কবি বিনয়কুমারী দেবীর কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।  www.milansagar.com
*
কে বুঝিবে ?
(নির্ঝর কাব্য ১৮৯১ থেকে নেওয়া)
বিনয়কুমারী বসু, বিনয়কুমারী ধর


নিরখি নয়ন কোণে                এক বিন্দু অশ্রুবারি,
.                কে বুঝিবে বল ?
প্রাণের ভিতরে তব                কি সিন্ধু লুকায়ে আছে,
.                কত তার তরঙ্গ প্রবল!
একটি দীরঘ শ্বাসে,                কে বুঝিবে, এ জগতে
.                কি ভীম তুফান
হৃদয়ের মাঝে তব,                বহিতেছে দিবানিশি
.                চূরমার করিছে পরাণ!
শুনিয়া ও ক্ষীণ কণ্ঠে                বিষাদের মৃদুতান,
.                কে বুঝিবে হায় ?
কি গভীর মর্ম্মোচ্ছ্বসে                কি গভীর হাহাকারে
.                বুক তব ভেঙ্গে নিতি যায়!
সজল নয়ন যুগে                        কাতর চাহনি আধ,
.                দেখে একবার!
কে বুঝিবে হৃদিমাঝে                আকুল পিপাসা-ভরা
.                কি বাসনা, কি ভিক্ষা তোমার ?
বিন্দুমাত্র দেখাইয়া                বুঝাইতে সব কথা,
.                কেন আকিঞ্চন!
কে এত মরমগ্রাহী                দেখিয়া বালুকাকণা
.                মরুদৃশ্য বুঝিবে কেমন ?


.     
                  ***************  
.                                                                                    
উপরে    


মিলনসাগর
*
যাও, স’রে যাও!
বিনয়কুমারী বসু

.        যাও, স’রে যাও!
সরতের সুনীলাকাশে বসিবে চাঁদের মেলা ;
তুমি কেন মেঘ-ছায়া, সেথায় দাঁড়াও ?
.        যাও, সরে যাও!
.        যাও, ডুবে যাও,
সাগর ঝটিকা শেষে, ভগন তকণি, তুমি,
কি আশে অকূল মাঝে ভাসিয়া বেড়াও ;
.        যাও, ডুবে যাও!
.        যাও, ঝ’রে যাও,
গোলাপ ঝরিয়া গেছে তুমি পাপড়িটি তার,
কেন বসে শূণ্য বৃন্তে, কার পথ চাও?
.        যাও, ঝরে যাও!
.        যাও, চলে যাও,
গেছে আশা, গেছে সুখ, বাসনা! কেন গো তবে
ঘুরে ঘুরে শুষ্ক বুকে পিয়াস জাগাও ?
.        যাও, চ’লে যাও!
.        যাও, ম’রে যাও!
অনন্ত বিশ্বের মাঝে, তুমি লক্ষ্যহারা প্রাণ,
তুলিয়া আকুল আঁখি কেন শূণ্যে চাও ?
.        যাও, ম’রে যাও!

.            ***************  
.                                                                                    
উপরে    


মিলনসাগর
*
ও গো, কেন বাঁশী বাজে ?
বিনয়কুমারী বসু

ও কেন বাজায় বাঁশী আকুল করে?
বাঁধিতে দেয় না মন আপন ঘরে! –
.        মধুর মোহন তানে,
.        কি মায়া ছড়ায় প্রাণে,
অবশে, চরণে হৃদি লুটায়ে পড়ে!
.        অধর চুমিয়া বাঁশী,
.        চুরি ক’রে মৃদু হাসি,
কি সাধে গাহে লো গান কাহার তরে ?
কেন, সে তানে মঞ্জুরে ফুল ;
.        গুঞ্জরে মধুপ-কুল ;
পিকবধূ ডাকে “কুহু” অধীর স্বরে ?
ওর দুটি কালো আঁখিতারা,
.        অমন অলস-পারা,
ঢুলু ঢুলু করে কেন কি ভাব ভরে ?
.        কি খেলা খেলিতে চায় ?
.        কেন হৃদি লয়ে যায়,
চরণে দলিবে যদি ক্ষণেক পরে!
ও কেন বাজিয়ে বাঁশী পাগল করে ?

.            ***************  
.                                                                                    
উপরে    


মিলনসাগর
*
দৃষ্টি
বিনয়কুমারী বসু

হৃদয়ের সাথে বুঝি হৃদয়ের কথা।
দোঁহারে টানিছে দোঁহে আপনার পানে,
জানাইতে মরমের চির আকুলতা
এসেছে হৃদয় দুটি ভাসিয়া নয়ানে!
গোপন প্রাণের দ্বার গেছে যেন খুলে,
দোঁহার লুকানো আশা দেখিছে দোঁহায়,
উথলিছে প্রেমসিন্ধু আঁখি-উপকূলে,
ভরে উঠে দরশের হরষ জ্যোত্স্নায়।
কত না মধুর সাধ সুখের পিপাসা,
জাগিছে অতৃপ্তি নিয়ে নয়নের কোণে ;
নীরব মনের কত সুকোমল ভাষা,
বুঝিতেছে পরস্পরে না বলে’ না শুনে ;
প্রাণে বাঁধিতেছে প্রাণ গাঢ় আলিঙ্গনে,
চেয়ে শুধু অনিমিষে নয়নে নয়নে!

.            ***************  
.                                                                                    
উপরে    


মিলনসাগর
*
বাসন্তী নিশায় (সম্ভবত খণ্ড কবিতা)
বিনয়কুমারী বসু

রজত যোছনাময়ী বাসন্তী যামিনী,
.        সুরভি লভে সে বায়,
.        আলসে বহিয়া যায়,
ফুটে যেথা নিশি গন্ধা সু-চারু হাসিনী,
সরমে আনত মুখী শেফালী কামিনী!

অধর টিপিয়া হাসে প্রকৃতি সুন্দরী!
.        নবীন শ্যামল কায়,
.        জ্যোছনায় ভেসে যায়,
আলিঙ্গি সে তনুখানি বসন্ত বাতাস,
চারিদিকে ঢালে চূত-মুকুল-সুবাস!

কেন এ মধুর রাতে এই মধুময়
.        ফুল দেহ বিলসিত,
.        পুলকেতে বিকম্পিত,
সুহাসিত, চন্দ্রালোকে হৃদয় পাতিয়া,
এমন অবশ-পারা আছি দাঁড়াইয়া।

*        *        *        *        *

.        এ মধু চাঁদিনী রাতে,
.        মধুর মলয় বাতে,
স্বরগের চারু বীণা কোন্ দেব করে,
বাজিতেছে কোথা যেন সুললিত স্বরে।

*        *        *        *        *

জাগাতে হৃদয় মাঝে অনন্ত পিয়াস
.        এমন মধুর স্বরে,
.        বাজে বীণা কার করে,
বুঝিতে পারে না মন সুধাইব কায় ?
কে করে বিবশ প্রাণ বাসন্তী নিশায় ?

.            ***************  
.                                                                                    
উপরে    


মিলনসাগর
*
রাত্রির প্রতি রজনীগন্ধা
বিনয়কুমারী ধর
(চৈত্র, ১৩০০ বঙ্গাব্দ, ১৮৯৩ সাল, “ভারতী” পত্রিকায় প্রকাশিত)

বারেক দেখিয়া যাও, ওগো মহা অন্ধকার!
পদতলে বনপ্রান্তে ফুরায় জীবন কার ?
গোপন মর্মের কথা ক্ষণেক শুনিয়া যাও,
নামায়ে করুণ নেত্র মুমূর্ষুর মুখে চাও ;
তুমি ত জান না কিছু কখন্ কে মুগ্ধ প্রাণে,
মেলিয়া মুকুল-আঁখি চেয়েছিল তোমা পানে।
শোন তবে, জীবনের নবীন প্রদোষে যবে,
তরুণ শ্যামল মূর্তি, দেখা দিলে সুনীরবে ;
অধরে লাগিয়াছিল হাসির চন্দ্রমা-রেখা।
ললাটে পড়িয়াছিল সন্ধ্যার কনক লেখা!

আনন্দে উঠিনু ফুটে, তোমারি পূজার তরে
সমস্ত হৃদয় দেহ যৌবনে উঠিল ভরে।
সব গন্ধ সব মধু তব তরে লয়ে বুকে,
অপূর্ব পুলকে আমি চাইনু তোমার মুখে।
শত লক্ষ এই তারা-খচিত নীলিমাসনে
যখন বসিলে তুমি প্রশান্ত গম্ভীরাননে,
যোগ্য অধিপতি জেনে আপনাকে সমর্পিয়া
ধরণী চরণতলে পড়ে তব ঘুমাইয়া।

আঁধারে খুলিয়া হিয়া অর্পিনু তোমার পায়
প্রেমের সৌরভ-ভার ; তখন বুঝিনি হায়
তুমি চেয়ে কার মুখ! কোন পুষ্প-কুঁড়িটিরে,
নিভঋত হৃদয় দিয়ে যতনে রেখেছ ঘিরে।
এখন সে নিজ নিধি দিয়ে প্রভাতের বুকে
ফেলিয়া শিশির অশ্রু না জানি চলেছ দুঃখে
কোন্ নিরুদ্দেশে তুমি। ফুরায় জীন মোর।
আসিছে আলোক অই আঁধার করিয়া ভোর,
পিকগান অলিতান হরষে হিল্লোল লয়ে
নবস্ফুট হৃদিতরে। তব অন্তরালে রয়ে
ফুটেছি, যেতেছি ম’রে কিছুই চাহিনা আর।
শেষ সুবাসিত শ্বাস প্রণয়ের উপহার,
দিতেছি অন্তিমে ; ওগো, এ নিশ্বাসে অনুক্ষণ,
স্নিগ্ধ রহে যেন তব শূণ্য অন্ধকার মন।

.            ***************  
.                                                                                    
উপরে    


মিলনসাগর
*
বঙ্গবধূ
বিনয়কুমারী বসু

মূর্ত্তিমতী নব প্রেম, সলাজ সুন্দরী
যোড়শী কিশোরী বালা ঊষার প্রতিমা,
লু্ক্কায়িত গৃহকোণে ; বধূ-রূপ ধরি
বঙ্গ-অন্তঃপুর মাঝে বদ্ধ মধুরিমা।
ঘোমটায় আবরিত অনিন্দ্য আনন,
অবনত আঁখিপাতা কমলের দল ;
বেড়ি মণিবন্ধ দুটি কনক-কঙ্কণ
জাগাইছে অণুক্ষণ পতির মঙ্গল।
রাঙ্গা-লজ্জা-বস্ত্রে ঢাকা চম্পকবরণ
সুগোল কোমল চারু পূর্ণ-তনুখানি,
নিশবদ পদক্ষেপে করে বিচরণ ;
শুনিতে পায় না কেহ অধরের বাণী!
স্নেহ-বন্দী, চির-রুদ্ধ গৃহের মাঝারে ;
লক্ষ্মী লুকাইয়া যেন বরুণ-আগারে।

.            ***************  
.                                                                                    
উপরে    


মিলনসাগর