কবি অমিতাভ গুপ্ত-র কবিতা
*
বুলন্দ্ দরওয়াজা

সমস্ত আক্রোশের আছে নিজস্ব প্রকাশভঙ্গি যা প্রেমের নেই
আক্রোশের প্রকাশধরনের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে আক্রোশীর জাতিগত কিংবা ভাবগত
লক্ষ্ণণ চিনে নেওয়াও কঠিন নয়
কিন্তু তার আগে বুঝতে হবে বুলন্দের দরজাকপাট কোনোদিন বন্ধ ছিল কিনা
দরজাটির পেরেকগুচ্ছ আসলে প্রণয়োন্মুখ নাকি হিংস্র এ বিবেচনার চেয়েও জরুরী
শিশুর মতন ওই কপাটদু’টিকে আজ কথা বলতে দেওয়া
শিশুরা কী বড়ো হবে কোনোদিন ? মনে করা যাক অজাত ও সদ্যোজাত শিশুরা সবাই বড়ো হয়ে উঠেছে
অর্থাৎ বুলন্দের কপাটদুটিও হাঁটতে শুরু করেছে টলোমলো পায়ে কথা বলছে আবোলতাবোল


সত্যিই আর কতদিন অপেক্ষা করব বুলন্দ্ দরওয়াজা তোমার বড়ো হয়ে ওঠার জন্যে
আমাদের উত্সবের আর্তির মতো আচড়ে পড়ছে আরাবল্লী পাহাড় দিগন্তের উপর
কেল্লাদুর্গের মতো গড়ে উঠছে ছোট ছোট স্থলবিভাজনরেখা
এখানে আমরা একদিন পৌঁছতে চাইব যেতে চাইব বুলন্দ্ দরওয়াজার খুব কাছাকাছি
নবজাতকের মুখে অন্ন দিতে নামগোত্রকূলশীল দিতে
কিংবদন্তীর সূত্রে মনে হয় এখানেই অগ্রদ্বার, এরই পরপারে এক সোনার দেশের মতো মায়াবি
ও তীব্র মালভূমি
এখানে দাঁড়িয়ে হয়ত ইতিহাস ভেদ করে কেবল আক্রোশে নয় ঝর্ণাপ্রপাতের শুশ্রুষাও
খুঁজে নেব, রেখে যাব বুলন্দের দীর্ঘ বুকে, অজাত ও সদ্যোজাত শিশুদের স্বপ্নের গভীরে


সত্যিই আর কতদিন অপেক্ষা করব বুলন্দ্ দরওয়াজা তোমার খুলে যাওয়ার জন্যে
আমরা কী এখনো দরজার ভিতরে আছি ? বাইরে রয়েছি ? অর্থাৎ
দরজা খুলে যাওয়ার অর্থ আকাশকে ভিতর থেকে যেরকম দেখা যায় তারই গঠনচ্যুতি, দরজা
খুলে গেলে
কীভাবে নতুন কোন্ প্রতিজ্ঞা বা অভিনব বিষাদের শুরু হবে ? কত দীপ্ত বৈশাখের নবীনতা
নিয়ে কত অন্তর্গূঢ় ভোর
জ্বলে উঠবে, কত দীপ্ত নবীনতা মুছে বৈশাখের আঁধি


আঁধির ধুলোর মতো ভোরের দীপ্তির মতো এইসব প্রশ্নকে মাড়িয়ে
আঞ্চলিক বুড়োভাম নিজামুদ্দিন এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে, চৌকাঠে দাঁড়িয়ে আমরাও
দুলে উঠেছি, তাকিয়ে রয়েছি ওর ধুলোমাখা কুয়াশায় পোড়া চ্যুত গঠনের দিকে
বুড়োভাম গাইডের মতো ও কী ঝাঁপ দিয়েছিল কবে বুলন্দের উঁচুমাথা থেকে
খোঁড়া হয়ে ধুলো মেখে আজো বেঁচে আছে
ওর বউ প্রতিদিন আঁধি জাগাবারআগে গা ধুতে নেমেছে সেই আগ্রা কিংবা অগ্রদ্বারনগরের সবচেয়ে
.                                                                                      পুরোনোপুকুরে
অতর্কিত তুলে আনে একমুঠো পদ্মফুল---- কবে কোন গণতন্ত্রে হয়ে উঠবে ভোটচিহ্ন, জেনে বা না জেনে

এইসব ভ্রমণের আগে--পরে কিছু কিছু ব্যর্থ প্রণয়ের গল্প বন্ধুসখীদের কাছে আমরাও শুনেছি
নিশ্চয়
তবু তীচেয়ে স্পষ্ট এখানে এখন আরো ফতেপুর সিক্রির পাথরের গায়ে
করুণামধুরভাবে হেলে পড়েছে বুলন্দ্ দরওয়াজা যে  সঈদ নিজামুদ্দিন আর তার বুয়ের সংসার
ফতেপুর সিক্রিতে কোনো ধ্বংসস্তুপ নেই ? কোনো আবেগ বা সংকোচন নেই ?
তবু তার চেয়ে স্পষ্ট এখানে যে--নিরবধি মাঠ
স্থির চোখে চেয়ে আছে ফতেপুর সিক্রির খিলানে জড়িয়ে যাওয়া জটার মতন মেঘরেখাটির দিকে
এখানেই একদিন এ’ মাঠেই প্রসারণক্ষমতায় ব্যর্থ হয়েছিল কোনো সংগ্রামসিংহের রণনীতি
তবু তার চেয়ে স্পষ্ট জৈষ্ঠ্যের বিহানবেলা নিজামুদ্দিনের বই আশমানবিবির স্নাত স্নিগ্ধমুখে
.                                                                  অকালের পদ্ম ফুটে ওঠে
তারপর মুখোমুখি হলাম আমরা বুলন্দ্ দরওয়াজার, হয়ত শেষবারের মতো
হয়ত মুখোমুখি হওয়া এ’ নয় যেহেতু ইতিমধ্যে কপাটদু’টি
হাঁটতে হাঁটতে চলছে মাঠ পেরিয়ে, সংসার ছেড়ে চলে--যাওয়া নিজামুদ্দিনের সন্তানসন্ততির মতো
তার অধিকৃত শিশুসাম্রাজ্যের প্রতিবেদনার মতো পদ্মাংশ কী খুঁজে পাবে আমাদের ভ্রষ্ট মূঢ়
.                                                               অবরুদ্ধ কবিতার ভাষাকে
যখন উত্তরদিকে উপবীত মার্জনা করেছে শববাহকেরা যেন সংগ্রামসিংহের সব অভিযান
মুছে যায় পূর্বাঞ্চলে বেজে উঠেছে নমোশূদ্রদের বেদপাঠ
যেন ধর্মসাপেক্ষ নয় এরকম হতচকিত আত্মাদেরও পুনর্জন্ম ঘটে
দক্ষিণের মন্দিরস্থাপত্য থেকে সারীসেনিক শিল্পের অসারতা পর্যন্ত থাক বলহরি হরি হরি বোল
ধ্বনিতরঙ্গের ফাঁসে মধ্যক্ষেত্রে জড়ো হোক অন্ত্যজবামুন


অর্থাৎ মৃত্যুর শেষে, বুলন্দ্ দরওয়াজা যেন বারবার জন্ম নেয়, মরে
কখনো জন্মের আগে রাত্রি জাগে সমস্ত মৃত্যুর আগে তবু ভোর হয়
শত আষাঢ়ের কান্তি ঋতুচিহ্নে, শ্রাবণ পেরিয়ে যাওয়া শ্রাবণের পূর্ণিমায়,
.                                                তারপর অনিঃশেষ শরতের রাতে
অবিকল নক্ষত্রমালার মতো আকাশে আকাশে যেন ভারতবর্ষফুটে ওঠে
আবার হারিয়ে যায় কত তীক্ষ্ণ কুয়াশায় ঋতুহীন দিনরাত্রিহারা কত আঁধির আঘাতে


যেভাবে তরাইযুদ্ধ জয় করে আইবক সাতাশটি হিন্দুমন্দির ভেঙে কুবাত--উল --ইসলাম গড়লেন
কয়েক শতাব্দী আগে বৌদ্ধচৈত্য টুকরো করে এইসব মন্দির গড়া হয়েছিল
এখন মন্দির নেই কোনো বৌদ্ধস্তুপ নেই মসজিদটিকেও চেনা যায় না তেমন
যেভাবে কুশাগ্রপুরে শৈব উপাসনাঘর ভেঙে দিয়ে বৌদ্ধনেতারা
রাজগৃহ বানালেন, এখন মাটির নীচে পড়ে আছে সেইসব কুশাগ্রপুর--রাজগীর
অনার্যধর্মীর নাগদেবতার মঠটিও পড়ে আছে অর্ধপ্রোথিত
উর্দ্ধে অধে রসাতলে ভূলোকে দ্যুলোকে যত অযুত নিযুত ধ্বস্ত নীহারিকাদের চিহ্ন পারাপার
করে
এবার দেখছি আমরা বুলন্দ্ দরওয়াজা যেন একবার থমকে দাঁড়াল
আগ্রার নগরসীমা পার হয়ে দিল্লির প্রসারিত হাতের নাগালে
বিহ্বল তর্জনীর মতো একটি লোহার খুঁটি দেখে নিল মেহেরৌলি গ্রামে
বুলন্দের হাত ধরে নিজামুদ্দিনের সারা সংসারের হাত ধরে আমরাও চলেছি তখন কোনো
দিল্লিগ্রামবাসী
পলাতক কমরেড দিলীপকুমার বসু নন্দিতা বসুর সন্ধানে
আমরাও থমকে দেখলাম লোহার খুঁটির গায়ে কোনো এক চন্দ্রবর্মার
সশরীর স্বর্গারোহণের উপকথা
শুশুনিয়া পাহাড়ের শিলালিপিতেও খোঁজ পাওয়া যায় চন্দ্রবর্মার
এক নাম একই ব্যক্তি ? নৌসাধনোদ্যত বাঙালির প্রাগিতিহাসের
কীর্তিপুরুষ কোনো ? কৈবর্ত কেওড় বাগদী নিষাদের অব্রাহ্মণ নেতা
প্রতিহত করেছিল উত্তরভারত থেকে ছুটে আসা সাম্রাজ্যশক্তিকে
রাজচক্রবর্তীর গৌরবমোচনদৃশ্য রচিত হয়েছে বুঝি শুশুনিয়া পাহাড়ের পেশির পাথরে
আর মেহেরৌলি গ্রামে
মর্চে না--পড়া ওই বিচিত্র লোহায়
বুলন্দের হাত ধরে দিলীপদা ও নন্দিতার হাত ধরে দিল্লি পেরিয়ে যদি শুশুনিয়া পাহাড়ের দিকে
চলে যাই ? আদিনায় পান্ডুয়ায় বর্দ্ধমানেশ্বরের মন্দিরে
রাম লাহিড়ীর মতো রহিম শেখের মতো সারিপুত্ত কবীরের মতো স্বাভাবিক চাঁড়ালকে হয়ত দেখব
ধর্মের ছায়া ছুঁয়ে অচ্ছুৎ হয়েছে বলে বুকচিরে রক্ত দিতে যায়


চাঁড়ালের বুক থেকে ঝরে পড়া রক্তের দাগের মতো আক্রোশের অভিজ্ঞান বিবর্ণ হয়েছে
নাকি এখনো ঝলক তোলে চাঁড়ালের উঠোনের পঞ্চমুখী জবার মতন
এসব প্রশ্নের কাছে বোবা বা বাচাল সেজে আমরা বিরাট হব ? বুলন্দ্ দরওয়াজা হয়ে
.                                                        বুলন্দ্ দরওয়াজার
মুখোমুখি দাঁড়াব কি ? চলে যাব অভিনব যুগে
যখন আক্রোশ নেই প্রেমের প্রৌঢ়তা নেই সশরীর স্বর্গারোহণের মতো সশস্ত্র রম্যকথা নেই
বুলন্দ দরওয়াজার চেয়ে আরো বড়ো আরো আরো বড়ো ?  অথবা এমন যদি হয়
ছোট ও কুঁকড়ে যাওয়া চৌকাঠের বদ্ধমূলে ভারি কিংবা অনড় কপাটে
আমাদের ছোঁয়া লেগে বুলন্দ্ দরওয়াজা আজচরিত্র পাল্টায়
বিন্ধ্যে হিমাচলে যমুনায় গঙ্গায় দ্রাবিড়ে উত্কলে বঙ্গে যখন দ্রুত শ্বেত কপোতের মতো
উড়ে আসে পুলিশের গুলি



কংগ্রেস নকসাল কিংবা এসইউসি সিপিএম হিঁদু বা মোচলমান শিখ কিংবা কেরেস্তান যে কোনো মায়ের
ছেলের পাঁজরে গুলি বেঁধে আর ছেলেটিও রাস্তার পিচে মুখ ঘষে
জল চায়, দ্বিতীয় গুলিটি তার কপালের মাঝখানে টিপ দিয়ে যায়
বুলন্দের মনে পড়ে রূপ কানোয়ার তার ভাইয়ের কপালে টিপ টিপ দিয়েছিল যমের দুয়ারে কাঁটা এঁকে
ভাইদ্বিতীয়ার দেশে আর দুধেভাতে থাকিবেকসন্তানের দেশে আর মধুমিতা নরুলের দেশে
বরানগরের গলিঘুঁজিতে ও আরোয়ালে তারাতলা ক্রসিং-এ বসিরহাটে গুজরাটে খালসা বস্তিতে
বুলন্দ্ দরওয়াজা তবে আমাদের মতো ছোট পোকার মতন নম্র হয়ে
সমস্ত দেখেছে ? কেন ?  কিছুই ভাবেনি ? কেন ? কিছুই বলেনি ?  কেন ? কেন?
বুলন্দ্ দরওয়াজার সামনে দাঁড়িয়ে আজ দিলীপদা ও নন্দিতার আদিম সন্তান যদি
.                                                 হঠাৎ ‘কঠিনভাবে চিত্কারকরে ওঠে’
কী দেখেছ বলো
সৈকত ও শুকতারার আগামীদিনের কলহাস্যময় স্বর যদি হুকুম করে
কী ভেবেছ বলো
বিশ শতকের কাছে এসে যদি নিজামুদ্দিনের মূর্খ বউ
আড়ষ্ট লাজুকভাবে প্রশ্ন করে, হত্যা পাপ নয় ? বলো রাষ্ট্র যদি হত্যা করে রাষ্ট্রপাপ নয় ?



মেহগনী কাঠের সাবলীল ভঙ্গিতে এবং পিতলের গজালে কী ধারণ করে রয়েছ তুমি
কুতুবমিনারের চেয়ে উঁচু এবং টাটা সেন্টারের চেয়ে একটু নিচু হয়ে কী ধৃতি তোমার


কোন্ মনীষার মেধা বুলন্দ্ দরওয়াজা থেকে লাফিয়ে পড়েছে ওই বিদেশীদের অফসেটে
যদিও সন্দেহ হয় আর্য বলে কোনো জাতি ছিল কিনা, অ্যাগ্লুটিনেটিভ ভাষা বেঁচে আছে কিনা
আদি বাইবেলের পুঁথি কুড়িশতকের বেশি পোরা ছিল কৃত্রিম কলসে
ফলে পচে গেছে
প্রতিটি রুকের আগে উত্কীর্ণ অক্ষরমালার অর্থ আজ আর জানা নেই, আরবীলিপির
সামগান, বৈদিক হোমচর্যা দ্রাবিড় পূজায় মিশে যাবে ক্রুশকাঠ বহে আনে শূদ্র ও সাঁওতাল
.                                                                     ইনকা রেড ইন্ডিয়ান
তখনই আবার শূঁড় নড়ে ওঠে লোকায়ত দেবতার, মূর্তি গড়া হয় তার বৌদ্ধস্তুপের আদলে


অর্থাৎ, ধীরোদত্ত সৃষ্টিপুরুষ আর পদ্মিনী প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ মিলনকল্পের মতো সমন্বয় যদি ঘটে যায়
চূর্ণমণির মতো হেমন্তের শিশিরের ফোঁটা যদি তৃণের মুকুরে রাখে সীতাপথচারী কোনো কৃষকের
.                                                                                    তরুণ শরীর
অর্থাৎ, সমন্বয় যেখানে আনুপাতিক সেখানে ধর্ম নয় ধর্মপ্রতিষ্ঠান নয় মানুষের শিল্প শুরু হয়
শোষিতের ক্লান্তি আর অপমানিত’র অভিমান
যে--মন্ত্রধ্বনিতে খুঁজে পাওয়া যায় তার কোনো প্রতিষ্ঠানসীমা নেই নীলরক্ত পীতরক্ত নেই
আল্লাহ্ তোমাকে ক্লেশ দিলে তিনিই মোচন করবেন
ঈশ্বর তোমার জন্য মঙ্গল চাইলে তাকে রোধ করতে পারবে না কেউ
এ’ শপফ তরঙ্গিত আকাশের দ্রুত তরুণীর আর দেবদূতদের
আর্তি বলে, যা কিছু রয়েছে এই গোচরে ও অগোচরে সবই রূপচিহ্ন তাঁর
তাঁরই রূপভাষা থেকে কথা জাগে, তাঁরই রূপনৈঃশব্দের স্তবে যেন নয়নক্ষমার মতো কথা ঝরে যায়
ক্লান্তি দুঃখ অভিমান গান গেয়ে ওঠে
তখনই আবার দ্রুত অট্টহাসির মতো ছুটে এলো দেবানাম্ পিয় পিয়দশী মামুদের অশ্বখুর
কলিঙ্গযুদ্ধের শেষে শুদ্ধশান্তভাবে হেসে শঙ্করাচার্য যেন জানালেন অহিংসাই ভালো তবে কেউ যদি ফের
স্পর্ধা দেখায়, যেন কলিঙ্গবাসীর দশা ভুলেও না ভোলে


বলো জ্ঞানী বলো দুঃখী আমাদের আর কত বুলন্দ্ দরওয়াজা বাকি আছে
বরং অন্যতর উনিশ শতকে এসে রামকৃষ্ণ শিবনাথ শাস্ত্রীর
ব্যক্তিগত ধর্মসমন্বয় আর আউলবাউল দরবেশ
সমূহ কীর্তন
বেজে ওঠে একবার মাত্রাবৃত্তে স্বরবৃত্তে সামিল পয়ারে


যখন অনেকদূরে রবিঠাকুরের ঘর, হরিনাথ কাঙালের জেদী লড়াইয়ের ডাক, এলোমেলো দুরন্ত স্টেশনে
নিয়নসাইনজুড়ে আরোপিত তখনো মেঘের রাত, লিটল ম্যাগের মতো ভারতী ও গ্রামবার্তা জ্বলে উঠে
চকিত মিলালো
সেকি অপঠিত ছিল যেহেতু ট্রেনের গতি তখন সম্পূর্ণ দ্রুত নদীর আবেগ ছুঁয়ে বাঁক নিল ব্রীজের গভীরে
ভাঙা মিনারের কাছে প্রার্থনাপর্যায় পূজা অবসান প্রতীক্ষা বিরহ আরো কিছুক্ষণ পরে
রেডফোর্টের ওই ধ্বন্যলোকে কে যেন তখন ডাকবে বন্দেমাতরম্ তবু মনে রেখো তবু
ধর্মযুদ্ধের প্রিয় বীজমন্ত্রে সরলাদেবীর সঙ্গে সুর দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেই
যা ব্যবহার করেননি পন্ডিত ওঙ্কারনাথ
হাজারবছর পরে শিবাজী উত্সবের তাত্পর্য নিয়ে তর্ক ঘনিয়ে উঠবে রবীন্দ্রনাথ সরলার
হাজারবছর আগে পাকিস্তান রেডিয়োয় বড়ে গোলাম গাইবেন বন্দেমাতরম সেই পুরোনো সুরে


এভাবে কয়েকটি স্বপ্ন যার আবরণ নেই হয়ত অবয়বও নেই, ছড়িয়ে আছে
স্বপ্ন ও রাত্রির মিশে যাওয়া হয়ত আনুপাতিক হয়নি সুসামঞ্জস্য ঘটেনি এখনো
রাত্রিতাড়িত মানুষের মতো এই আমরাও স্বপ্নাদ্রষ্টাদেরও সঙ্গে অসংলগ্নভাবে
হেঁটে চলেছি অনিশ্চিত ও অনির্ণীত পৃথিবীবিশ্বের দিকে সেলিম চিস্তির কবরের দিকে
যেখানে সন্তানলাভের আকাঙ্খা আর ভালবাসার শুভেচ্ছা বিনিময় করাও সম্ভব
যেখানে প্রাক্ইতিহাসের মর্মররেখার টানে নিগ্রোবটু নারী ও পুরুষ গড়ে ওঠে
কালো তাজমহলের মতো
বর্ণবিপরীতের এই সুষমায়ই সমস্ত মর্মরে আজো আদিমহাবীজের শূভ্রতা
কতদিন পরে বুলন্দ্ দরওয়াজার হাত ছাড়িয়ে ছুটে যাচ্ছি  আমরা
আদিমহাবীজের মতো মর্মরের দিকে শিল্পের দিকে শিশুদের দিকে



এমন হতেও পারে বুলন্দ দরওয়াজা নয়, অন্যসব দরজাজানলাই
ছোট ও সংক্ষিপ্ত হয়ে খাঁচার মতন হয়ে গেছে তাই সজ্জিত পাখির মতো খাঁচা আলো করে
আমরা রয়েছি বসে : সজ্জা মানে ফেজটুপি পৈতের গিঁট
জর্ডনের জলে ধোয়া পবিত্র পিস্তল আর অযোধ্যা বাবরি রামশিলা
যখন বেসেছি ভালো খাঁচাকেই কালো তাজমহলের চেয়ে সেলিম চিস্তির শাদা জাফরীর চেয়ে আরো বেশি
কানে ও নোলকে পরে মুক্তোর মতন যত আজারবাইজান রোম চেরানবিল পেন্টাগণ জাকার্তা
আউসেভিংস
সেজেগুজে বসে
নরম তলতুলে মিষ্টিশিকের এপার থেকে দেখছি উঁকি মেরে
আমাদের চকিত বিবস্ত্র সত্য আমাদের ডানার পালক আজ
গুরুমশায়ের বুকে ছিটকিনির মতো আটকে যায়


তবে কী আমরা সব পোষাক আশাক খুলে বনে চলে যাব
ন্যাংটা হয়ে উড়ে যাব, পক্ষিতীর্থম্ থেকে ভোগ খুঁটে আরাবল্লী টপকিয়ে অসমাপ্ত ভ্রমণসূচির
বুকফাটা হাসি খুঁজে নেব
যদিও ন্যাংটা কিংবা সবস্ত্র যাই হোক, পাখি বা মানুষ, ওই চাঁদের মতন ঝুলে থাকা
স্টার ওয়ার জ্যোত্স্না দিতে পার্থক্য করে না কোনো যেভাবে ভাগলপুরে
হালকা মেশিনগান পার্থক্য করেনি
যেভাবে এখন বাগবাজারের খালে জমে--ওঠা ছে’চল্লিশ সনের মুসলমান মাঝিদের লাশে
আর সত্তরদশকে উভয়বাংলার গণহত্যাকারীদের অতুল কৃতিত্বে কোনো পার্থক্য ঘটেনা
যেভাবে সোমেন চন্দ রামবাহাদুর সিং সফদার হাসমি আর রাজু দাস রঘুনন্দনের মুখ
.                                          হেমন্তের শেষরাতে অতিনৈসর্গিক
মথিত জ্যোত্স্নায় যেন এক হয়ে য়ায়
একটি মিলিত মুখ ধীরে ধীরে ঝরে যায় শেষ হেমন্তের রাতে হেমন্তের শিশিরে জ্যোত্স্নায়
এখন বসন্তকাল | প্রথমে ছত্রাক ফুটবে বুলন্দ দরওয়াজায়, একটু পরেই
ফুল ফোটা শুরু হবে | ধৃতমীনশরীরে ধৃতকূর্মশরীরে জেগে উঠবে বলরাম আরো একটু পরে
ততক্ষণ এই হাওয়া চিরফাল্গুনের হাওয়া আমাদের টেনে নেয়বুলন্দ দরওয়াজা থেকে
বুলন্দ্ দরওয়াজায়
এই চিরফআল্গুনেই না হয় ঘটুক তবে খান্ডবারণ্যের প্রস্তুতি
এই চিরফাল্গুনেই না হয় লুন্ঠন হোক রায় পিথৌরার
এই চিরফাল্গুনেই মা হয় উঠুক ঝলসে নাদির শাহের তরয়ালে

তখন আমরা যেন অসমাপ্ত বুলন্দ্ দরওয়াজার মতো পর্যটনস্পৃহার অধিক
বাংলার পুকুর মাঠ আলপথ থলকমলের দল ছুঁয়ে ছুঁয়ে কথা বলি, কোল ভীল শবরের
.                                                                         ধ্রুব মানবতা
যে--ভাষায় আজো বেঁচে আছে
বাংলার পুঁথির মতো ছিন্ন মাটির কাছে শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের পুঁথি গুঁজে রাখা খড়ের চালায়
বাংলার পটের মতো ক্রমশ মলিন হয়ে ক্রমশ ধূসর হয়ে যাওয়া সেই গোধূলির কাছে
কোটি কোটি মানুষের নিরন্ন দিনের কাছে ফুটে ওটা গোধূলির মতো গোধুলিতে
অন্ধকারে কচুরিপানার মহাবিন্যাসের কাছে দূর্বাঘাসে
কীভাবে কোথায় সত্য, খুঁজে পাব কীভাবে কোথায় সত্য কুন্ঠিত কুঁড়ির মতো অপেক্ষায় আছে        


কোন্ আর্তজিজ্ঞাসার রূপ ও সংঘাত নিয়ে তবু এসো এসো
এসো আধফোঁটা  শিশু এসো বিকশিত হ্রদ এসো এসো ঝরে--যাওয়া আকাশ আকাশ
আকাশের মতো আর শিশুর মতন আর গভীর হ্রদের মতো প্রাণ, মনে পড়ে
প্রথম সৃষ্টির রাত, কালপুরুষের রুদ্রবীণা
বেজে উঠেছিল কত ঋতুচক্র পার হয়ে সূর্য বিশ্বের হৃদস্পন্দনের মতো কতো পলে ও মুহূর্তে
.                                                                        কালে কালের অকূলে
আমরা দেখেনি তার রক্তখদ্যোতের মমেতা এন্ড্রেমিডা ? রোহিনীর ভ্রূরেখায় কত
কৃষ্ণগহ্বরের বিস্ময় বিস্ময়
নিরঞ্জন করিনি কি ? ক্ষমা কোরো তবু ক্ষমা কোরো
তার জ্যোতিসম্পাতের দিকে এই আবেগের প্রবণতা হারানো সন্ধ্যায় কোনো দীর্ণস্মৃতি বুকে
.                                             সান্ত্বনা যাবে না রেখে কবিতার সামান্য ভাষায়
তবু ক্ষমা করো গান করো কথা বলো, আদিম সন্তান হোক স্পর্শাতুর, ডানায় ডানায় আলো
.                                                                নিয়ে যাক্ নীড় থেকে নীড়ে
শূন্য ও পূর্ণের সীমা পার হয়ে এসো এসো, যেখানে প্রাণের কাছে প্রথম সৃষ্টির মতো
.                                                মহাজিজ্ঞাসার মতো প্রাণ শুরু হয়


আশমানবিবির গর্ভে তারই রূপকথা জাগে, স্তনে দুধ, এতদিনে কোন্
সত্যকে ভ্রূণের মতো গর্ভে গর্ভে গোলাপের অঙ্কুরে অঙ্কুরে
ক্রমশ স্পন্দিত বলে মনে হয় ?  কোন্ সত্য ? এতদিন গোলাপের মতো রোদ
দিলীপদা ও নন্দিতার নতুন সংসারে বুঝি ছড়িয়ে পড়েছে
এই রোদ গৃহদেবতার মতো তোমাদের ঘরে ঘরে, এই রোদ দিল্লির বিধ্বস্ত খালসাবস্তিতে
এই রোদ শিশুদের গালে
এই রোদ ঈশ্বরের এই রোদ আল্লাহের এই রোদ গৌতম বুদ্ধের মুখে ভোরের মতন স্মিত
.                                                                                     তবু
একি সত্য ?  একে সত্য বলে ?
গোলাপ গোলাপ যদি জাগে, জাগে রূপকথা, রোদের আভায় যদি জাগে প্রাণ ফুটে উঠবে
.                                                                        কোন্ ফাল্গুনের
সম্পূর্ণ রক্তিম সত্যে, যৌবনের সম্পূর্ণ ফাল্গুনে
হয়ত ফাল্গুন তবু এসেছিল আমরা পাইনি টের, লহনদিঘির পাশে ভুঁইচাঁপা কালকেতু
.                                                                       বুনো রামনাথ
ফুল ফোটা শুরু হয়েছিল তবু লক্ষ না করে
নিজস্ব কলেজ স্ট্রীটে ফিরে আসি, কফির টেবিলে কোনো জ্ঞানী ও দুঃখীর
হাতে অনুবীক্ষণের কাচ বেদ ও বেদান্ত কিংবা প্রজ্ঞাপারমিতা
তুলে দিই : যারা জ্ঞানহীন যারা দুঃখজয় করে
তাদের অন্নের দিকে নামগোত্রকুলশীলহারা ওই তাদের প্রাণের টানে শিল্পের বিস্ময়ে
হয়ত গোলাপ ফিরে এলো


হয়ত গোলাপ নয়, পদ্মফুল, ভোটচিহ্ন জেনে বা না--জেনে মুঠিভরে
তুলল আশমানবিবি, এই পূর্বফাল্গুনের স্বপ্নের মতন গোধুলি
বঙ্গোপসাগর থেকে বহে গেল অসমাপ্ত ভারতের দিকে




.                                               ****************                                              
সূচিতে...



মিলনসাগর