কবি বিমলচন্দ্র ঘোষ-এর কবিতা ও গান
*
বুড়ো শালকর আলি হোসেন
কবি বিমলচন্দ্র ঘোষ

বুড়ো শালকর আলি হোসেন,        মানুষটা বড় ভালো |
রাজারাজড়ার শাল আলোয়ান      সাফ করে জমকালো |
বয়সটা প্রায় আশীর কোঠায়         ভেঙে গেছে শিরদাঁড়া,
কুঁজো হ’য়ে বসে রিপু চালায়,        দাঁড়াতে পারে না খাড়া ;
চশমার ডাঁটি ভেঙে গেছে            সুতো বেঁধে কাজ করে ;
মেটে দাওয়াটার সিঁড়ি ভাঙে         ফুটো চালে জল ঝরে ;

বাবা তাঁকে চাচা ব’লে ডাকেন        আমার ঠাকুরদা,
আলি হোসেনের কন্ঠে যেন           স্বর্গের সুর সাধা |
সিঙ্গিবাড়ীর মেজোবাবুর               জামিয়ার রিপু কোরে
বুড়ো মানুষটা পাঁচশ’বার             গেলেন বাবুর দোরে ;
দু’টাকা মজুরী তাও পেতে            কেটে গেল বচ্ছর,
আল্লার কাছে নালিশ রুজু            করলেন শালকর |


আল্লার দয়া অন্তহীন                  মেজোবাবু জানোয়ার
চৌঘুড়ি মাৎ ক’রে বেড়ান            গায়ে দিয়ে জামিয়ার !
বুড়ো ঠাকুরদা আলি হোসেন         সাক্ষাৎ যেন ঋষি
ভুখাপেটে হায় খেটে খেটে           শূন্যে গেলেন মিশি’ !
যে মহাশূন্য --- শূন্য নয়               অযুত বজ্রে ঠাসা
মেজোবাবুদের চিতা জ্বালায়         অমোঘ সর্বনাশা |

.                     ****************      
.                                                                         
সূচীতে . . .     



মিলনসাগর
*
তক্ষক
কবি বিমলচন্দ্র ঘোষ

বৈশম্পায়ন কহিলেন, ‘হে মহর্ষে
অজাতশত্রু রাজা যুধিষ্ঠির ---‘
কারেন্ট ফিউজড্ আকস্মিক অন্ধকারে !
খট্ খট্ খট্ !
স্যাকরার হাতুড়ীতে কান ঝালাপালা !
‘স্বল্পশ্চকালো বহবশ্চ বিঘ্নাঃ’
কেন্দ্রচ্যুত অহম্ কাব্যলোকের কৈলাসে
জমার ঘরে লালবাতি !

‘ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ’
কবি-ভিক্ষুর সংকল্প
জঠর নয় অজাতশত্রু ক্ষুধাতৃষ্ণার সভ্যতায় |
পুঁজিপতির হামানদিস্তায়
ব্যাঙ্কের যাঁতায়
আত্মপুরুষ খাঁচাছাড়া !
মরার বাড়া গাল নেই !

যুধিষ্ঠির অজাতশত্রু, “অশ্বথামা হতঃ !”
ধামাচাপা “ইতিগজঃ,” --- হ-য-ব-র-ল !
সোনালি ইলেকট্রিকে পাঞ্চালীর হাসি
প্রলয়ের জলদর্চি চ্ছটা,
কারেন্ট ফিউজড্ --- বৈশাখী-ঈশানের অন্ধকারে !
তেঠেঙে পৃথিবীর জঙ্গলে
কিল বিল করছে পরীক্ষিতের তক্ষক !
স্যাকরার হাতুড়ীতে তক্ক-তক্ক-তক্ক
দ্বাপরের দুর্ঘটনা |

ঠোঁটের লিপস্টিকে প্রেমের মরীচিকা
অতনুর প্রেতশিখা
“আর কতদূরে নিয়ে যাবে মোরে হে সুন্দরি ?”
তুলে ধরো ধূম্রযবনিকা
বোমা-বিস্ফোরণে হলো চূর্ণ অট্টালিকা
উড়ে চলে আগ্নেয়-তক্ষক
হিটলারের পাপপ্রসূ আর্যামীর শূন্যপথ বেয়ে
তক্ক তক্ক তক্ক
কবিত্বের দুর্ঘটনা ট্যাঁক গড়ের মাঠ,
সোম্মে নয় মার্নে নয় আদিগঙ্গার তীরে |
সংকীর্ণ গলির মোড়ে গ্যাস জ্বলছে
গরাদের ফাঁকে ফাঁকে আলোছায়া |
কালপুরুষ আকাশে নির্বাক
ছন্নছাড়া নক্ষত্রের শিখা |
ভস্ কা উইঢিপি থেকে নিরেট পাহাড়
বৈষম্যের অন্ধ প্রতিযোগী
রেশারেশি কাপড়ে গয়নায়
খট্ খট্ স্যাকরার হাতুড়ী
মিহি সূতো টানা-পোড়েনের শব্দ ওঠে
শূন্যে ওড়ে বিষাক্ত তক্ষক !

.        ****************      
.                                                                         
সূচীতে . . .     



মিলনসাগর
*
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
কবি বিমলচন্দ্র ঘোষ

সাগরের জল নোনা, রক্ত অশ্রু ঘাম
সমধর্মী |   তুমি ক্ষুব্ধ চেতনা-সাগর,
অবিদ্যাবিজয়ী তব দূরন্ত সংগ্রাম
নব্যবঙ্গে মুক্তিদূত হে বিদ্যাসাগর !
জ্ঞানবাদী-সাধনায় তুমি অবিরাম
অজ্ঞতার যুদ্ধজয়ে ছিলে অস্ত্রধর,
ইতিহাসে রেখে গেছো কী উজ্জ্বল নাম
বাস্তব জীবনপথে চেতনা প্রখর |

অভিশপ্ত সমাজের ঘূণধরা মূলে
রুদ্ররোষে কী অব্যর্থ হেনেছ কুঠার,
পঙ্ক হ’তে পাপমুক্ত ঊর্ধ্ববাহুতুলে
শুনায়েছ জাগৃতির কেশরী-হুঙ্কার |
পিতৃপদে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববাঙালীর
তুমি ছিলে মুক্তিদাতা প্রশান্ত গম্ভীর |

.            ****************      
.                                                                         
সূচীতে . . .     



মিলনসাগর
*
বিগত বসন্ত
কবি বিমলচন্দ্র ঘোষ

ঘুম থেকে উঠে প্রাণ-সম্পুটে এটা নেই ওটা নেই !
নবারুণ-রাগে জ্বলে যাই রাগে ,স্বস্তির আশা নেই !
কর্কশ কাক দিনভোর ডাকে নেই নেই শুধু নেই !
বাজে-পোড়া নেড়া আশাবৃক্ষের ডাল থেকে ফল পাড়ি,
তাও যে বাদুড়ে ঠোকরানো হায় লক্ষ্মীর ফাটা হাঁড়ি
.                তুমিও অবুঝ হ’লে
দারিদ্র-ছুঁচো কীর্তন গায় ফাটা চামড়ার খোলে |
আমরা দু’জন যে কটি জীবন এনেছি এ সংসারে
কত মধুরাতে মুগ্ধ হৃদয় শাস্ত্রীয় ব্যভিচারে,
পরিণামে তাই সুস্থ জীবন সম্ভব হলোনাকো
বৃথা আশা নিয়ে অবাস্তবের নরকেই ডুবে থাকো !
.                  সংসার নয় সুখের রঙ্গভূমি !
প্রতি পদপাতে রক্ত ঝরায় বুঝেও বোঝে না তুমি |
তুমি ভাবো সবই মন্তরে আর অনায়াসে মিলে যাবে |
বরাতের মুখে ঝাড়ু মেরে যদি ভাবতে ঠান্ডা মাথায়
লক্ষ টাকার স্বপ্ন না দেখে শুয়ে শুয়ে ছেঁড়াকাঁথায়,
তা হ’লে অসার কান্নায় আর মিছে অভিমান ভরে
.                মরতে না ডুবে দুরাশার গহ্বরে |

কার্তিক শেষ শীত পড়ো পড়ো হেমন্তে হিম ঝরে
রাত্রি কাটাবো ছেঁড়া কম্বলও সম্বল নেই ঘরে,
দুঃসময়ের সান্ত্বনা শুধু দেশ নয় পরাধীন
আনন্দে তাই ক্ষুধিত-জঠরে পরমায়ু হ’লো ক্ষীণ
মিছে অভিমান পড়ে-পাওয়া প্রাণ বুকেই গুমরে মরে
শুধু একা নই নবরামায়ণী সমাজের ঘরে ঘরে |
শান্তির জল ছিটোয় বেতার ভোর থেকে রামধূনে
ভুঁখা জনতার বুকে পাখোয়াজ বেজে যায় চৌদুনে ;
আমরা দু’জনে যাদের এনেছি যৌবন-উত্সবে
সূতিকাগারের শঙ্খ বাজায়ে কোকিলের কুহু রবে
.                 বেহিসাবী যৌবন
টাকায় পাঁচ-পো দুধ জোগাবার চিন্তায় উচাটন |

ভুল নয় সখি, তোমার পাবার উদ্দাম-কামনায়
প্রেমের উনুনে দেহের কড়ায় আদিরস জ্বলে যায় ;
শরীরের প্রতি রন্ধ্রে রন্ধ্রে ধোঁয়াটে গন্ধ তা’র
ভরপূর কোরে রেখেছে ঘরের ছাঁপোষা অন্ধকার |
মরা-কোকিলের ডানার আঁধার বসন্ত গেছে ডুবে
মরা-চাঁদ ওঠে মরা-আকাশের সিঁড়ি ভেঙে চুপে চুপে |
তেপান্তরের প্রৌঢ়-জ্যোত্স্না ভাঙা লন্ঠন হাতে
গুঁড়ি মেরে চলে দুর্ভাবনার ঘনতমিস্রারাতে,
দখিণা মলয় ক্লান্ত শ্রান্ত হাঁপানীতে ভুগে ভুগে
অশোক বকুল ফোটে না প্রিয়ার হাজা-ধরা পদযুগে |
ভাঙা ঘরে বসে শরের কলমে স্থবির পঞ্চশর
হিসাব নিকাশে বিব্রত আজ ঋণভারে জর্জর,
পশে না সুরভি নাসারন্ধ্রে অসাড় অন্ধকারে,
চম্পক-হেনা-রজনীগন্ধা ফিরে যায় হাহাকারে !
.                কি হবে কাঁচুলি বেঁধে ?
দুধের অভাবে সন্তান যা’র ধুঁ’কে মরে কেঁদে কেঁদে !

.                  ****************      
.                                                                         
সূচীতে . . .     



মিলনসাগর
*
অতন্দ্র প্রহরী
কবি বিমলচন্দ্র ঘোষ
( ব্লাড্-প্রেসার স্ট্রোকে শয্যাশায়ী অবস্থায় )

ভেবে ভেবে রাত্রিদিন ভেঙ্গে গেছে বুক
আশাবাদী কাব্যে নেই ভাষা,
চিন্তা করে বিদ্রোহ-ঘোষণা !
আমি যদি মরে যাই আচম্বিত-মৃত্যুর আঘাতে
কতটুকু ক্ষতি কার ?
শুধু এক অনাথ-সংসার
মিশে যাবে নিরাশ্রিত অগণিত অনাথের ভিড়ে !
যদি সূর্য নিবে যায় দু’ চোখের দিবা--দ্বিপ্রহরের
পথ যদি থেমে যায়
কালের যাত্রায়
অসমাপ্ত আকাঙ্খার মাঝে
আচম্বিত-অন্ধকারে প্রলয়ের শঙ্খ যদি বাজে
বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু ক্ষতি ?
কে কা’র খবর রাখে জনতার সমুদ্র-কল্লোলে |

যে সন্তান বাবা ব’লে ডাকে
আদরে জড়ায় কন্ঠ আমারি সৃষ্টির শতদল
ঝরে যাবে পিষ্ট হবে এ নিষ্ঠুর সমাজের বুকে,
দয়ার কাঙাল হ’য়ে নেবে ভিক্ষাব্রত
কিম্বা চুরী সমাজের বৈষম্যের নিত্য পদাঘাতে |
আদরিণী শ্রেয়সী আমার
দাসীত্বের অপমানে দগ্ধে দগ্ধে পুড়ে হবে ছাই
নারীমেধযজ্ঞভূমি ধনবাদী ক্রুর-মৃত্তিকায়
আমার মৃত্যুর অভিশাপে ;
কন্যা হবে দেহপণ্যা লম্পটের ক্ষুধার ইন্ধন
আমি যদি মরে যাই
আমি যদি থেমে যাই প্রগতির জয়যাত্রাপথে !

হে আকাশ, হে পৃথিবী, শত দুঃখের শত নিরাশায়
দারিদ্রে ব্যাধিতে নির্যাতন
আমি যেন বেঁচে থাকি ক্ষমাহীন প্রহরীর মতো
সংসারে সমাজের দেশের দশের প্রয়োজনে !
আমি যেন যোগাই ইন্ধন
চেতনার অগ্নিকুন্ডে,
আমি যেন দিতে পারি স্নেহ-প্রেম-শ্রদ্ধার সম্মান !

.                  ****************      
.                                                                         
সূচীতে . . .     



মিলনসাগর
*
মুখোশ
কবি বিমলচন্দ্র ঘোষ
রচনা ২৬শে মার্চ ১৯৪০।
শ্রাবণ ১৩৬৩ বা আগস্ট ১৯৫৬ তে প্রকাশিত কবির “উদাত্ত ভারত” কাব্যগ্রন্থ থেকে
নেওয়া। এই কবিতাটির জন্য অনুরোধ করেছেন কবি রাজেশ দত্ত।
তাঁর ফেসবুক পাতা
https://www.facebook.com/rationalistrajesh ।    
YouTube-এ এই কবিতাটির, কাজী সব্যসাচীর কণ্ঠে আবৃত্তি শুনতে এখানে ক্লিক করুন...


সোনার পাহাড় ঘেরা মুখোশের দেশে
মুখোশেরা মঞ্চপতি। মুখোশে আবৃত মুখগুলি
মুখোশের গ্যালারীতে উল্লাসে মুখর!
মুখোশের যুগ এটা! মুখোশ! মুখোশ! চতুর্দিকে!
শূয়োরের চামড়া ঢাকা
মাথায় মোষের শিং ভাঁড়ামীর ক্লীব অঙ্গরাখা
শুচিশুভ্র সভ্যতার সর্বাঙ্গে জড়ানো।
মিহি মিহি বচনের সিকিইঞ্চি অর্ধইঞ্চি অমায়িক বর্বর ভাষণ
মুখোশের মুখে শোনো।
মনুষ্যত্ব কৃকলাস প্রেতায়িত প্রেম
আড়ষ্ট ললিতকলা প্রগল্ভ সঙ্গীত
মুখোশের মঞ্চে মঞ্চে!
উপদংশ গুটিকায় বিচিত্রিত মুখোশের মুখে
আঙ্গিকের অঙ্গভঙ্গী দ্যাখো,
দ্যাখো বিজ্ঞ মুখোশের রসাল রসনা
ঝরায় বিষাক্ত লালা!

নাগরিক জীবনের উচ্চাসনে কৃপালু নাগর
ব্যাঙ্কের ওভারড্রাফ্ টে, হুণ্ডি কেটে, মোটর হাঁকিয়ে,
চোরাগোপ্তা শেয়ারের মহিমায় প্রাসাদ বানিয়ে
অবিশ্রান্ত জন্ম দিয়ে যায়
নিরীহ নির্বোধ অসহায়
গরু ভেড়া ছাগ মহিষের
আভিজাত্য-কলুষিত কচি কচি উদ্ধত মুখোশ!

ক্লেদ-পঙ্ক-তিলকের জয়শ্রীমণ্ডিত
এ যুগের রাজসূয় মহাযজ্ঞশালা
পিশাচের প্রদর্শনী সশঙ্কিত সুরক্ষিত দ্বার
টিকিট লাগে না মুখোশের।
মুখ খোলা নিষিদ্ধ এখানে
খোলাকথা খোলাখুলি বলা অসম্ভব,
মুখোশের আভিজাত্য উচ্চপ্রশংসিত!
বনেদী মুখোশঢাকা মুখোশের মহারঙ্গভূমি
এ সমাজ, এ সংসার! পিতার মুখোশে
অনিচ্ছুক জন্মদাতা পিতৃস্নেহে বিবশ বিহ্বল!
মাতার মুখোশে---
চোখ নেই আলো নেই স্তন্যরস-ক্ষরণের জ্বালা
অন্ধ মূক মাতৃস্নেহ!

প্রেমিক প্রেমিকা প্রিয় প্রিয়া
যৌবনের নিরিন্দ্রিয় অভিশপ্ত চলন্ত মুখোশ,
মুখোশ! মখোশ! চতুর্দিকে!
তোমার মুখোশ দেখে হেসে ওঠে আমার মুখোশ
সৌজন্যে সম্ভ্রমে গদগদ
মুখোশের সুবিনীত মুখভঙ্গী দেখে
খোলাখুলি মনোবিনিময়
অবাস্তব মুখোশের দেশে!

মুখোশের যাদুকর মুখ নেই তবু কথা বলে
হাত নেই সম্পদ বিশাল
যাদুমন্ত্রে ধরে রাখে,
বিনাপায়ে হেঁটে যায় পায় যদি বাধামুক্ত পথ
জঠরে জটিল মনোরথ
অহোরাত্র জ্বেলে রাখে রাবণের চিতা!
দুরন্ত ক্ষুধায় লুব্ধ বিশাল জগত
কখন যে গিলে খাবে বলা অসম্ভব
অতিকায় মুখোশের হাঁয়ে।
মুখোশের আধিপত্যে সুরক্ষিত সোনার পাহাড়
ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি।

ভূরিভোজী ভূগর্ভের তলে
কান পেতে শোনো ভূকম্পন
চাপা ক্রোধ জমাট গর্জন
সুবর্ণ-পর্বতচূড়া ভেঙে বুঝি পড়ে!
আতঙ্কে উন্মাদ মুখোশেরা
মুখোশের রঙ্গমঞ্চে ভুলে যায় নাটকীয় ভাষা
আঙ্গিকের অঙ্গভঙ্গী! দুর্বোধ্য হুঙ্কার!
মুখোশ! মখোশ! চতুর্দিকে!

চেয়ে দ্যাখো মুখোশেরা নাচে বিনা পায়ে
আত্মঘাতী বীভত্স তাণ্ডব,
বিনা হাতে তালি দেয়
গলা নেই দোলে মুণ্ডমালা
অনাঙ্গিক হস্তপদ তাথৈ তাথৈ নাচ নাচে!

মুখোশের রঙ্গালয়ে যারা আজো পায়নি টিকিট
অনাহূত উপেক্ষিত অনিমন্ত্রিত
অনন্ত অর্বুদ হস্তপদ
খালি মুখে খোলাখুলি কথা বলে যারা
নিরন্ন নির্জীব পাকস্থলী,
সোনার পাহাড় যারা গড়েছিল ঘামো রক্তে নোনাঅশ্রুজলে
এ সমাজ এ সভ্যতা এ নগরীপথ
নিষিদ্ধ যাদের কাছে।

খোলা মুখ খোলা বুক, খোলা মন বৈভব উল্লাসে
তা’রা আসে---দলে দলে আসে
কেঁপে ওঠে রঙ্গশালা
ভেঙে পড়ে নিষিদ্ধ তোরণ!
শুয়োরের চামড়া ঢাকা
খসে পড়ে সভ্যতার ক্লীব অঙ্গরাখা,
পরাক্রান্ত মিছিলের দুরন্ত দুর্জয় পদাঘাতে
রাজপথে গড়ায় মুখোশ।

.                  ****************      
.                                                                         
সূচীতে . . .     



মিলনসাগর
*
চাকরী করো
কবি বিমলচন্দ্র ঘোষ

সেদিন বোঝাতে এলো হিতাকাঙ্ক্ষী বন্ধু একজন,
পরমবিজ্ঞের মতো সুচিন্তিত হিসেবী-ভাষণে :
‘অর্থহীন বিদ্রোহের কাব্য লেখা ছেড়ে
সংসারের মুখ চেয়ে,
চাকরী করো সদাশয় সরকারের বংশবদ হ’য়ে |’
সে কথায় হেঁচে উঠে ল্যাজ তুলে পালালো গরুটা
পাষাণ ফুটপাত থেকে ;
ট্রামের পা-দানী ফস্কে পড়ে গেল সরকারী পিওন
ছাঁটায়ের ফাইলের চাপে !
তারা খসে গেল শূন্যে,
চরকা-আঁকা তেরঙা পতাকা
শাঁ শাঁ ক’রে উড়ে গেল গরুর হাঁচির হাওয়া লেগে,
খাড়া হ’ল কুকুরের ল্যাজ
যে কুকুর হন্যে হয়ে রাজপথ আলো ক’রে ঘোরে |

তবুও বোঝালো বন্ধু, “কাব্য লেখা ছেড়ে
চাকরী করো, ছাড়ো মিছে বিদ্রোহ-বিলাস !”
সে কথায় খাটে-শোওয়া মড়া
শববাহীদের কাঁধে উঠে বসে তাকালো বিস্ময়ে
ভ্রুকুটি কুটীল চোখে |
সে কথায় বাঘমুখো-দোতলা বাসের
টায়ার বিদীর্ণ হলো উমেদার বেকারের চাপে !
একরাশি কৃষ্ণচূড়া-রক্তের ঝলক
রাঙালো কেল্লার মাঠ,
চীনাবাদামের খোসা উড়ে গেল তৃণশয্যা ছেড়ে |

.                  ****************      
.                                                                         
সূচীতে . . .     



মিলনসাগর