২। প্রেমবিলাস গ্রন্থের রচয়িতা নিত্যানন্দ দাসের পিতৃদত্ত নাম ছিল বলরাম দাস। শৈশবে তাঁর মাতা-পিতার
অকাল মৃত্যুর পর প্রভু নিত্যানন্দের প্রথমা পত্নী জাহ্নবা বা জাহ্নবী দেবী তাঁকে আশ্রয় দিয়ে দীক্ষিত ক’রে
নিত্যানন্দ দাস নাম দেন। সাধারণত কোন বৈষ্ণব কবিকে দীক্ষান্ত নাম ব্যাতীত পূর্বাশ্রমের নামে পদের  
ভণিতা দিতে দেখা যায় না। নিত্যানন্দ দাসও প্রেমবিলাস গ্রন্থের বিভিন্ন ভণিতায় তাঁর দীক্ষান্ত নামই  
ব্যবহার করেছেন। কেবল আত্ম-পরিচয়তে তাঁর পিতৃদত্ত নাম বলরাম দাসের উল্লেখ করেছেন। তাই তিনি  
যদি নিত্যানন্দ দাস নাম গ্রহণ করবার পূর্বে কোনো পদ রচনা করে থাকেন, সেই পদে বলরামদাস ভণিতা   
থাকা সম্ভব। নিত্যানন্দ দাসের প্রেমবিলাস গ্রন্থের বিংশ বিলাসের ২১২-পৃষ্ঠায় তাঁর আত্ম-পরিচয়-তে লেখা
রয়েছে . . .

মাতা সৌদামিনী, পিতা আত্মারাম দাস।  অম্বুষ্ঠ কুলেতে জন্ম শ্রীখণ্ডেতে বাস॥
আমি এক পুত্র মোরে রাখিয়া বালক।  মাতা পিতা দুঁহে চলি গেলা পরলোক॥
অনাথ হইয়া আমি ভাবি অনিবার।  রাত্রিতে স্বপন এক দেখিনু চমত্কার॥
জাহ্নবা ঈশ্বরী কহে কোন চিন্তা নাই।  খড়দহে গিয়া মন্ত্র লহ মোর ঠাঁই॥
স্বপ্ন দেখি খড়দহে কৈনু আগমন।  ঈশ্বরী করিলা মোরে কৃপার ভাজন॥
বলরাম দাস নাম পূর্ব্বে মোর ছিলা।  এবে নিত্যানন্দ দাস শ্রীমুখে রাখিলা॥

এখানে জাহ্নবা দেবীর স্বপ্ন দেখার পংক্তির অর্থ এই দাঁড়ায় যে তাঁকে জাহ্নবা দেবী নিজের আশ্রয়ে নেবার  
কালেই, বালকাবস্থাতেই, দীক্ষিত করার স্বপ্নাদেশ দিচ্ছেন। দীক্ষাগ্রহণের পূর্বে বালকাবস্থাতেই পদ রচনা করে
থাকলে তা বিস্ময়কর নিঃসন্দেহে। বালকাবস্থায় যদি পদ-রচনা কিছু করেও থাকেন তা নিশ্চয়ই বলরাম  
দাস ভণিতাযুক্ত হয়ে থাকবে।

৩। “কৃষ্ণলীলামৃত” কাব্যের রচয়িতা দীন বলরাম দাস। দীন বলরাম দাস ভণিতার যে কয়টি পদ পাওয়া
গেছে তা দীনতা-ব্যঞ্জক না হলে এই কবির রচনা হতে পারে।

৪। মূলতঃ ব্রজবুলির পদ রচয়িতা এক বলরাম দাস যাঁকে কবিরাজ বলে সম্বোধন করা হয়েছে। সেকালের
প্রখ্যাত কীর্তনিয়া ও কোনো রকমের পৃষ্ঠপোষক ছাড়া সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে, বিশ্বের সর্ববৃহৎ
কাব্যসংকলন শ্রীশ্রীপদকল্পতরুর রচয়িতা
বৈষ্ণবদাসের পদে এঁর উল্লেখ আছে . . .

কবি-নৃপ-বংশজ                ভুবন-বিদিত যশ
.        ঘনশ্যাম বলরাম।
ঐছন দুহুঁ জন                নিরুপম গুণগণ
.        গৌর-প্রেমময়-ধাম॥

এই পদের প্রথমজন ঘনশ্যাম,
কবি গোবিন্দদাস কবিরাজের পৌত্র ঘনশ্যাম কবিরাজ এবং দ্বিতীয়জন বলরাম
কবিরাজ যিনি গোবিন্দদাস কবিরাজের অগ্রজ রামচন্দ্র কবিরাজের শিষ্য বলে উল্লিখিত।  

৫। সুকুমার সেন এক বলরাম বসুর কথা বলেছেন যাঁর কয়েকটি পদ বলরাম দাসের ভণিতায় চলে আসছে
(
সুকুমার সেনের উদ্ধৃতিতে পড়ুন)।

৬। তিনটে পদে “বলাই দাস” বা “দাস বলাই” ভণিতা পাওয়া গিয়েছে। বাংলা ভাষায় মাধাই, মাধবের
অপভ্রংশ বা ডাক নামের মতো বলাই, বলরামের অপভ্রংশ বা ডাক নাম হিসেবে চলে আসছে। এই বলাই
দাসের পদকে বলরাম দাসেরই পদ বলে মনে করেছেন বিভিন্ন বৈষ্ণব পদাবলী বিশেষজ্ঞগণ। এই বিষয়ে
বিস্তারিত পড়তে
কবি বলাইদাসের পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন . . . (এই পৃষ্ঠা তৈরী হচ্ছে)।

আধুনিক কালে বলরাম দাসের জীবন নিয়ে বিশেষজ্ঞরা যে তথ্য-তর্ক-বিতর্কের মধ্যে দিয়ে এগিয়েছেন তার
একটি রূপরেখা দেওয়ার চেষ্টা করা হোলো নীচে, বিভিন্ন বৈষ্ণব-সাহিত্যের বিশেষজ্ঞদের কালানুক্রমিক
উদ্ধৃতির মাধ্যমে। এ বিষয়ে আগ্রহীজনদের তা কিছুটা কাজে লাগবে এই আশা রাখি।
---মিলন সেনগুপ্ত, মিলনসাগর॥
বলরামদাস-শ্রীশচন্দ্র-বিমানবিহারী-মালবিকা-মঞ্জুলিকা   
একাধিক বলরামদাস ভণিতা   
দীনেশচন্দ্র সেনের উদ্ধৃতি ও বিতর্ক   
রমণীমোহন মল্লিকের উদ্ধৃতি   
হরিমোহন মুখোপাধ্যায়ের উদ্ধৃতি   
আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদের উদ্ধৃতি   
দুর্গাদাস লাহিড়ীর উদ্ধৃতি   
কালীমোহন বিদ্যারত্নের উদ্ধৃতি   
সতীশচন্দ্র রায়ের উদ্ধৃতি   
জগদ্বন্ধু ভদ্র ও মৃণালকান্তি ঘোষের উদ্ধৃতি   
জগবন্ধুর লেখাতে বলরামদাসের বংশধর হরিদাস গোস্বামীর উদ্ধৃতি   
প্রিয়নাথ জানার উদ্ধৃতি   
সুকুমার সেনের উদ্ধৃতি   
রায়হাদুর খগেন্দ্রনাথ মিত্রের উদ্ধৃতি   
বিমানবিহারী মজুমদারের উদ্ধৃতি   
নীলরতন সেনের উদ্ধৃতি   
দেবনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্ধৃতি   
কুমুদরঞ্জন ভট্টাচার্যর উদ্ধৃতি    
বৈষ্ণব পদাবলী নিয়ে মিলনসাগরের ভূমিকা     
বৈষ্ণব পদাবলীর "রাগ"      
কৃতজ্ঞতা স্বীকার ও উত্স গ্রন্থাবলী     
মিলনসাগরে কেন বৈষ্ণব পদাবলী ?     
*

এই পাতার উপরে . . .
*

এই পাতার উপরে . . .
*

এই পাতার উপরে . . .
*

এই পাতার উপরে . . .
কবি বলরাম দাস  - অন্যতম বৈষ্ণব
পদকর্তা। বলরাম দাস নামে একাধিক কবি
ছিলেন। বৈষ্ণব কবিদের মধ্যে তাঁর বা তাঁদের
স্থান
জ্ঞানদাসের পাশে। তিনি তাঁর বাত্সল্য রস
বা বাললীলার পদের জন্য বেশী পরিচিত, যাতে
তিনি অনন্য ছিলেন। রূপানুরাগ ও রসোদ্গারের
পদেও তাঁর কৃতিত্বের কথা বিশেষজ্ঞরা স্বীকার
করেন। "পাষাণ মিলাঞা যায় গায়ের বাতাসে"
অথবা "হিয়ার ভেতর হৈতে কে কৈল বাহির"
প্রভৃতি পংক্তি বাংলা সাহিত্যে কালজয়ী সম্মান
লাভ করেছে। সংক্ষেপে বলরাম দাস নামের
কবিরা হলেন . . .

১। সর্ব-প্রবীণ বলরামদাস ছিলেন প্রভু
নিত্যানন্দের অনুচর। তিনি প্রভু নিত্যানন্দের
অনুমতিক্রমে গৃহস্থাশ্রম গ্রহণ করেন এবং
কৃষ্ণনগরের কাছে দোগাছিয়া গ্রামে বসবাস শুরু
ক’রে সেখানে শ্রীকৃষ্ণের গোপাল-মূর্ত্তি প্রতিষ্ঠা
করেন। তাঁর জন্ম ষোড়শ শতাব্দীর শেষে।
ইনিই
জগদ্বন্ধু ভদ্রর দ্বিজ বলরাম।
একাধিক বলরামদাস ভণিতা -                                                         পাতার উপরে . . .   
এযাবৎ আমাদের দ্বারা সংগৃহীত সকল “বলরাম-বলাই” নামের পদকর্তার সকল পদ এই পাতায় পাবেন। এ
ছাড়া আমরা মিনলসাগরে যে সকল “বলরামদাস” ভণিতার কবির পদ সংগ্রহ করতে পেয়েছি তা হলো
“বলরামদাস”, “বলরামদাস কবিরাজ”, “দীন বলরামদাস”, “বলরামদাস নরোত্তম ভক্ত” এবং “বলাইদাস”।


আমরা
মিলনসাগরে  কবি বলরামদাসের পদাবলী তুলে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে এই
প্রচেষ্টাকে সফল মনে করবো।


কবি বলরামদাসের মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন
কবি বলাই দাসের মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন


আমাদের ই-মেল -
srimilansengupta@yahoo.co.in     


এই পাতার প্রথম প্রকাশ - ১২.১.২০১০
মোট ২৮০টি পদ নিয়ে এই পাতার পরিবর্ধিত সংস্করণ - ১৪.৮.২০১৮
...
*
কুমুদরঞ্জন ভট্টাচার্যর উদ্ধৃতি -                                                        পাতার উপরে . . .   
বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ্ শিলং শাখার সম্পাদক কুমুদরঞ্জন ভট্টাচার্য, ১৯৭৮ সালে সংক্ষিপ্ত বৈষ্ণব অভিধান
সম্পাদনা করে প্রকাশিত করেন। সেখানে বলরামদাসের সংক্ষিপ্ত জীবনী বা পরিচয় রয়েছে। বলরাম দাস
প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন . . .

বৈষ্ণব সাহিত্যে বলরামদাস নামে কয়েক জন পদকর্তা আছেন। ইঁহাদের মধ্যে প্রেম বিলাস-রচয়িতা বলরাম
দাসই  সর্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ। ইঁহার মূল নাম নিত্যানন্দ দাস। জন্ম শ্রীখণ্ডের বৈদ্যবংশে ১৫৩৭ খ্রীঃ অব্দে। পিতা
আত্মারাম দাস এবং মাতা সৌদামিনী। ইনি নিত্যানন্দ পত্নী জাহ্নবা মাতার মন্ত্রশিষ্য এবং পদকর্তা গোবিন্দ
দাসের ভাগিনেয়। পদাবলী সাহিত্যে চণ্ডীদাস, বিদ্যাপতি, গোবিন্দদাস ও জ্ঞানদাসের পরেই ইঁহার স্থান

*
দেবনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্ধৃতি -                                                     পাতার উপরে . . .   
১৯৭৭ সালে দেবনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সম্পাদিত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “বৈষ্ণব পদসঙ্কলন”-এ
পরিশিষ্টের “বর্ণানুক্রমিক কবিপরিচয়”-তে লিখেছেন . . .

বৈষ্ণব পদাবলী সাহিত্যে একাধিক বলরাম দাসের অস্তিত্ব বর্ত্তমান। তার মধ্যে প্রেমবিলাস কাব্য রচয়িতা
শ্রীখণ্ডবাসী নিত্যানন্দ বলরাম নামে যেমন পদ লিখেছেন তেমনি কৃষ্ণলীলামৃত কাব্য রচয়িতা দীন বলরামের
পদ আছে। কিন্তু পদাবলী খ্যাত বলরাম মুখ্যতঃ দুজন। ভাব মধ্যে একজন দোগাছিয়া গ্রামের বলরাম দাস।
ষোড়শ শতকের প্রথমার্ধে এর জন্ম। নিত্যানন্দের নিকট ইনি দীক্ষিত হন। কবি ছিলেন কৃষ্ণের বালগোপাল
মূর্তির উপাসক। বাত্সল্যের পদে তিনি শ্রেষ্ঠ। প্রধানতঃ বাংলা ভাষায় পদ রচনায় তিনি বিখ্যাত। ব্রজবুলি
পদে খ্যাতি অর্জন করেছেন একজন পরবর্তীকালের বলরাম দাস (কবিরাজ) ইনি গোবিন্দদাস কবিরাজের
ভাগিনেয় বলে প্রসিদ্ধ। মতান্তরে গোবিন্দদাসের পৌত্র ঘনশ্যামই বলরাম


দেবনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের শেষোক্ত মন্তব্যটির কোনো প্রমাণ বা পোষক-তথ্য তিনি দেন নি, যেখানে তিনি
বলেছেন যে মতান্তরে বলরাম কবিরাজই গোবিন্দদাসের পৌত্র ঘনশ্যাম। কারণ
বৈষ্ণবদাসের পদে স্পষ্ট
রয়েছে “ঐছন দুহুঁ জন” কথাটি, অর্থাৎ ওই দুই জন।

কবি-নৃপ-বংশজ                ভুবন-বিদিত যশ
.        ঘনশ্যাম বলরাম।
ঐছন দুহুঁ জন                নিরুপম গুণগণ
.        গৌর-প্রেমময় ধাম॥
---বৈষ্ণবদাস, পদকল্পতরু, প্রথম খণ্ড, প্রথম শাখা, প্রথম পল্লব, মঙ্গলাচরণ, পদসংখ্যা ১৮॥
*
নীলরতন সেনের উদ্ধৃতি -                                                              পাতার উপরে . . .   
১৯৬৭ সালে প্রকাশিত
নীলরতন সেন রচিত বৈষ্ণব পদাবলী পরিচয় গ্রন্থে তিনি বলরাম দাসের পরিচয় ও
পদাবলীর ভাষা, ছন্দ, তথ্য-বাহুল্য সহ নানা দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন।
ডঃ নীলরতন সেন, কবি
বলরামদাসের পরিচয়ের বিষয়ে ডঃ সুকুমার সেন এবং
ডঃ বিমানবিহারী মজুমদারের সঙ্গে কিছুটা সহমত
পোষণ করেন বলেও জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন . . .

বৈষ্ণব সাহিত্যে একাধিক বলরামদাসের উল্লেখ পাওয়া যায়। একজন বলরাম নিত্যানন্দ-শাখার ভক্তকবি।
তিনি চৈতন্যদেবের সমসাময়িক, নিত্যানন্দের অনুচর। কবিরাজ গোস্বামী তাঁর সম্বন্ধে লিখেছেন,

বলরামদাস হয় কৃষ্ণপ্রেমরসাস্বাদী।
নিত্যানন্দ নামে হয় অধিক উন্মাদী॥

এঁর সম্পর্কে আরও জানা যায়, নিত্যানন্দ প্রভুর অনুমতি নিয়ে নিজের আবাসে, কৃষ্ণনগরের নিকটে
দোগাছিয়া গ্রামে গোপালমূর্ত্তি প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।

[পাদটীকায় এই তথ্যের উত্স হিসেবে তিনি ব্রহ্মচারী অমরচৈতন্যের বলরামদাসের পদাবলী গ্রন্থে সুকুমার
সেনের প্রবন্ধের উল্লেখ করেছেন।]

ড. সুকুমার সেন মনে করেন, বাত্সল্যরসের বিশুদ্ধ বাংলা পদগুলি এই নিত্যানন্দের সাক্ষাৎশিষ্য  
বলরামদাসের রচনা। ড. বিমানবিহারী মজুমদারও ড. সেনের এই মত সমর্থন করেছেন।

পদকল্পতরুতে বলরাম ভণিতার বাংলা ও ব্রজবুলি উভয়রীতির ১৩৬টি পদ আছে। ড. মজুমদার মনে করেন
এরমধ্যে অন্ততঃ ৮২টি পদ গোবিন্দদাসের আদর্শে দ্বিতীয় বলরামদাস রচনা করেছেন। [পাদটীকায় লিখেছেন
যে ডঃ সুকুমার সেন এর মধ্যে ৪১টি পদ দ্বিতীয় বলরামদাসের বলে নিঃসন্দেহ হয়েছেন।] অপেক্ষাকৃত
অপ্রধান আরও কয়েকজন বলরামদাসের উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে পদাবলী রচনায় তাঁদের বিশেষ গুরুত্ব
নেই। [এখানে পাদটীকায় লিখেছেন - শ্রীহরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় ‘বৈষ্ণব পদাবলী’-তে মুখ্য একজন কবি
বলরামদাস ধরে নিয়ে তার নামে ১৭৬টি পদ সংকল করেছেন। তা ছাড়া দীন বলরাম ও নরোত্তম-ভক্ত
বলরামের নামে যথাক্রমে ছয়টি করে পদ দিয়েছেন।]

এরপর তিনি গোবিন্দদাস কবিরাজের বংশধর কবি বলরামের রচিত পদের অনেকক্ষেত্রেই গোবিন্দদাস
কবিরাজের প্রভাব এবং অনেক পদের ভণিতায় কবির চৈতন্য-রসে বঞ্চিত হবার আক্ষেপ কবির চৈতন্য
সমসাময়িক না হবার সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে লিখেছেন . . .

এই আক্ষেপ বৈষ্ণবোচিত বিনয় ভণিতা হতে পারে, অথবা কবি চৈতন্য-যুগের পরবর্তীকালে জন্ম নিয়েছেন
বলেও হতে পারে। আমাদের মনে হয়, ড. সুকুমার সেন বা ড. মজুমদার তাঁদের আলোচনায় দুই বলরামের
পদগুলি পৃথকভাবে চিহ্নিত করবার যে উপায় গ্রহণ করেছেন সেটি সম্পূর্ণ যুক্তিযুক্ত নয়। চৈতন্য-সমসাময়িক
কবির লেখা বলে সুনিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করা যায় এমন পদ বলরাম ভণিতায় পাওয়া যাচ্ছে কিনা
সমালোচকদ্বয় সে বিষয়ে কিছু বলেননি। সুতরাং অনুমান করা অসঙ্গত হবে না, প্রখ্যাত কবি বলরাম
একজনই,---এবং সম্ভবতঃ তিনি চৈতন্য-পরবর্তী কবি। তিনি গোবিন্দদাস বংশজ হতে পারেন। চৈতন্য
সমসাময়িক নিত্যানন্দ শাখার ভক্তকবি হয়ত সামান্য ২|৪টি পদ লিখে থাকবেন। নিত্যানন্দ বিষয়ক ৭টি
পদের মধ্যেও পাঁচটি পদে বলরাম মুখ্যতঃ একজনই ছিলেন ধরে নিয়ে কাব্যবিচারে অগ্রসর হওয়া যুক্তিযুক্ত
মনে করি

*
বিমানবিহারী মজুমদারের উদ্ধৃতি -                                                     পাতার উপরে . . .   
১৯৬১ সালে প্রকাশিত
বিমান বিহারী মজুমদার সম্পাদিত “ষোড়শ শতাব্দীর পদাবলী-সাহিত্য”- গ্রন্থে তিনি
সুকুমার রায়ের সঙ্গে সহমত পোষণ করেছেন। গ্রন্থের ৪৮-পৃষ্ঠায় তিনি বলরাম দাস সম্বন্ধে লিখেছেন . . .

বলরাম নামে দুইজন প্রসিদ্ধ পদকর্ত্তা আছেন। একজন ব্রাহ্মণ, শ্রীচৈতন্যের সমসাময়িক এবং নিত্যানন্দ প্রভুর
অনুচর ; অপরজন বৈদ্য, সপ্তদশ শতাব্দীতে গোবিন্দদাস কবিরাজের বংশে জন্মেছিলেন। প্রথম মহাজনের
সম্বন্ধে দেবকীনন্দন বৈষ্ণব-বন্দনায় লিখিয়াছেন---

সঙ্গীত-কারক বন্দো শ্রীবলরাম দাস।
নিত্যানন্দ চন্দ্রে যাঁর অকথ্য বিশ্বাস॥

আর দ্বিতীয় মহাজন সম্বন্ধে বৈষ্ণবদাস পদকল্পতরুতে (১৮) লিখিয়াছেন---

কবি-নৃপ-বংশজ                ভুবন-বিদিত যশ
.        ঘনশ্যাম বলরাম।
ঐছন দুহুঁ জন                নিরুপম গুণগণ
.        গৌর-প্রেমময় ধাম॥

কবি-নৃপ-বংশজ মানে গোবিন্দদাস কবি-রাজের বংশধর। ইঁহাদের মধ্যে ঘনশ্যাম হইতেছেন গোবিন্দদাসের
পৌত্র, দিব্যসিংহের পুত্র। ইঁহার গোবিন্দরতিমঞ্জরী” প্রসিদ্ধ গ্রন্থ। পদকল্পতরুর ঘনশ্যামভণিতাযুক্ত যে যে  
পদগুলি ইঁহার লেখা---ঘনশ্যাম-নামধারী নরহরি চক্রবর্ত্তীর নহে---তাহার তালিকা পাদটীকায় দিলাম

[মিলনসাগরের এই লেখাটির জন্য অপ্রাসঙ্গিক, তাই তা দেওয়া থেকে আমরা বিরত থাকলাম ]।
এই  ঘনশ্যামের রচনায় যেমন গোবিন্দদাস কবিরাজের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়, বলরাম কবিরাজের পদও
তেমনি। সুতরাং এখানে আমরা ডাঃ সুকুমার সেন মহাশয়ের সঙ্গে একমত হইয়া বলিতেছি--- “একজন ---
যিনি প্রধানতঃ বাংলায় পদ লিখেছেন এবং যিনি প্রাচীনতর ; আর একজন যিনি প্রধানতঃ ব্রজবুলিতে পদ  
লিখেছেন এবং যিনি  গোবিন্দদাসের পরবর্ত্তী। এই দুই বলরামদাসের রচনা পৃথক করে নেওয়া দুঃসাধ্য  
ব্যাপার নয়।” (ব্রহ্মচারী অমরচৈতন্য সম্পাদিত বলরাম দাসের পদাবলীর ভূমিকা, পৃঃ ১৮)। কেহ কেহ বলেন
যে প্রেমবিলাসে’র রচয়িতা বলরামদাসই পদকর্ত্তা বলরামদাস। প্রেমবিলাসের খঞ্জভাষা যাঁহার, তিনি কোন
ক্রমেই এরূপ সুন্দর পদ লিখিতে পারেন না।
রায়হাদুর খগেন্দ্রনাথ মিত্রের উদ্ধৃতি -                                                 পাতার উপরে . . .   
১৯৫৭ সালে প্রকাশিত নবদ্বীপচন্দ্র ব্রজবাসী ও
রায়হাদুর খগেন্দ্রনাথ মিত্র সম্পাদিত পদাবলী সংকলন
“পদামৃত মাধুরী ৪র্থ খণ্ডে” তিনি লিখেছেন . . .

বৈষ্ণব সাহিত্যে বহুসংখ্যক বলরাম দাসের উল্লেখ দেখা যায়। পদকর্ত্তা বলরাম দাসের পরিচয়  প্রসঙ্গে
বিভিন্ন ব্যক্তি যে সকল মন্তব্য করিয়াছেন তাহা হইতে প্রসিদ্ধ পদকর্ত্তা বলরাম দাস সম্বন্ধে কোনও নিশ্চিত  
সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় না। প্রেমবিলাস-রচয়িতা নিত্যানন্দ দাসের অন্য নাম বলরাম দাস। আবার  
কৃষ্ণনগরের অন্তর্গত দোগাছী গ্রামবাসী নিত্যানন্দ-শিষ্য বলরাম দাসের উল্লেখ “স্বরূপবর্ণন”, “ভাবামৃত মঙ্গল”  
প্রভৃতি গ্রন্থে দেখা যায়। পদকর্ত্তা বলরামদাস একজন উচ্চশ্রেণীর কবি ছিলেন। কবিত্বের বিচারে তিনি  
গোবিন্দদাস ও জ্ঞানদাসের সহিত তুলনীয়

*
*
সুকুমার সেনের উদ্ধৃতি -                                                                  পাতার উপরে . . .   
১৯৫৬ সালে প্রকাশিত, ব্রহ্মচারী অমরচৈতন্য সম্পাদিত বলরামদাসের পদাবলী সংকলনে সুকুমার সেনের
“বৈষ্ণব-পদাবলী ও বলরামদাস” প্রবন্ধে, পনর-পৃষ্ঠায়, তিনি বলরাম দাসের পরিচিতি সম্বন্ধে লিখেছেন . . .

ষোড়শ-সপ্তদশ শতাব্দীতে বাংলায় বৈষ্ণব-ইতিহাসে বলরাম ও বলরামদাস নামে একাধিক ব্যক্তির উল্লেখ
আছে। এঁদের মধ্যে সকলেই যে বিভিন্ন ব্যক্তি তা মনে হয় না, এক বা একাধিক ব্যক্তি বিভিন্ন নামে বা
নামান্তরে পরিচিত ছিলেন হয়ত। এখন দেখা যাক কতগুলি বলরাম বা বলরামদাসের ঘোঁজ আমরা পাচ্ছি
বৈষ্ণব-সাহিত্যের ইতিহাসে এবং পদাবলী-সত্ত্ববিচারে তাঁদের দাবি কতটা মেনে নেওয়া যায়।

(১) নিত্যানন্দ প্রভুর গণ, যাঁর সম্বন্ধে দেবকীনন্দনের বৈষ্ণব-বন্দনায় বলা হয়েছে,
সঙ্গীত-কারক বন্দো বলরামদাস
নিত্যানন্দচন্দ্রে যাঁর অধিক বিশ্বাস।

নিত্যানন্দ-শাখা বর্ণনা প্রসঙ্গে কৃষ্ণদাস কবিরাজ এঁর প্রসঙ্গে বলেছেন,
বলরামদাস কৃষ্ণপ্রেমরসস্বাদী
নিত্যানন্দ-নামে হয় অধিক উন্মাদী
। [ কৃষ্ণদাস কবিরাজ, চৈতন্যচরিতামৃত, আদিলীলা, ১১শ পরিচ্ছেদ ]

কাটোয়ার ও খেতরীর উত্সবে সম্মানিত অভ্যাগতদের তালিকায় যে বলরামদাসের উল্লেখ আছে তিনি এই
ব্যক্তি ব’লে ধ’রে নিতে পারি।
কথিত আছে যে ইনি নিত্যানন্দ-প্রভুর অনুমতি নিয়ে নিজের আবাস দোগাছিয়া গ্রামে (কৃষ্ণনগরের কাছে)
গোপাল-মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কেউ কেউ বলেছেন ইনি ব্রাহ্মণ ছিলেন, কারো কারো মতে ইনি ছিলেন
বৈদ্য। শেষের মতই ঠিক ব’লে মনে হয়। শ্রীশচন্দ্র মজুমদার এঁরই বংশধর ছিলেন বলে জানা যায়।
দোগাছিয়া থেকে ইনি বলরামের দুই একটি উত্কৃষ্ট বাত্সল্যরসের পদ আবিষ্কার করেছিলেন। এই পদগুলি
শ্রীশচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের সম্পাদনায় পদরত্নাবলীতে সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। গোপালমূর্তি যিনি প্রতিষ্ঠা
করেছিলেন তিনি প্রধানতঃ বাত্সল্যরসের রসিক ছিলেন একথা স্বীকার করে নিলে দোষ হয় না এবং তাতে
ক’রে এই বলরামই যে বাত্সল্যরসের পদগুলির (সবগুলির না হোক অধিকাংশের) রচয়িতা তা অনুমান
করা যায়।

দোগাছিয়ায় বলরামদাসের বংশধরেরা কেউ কেউ এখনো বাস করছেন। সেখানে এখনো অগ্রহায়ণ মাসে এঁর
তিরোভাব মহোত্সব অনুষ্ঠিত হয়।
. . . .
(২) বলরাম বসু নামে এক পুরানো পদকর্তা ছিলেন। মনে হয় এঁর চারটি পদ ভনিতা বদলে অপরের নামে চ’
লে গেছে। প্রস্তুত সংগ্রহের একটি পদে এঁর নাম পাওয়া গেছে পুরানো পুঁথিতে। সে পাঠ শুদ্ধ, পূর্ণতর এবং
অনেক ভালো। তুলনার জন্য এখানে উদ্ধৃত করি।

.        আরে মোর নিত্যানন্দ রায়
মথিয়া সকল তন্ত্র        হরিনাম মহামন্ত্র
.        করে ধরি জীবেরে বুঝায়।
*        *        *        *        *
বসু বলরামে বলে        অবতরি কলিকালে
.        জগাই মাধাই হাটে আসি
ভাণ্ড হাথে ধনঞ্জয়         ভিক্ষা মাগিয়া লয়
.        হাটে হাটে ফিরয়ে তপাসি॥

[ গ্রন্থে পদটি এ যায়গায় সম্পূর্ণ উদ্ধৃত রয়েছে। আমরা স্থানাভাবে সংক্ষিপ্ত করে দিলাম। সম্পূর্ণ পদটি
এইরূপে এবং একত্রে, প্রাপ্ত অন্যান্য সংকলনের আরও চারটি রূপে, মিলনসাগরের বলরামদাসের পাতায়
গিয়ে পড়তে,
এখানে ক্লিক করুন . . . ]

এখানে “বসু বলরামে” “দাস বলরামে”-র পরিবর্তিত পাঠ হওয়া অসম্ভব নয়, কিন্তু ভনিতায় যে-ভাবে ধনঞ্জয়-
পণ্ডিতের উল্লেখ  আছে  তাহাতে  এটি তাঁর সতীর্থ নিত্যানন্দ-শিষ্য বলরামদাসের রচনা না হওয়াই বেশি
সম্ভব। পুঁথির প্রাচীনত্বের সাক্ষ্য তো আছেই। প্রস্তুত বলরামদাস-পদাবলীর
[ব্রহ্মচারী অমরচৈতন্য সম্পাদিত]
একটি পাঠ (“অচ্যুত অগ্রজ”) অত্যন্ত ভ্রান্ত। ছাড়বাদ ও উলটপালটও আছে।

(৩) নিত্যানন্দ-পত্নী জাহ্নবাদেবীর এক শিষ্য ছিলেন বলরামদাস নামে। এঁর পিতার নাম আত্মারামদাস, নিবাস
শ্রীখণ্ড। ইনি খেতরী মহোত্সবে উপস্থিত ছিলেন। এই বলরামদাস পদকর্তা ছিলেন ব’লে মনে হয় না, কেননা
ইনি সর্বদা গুরুদত্ত নাম নিত্যানন্দদাসই ব্যবহার করেছে। এঁর রচিত প্রেমবিলাসের ভনিতায় গুরুদত্ত নামই
পাই। তবে নিত্যানন্দদাস নাম গ্রহণ করবার আগে ইনি যদি কিছু লিখে থাকেন তাতে বলরামদাস ভনিতা
থাকা সম্ভব।

(৪) এক বলরাম ছিলেন রামচন্দ্র কবিরাজের শিষ্য। নিবাস বুধরী শাখা-বর্ণন বইগুলিতে বোধকরি ইনিই
উল্লিখিত হয়েছেন বলরাম কবিরাজ ব’লে গোবিন্দদাস কবিরাজের পৌত্র ঘনশ্যাম কবিরাজের সঙ্গে।
বলরামদাস ভনিতার বিশিষ্ট ব্রজবুলি পদগুলি এই বলরামদাস কবিরাজের রচনা ব’লে মনে করি। প্রথম
বলরামদাস যে ব্রজবুলিতে পদ একেবারেই লেখন নি সে কথা বলি না, কিন্তু এ’ কথা জোর ক’রেই বলব, যে
পদগুলি উল্লেখ করলুম সেগুলির কঠিন ব্রজবুলি-বাঁধুনি গোবিন্দদাস কবিরাজের অগ্রবর্তী কোন পদকর্তার
রচনা হওয়া সম্ভব নয়। আরো একটা কথা। এই রকম একটি ব্রজবুলি পদের ভনিতায় কনকমঞ্জরী উল্লেখ
আছে,
কনক মঞ্জরি রতি-        মঞ্জরি রোয়ত
.            রোয়ব কব বলরাম॥
[“চীর নিরাখি চমকই ঘন পুলকিত” পদের শেষ পংক্তি]

কনকমঞ্জরী রামচন্দ্র কবিরাজের সিদ্ধ সখীরূপের নাম। অতএব নিঃসন্দেহ এটি রামচন্দ্র-শিষ্য বলরামদাস
কবিরাজের লেখনী-নিঃসৃত।

(৫) পঞ্চম এক বলরামদাস, যিনি নিজেকে দীন বলেছেন, কৃষ্ণলীলামৃত কাব্য লিখেছিলেন। ইনি দু’চারটি পদ
লিখে থাকবেন। কৃষ্ণলীলামৃতের ভনিতায় দীন কথাটি যদি তাত্পর্যময় হয় তবে প্রস্তুত বলরামদাস-
পদাবলীতে যে দু’একটি পদে দীন বলরামদাস পাই তা এঁর রচনা হ’তে পারে। তবে এটা নিছক অনুমানের
ব্যাপার। এই কবি সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতাব্দীর সন্ধিস্থলে জীবিত ছিলেন।

গৌরপদতরঙ্গিণীতে বলরাম ভনিতায় এমন একটি পদ সংকলিত হয়েছে যার মধ্যে জীবগোস্বামীর রচনাবলীর
নাম আছে  
[“রূপ সনাতন সঙ্গে শ্রীজীব গোসাঞী” শিরোনামের পদ ]। এ’ চতুর্থ কিংবা পঞ্চম বলরামদাসের
রচনা হওয়া সম্ভব।

বলরামদাসের নামে আরো কয়েকখানি নিবন্ধ পাওয়া গেছে,---সারাবলী, গুরুতত্ত্বসার, হরপার্বতীসংবাদ,
গুরুভক্তিকলাচন্দ্রিকা, চৈতন্যগণোদ্দেশদীপিকা, বৈষ্ণববিধান, হাটপত্তন ও পাষণ্ডদলন। এগুলি কোন
বলরামদাসের অথবা বলরামদাসদের রচনা বলা কঠিন। তবে প্রথম চারিটি বই পঞ্চম বলরামদাসের লেখা হ’
তে পারে। পঞ্চম বলরামদাসের লেখায় একটি “সহজিয়া” ছোপ আছে।

বলরামদাসের পদাবলীর বিচারে দু’জন কবিকে স্বীকার করলেই যথেষ্ট। . . .। একজন--- যিনি প্রধানতঃ
বাংলায় পদ লিখেছেন এবং যিনি প্রাচীনতর, আর একজন যিনি প্রধানতঃ ব্রজবুলিতে পদ লিখেছেন এবং
যিনি গোবিন্দদাসের পরবর্তী। এই দুই বলরামদাসের রচনা পৃথক করে নেওয়া দুঃসাধ্য নয়।

প্রথম বলরামদাস চৈতন্য-নিত্যানন্দ-লীলার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। নিত্যানন্দ-বিষয়ক কোন কোন পদে তিনি যে
কথা বলেছেন তা প্রাচীন চৈতন্য-জীবনীগুলিতে নেই এবং যাতে প্রত্যক্ষজ্ঞানের প্রতীতি আছে। দানলীলার
কতকগুলি পদও এঁর রচনা
।”
*
প্রিয়নাথ জানার উদ্ধৃতি -                                                                 পাতার উপরে . . .   
১৯৫৫ সালে প্রিয়নাথ জানা সংকলিত, সম্পাদিত “বঙ্গীয় জীবনীকোষ, প্রথম খণ্ড” প্রকাশিত হয় ভারত
সরকারের শিক্ষা বিভাগের, ডিপার্টমেন্ট অব্ কালচারের অর্থানুকুল্যে পুষ্ট কলকাতার “মাতৃভাষা পরিষদ”
থেকে, যাঁর পুর্বতন নাম ছিল “গ্রন্থবাণী পাঠচক্র”।

পাঠক আমাদের ক্ষমা করবেন, আমরা “বলরাম দাস” প্রসঙ্গের বাইরে গিয়ে এই গ্রন্থের লেখক প্রিয়নাথ জানা
সম্বন্ধে দু-এক কথা বলে নিচ্ছি। বাঙালীর মত আত্মবিস্মৃত জাতিকে এই মানুষটির পরিচয় পুনর্বার মনে
করিয়ে দেবার প্রয়োজন বোধ করছি। তিনি ছিলেন মেদিনীপুরের স্বাধীনতা সংগ্রামী। তাঁর ছাত্র জীবন
গৌরবময় কারণ তিনি মাতৃভূমির স্বাধীনতা-কল্পে ১৯৪২ সালের ঐতিহাসিক আগস্ট বিপ্লব বা ভারত-ছাড়ো
আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে দীর্ঘকাল কারাবরণ করেছিলেন। স্বাধীনতার পরে ভারত সরকার এই বীর
স্বাধীনতা সংগ্রামীকে তাম্রপত্র দিয়ে সম্মানিত করেন। ছাত্র জীবন থেকেই তাঁর সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ ছিল।
স্বাধীনতার পর ক্রমে তিনি বঙ্গীয় পশুচিকিত্সা মহাবিদ্যালয়ের গ্রন্থগারিক পদে অধিষ্ঠিত হন। তিনি
"গ্রন্থবাণী" নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন, যা ছিল মাতৃভাষা তথা ভারতীয় ভাষায় প্রকাশিত প্রথম
প্রবন্ধপঞ্জী পত্রিকা। এ ছাড়া তাঁর রচনাসম্ভারে রয়েছে “জাতীয় মন্ত্রগুরু যাঁরা”, “ছাত্রজীবন সংগঠন”,
“মনীষীদের ছাত্রজীবন”, “আমাদের বিদ্যাসাগর” প্রভৃতি গ্রন্থ।

“বঙ্গীয় জীবনীকোষ, প্রথম খণ্ড”-এ বলরাম দাস প্রসঙ্গে তিনি ৬ জন বলরাম দাসের উল্লেখ করেছেন। তাঁর
গ্রন্থে একাধিক বলরাম দাসের নামের আগে-পরে কোনো সংখ্যা না দেওয়া থাকলেও আমরা পাঠকের
সুবিধার জন্য সংখ্যা বসিয়ে দিচ্ছি। তিনি লিখেছেন . . .

বলরাম দাস (১) - চৈতন্যোত্তর যুগের বিখ্যাত পদকর্তাদের মধ্যে বলরাম দাস অন্যতম। ইনি ষোড়শ
শতাব্দীতে বর্ধমান জেলার উত্তর পূর্বাংশে দোগাছিয়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। বলরাম দাস নামে একাধিক
বৈষ্ণব কবির উল্লেখ দেখা যায়। আলোচ্য বলরাম দাস ছিলেন জাতিতে ব্রাহ্মণ এবং নিত্যানন্দ-শিষ্য।
দেবকীনন্দনের বৈষ্ণ বন্দনায় ইনি ‘সংগীত কারক’ বলরাম দাস নামে উল্লিখিত হয়েছেন। ইনি বাংলা ও
ব্রজবুলি উভয় ভাষাতেই পদ রচনা করেছেন। তার মধ্যে বাংলা পদগুলিই উত্কৃষ্টতর। পদকর্তাদের মধ্যে
বলরাম দাস উচ্চ এবং স্বতন্ত্র স্থানের অধিকারী। বাত্সল্য পসের কবি হিসেবেই বলরাম সুপরিচিত। এ
বিষয়ে ইনি রামানন্দ বসুকে অনুসরণ করেছিলেন।
বলরাম দাস (২) - একজন গ্রন্থকার। এঁর রচিত গ্রন্থ “বৈষ্ণব বিধান’।
বলরাম দাস (৩) - একজন গ্রন্থকার। এঁর রচিত গ্রন্থ “সারাবলী’।
বলরাম দাস (৪) - একজন পদকর্তা। দীন বলরাম নামেো ইনি পরিচিত ছিলেন। এঁর রচিত কয়েকটি পদ
পাওয়া যায়।
বলরাম দাস (৫) - একজন পদকর্তা। ইনি শ্রীহট্ট জেলার অধিবাসী ছিলেন। নিত্যানন্দ প্রভুর নিকট দীক্ষা
গ্রহণ করার পর ইনি পূর্ববঙ্গ পরিত্যাগ করে নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে দোগাছিয়া গ্রামে বসবাস করেন। এঁর
পিতার নাম সত্যভানু উপাধ্যায়।  ইনি অত্যন্ত সঙ্গীতপ্রবণ ছিলেন এবং দিবারাত্রি গৌরগুণগানে মত্ত  
থাকতেন। নিত্যানন্দ প্রভু এঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে স্বীয় শিরোভূষণ পুরস্কারস্বরূপ এঁকে প্রদান করেন। এঁর  
বংশধররা এখনো এই উপাধি ধারণ করেন। পূর্বলীলায় বলরাম সুমন্দিরা সখী সাজতেন।
বলরাম দাস (৬) - ‘প্রেমবিলাস-রচয়িতা’ নিত্যানন্দ দাসের পূর্বনাম ছিল বলরাম দাস। নিত্যানন্দ দাস দ্রঃ।
[ আমরা এই গ্রন্থে লিখিত নিত্যানন্দ দাসের পরিচয় ও জীবনী তুলে দিচ্ছি ] . . .
নিত্যানন্দ দাসের পূর্ব নাম ছিল বলরাম দাস। এঁর রচিত প্রেমবিলাস গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে নিত্যানন্দ-পত্নী
জাহ্নবা দেবী ছিলেন বলরামের দীক্ষাগুরু আর নিত্যানন্দ-পুত্র বীরচন্দ্র ছিলেন তাঁর শিক্ষাগুরু। বলরামের
মাতার নাম সৌদামিনী, পিতার নাম আত্মারাম দাস এবং তাঁর ‘অম্বষ্ঠ-কুলেতে জন্ম শ্রীখণ্ডেতে বাস।’ পিতা-
মাতার মৃত্যুর পর বালক বলরাম একদিন স্বপ্নদর্শন করে খড়দহে জাহ্নবাদেবীর নিকট উপস্থিত হন এবং
তাঁর নিকট মন্ত্র গ্রহণ করে ‘নিত্যানন্দ দাস’ নাম প্রাপ্ত হন। ইনি বিরভদ্রের সঙ্গে বঙ্গ-গৌড়াদি পরিভ্রমণ
করেছিলেন। ইনি খেতুরির উত্সবে উপস্থিত ছিলেন এবং জাহ্নবা দেবীর সঙ্গে বৃন্দাবন গিয়েছিলেন। ‘কৃষ্ণ-
পদামৃতসিন্ধু’তে নিত্যানন্দদাসের রচিত কয়েকটি পদ পাওয়া যায়। ‘বৈষ্ণবদিগ্দর্শনী’র মতে ইনি
‘গৌরাঙ্গাষ্টক’, ‘রসকল্পসার’, ‘কৃষ্ণলীলামৃত’ ও ‘হাটবন্দনা’ নামক গ্রন্থ কচনা করেছিলেন। এঁর জীবিতকাল
ষোড়শ শতাব্দী


উপরোক্ত বলরাম দাস (১) ও (৫) কি একই ব্যক্তি?
*
দোগাছিনিবাসী বলরামদাসের বংশধর পণ্ডিত শ্রীযুক্ত হরিদাস গোস্বামী মহাশয় “দ্বিজ বলরামদাস ঠাকুরের
জীবনী ও পদাবলী” নামক একটি গ্রন্থ প্রকাশ করিয়াছেন। উক্ত গ্রন্থ হইতে দ্বিজ বলরামদাসের
সংক্ষিপ্ত জীবনী নিম্নে লিপিবদ্ধ করিতেছি :---

দ্বিজ বলরামদাস ভরদ্বাজ গোত্রীয় পাশ্চাত্ত্য ব্রাহ্মণ। ইঁহার পিতার নাম ছিল সত্যভানু উপাধ্যায় ;
আদি নিবাস শ্রীহট্ট জেলার পঞ্চগ্রামে। শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর নিকট দীক্ষাগ্রহণ করিয়া বলরাম দোগাছিয়া গ্রামে
আসিয়া বাস করেন। তিনি বালগোপাল উপাসক ছিলেন। তিনি দোগাছিয়ায় যে শ্রীমূর্ত্তি প্রতিষ্ঠা করেন, ঐ
শ্রীবিগ্রহ ও তাঁহার মন্দির অদ্যাপিও সেখানে বর্ত্তমান। নিত্যানন্দ প্রভু একজা শিষ্যগণে পরিবেষ্টিত হইয়া
কীর্ত্তন করিতে করিতে দোগাছিয়া গ্রামে আসিয়া উপনীত হয়েন। তথায় প্রিয় শিষ্যের প্রগাঢ় ভক্তি ও
বালগোপাল সেবার সুপদ্ধতি দর্শনে অত্যন্ত প্রীত হইয়া বলরামকে স্বীয় শিরোভূষণ (পাগড়ী) প্রদান করেন। ঐ
পাগড়ী অদ্যাপিও বলরামদাস ঠাকুরের বংশধরগণ পরম যত্নে রক্ষা করিয়া আসিতেছেন। অগ্রহায়ণ মাসের
কৃষ্ণা চতুর্দশী দিবসে বলরামদাসের তীরোধান উপলক্ষে দোগাছিয়া গ্রামে এক মেলা হয়। বলরাম গুরুর
আদেশক্রমে দারপরিগ্রহ করেন। তাঁহার পাঁচ পুত্র হইয়াছিল। যথা--- (১) জ্যেষ্ট কৃষ্ণবল্লভ ; (২) তস্য পুত্র
রমাকান্ত ; (৩) তস্য পুত্র আনন্দীরাম ; (৪) তস্য পুত্র ভরতচন্দ্র ; (৫) তস্য পুত্র গৌরহরি ; (৬) তস্য পুত্র
সীতানাথ। এই সীতানাথের দুই পুত্র--- হরিদাস ও গুরুদাস। কনিষ্ঠ গুরুদা, কয়েক বত্সর পূর্ব্বে পরলোকগত
হইয়াছেন। জ্যেষ্ঠ শ্রীযুক্ত হরিদাস গোস্বামী মহাশয় সরকারী কার্য্য হইতে অবসর গ্রহণ করিয়া নবদ্বীপে
শ্রীবিষ্ণুপ্রিয়া-গৌরাঙ্গ যুগল-বিগ্রহের সেবা ও বৈষ্ণবগ্রন্থাদি প্রণয়ন দ্বারা আনন্দ উপভোগ করিতেছেন। . . .
. . . উপরে আমরা যে আলোচনা করিলাম, তাহাতে দ্বিজ বলরামদাসকে নিত্যানন্দ-শিষ্য এবং
একজন পদকর্ত্তা বলিয়া মনে হয়। তবে পদকল্পতরু ও গৌরপদতরঙ্গিণীতে বলরাম বা বলরামদাস
ভণিতাযুক্ত যে সকল পদ আছে, তাহার সবগুলি যে একজন পদকর্ত্তা-রচিত নহে, তাহা পদগুলি পাঠ করিলেই
জানা যায়। বৈষ্ণবদাস যে বলরামদাসকে কবি-নৃপ-বংশজ বলিয়াছেন, হয় ত তিনিও একজন পদকর্ত্তা ছিলেন
। তবে বলরাম কবিরাজ যে নিত্যানন্দের শিষ্য নহেন, তাহা আমরা উপরে দেখাইয়াছি

*
                  পাতার উপরে . . .   
জগদ্বন্ধু ভদ্র ও মৃণালকান্তি ঘোষের উদ্ধৃতি -                                          পাতার উপরে . . .   
গৌরপদতরঙ্গিণীর সংকলক ও সম্পাদক
জগদ্বন্ধু ভদ্র ১৯জন বলরাম দাসকে খুঁজে পেয়েছিলেন যাঁর  মধ্যে
তাঁর মতে দুজনেরই পদকর্তা হওয়ার সম্ভাবনা। প্রেমবিলাসের রচয়িতা নিত্যানন্দ দাস এবং দ্বিজ বলরাম।
এই দ্বিজ বলরামই দোগাছিয়ার বলরাম দাস। ১৯৩৪ সালে মৃণালকান্তি ঘোষ, তাঁর সম্পাদিত,
জগদ্বন্ধু ভদ্র  
সংকলিত গৌরপদতরঙ্গিণীর (১ম সংস্করণ ১৯০২) দ্বিতীয় সংস্করণের পদকর্ত্তৃগণের পরিচয়-তে দোগাছিয়ার
বলরাম দাসের বংশধর পণ্ডিত হরিদাস গোস্বামীয়ের দেওয়া দ্বিজ বলরামদাসের সংক্ষিপ্ত জীবনীও রয়েছে।
বলরামদাস নিয়ে তিনি লিখেছেন . . .

বৈষ্ণব-পদকর্ত্তাদিগের মধ্যে যাঁহারা বিশেষ খ্যাতি লাভ করিয়াছিলেন, তাঁদের মধ্যে বলরামদাস অন্যতম।
কিন্তু বলরামদাস পদকর্ত্তা যে কে, তাহা লইয়া মতভেদ আছে। জগদ্বন্ধু ভদ্র লিখিয়াছেন, “বলরামদাস লইয়া
সাহিত্য-জগতে বিষম গোল। আমরা ১১জন বলরামের সন্ধান পাইয়াছি। ইহার মধ্যে দুইজনের বিস্তারিত
জীবনী লিখিব ; কারণ, যতদূর জানা গিয়াছে, তাহাতে বোধ হয়, ইঁহারাই কবি ও পদকর্ত্তা।” এই দুইজন  
হইতেছেন (১) প্রেমবিলাস রচয়িতা ও (২) দ্বিজবলরাম দাস।
(১) প্রেমবিলাস-রচয়িতা নিত্যানন্দদাসের নামান্তর বলরাম দাস। প্রেমবিলাসে তিনি যে আত্মপরিচয়  
দিয়াছেন, তাহা এই :---
“মাতা সৌদামিনী, পিতা আত্মারাম দাস।  অম্বুষ্ঠ কুলেতে জন্ম, শ্রীখণ্ডেতে বাস॥
আমি এক পুত্র, মোরে রাখিয়ে বালক। পিতামাতা দোঁহে চলি গেলা পরলোক॥
অনাথ হইয়া আমি ভাবি অনিবার।  রাত্রিতে স্বপন এক দেখিনু চমত্কার॥
জাহ্নবা-ঈশ্বরী কহে কোন চিন্তা নাই।  খড়দহে গিয়া মন্ত্র লহ মোর ঠাঁই॥
স্বপ্ন দেখি খড়দহে কৈলা আগমন।  ঈশ্বরী করিলা মোরে কৃপার ভাজন॥
বলরাম দাস নাম পূর্ব্বে মোর ছিলা।  এবে নিত্যানন্দ দাস শ্রীমুখে রাখিলা॥”

ইঁহার দীক্ষাগুরু জাহ্নবা ঠাকুরাণী ও শিক্ষাগুরু বীরচন্দ্রপ্রভু। যথা প্রেমবিলাসে-“বীরচন্দ্র মোর শিক্ষাগুরু হন।”
প্রেমবিলাসের প্রত্যেক বিলাসের শেষে এইরূপ আছে, “শ্রীজাহ্নবা-বীরচন্দ্র-পদে যার আশ। প্রেমবিলাস কহে
নিত্যানন্দ দাস॥” জগদ্বন্ধু ভদ্র লিখিয়াছেন, “প্রেমবিলাস-রচয়িতা নিত্যানন্দ দাসের পূর্ব্বাশ্রমের নাম ‘বলরাম
দাস’। ইঁহার বিষয় বৈষ্ণব গ্রন্থাদিতে লিপিবদ্ধ আছে। যথা---
“প্রেম-রসে মহামত্ত বলরাম দাস। যাঁহার বাতাসে সব পাপ যেয় নাশ॥” (চৈঃ ভাঃ)
“বলরাম দাস কৃষ্ণ-প্রেমরসাস্বাদী। নিত্যানন্দ-নামে হয় পরম-উন্মাদী॥” (চৈঃ চঃ)
“সঙ্গীত-কারক বন্দো বলরাম দাস। নিত্যানন্দচন্দ্রে যাঁর অধিক বিশ্বাস॥” (বৈঃ বঃ)

[ চৈঃ ভাঃ - বৃন্দাবনদাস রচিত চৈতন্য ভাগবত, চৈঃ চঃ - কৃষ্ণদাস কবিরাজ রচিত চৈতন্য চরিতামৃত,
বৈঃ বঃ - দৈবকীনন্দন রচিত বৈষ্ণব বন্দনা ]

উল্লিখিত চরণগুলি প্রেমবিলাস-রচয়িতা নিত্যানন্দ দাসের নামান্তর বলরাম দাস-সম্বন্ধে প্রযোজ্য হইতে পারে
না ; কারণ, চরণগুলি যখন লিখিত হয়, তখন এই বলরাম দাসের জন্মই হয় নাই। ইহার আরও কারণ আছে
। নিত্যানন্দ দাস প্রেমবিলাসে নিজের যে পরিচয় দিয়াছেন, তাহাতে জানা যাইতেছে যে, শৈশবাবস্থায় তিনি  
পিতৃমাতৃহীন হন এবং সেই অনাথ অবস্থায় স্বপ্নে জাহ্নবা দেবীর কৃপা লাভ করিয়া, তাঁহার নিকট গমন  
করেন। তিনি তত্ক্ষণাৎ বালককে দীক্ষা দিয়া নিজের কাছে রাখেন। নিত্যানন্দদাস দীক্ষাগ্রহণের পর
গ্রন্থ রচনা করেন। তত্পূর্ব্বে তাঁহার কোনো গ্রন্থ বা পদ রচনা করা সমাভবপর নহে ; কারণ, তখন তিনি
অত্যন্ত শিশু ও বিদ্যাশিক্ষাবিহীন। তিনি আত্মপরিচয় দিবার সময় ভিন্ন, তাঁহার পূর্ব্বাশ্রেমের ‘বলরাম দাস’
নাম অপর কোন স্থানে উল্লেখ করেন নাই। কোন বৈষ্ণব-পদকর্ত্তা, দীক্ষাগ্রহণের পর, স্বরচিত কোন পদে বা
গ্রন্থে, গুরুদত্ত নাম ভিন্ন, পূর্বাবশ্রমের নাম ব্যবহার করিয়াছেন, এরূপ জানা যায় না। অপর ‘নিত্যানন্দ নামে
পরম উন্মাদী’ এবং ‘নিত্যানন্দচন্দ্রে যাঁর অধিক বিশ্বাস,’ এই চরণদ্বয়ের পোষকতায় নিত্যানন্দ সম্বন্ধে কোন
কথা তাঁহার প্রেমবিলাস প্রভৃতি কোন গ্রন্থে নাই। আরও একটি কথা। প্রেমবিলাস-রচয়িতা নিত্যানন্দ দাস
যদি বিখ্যাত পদকর্ত্তা বলরাম দাস হইতেন, তাহা হইলে তাঁহার গ্রন্থাদির মধ্যে তাঁহার স্ব-রচিত পদ দুই
একটিও অন্তত থাকিত। এই সকল কারণে আমাদের মনে হয়, ‘বলরাম দাস’ নামক যে পদকর্ত্তা বৈষ্ণব-
জগতে খ্যাতি লাভ করেন, তিনি প্রেমবিলাস-রচয়িতা নিত্যানন্দ দাসের নামান্তর বলরাম দাস নহেন।

পদকল্পতরুর মঙ্গলাচরণে বৈষ্ণবদাস-ভণিতাযুক্ত একটী পদে নিম্নলিখিত চরণদ্বয় আছে। যথা---“কবি-নৃপ-
বংশজ, ভুবন-বিদিত-যশ, জয় ঘনশ্যাম বলরাম। ঐছন দুহুঁ জন, নিরুপম গুণগণ, গৌর-প্রেমময়-ধাম॥” এই
বলরাম কে
?  

এর পর মৃণালকান্তি ঘোষ দীনেশচন্দ্র সেনের তাঁর “বঙ্গভাষা ও সাহিত্য” গ্রন্থে প্রকাশিত, এই বলরাম,
গোবিন্দদাসের ভাগিনেয় ছিলেন বলে উক্তির
সতীশচন্দ্র রায় দ্বারা খণ্ডনের বিষয়ে তাঁর মতামত প্রকাশ
করেছেন। তাঁর এই উদ্ধৃতি দীনেশচন্দ্র সেনের উদ্ধৃতিতে সতীশচন্দ্রের উদ্ধৃতির পরে দেওয়া হয়েছে। তার
পরেই তিনি তথ্যসমৃদ্ধ লেখায় লিখেছেন . . .

ঘনশ্যাম ও বলরামকে ‘কবি-নৃপ-বংশজ’ বলা হইয়াছে। এখানে ‘কবি-নৃপ-বংশজ’ অর্থ কবিরাজ বংশ হইলে
এ সম্বন্ধে কাহারও আপত্তি হইতে পারে না। ঘনশ্যাম যে গোবিন্দ কবিরাজের পৌত্র, তাহা সর্ব্ববাদিসম্মত।
আর বৈষ্ণবদাসের উল্লিখিত চরণদ্বয় পাঠ করিলে মনে হয়, ঘনশ্যাম ও বলরাম সমসাময়িক। এই বলরামের
বিশেষ কোন পরিচয় কেহ দিতে পারেন নাই। তবে প্রেমবিলাসে রামচন্দ্র কবিরাজের শাখা-বর্ণনায় আমরা
পাইতেছি, ‘আর শাখা বলরাম কবিপতি হয়। পরম পণ্ডিত তিঁহো বুধরী আলয়॥’ ইহাতে জানা
জাইতেছে যে, রামচন্দ্র কবিরাজের শাখা-বর্ণনায় এক বলরামের নাম আছে ; তাঁহার উপাধি কবিপতি ছিল ;
তিনি পরম পণ্ডিত ছিলেন ; এবং বুধরীতে তাঁহার বাড়ী ছিল। রামচন্দ্র কবিরাজ ও তাঁহার ভ্রাতা গোবিন্দ
কবিরাজও বুধরীতে বাস করিতেন”। এই বলরাম যখন রামচন্দ্রের শিষ্য, তখন তিনি ও ঘনশ্যাম সমসাময়িক
হইতে পারেন ; এবং তিনি যখন কবিপতি উপাধিধারী ও পরম পণ্ডিত, তখন তিনিও যে পদকর্ত্তা ছিলেন,
তাহা ধরিয়া লওয়া যাইতে পারে। আবার বৈষ্ণবদাস যখন বলিতেছেন, কবি নৃপ বংশজ, ভূবন-বিদিত-যশ,
জয় ঘনশ্যাম বলরাম”, তখন এই বলরাম কবিরাজ যে রামচন্দ্র কবিরাজের শাখা তাহাতে আর সন্দেহ
থাকিতে পারে না। বিশেষতঃ এই বলরাম কবিরাজের নাম নরোত্তম-বিলাসের কয়েক স্থানে পাওয়া যাইতেছে
।  বলরাম কবিরাজের বাড়ী যে খেতরীর সন্নিকট পদ্মার এপর পারে ছিল, এ কথাও নরোত্তম-বিলাসে আছে।
আর বুধরী যে খেতরীর সন্নিকট পদ্মার অপর পারে, ইহাও ঠিক। আবার, কর্ণানন্দ গ্রন্থে শ্রীনিবাসাচার্য্যের
শাখাবর্ণনায় লেখা আছে, “শ্রীবলরাম কবিরাজাদি উপশাখাগণ।” ইহাও সত্য ; কারণ বলরাম কবিরাজ
হইতেছেন রামচন্দ্রে শিষ্য, এবং রামচন্দ্র শ্রীনিবাসের শিষ্য। সুতরাং বৈষ্ণবদাস যে বলরামকে কবি-নৃপ-
বংশজ, ভূবন-বিদিত-যশ বলিয়াছেন, তিনি রামচন্দ্র কবিরাজের শিষ্য ভিন্ন অপর কেহ নহেন।

(২) যে দুই জন বলরাম দাসকে জগদ্বন্ধুবাবু পদকর্ত্তা বলিয়া নির্দ্দেশ করিয়াছেন, তাঁহাদের মধ্যে
একজন সম্বন্ধে উপরে আলোচনা করা হইল। অপর জনের কথা নিম্নে বলিতেছি। ইনি হইতেছেন নদীয়া
জেলার অন্তর্গত দোগাছিয়া গ্রামবাসী ; নাম দ্বিজ বলরামদাস। ইনি নিত্যানন্দ প্রভুর শিষ্য ; পূর্ব্বলীলায় ছিলেন
সুমন্দিরা সখী। কবিরাজ গোস্বামীকৃত স্বরূপবর্ণন গ্রন্থে আছে---

“মন্দির মার্জ্জন করেন সুমন্দিরা সখী। এবে তাঁর বলরাম খ্যাতি লিখি॥”
ভাবামৃতমঙ্গল গ্রন্থেও ইঁহার উল্লেখ আছে, যথা---
জয় প্রভু-প্রিয় শ্রীবলরামদাস। সঙ্গীত-প্রবীণ, দোগাছিয়া যাঁর বাস॥
পুনশ্চ--- “জয় দ্বিজ বলরাম দোগাছিয়া-বাসী। গৌর-গুণগানে যেহ মত্ত দিবানিশি॥”

ভাবামৃতমঙ্গল হইতে উদ্ধৃত উপরের চারি চরণের সহিত চৈতন্যচরিচামৃত, বৈষ্ণব-বন্দন ও চৈতন্যভাগবতের
চরণগুলি মিলাইয়া পাঠ করিলেই মনে হয়, দ্বিজ বলরামদাস সম্বন্ধেই এইগুলি লিখিত হইয়াছে

*
সতীশচন্দ্র রায়ের উদ্ধৃতি -                                                               পাতার উপরে . . .   
১৭৫০সাল নাগাদ
বৈষ্ণদাস সংকলিত সর্ববৃহৎ পদাবলী সংকলন শ্রীশ্রীপদকল্পতরুর, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ
মন্দির থেকে ১৯৩১সালে প্রকাশিত সংকলনের ৫ম খণ্ডের ভূমিকায় সম্পাদক
সতীশচন্দ্র রায় বলরামদাসের
উপরে লিখতে গিয়ে দীনেশচন্দ্র সেনের, তাঁর “বঙ্গভাষা ও সাহিত্য” গ্রন্থে প্রকাশিত, বলরাম কবিরাজ,
গোবিন্দদাসের ভাগিনেয় ছিলেন বলে উক্তির খণ্ডন করেছেন যা আমরা দীনেশচন্দ্র সেনের উদ্ধৃতির অন্তর্গত
তুলে দিয়েছি। বলরামদাসের পরিচয়ের পরিশিষ্টে সতীশচন্দ্রই সম্পাদিত ১৯২৬সালে প্রকাশিত “অপ্রকাশিত
পদ-রত্নাবলী”-তে বলরামদাসের পরিচয়ের অংশটি হুবহু তুলে দিয়েছেন। আমরা সেইটুকু এখানে তুলে
দিচ্ছি . . .

. . . বলরাম দাসের বহুসংখ্যক পদাবলী হইতে আমরা পদ বা পদাংশ উদ্ধৃত করিয়া, তাঁহার রচনা ও
কবিত্বের উদাহরণ দেখাইব, এরূপ স্থান নাই। সুতরাং “অপ্রকাশিত পদ-রত্নাবলী” গ্রন্থের ভূমিকায় আমরা
তাঁহার সম্বন্ধে যে সংক্ষিপ্ত মন্তব্য লিখিয়াছি, উহা নিম্নে উদ্ধৃত করিয়াই এই প্রসঙ্গের উপসংহার করিব।

“বলরাম দাস অন্যতম শ্রেষ্ঠ পদকর্ত্তা ; কিন্তু বৈষ্ণব-সাহিত্যে এতগুলি বলরামের উল্লেখ দেখা যায় যে
উহাদিগের মধ্যে প্রসিদ্ধ পদ-কর্ত্তা বলরাম কোন্ ব্যক্তি, নির্ণয় করা সুঃসাধ্য। জগদ্বন্ধু বাবু গৌরপদ-তরঙ্গিণীর
উপক্রমণিকায় বহুসংখ্যক বলরামের উল্লেখ করিয়া, তন্মধ্যে প্রেমবিলাস গ্রন্থের রচয়িতা বলরাম ও
কৃষ্ণনগরে অন্তর্গত দোগাছী গ্রাম-বাসী বলরামই পদকর্ত্তা ছিলেন, মত প্রকাশ করিয়াছেন। বৈষ্ণবদাস কিন্তু
পদকল্পতরুর মঙ্গলাচরণে কবি-নৃপ-বংশজ, ভূবন-বিদিত-যশ, জয় ঘনশ্যাম বলরাম---বাক্যে কবিরাজ বংশজ
বলরামেরই মহিমা কীর্ত্তন করিয়াছেন। প্রসিদ্ধ পদকর্ত্তা না হইলে, বৈষ্ণবদাস যে কি জন্য এ ভাবে বলরামের
উল্লেখ করিবেন, তাহা বুঝা যায় না। বলরাম দাসের বহু পদই পদকল্পতরু গ্রন্থে উদ্ধৃত হইয়াছে। রমণীমোহন
মল্লিক মহাশয় নানা প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত পুস্তক হইতে পদ সংগ্রহপূর্ব্বক চণ্ডীদাস ও জ্ঞানদাসের
পদাবলীর ন্যায় বলরাম দাসের পদাবলীরও একটি সটীক সংস্করণ প্রকাশিত করিয়া আমাদিগের
কৃতজ্ঞতাভাজন হইয়াছেন ; কিন্তু চণ্ডীদাস ও জ্ঞানদাসের সংস্করণের ন্যায় তাঁহার বলরাম দাসের সংস্করণেও
পাঠ ও অর্থের অনেক অসঙ্গতি রহিয়া গিয়াছে। সে জন্যই আমরা পদ-রত্নাবলীতে তাঁহার প্রকাশিত দুই
চারিটি বলরামের পদও সংশোধন করিয়া সন্নিবেশিত করিয়াছি। কৌতূহলী পাঠক পদ-রত্নাবলীর শশীমুখী
হেরলুঁ অপরূপ মেহ, পহিলহি মোহে নিরখি লহু হাস, কতহুঁ বেরি বেরি ইত্যাদি পদগুলি রমণীবাবুর
সংসেকরণের পদগুলির সহিত তুলনা করিয়া দেখিলেই বৈষম্য বুঝিতে পারিবেন।

বলরাম দাস ব্রজবুলি ও বাংলা---উভয়বিধ পদ-রচনায় নৈপুণ্য প্রদর্শন করিয়াছেন। তাঁহার উল্লিখিত ব্রজবুলি
গোবিন্দদাস ও জ্ঞানদাসের উত্কৃষ্ট ব্রজবুলি পদের সহিত তুলনার অযোগ্য নহে ; তথাপি বলরাম তাঁহার
সরল ও মর্ম্ম-স্পর্শী বাংলা পদগুলির জন্যই অধিক বিখ্যাত। বলরামের রসোদ্গারের বাংলা পদগুলি
একরকম অতুলনীয় বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। বাঙ্গালী পদ-কর্ত্তাদিগের মধ্যে চণ্ডীদাস, গোবিন্দদাস ও
জ্ঞানদাসের পরেই যে, বলরাম দাসের স্থান-এ সম্বন্ধে সমালোচকদিগের মধ্যে বিশেষ মত-ভেদ দেখা যায় না।
দুঃখের বিষয়, এরূপ একজন বিখ্যাত পদ-কর্ত্তার নিশ্চিত জীবন-বৃত্তান্ত আজ পর্যন্তও সংগৃহীত হয় নাই
।”
*
কালীমোহন বিদ্যারত্নের উদ্ধৃতি -                                                     পাতার উপরে . . .   
১৯২২ সালে প্রকাশিত কালীমোহন বিদ্যারত্ন সম্পাদিত পদাবলী সংকলন,“কীর্ত্তন-পদাবলী”-তে তিনি
বলরামদাসের পরিচয়ে লিখেছেন . . .

বলরামদাসের পিতার নাম সত্যভানু উপাধ্যায় - বৈদিক শ্রেণীর ব্রাহ্মণ। পূর্ব্বে ইহাঁদের বাসস্থান পূর্ব্ববঙ্গে
ছিল। নিত্যানন্দ প্রভুর নিকট মন্ত্র গ্রহণ করিয়া বলরামদাস নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরের নিকটবর্ত্তী দোগাছী
নামক গ্রামে বাস করিতে থাকেন। বলরামদাসের ভজনে সন্তুষ্ট হইয়া নিত্যানন্দ প্রভু ইহাকে নিজমস্কের
শিরোভূষণ “পাগড়ী” প্রদান করেন। বলরামদাসের বংশধরগণের নিকট এখনও সেই পবিত্র
“নিত্যানন্দ পাগড়ী” আছে। অগ্রহায়ণ মাসের কৃষ্ণা চতুর্দ্দশী তিথিতে বলরাম দসের তিরোভাব উপলক্ষে
প্রতিবছর মেলা হইয়া থাকে। বলরামদাস-বিরচিত প্রেমবিলাসগ্রন্থে ইহাঁর অন্য পরিচয় পাওয়া যায়। উক্ত
গ্রন্থানুসারে ইনি বৈদ্যবংশে জন্মগ্রহণ করেন। ইহাঁর পিতার নাম আত্মরাম দাস এবং মাতার নাম সৌদামিনী,
ইনি জাহ্নবী গোস্বামিনীর মন্ত্রশিষ্য

*
দুর্গাদাস লাহিড়ীর উদ্ধৃতি -                                                              পাতার উপরে . . .   
দুর্গাদাস লাহিড়ী তাঁর সম্পাদিত, ১৯০৫ সালে প্রকাশিত, বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “বৈষ্ণব-পদলহরী” তে
বলরামদাস সম্বন্ধে লিখেছেন . . .

বলরাম দাস নামে এ পর্যন্ত ১৯জন পদকর্ত্তার পরিচয় পাওয়া গিয়াছে ; এবং পদাবলীর মধ্যেও ভিন্ন ভিন্ন
পদকর্ত্তার পদ যে মিলাইয়া গিয়াছে, তাহা বলাই বাহুল্য। তবে বর্দ্ধমান জেলার শ্রীখণ্ড গ্রামে ৯৪৪  সালে  
(১৪৫৯ শকে) [১৫৩৭খৃষ্টাব্দ] যে বলরাম দাস জন্মগ্রহণ করেন, তিনিই সর্ব্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ। তাঁহার পিতার নাম
আত্মারাম দাস, মাতার নাম সৌদামিনী। তিনি শ্রীনিত্যানন্দ-পত্নী জাহ্নবী দেবীর নিকট মন্ত্র গ্রহণ করেন।  
কাহারও কাহারও মতে মন্ত্রগ্রহণের পর, বলরাম দাস নদীয়া কৃষ্ণনগরের দোগাছিয়া পল্লীতে আসিয়া বাস
করিয়াছিলেন। তাঁহার প্রতিষ্ঠিত শ্রীগোপাল মূর্ত্তি এখনও ঐ স্থানে বিদ্যমান আছে, এবং ঐ বিগ্রহের পূজা  
উত্সবে এখনও ধূমধাম হইয়া থাকে
।”
*
আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদের উদ্ধৃতি -                                       পাতার উপরে . . .   
১৯০৫ সালে (১৩১১বঙ্গাব্দ) প্রকাশিত পূর্ণিমা পত্রিকায়,
আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদের “প্রাচীন সাহিত্য-
কীর্ত্তি” প্রবন্ধে এই বারমাস্যার পদটি তিনি সম্পূর্ণ উদ্ধৃত করেন। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, প্রাচীন-পুথি
বিশারদ হিসেবে বিখ্যাত ছিলেন। বৈষ্ণব সাহিত্যে বিশেষ করে চট্টগ্রামে রচিত বা প্রাপ্ত,  হিন্দু-মুসলমান
উভয় সম্প্রদায়েরই বৈষ্ণব-পদাবলীর সংগ্রাহক হিসেবে তিনি অদ্বিতীয়। “মাগে মুগধমতি আসিল অক্রুর”
শিরোনামের এই পদটি বলরামদাসের, নীচের, পদাবলীর পৃষ্ঠায় প্রকাশ করলাম। পাঠক তা দেখে নিতে
পারেন। এ বিষয়ে আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদের উদ্ধৃতি আমরা এখানে তুলে দিয়েছি। ওই প্রবন্ধে তিনি
লিখেছেন . . .

“. . .
বোধ হয় অনেরেই জানেন যে, বঙ্গীয় সাহিত্য-পরিষৎ প্রাচীন সাহিত্যের উদ্ধারে ব্রতী হইয়া প্রাচীন
বাঙ্গালা বাব্যগুলির মুদ্রণ ও প্রকাশে হস্ত প্রসারণ করিয়াছেন। ‘সাহিত্য-সভার’ও এ বিষয়ে লক্ষ্য আছে বটে,
কিন্তু উহার কার্য্য অদ্যাপি তেমন কিছুই হয় নাই। উক্ত সমিতিদ্বয় ভিন্ন ব্যক্তিগত চেষ্টাতেও অধুনা কোথাও
বা ২|১ খানা প্রাচীন গ্রন্থ মুদ্রিত ও প্রচারিত হইতে দেখা যাইতেছে। এ সমস্তই দেখিতে ও শুনিতে
আনন্দজনক, সন্দেহ নাই ; কিন্তু প্রাচীন-সাহিত্যের বিপুলত্বের সহিত উক্ত কার্য্যাবলীর তুলনা
করিলে আমাদের এই সকল চেষ্টা কিছুই নহে বলিলেই চলে! বর্ত্তমানে যে ভাবে ও যে পরিমাণে কার্য্য
চলিতেছে, তাহাতে এই নিত্য-বর্দ্ধমান-কলেবর প্রাচীন সাহিত্যের উদ্ধার হইতে বহু --- বহুকালের প্রয়োজন
হইবে। তবে সেই অনাগত ‘বহু’ কালের সংঘাত ইতিমধ্যেই জর্জ্জরিত-দেহ সাহিত্যের গায়ে সহ্য হইবে কি
না, আগে আমাদের তাহাই বিবেচ্য বটে! বিশেষতঃ ‘সাহিত্য-পরিষৎ’ প্রভৃতির লক্ষ্য বড় বড় কাব্যাদির
প্রকাশের দিকেই বেশী দেখা যাইতেছে। কিন্তু প্রাচীন সাহিত্যের বিপুলার মধ্যে এমন অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাব্য
বা সন্দর্ভ-মালা বর্ত্তমান আছে, যাহাদের স্বতন্ত্র প্রকাশ অসম্ভব না হইলেও কোন ক্রমেই সুবিধাজনক নহে।
ইতিহাসের খাতিরে প্রাচীন সাহিত্যের সর্ব্বাংশ অবিকৃত রাখা দরকার ; সুতরাং ঐ গুলি আকারে বা গুণে
ক্ষুদ্র ও নগণ্য বলিয়া কিছুতেই উপেক্ষণীয় নহে। . . . প্রাচীন কীর্ত্তি, যেরূপই হউক, কোনরূপে সুরক্ষিত
হইলেই সমস্ত শ্রম সফল হইল, বোধ করিয়া থাকি। তবে এখন আমাদের বক্ষ্যমাণ সন্দর্ভের কথাই বলি।

রাধিকার বারমাস।
এই সুন্দর সন্দর্ভটি বলরাম দাস নামক কবির রচিত। বৈষ্ণব-সাহিত্যে উক্ত নামধেয় কবি একাধিক আছেন।
তাঁহাদিগের হইতে এই কবি অভিন্ন কি ভিন্ন ব্যক্তি, তাহা নির্ণয় করা সুকঠিন। তবে তিনি যিনিই হউন না
কেন, তিনি যে সুকবি ছিলেন, এই ক্ষুদ্র সন্দর্ভেই তাহার বেশ পরিচয় পাোয়া যায়। ইহা পাঠে সকলেই মুগ্ধ
হইবেন, এরূপ আশা আমাদের আছে।

ইহার যে দুইখানি প্রতিলিপি পাওয়া গিয়াছে, তন্মধ্যে বিস্তর পাঠ-পার্থক্য বিদ্যমান আছে। বাঙ্গালা
পুঁথিগুলির এ রহস্য বড়ই বিচিত্র। কিরুপে যে এমন হইল, বুঝা দুষ্কর। পাদ-টীকায় পাঠান্তর সন্নিবিষ্ট করিয়া
দিয়া আমরা উভয় হস্তলিপির পাঠ-পার্থক্য নির্দ্দেশ করিয়া দিলাম। তাহা হইতে পাঠকগণ সেকালের
নকলনবিশগণের অসর্তকতার এবং আসল-খাস্ত-করণ পটুতার প্রকৃষ্ট প্রমাণ পাইবেন।

প্রাচীন সাহিত্যের অনুসৃত নানা ছন্দের মধ্যে এই বারমাস্যার ছন্দটি সম্পূর্ণ নূতন ধরণের বটে। এই ছন্দে
নরোত্তম ঠাকুরের কাধিকার মানভঙ্গ, বাসুদেব ঘোষের গৌরাঙ্গ চরিত এবং একজন অজ্ঞাতনামা কবির
নিমাইর সন্ন্যাস-পটিও লিখিত হইয়াছে। বাস্তবিক ছন্দটি অতীব মনোরম। এমন সুন্দর ছন্দের অনুসরণ
অধুনা করা হয় না কেন?

রচনার সৌন্দর্য্য বুঝাইবার জিনিষ নহে,---অনুভবেরই জিনিষ বটে। নিম্নে আমরা বারমাস্যাটি প্রকাশিত
করিলাম। পাঠকগণ আপনারাই তাহার রসাস্বাদন করুন।---

মাগে মুগধমতি আসিল অক্রুর।
কৃষ্ণ হেন প্রাণনাথ নিল মধুপুর॥ ১॥
হিম হিম বায়ু করে সহন না যাএ।
দারুণ মদন বাণে প্রাণি দহি জাএ॥ ধুআ

[ সম্পূর্ণ বারমাস্যা পদটি নীচের পদাবলীর পাতায় দেখুন ] . . .”
*
হরিমোহন মুখোপাধ্যায়ের উদ্ধৃতি -                                                   পাতার উপরে . . .   
১৯০০ সালে প্রকাশিত, হরিমোহন মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ১৯৩৮টি পদ বিশিষ্ট, পদাবলী সংকলন “সঙ্গীত-সার-
গ্রন্থ”-এ তিনি লিখেছেন . . . "
ইনি নরোত্তমদাসের সম সাময়িক কবি"।
*
রমণীমোহন মল্লিকের উদ্ধৃতি -                                                         পাতার উপরে . . .   
১৮৯৯ সালে প্রকাশিত তাঁর “বলরামদাস” গ্রন্থে রমণীমোহন মল্লিক বলরাম দাসের জীবনীতে, শ্রী অচ্যুতচরণ
চৌধুরী তত্ত্বনিধির প্রথমদিকের মত কে অনুসরণ করে, [ এই নিয়ে দীনেশচন্দ্র সেনের উদ্ধৃতির  পাদটীকা
দেখুন ] বলরাম দাস নামের কেবল একজন কবি ছিলেন বলে ধরেছেন। এই বলরামদাস ছিলেন উপরোক্ত ২য়
বলরাম দাস অর্থাৎ “প্রেমবিলাস”-এর রচয়িতা, প্রভু নিত্যানন্দের প্রথমা পত্নী জাহ্নবা (জাহ্নবী) দেবীর শিষ্য
নিত্যানন্দ দাস, যাঁর পিতৃদত্ত নাম ছিল বলরাম দাস।

কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্যচরিতামৃত, দেবকীনন্দনের বৈষ্ণব-বন্দনা, নরহরি চক্রবর্তীর ভক্তিরত্নাকরে যত
বলরামদাসের উল্লেখ ও বর্ণনা রয়েছে, সে সকলই রমণীমোহন এই বলরাম দাসের মহিমা-বর্ণনা হিসেবে
ধরেছেন যা পরবর্তী বিশেষজ্ঞগণের মতের সঙ্গে মেলে না। তাঁদের মতে বলরাম দাস নামে একাধিক কবি
ছিলেন। রমণীমোহন তাঁর গ্রন্থে কবির “জীবনী”-তে প্রেমবিলাসে দেওয়া নিত্যানন্দের আত্মপরিচয় সহ
লিখেছেন . . .

অন্যান্য কবিদিগের জীবনী কষ্টে সংগ্রহ করিতে হয় কিন্তু বলরাম দাস সৌভাগ্যক্রমে সে কষ্ট দেন নাই। তিনি
বরং আরো বহুতর পদকর্ত্তার জীবনী তাঁহার রচিত প্রেমবিলাস গ্রন্থে লিখিয়াছেন। উক্ত গ্রন্থে তিনি আত্ম-
পরিচয় দিতেও বিম্মৃত হয়েন নাই। এই পাঠ করিয়া আকাঙ্ক্ষা মিটে না সত্য কিন্তু যাহা জানিতে পারা যায়
তাহাতে মনকে কথঞ্চিৎ প্রবোধ দেওয়া যাইতে পারে। আত্ম-পরিচয় এই---

মাতা সৌদামিনী, পিতা আত্মারাম দাস।
অম্বষ্ঠ কুলেতে জন্ম শ্রীখণ্ডেতে বাস॥
আমি এক পুত্র মোরে রাখিয়া বালক।
মাতা পিতা দুঁহে চলি গেলা পরলোক॥
অনাথথ হইয়া আমি ভাবি অনিবার।
রাত্রিতে স্বপন এক দেখিনু চমত্কার॥
জাহ্নবা ঈশ্বরী কহে কোন চিন্তা নাই।
খড়দহে গিয়া মন্ত্র লহ মোর ঠাঁই॥
স্বপ্ন দেখি খড়দহে কৈনু আগমন।
ঈশ্বরী করিলা মোরে কৃপার ভাজন॥
বলরাম দাস নাম পূর্ব্বে মোর ছিলা।
এবে নিত্যানন্দ দাস শ্রীমুখে রাখিলা॥
নিজ পরিচয় আমি করিনু প্রচার।
গুরু কৃষ্ণ বৈষ্ণব পদে কোটী নমস্কার

[ “শ্রীপ্রেমবিলাস”, বিংশ বিলাস, নিত্যানন্দ দাসের আত্ম-পরিচয়, ২১২-পৃষ্ঠা।]

ইহাতে জানা যাইতেছে যে বলরাম দাস বৈদ্য ছিলেন এবং ইঁহার পিতার নাম আত্মারাম এবং মাতার নাম
সৌদামিনী ছিল। ইঁহার নিবাস শ্রীখণ্ডে। শ্রীখণ্ড বর্দ্ধমান জেলার অধীন কাটোয়া মহকুমার অন্তর্গত এবং
কাটোয়া হইতে শ্রীখণ্ড দুই ক্রোশ ব্যবধান। শ্রীখণ্ডে অদ্যাপি এনেক বৈদ্যের বাস আছে এবং সকলেই পরম
বৈষ্ণব। ঠাকুর নরহরির পাঠ (পাট হবে) এই শ্রীখণ্ডে।
. . . বলরামদাস শ্রীশ্রীনিত্যানন্দ মহাপ্রভুর পত্নী শ্রীমতী জাহ্নবী দেবীর নিকট মন্ত্র গ্রহণ করিয়াছিলেন সুতরাং
এই মাত্র বুঝিতে পারা যায় যে তিনি শ্রীমন্ মহাপ্রভুর সমসাময়িক ছিলেন।

. . . প্রেম বিলাসে সকল মহাজনেরই জীবন চরিত লিখিত হইয়াছে। সমুদায় মহাজনের জীবন চরিত অবগত
হইয়া লিপিবদ্ধ করা তাঁহার কম পাণ্ডিত্যের পরিচায়ক নহে। উক্ত গ্রন্থ ব্যতীত বীরচন্দ্র চরিত নামক আর
এক খানি গ্রন্থ বলরাম দাসের রচিত ইহা প্রেম বিলাসে লিখিত আছে কিন্তু ঐ গ্রন্থ কোথাও আছে কি না জানা
যায় না।

. . . বলরাম কম বেশী ২৫০পদ রচনা করিয়া গিয়াছেন ইহা অনুমান করা যায়। পদগুলি পাণ্ডিত্যে ও
মধুরতায় পরিপূর্ণ। . . . বলরাম দাস শুদ্ধ যে ভক্ত, গ্রন্থ কর্ত্তা ও কবি ছিলেন তাহা নহে তাঁহার সঙ্গীত বিষয়ে
বিশেষ অনুরাগ ছিল
।”
*
দীনেশচন্দ্র সেনের উদ্ধৃতি -                                                             পাতার উপরে . . .   
“বঙ্গভাষা ও সাহিত্য” গ্রন্থটি দীনেশচন্দ্র সেন প্রথম প্রকাশ করেন ১৯৮৬ সালে। ১৯৪৬ সালে, তাঁর জীবিত
অবস্থায় ষষ্ঠ সংস্করণ প্রকাশিত হয় সম্ভবত ১৯২৭ থেকে ১৯৩০ এর মধ্যে। দুটি সংস্করণেই তিনি
বলরামদাসের জীবন সম্বন্ধে লিখেছেন। ৫ম সংস্করণে তিনি কিছু পরিবরিতন করে বলরাম কবিরাজকে
গোবিন্দদাস কবিরাজের ভাগিনেয় বলেন। কিন্তু তিনি এ তথ্য কোথায় পেয়েছিলেন তা উল্লেখ করেন নি। এ
নিয়ে শ্রীশ্রীপদকল্পতরুর ৫ম খণ্ডের ভূমিকায়
সতীশচন্দ্র রায় জোরালো ভাবে দীনেশচন্দ্র সেনের প্রস্তাব খণ্ডন
করেন। আমাদের কাছে “বঙ্গভাষা ও সাহিত্য” গ্রন্থটির ৫ম সংস্করণ না থাকলেও ৬ষ্ঠ সংস্করণ রয়েছে।
আমরা সেখান থেকেই বলরামদাস সম্বন্ধে দীনেশ চন্দ্র সেনের বিতর্কিত বক্তব্য, এবং
সতীশচন্দ্র রায়ের,
পদকল্পতরুতে দেওয়া বিতর্কের অংশ এখানে তুলে দিচ্ছি . . .

“বঙ্গভাষা ও সাহিত্য” গ্রন্থটির ৬ষ্ঠ সংস্করণে দীনেশচন্দ্র সেন বলরাম সম্বন্ধে, ২৮৮-পৃষ্ঠায় লিখেছেন . . .
“পূর্ব্বে এক পত্রে ১১বার বলরামদাসের উল্লেখ করিয়াছি। ইঁহারা প্রত্যেকেই স্বতন্ত্র স্বতন্ত্র ব্যক্তি নহেন।
পদকর্ত্তা বলরাম দাস উক্ত ১১ স্থলের অন্ততঃ ৪টির উদ্দিষ্ট কবি বলিয়া বোধ হয়। প্রেম-বিলাসের লেখক
নিত্যানন্দের অপর নাম বলরাম দাস। ইনি শ্রীখণ্ডের কবিরাজ বংশীয়, বৈদ্যজাতীয় কবি। পদকল্পতরুর
কবিবন্দনায় পদকর্ত্তা বলরামদাসকে “কবিনৃপবংশজ” (কবিরাজ) বলা হইয়াছে। বলরাম দাস গোবিন্দ দাসের
ভাগিনেয় ছিলেন। গোবিন্দ দাস কৃত সংঙ্গীতমাধবে তদীয় জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা রামচন্দ্র “কবিনৃপতি” নামে উল্লিখিত
হইয়াছেন। সুতরাং “কবিনৃপজ বংশজ জয় ঘনশ্যাম, বলরাম”। পদকল্পতরুধৃত এই পদের উদ্দিষ্ট কবি
বিখ্যাত বলরাম দাস। বলরাম কবিরাজ নরোত্তমবিলাস প্রভৃতি পুস্তকে উল্লিখিত হইয়াছেন, ইনিই
বৈষ্ণববন্দনায় “সঙ্গীত কারক” ও “নিত্যানন্দশাখাভুক্ত” বলিয়া নির্দ্দিষ্ট হইয়াছেন। প্রেমবিলাস-রচক
বলরামদাসও বৈদ্য এবং স্পষ্টতঃই নিত্যানন্দশাখাভুক্ত। সুতরাং পদকর্ত্তা বলরামদাস ও প্রেমবিলাস-রচক
অভিন্ন ব্যক্তি বলিয়া বোধ হইতেছে। @ বলরাম দাসের পিতার নাম আত্মারাম দাস ও মাতার নাম
সৌদামিনী। পদকল্পতরু প্রভৃতি সংগ্রহপুস্তক আত্মারাম দাস কৃত কয়েকটি পদ পাওয়া যায়। প্রেম বিলাস-
রচক বলরাম (নিত্যানন্দ নাম ধারী) এবং পদকর্ত্তা বিখ্যাত বলরাম দাস, একব্যক্তি কিনা---
তত্সম্বন্ধে কাহারও কাহারো কিছু সন্দেহ আছে। কিন্তু পদকর্ত্তা বলরাম যে সুপ্রসিদ্ধ কবিরাজ-বংশীয় এবং
তিনি যে কবি গোবিন্দদাসের ভাগিনেয় ছিলেন, তত্সম্বন্ধে কোন দ্বিধা নাই। পদকল্পতরুর প্রমাণ আমরা
অগ্রাহ্য করিতে পারি না। তাহা ছাড়াও এ সম্বন্ধে বহু প্রমাণ আছে---বৈদ্যহিতৈষিণী পত্রিকায় তাহা বিস্তারিত
ভাবে প্রকাশিত হইয়াছে। কিন্তু আধুনিক কোন ব্রাহ্মণবংশ কবি বলরাম দাসকে দাবী করিতেছেন
।”

@ এই পৃষ্ঠার পাদটীকায় রয়েছে - “গৌরভূষণ শ্রীযুক্ত অচ্যুতচরণ চৌধুরী মহাশয় অনুমান করেন, ইঁহারা
দুইজন এক ব্যক্তি নহেন। কারণ বলরামের পদ প্রাঞ্জল প্রেমবিলাসের রচনা কুটিল। নরহরির নরোত্তমবিলাস
ও ভক্তিরত্নাকরের ভাষা সাদা সিধা হদ্যের ন্যায়, কিন্তু তত্কৃত পদগুলি কবিত্বময়, বৃন্দাবনদাসের পদ ও
ভাগবতের রচনা এক কবির লেখার মত শুনায় না। আমরা এ সম্বন্ধে শ্রদ্ধেয় গৌরভূষণ মহাশয়ের মত গ্রহণ
করিতে পারিলাম না।”---এই পুস্তকের প্রথম সংস্করণের পাদটীকা আমরা উপরি উক্ত কথাগুলি লিখিয়াছিলাম
কিন্তু সম্প্রতি অচ্যুতবাবু আমাদিগকে লিখিয়া পাঠাইয়াছেন “বঙ্গভাষা ও সাহিত্য প্রকাশ হইবার পূর্ব্বেই
আমার এই মতের পরিবর্ত্তন হয়। তত্পূর্ব্বেই আমি নব্যভারত ১৪শ খণ্ড ৮ম সংখ্যায় (তোমার মতানুযায়ী)
পদকর্ত্তা বলরামকেই প্রেমবিলাস-প্রণেতা বলিয়াই জানি।”  

দীনেশচন্দ্র সেনের উপরোক্ত মতের বিরুদ্ধে, পদকল্পতরুর ৫ম খণ্ডের ভূমিকা থেকে
সতীশচন্দ্র রায়ের
উদ্ধৃতি . . .
“পদকর্ত্তা বলরাম কবিরাজ গোবিন্দদাসের ভাগিনেয় ছিলেন, এই প্রয়োজনীয় নূতন তথ্যটা সে মহাশয় কোথায়
পাইয়াছেন, তাহা তিনি লিখিতে বিস্মৃত হইয়াছেন। তাঁহার উদ্ধৃত লেখার ভাবে বুঝা যায়, যেন ঐ তথ্যটা
পদকল্পতরুতে আছে। কিন্তু উহাতে এরূপ কোনও প্রসঙ্গ নাই। পদকল্পতরু-কার বলরাম দাসকে ঘনশ্যামের
ন্যায় কবি-নৃপ-বংশজ অর্থাৎ কবিরাজ বংশীয় বলিয়া নির্দ্দেশ করিয়াছেন। গোবিন্দ দাসের পৌত্র ঘনশ্যাম
যদি কবিরাজ-বংশীয় হন, তাহা হইলে গোবিন্দ দাসের ভিন্ন-গোত্রজ ভাগিনেয় বলরাম সেই একই কবিরাজ-
বংশীয় হইতে পারেন না। যদি তিনি ভিন্ন গোত্র অন্য কোন কবিরাজ-বংশ-জাত হইয়া থাকেন, তবে
পদকল্পতরুর এরূপ উল্লেখ সঙ্গত বিবেচনা হয় না। সেন মহাশয় তাঁহার উক্তির পোষকতায় কোন প্রমাণ না
দেওয়ায় মনে হয় যে, তিনি কোনও কিংবদন্তীর উপর বিশ্বাস করিয়াই পদ-কর্ত্তা বলরাম দাসকে নিঃসন্দেহে
গোবিন্দ কবিরাজের ভাগিনেয় বলিয়া স্থির করিয়াছেন। বস্তুতঃ বলরাম নামে গোবিন্দদাসের কোন ভাগিনেয়
থাকিয়া থাকিলে দোগাছীর বলরাম দাসের রচিত পদের ন্যায় তাঁহার রচিত কোন কোন পদো পদকল্পতরুতে
সংগৃহীত হইতে পারে ; কিন্তু বৈষ্ণব-সাহিত্যে এই অভিনব তথ্যটার পোষক  কোনও উল্লেখ না পাওয়ায়,
আমরা সেন মহাশয়ের ঐ উক্তির অনুমোদন করিতে পারিলাম না। আমরা আশা করি, ডক্টর সেন মহাশয়
তাঁহার গ্রন্থের ৬ষ্ঠ সংস্করণে এই কৌতূহল-জনক তথ্যের মূল কি উহা স্পষ্টাক্ষরে ব্যক্ত করিয়া আমাদিগের
কৃতজ্ঞতা-ভাজন হইবেন
।”

আমাদের কাছে “বঙ্গভাষা ও সাহিত্য” গ্রন্থটির ৮ম সংস্করণ আছে, যা প্রকাশিত হয়েছিল দীনেশচন্দ্র সেনের
মৃত্যুর পরে ১৯৪৬সালে। গ্রন্থটির সম্পাদনা ও ভূমিকা লিখেছিলেন বিনয়চন্দ্র সেন। সেই সংস্করণেও বলরাম
কবিরাজকে গোবিন্দদাসের ভাগিনেয় এই কথার সংশোধন বা এই তথ্য কোন উৎস থেকে তা বলা হয় নি।

দীনেশচন্দ্র সেন ও সতীশচন্দ্র রায়ের এই তর্ক-বিতর্কের উপরে, ১৯৩৪ সালে মৃণালকান্তি ঘোষ,
তাঁর সম্পাদিত, জগদ্বন্ধু ভদ্র সংকলিত গৌরপদতরঙ্গিণীর ২য় সংস্করণে লিখেছেন . . .
“সেন মহাশয়ের কৌতূহল-জনক তথ্য সম্বন্ধে সতীশবাবুর ব্যঙ্গোক্তি কতকটা অশোভনীয়
হইলেও, দীনেশবাবুর ন্যায় প্রবীণ ও বিজ্ঞ সাহিত্যিকের পক্ষে এই ভাবে যুক্তি তর্ক করাও যে আদৌ
শোভনীয় নহে, তাহা বলাই অধিকন্তু
।”
*
বলরামদাস-শ্রীশচন্দ্র-বিমানবিহারী-মালবিকা-মঞ্জুলিকা -                          পাতার উপরে . . .   
"বলরাম দাস" জ্যোতিষ্কের মতো বাংলার বৈষ্ণব সাহিত্যাকাশে বিরাজ করছেন। তাঁদের মধ্যে সর্বপ্রবীণ
বলরামদাস ছিলেন দোগাছিয়া নিবাসী। তাঁর বংশধররাও উনবিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে পুরুষানুক্রণে
বৈষ্ণব সাহিত্যের প্রচার ও প্রসারে লিপ্ত থেকেছেন। আধুনিক কালে, সর্ব্বপ্রথম বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন
“পদরত্নাবলী” প্রকাশিত হয় ১৮৮৫ সালে। সম্পাদনা করেন অনুর্ধ ত্রিশ,
শ্রীশচন্দ্র মজুমদার এবং তাঁর অন্তরঙ্গ
বন্ধু
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এঁরাই সর্বপ্রথম ধর্মীয় ভক্তিরসের বাইরে গিয়ে, কেবলমাত্র সাহিত্যরসের নিরিখে
বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন করে এক নতুন দিশার উন্মোচন করেন।

শ্রীশচন্দ্র মজুমদারের পুত্র বিমানবিহারী মজুমদার ইতিহাস ও অর্থনীতির অধ্যাপনা করলেও, বৈষ্ণব
সাহিত্যের এক অগ্রণী বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছেন তাঁর “জ্ঞানদাস ও তাঁহার পদাবলী”
(১৯২০), “শ্রীচৈতন্যচরিতের উপাদান” (১৯৫৯), খগেন্দ্রনাথ মিত্রের সঙ্গে “বিদ্যাপতির পদাবলী” (১৯৫৯),
“চণ্ডীদাসের পদাবলী” (১৯৬০), “পাঁচশত বত্সরের পদাবলী” (১৯৬১), “ষোড়শ শতাব্দীর পদাবলী সাহিত্য”
(১৯৬১), গোবিন্দদাসের পদাবলী ও তাঁহার যুগ (১৯৬১),  প্রভৃতি গ্রন্থাবলীর মধ্য দিয়ে।

তাঁর দুই কন্যা মালবিকা চাকী এবং মঞ্জুলিকা মজুমদারও বৈষ্ণব সাহিত্যে তাঁদের স্থান চিরস্থায়ী করে
গিয়েছেন। মালবিকা দেবীর অবদান তাঁর অতি মূল্যবান “বাসু ঘোষের পদাবলী” সংকলন সম্পাদনা এবং
মঞ্জুলিকা দেবীর দৃঢ় উল্লেখ পাওয়া যায়
রায়বাহাদুর খগেন্দ্রনাথ মিত্রের লেখা “বিদ্যাপতির পদাবলী” গ্রন্থের
ভূমিকায়।

শ্রীশচন্দ্র মজুমদার ও বিমান বিহারী মজুমদার তাঁদের এই বংশ-পরিচয় নিয়ে তাঁদের গ্রন্থে তেমন কোনো
উল্লেখ বা আলোকপাত করে যান নি, যা এককথায় তাঁদের আভিজাত্যেরই প্রমাণ।

দোগাছিয়ার বলরাম দাস যে তাঁদের পূর্বপুরুষ একথা আমরা জানতে পারি "বিদ্যাপতির পদাবলী" গ্রন্থের
খগেন্দ্রনাথ মিত্রের মুখবন্ধে, সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু সম্পাদিত "সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান" ১ম
খণ্ডে এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শ্রীশচন্দ্র মজুমদার সম্পাদিত, ১৮৮৫ সালে প্রকাশিত, পদাবলী সংকলন
“পদরত্নাবলী”-র পরিবর্ধিত আনন্দ সংস্করণ ২০০৬ -এর গ্রন্থ প্রসঙ্গ, পূর্বকথা, ৩৩৫-পৃষ্ঠায়।  
---মিলন সেনগুপ্ত, মিলনসাগর॥
*