চর্যাগীতি এবং তার আধুনিক বাংলা রূপান্তর
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
*
নিজে রচনা করে করে ভব-নির্বাণ |
মিছে লোক বাঁধে আপনাকে  ||
আমরা জানিনা অচিন্ত্যযোগীরা  |
জন্ম-মরণ-ভব কিভাবে হয়  ||
যেরূপ জন্ম, মরণও সেরূপ  |
জীবন্তে মৃতে বিশেষ নাই  ||
যার এখানে জন্ম মরণেরও শঙ্কা |
সে করুক রস-রসায়নের আকাঙ্খা  ||
যিনি সচরাচর ত্রিদশ১  ভ্রমণ করেন |
তিনি অজরামর কোনোরূপে হবেন না ||
জন্মে কর্ম না কর্মে জন্ম |
সরহ বলেন, অচিন্ত্য সেই ধাম ||



১ বাল্য-কৈশোর -যৌবন  অথবা জন্ম - মৃত্যু - স্থিতি  


.            ****************                                   
র্যাগীতির সূচি   
চর্যাগীতি
কবি সরহপাদ    

২২. রাগ গুঞ্জরী |  সরহপাদানাম্ |
অপণে রচি রচি ভব নির্বাণা  |
মিছেঁ লোঅ বন্ধাবএ অপণা  || ধ্রু ||
অম্ভে ন জানহূঁ অচিন্ত জোই  |
জাম-মরণ-ভব কইসণ হোই  || ধ্রু ||
জইসো জাম মরণ বি তইসো  |
জীবন্তে মঅলেঁ নাহি বিশেসো  || ধ্রু||
জা এথু জাম মরণে বি সঙ্কা  |
সো করউ রস-রসাণেরে কংখা || ধ্রু ||
জে সচরাচর তিঅস ভমন্তি |
তে অজরামর কিম্পি ন হোন্তি || ধ্রু ||
জামে কাম কি কামে জাম  |
সরহ ভণতি অচিন্ত সো ধাম || ধ্রু||
*
যদি তুমি ভুসুকু শিকারে যাবে, মেরো সেই পাঁচজনকে |
নলিনীবনে প্রবেশ করতে হোয়ো একমনা  ||
জীবন্ত হল প্রভাত , মরল রজনী |
হনন-বিনা মাংসের জন্য ভুসুকু পদ্মবনে প্রবেশ করল  ||
মায়াজাল প্রসারিত করে রে বাঁধল মায়াহরিণী |
সদ্ গুরুর বোধে বুঝি রে, কার কাহিনী  ||




.            ****************                  
র্যাগীতির সূচি   
চর্যাগীতি
কবি ভুসুকুপাদ     

২৩. রাগ বরাড়ী | ভুসুকুপাদানাম্ |
জই তুহ্মে ভুসুকু অহেই জাইবেঁ মারিহ সি পঞ্চজণা  |
নলণীবন পইসন্তে হোহিসি একুমনা  || ধ্রু ||
জীবন্তে ভেলা বিহণি মএল ণঅণি  |
হণ বিণু মাংসে ভুসুকু পদ্মবন পইসহিণি ||ধ্রু ||
মাআজাল পসরিউ রে বাধেলি মা আহরিণী  |
সদ্ গুরুবোহেঁ বুঝি রে কাসু কহিনি  || ধ্রু ||১
*
নিশি আঁধার, মুষার চারণা |
অমিয় ভক্ষণ করে মূষা, করে আহার  ||
মার রে যোগী, মুষা-পবনকে |
যেন টুটে যায় অবনাগমন ||
ভব বিদারণ করে মুষা , খোঁড়ে গর্ত |
চঞ্চল মুষিক জেনে (তার) নাশক  হও ||
কাল মুষা , অনুভূত হয়না বর্ণ |
গগনে উঠে চরে আমন ধান (--এর মাঠে) ||
তবু সে মুষা উঞ্চল- পাঞ্চল১ |
সদ্ গুরুর বুদ্ধিতে কোরো তাকে নিশ্চল ||
যখন মুষার আচার টুটবে  |
ভুসুকু বলেন, তবে বাঁধন কাটবে ||



১ অস্থির  


.           ****************                                   
র্যাগীতির সূচি
চর্যাগীতি
কবি ভুসুকুপাদ    

২১. রাগ বরাড়ী | ভুসুকুপাদানাম্ |
চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ
চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ
চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ
*
তুলা ধুনে ধুনে আঁশ রে আঁশ  |
আঁশ ধুনে ধুনে নিরবয়ব শেষে ||
তবু সেই হেতু পাবেনা |
শান্তি বলেন , কেন সেরূপ ভাবা হয়  ||
তুলা ধুনে ধুনে শূন্যকে আহার করালাম  |
পুনর্বার নিয়ে নিজের মধ্যে চটিয়ে দিলাম১ ||
বিস্তৃত বর্ত , দুই মার্গ দেখা যায়না |
শান্তি বলেন , কেশাগ্র প্রবেশ করেনা ||
না কাজ না কারণ, ---যার এরূপ যুক্তি |
(তাকে ) স্বসংবেদন বলেন শান্তি  ||


১ আত্মলীন করে দিলাম |



.        ****************                                       
র্যাগীতির সূচি   
চর্যাগীতি
কবি শান্তিপাদ     

২৬. রাগ শীবরী | শান্তিপাদানাম্ |
তুলা ধুণি ধুণি আঁসুরে আঁসু |
আঁসু ধুণি ধুণি ণিরবর সেসু  || ধ্রু ||
তউ যে হেরুঅ ণ পাবিঅই |
সান্তি ভণই কিণ স ভাবিঅই ||ধ্রু ||
তুলা ধুণি ধুণি সুনে অহারিউ  |
পুণ  লইআ অপণা চটারিউ || ধ্রু||
বহল বট দুই মার ন দিশঅ |
সান্তি ভণই বালাগ ন পইসঅ  ||ধ্রু ||
কাজ ন কারণ জ এহু জুঅতি |
সঁএঁসংবেঅণ বোলথি সান্তি || ধ্রু ||
চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ
*
অর্ধরাত্রি ভরে কমল বিকশিত হল  |
বত্রিশ যোগিনী তাদের অঙ্গ উল্লসিত করল  ||
চালিত হল শশধর অবধূতি মার্গে  |
রত্ন (প্রভাব ) হেতু সহজকে কহে  ||
চালিত শশধর গেল নির্বাণে  |
কমলিনী কমল (রসে ) বহে পদ্মনালে  ||
বিরমানন্দ বিলক্ষণ শুদ্ধ  |
যিনি এরূপ বোঝেন তিনি এখানে বুদ্ধ ||
ভুসুকু বলেন, আমি মিলনের দ্বারা বুঝলাম  |
সহজানন্দ মহাসুখলীলায়  ||



.       ****************                                       
র্যাগীতির সূচি   
চর্যাগীতি
কবি ভুসুকুপাদ    

২৭. রাগ কামোদ | ভুসুকুপাদানাম্ |
অধরাতি ভর কমল বিকসউ  |
বতিস যোইণী তসু অঙ্গ উহ্লসিউ ||ধ্রু ||
চালিউঅ ষষহর মাগে অবধূই |
রঅণহু ষহজে কহেই  || ধ্রু||
চালিঅ ষষহর গউ নিবাণেঁ |
কমলিনি কমল বহই পণালেঁ || ধ্রু ||
বিরমানন্দ বিলক্ষণ সুধ |
জো এথু বুঝই সো এথু বুধ || ধ্রু||
ভুসুকু ভণই মই বুঝিঅ মেলেঁ |
সহজানন্দ মহাসুহ লীলেঁ || ধ্রু ||
চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ
*
উঁচু উঁচু পর্বত, সেখানে বাস করে শবরী--বালিকা |
ময়ূরপুচ্ছ পরিহিত শবরী  | গলায় গুঞ্জরী--মালিকা ||
উন্মত্ত শবর, পাগল শবর, না করিস গোল, দোহাই তোর |
নিজ ঘরণী নামে ( ও হল ) সহজসুন্দরী  ||
নানা তরুবর মুকুলিত হল, গগনে লাগল ডাল  |
একলা শবর এ-বনে ঢোঁড়ে, কর্ণকুন্ডলবজ্রধারী  ||
ত্রিধাতুখাট পাতল শবর, মহাসুখে শয্যা ছাইল  |
শবর ভুজঙ্গ১ , নৈরাত্মা দারী২, প্রেমে রাত পোহাল  ||
চিত্ত-তাম্বুল মহাসুখে কর্পূর খায়  |
শূন্য-নৈরাত্মাকে কন্ঠে নিয়ে মহাসুখে রাত পোহায়  ||
গুরুবাক্--ধনুকে বিদ্ধকর, নিজমন--বাণের দ্বারা  |
এক শরসন্ধানে বিদ্ধকর, বিদ্ধকর পরম নির্বাণকে ||
গুরু রোষে শবর উন্মত্ত |
গিরিবর-শিখর-সন্ধিতে প্রবেশ করে, শবর লড়বে কিরূপে ||


১ নাগর                                          
২ বারবণিতা


.       ****************                                       
র্যাগীতির সূচি   
চর্যাগীতি
কবি শবরপাদ      

২৮. রাগ বল্লাড্ডি | শবরপাদানাম্ |
উঞ্চা উঞ্চা পাবত তঁহি বসই সবরীবালী  |
মোরঙ্গি পীচ্ছ পরহিণ সবরী গিবত গুঞ্জরী মালী  || ধ্রু ||
উমত সবরো পাগল শবরো মা কর গুলী গুহাডা তোহৌরী  |
নিঅ ঘরিণী ণামে সহজ সুন্দারী  || ধ্রু ||
ণাণা তরুবর মৌলিলরে গঅণত লাগেলি ডালী  |
একেলী সবরী এ বণ হিন্ডই কর্ণ্ণকুন্ডলবজ্রধারী   || ধ্রু ||
তিঅ ধাউ খাট পড়িলা সবরো মহাসুহে সেজি ছাইলী  |
সবরো ভুজঙ্গ ণইরামণি দারী পেহ্ম রাতি পোহাইলী  || ধ্রু ||
হিঅ তাঁবোলা মহাসুহে কাপুর খাই |
সুন নিরামণি কন্ঠে লইআ মহাসুহে রাতি পোহাই  || ধ্রু ||
গুরুবাক পুঞ্চআ বিন্ধ ণিঅমণে বাণেঁ |
একে সরসন্ধাণেঁ বিন্ধহ বিন্ধহ পরম নিবাণেঁ  || ধ্রু ||
উমত সবরো গরুআ রোসে  |
গিরিবরসিহরসন্ধি পইসন্তে সবরো লোড়িব কইসেঁ  || ধ্রু ||
চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ
*
ভাব হয়না, অভাব যায় না  |
এরূপ সংবোধে১ কে প্রত্যয় করে ||
লূই বলেন, বিজ্ঞান দুর্লক্ষ বটে |
ত্রিধাতুতে বিলাস করে, ওখানে নেই ঠাঁই ||
যার বর্ণ, চিহ্ন, রূপ জানা নেই |
তাকে কিভাবে আগম-বেদ দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায় ||
কাকে কি বলে আমি দেব প্রশ্ন (-এর উত্তর )  |
উদকের চাঁদ যেমন সত্য, না মিথ্যা (? ) ||
লূই বলেন, আমি ভাব্ ব কিরূপে |
যা নিয়ে আছি, তার উদ্দেশ না দেখা যায় ||



১ ব্যাখ্যাতে |

.       ****************                                   
র্যাগীতির সূচি   
চর্যাগীতি
কবি লুইপাদ    

২৯. রাগ পটমঞ্জরী | লুইপাদানাম্ |
ভাব ন হোই অভাব ণ  জাই |
আইস সংবোহেঁ কো পতিআই ||ধ্রু||
লুই ভণই বট দুলর্কখ বিণাণা  |
তিঅধাএ বিলসই উহ ণ ঠাণা  || ধ্রু ||
জাহের বান চিহ্ন রূব ণ জাণী  |
সো কইসে আগম বেএঁ বখাণী || ধ্রু||
কাহেরে কিষভণি মই দিবি পিরিচ্ছা |
উদক চান্দ জিম সাচ ন মিছা || ধ্রু ||
লূই ভণই মই ভাইব কীষ |
জা লই অচ্ছম তাহের উহ ণ দিস ||ধ্রু ||
চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ
*
করুণা-মেঘ নিরন্তর স্ফুরিত |
ভাবাভাব দ্বন্দ্বকে দলিত ক’রে ||
উদিত গগণ মাঝে অদ্ভুত |
দেখ, রে ভুসুকু , সহজ স্বরূপ ||
যা শুনে টুটে ইন্দ্রজাল  |
নিভৃত রে নিজমন , না দেয় উল্লাস ||
বিষয়বিশুদ্ধি থেকে আমি বুঝলাম আনন্দে |
গগনে যেমন উজ্জ্বলিত হয় চাঁদ ||
এই  ত্রৈলোক্যে এই হল সার |
যোগী ভুসুকু বিদীর্ণ করে অন্ধকার ||




.       ****************                                       
র্যাগীতির সূচি   
চর্যাগীতি
কবি ভুসুকুপাদ  

৩০. রাগ মল্লারী | ভুসুকুপাদানাম্ |
করুণ মেহ নিরন্তর ফরিআ |
ভাবাভাব দ্বংদ্বল দলিআ  || ধ্রু ||
উইত্তা গঅণ মাঝেঁ অদভুআ  |
পেখরে ভুসুকু সহজ সরূআ  || ধ্রু||
জাসু সুনন্তে তুট্টই ইন্দিআল |
নিহু রে নিঅমণ ণ দে উলাস || ধ্রু ||
বিসঅবিশুদ্ধিঁ মই বুঝ্ ঝিঅ আনন্দে |
গঅণহ জিন উজোলি চান্দে  || ধ্রু||
এ তৈলোএ এত বিষারা  |
জোই ভুসুকু  হেভ্ভই অন্ধকারা || ধ্রু ||
চর্যাগীতির আধুনিক বাংলা রূপ
নিসিঅ অন্ধারী মুসা চটারা  |
অমিঅ ভখঅ মুসা করঅ আহারা  || ধ্রু ||
মার রে জোইআ মুসা পবণা  |
জেঁ ণ তুটঅ অবণা গবণা  || ধ্রু ||
ভব বিন্দারঅ মুসা খণঅ গাতী |
চঞ্চল মুসা কলিআঁ নাশক থাতী || ধ্রু ||
কাল মুষা উহ ণ বাণ  |
গঅণে উঠি চরঅ অমণ ধাণ || ধ্রু ||
তব সে মুষা উঞ্চল পাঞ্চল   |
সদ্ গুরু বোহে করিহ সো ণিচ্চল  || ধ্রু ||
জবেঁ মুষাএর অচার তুটঅ |
ভুসুকু ভণঅ তবেঁ বান্ধন ফিটঅ || ধ্রু ||
১ এরপর তিনটি পাতা পাওয়া যায়নি তার ফলে ২৩নং গীতের শেষ
চার পংক্তি এবং ২৪,২৫ ---সংখ্যক গীত দুটি পাওয়া যায়নি |