কবি রামী বা রামমণী - বংশ পরম্পরায় বর্ধমান জেলার নান্নুর-এর বাঁশুলী দেবীর মন্দীরের পুজারী
নিযুক্ত হয়েছিলেন সুগায়ক ও কবি চণ্ডীদাস। কবি চণ্ডীদাস ও চৈতন্য-পূর্ব বড়ু চণ্ডীদাস একই ব্যক্তি কি
না তা নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে।   শ্রীকৃষ্ণকীর্তন  গ্রন্থের  সম্পাদক এবং পুঁথির  আবিষ্কারক বসন্তরঞ্জন রায়
বিদ্বদ্ বল্লভ মনে করতেন যে এঁরা একই ব্যক্তি।

ছোটবেলা থেকেই সেই মন্দিরের সেবিকা ছিলেন রামমণী বা রামী। তিনি জাতিতে ছিলেন রজক (ধোপা)।
তাই বিভিন্ন স্থানে রামী কে রজকিনী রামী বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

শৈশবে রামী আহার-অন্বেষণে ঘুরে বেড়াতেন দেখে গ্রামের মানুষ তাঁকে বাঁশুলী দেবীর মন্দিরের সেবিকা
নিযুক্ত করে দিয়েছিলেন। তিনিও কায়মনোবাক্যে দেবীর সেবায় নিজেকে উত্সর্গ করে দিলেন।

কিন্তু ক্রমে চণ্ডীদাসের সাথে তাঁর কামগন্ধহীন প্রেমের (platonic love) সূচনা হয়। চণ্ডীদাসের পদ থেকেই তা
বোঝা যায় যে তিনি রামীকে কখনও মাতা বা কখনও গুরু বলে সম্বোধন করেছিলেন।

চণ্ডীদাস লিখেছিলেন ....
.        শুন রজকিনী রামী
ও-দুটি-চরণ,                শীতল জানিয়া
.        শরণ লইনু আমি।
এক নিবেদন,                করি পুনঃ পুনঃ
.        শুন রজকিনী রামী।

দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর “বঙ্গভাষা ও সাহিত্য” গ্রন্থে (পৃষ্ঠা ২১৭) জানিয়েছেন যে চণ্ডীদাসের মৃত্যু সম্বন্ধে রামীর
রচিত এবং ভণিতাযুক্ত একটি গীতিকা আবিষ্কার করেন, বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্ বল্লভ (১৮৬৫- ১৯৫২)।  
তাতে জানা যাচ্ছে যে চণ্ডীদাস, গৌড়ের নবাবের রাজসভায় গান গাইবার আমন্ত্রণ পেয়ে সেখানে যান। তাঁর
গান শুনে নবাবের বেগম, চণ্ডীদাসের অনুরাগিনী হয়ে পড়েন। এ কথা তিনি নির্ভীকভাবে নবাবের সামনে
স্বীকারও করেন। এরপর ক্রুদ্ধ নবাবের আদেশে চণ্ডীদাসকে, তাঁর অত্মীয় পরিজনদের সমক্ষে হাতির পিঠে
বেঁধে কষাঘাত করা হয়, যার ফলে চণ্ডীদাসের মৃত্যু হয়। এই দৃশ্য রামী ও বেগম দুজনকেই প্রত্যক্ষ করতে
হয়। বেগম এই দৃশ্য দেখে মূর্চ্ছিত হন এবং তাঁর জ্ঞান আর না ফিরলে, তিনি মারা যান। আরো জানা যায়
যে বেগমের প্রতি চণ্ডীদাসও আকৃষ্ট হয়েছিলেন।

“বঙ্গের মহিলা কবি” গ্রন্থের রচয়িতা যোগেনেদ্রনাথ গুপ্ত লিখেছেন যে “....একটি দেশব্যাপী জনশ্রুতি যখন
দুইশত বত্সরের প্রাচীন হস্তলিপি সম্বলিত প্রমাণ দ্বারা সমর্থিত হইতেছে, তখন তাহা আমরা
ঐতিহাসিক সত্য বলিয়া গ্রহণ করিতে বাধা দেখিতেছি না।”

আমরা, মিলনসাগরেও মনে করছি যে এই ঘটনাটি যখন জনস্রুতিতে ছিলই। রামীর পদ আবিষ্কারের পর তা
সত্য বলে ধরে নেওয়া অন্যায় হবে না। সেই মত আমরা রামীকে বাংলারভাষার প্রথম মহিলা কবি হিসেবে
এখানে প্রকাশিত করলাম।

আমরা
মিলনসাগরে কবি রামী বা রামমণির কবিতা তুলে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে এই
প্রচেষ্টার সার্থকতা।

বৈষ্ণব পদাবলীর "রাগ"   
বৈষ্ণব পদাবলীর পদগুলি মূলত গান হিসেবেই রচনা করা হোতো। প্রায় প্রতিটি পদের শুরুতেই সেই পদটির
“রাগ”-এর উল্লেখ থাকে। তবে কিছু পদের আগে তার “রাগ”-এর উল্লেখ নেই এমনও পাওয়া গিয়েছে। বৈষ্ণব
পদাবলীর সংকলকগণ যখন তাঁদের সংকলনে পদ সাজান, তখন পর পর একাধিক গানের যদি একই সুর বা
রাগ থাকে, তাহলে তাঁরা প্রথম গানটিতে তার রাগ উল্লেখ ক’রে পরের গানটিতে রাগের যায়গায় “তথা রাগ”
বা “যথা” শব্দ বসিয়ে দিতেন, এই বোঝাতে যে পরের গানটি একই রাগাশ্রিত। কিন্ত এমনও পাওয়া গিয়েছে
যে একই গান বিভিন্ন সংকলকের সংকলনে ভিন্ন রাগাশ্রিত বলে উল্লেখিত। বহু পদই মুখে মুখে গীত  
অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে।  তাই  একই গান  বিভিন্ন  গায়কের মুখে ভিন্ন ভিন্ন সুরে পাওয়া গিয়ে থাকতেই
পারে। তাই অনেক বিদগ্ধজনেরা মনে করেন যে এখন আর পদের রাগের উল্লেখ না করলেও চলে। যে  
যেমন সুরে চায়, গেয়ে আনন্দ লাভ করলেই এর সার্থকতা। আমরা অবশ্য যে সংকলন থেকে যে পদ  
নিয়েছি, সেই সংকলনে উল্লেখিত রাগটি মিলনসাগরের পাতায় তুলে দিয়েছি। এমন হতে পারে বিশেষজ্ঞরা
অন্য সংকলনে সেই গানটির অন্য রাগ দেখতে পাবেন।
          




কবি রামীর মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক্ করুন

উত্স : যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত, বঙ্গের মহিলা কবি, ১৩৩৭ বঙ্গাব্দ (১৯৩০ খৃষ্টাব্দ)

আমাদের ই-মেল -
srimilansengupta@yahoo.co.in     

এই পাতা প্রকাশ - ২০.৯.২০১১
...