বিপ্লবী কবি বারীন্দ্রকুমার ঘোষ-এর গান ও কবিতা
প্রবাহ-পতিত    
কবি বারীন্দ্র কুমার ঘোষ
কবির ১৯২৫ সালে প্রকাশিত "দ্বীপান্তরের বাঁশী" কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

.        হৃদি বৃন্দাবনে আমারি কারণে |
সেই    সর্ব্বনাশা বাঁশী বেজেছে এবার |
তারে   জানি না তবু যে ভুলি লোকলাজে
.                        পাগলিনী ধাই অভিসারে তার |
ওগো   প্রমত্ত উজান মন যমুনায়,
.        লুকাইয়ে বাঁশী ডাকে সখী আয়,
.        সে প্রাণ কালিয়া বলে দে কোথায়,
.                        বড় যে সুখের কলঙ্ক রাধার |
.        প্রতি অঙ্গ মোর কানু ক্ষুধাতুর,
.        সে কানু কেন রে দূর এত দূর?
মম     প্রেমেরি রাজা তো ছিল না নিঠুর,
.        কোটি কুঞ্জে সে হয়েছে আমার |
ওরে    যত ছিল রাস যত বৃন্দাবন
.        যত লো যমুনা কদম্ব কানন
সেথা    জনমে জনমে সেই কানুধন
.                        প্রেম ভিখারিণী আমি রাধা তার |

.                     ****************                     

.                                                                 
                   সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ভেদে আনন্দ    
কবি বারীন্দ্র কুমার ঘোষ
কবির ১৯২৫ সালে প্রকাশিত "দ্বীপান্তরের বাঁশী" কাব্যগ্রন্থের কবিতা।


আমি   যার কাঙালিনী
.        সে পরশ মণি
.                আমারি হৃদয়ে রাজে ;

.        এ শ্রীঅঙ্গে থাকি
.        লুকায়েছে নাকি
.                অনু পরমাণু মাঝে |

মোর   তিয়াসু পরাণ
.        ভরি কাণে কাণ
.                মধু গঙ্গা ছল ছল্!

.        মোর বুক ভরা
.        সে সুধা পসরা
.                পিয়িব কেমনে বল্?

.        সুবাসে বরণে
.        রূপ রস ধনে
.                রচিয়া রচিয়া মায়া,

.        মজায়ে আ মরি
.        পাগলিনী করি
.                সে যে গো ধরেছে কায়া |

তাই    দরশে পরশে
.        শ্রুতি গন্ধ রসে
.                পিয়া-মকরন্দ-ময়,

.        যেথা হেরি সবি
.        কানু চন্দ্র ছবি
.                জগত উজলি রয় |

এত     চাহিয়া পাইয়া
.        পূরে নাক হিয়া
.                অফুরন্ত প্রেমধনে

.        আপ্তকামা দাসী
.        তাই লো পিয়াসী
.                সে বিনা নাহিক মনে |

.        আপনা হারায়ে
.        পিয়াময় হয়ে
.                নাহি বুঝি এত সুখ,

.        আন তনু ধরি
.        নিতি নব করি
.                যত লো চুমিতে মুখ |

.        জনমে জনমে
.        তাই বঁধু সনে
.                সাধের এ দুখ দশা,

ওরে    স্বামী কামনায়
.        প্রবেশি চিতায়
.                এ মোর কলঙ্কনাশা!

সে      চিদানন্দ মণি
.        ধনে আমি ধনী
তবু            এ তনু পাপের ভার---

.        ছিদ্র কুম্ভ ভরি
.        প্রেমবারি ধরি
.                সতীত্ব গরবে তার |

.                     ****************                     
.                                                                                    
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
অকিঞ্চনের প্রেম    
কবি বারীন্দ্র কুমার ঘোষ
কবির ১৯২৫ সালে প্রকাশিত "দ্বীপান্তরের বাঁশী" কাব্যগ্রন্থের কবিতা।


তুমি নহ চাহিবার ধন!---
বুক ভরা মর্ম্ম ভরা
অচিন্চ্য পরাণ কাড়া
কালজয়ী সে তোমার আমার মিলন,---
কামনা কলুষ হরা মগ্ন স্বপন |

তুমি নহ খুঁজে গো পাবার!---
নিজের মরণ কবে
কে খুঁজে পেয়েছে ভবে?
তুমি যে পাথার মোর ডুবে মরিবার,---
শ্মশান লক্ষ কোটী জনম লীলার |

এ পরাণ পরশ রসিক!---
অলখে চুমিয়া মোরে
কবে সব নেছ হরে
মন আঁখি তাই তোমা চেয়ে অনিমিখ ;
সব কামনার মম তুমি গে অধিক |

এ প্রেম নাহি কি অবধি ;
হরিতে আমার হিয়া
কত রূপ রস দিয়া
রচিছ এ মায়া ; কেন এত সাধাসাধি?
তোমাতে যে কাম মোক্ষ লয়েছে সমাধি |

অকূলের হে রাসবিহারী!
পরশে সহজ করি
সব যে গো আছ ভরি |
তৃপ্তি মেনেছে হার আহা মরি মরি!
---সুখের অধিক মোর নির্ব্বাণ লহরী |

.                     ****************                     
.                                                                                    
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
.        বীর সাধনে    
কবি বারীন্দ্র কুমার ঘোষ
কবির ১৯২৫ সালে প্রকাশিত "দ্বীপান্তরের বাঁশী" কাব্যগ্রন্থের কবিতা।


.        নিরাকারা তবু নিখিল আকারা
.                বড় রূপসী গো বঁধু সে আমার ;
.        সে জ্ঞান সাগরে বিষ সুধা ধরে
.                মধুমগ্ন হয়ে দু'য়ে একাকার?

মোর    চরণেরি গতি এ কণ্ঠের বাণী
.         তারি শক্তি সে যে শকতির রাণী ;
.         শ্রবণেরি শ্রুতি মোর নয়নমণি
.                সে হয়েছে মোর চিত প্রেমাধার |

.         আমি সেই ফুলে ফুলে মধু
মোর    যতরে লালসা মিটাবার বঁধু,
.         সে ভোগ কুঙ্কুমে লেপি অঙ্গ শুধু
.                আমি রে কলঙ্কী জগত মাঝার |

.         সে মোর গরল পাপ দীনতারই
.         তারে পিয়ে আমি নীলকণ্ঠ তারি
.         কাম ক্রোধ ভস্ম অঙ্গে রে ভিখারী
.                আমি চিরদিন সে অন্নপূর্ণার |

ওরে     নহে পাপ পঙ্ক এ গঙ্গা মৃত্তিকা
.         পূত বিশ্বজন ধরি এই টিকা,
.         তার পদ যুগে অলক্তক লেখা
.                দুখ হুতাসের যত রক্তধার |

.         সে অবিদ্যা তাই আমি হীনমতি,
.         আমিরি কলঙ্কে মরেছে সে সতী,
.         মায়া শব স্কন্ধে রে কৈলাশপতি
.                আমি চিদানন্দময় শিব তার |

.                     ****************                     
.                                                                                    
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
অন্তর্মুখতা    
কবি বারীন্দ্র কুমার ঘোষ
কবির ১৯২৫ সালে প্রকাশিত "দ্বীপান্তরের বাঁশী" কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

এ পরাণে ওগো অগোচর!
তুয়া বৃন্দাবন মাঝে
রচি ফুলশয্যা লাজে
কোথা রেখেছিলে মোরে করিয়া বিভোর ;
অখণ্ডের ঘরে যেথা তব দূরান্তর |

হে আমার মায়া যাদুকর!
মজাইতে অবেলায়
কেন গো জাগাতে তায়?
সহজে পাগল দাসী ; অসহ সুন্দর---
তুমি যে তাহার সুখ-কলঙ্কের ডর |

তব বুকে ঘুমাবার সাধ
মেটেনি এখনো আজি
লাজ মান ভয় ত্যজি
ছিনু শুয়ে, সুখে মোর কে সাধিল বাদ?
---একাকারে চিনি ঘুম সুধার আস্বাদ |

হে আমার        সীমান্তে সোহাগ-সিন্দূর!      
.        তব প্রেম কলঙ্কিনী
.           করিবে বৈকুণ্ঠ রাণী
আমারে? সবে না সে যে সুখ ভরপুর ;
তুয়া-সঙ্গ-সুধা মোর মরণ ঠাকুর |

মোরা হব লক্ষ্মী নারায়ণ |
এস ক্ষীর শ্যয্যাপাতি
কাটাব অনন্ত রাতি,
কোটী সৃষ্টি নাশা ওগো সে সহমরণ
ত্রিতাপ জুড়ান মোর শ্রীঅঙ্গ চন্দন |

মোর        এস চির বিজয়াদশমী!        
জীবনের সপ্তস্বরা
বাজিয়া হয়েছে সারা,
শ্রান্তা ভোগপুরে তব বারবিলাসিনী ;
তোমাতে গো গঙ্গাঞ্জলী কর তানে আনি |

.                     ****************                     
.                                                                                    
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
.                শ্রীরাধা
কবি বারীন্দ্র কুমার ঘোষ
কবির ১৯২৫ সালে প্রকাশিত "দ্বীপান্তরের বাঁশী" কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

.        রাধার দু'টি রাঙা পায়ে
.                        অনন্ত পড়েছে ধরা,
সেথা    কত বিশ্ব উঠে ভাসে
.                        চিদানন্দে মাতোয়ারা |

.        কালো তাঁর আঁখির কোলে
.        কাল-শিশু দোলায় দোলে,
সে যে জীবনেরই মূর্ত্ত গীতি
.                        মরণ বাঁশীর সুরে ধরা |

.        কি লাবণী ধাম সে রে
তাহে   কবির স্বপন গেছে হেরে,
সে যে সীমার মাঝে অসীম রাজে
.                        দিগ্বলয়ে গগন পারা |

.        কোন্ দূরের কোলে এমন
.        জগজ্জ্যোতির উজল তপন
.        সোণার রাগে জুড়িয়ে জাগে
.                        প্রেমের ঊষায় ভূবন সারা |

.        বিশ্বকবির হে কবিতা!
হের    নিত্য লীলায় কি ছবি তা'!
সে      যোগীজন প্রাণারাম
এবার                বুঝেছি রে কেমন ধারা |

.                     ****************                     
.                                                                                    
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
.                অন্বেষণ
কবি বারীন্দ্র কুমার ঘোষ
কবির ১৯২৫ সালে প্রকাশিত "দ্বীপান্তরের বাঁশী" কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

ওগো   মায়া বড় মনোহরা |
.        যেই মলয়জে এ গন্ধ বিরাজে
.                        বল সে কেমন ধারা |

.        কার শ্রীঅধরে দিয়া মনবেণু
.        মহাভাবময়ী এ গীত সৃজিনু,
.        এক ফুঁকে মরি বাজাল কি করি
.                        রাগিণী জগদাকারা?

.        কার রে কুঙ্কুম কার হোলিখেলা
.        রঙিয়া গো চিতি করিল উজলা?
.        এ সৃষ্টি দীপালী কে দিল রে জ্বালি
.                        খচিত তপন তারা?

.        নিরমল মোর নীল জলরাশি
.        কাহার শীতল শ্রীঅঙ্গ পরশি
.        হিমানী ধবল হলো হিমাচল
.                        শত চন্দ্র উজিয়ারা?

তার    শুনেছি শ্রীপদ নখমণিচাঁদে
.        মোর মত বাজে অনন্ত শ্রীরাধে,
.        কোটী বিশ্বদোলা গলে গুঞ্জমালা
.                        মোর সে হৃদয়-চোরা |

.                     ****************                     
.                                                                                    
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
.       আত্মরতি
কবি বারীন্দ্র কুমার ঘোষ
কবির ১৯২৫ সালে প্রকাশিত "দ্বীপান্তরের বাঁশী" কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

কে বলিবে একি বিজলি শিহর
.                        পরাণ পরশি রয়!
জগত জুড়ান শান্তি অমিয়া
.                        মরম নিঙ্গাড়ি বয় |

জাগর সুপ্চি হতে গো অতুল
দ্বিধা দ্বন্দ্ব হারা কি সুখ বিভুল
দশা মনোহর নিবিড় নিথর
.                        নীরব সোহাগময় |

না তেয়াগি দেশ কাল ব্যবধান
.                        তনু না পাসরি সই
প্রাণারাম প্রেমে বল গো কেমনে
.                        হইব গো প্রেমময়ী?

কি সুখ যদি গো মাখামাখি হয়ে
আত্মযোগে মোর বঁধুয়ারে লয়ে
নারি গো ডুবিতে সুধা জলধিতে
.                        জীবন-মরণ-জয়ী,

তোরা আঁখি ভরি দেখে নাকি সুখী
.                        অধরে অধর রাখি,
এমন করিয়া মনে মন দিয়া
.                        কে জানে দেখিতে সখি?

তোদের যত জানাজানি যত রে মিলন
.        তাহে প্রেম আশা ভরে কি এমন?
ওরে    সে মণির মাঝে মোর জ্যোতি রাজে
.                        জগৎ প্রকাশ রাখি |

মোর    অশরীরী বঁধু নাহি পচদিন
.                        হৃদিবৃন্দাবনচারী,
সদা     মোর কালো জলে কানু ছবি দোলে
.                        তরঙ্গউজলকারী |

তাই     নাই তুমি আমি শান্তি অটল
.        অকাম মধুর বড় গো শীতল---
.        এক রসতায় অখণ্ড লীলায়
যেন                    সাগরে যমুনা বারি |

.                     ****************                     
.                                                                                    
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
.               কে?
কবি বারীন্দ্র কুমার ঘোষ
কবির ১৯২৫ সালে প্রকাশিত "দ্বীপান্তরের বাঁশী" কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

.        কে তুমি সেই মধুর মধু
.                        এ মায়া-বালার লুকান বঁধু?
মোর   ব্যর্থ বুকের আকুল সাড়া
.                        সুখ পরাজয় পরাণ কাড়া |
.        ---অনায়াস ওগো আপনি ফোটা
.                        জগতের বুকে আকুলি ওঠা |
.        গর গর গর শান্তি মোর,
এ                       বহু ভঙিম-জীবন ওর |
.        দর দর দর প্রেমাশ্রু ধারা,
.                        রূপ অরূপের সোহাগে হারা |
.        আড়ি পেতে মোর দেখার ধন
সব                     সম্বিত ভরি আলিঙ্গন |

.                     ****************                     
.                                                                                    
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
স্বতঃস্ফুর্ত্ত
কবি বারীন্দ্র কুমার ঘোষ
কবির ১৯২৫ সালে প্রকাশিত "দ্বীপান্তরের বাঁশী" কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

দু'টি কর্ণ ভরি                     পরাণ নিঙ্গাড়ি
গঞ্জরে গোপন পথে,
সে অলির ডাকে                লাখে লাখে লাখে
কি ফুল ফুটিল চিতে |
বসন্ত সরস                          কার প্রেমরস
কোন মঞ্জু বরষায়,
হৃদি বিজ নিয়া                    করিল সিঞ্চিয়া
হরিত সুরভিময়?
অনূঢ়া যৌবনে                 কার আলিঙ্গনে
মোরে করিল নবোঢ়া বঁধু?
কারে নাথ করি                 আস্বাদিনু মরি
এ পতি সোহাগ মধু?
সিঞ্চিয়া সুধায়                 কে দিল আমায়
যোগীর বাঞ্ছত ধন?
আপনারি মাঝে                খুঁজিয়া পেনু যে
জগতের প্রস্রবণ!
ধরা দেও যেথা                    মরণের নাম
জীবন---সে বঁধু পাওয়া,
অনন্তের সাথে                চোখা চোখী হয়ে
অধরে অধর দেওয়া |
লক্ষ জনম মোর                ফুলে গাঁথি ওরে
প্রেম বৈজয়ন্তী মালা
স্বয়ম্বরা হয়ে                      নিছিনু বরিয়ে
আমি সে পরাণ কালা |
কাল সেথা ওগো                  বঁধুর সোহাগ,
দেশ তার প্রেমকোর,
সৃষ্টি মোদের                           চুম্বন মধু,
প্রলয় আঁখির লোর |


.                     ****************                     
.                                                                                    
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*