাৎ তাঁতির তাঁত ছিঁড়ে গেছে
.                ফুরায়ে গিয়াছে সুতো |

কাৎরানি এত কের্ দানি যার
.                সে কল হয়েছে কাৎ
আজি দখিনায় মজুর জুড়ায়,
.                আজিকে সুপ্রভাত !

কেড়ানীরা সব কলম ছুঁড়েছে,
.                উপুড় করেছে কালি ;
আকাশ আজিকে চায় তার চোখে
.               জ্যোত্স্না-জোনাকি জ্বালি |

ফিরিওয়ালারা আর ফিরিবে না
.               ঠাঠা-পড়া চড়া রোদে ;
ধাঙড় আজিকে নোঙড় নিয়েছে,
.               মুদি সে নয়ন মোদে |

কেড়ানীর রাণী উনুনের কোণে
.                ঠেলিবে না আর হাঁড়ি ;
আজ দখিনায় খোঁপা খসে’ যায়,
.                গোছালো থাকে না শাড়ী |

বস্তা যাহারা বয় আর যারা
.                বস্তিতে বাস করে,
খোলা রাস্তায় বরা দখিনায়
.                 নিশ্বাস আজি ভরে |

দখিনার ফুঁয়ে গিয়াছে উড়িয়া
.                 করাটের ছেঁড়া চট
আকাশে বাজিছে ছুটির ঘন্টা,
.                আজিকে ধর্মঘট |

.                    ****************  
.                                                                                  
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
সকলি যে ভুলিয়াছি
কবি অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
কল্লোল পত্রিকা, ১৩৩৪ শ্রাবণ (জুলাই ১৯২৭) সংখ্যা থেকে নেওয়া |


আজিকার রোদে রোদন ভুলেছি বৈশাখী সন্ধ্যার,
পদ্মার ঢেউয়ে পদ্ম ভাসায়ে গন্ধ ভুলেছি তার |

.                        সকলি যে ভুলিয়াছি,---
কবে তুমি ছিলে মোর মধুচাকে উন্মন মউ-মাছি !
ফুলের সোসর দোসর পাইনু কবে যে বাসর-রাতে,
তোমার চোখের কাজল মেজেছি আমার আঁখির পাতে ;
কবে তব কোলে কপোল রাখিয়া কপোলকল্পনায়,
ক্ষয়হীন রাতি গোঙাইনু দোঁহে অক্ষয়তৃতীয়ায় ;---

.                        কিছুই যে মনে নাই,
সোতের শ্যাওলা ঘাটে ঠেকেছিনু, আবার ভেসেছি ভাই |
বিদ্যুল্লতা-দ্যুতির দ্রুততা মন্থর মেঘে ঢাকা,
ব্যঞ্জন আজি আলুনি হয়েছে, কালকূট ঠোঁটে মাখা |

.                        আজি ওগো প্রিয়সখি,
অলক্ষ্মী রাতে নাগে-কাটা শুধু লখিন্দরেরে লখি |
সরাইখানার সরা-র সরাব হঠাৎ গিয়াছে চুকে ,
অনুরাধা তারা মুখ ঢাকিয়াছে অন্ধকারের মুখে |

.                        আমি হেথা পরবাসী,
ভুলে গেছি সখি, সেই আশাতীত দূর ভাষা,--- ‘ভালোবাসি |

.                    ****************  
.                                                                                  
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
সব পুড়ে হ’ল ছাই
কবি অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
কল্লোল পত্রিকা, ১৩৩৪ অগ্রহায়ণ (নভেম্বর ১৯২৭) সংখ্যা থেকে নেওয়া |


শাওনের গাঙ্ ভাঙন ধরেছে --- এমনি তোমার দেহ,
বুকের সোনার গাগরী ভরিয়া এনেছ কি অনুলেহ !
.                ময়ূরপঙ্খী তনু
ময়ূরের মত পেখম মেলেছে,--- দেখিয়া উতলা হ’নু |
প্রবালের ডিবা দুটি ঠোঁটে কিবা প্রবল কামনা মাখি’
আমার নয়নে রেখেছিলে তব মদমুকুলিত আঁখি !
গিরিকর্ণিকা কর্ণে দুলিত, বক্ষে ললন্তিকা,
দেহদীপাধারে জ্বলিত লেলিহ যৌবন-জয়শিখা !
.                সব পুড়ে’ হ’ল ছাই,
তোমার মাঝে যে বিধবা বিরাজে সে কথা ত জনি নাই |
কই তব সেই মণিকঙ্কণ, কই মালাচন্দন,
উদয়-তারার শাড়ি কই সই, কই বেণীবন্ধন ?
.                 আজি সখি গিয়ে দূরে
রজনী ভরিয়া তারার আলোয় খুঁজিছ কি বন্ধুরে ?
বন উচ্ছের তুচ্ছ পাতায় তোমার চাহনি দেখি,
সন্ধ্যার ঐ সন্ধ্যাভাষায় মোরে তুমি ডাকিলে কি ?
.                  অন্তরঙ্গতার
সুখসৌরভ আনিল কি বহে’ মৃত্যু-অহঙ্কার ?

.                    ****************  
.                                                                                  
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
আমার প্রিয়ার ঘরের অতিথি
কবি অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
কল্লোল পত্রিকা, ১৩৩৪ মাঘ (জানুয়ারী ১৯২৮) সংখ্যা থেকে নেওয়া |


আমার প্রিয়ার ঘরের অতিথি, শুধাই তোমরে ভাই,
হেরিছ তেমনি তা’র দুই চোখে বসন্ত--- বাসনাই ?
.                কোন্ নামে তারে ডাক’ ?
তোমারো আকাশে ফুটিয়াছে তারা তেমনি কি লাখো লাখো ?
তোমরা দুজনে মাঠের কিনারে তেমনি কি থাক’ বসি,
তোমাদের দেশে তেমনি কি আসে চৈতের চৌদশী ?
শয়ন-শিয়রে রজনীগন্ধা ফেলিছে কি নিশ্বাস,
নিরালা জাগিয়া দু’জনে তেমনি ভুঞ্জিব আবকাশ ?
.                আমারে বলিবে না কি ?
তেমনি কোমল দু’টি করতল, শীতল তেমনি আঁখি ?
তুমি না চাহিতে অধর আনিয়া অধরে কি আর রাখে,
বারেক আধেক ‘ভালবাসি’ বলে’ তেমনি কি থেমে থাকে ?
.                রঙীন বসন পরি’
তোমারে তুষিতে খোঁপায় গোঁজে কি ধান্যের মঞ্জরী ?
নবনবনীর মত সুকোমল তার দুটি পয়োধরে
সঞ্চিত করি’ রাখিয়াছে সুধা তোমার শিশুর তরে ?
.                আর কি বেহাগ গায় ?
তোমার চোখে কি আমার চোখের জলের আভাস পায় ?

.                    ****************  
.                                                                                  
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
আমার মেঘ্ না নদী
কবি অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
কল্লোল পত্রিকা, ১৩৩৪ ফাল্গুন (ফেব্রুয়ারী ১৯২৮) সংখ্যা থেকে নেওয়া |


মেঘ্ নার তীরে বাঁধিয়াছি বাসা ছোট একখানি নীড়,
ফিরি করে’ আর ফিরি না পরাণ, নই আর মুসাফির
.                আমার মেঘ্ না নদী
শুকাইত, ওর সাথে মোর আঁখিজল না মিশিত যদি !
ছোট গ্রামখানি  লজুক শ্যামল নববধূটির মত,
শূন্যতাভারে বিরহী আকাশ চুম্বনে অবনত |
জেগে বসে’ মেঘ গর্জন আর জনকল্লোল শুনি,
শ্রান্ত শ্রাবণ নয়নে ও নভে নাই ফুল ফাল্গুনি |
.                নদী মাছি মাটি ধান---
আপনার মাঝে শুনি সবাকার প্রাণধারণের গান |
হে বিদেশী নাও, কোথা যাও ভেসে
.                বারেক আসিবে হেথা,
তোমার কক্ষে যপিছে কি নিশি আমার মহাশ্বেতা ?
.                মেঘ্ না মেঘের প্রিয়া,
পরাণের সে যে নাই, এ যে মোর নয়নের আত্মীয়া !
তাহার শিয়রে রূপার প্রদীপ, মৃত্যু শিয়রে মোর,
তাহার আকাশে ঊষা উদ্ভাসে হেথা যায় ঘনঘোর |
.                তাহার চন্দ্রহার,
মোর আছে শুধু মেঘ্ লা আকাশ আর জল মেঘ্ নার ||

.                    ****************  
.                                                                                  
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর