উত্তর আধুনিক চেতনা  
(কবি অমিতাভ গুপ্ত-র সাথে একটি সাক্ষাত্কার, ২৫শে জুলাই ২০১০ ---- )  
কবি অমিতাভ গুপ্ত-র কবিতার পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন...


ষাটের শেষ (৬৭-৭১) সত্তর দশকের শুরুর সময়টায় অনেক বড় বড় স্বপ্ন তৈরী হয়েছিল | যেহেতু স্বপ্ন ছিল
বড়, স্বপ্ন-ভঙ্গটাও ছিল বড় | শোষণহীন সাম্য সমাজের স্বপ্ন |

স্বপ্নের একটা দিকে ছিল  ৬৭ সালে নকশালবাড়ী আন্দোলন | তেলেঙ্গার পরে এভাবে কৃষক অভ্যুত্থানের
ব্যাপারটা আর হয় নি |  যা খবর আসছিল তাতে মনে হচ্ছিল যে হয়তো সর্বহারার মুক্তির প্রতিশ্রুতি
কোথাও রচিত হচ্ছে | অন্য একটা দিকও ছিল যা আমাদের স্বচক্ষে দেখা | তখন আমরা কলেজে পড়ি | ৬৭
তে কংগ্রেসের সংসদীয় শাসন চলে গেল | একটা বিকল্প বা অল্টারনেটিভ গভমেন্ট এল | তাকে কেন্দ্র করেও
অনেকে স্বপ্ন দেখতে লাগল যে এবারে সুশাসন আসবে | আমরা যারা নানাভাবে এ ধরণের স্বপ্নে আপ্লুত হয়ে
গেছিলাম, আমাদের স্বপ্ন দেখার সাথে সাথে  স্বপ্ন-ভঙ্গটাও তিন চার বছরের মধ্যেই হয়ে গেল |

সেটা খুব মারাত্বক সময় ছিল | আমি ব্যক্তিগত ভাবে এটা বুঝেছি... | আমি খুব অল্প ছাত্র রাজনীতি করেছি |
একটা সময়ে আমাদের যেভাবে পরিবর্তনগুলো হয়েছে--- ঐ তথাকথিত বামপন্থী রাজনীতির আরকি,
কমিউনিজম এর আকর্শনে এগিয়েছি |  শেষ দিকের পর্যায়ে স্বভাবতই নকশালবাড়ীর রাজনীতির সাথে
সংশ্লিষ্ট হয়েছি | আমার প্রথম স্বপ্নভঙ্গটা ঘটল সেটা হল হঠাৎ কলকাতায় একটা তত্ত্ব এসে হাজির হল ---
ব্যক্তিহত্যার তত্ত্ব | এই ব্যক্তিহত্যার তত্ত্ব যেদিন প্রথম আলোচিত হয় গেট-মিটিং এ, সেদিনই আমি, ঘোষিত
ভাবে, এ রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করি | আমাকে বলাও হয়েছিল যে কমরেড আপনি যদি আপনার
অভিমত না পাল্টান তাহলে আর আসবেন না গেট মিটিং এ |

এর পরে একটা ভয়াবহ অবস্থা দাঁড়ালো | কে কাকে মারছে, কেন মারছে, কি কারণে মারছে, কিভাবে
মারছে, কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না | এরপর ৭৭ সালের বামফন্ট সরকারের আমলে দেখা যাচ্ছে যে এই আশা
ভরসা কিছুই থাকছে না | এমন নয় যে আমরা সি.পি.এম. হয়ে গেছি, কিন্তু প্রত্যাশা ছিল যে কুশাসন
অপশাসন দূর হয়ে সবাই ভাল লোক হয়ে যাবে, অন্তত হিংসা বিদ্বেষ থাকবে না, মারামারি থাকবে না |  
কোথায় কি! যেমন ৭০ এর দশকের গোড়ার দিকে কাশিপুর-বরানগর (সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের মূখ্যমন্ত্রীত্বকালে
রচিত গণহত্যা) ঘটেছে, ৭০এর দশকের শেষ দিক থেকে পর পর ঘটতে লাগল ---  মরিচঝাঁপি ইত্যাদি
(
জ্যোতি বসুর আমলে রচিত গণহত্যা) |

এই বিশাল স্বপ্নভঙ্গের মধ্যে থেকে আমার এবং আমার মত আরও,  যারা রাইফেল টাইফেল কোনো দিন
ধরি নি, ছুরির বা বোমার ছবি দেখলেও ভয়ে কাঁপি,  মনে হয়েছিল যে কোথাও কিন্তু সাংস্কৃতিক শৃঙ্খল
মোচন করা যেতে পারে |

এটা তিন ভাবে এসেছিল |

প্রথমত আমরা যখন প্রত্যক্ষভাবে লেখালেখির সাথে যুক্ত হলাম,  মানে লিটল ম্যাগাজিনে লেখা ছাপা হতে
শুরু করল, সেই সময় (১৯৬৫) থেকে একটা কদর্য পরিস্থিতির সামনে আমরা থেকেছি | এখনও হয়তো থাকে
লোকে | সেটা হল কিছু লোক সব সময়েই কিছু টার্মস ডিকটেট করছে | ---এ রকম না হলে আধুনিক কবিতা
হবে না, ---এই রকম আচরণ না করলে আধুনিক হওয়া যাবে না | আর তার সঙ্গে সঙ্গে হচ্ছে কি, বিভিন্ন
জায়গায় যশ, প্রতিষ্ঠা, খ্যাতি ইত্যাদি সম্পর্কে অদ্ভুত  একটা মোহ তৈরি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে করা হচ্ছে |
এবং তার জন্য ব্যক্তিপূজাও, মানে যারা যারা ক্ষমতার স্তরে আছেন, রাজনীতিতেও যেমন ব্যক্তিপূজা চলছে
এখানেও, শিল্প সাংস্কৃতির ক্ষেত্রেও সে ধরণের ব্যক্তিপূজা কিন্তু....পাইয়ে দেবার রাজনীতির যে ব্যাপারটা,
সেটা শিল্প-সাহিত্যেও বেশ প্রযুক্ত হতে থেকেছে |

আমার নিজের মনে হয়েছিল...  মানে খুব অসুস্থ বোধ করছিলাম--- যে এই স্টুপিডিটি, এই ননসেন্স যে
বিখ্যাত হতে হবে, এবং প্রতিষ্ঠা পেতে হবে এবং তার সঙ্গে সঙ্গে,  খুব আন্তরিক ভাবে বলছি, অনবরত
নানা স্তরে কমপ্রোমাইজ করতে হবে | এ ব্যাপারটা আমার কাছে খুব কূরুচিকর লেগেছিল |  এই
কমপ্রোমাইজ করার একটা দিক হচ্ছে কিন্তু মডার্নিজম্ এর সঙ্গে কমপ্রোমাইজ করা |

আমার দু-নম্বর কারণের কথা বলছি |  এবার এই মডার্নিজমের সঙ্গে কমপ্রোমাইজ করতে গিয়ে, যদি
কবিতার কথাটাই বলি --- এইরকম ভাবে কবিতা লিখতে হবে, তা না হলে যথেষ্ট আধুনিক হওয়া যাবে না |  
এরকম তো সব সময়েই শোনা যেত যে এই শব্দ ব্যবহার করলে আধুনিক থাকা যায় না |  এই ধরণের চিন্তা
ভাবনা করলে আধুনিক হওয়া যায় না |  এই জায়গাটা খুব আপত্তিকর হয়ে দাঁড়ালো |

আর তার সঙ্গে সঙ্গে তিন নম্বর যেটা কারণ--- সেটা হচ্ছে যে অসাধারণ একটা ইউরো-কেন্দ্রিকতা | মানে,
আমার তো পরে মনে হয়েছে যে কলোনিয়াল ইণ্ডিয়ায় বা যখন প্রত্যক্ষ ইংরেজ শাসন ছিল ভারতবর্ষে, তার
চেয়েও অনেক বেশী ইউরো-কেন্দ্রিকতা কিন্তু ওই সময়টা দিয়ে এসেছে | মানে
“বোদলেয়ার (Charles Pierre
Baudelaire 1821-1867) পড়তেই হবে | “বোদলেয়ার” পড়লে কোনো অন্যায় নেই, পড়া যেতেই পারে | কিন্তু
“বোদলেয়ার” পড়তে হবে, “ব়্যাবো (Charles Félix Henri Rabou 1803-1871) পড়তেই হবে, অমুক উপন্যাসটা
পড়ে ফেলতেই হবে, না হলে কিছুতেই তোমার চেতনার বিকাশ হবে না |  এই একটা অবস্থা কিন্তু এসেছে |
আমি নিজেই এটা জানি যে আমার সমসাময়িক যারা, তাঁদের মধ্যে প্রায় বেশিরভাগ লোকই কিন্তু
বিভূতিভুষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা পড়েন নি | পড়েননি, তার কারণ হলো তাঁদের স্পষ্টত বোঝানো হয়েছিল
যে বিভূতুভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের চেয়ে
“কাফকা (Franz Kafka 1883-1924) অনেক বড় লেখক | কাফকা বড়
লেখক হতেই পারে, কোনো আপত্তি নেই | কিন্তু এই তুলনাত্বক আলোচনা করে একজনকে সম্পূর্ণ সরিয়ে
দেওয়া -- অনেক পরে সেটা বুঝেছি যে এটাই হচ্ছে সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ |

তার সঙ্গে সঙ্গে আর একটা ব্যাপার ভয়ঙ্কর ছিল যে, যে করেই হোক
রবীন্দ্রনাথকে অবমাননা করা |
রবীন্দ্রনাথের  চেয়ে বাংলা কবিতা অনেক এগিয়ে গেছে--- এটা শুধু মাত্র বলা না | এটা পরেও হয়েছে |  
আশির দশকে হয়েছে |  নব্বুইয়ের  দশকে হয়েছে |  
রবীন্দ্রনাথকে  নিয়ে অতি কদর্য সমস্ত প্রবন্ধ তৈরী
হয়েছে | শুধু রবীন্দ্রনাথ কেন বিদ্যাসগরকে নিয়ে,
বিবেকানন্দকে নিয়ে,  রামকৃষ্ণ পরমহংসকে  নিয়ে
ব্যক্তিগত কূরুচিকর সমস্ত লেখার সঙ্গে সঙ্গে একেবারে আমাদের লোকায়ত শিল্পকে সম্পূর্ণভাবে ভুলিয়ে
দেওয়া |  লোকায়ত বলতে আমি লোকশিল্প বলছি না, মানে সাধারণ মানুষের মধ্যে, মাটির মধ্যে অন্তলীন
হয়ে আছে যেটা, সেই শিল্পকে ভুলিয়ে দাও | তার দুটো অর্থ আছে | একটা হচ্ছে যে ওগুলোকে তুলে এনে
বড় বড় মঞ্চে এবং প্রতিষ্ঠানে তুলে ধরে তাকে নষ্ট করে দেওয়া | আর আরেকটা হচ্ছে যে যে সব জায়গায়
সেই শিল্পগুলো উত্সারিত হয়, সেখানে গিয়ে তাকে আঘাত করা | নানাবিধ উপায়ে | টেলিভিশন দিয়ে |
শিল্পীরা, কবিরা ওখানে গিয়ে, মদের বোতল নিয়ে, নানারকম ফুর্তি করে এবং যতধরনের কোরাপশান হতে
পারে এই মডার্নিজমের, সেইগুলো সব আমদানি করে |

প্রসঙ্গত মনে পড়ে গেল--- মিড সিক্সটিস থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছিল, সেটাও সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের
ব্যাপার--- সেটা হচ্ছে নেশা করার সম্বন্ধে একটা তাত্ত্বিক উত্সাহ দেওয়া | নেশা করার ব্যাপারটা বহু বছর
ধরেই আমাদের এখানেও চালু আছে | অন্তত মদ্যপান তো করেই থাকেন শিল্পীরা কবিরা এটা ধরেই নেওয়া
হয় |
মধসূদন দত্ত,  ঈশ্বর গুপ্ত সম্ভবত |  কিন্তু, আমি কক্ষনো দেখি নি, আমার জ্ঞান-বুদ্ধিতে এমন লেখা পড়ি
নি ---
ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত বা মধসূদন দত্ত, মদ্যপান সম্পর্কে হাইলাইট করার জন্য, তাকে এলিভিয়েট করার জন্য
এবং পরবর্তি প্রজন্মকে তাতে উত্সাহিত করার জন্য কোনো রচনা লিখছেন | আমি পড়িনি অন্তত | থাকলে
থাকতে পারে কিন্তু আমি জানি না |
ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত তোপসে মাছ নিয়ে কবিতা লিখেছেন | মদ্যপান নিয়ে বা
গাঁজা খাওয়া নিয়ে, মারিজুয়ানা - এল.এস.ডি. নিয়ে কবিতা কিন্তু লিখেছেন ৫০ এর অবক্ষয়ি কবিরা এবং
তারপরে ৬০এর দশকের বা আরো কিছু লেখকেরা | এই জায়গাটা আমার কাছে খুব সাংঘাতিক মনে
হয়েছিল | আজকে এর ভয়াবহতাটা কিন্তু খুব স্পষ্ট | আজকের যে তরুণতম প্রজন্ম, তারা যে পরিমান
এডিক্টেড! দেখুন, আমি নিজে সিগারেট খাই | অন্য কোন নেশা বলতে--- চা-ও খাই, আরকি | কিন্তু সিগারেট
ও চা, এই দুটোর মধ্যে সিগারেটটা নিশচয়ই খুব খারাপ | সব চেয়ে খারাপ নেশা হয়তো | কিন্তু সিগারেটটা
সম্পর্কে একটা কথা বলা যায় যে সিগারেটটা আমাদের ব্রেনটাকে ওরকমভাবে প্যারালাইজ করে দেয় না |  
বা আমাদের চিন্তাশক্তিকে একেবারে আচ্ছন্ন করে না | যেটা কিন্তু অন্য নেশাগুলো করে | মদ করে, গাঁজা
করে বা এগুলো তো করেই |

এইটা কিন্তু বড়লোকদের একটা প্রধান উদ্দেশ্য | যে কি করে চিন্তা না করতে পারে লোকে | আপনার মনে
আছে, সেই চীনে যখন আফিংএর নেশা করে একেবারে আচ্ছন্ন করে দিয়েছিল | খুব ভাল করেই জানেন |
সেটা হলে খুব ভাল হয় |  এবারে  ওই আচ্ছন্ন হয়ে যাওয়া মাথায় আপনি যা বম্বার্ডমেন্ট করবেন তখন
সেটাই আপনি কিন্তু নির্বিচারে গ্রহণ করবেন |

এই একটা অবস্থার জন্য দেখা গেল যে অজস্র লেখা, এডিকশনে উত্সাহ দেওয়া, তৈরি হতে লাগল | এবং
জীবনযাপন পূরণে কিন্তু সেটা করা হতে লাগল | এর ফলে অনেক মর্মান্তিক ট্র্যাজিডি ঘটেছে |  আমাদের
চেয়ে একটু সিনিয়ার সামসের আনোয়ার মারা গেছেন | অনন্য রায় ভয়ঙ্কর অবস্থায় মারা গেছেন |  এই
সেদিন সৌভিক মারা গেল | ফাল্গুনি মারা গেছে | যোগব্রত মদ্যপান করে পুকুরে ডুবে মারা যান, তিনি নাকি
পুকুরকে মাটি ভেবেছিলেন | অমিতেশ মারা গেছে | মৃত্যুর মিছিল! অচ্যুত মণ্ডল মারা গেল | এই যে একটা
ভয়াবহ অবস্থা...  |
মধুসূদন বিভত্স নেশা-টেশা করতেন কিন্তু মধুসূদন কক্ষনো পরবর্তি প্রজন্মকে “নেশা
করো” বলে উত্সাহ দিয়েছিন বলে --- আমি জানি না | এবারে আধুনিকদের এই চেহারাটা (অবক্ষয়টা) স্পষ্ট
হতে লাগল |

আমার দিক থেকে বলতে পারি--- প্রথম যে প্রবন্ধটা আমি লিখেছিলাম, ১৯৭৩ সালে কৃত্তিবাস পত্রিকায়,
“তরুণ কবির সঙ্কট”, তাতে আমার তখনই যা জমে গিয়েছিল বলার, সেটা আমি বলতে পেরেছিলাম | এঁদের
সরাসরি অবক্ষয়ী আধুনিক বলেছিলাম | এঁদের  বক্তব্যকে,  আমার মত করে কাউন্টার করার চেষ্টা
করেছিলাম | এবারে যে সমস্যাটা হল সেটা কিন্তু (আমার একেবারে ব্যক্তিগত কথা বলছি) | একটা কোথাও
আমার মনে হচ্ছিল যে এই অবস্থাটার তো প্রতিবাদ করা যেতে পারে | প্রতিবাদ তো করছিই | কিন্তু এই
অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য কিছু করা দরকার |

এই সময়ে প্রথমবার আমি মৌলানা আজাদ কলেজে ট্র্যান্সফার হই | ৭৮ সালে | তখন আমার কাছে
সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্তর
“The Indian Philosophy”-র  আগের সংস্করণের ভলিউমগুলো আসে |  সেখানে
অবিচ্ছিন্ন ক্ষেত্র-কাল সম্পর্কে একটা চেতনা রেখে, যে শিল্পচর্চা করা যায়, নন্দনতত্ত্বের দিক থেকে সেটার
একটা সমর্থন পেয়ে গেলাম, “উত্তর” এবং “পূর্ব”, এর মধ্য দিয়ে | এই যে “উত্তর-পূর্ব” “পূর্ব-উত্তর” “উত্তর-পূর্ব”
এভাবে একটা অবিচ্ছিন্ন প্রবাহ চলতে থাকে চৈতন্যের, এটা খুব জরুরি |  আর এটাই, মর্ডানিস্ম, পরবর্তি
কালে নিও-মর্ডানিজম বা পোস্ট-মর্ডানিজম সারাক্ষণ ভুলিয়ে দেবার চেষ্টা করছে |

কি ভাবে ভুলিয়েছে দেখুন | তাঁরা একটা সম্পূর্ণ কল্পিত রেখা টেনেছে | আপনি ভাল করেই জানেন যে “সরল
রেখা” ব্যাপারটাই অবাস্তব | সরল-রেখা বলে কিছুই হয় না | কিন্তু তাঁরা একটা সরল-রেখা টেনেছে | এবারে
এই সরল-রেখার উপরে একটা বিন্দু এনেছে | কল্পিত সরল-রেখার উপর কল্পিত বিন্দু | এবার একটা বিন্দু
পেলেই আপনি অনেকগুলো বিন্দু পাবেন! একটা বিন্দুর নাম আপনি দিয়ে দিলেন “মর্ডান” | এবার মর্ডান
দিলেই কিন্তু মর্ডানের “আগে”, “পরে” একটা  ব্যাপারটা এসে যাচ্ছে |  মানে, আপনি তাঁর পলিটিকাল
স্টেটমেন্ট যদি আপনি লক্ষ্য করেন, তবে বুদ্ধদেব বসু যেমন বলেছিলেন, “...রবীন্দ্রনাথের পরে, প্রথম নতুন
(আধুনিক) তো রবীন্দ্রনাথ নিজেই...” | তাঁর “আধুনিক বাংলা কবিতা”-র ভূমিকায় এটা বলেছেন | এধরণের
পলিটিক্স বা পলিটিক্স অফ ভোক্যাবুলারি যেটাকে বলেছি, সেটাকে যদি উপেক্ষা করা যায়, তাহলে কিন্তু
মডার্নিজমের একটা সমূর্ণ অবৈজ্ঞানিক দিক ধরা পড়ে |

এর মধ্যে আর একটা মজা হয়েছে | এই সময় একেবারে খুব পরিচিত বই একটা--- এনসাইক্লোপেডিয়া
ব্রিটানিকা | সেটায় মর্ডানিজমের এন্ট্রিটা দেখতে গিয়ে চমকে উঠেছিলাম | মর্ডানিজম, ইজম হিসাবে প্রচলিত
হয় প্রথম “এঙ্গলিকান চার্চ”-এ |  কিছু লিবারাল ক্যাথোলিক, চাইছিল যে ক্রিশ্চিয়ানিটিকে কনটেমপোরারি
করে তুলে যুগোপযোগী করে তোলা যায় | এদের বলা হয় মর্ডানিস্ট | এদেরই প্রথম আখ্যা দেওয়া হয়
মর্ডানিস্ট এবং এঁদের যে ধর্মীয় দর্শন, সেটাকেই বলা হয় মর্ডানিজম | আমি খুব সাধারণভাবে বলছি, অত
সহজ নয় ব্যাপারটা | সম্ভবত ১৯০৭ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর, তথাকথিত লিবারাল ক্রিশ্চিয়ান যাঁরা মর্ডানিস্ট,
তাঁদের “হাই এঙ্গলিকান চার্চ” থেকে বের করে দেওয়া হয় | পোপ খুব ভালভাবে, পিঠে হাত বুলিয়ে একটা
বক্তৃতা দেন যে ...তোমাদের ঠিক চার্চের মধ্যে রাখতে পারছি না | তোমরা বেরিয়ে পড়, এবং সত্যি সত্যিই
এটা বলা হয়েছিল যে তোমরা তোমাদের ভাবধারাগুলো মোটামুটি রাখো | এঁরা অনেকেই খুব
আকাদেমিকালি শিক্ষিত ছিল | এঁরা জার্মানিতে, ইংল্যাণ্ডে, ফ্রান্সে আর ইতালিতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে
ঢুকে যায় |

এর একশো ছয় বছর আগে
"স্লেগেল (Karl Wilhelm Friedrich Schlegel 1772-1829)" যখন বলছেন---“সমস্ত
মডার্ন লিটারেচারই রোমান্টিক লিটারেচার”,  তখনও  পর্যন্ত কিন্তু মডার্ন শব্দটা কনটেমপোরারি অর্থে
ব্যবহার করা হচ্ছে | কনটেমপোরারির একটা প্রতিশব্দ হতে পারে মডার্ন | কিন্তু পরবর্তিকালে দাঁড়িয়ে গেল
মডার্নেরই একটা প্রতিশব্দ কনটেমপোরারি |  খুব চাতুর্যের সঙ্গে ব্যাপারটা করা হল |  এই যে চারটে দেশের
কথা বললাম, এই চারটে দেশের কথা মনে খুব গেঁথে গেছিল | কেননা সেই সময়ে ১৯০৭ - ১০ সালে, এই
চারটে দেশের মধ্যে দুটো দেশ (ইংল্যাণ্ড ও ফ্রান্স), পৃথিবীর অর্ধাংশ অধিকার করে আছে, কোলোনিয়াল
ইম্পিরিয়ালিজমের মাধ্যমে | আর দুটো দেশে (জার্মানি ও ইতালি) তখন ফ্যাসিবাদ অঙ্কুরিত হচ্ছে | তিরিশ
বছরের মধ্যেই যার বিস্ফোরণে অজস্র লোক মারা যাবে |

এই বিশাল রাজনীতি, যার অন্তর্গত হয়ে গেল সংস্কৃতিটা, তার সামনে আমার মতন ক্ষুদ্র মানুষেরা তো
একেবারে অসহায় | কিছুই করতে পারি না | কিন্তু এই কথাটুকু অন্তত বলতে পারি যে এটাই শেষ কথা নয় |
তোমাদের এই কল্পিত সরল রেখা বা কল্পিত বৃত্তের মধ্যেই আমাদের একটা মানসিক খাঁচায় আটকে রেখে
দেবে, এটাই শেষ কথা হতে পারে না |

এই সূত্রেই হয়তো আমরা, আমাদের মতন করে, ইণ্ডিয়াননেস বা ভারতীয়ত্বের সন্ধান করতে শুরু করলাম |
আমি আমার নিজের ব্যক্তিগত কাহিনীটাই বলছি কিন্তু | অন্যের দায়ীত্ব নিচ্ছি না সেইভাবে | ধরুণ ১৯৭৮ -
৭৯ সাল থেকে, পশ্চিমবঙ্গে মধ্যে অন্তত, বিভিন্ন জায়গায়, আপন মনে ঘোরাঘুরি করার জন্য আমি বেরিয়ে
পড়ি | প্রায় সব জেলায় বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে থাকি | কখনও সপরিবারে কখনও একা |

বিভিন্ন সময়ে সাহিত্যিকরা কবিরা যান | তাঁরা ওই সদরেই যান | মানে ডিস্ট্রিকিট টাউনে যান |  হয়তো
একটু বেড়াতে ট্যারাতে গেলেন কোনো ডাকবাংলোতে |  সেখানে তাঁরা শুধুমাত্র মদ্যপান করেন এবং
কবিদের নানা রকম উত্সাহ দেন যে কলকাতায় আমি কবিতা ছাপিয়ে দেব... ইত্যাদি | এটা ঘটনা | এটা
একটা দিক আর অন্য দিকে হচ্ছে যে একটা সময় হয়েছিল যে হঠাৎ গ্রামে চলো বলে কিছু নেতা তিন-চার
মাসের জন্য গ্রামে চলে গেলেন এবং সেখানে অকস্মাৎ তাঁরা পিপলস ডেমোক্রাটিক রেভলিউশনের তত্ত্বটা
প্রায় নিরক্ষর গ্রামবাসীদের কাছে বলতে লাগলেন | এই দুটোই গণ্ডোগোলে বলে আমার মনে হতে লাগলো |
যতটা ঘুরছি, যতটা দেখছি, যতটা মিশছি, হয়তো আমার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল..... প্রথম দিকে বেড়াতে
গেছিলাম ঝাড়গ্রাম থেকে প্রায় ৪০-৪৫ কিলোমিটার দূরে, লালচল অঞ্চলটায় | ওখানে অনেকগুলো
প্রীহিস্টোরিক কেভস পাওয়া গেছিল | স্টেসম্যান পত্রিকায় তিন দিন ধরে রিপোর্টটা বেরিয়েছিল | অনেক
কিছু সেখানে পাওয়া গেছে | আমি মূলতঃ সেটা দেখতেই গেছিলাম | সেখানে এখন আর যাওয়া যায় না |  
এখন সেটা নিষিদ্ধ জায়গা হয়ে গেছে | সেটা কাকরাঝোর থেকেও ৩০-৩৫ কিলোমিটার দূরে, পাহাড়ের উপর
উঠতে হয় | একেবারে মৌমাছির চাকের মত অজস্র কেভ, মাঝখানে একটা হলঘর |  আমি কিন্তু সচক্ষে
দেখে এসেছি | ওখানে সেন্টার হলে এক সঙ্গে খাবারটা রাখতো, এক সঙ্গে সব কিছু করতো | তার সঙ্গে
কোথাও একটা সেন্স অফ প্রাইভেসিও ছিল | ছোটো ছোটো ঘর ছিল চারপাশে ঘিরে | আমি জানি না এখনো
রিপোর্টটা পাওয়া যায় কি না | নিশ্চয়ই পাবেন ইনটারনেটে | ওই ছোটানাগপুর প্ল্যাটোর মধ্যেই |

তো সেই ঝাড়গ্রামে যখন গেলাম তখন সেখানে কবি অশোক মহান্তি ছিলেন, মারা গেছেন | সদ্দ কলেজে
ঢুকেছে সংযম পাল, সুকোমল বসু, মুরারি বাবুও ছিলেন | এঁদের সকলের সঙ্গেই পরিচয়টা হয়ে গেল | প্রায়
কাছাকাছি সময়ে আমি পুরুলিয়ায়ও গেছি | তারপরে বর্ধমানে গেছি | বানগরে গেছি অনেক পরে |
পুরুলিয়ার তরুণ কবি দিলীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, নির্মল হালদার, সৈকত, অসিত সিংহ, অশোক দত্ত এঁদের
সকলের সঙ্গেই পরিচয়টা হয়ে গেল |

তখন আমি একটা জিনিষ আবিষ্কারই করে ফেললাম | মানে এই চেতনাটা আমার এল যে ওই সর্বগ্রাসী
আধুনিকতাকে বাদ দিয়েও সাহিত্য সৃষ্টি করা যায় |  এঁদের মধ্যে লক্ষ্য করালাম যে এঁরা কিন্তু ওই যে
ঝাপটাটা, অনবরত বলা হচ্ছে,  আমাদের মাথার মধ্যে ঢোকানো হচ্ছে যে
ব়্যাবো না পড়লে কবি হওয়াই
যায় না--- সেই যায়গাটা থেকে তাঁরা কিন্তু অনেকটাই মুক্ত | সেটা ঘটনাচক্রেই মুক্ত | রমেশ তালুকদার,
বর্ধমানের, এঁ কিন্তু অনেত পণ্ডিত, অনেক পড়াশুনা করেছেন  কিন্তু একটা মুক্তভাবে  যে কবিতা লেখা,
শ্যামলবরণ বা সঞ্চয়িতা, ও তখন একেবারে বাচ্চা মেয়ে, এঁদের কবিতা থেকে আমার মনে হলো যে ওই
সর্বগ্রাসী সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের বাইরেও ওই ধিকি ধিকি ধিকি করে প্রাণটা জ্বলছে | আর তার সঙ্গে সঙ্গে
কোথাও একটা ওই লোক সাহিত্য বলে আকাদেমিক আস্তাকুড়ে ফেলে দেওয়ার ব্যাপারটা নয়, লোকজ
শিল্পের সঙ্গে একটা খুব সহজ অন্তরঙ্গ সম্পর্ক রয়ে গেছে এঁদের |

এবারে এই জায়গাটা থেকে আসে কোথাও ওই অবিচ্ছিন্নতার ধারণা, কন্টিনিউয়ামের ধারণা | তুমি
কোনোভাবেই আমাকে বলতে পারো না যে এই জায়গায় এসে অন্ধকার যুগ কেটে গেল | এবং হঠাৎ মানুষ
আলোকিত হয়ে গেল | আর মানুষ এসে দাঁড়ালো বিশ্বের কেন্দ্রে | এই ব্যাপারটার মধ্যে যে বিশাল একটা
ফাঁকিবাজি আছে না, গোটা রেনেসাঁসটা কিন্তু এই ফাঁকিবাজির উপর দাঁড়িয়ে আছে | মানুষ কেন্দ্রে |
I am the
Center the Holy Spring
| এই কথাটা বলার মধ্যে একটা অবিশ্বাস্য বোকামো আছে | রেনেসাঁসের একজন
প্রধান --- গ্যালিলিও, তিনিই বলছেন --- কোনো
Center নেই | কোনো কেন্দ্রবিন্দু তো নেই | কিন্তু এই কেন্দ্রটা
কেন আবিস্কার করা হচ্ছে?  একমাত্র কারণ যে আমরা বাজার  তৈরি করবো, এই বাজারের জিনিষ
তোমাকে কিনতে হবে | অতয়েব ঠিক যেভাবে আমরা একটা দোকানে গেলে আমাদের খুব খাতির করা হয়,
ঠিক সেই রকম খাতিরটা করেছে | বুর্জুয়া রেনেসাঁসের এটাই একমাত্র প্রতিপাদ্য | তথাকথিত হিউম্যানিজম
বা মানবতাবাদের নোংরামো,
ugliness এটাই যে তারা কিন্তু মানুষকে সর্বশ্রেষ্ঠ জীব মনে করে |  একবার
ভাবুন আপনি, যদি আপনি নিজেকে মনে করেন সবচেয়ে সুপুরুষ লোক, বা শবর যদি নিজেকে মনে করে
পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবি, তাহলে যেরকম ব্যাপারটা দাঁড়িয়ে যায়, ব্যাপারটা তাই দাঁড়িয়ে যায় |  মানুষ মনে
করছে মানুষ শ্রেষ্ঠ প্রাণী | কে তাকে বলেছে?  এটা বলার দরকার হচ্ছে কেন? মানুষ জিনিষ কিনতে পারে |
মানুষ জিনিষ বিক্রী করতে পারে এবং বুর্জুয়ারা একটা অদম্য মার্কেট তৈরি করছে | এই মার্কেটের মধ্য
আসতে হবে |

এবারে এই বৃত্তান্তটার সঙ্গে একটা কোথাও কিন্তু ভিষণভাবে
Post Modernism জড়িত | এই জায়গাটায় এসে
কোথাও মূল বুর্জুয়া দর্শন বা
Modernism, একটা সংকটে পড়ে গেল | দেখা যাচ্ছে যে নিজেকে কোথাও কিন্তু
adjust  করতে পারছে না | এটা করতে ওদের বেশ কিছুদিন সময় লেগেছে | হলিউডের চিত্রাভিনেত্রীকে দিয়ে
কোনো বিজ্ঞাপন রচনা করে সেই জিনিষটাকে বিক্রি করা | আফ্রিকায় বা পশ্চিমবঙ্গে বা বাংলাদেশের দূর
গ্রামে বা গুজরাতে | এতে কিন্তু বিক্রি হবে না জিনিষ |

সেই গল্পটা বলেই দিই | একবার একটা ঘটনা ঘটলো | আফ্রিকার একটা জায়গায়, একেবারেই গ্রামাঞ্চল,
সেখানে প্রচুর খনিজ পদার্থ আছে বলে আবিস্কার হয়েছে | সেই অঞ্চলের লোকগুলো হুড়হুড় করে বড়লোক
হয়ে গেছে | তাদের হাতে কাঁচা পয়সা এসে গেছে | কিরকম কাচা পয়সা? মানে তাদের হয়তো কুড়ি টাকা
দিচ্ছে | দিয়ে সেই খনিজটা বিক্রী করছে দুলক্ষ ডলারে | সেটা অন্য গল্প | কিন্তু ওদের কাছে হাতে অনেক
কাঁচা পয়সা এসে যাচ্ছে | ফলে সেখানে তাদের ক্রয়ক্ষমতা বেড়ে গেছে | সেখানে খুব ভালো ভালো
সুপারমার্কেট-টার্কেট তৈরী হয়ে গেছে | শপিং মল-টল তৈরী হয়ে গেছে | এবারে সেসব মলে দেখা গেল যে
একটা মুখে মাখবার ক্রীম এসেছে | এবার দেখা গেল যে সেটা হুড়হুড় করে বিক্রী হয়ে যাচ্ছে |  চারপাশের  
দু-তিশো গ্রামের মানুষ এসে কিনে নিয়ে যাচ্ছে | তখন যারা ওটা বিক্রী করছে, তাদের খুব উত্সাহ হোলো |  
তিন জাহাজ অর্ডার চলে এলো | এসেও গেল ওখানে | সে সব দোকানে সাজানো হোলো | বিক্রী কে আরও
উত্সাহ দেবার জন্য বিজ্ঞাপনের ছবি দিয়ে দেখানো হলো যে কি করে ওই মুখে মাখার ক্রীমটা মাখতে হবে |
মাখলে আরও ভালো ফল পাওয়া যাবে | পরের দিন থেকে দেখা গেল যে আর একটা ক্রীমও বিক্রী হয় না |
এবারে তো ওদের মাথায় হাত | প্রচুর জিনিষ এসে গেছে | এবার সেই মার্কেট রিসার্চ টীমগুলো গ্রামে গিয়ে
জানতে পারলো যে ক্রেতারা ভেবেছিলেন ক্রীমটা বুঝি পাওরুটিতে মাখিয়ে খাওয়ার জন্য! এই জায়গায় এসে
সম্ভবত ১৯৭৮ সালে লিওতারকে কানাডার কিউবেক সরকার
One man commission এর প্রতিনিধি করে
পাঠালেন --- জানতে কি করে
Indigenous culture এর সঙ্গে কি করে সখ্য স্থাপন করতে হবে |

দেখুন,
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এই কথাটা “তিন জোড়া পায়ের লাথিতে রবীন্দ্র রচনাবলী লুটায় পাপোষে”
বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই কারণেই যে ওই রবীন্দ্র রচনাবলী পাপোষে লুটাতে হবে আগে তো! তারপর
আপনি টেবিলে তুলবেন
"গিনসবার্গ (Irwin Allen Ginsberg 1926-1977)"-এর লেখা |   এলেন  গিনসবার্গের
“হাউল” বইটাকে আপনি টেবিলে তখনই  স্থান দেবেন  যখন আপনি টেবিল থেকে পাপোষে ছুঁড়ে ফেলে
দিচ্ছেন
“গিতাঞ্জলি” | এই জায়গাটায় এসে কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে এখানে একটা ক্রাইসিস তৈরি হচ্ছে |   
আমাকে টেবিলটা একটু বড় করতে হবে |  লোকের মনে কিন্তু আঘাত লাগে, ও রকম বললে | ও রকম
বলতে নেই | আহা হা! লোকে কি মনে করবে!  ফলে এই একটা  কোথাও নতুন কালচারাল ইডিয়ামের
দরকার হলো, যেটার নাম
Post Modernism |

এই
Posting of Modernism টা কিভাবে হবে? আমার যা সামান্য ভাষার জ্ঞান, তাতে আমি কখনও জানি না
যে
Post শব্দটাকে কোথাও অতিক্রমী হিসাবে,  পরবর্তিকালে ভোকাবুলারি অনুসারে সেটা চলে এসেছে |  
কিন্তু অরিজিনালি
Post কথাটা এসেছে ল্যাটিন শব্দ Postis থেকে | তার মানে কিন্তু ফিক্স করে দেওয়া |
প্রয়োজন অনুসারে এক একটা জায়গায় এক একটা জিনিষ ফিক্স করা | যেমন লাইট পোস্ট | যেমন আপনি
Post dated cheque দেন | একটা ডেট ফিক্স করে দেন | এই ডেটের আগে সেটা ভাঙানো যাবে না | এই
মডার্নিজমকে, যেটা ততদিনে আরকি সেই অর্থে দুর্বল হয়ে গেছে,  আমার মার্কেটটাকে সুচারু ভাবে
চালানোর জন্য | সেটাকে নতুনভাবে নয়, সেটাকে একটু ঠিকঠাক, রাংতা দিয়ে পরিবেশন করা
Post
Modernism
|

বাংলায় যারা
Post Modernist, আমি দায়িত্ব নিয়ে এটা বলছি, প্রত্যক্ষ প্রমাণ যদি আপনি চান তবে উত্তম
দাশের একটা অসাধারণ বই আছে “হাংরি শ্রুতি আন্দোলন”  | অনেক ডকুমেন্ট ওখানে তুলে দেওয়া আছে |
এই পোস্ট মডার্নিস্টরা কিন্তু ওই
হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং এই হাংরি আন্দোলনটা একটা
কুৎসিত ব্যাপার | খুবই কুৎসিত ব্যাপার | ওই যেটা বলছিলাম---নেশা-ভাঙে উত্সাহ দেওয়া |  
জীবনানন্দ
দাশ আফিং খেতেন কি খেতেন না, এটা আমাদের জানার কোনো দরকার নেই |  আর এইটুকু অন্তত জানি
যে
জীবনান্দ দাশ তাঁর লেখায় কখনও আফিং খাওয়ার উত্সাহ দেননি | এটাই সব চেয়ে বড় কথা |
রবীন্দ্রনাথ মদ্যপান করেছেন কি করেন নি, এটা নিয়ে গবেষণা করবার কোনো দরকার নেই |  স্পষ্ট কথা
হচ্ছে
রবীন্দ্রনাথ কখনও বলেননি যে ওই শামসের আনোয়ার থেকে সৌভিক চক্রবর্তী পর্যন্ত মদ্যপান করে
মরে যেতে হবে | তা নাহলে কবি হওয়া যাবে না | এটা কোথাও
রবীন্দ্রনাথ বলেন নি | কিন্তু গিনসবর্গ থেকে
আরম্ভ করে এটা বলা হতে শুরু করলো | আমি জানি না আপনি
গিনসবার্গের কবিতা পড়েছেন কি না |
ভয়াবহ কবিতা! বলা হতে লাগলো যে
গিনসবার্গ একজন মহাকবি | পিটার ওর্লভস্কির সঙ্গে ওর
হোমোসেক্সুয়াল সম্পর্ক ছিল | সেটাও তো শুনি আজকাল--- যে লোকের থাকতেই পারে | তারও নাকি একটা
দর্শন আছে | ননসেন্স |

গিনসবার্গ ভালো কবি কি খারাপ কবি এটা বিবেচ্যই হচ্ছে না | মানে তার কবিতার --- ধরুন “হাউল”
কবিতাটা--- একদম বাজে কবিতা, তা হয়তো নয় | হাউল কবিতার মধ্যে অপূর্বতা খুব বেশী নেই |
"মায়কভস্কি (Vladimir Vladimirovich Mayakovsky 1893-1930)" যখন কবিতা লিখছেন,  মায়কভস্কির গ্রুপটা
আরকি, ওই আন্দোলনেরই একটা অবক্ষয়ী ডিকাডেন্ট চেহারা কিন্তু
গিনসবার্গের মধ্যে পাচ্ছি | মায়কভস্কির
মধ্যে যেটা সতেজ সপ্রাণ ছিল .... মানে,
"লেনিন (Vladimir Ilyich Lenin 1870-1924)"  বলছেন---“এরা  
এত চেঁচায় কেন” |
গিনসবার্গ যখন হাউল লিখছেন, তখন কোথাও এটা আর চিত্কার করে বলা হচ্ছে না যে--
মানুষের মঙ্গল চাই | বিশ্বজগতের কল্যাণ চাই | কিন্তু চিত্কার করে বলা হচ্ছে যে--- হোমোসেক্সুয়ালিটি
ব্যাপারটা খুব ভালো |  
"পিটার ওর্লভস্কির (Peter Anton Orlovsky 1933-2010)" সঙ্গে ওর ভয়াবহ
সম্পর্ক, তাতে যে বর্ণনাগুলো আছে, সেইগুলোকে অনেক বেশী হাইলাইট  করা হয়েছে |   এবং  অনবরত  
এটাকে
রি-এমফ্যাসাইজ করা হচ্ছে যে এইগুলোই হচ্ছে  কনটেমপোরারি ট্রেণ্ডস | যে কনটেমোরারি ট্রেণ্ডসগুলোকে
তুমি যদি আত্মীকরণ করতে পার, তাহলেই তুমি সঠিকভাবে মডার্নিস্ট বা পোস্ট মডার্নিস্ট হয়ে উঠবে |

এই যে অবক্ষয়ের তত্ত্বটা, এটা প্রতিষ্ঠিত হলো | কিচ্ছু করবার নেই | কেন না এর সঙ্গে সমস্ত প্রতিষ্ঠানগুলো
যুক্ত | আর প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরটা শুধু লিটল ম্যাগাজিনে | যার হয়তো দশ কপি পনেরো কপি লোকে পড়ে |  
তার বেশী পড়ে না | কিন্তু আমার কাছে, মিলন, যেটা সব চেয়ে বড় সত্য, সেটা হচ্ছে ওই যে দশ কপি
পনেরো কপিও পড়ে, কোথাও একটা যে ধিকি ধিকি করে হলেও ওই প্রতিবাদ এবং তার সঙ্গে সঙ্গে সৃষ্টিও
রয়েছে | এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াল | ফলে, অন্য তাত্ত্বিকরা যাই বলুন না কেন, উত্তর-আধুনিকতা নিয়ে
আরকি, তাঁরা উত্তরাধুনিকতা বলেন, তা-প্রত্ত্বয় যোগ করে বলেন | এমন কি এটাও আমি দেখেছি --- উত্তর
আধুনিক আন্দোলন বলেন | বা কখনও কখনও উত্তর আধুনিক কবিতা এই শব্দটাও ব্যবহৃত হয় | আমার
কাছে এটা শুধু মাত্র একটা চেতনার ব্যাপার | এবং এটা কোনো ভাবে একটা নতুন চেতনা নয় | এই চেতনাটা
একেবারে চিরাতনের ক্ষেত্রকালেই রয়েছে | শুধুমাত্র এটার উপর নানাবিধ আবর্জনার স্তুপ দিয়ে মডার্নিজম,
নিও মডার্নিজম, পোস্ট মডার্নিজম এটাকে ঢেকে দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে | সেই আবর্জনার স্তুপ সরিয়ে
সরিয়ে এই শাশ্বত চৈতন্যের সন্ধান করাকে উত্তর আধুনিক চেতনা বলা যেতে পারে বলে আমার মনে হয়ে |
সেটার প্রকাশ স্বভাবতই যে কোনো ভাবেই হোক না কেন, ঠিক যেগুলোকে আমরা কবিতা বলে গণ্য করি,
সেই কবিতার মধ্যে প্রতিফলিত হতে পারে | তাহলেও সেটাকে উত্তর আধুনিক কবিতা বলা যেতে পারে না!
সেটা কবিতাই | তার মধ্যে উত্তর আধুনিক চেতনা, উত্তর আধুনিক চৈতন্য ক্রিয়াশীল | সে জন্য আমি উত্তর
আধুনিক চেতনা কথাটা ব্যবহার করাটা পছন্দ করি |

ক্ষুধা এবং দারিদ্রের যে বাস্তবতা, সেখানে উত্তর আধুনিক চেতনাটা অনেক বেশী প্রয়োজন | বাইরে থেকে
চাপিয়ে দেওয়া মডার্নিজম-পোস্ট মডার্নিজমের দ্বারা এখানকার সমস্যা আরো বেড়ে যাবে | এবং অনবরত
অনুকরণবাদের ফলে আরও বেশী বিপন্নতা এসে যাবে |  আমার ধারণা, এই উত্তর আধুনিক চেতনা
ব্যাপারটা রাজনীতির দিক থেকে, অর্থনীতির দিক থেকে, শিক্ষা ব্যবস্থার দিক থেকে বোধহয় খুব বেশী
দরকারী |




কবির সঙ্গে যোগাযোগ -


কবি অমিতাভ গুপ্ত-র মূল কবিতার পাতায় যেতে এখানে ক্লিক্ করুন
উত্স:
কবি অমিতাভ গুপ্তর সাথে এই সাক্ষাত্কারটি,  ২৫শে জুলাই ২০১০,
রবিবার, তাঁর যোধপুর পার্কের বাড়ীতে, নেওয়া হয়েছিল | মিলনসাগরের
পক্ষে সাক্ষাত্কারটি নিয়েছিলেন মিলন সেনগুপ্ত এবং মানস গুপ্ত |
আমাদের যোগাযোগের ঠিকানা :-
srimilansengupta@yahoo.co.in


...