নারিকেল খাইয়া রাজা হইল আনন্দিত |
আজু হইতে হইলা আমার মিত ||
বৈদ্য বিজয় গুপ্ত মনসাকিঙ্কর |
আর নারিকেল রাজা আনিল সত্বর  ||
জলপানে তুষ্ট রাজা করে হুড়াহুড়ি |
এইকালে বল বল  ভাই সরস লাচারি  ||

.              ****************                                                                 
সূচি...    


মিলনসাগর
*
*
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

বস্তুবদল পালা



উষার মা ভাই কান্দে            কোতোয়াল চান্দরে বান্ধে
ভিন দেশে সাধুর অপমান |
ধনা বলে একি হইল              নারিকেল খেয়ে উষা মৈল
আমা সবা হইল নিদান ||
হায় হায় কি হইল                      কেন বা ঊষা মরিল
এযে মোর বিষম সঙ্কট |
ধনা বেটা সন্ধি জানে                পাইক ডাকে হাতসানে
যাও তোমরা রাজার নিকট ||
ঊষার চাহিয়া সারা                     আগুন জ্বালিল ত্বরা
দিল ঊষার মার্গেতে জ্বালিয়া  |
ঊষার মার্গে অগ্নি দেয়                  বলে বিষ হইল ক্ষয়
তখনে লড় দিলেক উঠিয়া  ||
ধনা বলে হায় হায়                      মরা মানুষ লড়ে ধায়
এদেশে এমন বিচার |
পদ্মাবতী দরশনে                        সানন্দে বিজয় গুণে
সহায় হইল সদাগর ||

.                                                          ****************                                                
সূচি...    


মিলনসাগর
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

বস্তুবদল পালা

১০

তোমার দেশেতে যাব                  এক লক্ষ টাকা লব
পেট ভরি খাব নারিকেল |
আমার পাপিষ্ঠ রাজ                   তাহাতে পড়ুক বাজ
এদেশে না হয় হেন ফল  ||
শুনিয়া রাজার কথা                    পুরোহিত ওঝা তথা
বলে রাজা আমি যাব সঙ্গে  |
শুনিয়া দ্বিজের বাণী                   কোতোয়াল বলে পুনি
রাজা সঙ্গে আমি যাব রঙ্গে ||
ধন্য করে শিব পূজা                  ধন্য তুমি দেশের রাজা
যে দেশে উপজে নারিকেল  |
সাধু বাণিজ্যে আইল                বড় ভাগ্যে মিতা পাইল
বিধি মোরে মিলাইল সকল  ||       
বলে পুরোহিত ওঝা                    একেলা কি যাবা রাজা
তুমি যাইতে সাথে যাব আমি |
শুনিয়া ব্রাহ্মণের বাণী                     পাত্র মিত্র কানাকানি
দাস হইয়া সঙ্গে যাব আমি ||
রাজার অভিলাষে                          খল খলি চান্দ হাসে
ভিন্ন দেশে যাবা রাজা হইয়া  |
যত নারিকেল নাও                  বত্সরে খাইলে না ফুরাও
ধন দিয়া তুল বদলাইয়া  ||
রাজা বলে শুন মিতা                        কহিছ উচিত কথা
আমি নহে ধনেতে কাতর ||

.                                                          ****************                                                
সূচি...    


মিলনসাগর
*
*
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

বস্তুবদল পালা

                   ৭
যদি সে রাজা মোর লইবা জীবন  |
গোটা কতক কথা আমি করি নিবেদন ||
কান্দিয়া উষা দ্বারী কহে রাজার ঠাঁই |
সাতটি পরিজন আমার পালিবা গোসাঞি ||
তোমায় কহিলাম ঠাকুর মনে দুঃখ রহিল  |
কাহার মুখ চাহিবে পুত্র খোদায় দুঃখ দিল  ||
কাঁলাবলী নামে প্রিয়া  সেবায় আগল  |
অন্তকালে দেখা না হইল মোর কর্মফল  ||
দৈবে মরিব মুই যেন করিলাম সার |
আমা হেন সেবক রাজা নাহি পাবা আর ||
হাতে নারিকেল উষা চারিদিকে চায়  |
নারিকেল খেয়ে পাছে তার প্রাণ যায় ||
জল দেখিয়া নারিকেল দূরেতে ফেলায়  |
ছলে মোহ দেখাইল বিষহরি মায়  ||
ধর ধর করি সবে চান্দরে ধরিয়া |
সভার সাক্ষাতে তারে কিলায় পাড়িয়া  ||

.              ****************                                                                 
সূচি...    


মিলনসাগর
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

বস্তুবদল পালা

                  ১১
নপুংসক লোক রাজা আনে ডাক দিয়া  |
বাড়ির ভিতর মূলা দিল পাঠাইয়া  ||
মূলার যত গুণ কহিতে নাহি অন্ত |
ইহার বদলে দিবা গজ হস্তীর দন্ত ||
হস্তীর দন্ত দেখিয়া চান্দ হাসে মনে মনে |
বিজু সিজু  ডিঙ্গায় ভরিল ততক্ষণে  ||
দুই মিত্র একত্র হইয়া করিল মন্ত্রণা  |
রাজা দিল কোতয়াল চান্দ দিল ধনা ||
দোহে দোহার বস্তু আনে ভাগে ভাগে |
দুই জনার ভাল মন্দ দুই জনার লাগে ||
বিক্রম কেশর রাজা ধনে নহে উনা  |
হরিদ্রা বদলে চান্দ লইলেক সোনা ||
সোনা লইয়া চান্দ হরিষ অপার |
সম্মুখে আসিল ধনা আঁখির ঠার ||
চন্দন কাষ্ঠের নৌকা দেখিতে সুন্দর |
সেই নৌকায় সোনা ভরে চান্দ সদাগর ||
নৌকা হইতে ধনা আসিল কৌতুকে |
কলাই লইয়া যায় রাজার সম্মুখে ||
চান্দ বলে অবধান কর মহাশয় |
কলাই হেন দ্রব্য বড় ভাগ্যে পায় ||
রান্ধিয়া বাড়িয়া খাইতে অধিক বাড়ে আশ |
অধিক তৃপ্তি হয় খাইতে নিরামিষ ||
আদা কাসুন্দ দিয়া করিয়া খিচুরী  |
মুখে তুমি চিবাইলে শুনি মড়মড়ি ||
কলাই দেখিয়া রাজার আনন্দ বিশাল  |
ইহার বদলে দিল মুকুতা প্রবল ||
বিধাতা প্রসন্ন হইলে দৈবে মেলে ধন  |
চট দেখিয়া রাজা ভাবে মনে মন ||
রাজা বলে মিতা কও স্বরূপ বচন  |
গাছের বাকল কেন আমার সদন  ||
দুইখানি চট মেলি দিল তার পায় |
পরম সন্তুষ্ট রাজা সর্ব অঙ্গ ছায়   ||
চট দেখিয়া রাজার কৌতুক হইল বড়ি |
এই কালে বল ভাই সরস লাচারি  ||

.              ****************                                                                 
সূচি...    


মিলনসাগর
*
*
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

বস্তুবদল পালা



শিশু হইতে সেবাকারি            না করিলাম ডাকাতি চুরি
কোন দোষে মার বিষ দিয়া  |
নৃপতি কাইবে বিষ                      দৈবে করে বিমরিষ
এড়াইল দিনের প্রভাবে  ||
কোথা হইতে সাধু আইল           মোর বধের ভাগী  হইল
কি করিব খাব কোন রীতে |
এই দ্বারে হইলাম বুড়া                 যত সাধু আনিল ভরা
বিষফল কেহ ত না আনে ||
সেয়ান সাধু কার্যে                    রাজা মারি রবে রাজ্যে
আমার নির্বন্ধ এত দিনে ||
কিবা দোষ দিব তোরে              শত্রুতে হিংসিল মোরে
প্রাণ লইতে আনিল বিষফল |
শিশু হইতে সেবা করি                তোকারণে প্রাণে মরি
তোমার স্থানে নিবেদি সকল  ||
শুনিয়া দ্বারীর কথা                   রাজার মনে লাগে ব্যথা
আপন মনে ধন্দ হেন বাসে |
পদ্মাবতী পরশনে                        সানন্দে বিজয় ভণে
ধনার দিকে চান্দ চাহি হাসে ||

.                                                          ****************                                                
সূচি...    


মিলনসাগর
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

বস্তুবদল পালা

১২

মিতা রে, তুমিত পন্ডিত মহাজন |
চিন্তিত হইয়া তুমি                           দুর্লভ পাটের ভুনি
ইহার বদলে কোন ধন |
আমার দেশের জাতি                           জন কতক তাঁতী
বুনাইতে অনেক দিবস লাগে  |
কেবল ধীরের কাম                              বস্ত্র বড় অনুপম
প্রাণশক্তি টানিলে না  ছিঁড়ে ||     
তোমার দেশের কাছে                            আর যত দ্রব্য
দর দিয়া করহ বিচার  |
পাঠাও তুমি চট চাহি                       সর্ব রাজ্যে ঠাঁই ঠাঁই
কোন দেশে চট নাহি আর ||
রাজার যোগ্য বসন                          না পরে সামান্য জন
অনেক শকতি ইহা কিনি |
যতনে রাখিয়া ঘরে                         সর্বকাল লোকে পরে
বড়ই দুর্লভ চটের ভুনি  ||
চান্দর ললিত ভাবে                           খলখলি রাজা হাসে
আপন হাতে চট মেলি চায়  ||
একখানা কসিয়া পিন্ধে                   আর খানা মাথায় বান্ধে
আর খান দিল সর্ব গায়  ||
চট পরিয়া রাজা                         ডাক দিয়া আনে খোজা
আবাসে পাঠাইলে কতখান  |
রাণীরে বলিও বাণী                            পরুক চটের ভুনি
যেন দেখি জুড়ায় পরাণ  ||
তোমারে কহিলাম সার                     এমন বসন নাহি আর
ইহার বদলে কোন ধন |
সাধু বলে মহাশয়                         এ বোল কভু মিথ্যা নয়
তোমার তরে কহিব সকল  ||
উচিত কহি মিতা                                নেও পাটের বস্তা
বাছিয়া লও ইহার বদল ||
পদ্মাবতী দরশনে                              সানন্দে বিজয় ভণে
যাহারে সদয় নারায়ণ ||

.                                                          ****************                                                
সূচি...    


মিলনসাগর
*
*
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

বস্তুবদল পালা

                     ৫
রাজা বলে শুন ভাই আমার বচন |
উষা দ্বারীরে আন আমার সদন ||
রাজার কথায় একজন গেল ধাইয়া |
বাড়ির ভিতর দূত দিল পাঠাইয়া  ||
সত্বরে চলিল ঊষা রাজার গোচর |
রাজ ব্যবহারে সেলাম করে তিনবার ||
রাজা বলে দ্বারী ভাই শুনরে বচন |
এই ফল খাবা তুমি আমার সদন  ||
ভিন দেশী সদাগর নাহি বুঝি কার্য  |
আমারে মারিয়া বুঝি লইবেক রাজ্য ||
ইনামের নামে বেটা কাতর হইয়া আসে |
আমি মরিলে রাজা ইনাম দিবা শেষে  ||
প্রাণ ভয়ে আগু নহে কোপে নরপতি |
এড়াইতে নারি ফল লইল হাত পাতি ||
রাজার আগে কান্দে ঊষা দুঃখ লাগে বড়ি |
এই কালে বল ভাই সরস লাচারি  ||

.              ****************                                                                 
সূচি...    


মিলনসাগর
রাজা বই ইহার আর অন্যে নাহি খায় |
মূলা হেন দ্রব্য লোকে অতি ভাগ্যে পায় ||
হেন মত খাই মূলা তেন মত বুঝ কাজ |
গৃহিণীর প্রিয় বড় মূলার আনাজ ||
রান্ধিয়া ব্যঞ্জন খাইতে বড়ই হরিষ |
অধিক তৃপ্তি হয় খাইতে নিরামিষ ||
চান্দ বলে শুন ধনা আমার বচন |
আর যত বস্তু আছে আনহ্ এখন ||
এতেক শুনিয়া ধনা না করিল আন |
ডিঙ্গা ঘাটে পাইক লইয়া ধরিল যোগান ||
মুসুরির বদলে লইল রক্ত হিঙ্গুল  |
বাউস বদলে দ্রাক্ষা লইল বহু মূল  ||
ছাগল বদলে হরিণ লইল বড় দেখি ভাল  |
বারকোষ বদলে লইল পিতলের থাল ||
এই সকল দ্রব্য লইয়া কৌতুক হইল বড়ি |
সংবাদ পড়িল ভাই বলিতে লাচারি ||

.              ****************                                                                 
সূচি...    


মিলনসাগর
*
*
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

বস্তুবদল পালা



বিষম বাঙ্গালী লোকে                   প্রকারে মারিতে তোকে
তার লাগি আনিয়াছে বিষ ফল |
সাধু বড় কহে সাঁচ                             ডাঙ্গর দীঘল গাছ
মাথায় ছড়ায় ধরে ফল ||
বুঝিনু কপট যত                            বায়ু যেতে নাহি পথ
তাতে জল গেলেক কেমনে |
শাকবর্ণ বাহির কাল                    ছুলিলে যে বার হয় ধল
লালবর্ণ হয় পরক্ষণে  ||
আসিয়াছে বড় ঠাটে                       যুঝিবারে নাহি আঁটে
তেকারণে করিছে মন্ত্রণা |
কৌশল করিয়া বেটা                          ঘটাবে বিষম লেঠা
না জানি কি ঘটায় যন্ত্রণা  ||
শুন শুন মহাশয়                                  বিষফল মনে লয়
সব কথা শুনি বিপরীত |
পদ্মাবতী দরশনে                             সানন্দে বিজয় ভণে
নারিকেল থুইল ভূমিত ||

.                                                          ****************                                                
সূচি...    


মিলনসাগর
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

বস্তুবদল পালা

                                        ১৪

বস্তু বদল করে তারা                                  তবু বলে সাধুর ধন দেড়া |
নারিকেল বদলে শঙ্খজোড় লইল রে                  তবু বলে সাধুর ধন দেড়া |
বারকোষ বদলে পিতলা থাল লইল রে               তবু বলে সাধুর ধন দেড়া |
কুকুর বদলে ঘোড়া ভাল লইল রে                    তবু বলে সাধুর ধন দেড়া |
টিয়া বদলে শুক পাখী লইল রে                       তবু বলে সাধুর ধন দেড়া |
হরিদ্রা বদলে সোনা ভাল হইল রে                    তবু বলে সাধুর ধন দেড়া |
মুগ বদলে মুক্তা লইল রে                              তবু বলে সাধুর ধন দেড়া |

.                                   ****************             
.                                                                                    
সূচি...    


মিলনসাগর
*
কবি বিজয় গুপ্ত-র মনসামঙ্গল কাব্য
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

বস্তুবদল পালা

                   ১৫
দিবসের বিকি কিনি হরিষে করিয়া |
চক্ষুর নিমেষে লুঠে ডাকাতি করিয়া ||
রতন মাণিক্য সব দেখিতে উজ্জ্বল |
ছালা ভরিয়া সাধু নিলেক সকল ||
যত দ্রব্য ছিল মোর রাজ ভান্ডার ভিতর |
একে একে তুলিলেক ডিঙ্গার উপর  ||
একে একে চৌদ্দ ডিঙ্গা সকল ভরিল |
মনে মনে সদাগর আনন্দে ভাসিল  ||
চান্দ বলে আরে ধনা উপদেশ শুন |
যত দ্রব্য আছে ডিঙ্গার বাহিরে আন ||
মাল নিয়ে যায় ধনা বাজারে বাজারে |
দ্রব্যের সহিত তারে কোতোয়ালে ধরে ||
ধনারে লইয়া গেল রাজার গোচরে  |
রাজা বলে হেন দ্রব্য নাহিক সহরে  ||
রাজার হইল ক্রোধ ধনার হইল হাস |
রাজা যদি গরু হয় অবশ্য চাহি ঘাস ||
এক মুষ্টি কায়নের চাল হাতে করি |
রাজারে দিলেক ধনা বহু যত্ন করি ||
পাঁচ সের দুগ্ধ ধনা আনিলেক কিনিয়া  |
ক্ষীর রান্ধি খায় সে বিরলে বসিয়া ||
ক্ষীর খেয়ে হয় রাজার হরিষ অপার |
সদাগর আসিলেক রাজার গোচর ||
সাধু বলে এইবার বিকিতে নাহি ভাস্য |
দেশে গেলে স্ত্রী আমাকে বলিবে পাগল ||
এক কাঠা কায়ন যে মাপিয়া থুইল  |
কুড়ি কাঠা মুক্তা তার বদলে লইল ||
প্রবাল লইল আরো সমতুল্য তার |
মনে মনে সদাগর হরিষ অপার ||
মনে মনে ধনা তবে করিল বিচার |
দেখেছি রাজার ভান্ডে দ্রব্য নাহি আর ||
অন্দরেতে মহারাণী শুনিল শ্রবণে |
ডাক দিয়া ধাইকে আনিল তখনে ||
বিজয় গুপ্ত বলে গাইন কৌতুক হইল বড়ি |
সংবাদ পড়িল গাইন বলরে লাচারি ||

.            ****************                                                                   
সূচি...    


মিলনসাগর
*
১  
মনসার জন্ম পালা

গৌরী কোন্দল পালা     

মনসা বিবাহ পালা     

অষ্ট নাগের জন্ম পালা   

অমৃত মথন পালা   

বনবাস পালা       

হাসন হুসন যুদ্ধ পালা     

গুয়াবাড়ি কাটা পালা       

ধন্বন্তরি বধ পালা     
১০
ছয় কুমার বধ পালা     
১১
ঝালুবাড়ির পূজা পালা  
১২
যমযুদ্ধ পালা      
১৩
যাত্রাপাটন পাটন পালা     
১৪
বস্তুবদল পালা     
  ১. কোতোয়ালের মুখে রাজা শুনিয়া বচন   
২. রাজার ভেটিতে যায় পট্টবস্ত্র দিয়া গায়   
৩. স্বভাব বিচক্ষণ সাধু পরের বুঝে মান   
৪. বিষম বাঙ্গালী লোকে প্রকারে মারিতে তোকে   
৫. রাজা বলে শুন ভাই আমার বচন   
৬. শিশু হইতে সেবাকারি না করিলাম ডাকাতি চুরি  
৭. যদি সে রাজা মোর লইবা জীবন   
৮. উষার মা ভাই কান্দে কোতোয়াল চান্দরে বান্ধে   
৯. পাত্র মিত্র বলে ঊষা সত্য কথা কহ   
১০. তোমার দেশেতে যাব এক লক্ষ টাকা লব   
১১. নপুংসক লোক রাজা আনে ডাক দিয়া   
১২. মিতা রে, তুমিত পন্ডিত মহাজন   
১৩. চান্দর ইঙ্গিত ধনা আনন্দিত মন   
১৪. বস্তু বদল করে তারা তবু বলে সাধুর ধন দেড়া   
১৫. দিবসের বিকি কিনি হরিষে করিয়া   
১৬. যত ধন মিতা চায় তুলি দিও তার নায়   
১৭. একে একে চৌদ্দ ডিঙ্গা ভরিল সত্বর   
১৮ মান্দারের ফুল আর চটের কাপড়   
১৫
ডিঙ্গা বুড়ান, লক্ষ্মীন্দরের জন্ম ও চান্দ লাঞ্ছনা পালা
১৬
লখিন্দরের বিবাহের জোড়ানি পালা    
১৭
লোহার বাসর ঘর নির্মাণ পালা     
১৮
লখিন্দর বিবাহ পালা       
১৯
লখিন্দর দংশন পালা   
২০
ভাসান পালা      
২১
স্বর্গারোহণ পালা     
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

বস্তুবদল পালা

১৬

যত ধন মিতা চায়                          তুলি দিও তার নায়
কি বুদ্ধিতে যাইতে পারি তথা |
হেন মনে লহ ধাই                          পক্ষী হইয়া তথা যাই
চটের বসন আছে যথা ||
মিতার ঘরে যত চেড়ী                 তারা পরে পাটের শাড়ী
বিদ্যাধরি হেন লয় মনে  |
হেন ছার দেশ ছাড়ি                     তথা যাইতে ইচ্ছা করি
একাসনে বসি সাধু সনে ||
ধাই বলে কি কহ মা                         হেন কথা বলিও না
কেন যাবে সদাগর পাশ |
রত্নময় আভরণ                                 পরিতেছ সর্বক্ষণ
তাহে তব নাহি মিটে আশ ||
এ কথা হইলে ফাঁস                            সাধু পাবে সর্বনাশ
বিক্রমকেশর পাছে শুনে |
পদ্মাবতী দরশনে                             সানন্দে বিজয় ভণে
শুনিয়া কৌতুক সর্বজনে ||

.                                                          ****************                                                
সূচি...    


মিলনসাগর
খাসা ইনাম আনি কোতোয়ালকে দিল  ||
বেলা অবশেষ হইল রবি ঘরে গেল  |
ভোজন করিয়া সাধু শয়ন করিল  ||
নিদ্রা হইতে ওঠে সাধুর নন্দন |
শয্যা ত্যাগী বাইরে গেলা ততক্ষণ  ||
রাজার হুকুম পাইল পাইক শতে শতে |
বারবেলা এড়িয়া চলিল ত্বরিতে ||
ভাল ভাল দ্রব্য নিল সঙ্গে করিয়া |
রাজার নিকট যায় হরষিত হইয়া ||
তুলা লগ্নে যাত্রা করে চান্দর সদাগর |
দুর্গা দুর্গা বলি চান্দ চাহে নাকের স্বর ||
রাজা ভেটিতে যায় কৌতুক হইল বড়ি |
সংবাদ পড়িল গাইন বলরে লাচারি ||

.                                   ****************                         
সূচি...    


মিলনসাগর
*
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

বস্তুবদল পালা

                    ৩
স্বভাব বিচক্ষণ সাধু পরের বুঝে মান  |
রাজার সঙ্গেতে করে মিত্রতা সম্ভাষণ  ||
কিবা বস্তু আনিয়াছ আমার সহরে |
সকল আনিয়া দেহ আমার গোচরে ||
এতেক শুনিয়া চান্দ ধনারে নেহালে |
কহিলেন যত রাজা সকলি শুনিলে ||
ইঙ্গিতে সদাগর কহিল ধনারে  |
সস্তা দ্রব্য আনি দেহ রাজার গোচরে ||
কাঁচা আদা আনি বরি বাটা বাটা  |
শুকনা খেজুর দিল মূলা আটা আটা ||
ভক্ষ্য দ্রব্য থুইল যত সারি সারি দিয়া  |
নবেতে আনন্দ বড় এ সব দেখিয়া  ||
গুবাক নারিকেল আর নাগরঙ্গ |
শুকনা খেজুর আর দিলেক ছোলঙ্গ ||
দেখিয়া কৌতুক রাজা মনে মনে পাঁচে |
এমন অপূর্ব ফল ধরে কোন গাছে ||
নারিকেল দেখি রাজা তখন জিজ্ঞাসে |
এমন অপূর্ব ফল আছে কোন দেশে  ||
গোটা কয়েক গাছ আছে মোর অধিকারে |
গোটাকয়েক আনিয়াছি তোমা ভেটিবারে ||
নারিকেল খাইতে রাজার বড় আশ |
কাটারি আনিয়া ধনা খসাইল শাঁস  ||
তোলা ছয় চিনি তবে জলে মিশাইয়া |
রাজার হাতেতে ধনা দিলেক আনিয়া  ||
পাত্র সবে আসিয়া রাজা হাত ধরি  |
না খাইও নারিকেল পরীক্ষা না করি ||
বিজয় গুপ্ত বলে মোরে রাখ বিষহরি
সংবাদ পড়িল গাইন বলরে লাচারি  ||

.              ****************                                                                 
সূচি...    


মিলনসাগর
*
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

বস্তুবদল পালা

                   ১৭
একে একে চৌদ্দ ডিঙ্গা ভরিল সত্বর |
রোঙ্গাই পন্ডিত বলে সাধুর গোচর  ||
দিনে দিনে বাড়ে বায়ু দক্ষিণ পবন  |
দেশেতে যাইতে সাধু করহ মনন  ||
এ দেশের মধ্যে যদি থাকে দুষ্টজন |
প্রকাশ করিলে যাবে তোমার জীবন ||
ডাব নারিকেল পচে শিমূলের তুলা |
রৌদ্রে শুকাইবে যত দিছ পাকা মূলা ||
চৌদ্দ ডিঙ্গা ভরিয়াছে হরষিত মন |
বিদায় লইতে চান্দ করিল গমন ||
করযোড়ে কহে সাধু আপন কাহিনী  |
দেশের তরে যাই মিতা দেহ হে মেলানি ||
মেলানি দেহ হে তবে দেশে চলে যাই  |
আবার আসিব মিতা বলিলাম তোমার ঠাঁই ||
আবার আসিবার কালে আনিব মাদার ফুল  |
বুড়া কালে দিলে হয় তরুণ গাভুর ||
ডৌয়া আনিব রাজা মাণিক্যের তুল্য  |
এক রাজার ধন আছে এক ডৌয়ার মূল্য ||
পাকা চালিতা আছে আর মাকাল ফল |
থাকুক খাবার কাজ দেখে জিবের পড়ে লাল  ||
পাকা গাব দেখি রাজা হরিষ অন্তর |
ভক্তি করি আভরণ দিলেক সত্বর ||
কোলাকুলি করি কহে বিক্রমকেশর |
করিয়াছ উপকার তুমি সদাগর ||
কি দিব তোমাকে আমি কি আছে আমার |
এক লক্ষ টাকা দিল সাধুকে ব্যবহার ||
রোঙ্গাই পন্ডিত আর নফর যোগ্য ধনা |
ব্যবহার দিল তারে এক মণ সোনা ||
স্বভাবে বণিক জাতি বড়ই সেয়ানা  |
রাজার ব্যবহার দিল চট চারিখানা  ||
একখানা চট ধনা গুছান করিল |
রাজার সাক্ষাতে হস্ত বাড়াইয়া দিল ||
যোড় হাতে ধনা কহে রাজার গোচর |
ধন্য ধন্য করে রাজা কৌতুক অন্তর  ||
সোনার টোপর রাখি খাটের উপরে |
সকল শরীরে  রাজা চটের বস্ত্র পরে ||
সাধুর বচনে রাজা ধার কাছে কয়  |
এই সব বস্ত্রে কেন গাত্র চুলকায়  ||
ক্রোধ করি কহে ধনা আগুন অন্তর |
নিত্য পরি মোরা দেশের কাপড় ||
বান্ধিয়া রাখিছি মোরা পরম যতনে |
উত্সব আনন্দ হইলে পরি সেই দিনে ||
ভণে কবি বিজয় গুপ্ত মনসার বর |
চট বস্ত্র পরে রাজা বিক্রমকেশর ||

.            ****************                                                                   
সূচি...    


মিলনসাগর
*
মনসামঙ্গল কাব্যের সূচি
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

বস্তুবদল পালা



রাজার ভেটিতে যায়                     পট্টবস্ত্র দিয়া গায়
এক ধাইতে সহস্রেক ধায় |
রোঙ্গাই পন্ডিত চলে                      তেরা নফর চলে
যাহার হাতে মিষ্ট নারিকেল  ||
শুকনা পাটের পাত                     আর যত দ্রব্যজাত
কোটি কোটি লড়ে সব দাতা |
যোগিনী করিয়া পাছে               দাঁড়াইল রাজার কাছে
রাজা ঘনাইয়া নোয়ায় মাথা ||
খাট পাট সিংহাসন               তাতে তোমার আরোহণ
তোমার দেখি পুণ্য শরীর |
কোথাকার সদাগর                     কি নাম কোথায় ঘর
স্বরূপে কহিবা মোরে সার ||
চম্পক নগর ঘর                         নাম আমার চন্দ্রধর
বাপ আমার ধনের কুবের |
আমার দেশের কথা                   কি কব তোমার হেথা
দ্রব্য মেলে অনেক প্রকার ||
পদ্মাবতী দরশনে                        সানন্দে বিজয় ভণে
রাজারে ভেটিল সদাগর ||

.                                                          ****************                                                
সূচি...    


মিলনসাগর
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

বস্তুবদল পালা

                   ১৮
মান্দারের ফুল আর চটের কাপড় |
পরিলে বুড়ায় হয় তরুণ নাগর ||
আরবার আনিব মিতা চলিতার ফল  |
তাহারে খাইলে মিতা গায় হয় বল ||
আরবার আনিব মিতা পাকা কলা তাল |
তাহারে খাইতে মিতা বড়ই রসাল  ||
আরবার আসিলে মিতা আনিব তেঁতুল  |
ধনা বলে তারে খাইলে হয় জনম সফল  ||
চান্দ বলে ধনা তুই ঘরের নফর হও |
এই সব মর্মকথা মিতার ঠাঁই কও  ||
তাহার সমান ফল মর্ত্যলোকে নাই |
দেবতার ভাগ লাগি সৃজিলা গোসাঞি ||
মেলানি করিয়া তখন চান্দর সদাগর  |
ডিঙ্গা ঘাটে গিয়া সাধু মিলিল সত্বর  ||
মনে মনে চিন্তে সাধু ভবানীর পাও |
গঙ্গা পূজা করিয়া সাধু শীঘ্র বাহে নাও ||
স্নান করি সাধু করে দেবার্চ্চন |
নানা দেবের পূজা করে সাধুর নন্দন  ||
ধূপ দীপ দিয়া পূজে চান্দ আনন্দিত মন |
শিবদুর্গা পূজে আর দেব নারায়ণ ||
কুবের বরুণ পূজে দেবতা পবন |
ইন্দ্র চন্দ্র ব্রহ্মা পূজে দেব হুতাশন ||
সকল দেব পূজা করে চান্দ মহাবলী  |
গঙ্গারে পূজে ধবল ছাগল দিয়া বলি  ||
সর্ব দেব পূজে চান্দ আনন্দিত মতি  |
ঘৃণায় না পূজিল দেবী পদ্মাবতী  ||
পূজা সাঙ্গ করিয়া চান্দ হইল কোপিত |
কোথা হইতে এক বুড়ী আসিল আচম্বিত ||
অতি বৃদ্ধা হয়ে আসে লড়ি করি ভর |
মাথায় আঙ্গুল চুল করে ফরফর  ||
কোথা গেলা আরে ধনা মোর বোল ধর |
ঠেঙ্গা মারি বুড়ীরে পুরীর বাহির কর ||
চান্দর কোপ দেখি পদ্মার ভয় অতিশয় |
যোড় হাতে কহে দেবী করিয়া বিনয় ||
পদ্মা বলে কোপ এড় সাধুর তনয়  |
অবধান কর আমি হই পরিচয়  ||
কোপ পরিহর সাধু আমি নাগ জাতি |
মহাদেবের কন্যা আমি নাম পদ্মাবতী  ||
যাত্রাকালে দেব পূজা ফুলে আর ধূপেতে |
তেকরণে আসিলাম তোমার পূজা খাইতে ||
মোর তরে কোপ এড় সাধুর কুমার  |
মোর তরে ফুল জল দেও একবার ||
মোর পূজা করি চান্দ সুখে চলি যাও |
কান্ডারে বসিয়া আমি তরাইব নাও ||
ধনগর্বে না পূজ কর অহঙ্কার |
এবার হারাবা প্রাণ সমুদ্র মাঝার ||
চান্দ বলে কানি তোর লাজ নাই চিতে |
কোন মুখে আইলি তুই মোর পূজা খাইতে ||
যেই হাতে পূজি আমি শঙ্কর ভবানী |
সেই হাতে পূজা খাইতে চাহ দুষ্ট কানি ||
যেই হাতে পূজি আমি দেবী দশভূজা  |
কোন মুখে চাহ তুমি সেই হাতের পূজা ||
মরণ জীয়ান যদি তুমি করিতে পার |
তবে কেন কাণা চক্ষুর ঔষধ না ধর ||
দূরে যাও লঘুজাতি না বলিস আর |
এত দেব মধ্যে করিস ধামনা ভাতার ||
তর্জে গর্জে চান্দ হেতাল লইয়া লাঁফে |
কলার বাকল হেন পদ্মার প্রাণ কাঁপে ||
দন্তে দন্তে সশনে করে কড়মড় |
প্রাণ লইয়া মনসা উঠিয়া দিল লড় ||
ত্রাসে যায় পদ্মাবতী আলুথালু চুলি |
পাছে পাছে ধায় চান্দ ধর ধর বলি ||
ত্রাসে যায় পদ্মাবতী আপন ভবন |
নেতার সঙ্গে কহে গিয়া আপন কথন ||
নৌকায় উঠিল চান্দ মনের কৌতুকে |
শিবদুর্গা বলিয়া নৌকায় গিয়া উঠে ||
দেশের নামে সর্বলোকে ধায় আগুসারে |
হাসিতে হাসিতে গেল কলিদয় সাগরে ||
হেথায় মনসা দেবী চিন্তিয়া বিকল  |
অবিলম্বে যায় তরিয়া সমুদ্রের জল ||
বুদ্ধি বল ওগো নেতা কি হবে উপায় |
কি বুদ্ধি করিব চান্দ দেশে চলি যায় ||
বারে বারে যত বলে মনে দুঃখ পাই  |
হেন মনে চান্দর চৌদ্দ ডিঙ্গা ডুবাই ||
ধন জন নিব চান্দর প্রাণে না মারিব |
তবে মনে সুখী হইয়া দুঃখ পাশরিব ||
নেতা বলে শুন কথা জয় বিষহরি |
তোমার প্রাণে চান্দরে কি করিতে পারি ||
বাপ মহেশ্বর চান্দর মাতা মহামায়া |
পুত্রভাবে তাঁহারা চান্দরে করে দয়া ||
আমার বচন তুমি শুন  দিয়া মন |
গঙ্গার নিকটে তুমি যাও এইক্ষণ ||
অশেষ বিশেষ তাঁরে  কহিও কথন |
গঙ্গা যদি করেন তোমার দুঃখ বিমোচন ||
তোমার প্রতি দয়া থাকে যদি আজ্ঞা পাও |
তবে সে ডুবাইতে পারে চান্দর চৌদ্দ নাও ||
এতেক শুনিয়া দেবী ভাবে মনে মন |
নাগরথ সাজাইয়া আনিল তখন ||
বিজয় গুপ্ত কবি ভণে মনসার বর |
বিদায় লইয়া যায় চান্দ সগাগর ||
রথে চড়ি রহিলা দেবী পদ্মাবতী |
বস্তু বদল পালা সমাপ্তি ইতি ||

.            ****************                                                                   
সূচি...    


মিলনসাগর
*
*
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

বস্তুবদল পালা


কোতোয়ালের মুখে রাজা শুনিয়া বচন |
সংবাদ দিয়া আনিলেক পাত্র যতজন ||
কোতোয়াল বলে শুন নৃপবর |
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

বস্তুবদল পালা

                   ৯
পাত্র মিত্র বলে ঊষা সত্য কথা কহ |
হাতসনে চক্ষু বুজি নিমেষ কেন রহ ||
কবি বিজয় গুপ্তর
মনসা মঙ্গল

বস্তুবদল পালা

                 ১৩
চান্দর ইঙ্গিত ধনা আনন্দিত মন |
পট্ট বস্ত্র লইয়া ধনা করিল গমন ||
রাজা বলে শুন মিতা আমার বচন |
আর যে বস্তু আছে তোলত এখন  ||
এই পাতায় কোনো ভুল-ত্রুটি চোখে পড়লে অথবা যদি
কোথাও ভুল বলে মনে হয়, তাহলে আমাদের এই ইমেলে
জানাবেন। আমরা শুধরে নেবার চেষ্টা করবো।
srimilansengupta@yahoo.co.in