কবি অম্বুজাসুন্দরী দাশগুপ্তার কবিতা
বঙ্গ-কুল-নারী
কবি অম্বুজাসুন্দরী দাশগুপ্তা
নমিতা চৌধুরী ও অনিন্দিতা বসু সান্যাল সম্পাদিত "দামিনী" (২০১৩) কাব্য সংকলন থেকে।


বড় ভালবাসি আমি বঙ্গকুল-নারী,
ধীরতা নম্রতা মাখা,                        ঘোমটায় মুখ ঢাকা
রয়েছে উনন-ধারে চিরকাল ধরি,
বড় ভালবাসি আমি বঙ্গৃকুল-নারী।
নয়নে কজ্জল-দাগ,                          অধরে তম্বুল-রাগ,
ললাটে সিন্দুর-বিন্দু লক্ষ্মীর আসন,
সহাস্য সুন্দর মুখ,                           সুন্দর সরল বুক,
উজ্জ্বল তারার মত আনত আনন।

*        *        *        *        *        *

বুক ভরা স্নেহ-ধারা                    পতি-প্রেমে মাতোয়ার,
স্থির সরসীর ন্যায় গম্ভীর সুস্থীর।
আঁখিভরা সুশীতল                           বরষা-গঙ্গার জল,
সফেন তরঙ্গে সদা হয় উদ্বেলিত,
উচ্চ হিয়া উচ্চ মন,                        উচ্চ কাজ অনুক্ষণ,
তবুও ক্ষুদ্রের ন্যায় পর-পদানত।
সর্ব্বদা সন্তুষ্টমনা,                           সামান্য নীহার-কণা,
একটু উত্তাপে শুষ্ক কমনীয় কায়,
একটু মলয়ানিলে                         আবেশে পড়িবে টলে
আবার সহাসে স’বে ঝঞ্ঝাবাত তার।

.    ***************  

.                                                                                               
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
বনবালা
কবি অম্বুজাসুন্দরী দেবী
নমিতা চৌধুরী ও অনিন্দিতা বসু সান্যাল সম্পাদিত "দামিনী" (২০১৩) কাব্য সংকলন থেকে।


মঞ্জরিত বৃক্ষশ্রেণী ঋতুর পর্য্যায়
কাননের স্থানে স্থানে মনসিজ যেন
ফুটন্ত কুসুম-ভার ফুলধনু করে।
বৃক্ষ হতে বৃক্ষান্তরে কোকিল কোকিলা।
মধুর ঝঞ্ঝার ঢালি করিছে গমন।
বিটপীর ঊর্দ্ধতম শাখায় বসিয়া
পাঞ্চজন্য-শঙ্খনাদ সমান সুরবে।
পাপিয়া কাননস্থলী করিছে কম্পিত।
কিমশুক কদম্ব ডালে বসিয়া আরামে।
কপোত ঢালিছে গীতি চিত্তদ্রবকর।
বরষিয়া হুলুধ্বনি বিহঙ্গ-নিকর
সীমা হতে সীমান্তরে যাত কুতুহলে ;
নীরবে বিহঙ্গ কভু তরুর কোটরে
বসিয়া ডানায় চঞ্চু করি লুকায়িত।

লতা-কুঞ্জে সুমধুর ঘুঘুর সঙ্গীত
বন নিস্তব্ধতা ভাঙ্গি হতেছে উত্থিত।
আনত পুষ্পিতা লতা ফুটন্ত কুসুম,
গন্ধময় সমীরণে চন্দনাদ্রি-সম
তুষিতে মানব-চিত্ত অতি মনোহর।
বসন্তের রঙ্গভূমি তুমি বনবালা
জলদ গম্ভীর--- কিন্তু সতত চঞ্চলা
নীরব সতত--- কিন্তু অস্ফুট নিনাদে
বিমল শান্তির স্রোত কর প্রবাহিত।

.          ***************  
.                                                                                  
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
পাগলিনী
কবি অম্বুজাসুন্দরী দেবী
রাধারাণী দেবী নরেন্দ্র দেব সম্পাদিত "কাব্য-দীপালি", আষাঢ় ১৩৩৮ (জুলাই ১৯৩১) কাব্য
সংকলন থেকে।


আঁচল ভরিয়া তুলিব লো ফুল
.                ঢালিয়া দিব লো যমুনা কোলে,
হেলিয়া দুলিয়া করিব লো খেলা,
.                সরসী যেমন লহরী তোলে।

কখনো গিরির সুদূর শিখরে
.                একেলা নীরবে রহিব বসি,
আধ-ঘুম-ঘোরে --- আধ-জাগরণে
.                ভাবিবে সকলে করুণ শশী!

কখনো নিবিড় নিভৃত কাননে
.                এলাইয়া দিয়া চুলের রাশ
বসি তরুমূলে শুনিব বিরলে
.                বন-সারিকার মুখর ভাষ!

কখনো বা ফুলে সাজি ফুলময়ী
.                বনদেবী সম করিব মান,
লতিকার ছায়ে বসিয়া কখনো
.                কোকিলার সম করিব গান!

চাঁদের কিরণে উজল হইয়া
.                কুসুম শয়নে রহিব শুয়ে
মৃদুল বাতাসে ঘুমাব’ হরষে
.                শেফালি যোমন ঘুমায় ভুঁয়ে!

কভু বা পরিয়া নানা আভরণ
.                সিঁদুরে রঙীন করিব সিঁথি,
কভুবা ফেলিয়া বসন ভূষণ
.                জাগাবো জীবনে আদিম স্মৃতি।

কভু এলোকেশে স্লথ অঞ্চলে
.                সারা নিশি রবো কুসুম বনে
চন্দ্র আমারে চুমিবে আদরে
.                তারা হেসে চা’বে নয়ন কোণে।

কুঞ্জ কাননে নব-জল-কণা
.                ধুইয়া দিবে গো এ দেহ-লতা,
শিশিরে ডুবায়ে আধেক অঙ্গ
.                শ্বেত সুঁদী সম শোভিব তথা।

আ’মরি কি সুখ! কি সুখ আ’মরি---!
.                পাগলিনী সবে আমারে কয়,
আমারি বিশ্ব---নিখিল আমার---
.                এ ভূবন আর কাহারো নয়!

আকাশের তারা ধরণীর ফুল
.                সাগর লহর আমারি সব
আমারি কারণে কানন ভূধর
.                আমারি কারণ পাখীর রব!

যেথা খুশি যাই, যাহা খুশি খাই
.                মনের সিখেতে বেড়াই ঘুরে,
পাগলিনী হ’য়ে বেঁচে আছি আমি
.                সাধু মরে গেছে স্বরগ পুরে!

.                  ***************  
.                                                                                   
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
আত্মার মঙ্গল
কবি অম্বুজাসুন্দরী দাশগুপ্তা
দেবীপ্রসন্ন রায়চৌধুরী সম্পাদিত “নব্যভারত” পত্রিকার চৈত্র ১৩০৮ (এপ্রিল ১৯০২) সংখ্যা
থেকে।


হে দেব! জীবনলীলা করি পরিহার
চলিল স্বরগ ধামে বিনয় আমার।
হে পিতঃ! হে পরমেশ! ভকত-বত্সল!
জীবের আশ্রয়স্থল আত্মার মঙ্গল!
ত্যজি ধন, ত্যজি জন, শিশু মম যায়,
ডেকে লও ডেকে লও স্নেহ মমতায়।
হে প্রভো! হে বিভো! ভব-সিন্ধুর কাণ্ডারি!
ভবেশ ভারব-ভীম-ভব-ভয় হারি!

নিতান্ত চলিল শিশু তোমার আশ্রমে,
সুবাস করিয়ে রোখো চরণ-কুসুমে।
নিবেদন করে তায় দুঃখিনী জননী
তাপিত সে শিশুটিরে কোলে লও তুমি।
আহা, কত কষ্ট পেয়ে মোর সে গিয়েছে চলে,
তুলে লও কোলে প্রভু তুলে লও কোলে।
জীবের ভরসা তুমি জীবনে মরণে,
চরণে যেতেছে শিশু রাখিও চরণে।
জগন্নাথ, জগবন্ধু জগতজীবন!
দীনবন্ধু প্রিয় তব দীন হীন জন।
চলিল গো দীন নাথ শিশু দীন হীন
রোগাগুণে দগ্ধীভূত বদন মলিন,
তোমার চরণতলে, চৈতন্যস্বরূপ!
একমাত্র শান্তিদাতা এক মাত্র ভূপ!
আশীর্ব্বাদ করি আমি নয়নের জলে
তব কাছে পাঠালেম তুমি লও কোলে।
জগদীশ, সে আমার হৃদয়ের ধন
করিলাম তোমার চরণে সমর্পণ।
জগতের অলঙ্ঘনীয় নিয়তি নিয়ম,
লঙ্ঘন হউক ইচ্ছা নাহি প্রিয়তম!
গেল শিশু তব কাছে শোক নাহি তায়,
তুমি তারে স্থান দিও চরণ-ছায়ায়।
রোগে দুঃখে শান্তিহারা শিশু অসহায়,
চলিল তোমার পদে শান্তির আশায়
আত্মার উপরে তার নিত্যনিরঞ্জন!
শান্তির সন্তেষ-উত্স কর বরিষণ।
পিতা মাতা ভ্রাতা ভগ্নী ত্যজিয়া সকলে,
শরণ লইল তব চরণ-কমলে।
ত্যজি রবি ত্যজি শশী ত্যজি বন্ধুদলে,
শরণ লইল তব চরণ-কমলে।
হে শুভ! হে শিব! সনাতন সুধাকর!
হে অনন্ত! হে অব্যয়! হে সত্য শঙ্কর!
চরণ-সরোজে তারে এক বিন্দু স্থান
সৃষ্টি স্থিতিকারী হরি করহ প্রদান।

তোমার নিকটে যাবে আর কারে ভয়
অভয় আনন্দ দান করহ অব্যয়।
বড় আদরের সে যে বড় সোহাগের,
বড় আবদারে সে যে অগাধ স্নেহের।
তোমার নিকটে যাবে এই ভরসায়
পাষাণে বাঁধিয়া হিয়া দিলাম বিদায়।
রোগ জ্বালা দুর্ব্বলতা সব হবে দূর,
আনন্দ আলয়ে পাবে আনন্দ প্রচুর।
কি বলিব দুঃখকথা প্রভু ভগবান!
সেই জ্যেষ্ঠ সেই শ্রেষ্ঠ সেই সে প্রধান
সন্তানের মধ্যে মম সব জান তুমি,
অন্তরযামীর কাছে কি জানাব আমি।
তথাপি তাহাতে দুঃখ করি না ঈশ্বর
তুমি তারে সুখ শান্তি দিও নিরন্তর।
আমি পাপী মহাপাপী মহা দুঃখানলে
অবশ্য হৃদয় মম যাইবেক জ্বলে।
হৃদয় হউক মম পুড়ে ছারখার
তাহারে রাখিও সুখে মিনতি আমার।
আত্মাতে আনন্দ তার উঠুক বিকাশি
বসন্ত কুসুমে যথা সুবাসের রাশি।
অতৃপ্তি অভাব পূর্ণ অনিত্য এভব
বিষতুল্য যাবতীয় বিষয় বিভব।
অল্পকালে ত্যজি সব পবিত্র বালক
চলিল তোমার কাছে পৃথিবীপালক।
সুশীল সুবোধ সে যে ধার্ম্মিক সরল
জগদীশ কর তার আত্মার মঙ্গল।

স্বর্গগত বিনয়ভূষণ দাশগুপ্তের মৃত্যুতে এই শোক-কবিতা লিখিত হইল।

.                  ***************  
.                                                                               
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
সুপণ্ডিত চন্দ্রকান্ত তর্কালঙ্কার মহাশয়ের মৃত্যুতে
কবি অম্বুজাসুন্দরী দাশগুপ্তা
দেবীপ্রসন্ন রায়চৌধুরী সম্পাদিত “নব্যভারত” পত্রিকার ফাল্গুন ১৩১৬ (মার্চ ১৯১০) সংখ্যা
থেকে।


.                ১
কি শুনিনু আজি হায় পণ্ডিত প্রবর
চন্দ্রকান্ত মহাশয় নাহি এ জগতে,
ছুটিয়াছে দেশব্যাপী লোকের লহর,
ভাসিছে ভারত, বঙ্গ অশ্রু-বারি-স্রোতে।

.                ২
চন্দ্রতুল্য দীপ্তি যাঁর ব্যাপ্ত চরাচরে,
চন্দ্রকান্ত মণি তুল্য যাঁর উজ্জ্বলতা,
তিনি আজ ডুবাইয়া শোকের সাগরে
স্বদেশ বিদেশ হায়, নাহি স্বরে কথা,

.                ৩
চলিলেন মৃত্যপুরে, যাঁহার কারণ
প্রধান পণ্ডিতগণ মিলিয়া কাশীতে
মহতী সমিতি এক করিয়া গঠন,
করিয়াছেন শোক ব্যপ্ত করুণ ভাষাতে।

.                ৪
স্বরগ হইত সৃষ্টি যাঁর বক্তৃতায়,
যাঁর সম সুপণ্ডিত নাহি বঙ্গ-ভূমে,
কোথায় গেলেন তিনি মরি হায় হায়,
আবরিয়া বঙ্গভূমি অন্ধকার-ধূমে!

.                  ***************  
.                                                                               
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*