কবি বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র - জন্মগ্রহণ করেন কলকাতায় তাঁর মামাবাড়ীতে। ছদ্মনাম "বিরুপাক্ষ"। পিতা
রায়বাহাদুর কালীকৃষ্ণ ভদ্র ও মাতা সরলাবালা দেবী।

বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ১৯২৬ সালে ইন্টারমিডিয়েট ও ১৯২৮ সালে কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে স্নাতক হন।
তিরিশের দশকে তিনি যোগ দেন কলকাতার বেতার কেন্দ্রে।

১৯২৮-সালে
বাণীকুমার তাঁর টাকশালের চাকরি ছেড়ে যোগ দেন কলকাতা বেতার কেন্দ্রে। ১৯৩২ সালে
রচনা করেন শারদ-আগমনী গীতি-আলেখ্য ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ যা মহালয়ার প্রভাতে দেবীপক্ষের সূচনা করে।
এই অনুষ্ঠানটির সুর সংযোজন করেছিলেন পঙ্কজ মল্লিক এবং চণ্ডীপাঠ ও ভাষ্যে ছিলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র।
কলকাতা বেতার কেন্দ্রে অসংখ্য অনুষ্ঠান করলেও বাণীকুমার ও বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র কে মানুষ মনে রেখেছে
‘মহিষাসুরমর্দিনী’-র জন্য। পঙ্কজ মল্লিক অবশ্য বহুমূখী প্রতিভাধর ব্যক্তি ছিলেন, যিনি বাংলা সিনেমার
জনপ্রিয় সুরকার-গায়ক-নায়কও ছিলেন। কিন্তু তাঁকেও বাঙালী এই ‘মহিষাসুরমর্দিনী’-র জন্যও মনে রাখবে।

বাণীকুমার নিজের লেখাতেই জানিয়েছেন, ‘‘এ-কথা বলা বাহুল্য যে, আমাদের কয়জনের আন্তরিক সাধন-দ্বারা
এই মহিমাময় চণ্ডী-গাথা সকল শ্রেণীর জনবর্গের প্রার্থনীয় হয়েছে।.......... ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ কলিকাতা
বেতারের তথা বাঙালার একটা কীর্তি-স্থাপন করেছে।’’ বেতার সম্প্রচারের আশি বছরের ইতিহাসে এই
রকম অনুষ্ঠান আর দ্বিতীয় নির্মিত হয়নি, যার জনপ্রিয়তা এর ধারে কাছে আসতে পারে।

১৯৭৬-এ আকাশবাণী কর্তৃপক্ষ একবার বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ বাতিল করে দিয়ে মহানায়ক
উত্তম কুমারকে দিয়ে ভাষ্য পাঠ করিয়ে নতুনভাবে এই অনুষ্ঠান পরিবেশন করে যার নাম ছিল “দেবী
দুর্গতিনাশিনী”, কিন্তু সে পরিবর্তন বাঙালী মেনে নেয়নি। অনুষ্ঠান শেষে ব্যাপক জনরোষ দেখা দেয়। মজার
ব্যাপার ছিল এই যে এই নতুন অনুষ্ঠানের নেতৃত্বে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা সকলেই সেই সময়কার সংস্কৃতিক-
জগতের অতি নমস্য ও জনপ্রিয় ব্যক্তি ছিলেন! তা সত্ত্বেও প্রত্যাখ্যানের সুর এতটাই চড়া ছিল যে খ্যাতির
মধ্যগগনে থাকা মহানায়ক উত্তমকুমারকে ব্যাপক তিরস্কার হজম করতে হয় তার অগণিত ভক্তের কাছ
থেকে। শেষে উত্তম কুমার ও আকাশবাণীকে ক্ষমা চাইতে হয়। আকাশবাণী আর দ্বিতীয়বার সাহস দেখাননি
মহানায়কের অনুষ্ঠানটির সম্প্রচার করার। সেই ‘জরুরী অবস্থা’-র জমানাতেও জনগণের প্রবল প্রতিবাদে
মহাষষ্ঠীর সকালে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ সম্প্রচার করতে বাধ্য হয়েছিল সরকারি প্রচার মাধ্যম ‘আকাশবাণী’।
পরের বছর থেকে আবার ফিরে আসে বাণীকুমার-পঙ্কজকুমার মল্লিক-বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের ‘মহিষাসুরমর্দিনী’।
বাঙালী প্রজন্মের পর প্রজন্ম বিনা বিজ্ঞাপনেই শুনে চলেছে এই অনুষ্ঠান!

১৯৭৬ এর সেই মহালয়ার সকালে ক্ষূব্ধ রেলকর্মীরা যাত্রিদের জন্য হাওড়া স্টেশনেরর মাইকে
‘মহিষাসুরমর্দিনী’-র ক্যাসেট চালিয়ে দিয়েছিলেন! যত পত্র-পত্রিকা ছিলো সেইসময়ের, তার সবটাই
প্রতিবাদের চিঠিতে ভরে গিয়েছিল। বাঙালীর মতো সাত-চড়ে-রা-না-কাড়া জাতি যেভাবে সেবার প্রতিবাদ
করেছিল, তা ছিল বিস্ময়কর। যেন আপামর জনসাধারণের ব্যক্তিগত কোন ক্ষতিসাধন করা হয়েছিল সেই
বিকল্প অনুষ্ঠান প্রচারিত করে। এ থেকেই বোঝা যায় যে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ বাঙালীর মনে কোন আসন
অধিকার করেছিল। আজও তার হেরফের হয় নি।

বিশ্বের আর কোনও বেতার তরঙ্গে এতদিন ধরে নিয়ম করে, বছরে একটি দিন, সাধারণ সম্প্রচারের সময়ের
বাইরে (ভোর চারটের সময়), একটি নির্দিষ্ট অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হয়, এমন ঘটনা বোধহয় আর নেই।
সংগীতজ্ঞ বিমলভূষণ একবার বলেছিলেন যে এই অনুষ্ঠান বাঙালির হৃদয়ে পাকাপাকিভাবে স্থান করে
নিয়েছে। সেই কথারই প্রতিধ্বনি শোনা গিয়েছিল বর্ষীয়ান সংগীতশিল্পী দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়ের কথায়। ২০০৭-
এ, ‘মহিষাসুরমর্দিনী’-র ৭৫ বছর উপলক্ষে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘‘এ হল বাঙালির সর্বকালের
সর্বশ্রেষ্ঠ অনুষ্ঠান। আমাদের কালে অনেক জলসা ইত্যাদি হত, কিন্তু এখন সে সব উঠে গেছে, অথচ
‘মহিষাসুরমর্দিনী’ রয়ে গেছে এবং থাকবেও বহুদিন। এই গীতি আলেখ্যর আকর্ষণ সারা বিশ্বের বাঙালির
কাছেই…।”

বাণীকুমার রচিত ‘মহিষাসুরমর্দিনী’, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের স্তোত্রপাঠে এবং পঙ্কজ মল্লিকের সুরে যেভাবে
বাঙালীকে প্রভাবিত করেছে তেমন করে বোধহয় আর কারো লেখা প্রভাবিত করে নি। না, রবীন্দ্রনাথের
লেখাও নয়। সমাজের উঁচু, নীচু, বড়, ছোট, সর্বস্তরের বাঙালীকে, একই সময়ে, একইভাবে প্রভাবিত করতে
পেরেছেন একমাত্র এঁরাই ‘মহিষাসুরমর্দিনী’-র মধ্য দিয়ে। যে বাঙালীর মহালয়ার ভোরে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’
শোনা হয় না, সে বাঙালীর যেন জীবন থেকে কি একটা বাদই পড়ে যায় সে বছর! আগামীতে কোনো
বৈজ্ঞনিক বিশ্লেষণ হয়তো বলতে পারবে যে এই অনুষ্ঠানটি বাঙালী জাতির জেনেটিক মিউটেশন (জীনগত
পরিবর্তন) ঘটিয়েছিল কি না!

বীরেন্দ্রকৃষ্ণ একাধিক নাটকে অভিনয় ও পরিচালনার কাজও করেছেন। তিনি ১৯৫৫ সালে, নিষিদ্ধ ফল নামে
একটি চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যও রচনা করেছিলেন। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ মেস নং ৪৯ সহ একাধিক নাটক রচনা করেন।
বিমল মিত্রের সাহেব বিবি গোলাম উপন্যাসটিকে তিনি মঞ্চায়িত করেছিলেন। ১৯৫২ সালে বঙ্কিমচন্দ্র
চট্টোপাধ্যায়ের সুবর্ণ গোলক গল্পটিকে তিনি নাট্যায়িত করেন। রম্যরচনা লিখেছেন "বিরুপাক্ষ" ছদ্মনামে।

৩রা নভেম্বর ১৯৯১ তারিখে তাঁর মৃত্যুর আগে, দীর্ঘ কাল তিনি স্মৃতিশক্তিহীন হয়ে ছিলেন। তাঁকে নিয়ে
বাঙালীর উন্মাদনা ও স্বীকৃতি এ সব কিছুই তিনি শেষ বয়সে বুঝে যেতে পারেন নি।

বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের সংগীত সম্বন্ধে লোকমুখে একটি খবর ছড়িয়েছিল। খবরটি গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের
১৩১৩ বঙ্গাব্দের আষাঢ়ে প্রকাশিত, খেয়া কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা ১৩১২ বঙ্গাব্দে রচিত, “শেষ খেয়া”
কবিতাটিকে নিয়ে, যার প্রথম পংক্তি “দিনের শেষে ঘুমের দেশে ঘোমটা-পরা ঐ ছায়া”। গানটি পঙ্কজ
মল্লিকের কণ্ঠে প্রথম শোনা যায় “মুক্তি” ছায়াছবিতে। পঙ্কজ মল্লিক এই ছবির নায়কও ছিলেন। ছবিতে এই
গানটির সুরকারের জায়গায় নাম ছিল পঙ্কজ মল্লিকের।

পরে শোনা যায় যে গানটিতে দেওয়া সুরটি নাকি পঙ্কজ মল্লিক ও বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের মিলিত প্রচেষ্টা ছিল।
আরও শোনাযায় যে এই নিয়ে তাঁদের মধ্যে একটি মনোমালিন্যের সৃষ্টিও হয়েছিল (এই খবরটির সত্যতা
সম্বন্ধে আমাদের কেউ জানালে বাধিত হব)। বহু পরে গানটি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠেও প্রকাশ পায় একই
সুরে।


আমরা এখানে
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীসরল দে সম্পাদিত “পাঁচশো বছরের কিশোর কবিতা” সংকলন থেকে
বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রর একটি কবিতা তুলে দিয়েছি।

জগন্নাথ বসু কথিত, আনন্দবাজার পত্রিকার ২০-০৯-২০১৪ তারিখের সংখ্যায় প্রকাশিত, যা বীরেন্দ্র
সর্বভূতেষু লেখাটি বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র এবং সেই সময়কালকে নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা।
লেখাটি পড়তে
এখানে ক্লিক্ করুন

আমরা
মিলনসাগরে  কবি বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রর কবিতা তুলে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে
আমাদের এই প্রয়াস সার্থক মনে করবো।

উত্স :  বাংলা টোরেন্টস.কম     
.         
উইকিপেডিয়া         
.         গৌতম বসুমল্লিক, মহিষাসুরমর্দিনী গীতি-আলেখ্য ও বাণীকুমার, আনন্দবাজার পত্রিকা
.         
রক্তিম দাশ, কলকাতা করেসপন্ডেন্ট, বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম   



কবি বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রর মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক্ করুন

আমাদের যোগাযোগের ঠিকানা :-   
মিলনসাগর       
srimilansengupta@yahoo.co.in      





এই পাতার প্রথম প্রকাশ - ১৮.১১.২০১৩
.