কবি মাধবী দাসী - এর পদের ভণিতা “মাধবী” অথবা “মাধবী দাস”। কবি, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর
সমসাময়িক বলে মনে করা হয়। ষোড়শ শতকের প্রথমার্ধে তাঁর নাম পাওয়া যায়।

কৃষ্ণদাস কবিরাজ রচিত চৈতন্যচরিতামৃত, অন্ত্যলীলা, দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ, ৫২-পৃষ্ঠায় দেওয়া ছোট হরিদাস
দণ্ডরূপ শিক্ষা বৃত্তান্তের নীচে দেওয়া পংক্তিতে শিখি মাহিতীকে বৃদ্ধা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর থেকে নিশ্চয়ই বয়সে বড় ছিলেন।
ছোট হরিদাস নাম প্রভুর কীর্ত্তনীয়া।
তারে কহেন আচার্য্য ডাকিয়া আনিয়া॥
মোর নামে শিখি মাহিতীর ভগিনী স্থানে গিয়া।
উত্তম চালু এর মোন আনহ মাগিয়া॥
মাহিতীর ভগিনীর নাম মাধবী দেবী।
বৃদ্ধা তপস্বিনী আর পরম বৈষ্ণবী


শোনা যায় এই মাধবী দাসী, নীলাচল বা  পুরীর জগন্নাথ দেবের মন্দিরের হিসাব-রক্ষক অথবা লিপিকর শিখী
মাহিতীর ভগিনী ছিলেন। কথিত আছে যে মাধবী দেবীর সুন্দর হস্তাক্ষর ও পাণ্ডিত্যের জন্য, রাজা প্রতাপরুদ্র
তাঁকে শ্রীমন্দিরের (জগন্নাথদেবের মন্দিরের) লিখনাধিকারীর পদে নিযুক্ত করেন।

আরেকদল বিশেষজ্ঞ মনে করেন যে “মাধবী দাস” ভণিতার পদের রচয়িতা শিখী মাহাতীর ভগিনী নন।



ছোট হরিদাস দণ্ডরূপ শিক্ষা                                                           পাতার উপরে . . .    
মাধবী দেবী এই পদের রচয়িতা হন বা না হন, তা তর্কসাপেক্ষ হলেও একথা অশ্বীকার করা যাবে না যে
মাধবী দাসী চৈতন্যদেবের নীলাচলে থাকার কালে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন। কৃষ্ণদাস কবিরাজ রচিত
“চৈতন্যচরিতামৃতের” অন্ত্যলীলার দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ - “ছোট হরিদাস দণ্ডরূপ শিক্ষা” বৃত্তান্তে রয়েছে  যে
একদিন ভগবানাচার্য্য, প্রভুকে (
শ্রীচৈতন্যদেবকে ) ঘরে ভাত খাওয়ানোর জন্য ছোট হরিদাস নামের  
কীর্তনিয়াকে সুগন্ধী চাল আনার জন্য শিখী মাহিতীর ভগ্নী মাধবী দেবীর কাছে পাঠান। খেতে বসে,
চৈতন্যদেব
এই চাল সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করে জানতে পারেন যে হরিদাস একজন মহিলার কাছ থেকে চাল চেয়ে এনেছেন।
এই কারণে তিনি তাঁকে বর্জন করেন। অনেক অনুরোধ উপরোধেও যখন তিনি হরিদাসকে ক্ষমা করলেন
না, তখন আর থাকতে না পেরে ছোট হরিদাস ত্রিবেণীতে গিয়ে জলে ডুবে আত্মহত্যা করেন। এই ঘটনাটির
উপলক্ষে আমরা জানতে পারি যে শিখী মাহাতীর ভগ্নী মাধবী দেবী নাম্নী মহিলা শ্রীচৈতন্যের  সমকালে
বর্তমান ছিলেন, নীলাচলে। শোনা যায় যে
শ্রীচৈতন্যদেব নীলাচলে যাওয়ার পরে, মাধবী দাসীর জ্ঞান  ও
ভক্তির প্রমাণ পেয়ে, তাঁকে স্বয়ং দীক্ষা দিয়েছিলেন। মাধবী দাসী নাকি নিজের নাম কখনও কখনও মাধব
দাস বলেও স্বাক্ষর করতেন।  



সুকুমার সেনের উদ্ধৃতি                                                                 পাতার উপরে . . .    
১৯৪০ সালে প্রকাশিত, সুকুমার সেন রচিত বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ২৪৯-এ জানিয়েছেন . . .
“মাধবীদাস ভণিতার ভণিতাযুক্ত পদগুলিকে প্রায় সকলেই উড়িয়া মহিলা মাধবী মাহিতীর রচনা বলিয়া মনে
করেন। কিন্তু ইহা যুক্তিলেশহীন অনুমান মাত্র। মাধবীদাস ভণিতার একটি পদ হইতে অনুমান হয় যে,
পদকর্ত্তা মহাপ্রভুর বিশিষ্ট পারিষদ জগদানন্দ পণ্ডিতের শিষ্য ছিলেন। কয়েকটি পদের ভণিতায় ‘মাধুবীদাস’
এই পাঠান্তর পাওয়া যায়।




মাধবী দাসীর পদকর্তা হওয়া নিয়ে তর্ক-বিতক                                    পাতার উপরে . . .    
মাধবী দেবীর পদকর্তা হওয়ার পক্ষে ছিলেন হারাধন দত্ত ভক্তিনিধি, অচ্যুতচরণ তত্ত্বনিধি, দীনেশচন্দ্র সেন
প্রমুখরা। অপরপক্ষে পদকল্পতরুর সম্পাদক
সতীশচন্দ্র রায়ের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে মাধবীদাস ভণিতাযুক্ত
পদগুলির রচয়িতা শিখি মাহাতির ভগিনী হতেই পারেন না! এই দুপক্ষের যুক্তি-তর্ক আমরা এখানে তুলে
দিলাম।



জগবন্ধু ভদ্রর উদ্ধৃতি                                                                      পাতার উপরে . . .    
আমরা
সতীশচন্দ্র রায়ের শ্রীশ্রীপদকল্পতরুর ৫ম খণ্ডের ভূমিকার ১৮৮ পৃষ্ঠা থেকে এই বিষয়ে চলা
তর্ক-বিতর্ক টি এখানে তুলে দিচ্ছি, পাঠকের সুবিধার জন্য।

. . . যে যে কারণে মাধবী দেবীকে পদকর্ত্রী স্থির করা হইয়াছে, তাহা জগবন্ধু বাবুর ‘মাধবী দাস’ নামক
আলোচনা হইতে নিম্নে উদ্ধৃত করা যাইতেছে।

(১)         শিখী মাহিতি নামে জগন্নাথ দেবের একজন লিপিকর ছিলেন। তাঁহার ভ্রাতার নাম মুরারি মাহিতী  
ও সহোদরার নাম মাধবী এই মাধবী চরিত্র অত্যন্ত উত্তম ছিল বলিয়া, কৃষ্ণদাস কবিরাজ ইহাঁকে দেবী বলিয়া
উল্লেখ করিয়াছেন। কেন না, কবিরাজ গোস্বামী তাঁহাকে শ্রীরাধিকার দাসীমধ্যে গণনা করিয়াছেন।
(২)        চৈতন্যচরিতামৃতে অন্ত্য খণ্ডে লেখা আছে যে, মহাপ্রভু নিজ জনকে যে গূঢ় ব্রজের রস প্রদান
করিয়াছেন, সাড়ে তিন জন ব্যক্তিমাত্র আস্বাদন করিতে সক্ষম হইয়াছিলেন। যথা,---
প্রভু লেখা করে যাঁরে রাধিকার গণ।
জগতের মধ্যে পাত্র সাড়ে তিন জন॥
স্বরূপ-দামোদর, আর রায় রামানন্দ।
শিখি মাহিতি তিন, তাঁর ভগ্নী অর্দ্ধজন॥
(৩)        মাধবী পুরুষের ন্যায় পণ্ডিত ছিলেন, এবং পুরুষের ন্যায় তপস্যা করিতেন।  এই জন্য বৈষ্ণব গ্রন্থে
ইহাঁদিগকে ‘তিন ভ্রাতা’ বলা হইয়াছে। এবং তাঁহার ভ্রাতারাও তাঁহার প্রতি ভ্রাতার ন্যায় সম্মান প্রদর্শন
করিতেন। মাধবী স্বয়ংও অধিকাংশ পদে আপনাকে ‘মাধবী দাস’ কহিয়াছেন।
(৪)        প্রধানতঃ নীলাচলবাসিনী মাধবী মহাপ্রভুর নীলাচল লীলা সম্বন্ধেই পদ লিখিয়াছেন ; সুতরাং তাঁহার
পদ মূল্যবান।
(৫)        ভক্তিনিধি মহাশয় মাধবীর পদ সম্বন্ধে অপর এক প্রবন্ধে লিখেন,--- পদ-সমুদ্রে মাধবী-কৃত অনেক
উড়িয়া পদ আছে। এবং উড়িয়া ভাষার পদগুলি বড়ই জটিল, বাঙ্গালা পদ অপেক্ষা কর্কশ, উড়িয়াদিগের
নিকট তাহা আদরণীয়।
(৬)        কর্ম্মদোষে নারীজন্ম পরিগ্রহ করাতে প্রাণ ভরিয়া প্রভুর বদন-সুধাকর দর্শন করিতে
অসমর্থা বলিয়া একটী পদে মাধবী খেদ করিয়া বলিয়াছেন,---
যে দেখায়ে গোরা-মুখ সেই প্রেমে ভাসে।
মাধবী বঞ্চিত হৈল নিজ কর্ম্মদোষে॥




সতীশচন্দ্র রায়ের জবাবী উদ্ধৃতি                                                     পাতার উপরে . . .    
"
দুঃখের সহিত আমাদিগকে বলিতে হইতেছে যে, পূর্ব্বোদ্ধৃত যুক্তিগুলির দ্বারা মাধবী দেবীর কর্ত্তৃক আলোচ্য
পদগুলির রচনা প্রমাণিত হয় না। আমরা সংক্ষেপে ঐ যুক্তিগুলির অসারতা প্রদর্শিত করিব।

(১)        চরিত্রের মহত্ব দ্বারা পদ-কর্ত্তৃত্ব সিদ্ধ হয় না।
(২)        ব্রজ-রসের অসাধারণ আস্বাদক সাড়ে তিন জন নীলাচলবাসী ভক্তের মধ্যে রায় রামানন্দ পদ-রচনা
করিয়া গিয়াছেন। তাঁহার কয়েতটি সংস্কৃত পদ ও একটি ব্রজবুলী পদ . (“পহিলহি রাগ নয়ন-ভঙ্গ ভেল”
ইত্যাদি) পাওয়া গিয়াছে। স্বরূপ দামোদর বা শিখী মাহাতীর কোনো পদ পাওয়া যায় নাই। এ
অবস্থায় মাধবী দেবী পদ-রচনা না করিলেও তাঁহার ব্রজরসাস্বাদনের কোন বাধা দেখা যায় না। মাধবী দেবী
কোন পদ-রচনা করিয়া থাকিলে, উহা উড়িয়া পদ হওয়াই একান্ত সম্ভব।
(৩)        মাধবী দেবী পুরুষের সমকক্ষ পণ্ডিত হইতে পারেন, কিন্তু তিনি পুরুষের ন্যায় তপস্যা
করিতেন এই কথার অর্থ কি ? ইহা তো মাধবীর ন্যায় শালীনতাসম্পন্ন মহিলা ও শ্রীরাধিকার দাসীর পক্ষে
কোন রূপেই সম্ভবপর হইতে পারে না। সুতরাং মাধবী দেবী তাঁহার বিদ্যা-বুদ্ধির জন্য ভ্রাতাদিগের নিকট
জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার সম্মান লাভ করিলেও ‘দাস’ বলিয়া নিজকে ভণিতায় পরিচিত করার কোন কারণ দেখা যায় না
। আমাদের বিবেচনায় ভণিতার দাস শব্দ স্পষ্টাক্ষরে বলিয়া দিতেছে যে, এই সকল পদের রচয়িতা আর
যিনিই হউন না কেন, তিনি কখনও মাধবী দাসী হইতে পারেন না।
(৪)        নীলাচলে শ্রীমহাপ্রভুর বহু বাঙ্গালী ভক্তের গমনাগমন ছিল। ইহাঁদিগের মধ্যে ‘মাধবী দাস’ নামক
কেহ এই সকল নীলাচল-লীলার পদ রচনা করিতে পারেন। স্ত্রীলোক বলিয়া যিনি ‘প্রাণ ভরিয়া প্রভুর বদন
সুধাকর’ দর্শন করিতে অসমর্থা ছিলেন, তাঁহার পক্ষে মহাপ্রভুর ভক্তগণ সঙ্গে ফাগু খেলা প্রভৃতি বিষয়ে পদ-
রচনা কিঞ্চিৎ অসম্ভব মনে হয় না কি ? মাধবী দাস ভণিতার ১৮৫৩ সংখ্যাক পদে শ্রীগৌরাঙ্গের সন্ন্যাসের
পর প্রথম নীলাচলে গমনের অব্যবহিত পরেই শচী মাতাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য নীলাচল হইতে জগদানন্দ
ঠাকুরের নবদ্বীপ-গমন বর্ণিত হইয়াছে। মহাপ্রভুর নীলাচলে যাওয়া মাত্রই যে, শিখী মাহাতী ভাতৃগণের সহিত
তাঁহার কিংবা জগদানন্দের ঘনিষ্ঠতা জন্মিয়াছিল, এরূপ জানা যায় না ;  এ অবস্থায় মাধবী দেবীর পক্ষে
নবদ্বীপের তত্কালীন অবস্থা-সূচক এই পদের রচনা এবং জগদানন্দ ঠাকুরকে ‘মাধবী দাসের ঠাকুর পণ্ডিত’
বলিয়া উল্লেখ করা অসম্ভব মনে হয়। শ্রীমহাপ্রভু বা জগন্নাথ ঠাকুর প্রভৃতি অন্তরঙ্গ সহচরগণ অপর
স্ত্রীলোকের সহিত আলাপাদি করিতেন না ; এ অবস্থায় অন্য লোকের নিকট বিবরণ শুনিয়া এরূপ
পদের রচনা করিতে যাওয়া যথেষ্ট অবিবেচনার কার্য্য ও অনধিকার চর্চ্চা বটে। মাধবী দেবীর পক্ষে আমরা
উহা সম্ভব বোধ করি না। মাধবী দেবীর রচিত হইলে, অন্ততঃ ‘নীলাচল হইতে শচীরে দেখিতে আইসে
জগদানন্দ’ ইত্যাদি ১৮৫৩ সংখ্যক পদের রচয়িতা জগদানন্দ ঠাকুরের ভক্ত ও অনুগত কোনও ব্যক্তি ছিলেন,
এরূপ অনুমানই অনিবার্য্য মনে হয়।

(৫)        মাধবী দেবীর উড়িয়া পদগুলি আমরা দেখি নাই। পদ-সমুদ্র পুথিখানা লুপ্ত হইয়া যাওয়ায় ঐ সকল
পদের বিষয় কি ছিল, এবং উহাতে কিরূপ ভণিতা দেওয়া ছিল, তাহাও এখন জানার উপায় নাই। তর্কস্থলে
মাধবী দেবীকে ঐ সকল উড়িয়া পদের রচয়িত্রী বলিয়া স্বীকার করিয়া লইলেও তদ্দ্বারা তাঁহার আলোচ্য
বাংলা পদগুলির কৃতিত্ব প্রমাণিত হয় না। তাঁহার উড়িয়া-পদ রচনার দ্বারা বরং বাঙ্গালা রচনায় অসামর্থ্যই
অনুমিত হইতে পারে।

(৬)        মাধবী দাসের ২২৯০ সংখ্যাক পদে আছে,---

আনন্দে নাচত                            সঙ্গে ভকত
.                গৌরকিশোর-রাজ।
ফাগু উঝালি                        করে ফেলাফেলি
.                নীলাচল-পুরী মাঝ॥
শুনিয়া নাগরী                        প্রেমেত আগরি
.                ধাইয়া চলিল বাটে।
হেরিয়া গৌরে                        পড়িয়া ফাঁফরে
.                বদন চাহিয়া থাকে॥

এই বর্ণনা যদি শুধু কাল্পনিক না হয়, তাহা হইলে বুঝা যায় যে, মাধবী দেবীও গৌর-প্রেমাকৃষ্টা
এই নাগরীদিগের ন্যায় দূর হইতে শ্রীগৌরাঙ্গের মুখের পানে অনিমিষ-দৃষ্টিতে চাহিয়া দেখিয়াছেন। এ অবস্থায়
তাঁহার পক্ষে ---

যে দেখয়ে গোরা-মুখ সেই প্রেমে ভাসে।
মাধবী বঞ্চিত হৈল নিজ কর্ম্মদোষে॥ ”

এই বলিয়া আক্ষেপ করা সম্ভব হয় কি ? আমাদের বিবেচনায় এই পদের রচয়িতা খুব
সম্ভবতঃ শ্রীগৌরাঙ্গের কিঞ্চিৎ পরবর্ত্তী সময়ের ব্যক্তি। তিনি হয় ত ঠাকুর জগদানন্দ কিংবা অন্য কোনও
সাক্ষাত্দ্রষ্টার মুখে বৃত্তান্ত শুনিয়া এই সকল পদ রচনা করিয়া গিয়াছেন। প্রকৃত পক্ষে মাধবী দেবী রচয়িত্রী
হইলে, উহাতে এরূপ আক্ষেপ ও বিশেষতঃ ‘মাধবী দাস’ ভণিতা পাওয়া যাইত না।

বৈষ্ণব-ইতিহাসের অসম্পূর্ণতা হেতু অনেক পদ-কর্ত্তারই কোন পরিচয় পাওয়া যায় না। এ অবস্থায় কোনও
প্রসিদ্ধ বৈষ্ণব ভক্তের নাম যদি কোন পদের ভণিতার নামের সহিত ঘূর্ণাক্ষরে মিলিয়া যায়, তাহা হইলে
গত্যান্তরের অভাবে আমরা তাঁহাকেই পদকর্ত্তা স্থির করা সঙ্গত মনে করি না। তবে, সত্যের অনুরোধে
দুঃখের সহিত না বলিয়া পারিতেছি না যে, উত্কল-দেশীয় গৌর-ভক্ত শিখী মাহাতীর ভগিনী মাধবী দেবীর
পক্ষে আলোচ্য পদের রচনা আমাদের নিকট সম্ভবপর বোধ হয় না
।”



বিভিন্ন রূপে "মাধব" ভণিতা ও তার অপভ্রংশ -                                  পাতার উপরে . . .   
আমরা মিনলসাগরে যে বিভিন্ন রূপে “মাধব” ও তার অপভ্রংশ রূপের ভণিতাযুক্ত পদ সংগ্রহ করতে
পেয়েছি তা হলো "মাধব", "মাধব দাস", "দ্বিজ মাধব", "মাধব আচার্য্য", "শ্রীমাধব", "মাধাই", "মাধো", "মাধব
ঘোষ", "মাধবেন্দ্র পুরী", "মাধবী" এবং "মাধবী দাসী"।

মিলনসাগরে প্রকাশিত "মাধব" সম্বলিত বিভিন্ন ভণিতায় ক্লিক করলেই সেই পাতায় চলে যেতে পারবেন।
মাধব   
মাধব দাস    
দ্বিজ মাধব   
দ্বিজ মাধব দাস   
মাধব আচার্য্য   
শ্রীমাধব   
মাধাই    
মাধব ঘোষ   
মাধবেন্দ্র পুরী    
মাধবী    
মাধবী দাসী      
মাধো   ...   
আমরা
মিলনসাগরে  কবি মাধবী দাসীর বৈষ্ণব পদাবলী আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে এই  
প্রচেষ্টার সার্থকতা।



বৈষ্ণব পদাবলী নিয়ে মিলনসাগরের উদ্দেশ্য                                          পাতার উপরে . . .    
নরহরি চক্রবর্তীর কবিতা বা পদাবলির মান দ্বিতীয় শ্রেণীর কি না, তাঁর কবিতা বিদ্যাপতি-চণ্ডীদাসের তুল্য
কি না বা
জ্ঞানদাসের কাব্যের মানের কাছাকাছি কি না, এই সব গূঢ় তাত্ত্বিক তর্ক-বিতর্কের আলোচনায়
উনিশ ও বিংশ শতকের বাংলার পদাবলী সাহিত্য সরগরম হয়েছিল! সেসময়ের বিভিন্ন গ্রন্থকারের লেখা
পড়লেই তা চোখে পড়ে। কিন্তু মিলনসাগর এ বিষয়ের অতি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম তত্ত্বকথায় যেতে আগ্রহী নয়! তাই
এই আলোচনা আমরা এখানে করলাম না।

আমাদের উদ্দেশ্য, উত্কর্ষের নিরিখে বৈষ্ণব পদাবলীর বিচার করা নয়। আমাদের উদ্দেশ্য পদকর্তাদের
যতগুলি সম্ভব পদ একত্রে এখানে প্রকাশ করা। বৈষ্ণব পদকর্তা ও সংকলকগণ যে আজীবন কঠোর
পরিশ্রম  করে এই বিশাল সাহিত্য বাঙালীকে এযুগে উপহার দিয়ে যেতে পেরেছেন, আমরা মিলনসাগরে
তাঁদের সবাইকে আমাদের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও নমস্কার জানাই।

আমরা প্রতিটি পদে, সেই পদেটির উত্স-গ্রন্থের নাম উল্লেখ করেছি। একাধিক ক্ষেত্রে একাধিক রূপে পাওয়া
একই পদ একত্রে তুলে দিয়েছি  তুলনার জন্য।  সংস্কৃত ভাষার  পদগুলির বাংলায় অনুবাদ বা ব্যাখ্যা হাতে
পেলেই তুলে দেওয়ার চেষ্টা করছি।




বৈষ্ণব পদাবলীর "রাগ"                                                                   পাতার উপরে . . .    
বৈষ্ণব পদাবলীর পদগুলি মূলত গান হিসেবেই রচনা করা হোতো। প্রায় প্রতিটি পদের শুরুতেই সেই পদটির
“রাগ”-এর উল্লেখ থাকে। তবে কিছু পদের আগে তার “রাগ”-এর উল্লেখ নেই এমনও পাওয়া গিয়েছে। বৈষ্ণব
পদাবলীর সংকলকগণ যখন তাঁদের সংকলনে পদ সাজান, তখন পর পর একাধিক গানের যদি একই সুর বা
রাগ থাকে, তাহলে তাঁরা প্রথম গানটিতে তার রাগ উল্লেখ ক’রে পরের গানটিতে রাগের যায়গায় “তথা রাগ”
বা “যথা” শব্দ বসিয়ে দিতেন, এই বোঝাতে যে পরের গানটি একই রাগাশ্রিত। কিন্ত এমনও পাওয়া গিয়েছে
যে একই গান বিভিন্ন সংকলকের সংকলনে ভিন্ন রাগাশ্রিত বলে উল্লেখিত। বহু পদই মুখে মুখে গীত  
অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে।  তাই  একই গান  বিভিন্ন  গায়কের মুখে ভিন্ন ভিন্ন সুরে পাওয়া গিয়ে থাকতেই
পারে। তাই অনেক বিদগ্ধজনেরা মনে করেন যে এখন আর পদের রাগের উল্লেখ না করলেও চলে। যে  
যেমন সুরে চায়, গেয়ে আনন্দ লাভ করলেই এর সার্থকতা। আমরা অবশ্য যে সংকলন থেকে যে পদ  
নিয়েছি, সেই সংকলনে উল্লেখিত রাগটি মিলনসাগরের পাতায় তুলে দিয়েছি। এমন হতে পারে বিশেষজ্ঞরা
অন্য সংকলনে সেই গানটির অন্য রাগ দেখতে পাবেন।
          



কবি মাধবী দাসীর মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন।    
কবি মাধবীর মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন।  


উত্স -
  • রূপ গোস্বামী দ্বারা সংগৃহীত, বিরোচিত ও পঞ্চদশ শতকে প্রকাশিত, প্রাচীন বৈষ্ণব এবং শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য-
    মহাপ্রভুর স্বকৃত শ্লোকসম্বলিত, ১৮৮২ সালে রামনারায়ণ বিদ্যারত্ন দ্বারা অনুদিত, গ্রন্থ “পদ্যাবলী”।
  • বৃন্দাদন দাস দ্বারা ষোড়শ শতকে বিরচিত, অতুলকৃষ্ণ গোস্বামী সম্পাদিত, “শ্রীচৈতন্যভাগবত”, ১৯১৫।
  • নিত্যানন্দ দাস দ্বারা ১৬০০ সালে বিরচিত, বাবু যশোদালাল তালুকদার প্রকাশিত, “শ্রীপ্রেমবিলাস”, ১৯১৩।
  • ১৫২২ শকাব্দে অর্থাৎ ১৬০০ খৃষ্টাব্দে, মাধবাচার্য বা দ্বিজ মাধব দ্বারা রচিত শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল কাব্য, ১১১৮
    বঙ্গাব্দে (১৭১১ সালে) লেখা শেষ করা পুথি থেকে, কলকাতার ভবানীচরণ দত্তের ষ্ট্রীটের বঙ্গবাসী কার্যালয়
    থেকে, ফাল্গুন ১৩১০ বঙ্গাব্দে (ফেব্রয়ারী ১৯০৪) নটবর চক্রবর্ত্তী দ্বারা মুদ্রিত ও প্রকাশিত।
  • কৃষ্ণদাস কবিরাজ দ্বারা ১৬১৫ সালে বিরচিত, জগদীশ্বর গুপ্ত দ্বারা সরল টীকা ও ব্যাখ্যা সহিত সম্পাদিত,
    “শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত”, ১৮৮৯।
  • রামগোপাল দাস (গোপাল দাস) দ্বারা ১৬৪৩-১৬৭৬ সময়কালে, সংকলিত ও বিরচিত এবং ১৯৪৬ সালে
    হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়, সুকুমার সেন ও প্রফুল্ল পাল দ্বারা সম্পাদিত, বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন
    "শ্রীশ্রীরাধাকৃষ্ণ-রসকল্পবল্লী”।
  • পীতাম্বর দাস দ্বারা সপ্তদশ শতকে সংকলিত ও বিরচিত এবং ১৯৪৬ সালে হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়,  
    সুকুমার সেন ও প্রফুল্ল পাল দ্বারা সম্পাদিত, বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন "অষ্টরস-ব্যাখ্যা ও রসমঞ্জরী”।  
  • বিশ্বনাথ চক্রবর্তী (হরিবল্লভ দাস) দ্বারা আনুমানিক ১৭০০ সালে  সংকলিত ও বিরচিত এবং ১৯২৪
    সালে, রাধানাথ কাবাসী দ্বারা সম্পাদিত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “শ্রীশ্রীক্ষণদা-গীতচিন্তামণি”।
  • নরহরি চক্রবর্তী (ঘনশ্যাম) দ্বারা আনুমানিক ১৭২৫ সালে সংকলিত ও বিরচিত এবং ৪৬২ গৌরাব্দে
    (১৯৪৯), হরিদাস দাস দ্বারা সম্পাদিত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “শ্রীশ্রীগীতচন্দ্রোদয় (পূর্বরাগ)”।
  • রাধামোহন ঠাকুর (রাধামোহন দাস) দ্বারা আনুমানিক ১৭২৫ সালে সংকলিত ও বিরচিত এবং ১৮৭৮
    সালে, রামনারায়ণ বিদ্যারত্ন দ্বারা সম্পাদিত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “পদামৃত সমুদ্র”।
  • গোকুলানন্দ সেন (বৈষ্ণবদাস) দ্বারা আনুমানিক ১৭৫০ সালে সংকলিত ও বিরচিত এবং ১৯১৫-১৯৩১
    সময়কালে, সতীশচন্দ্র রায় দ্বারা সম্পাদিত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “শ্রীশ্রীপদকল্পতরু”, ৫ খণ্ডে, সটীক
    সংস্করণ, ১৯১৫-১৯৩১। প্রথম সংস্করণ ১৮৯৬।
  • দ্বিজ মাধব দ্বারা সংকলিত, বিশ্বভারতী গ্রন্থশালায় সংরক্ষিত ১৩৮১টি পদবিশিষ্ট “শ্রীপদমেরুগ্রন্থ”,  
    উনিশ শতকের প্রথমার্ধে অনুলিখিত।
  • গৌরমোহন দাস সংকলিত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “পদকল্পলতিকা”, ১৮৪৯।
  • অক্ষয়চন্দ্র সরকার সম্পাদিত, ১৮৮৪ সালে প্রকাশিত, “প্রাচীন কাব্য সংগ্রহ, প্রথম খণ্ড”।
  • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শ্রীশচন্দ্র মজুমদার দ্বারা সম্পাদিত, ১৮৮৫ সালে প্রকাশিত, পদাবলী সং
    “পদরত্নাবলী”-এর পরিবর্ধিত আনন্দ সংস্করণ, ২০০৬।
  • জগবন্ধু ভদ্র সংকলিত ও মৃণালকান্তি ঘোষ সম্পাদিত, পদাবলী সংকলন “শ্রীগৌরপদ-তরঙ্গিণী”, ১৯৩৪,
    প্রথম সংস্করণ ১৯০২।
  • দুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “বৈষ্ণব-পদলহরী”, ১৯০৫।
  • হরিলাল চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “শ্রীশ্রীপদরত্ন-মালা”, ১৯১৬।
  • চন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সংগৃহীত রাজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বারা প্রকাশিত “শ্রীশ্রীপদামৃতসিন্ধু”, ১৯২২।
  • সতীশচন্দ্র রায় সম্পাদিত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “অপ্রকাশিত পদরত্নাবলী”, ১৯২৬।
  • নবদ্বীপ চন্দ্র ব্রজবাসী ও খগেন্দ্রনাথ মিত্রের মহাজন পদালী সংকলন “শ্রীপদামৃতমাধুরী”, ১৯৩৭।
  • আবদুল কাদির ও রেজাউল করীম সম্পাদিত, বাঙ্গালী মুসলমান কবিদের রচিত কবিতাবলীর সংকলন
    “কাব্য-মালঞ্চ”, ১৯৪৫।
  • যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য্য সম্পাদিত “বাঙ্গালার বৈষ্ণব-ভাবাপন্ন মুসলমান কবি”, ১৯৪৫।
  • হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “বৈষ্ণব পদাবলী”, ১৯৪৬।
  • সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত “পদামৃত লহরী”।
  • খগেন্দ্রনাথ মিত্র, সুকুমার সেন, বিশ্বপতি চৌধুরী ও শ্যামাপদ চৌধুরী সম্পাদিত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন
    “বৈষ্ণব পদাবলী (চয়ন)”, ১৯৫২।
  • সুকুমার সেন সংকলিত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “বৈষ্ণব পদাবলী”, ১৯৫৭।
  • দুর্গাচরণ বিশ্বাস সংগৃহীত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “কীর্ত্তন-পদাবলী”, ১৯৫৯।
  • সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “বৈষ্ণব পদরত্নাবলী”, ১৯৬০।
  • বিমান বিহারী মজুমদার সম্পাদিত “পাঁচশত বত্সরের পদাবলী”, ১৯৬১।
  • বিমান বিহারী মজুমদার সম্পাদিত “ষোড়শ শতাব্দীর পদাবলী-সাহিত্য”, ১৯৬১।
  • দেবনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “বৈষ্ণব পদসঙ্কলন”, ১৯৭৭।
  • জয়দেব মুখোপাধ্যায়ের গ্রন্থ “কাঁহা গেলে তোমা পাই”, ১৯৭৮।
  • যুধিষ্ঠির জানা (মালীবুড়ো) দ্বারা প্রকাশিত, “শ্রীচৈতন্যের অন্তর্ধান রহস্য” অখণ্ড, ১৯৮৫ এর পরে
  • সুকুমার সেন সম্পাদিত "বাংলা কবিতা সমুচ্চয়" প্রথম খণ্ড, ১৯৯১।
  • শিশিরকুমার দাশ সম্পাদিত "সংসদ বাংলা সাহিত্য সঙ্গী", ২০০৩।
  • সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু সম্পাদিত "সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান", ১ম ও ২য় খণ্ড, ২০১০।
  • ডঃ নিরঞ্জন ধরের প্রবন্ধ সংকলন "অবতার থেকে মানুষ", ২০১৩।
  • নমিতা চৌধুরী ও অনিন্দিতা বসু সান্যাল সম্পাদিত, “মহিলা কবিদের কবিতা সংকলন ১৪০০-২০০০
    দামিনী”, ২০১৩।


কবি মাধবী দাসীর মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন।    
কবি মাধবীর মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন।  


আমাদের ই-মেল -
srimilansengupta@yahoo.co.in     


এই পাতা প্রথম প্রকাশ - ১৯.১০.২০১৪
এই পাতার ১ম পরিবর্ধিত সংস্করণ -
.৮.২০১৭                                                  পাতার উপরে . . .    
*
মাধবী দাসী
পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ – যোড়শ শতাব্দী প্রথমার্ধ
ছোট হরিদাস দণ্ডরূপ শিক্ষা  
সুকুমার সেনের উদ্ধৃতি   
মাধবী দাসীর পদকর্তা হওয়া নিয়ে তর্ক-বিতর্ক   
জগবন্ধু ভদ্রর উদ্ধৃতি   
সতীশচন্দ্র রায়ের জবাবী উদ্ধৃতি     
বিভিন্ন রূপে "মাধব" ভণিতা ও তার অপভ্রংশ    
বৈষ্ণব পদাবলী নিয়ে মিলনসাগরের উদ্দেশ্য   
বৈষ্ণব পদাবলীর রাগ   
উত্স গ্রন্থাবলী     
মিলনসাগরে কেন বৈষ্ণব পদাবলী ?      
*
*
*
*
*
*
*
আমাদের কাছে
কবির  কোনো ছবি নেই | একটি ছবি
এবং আরও তথ্য আমাদের কাছে
পাঠালে আমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে  
প্রেরকের নাম এই পাতায় উল্লেখ করবো |
আমাদের ঠিকানা-
srimilansengupta@yahoo.co.in
এই পাতার কবিতার ভণিতা -
মাধবী দাস
“মাধবী” ভণিতাযুক্ত পদের জন্য
এখানে ক্লিক করুন . . .

*
*