দোসরা আশ্বিন কবি অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত কল্লোল পত্রিকা, ১৩৩৫ আশ্বিন (সেপ্টোম্বর ১৯২৮) সংখ্যা থেকে নেওয়া |
উন্মীলিত নীলচক্ষু আকাশের তলে এই দিন জন্মেছিনু নিষ্কলঙ্ক --- নাম তার দোসরা আশ্বিন | এই দিন তুমি মোর কাছে ছিলে পড়ে আজি মনে, লজ্জালুলতার মত দু’টি বাহু ভীরু আলিঙ্গনে এনেছিল কি আশঙ্কা, চক্ষে ছিল মৃত্যুর মমতা | চুম্বনে ভুলিয়াছিনু সে দিনের আকাশের ব্যথা | নম্রকন্ঠে বলেছিলে,--- “আজি এ সুন্দর দিনটিতে অপরিচয়ের রাজ্যে কি তোমারে পারি আমি দিতে পরাজিত যার কাছে মৃত্যুর দস্যুতা ?” “কিছু নহে|” বলেছিনু,--- “ঊর্দ্ধে মোর নীলাকাশ যেন সদা বহে রিক্ততার অপর্যাপ্ত সম্পূর্ণতা, --- বৈরাগী পৃথিবী পদতলে চিরনৃত্যশীলা, যেন হই দীর্ঘজীবী— প্রেমপরমান্ন মোর অনন্ত পাথেয়., কিছু নহে— তোমার অমরস্পর্শ মর্মমূলে নিত্য যেন রহে ; মুহূর্তের মত যেন মৃত্যুহীন নব জন্ম লভি | আঁখিতে আঁকিয়া দাও প্রেমোজ্জ্বল প্রভাতের রবি |” এত বলি’ মদির চুম্বনে তোমা’ করিনু প্রণাম, সেদিন ত’ কাছে ছিলে, --- কত যে বলিতে পারিতাম !
আজি আর কাছে নও, আসিয়াছে দোসরা আশ্বিন ব্যথায় সুনীল চোখ পাণ্ডুর বিষণ্ণ বিমলিন ! নিরিখিয়া চিনিবে কি আজিকার উদাসী আকাশ ? মনে কি পড়িবে, সখি সেদিনের শীতল নিশ্বাস পাণ্ডুর গণ্ডের ‘পরে, বিম্বাধরে সুচারু রুচির ? সেদিনের ভুরু দু’টি আজিও কি বিদ্যুৎ-বল্লীর চঞ্চলতা ডাকি’ আনে ? আজিও কি তুলসীতলায় ভীরু দীপশিখাখানি জ্বালি’ দিবে সলজ্জ সন্ধ্যায় আমারে স্মরণ করি’ ? নেত্রকোণে স্নিগ্ধ অশ্রুকণা সিক্ত করে’ দিবে আজো ভাষাহীন কুশলকামনা ? বাহিরে আকাশতলে দাঁড়াবে কি ওগো লগ্নপাণি, তারকালোকের তীর্থে পাঠাইবে প্রার্থনার বাণী করিতে আমার স্পর্শলাভ মর্ত্যের অতীত তীরে ? চিনিবে কি সেই তারা ? ভুলিবে কি এই দিনটিরে ? যদি বা ভুলিয়া থাক, চোখে স্নেহ নাহি যদি আর, কার্পণ্যে কুন্ঠিত যদি,-- তাই মোর হোক্ উপহার | তোমার সে-বিস্মৃতিরে রেখে দিব অম্লান অক্ষত, তোমারি সীমন্তশোভী গর্বদীপ্ত সিন্দুরের মত |
তুমি আজ কাছে নও, এ জগতে ইহাও সম্ভব ! কাছে নও, তবু আজো অম্বরে অন্তরে মহোত্সব গাঢ় নীল বেদনার | তবু আজ নহি ক’ একাকী --- শীতল লক্ষ্যার জলে তৃষাতুর আঁখি দুটি রাখি’ বসে’ আছি ; ভাবি শুধু, কি মধুর বিরহ-বিলাস! তোমারে হারাব--- ইহা সৃষ্টির আদিম অভিলাষ | ভাগ্যিস্ আসিয়াছিনু ধরণীতে এক সন্ধ্যাকালে, তাইত নয়ন ভরি’ বেদনার সমুদ্র দোলালে আকাশের বিস্তৃতির মত | কন্ঠে দিলে এত গান | তোমারে হারানু আমি, --- আমি যে পরম ভাগ্যবান | তোমারে হারায়ে আমি লভিয়াছি সত্য জন্মদিন, তুমি নাই, তবুও সার্থক মম দোসরা আশ্বিন || . **************** . সূচিতে . . .
সার্বজনীন কবি অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত কল্লোল পত্রিকা, ১৩৩৬ জ্যৈষ্ঠ (মে ১৯২৯) সংখ্যা থেকে নেওয়া |
. শুধু আমি রচি তার গান, . যে-জীবন ক্লান্ত পঙ্গু কামক্লিষ্ট ঘৃণ্য মুহ্যমান ; . পাপলিপ্ত অঙ্গে যার লাগিয়াছে লালসার ধূলি, . যে ললাট ছোঁয় নাই সেবামৃতসুস্নিগ্ধ অঙ্গুলি, জীবনের দাবদাহে মিলে নাই যার স্নেহ-সন্ধ্যার সন্ধান , . রচিতেছি আমি তা’রি গান ||
. ধূলি-রুক্ষ রাজপথে নিরাশ্রয় যারা পরিশ্রমী, . যুগ্ম করে তাহাদেরে নমি ; . মরণের স্নেহ যেন, --- সর্ব অঙ্গে ঝরিতেছে স্বেদ, জীবনে ঘুচালো যারা মৃত্যু আর মৃত্তিকার ভেদ, শির পাতি’ লয় যারা একচক্ষু বিধাতার অমোঘ কুঠার, . তাদের জানাই নমস্কার ||
. শুধু আমি রচি তা’র গান. শিব-সম নগ্ন যারা শিবাকীর্ণ শ্মশানে শয়ান ; এক মুষ্টি নিশ্বাসের প্রীতিহীন যে প্রতিযোগিতা জীব যাত্রারথতলে বিরচিল বিস্মৃতির চিতা, বিধাতার বিশ্বব্যাপী সৃষ্টি চেয়ে মহত্তর যার পরাজয়, . তা’রি গানে যাপিনু সময় ||
. ধূলি যা’র জীবখাদ্য, অশ্রু যা’র বিষাক্ত পানীয়, . আমি কবি, আমি তার প্রিয় ! আমারে করেনি মুগ্ধ সমুদ্র বা নভ মনোরম, কলঙ্কের কবি আমি ; সাথী মোর কন্টক, কর্দম ; সঙ্গীত শোনেনি যে-ই’করিয়াছে ক্ষমাহীন রক্তাক্ত সংগ্রাম ,
আবিষ্কার কবি অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত কল্লোল পত্রিকা, ১৩৩৬ কার্তিক (অক্টোবর ১৯২৯) সংখ্যা থেকে নেওয়া |
এ মোর অত্যুক্তি নয়, এ মোর যথার্থ অহঙ্কার, যদি পাই দীর্ঘ আয়ু, হাতে যদি থাকে এ লেখনী, কা’রেও ডরি না কভু; সুকঠোর হউক সংসার, বব্ধুর বিচ্ছেদ তুচ্ছ, তুচ্ছতর বন্ধুর সরণি !
পশ্চাতে শত্রুরা শর অগণন হানুক ধারালো., সম্মুখ থাকুন বসে’ পথ রুধি’ রবীন্দ্র ঠাকুর, আপন চক্ষের থেকে জ্বালিব যে তীব্র তীক্ষ্ণ আলো যুগ-সূর্য ম্লান তা’র কাছে | মোর পথ আরো দূর !
গভীর আত্মোপলব্ধি --- এ আমার দুর্দান্ত সাহস, উচ্চকন্ঠে ঘোষিতেছি নব নর-জন্ম-সম্ভাবনা ; অক্ষর তুলিকা মোর হস্তে যেন রহে অনলস, ভবিষ্যৎ বত্সরের শঙ্খ আমি ---- নবীন প্রেরণা !