কবি অচ্যুত মণ্ডলের কবিতা
*
পদ্মখাদকের গান (১৯৯১)
কবি অচ্যুত মণ্ডল

আমের বউল ফোটে, মাঝরাতে মৃদঙ্গের বোল
দুপুরের আলো একা বাউল পাঠায় চুপি চুপি ;
বউ কথা বলো পাখি, দিগন্তে রোদের বহুরূপী
ছায়ার প্রশাখা থেকে নিয়ে যায় দিনের সম্বল |

প্রহারে আগুন ওড়ে, হাপরের উচ্ছিষ্ট জোনাকি,
করাতে কাঠের গুঁড়ো ; ছুতোরের ছেনিতে আঁধার--
মাটি মেখে ওঠে সূর্য, কুমোরের চাকে রক্ত তার
লাঙলের ক্ষতমুখে মেঘের প্রান্তরে মাখামাখি |

কত যে কুসুম ছিঁড়ি, কত পাখি শিকলে জড়াই ;
এ্যাতো মাংস দলি তবু কসাইয়ের কামনা অবধি
কোনো তৃপ্তি নেই, কোনো খিদে নেই তবু পদ্ম খাই
মৃণালে নিহিত স্বপ্ন প্রস্ফুটিত হতে পারে যদি |

তুমি জানো ম্যাগেল্লান , সকল রাস্তাই যায় রোমে ---
যেহেতু পৃথিবী গোল দিন কাটে স্বপ্নে বা সঙ্গমে |

.                  ********************  

.                                                                                   
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
মুদ্রণ মৈথুন ( ১৯৯১ )
কবি অচ্যুত মণ্ডল

হৃদয় সংবাদে মুগ্ধ তন্নতন্ন প্রুফ দেখি তোর |
সিল্ক স্ক্রীন উন্মোচনে আঁচলের দেরি দেখি কেন
ব্লাউজে বিপদসীমা ; ধমনীতে ঝড়ের খবর---
শরীরের স্যুভেনিরে বিলম্বিত বিজ্ঞাপন যেন |

কম্পোজের ক্যামোফ্লেজে জ্বলে দীর্ঘ বিনুনির শিখা,
হরফে হসন্ত যেন দুলে ওঠে পাহাড়ের খাদ--
আঁখি যদি অপরাধ করে তবে সংবাদপাঠিকা
তোমার মুদ্রাই দায়ী, ক্ষমা কোরো মুদ্রণ প্রমাদ |

বিষণ্ণ কাগজ ওড়ে |   অফসেটে বৃষ্টির বাহানা
সীসে ও কালির দাগে তোমাকে বিষাদসীমা দিক |
যান্ত্রিক ঘর্ষণে ক্লান্ত. অন্ধকারে এই ছাপাখানা --
যেন কেঁপে ওঠে ঘামে, স্বমেহনে --বন্য আন্তরিক |

পৌরুষ ক্ষরণ কালে বাল্যকাল মনে পড়ে ক্ষীণ,
ব্যবচ্ছিন্ন বর্ণমালা ;  লিনোকাটে মুদ্রিত মাইন !

.                  ********************  

.                                                                                   
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
কৌম কুসুমের কথা (১৯৯১)
কবি অচ্যুত মণ্ডল

ঠিক সন্ধে নয়, মৌন ম্লানতর বিকেলের দিকে
একটি শরীর গেল -- কুসুম কুসুম রঙ জামা |
নিতম্বে নিহিত নাচ ; স্তনে স্তব্ধ দ্রাবিড় দামামা,
যুবক নিথর হোলো চলমান জঙ্ঘার নিরিখে ,

শীত্কারে শব্দ শুনি স্কুটারের টায়ারে টায়ারে ---
রক্তবুলবুলির মতো বিকেলের রজঃস্বলা পাখি
ঘুঘুর দুপুরে ক্লান্ত | নান্দনিক সন্ধের চালাকি
যেন যৌনকাতরতা, যেন রাত্রি সিক্ত ডানা ঝাড়ে !

পুরুষাঙ্গে জল ঢেলে উপবাসিনীরা ফিরে যায়  |
এই যে পার্বত্য প্রথা, কামনার ধর্মীয় প্রকাশ
অশিব অনন্ত রাত্রে মড়িকাটা ঘরে দগ্ধ লাশ
চাপা আগুনের ছাই বিশ্বময় এভাবে ছড়ায়--

রঙিন ছবির নীচে অর্ধস্বচ্ছ এই ডার্করুম,
কে বলে শরীর শুধু !  মন আছে তোমার কুসুম |

.                ********************  

.                                                                                   
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
নদীর মাছ (১৯৯১)
কবি অচ্যুত মণ্ডল  

নিওলিথ জ্যোত্স্না তার মধ্যরাতে কৌমার্য হারালে
ইউক্যালিপ্ টাসের উরু ঘন সাদা পৌরুষে আহত  !
মহীনের ঘোড়গুলি ঘাস খায় ডায়নামোর আলে
অস্ফূট আলোর রেখা ধর্ষকের জিপারের মতো  |

সিঁথিতে সস্মিত সূর্য, মেঘে ঢাকা কনেবউ ভোর
রোদের পাল্কিতে যায় দুপুরের সাজানো সংসারে ;
সুপটু গৃহিনী হবে বিকেলের বিষণ্ণ আদর
চাঁদের চকিত চোখে প্রৌঢ়তার সান্ধ্য জল বাড়ে |

এই তো পৃথিবী , এই প্রকৃতিক প্রশ্রয়ের রাণী ,
আমাদের ছোটো নদী , মাছেদের ক্লান্ত বারোমাস --
অনির্দিষ্ট খেয়াঘাটে স্বতঃসিদ্ধ সবার পারানি
অথচ ওপার শোনে এপারের আসক্ত নিঃশ্বাস |

জলবিভাজন রেখা ভেদ করে ব্যর্থ চলাফেরা,
কী জানি কোথায় যায় সীমান্তের শঙ্কিত মাছেরা !

.                ********************  

.                                                                                   
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
বান্ধবীকে (১৯৯২)
কবি অচ্যুত মণ্ডল

করমচা পাতার ছায়া লেবু বাগানের দিকে গেলে
আকাশমণির ঝাড়ে দোয়েলের আধো চঞ্চলতা  |
কে যেন ঝোপের পাশে জায়মান অস্ফূট বিকেলে
বিয়োগান্ত বৃন্ত যেন --- বিষাদে বিমূর্ত মধুরতা |

মালিনী কোথায় গেলে, মন্দাক্রান্তা মোহমুগ্ধ কবি
যেভাবে দুপুর যায় জড়িয়ে  রোদের উত্তরীয়
অস্পস্ট  আলোর মতো বিকেলের বাগানে বান্ধবী
কোথায় চলেছ তন্বী আমাকেও সঙ্গে করে নিও |

ইশ্ কুলের শাড়ি পরা ভিজে চুলে শান্ত চেনামুখ
তুমি যে গিয়েছো পথে শৈশব শুভ্র পাদটীকা
ঝড়া বকুলের মতো শেফালিরা সহাস্যে ঝরুক
তরুটি তরুণী হোক  --ফুলগুলি বাগানবালিকা |

নক্ষত্রের পাপড়ি থেকে বিদায়ের অন্তিম প্রহরে
পুঞ্জিত ব্যথারাই বাষ্প ঘাসের ঝিনুকে ঝড়ে পড়ে |

.                ********************  

.                                                                                   
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
বুদ্ধ পূর্ণিমার ব্যাখ্যা অথবা বন্ধুকে খোলা চিঠি (১৯৯২)
কবি অচ্যুত মণ্ডল

কে যেন ভোরের দিকে চলে যায় কুয়োতলা ডাকে
তোমারও উঠোনে এত চাঁদ ছিল আগে তো দেখিনি
কে গেল সূর্যের দিকে পার হয়ে শান্ত স্রোতঃস্বিনী
তুমি তার নাম জানো , কোনোদিন বলো নি আমাকে !

পথে পড়ে থাকে তার তোমাদের জানালার আলো
ফাটলের হাসির দাগ, মনঃক্ষুণ্ণ দেওয়ালের কোনে
যেন ব্যঙ্গ করে তাকে -- বাধা দেয় ভোরের ভ্রমণে
যেন অনন্তের কাছে কেউ তার অভ্যেস জানালো !

পূজো পূজো রোদে এই সিঁড়িতে লক্ষ্মীর পা আঁকো
কে যেন পুবের দিকে যেতে চায়  --- চই চই হাঁস
পালক ভেজায় রোদে ব্যর্থ করে ভোরের সন্ন্যাস
তুমি ওকে ভয় পাও -- আমাকেও অন্য নামে ডাকো

দেওয়ালই উল্লম্ব হয় -- তোমাদের কবিতার খাতা
নৈরঞ্জনা সিক্ত হাতে ছিঁড়ে ফেলে বান্ধবী সুজাতা ||

.                ********************  

.                                                                                   
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
পাণিণির অনুপ্রেরণা (১৯৯৭)
কবি অচ্যুত মণ্ডল

কিভাবে আবার আমরা কথা বলবো উত্তমপুরুষে  ;
সে কিংবা তার মতো নিজেদের উঠোনে যেদিন
লজেন্সের মতো চাঁদ ক্ষয়ে আসছে নগ্ন নীল জিভে
.            আর কড়া নাড়বো ভাবতেও পারিনি !
যেহেতু বিচারমুখী পাতা শুধু ঝরে যায়
হেমন্তের সস্তা ফুলাদানি কোথায় ফোটাবে ঋতু  ?
“এভাবে ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থেকো না উঠে এসো”
বলে ব্যক্তি চলে যাবে সেও তো সঞ্চারমান
টিলা, বৃক্ষ, বসন্তের মতো ---- কোথায় গেরুয়ামাটি
বসন রাঙাবে , পাইনবীথিকাটিও নিলে
এই কুঁড়ে, ওই আলো, মাঝের আঁধারটুকু
দিলে তাও উপযুক্ত উপমা দিলে না !
কিভাবে আবার আমরা চিঠি লিখব হে মাননীয়য়াসু
মহত্তর তরবারি কেটে বসলে কদর্থ শ্রোণিতে ?

একটি প্রচ্ছন্ন দেবদারু ; কে তাকে শেখালো
এই স্বয়ম্ভর শান্ত নীরবতা, যেন কোনো পাতা নয়
বোঁটারই অনীহাটুকু লেগে আছে সবুজ বিদ্রূপে !
সে কিংবা তার মতো নিজেদের বাগানে সেদিন
কিভাবে আবার আমরা কথা বলবো উত্তমপুরুষে
কিভাবে আবার আমরা কথা বলবো উত্তমপুরুষে
না নিয়ে না দিয়ে কিছু না বানিয়ে মধ্যমরমণী |

.                ********************  

.                                                                                   
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
যন্ত্রসংগীত (১৯৯৩)
কবি অচ্যুত মণ্ডল

দিদিমণি দৃপ্ত হলে সমস্ত চাকর চলে যায়
একটি যুবক আসে বেহালা বাজাতে ছাতা নিয়ে |
হাসির অনতিদীর্ঘ মীড়ে কেঁপে উঠে পার্কে বসা বুড়ো
মিশে যাচ্ছে কুয়াশায় হাতে নিয়ে সন্ত্রস্ত রেডিও---
‘কিছু  একটু কথা বলো কিছু বলো না হলে কীভাবে’
একটি ড্রাকুলা যাচ্ছে রিক্সা নিয়ে সঙ্গে দুটি পরী
‘চল একটু দেখি তাকে, এসো গল্প করি’ |
দিদিমণি দীপ্ত হলে সমস্ত চাকর চলে গিয়ে
একটি যুবকই থাকে, কানকো তার কেঁপে ওঠে ধীরে,
অতি শুষ্ক, সমীচীন, প্রথাসিদ্ধ অত্যন্ত সমীরে --
‘আমি কি বুঝি না কিছু পাই না কি টের ?’
‘তুমি বড্ড বোকা সাজো আসলে তো গভীর জলের’ --
ঝাপটা লাগে, চোখে মুখে নোনা তরলের ঝাপটা লাগে
হাসির অনতিদীর্ঘ মীড়ে একটি যুবক আসে
ফিরে যায় ------ বেহালা বাজিয়ে , ছাতা নিয়ে |

.                ********************  

.                                                                                   
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
মহাকাব্যে নেই (১৯৯৪)
কবি অচ্যুত মণ্ডল

বস্ত্রহরণের দৃশ্য এত ভোরে দেখব তা ভাবিনি
অজস্র মিলের শাড়ি জমা হচ্ছে অক্লান্ত সড়কে
যেন ক্রুদ্ধ দুঃশাসন দিগন্তে বাড়িয়ে বাহু খুলেছে রোদের ভাঁজ
ঘন কৃষ্ণ আঁধারের থেকে অথচ কি করে তাও
রজস্বলা রমণীর রক্তে ভেসে যায় ভেবে ম্লান সভাস্থ বৃক্ষেরা
কেননা সকলে জানে এই দৃশ্য মহাকাব্যে নেই |
ওল্টানো পাতার পাশে সুনিপুণ মার্জিনের মতো
ফুটে আছে বাসরাস্তা | সমতা চিহ্নের দুটি চাকা
ছিন্ন ধূসরিত করে আরো নীল নামতার দিকে--
দীর্ঘ ল.সা.গু.র মতো পাহাড়ের গায়ে গায়ে জমি
মিশেছে কোথাও ঊর্ধ্বে প্রসারিত অসীম ভাগফলে --
যেখানে কোথাও কোনো লালফুল স্পষ্ট ঝর্ণা নেই

কয়েকটি করুণ বর্শা শুয়ে আছে ঢালের ফলকে
আর দীর্ঘ আদিবাসী রমণীর উরু উলঙ্গ শালের মতো  |
পাহাড়ের ভাঁজ ভেঙে শান্ত শাড়িটিতে কুঁচকে কুঁচকে নেমে গেছে
গাঁইতি আর হাতের পরখে নাভি যেন চিরস্থায়ী ধর্ষণ বিন্দুটি
প্রাজ্ঞ আর প্রথাসিদ্ধ পুকুরের মতো পড়ে আছে খোলা মাঠে
পার্বতীর পেট দিয়ে পরবর্তী গাঁয়ে যাচ্ছে দলবদ্ধ কালো মানুষেরা !

.                  ********************  

.                                                                                   
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
ইতিহাস (১৯৯৪)
কবি অচ্যুত মণ্ডল

আসুন ব্যবহারজীবী রাখুন এখানে  | এই টেবিলে দু’হাত
এছাড়া এই ঘরে অন্য কোনো আসবাবের প্রতি
এমনকি স্বল্প আস্থা নেই | উদ্যোক্তা ছুতোরও
এই কথা ভাল জানতো
শুধু আলগা পেরেকের থেকে ক্লান্ত শার্টটিকে
খুলে নিতে নিতে খুব অসহায় দু-কাঁধ ঝাঁকিয়ে
সব দোষ বৃক্ষকে চাপালো --
নীরস তরুটি এত রসগ্রাহী মরণের ওপারে
দুটি চিরসঙ্গী পাখিকে রেখেছে |
চৌকিতে বইয়ের তাকে টেবিলে চেয়ারে তারা ওড়ে
পাতাগুলি খুঁজে পায় না -- ফুলের সন্ধানে
দেওয়ালে দেওয়ালে যায় | শুধু আল্ গা
চুনবালি খসে পড়া দাগে অলস ঘুলঘুলি দিয়ে
রোদ পড়লে ভোরের খবর আমাকে জানায় নিয়মিত |
আশ্চর্য ফলের মতো ঝুলে থাকা বৈদ্যুতিক পাখাটির নীচে
চেরাই কলের থেকে আসবাবের দোকান পেরিয়ে
মলিন ঘরের মধ্যে অচঞ্চল বিদ্রূপের মতো
প্রতিদিন বিষণ্ণ পালিশে অস্ফূট বাকলরেখা মনে করে
মনে করে অরণ্যের দিনগুলি রাতগুলি আর প্রবল প্রচন্ড দাবানল
পুনরায় কোনো শান্ত গ্রামীণ চুল্লীতে |

.                ********************  

.                                                                                   
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর