কবি বীথি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা
*
গোপনে রাখা ঘুমের বড়ি নিয়ে
হারিয়ে যাই আলোকবর্ষেই।

সেই ঘটনার বছর দুয়েক বাদে
তুমি আমার পরিত্যক্ত ঘরে
এসে দেখতে ধূলো জমেছে কাচে
হঠাৎ হাওয়ায় বইয়ের পাতা ওড়ে।

তুমি তখন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে
বসে পড়তে পালঙ্কের কাছে . . .
মৃদু ডাকতে নতুন বউঠান
কোথায় তুমি ? বারান্দার গাছে---

হাত বুলোতে জল ছিটিয়ে দিতে
আমি তখন আলোকবর্ষ দূরে,
একা ঘুরছি আকাশ পথে পথে
শুধুই মেঘ নবীন মেঘের সুরে।

অথচ তুমি জোড়াসাঁকোর ঘরে
বসে ভাবছ তোমার বউঠান
কোথায় আছে ? সত্যি আছে নাকি ?
ভেবে তোমার কলম খরশান।

তুমি যদি রবীন্দ্রনাথ হতে
তাহলে এক কিংবদন্তী হত,
বাংলাভাষা বাংলা কবিতায়
আমি হতাম কাদম্বরীর মতো।

.           *****************

.                                                                                          
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
আর কীভাবে কত নকল করি ?
যারা তোমায় মেঘ বানিয়ে দেয়---
তাদের মতো অধরা অপ্সরী . . .

আমি তো নই এটাই আমার দোষ!
আমার দুঃখে আভিজাত্য নেই,
আমার অশ্রু লেখনি কোনোদিন
আমার ক্রোধেও রুচির ছাপ নেই।

আমার কথা ফুরিয়ে এল যেন
এসব কথা ফুরিয়ে যাওয়াই ভালো
তুমি এখন শিলাইদহে একা
ফুটছে প্রথম রূপের মতো আলো।

.           *****************

.                                                                                          
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
একা
কবি বীথি চট্টোপাধ্যায়

আমার চোখে বসন্ত দারুণ চৈত্রমাস
চতুর্দিকে শিমূল-পলাশ কৃষ্ণচূড়ার ত্রাস।

ঝড় উঠেছে নিখুঁত কালো বৃষ্টি ভেজা রাত
আঁচল দিয়ে দুঃখ ঢাকি কোথায় তোমার হাত ?

তব্ধ যদি ভালোবাসা প্রেমের-কম্পন
ফিরিয়ে দাও কিশোরীকাল প্রথম চুম্বন।

ভালোবাসার আগুন ঝড়ে চাইনি কোনো দাম
অশ্রুবিহীন চক্ষু হল প্রেমের পরিণাম।

এই সময়েই ভিন্ন হলে এমন চৈত্রমাস
ভালোবাসার ফুটছে কলি, ফাল্গুন বাতাস!

এই যে চোখ এই যে প্রেম, এই যে হা-হুতাশ
এই বসন্তে দেবো কাকে প্রেমের আস্বাস ?

আমার চোখে বসন্ত দারুণ চৈত্রমাস
ভালোবাসা বাসার পরে, ভাঙলে বিশ্বাস!

.           *****************

.                                                                                          
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
শশুরবাড়ি যাবার দিন
কবি বীথি চট্টোপাধ্যায়

ট্রেনের জানলায় নরম রোদ
অথচ কামরায় প্রখর তাপ
আকাশে সুনিপুণ নীলের দাগ
সবুজ ধানক্ষেত ছটেছে জোর

ওপাশে ঘরবাড়ি সোনালি রঙ
গ্রামের বধুটির নিবিড় মন
কলসীভরে নিতে মায়াবীজল
আঁচলে বেঁধে নেয় সারাটা দিন।

দিনের শেষে রোজ ছায়া জড়ায়
বাতাসে দোল ওঠে ঝাঁকুনি দোল
তারার চাঁদোয়াটা নীলে মানায়

ট্রেনের ছুটে চলা কু-এতে ঝিক
মনের দিক ভুল খুব দোষের ?
জানালা মুখোমুখি প্রেম জানায়

শরীরে ট্রেন সুর রঙিন তাস
ঘুমিয়ে জেগে থাকা এ বসবাস।

.        *****************

.                                                                                          
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
অভিশাপ
কবি বীথি চট্টোপাধ্যায়

স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে যেই বউকে বুকে জড়িয়ে ধরবে
তখন তোমার ভীষণভাবে আমার কথাই মনে পড়বে।
আমার বুকের কলহাস্য এবং নিছক বুকের স্পর্শ---
আমার রূপের টুকরো টুকরো অনুষঙ্গ,
হাতের নরম আঙুলগুলো তোমার চুলে খেলা করবে।

এসব কথা বাড়িয়ে বলা একদমই নয়
যখন তুমি আমায় নিয়ে জড়িয়ে ছিলে
তখন থেকেই আমার ভুরু, চিবুকের ডৌল,
শাড়িতে ঢাকা পায়ের পাতা, বিঝতে পারলো
অন্যকোনও মেয়ের সঙ্গে শুয়ে থাকলেও . . .

পাপের মতো এসব কথা শোনায় যেন
কেমন করে পাপের গতি ভয় হারালো ?
পাপও এত পবিত্র হয়! জানা ছিল না।
সে যাই হোক, এবার তুমি যে মুহূর্তেই
প্রেমে পড়বে, তক্ষুনি ঠিক এমনভাবে
আমার খতাই মনে পড়বে।

.        *****************

.                                                                                          
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
অলৌকিক
কবি বীথি চট্টোপাধ্যায়

তুমি যদি রবীন্দ্রনাথ হতে
আমি হতাম নতুন বউঠান,
সূর্যাস্ত জোড়াসাঁকোর ছাদে
বৈশাখী ঝড় নতুন বাঁদাগান।

তোমার তখন তেইশ চব্বিশ
তোমার গায়ে পিরান দুধসাদা,
সকালবেলা ভৈরবী সুর বাজে
বাঁধানো ঘাটে বজরাটিও বাঁধা।

নদীর ঘাটে নুয়ে পড়ছে গাছ
প্রাণাধিকেষু
কবি বীথি চট্টোপাধ্যায়

আমি এখন একাকী মাঝরাত
মাধুরীলতা পাশে ঘুমিয়ে আছে,
তুমি এখন শিলাইদহে বোটে
আমার শরীর যখন তুমি নাও
যখন তোমার শোভন মধুর বাঁশি---

বুঝতে পারি অন্য কাউকে ভাবছো
আমার বুকে কোমল রঙ সুখ,
অথচ তুমি আমাকে দেখছো না!
দিগন্তে কার গভীর স্মিতমুখ ?

এসব কথা তোমাকে বলব না
আমার বলার ভাষাও ভালো নয়,
রাগরাগিণীর সুর চিনতে আজও
আমার দারুণ ভুলভ্রান্তি হয়।

আমি একটা বোকা গ্রাম্য মেয়ে
তোমার লেখা বুঝতে ভয়ে সারা,
আমায় তোমার কীইবা প্রয়োজন ?
রান্নাঘর আর শয্যাকক্ষ ছাড়া ?

প্রথম প্রথম তোমার ছন্দ ভুল
শুধরে দিতেন নতুন বউঠান,
এখন যেমন বিবি তোমার লেখা