কবি অচ্যুত মণ্ডলের কবিতা
*
হ্যামলেট (১৯৯০)
কবি অচ্যুত মণ্ডল

রাজ্য নেই ওফেলিয়া, যুবরাজ নই, তবু বুঝি
পৃথিবী নামের দেশে কোথাও গভীর ভুল আছে |
থাকা আর না থাকার মধ্যবর্তী ক্লান্ত গলিঘুঁজি
হাঁটি উত্তরের খোঁজে শহরের আনাচে কানাচে |

পিতার প্রেতাত্মা যেন কলেজের কোণে অধ্যাপক
অক্ষম জ্ঞানের ভারে | বিবেচক বন্ধু হোরেশিও
ছবি আঁকে, গান গায়, কবিতার মরমী পাঠক ;
তৃপ্তির ঢেকুর শোনে ছায়াছবি গানের রেডিও |

মফস্বলী মহিলার ফর্সা হাঁটু দ্যাওরের কোলে,
সকলেরই চোখেমুখে অনাবিল আনন্দের রেশ ;
যেন কারো কষ্ট নেই, ভালো রান্না -- ঝোলে বা অম্বলে
নুন আছে কি না কেউ কোনোদিন করেনি জিজ্ঞেস !

আত্মবিলোপের মতো অন্ত্যমিলে যে লেখা সনেট
অমাত্য বা ভাঁড় নয়----- কালান্তরে ক্লিষ্ট হ্যামলেট  |

.                  ********************  

.                                                                                   
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
বৃষ্টি-১ (১৯৯০)
কবি অচ্যুত মণ্ডল

বৃষ্টি নামে  | ঘরে ঘরে অর্ধমৃত সৈনিকের ভিড় ;
সার্চলাইটের মতো থেকে থেকে বিদ্যুতের কষা
আলোকিত করে তোলে পৃথিবীর পুরনো প্রাচীর,
ভারী কামানের মেঘে কেঁপে ওঠে গম্বুজ সহসা !

আদিম যোদ্ধার বর্শা বিঁধে যায় রাতের যোনিতে,
শিল কুড়ানোর জন্যে ঝাঁপ তোলে দোকানের আলো--
সাদা বুলেটের বৃষ্টি মাথা খুঁড়ে বাঙ্কারের ভিতে
মুকুলের মৃতদেহ সারামাঠে অযথা ছড়ালো |

গ্যাস মুখোশের মতো ওঠে চাঁদ কালো পর্দা বেয়ে--
বোমারু হাঁসের সারি যার নাম রেখেছে আকাশ
খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটে হাওয়ার স্ট্রেচার নিয়ে সেও
পিঠে তার হিম, সাদা আধমরা যুবতীর লাশ  |

লাশের ঠোঁটের পাশে মাছি ওড়ে যেন চক্রবাক্
চন্দ্রাহত চতর্দশী জ্যোত্স্নার নাপামে পুড়ে খাক্  !

.                ********************  

.                                                                                   
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
বৃষ্টি – ২ (১৯৯০)
কবি অচ্যুত মণ্ডল

বৃষ্টির রহস্যগল্পে সকলেই সন্দেহভাজন ;
বর্ষাতে চাপিয়ে গায়ে টর্চ হাতে খুনী অন্ধকার
পিস্তল ঝিলিকে বিদ্ধ মূহুর্মুহু বৃক্ষ অভাজন,
গোয়েন্দা দেশলাই জ্বালে, বারান্দায় চোখ জ্বলে তার |

বাদামওলার কুপি নিভে গেল ঘন বর্ষাছাঁটে
বহস্যের যবনিকা --- ভিজে শাড়ি টাঙানো পেরেক ;
জলে জবুথবু ছায়া এত রাত্রে একা রাস্তা হাঁটে,
ও কোথায় যাবে ?  কেন ?  এই দৃশ্যে অপরাধী কে ?           
গোপন বিদ্যুত্সূত্রে দেখা যায় মুখের আদল   
ভাঙা চৌকো ভিজে মুখে উদ্বেগের খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি ;
‘কি বৃষ্টি, কি বৃষ্টি বাপু, কি করছ গো, খুকি দরজা খোল’
জলের কাহিনীবৃত্ত পৌঁছে যায় ঘটনার বাড়ি |

গল্প শেষ হয়ে গেলে হাই তোলে প্রবীণ পাঠক---
মলাটে নিবিষ্ট মেঘ ছিঁড়ে গেলে বুজে আসে চোখ |

.                ********************  

.                                                                                   
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
শ্মশানবান্ধবী (১৯৯০)
কবি অচ্যুত মণ্ডল

প্রত্যহের মানে কিছু খুঁজে পেলে শ্মশানবান্ধবী  ?
সম্পর্কের সুতোগুলো একে একে ছিঁড়ে গেলো না তো ;
আমার নির্দেশক্রমে হয়েছো কি সত্যিই আহত
মোমের আলোয় দেখে ভান্ গখের সূর্যমুখী ছবি ?

এখনো কি মনে হয় ভালো আছো নদীর ওপারে ?
কেন আছো, কেন থাকো -- এভাবে থাকার কোনো মানে
খুঁজে পেয়েছো কি আজ  ?  আমাদের অনন্ত সাম্পানে
কেউ ভালো নেই -- মাঝি সবার বাড়িতে কড়া নাড়ে |

দাঁড়ি তো বিস্ময় চিহ্ন ! কমা, সেমিকোলনের ঢেউ
রাতের ট্রেনের মতো অন্ধ আর আবহবিহীন --
পাখির ডানায় আঁকা শ্মশানের বালিয়াড়ি ক্ষীণ ;
পিছনে জলের শব্দে মধ্যরাতে কেঁদে উঠলে কেউ

শিশির কালের বিন্দু পড়ে থাকে ঘাসের জাজিমে,
অংশভাক্ সত্তা হাঁটে ভোরবেলা সমগ্রের হিমে !

.                ********************  

.                                                                                   
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
শেষ পাতা ১৯৯০
কবি অচ্যুত মণ্ডল

আদিম ঝড়ের রাতে করুণ হলুদ পাতাগুলি
রোগিনীর ঠোঁট থেকে খসে পড়ে জ্বরের প্রলাপে |
শহর ঘুমালে , উষ্ণ রোঁয়াখাঁড়া কম্বলের ভাপে
ব্যর্থ বুড়ো, কুঁজো শিল্পী খোঁজে রঙ, নিঃসঙ্গতা তুলি |

বার্লি জ্বাল দেয় রাত্রি উল্টে রেখে শুরুয়ার বাটি,
থার্মোমিটারের গায়ে বিদ্যুতের পারা নেমে এলে
ঘন বার্লিঝড় ওঠে আকাশের অদ্ভুত ইজেলে--
ন্যাড়ামুন্ডি ডাল থেকে ঝরে যায় অমোঘ পাতাটি !

বুড়ো ইঁদুরের মতো ঝড়ের তান্ডবে অবিরাম
টিনের পাতের বুকে রঙ করি -- বানাই পল্লব ;
সবুজ দাঁড়িয়ে থাকে হলুদেরা ঝরে গেলে সব,
রোগিনী উজ্জ্বল হাসে কাকভোরে, নয়নাভিরাম |

শেষ পাতা ঝরে গেলে আমাদের শিল্প শুরু হয়,
উদ্ধত সবুজ জন্মে মুমূর্ষুকে মৃতের হৃদয় !

.                ********************  

.                                                                                   
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
তুলনামূলক (১৯৯০)
কবি অচ্যুত মণ্ডল

চোখ পুড়ে গেছে রাত্রি, দেখেছি শাড়িতে তারা খসা,
পাড়ের দিগন্ত দিয়ে পাটভাঙা পাহাড়ের ভোর
কালো কাঁচুলিতে ঢাকা  | আধো আধো কালো মেঘ, তোর
প্রথমে পড়েছি প্রেমে, কামনায়, এখন লালসা  |

শাড়ি তুলেছিলে কবে, জলে ছিল আকাশের উরু
যেন জ্যোত্স্না | মৃগেল মাছের ঢেউ অনুমান করে
চাঁদ ফেলেছিল ছিপ উরুসন্ধি অথবা ডহরে
বঁড়শির মাপে যার নালীঘাস বাঁকিয়েছে ভুরু

এ্যাতো কালো চুল তার মদ খেলে মনে হয় মাঝি,
উজানে গিয়েছে নেমে ; আঁধারের সেই দীর্ঘ বেণী
আলোর কোমর ছুঁয়ে মনে হয় কোথাও থামেনি,
পর্বতশ্রেণীর পথে আরও বহুদূর যেতে রাজি !

অস্পষ্ট মসৃণ ত্বকে চাপ চাপ কুয়াশার হিম
আদমের অন্ধকারে দেখে ফেলছে ইভের আদিম |

.                ********************  

.                                                                                   
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
পুনর্দর্শনায় (১৯৯০)
কবি অচ্যুত মণ্ডল

প্রাইমারি ইশকুলের পাশে ছিল দুপুরের বাড়ি,
দর্ মা ঘেরা ;  কিছু তার মনে আছে কিছু গেছে ভুলে,
কুমারকান্তির মতো বন্ধু ছিল রোদের ইশ্ কুলে |
ভূতের গল্পের মতো পোড়ো ঘরে জানালার সারি

আমাদের ডেকে নিল, কাক ডেকে উঠল চারবার |
উঠোনের ধুলো থেকে চৌকাঠের দিকে বুড়ো নিম
খুঁজে পেল --- হারানো সিঁদুর কৌটো, শালিখের ডিম,
মেয়েলি হাতের চিঠি, স্তব্ধবাক্ আমি ও কুমার |

কেন যে বাতাস এলো |   ঝরে যাওয়া পাতাদের শোক,
কাঠের মেদুরে ম্লান খোদাই করেছে আঁকিবুকি
কাঁচা, কাঁপা হাতে লেখা ‘কোথায় গেলি রে তুই খুকী ?’
অশ্বথ্বের ডাল ছুঁয়ে বলে গেল ‘কে তুমি বালক ?’

আজ সন্ধেবেলা সেই পোড়োঘরে জানালার ফাঁকে
দেখেছি আলোর বৃত্তে মানুষেরা ঘর বেঁধে থাকে !

.                ********************  

.                                                                                   
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
জ্যামিতি (১৯৯০)
কবি অচ্যুত মণ্ডল

নিভন্ত চুল্লীর মধ্যে আঁচ দেখি | কালো কালো শিক
যেন বন্দী করে তাকে ; আগুনেরও গরাদ রয়েছে
জেনে তৃপ্তি পাই খুব | নয়ানজুলির জলসেচে
যখন যেদিকে ফিরি,  টের পাই সবই জ্যামিতিক !

আয়তক্ষেত্রের মাঠে চাঁদ ওঠে ক্ষিপ্র গোলাকার ;
উল্লম্ব শালের বনে সমকোণে রম্বস আকাশে
ত্রিভুজ পাহাড়তলী | বর্গাকার ক্ষেতে বুনো ঘাসে
বাংলোর বাদামী ছাদ--- ট্রাপিজিয়ামের দুই ধার |

সম্পর্কের বহুভুজে ব্যক্তিবিন্দু যতই লুকোন ;
বিপ্রতীপে সৃষ্টি চলে অনুরূপ -- সম-অন্তরালে
ক্লান্তির সরলরেখা বৃত্তটির বিভাজন কালে
ব্যাসার্ধের অস্বস্তিতে ফেটে যায় প্রেমের ত্রিকোণ |

আর মৃত্যু ? পরিমিতি শেখাতেন ইশ্ কুলের দিদি
সে মন পাইয়ের মান, বেড়ে চলা সত্তার পরিধি !

.                ********************  

.                                                                                   
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
সহ পাঠক্রম (১৯৯০)
কবি অচ্যুত মণ্ডল

সমস্ত স্বপ্নের মধ্যে তাকে দেখি, কেঁপে ওঠে শিরা |
অলৌকিক ক্লাসরুমে কারা যেন কি সব পড়ায় ;
স্তব্ধ ঘুল্ ঘুলির ঘরে পায়রাদের গলায় গম্ভীরা
রোদ রাখে গোড়ালীতে, দুপুরের দৈর্ঘ্য কমে যায় |

অচেনা হলুদ দুঃখ চারপাশ ভারী হয়ে ওঠে,
বন্ধুভাবাপন্ন হাওয়া আঁচল ওড়ায় বারবার --
যেন মূর্ত মোনালিসা ; রহস্যবিঘ্নিত হাসি ঠোঁটে
যেন ছাত্রী নয়, যেন অহংকারী ওষ্ঠ শিক্ষিকার |

এই মুগ্ধ বসে থাকা অকথিত অলীক সঙ্গমে,
যৌনকাতরের এই প্লেটোনিক মৃদু ফেরেব্বাজি
বিশ্ববিদ্যালয়কৃত হাস্যকর এই পাঠক্রমে
সহপাঠিনীর জন্যে ; আজীবন ছাত্র হতে রাজি  |

‘মৃত সব কবিদের মাংস কৃমি খুঁটে’ তবু ওম্
পেতে তুমি মহাকবি --- চালু থাকলে সহপাঠক্রম |

.                ********************  

.                                                                                   
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
পৌরাণিক (১৯৯০)
কবি অচ্যুত মণ্ডল

দ্যাখো ভিজে গেছি খুব, এই বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে স্রোতে
ডুবে যাচ্ছে ধানচারা -- এই ধান এ্যাতো কষ্টে বুনি ;
ভেঙে যাচ্ছি, ভেসে যাচ্ছি --- খুলে যাচ্ছে পরতে পরতে
রাতের অস্থির পর্দা, হাওয়া হাঁকছে, ‘আরুণি, আরুণি’ !

মনে পড়ছে ওম্ আর ভাতের অস্ফুট গন্ধ মেখে
কে যেন এসেছে কাছে | কারা যেন সুখে নিদ্রা যায় ;
কে শোনে বৃষ্টির শব্দ, কেউ কাঁদে, যে লেখে সে লেখে
মুমূর্ষু পাখির গান রাতের অন্তিম পাহারায় |

এ কোন গুরুর বাক্যে কালরাত্রি জেগে বসে আছি ;
কোদালে সশব্দ মাটি, বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে বারবার---
জলে ভিজে আসে চোখ, এ কোন্ করুণ কানামাছি
কেন যে কিসের জন্যে আলপথে এসেছি আবার !

শুধু কি ধানের জন্যে আল বাঁধে শব্দের চাষিরা--
যে স্রোত ভিতরে বইছে আল তারও ব্যক্তিগত শিরা |

.                ********************  

.                                                                                   
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর