কবি দেবব্রত সান্যালের কবিতা
*
নিজের খেয়াল খুব রাখছি
কবি দেবব্রত সান্যাল
“নিজের খেয়াল খুব রাখছি” কাব্যগ্রন্থ থেকে

এইতো কাজের  মাসি সক্কাল সক্কাল এসে আকাশটা তকতকে করে
মুছে গিয়ে ছিল,
আবার জল ঢালছো ?
ছিস্টির কাজ এখনো বাকি !
গতরটা একটু নাড়াও, আসে পাশে নজর ফেলো।
কাঁকুড়গাছির সিগনালে ফোর্ড ফিয়েস্টা গাড়ির তোলা কাঁচের
এপারে দাঁড়িয়ে হাত মেলে থাকা বালিকাটিকে বল',
আর দেরী নয়, এবার স্কুলের বাসটা নির্ঘাত মিস হয়ে যাবে।
শেখার যে অনেক বাঁকি।   
মল্লিক বাজারের রাস্তার ওপর যে ছেলেটি ঘষে ঘষে গাড়িটা মুছছে ,
তাকে একটু বলো  ওভাবে কি আর ঝকঝকে ভবিষ্যত পাওয়া যায়।
আর্তনাদ করতে করতে যে অ্যাম্বুলেন্সটা এন্টালিতে ছটফট  কোরছে ,
তাকে বোঝাও, এ উত্সবের শহরে চিত্কার করতে নেই ,
সবে ইলিশ উত্সব সেরে, নৈশ ফুটবলে ব্যস্ত এই শহর।
পুজোর আর কদ্দিনই বাঁকি, এখনই প্যান্ট সেলাই করতে দিলে দর্জিরাও মুখ বাঁকাচ্ছে।
সবাইকে এমন নিরক্ষর , বিবস্ত্র, অসহায় করে,
স্লেট মুছে পাঠাও কেন ?
রোজ সকালে ভেজা চুলে তোমার ফোটোর  সামনে
ধুপ কাঠি জ্বালবো বলে ?
সরকারী বলে আর শনিবারে ছুটি নিও না, একটু দেখো।         
আমার জন্য এক্কেবারে চিন্তা কোরোনা
আমি সাফোলা, ডায়েট কোক আর ব্রাউন ব্রেড খেয়ে
নিজের খেয়াল খুব রাখছি।

.           *************************      
.                                                                                        
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর   
*
বহ্নিশিখা
কবি দেবব্রত সান্যাল
“নিজের খেয়াল খুব রাখছি” কাব্যগ্রন্থ থেকে

কোরাস : হে নির্যাতিতা নারী, এখন থেকে  তোমার নব জন্ম হলো। তোমার নাকে মুখের
নল গুলো খুলে দেবার পর তোমার যখন নতুন করে অন্নপ্রাশন হলো, তার সাথেই তোমার নতুন
নামকরণ হোল বহ্নিশিখা।

নারী : বহ্নিশিখা! আমার পুরনো নামটা তো ভালই ছিল। ওই নামেই তো ডেকে, রোজ সকালে মা
আমার ঘুম ভাঙাত'। আমাদের পোষা টিয়াটা, ও ও আমার নাম ধরে ডাকত আর ব'লত, "পড়তে
বোসো"।

কোরাস : সে নামে তোমাকে আর ডাকা যাবে না। সে নামের সাথে তোমার, তোমার পরিবারের
সবার অনেক লজ্জা জড়িয়ে আছে।

নারী : লজ্জা! যারা আমাকে আঘাত করে - আপমান করে পুলিস, ডাক্তার আর রিপোর্টারদের
মধ্যে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে পালিয়ে গেলো, তারা তো আমার নামও জানত না। তাহলে ওরা আমার
নামটা নোংরা করে দিলো কি করে?

কোরাস : ভুলে যাও পুরনো নাম, নতুন পরিচয়ে নতুন করে বাঁচো।

নারী : আবার যদি কলেজ থেকে ফেরার পথে, অন্ধকারের সুযোগে আরেক দল নেকড়ে লাফিয়ে
পড়ে। তোমরা আবার আমার নতুন নাম দেবে? নাকি ভ্রুকুটি করে বলবে, নষ্ট মেয়ে, তোর্ সাথেই
বার বার কেন? মেয়েরা তো গাছের ফল, পোকা লাগলেই নষ্ট।

কোরাস : আমাদের ভুল বুঝনা। আমরা তোমার যন্ত্রনা বুঝি।

নারী : বোঝো! সত্যি। আমি তো তোমাদের একদম বুঝি না। ভুল - ঠিক কিচ্ছু না।
কোরাস : আমরা তোমার সাথে আছি, বহ্নিশিখা। তোমার জন্য আমরা মোমবাতি হাতে হেঁটেছি,
প্রতিবাদের গান গেয়েছি, ছবিতে ছবিতে দেয়াল ভরিয়েছি ।

নারী : তোমাদের সে মোমবাতির আলো আমাদের গ্রামে পৌঁছায়নি। আমাদের যাতায়াতের পথ
এখনো অন্ধকার আর তোমাদের পথে, আলোর নীচেই বাহারি আলোর ত্রিশূল। তোমরা সবাই
আমার নির্যাতনের ছবি আঁকলে, কি নিষ্ঠুর সব কালো কালো থাবার ছবি। কই আমার কালকের
সেই জীবনটা, যা তোমাদের  দেয়া এই নতুন নাম নিয়ে সুন্দর হবে, সেই ছবিতো একটাও দেখলাম
না।

কোরাস : বাঁচতে শেখো বহ্নিশিখা, বাঁচতে বড় সুখ। সময়ের ঠান্ডা মলমে সব জ্বালা জুড়াবে,
বাঁচার আনন্দে বাঁচো  বহ্নিশিখা।

নারী : কি করে আর সাধারণ হয়ে বাঁচি ? তোমরা যে আমাকে বহ্নিশিখা বানালে!
আগুন জ্বালানই এখন আমার জীবন। আমি যে আগুন জ্বালাব, সেই আগুনে পুড়ে সব শুদ্ধ হোক,
পবিত্র হোক।

.                                *************************      
.                                                                                        
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর   
*
মেয়ের মতো
কবি দেবব্রত সান্যাল
“নিজের খেয়াল খুব রাখছি” কাব্যগ্রন্থ থেকে

সবাই  বলে মিঠু ছোটো পিসির মেয়ের মতো  ,
অর্থাৎ পিসির জন্য রান্না করে,
ওষুধ খাবার কথা মনে করিয়ে দেয় ,
ধোপার হিসেব রাখে ,পাশে বসে মা সিরিয়াল দেখে।
আর পিসির বিবাহিত মেয়ে ঝুমা দেখা করতে এলে,
চায়ের সাথে এগরোল , মোগলাই পরোটা বানিয়ে খাওয়ায় ,
নাতনির গান শোনে , আবদার ও ,
জামাইবাবুকে  বার বার চা করে দেয় ,
জামাইবাবু রসিকতার ছলে গায়ে হাত দিলে ও
শালীর মতই মানিয়ে নেয়।
এক কথায় একজন অবিবাহিত মেয়ের
দায়িত্ব, কর্তব্য সবই করে।

পিসিরও ওকে ছাড়া একটুও চলেনা,
সব জায়গায় সাথে করে নিয়ে যায় ,
ঝুমার পোশাক বেশী পুরনো হবার আগেই
মিঠুকে দিয়ে দেয়।
মিঠুর মাইনে মাসে মাসে ব্যাঙ্কে জমিয়ে দেয়।

এখন পিসির একটা কর্তব্যই বাঁকি - মিঠুর বিয়ে।
পাত্র তো হাতেই আছে, ড্রাইভার বাবুলাল,
ঘরের মেয়ে ঘরেই থাকলো ,
আর বাবুলালও তো প্রায় ছেলেরই মতো।


.             *************************      
.                                                                                        
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর   
*
আমার মৃত্যুর জন্য - কেউ দায়ী নয়
কবি দেবব্রত সান্যাল
“নিজের খেয়াল খুব রাখছি” কাব্যগ্রন্থ থেকে

আমার মৃত্যুর জন্য -
না কেউ দায়ী নয়।
যারা আমার বেঁচে থাকার ইচ্ছে গুলোকে,
মেলায় বন্দুক দিয়ে বেলুন ফাটাবার ছেলেমানুষী উল্লাসে নষ্ট করেছে
.                                                           তারা নয়।
যারা দুধে জল মেশাবার চাতুর্যে হাওয়ায় বিষ মিশিয়ে
আমার ফুসফুসে নোংরা হাত মোছার
ছাপ ফেলেছে                                                                   
.                                                           তারাও  নয়।
যারা হোলি খেলার গতানুগতিক উত্সাহে
আমার জীবনকে রঙিন করার ছলে ময়লা করেছে
.                                                           তারাও নয়।

মরে যাওয়াটা তো ঠিক ছিল সেদিন থেকেই ,
যখন বেঁচে থাকাটা কি, তাই জানা ছিল না।
সেই নিশ্চিত মরে যাবার আগে
জীবনের হাত ছুঁয়ে অন্তত একবার 'ভালো থেক' বলে যাওয়া ,
এক নি;স্বার্থ শুভেচ্ছা,
এরপর হাসি মুখে , মালার ফসিলের সাথে দেয়ালের গায়ে ,
অনন্তকাল সুখী থাকার বিজ্ঞাপন।

.             *************************      
.                                                                                        
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর   
*
আসবে
কবি দেবব্রত সান্যাল
“নিজের খেয়াল খুব রাখছি” কাব্যগ্রন্থ থেকে

"চলে এসো",  বোলে যদি ডাকি
.                       তবে আসবে ?
কোনো প্রস্তুতি না থাক
চুল বাঁধা, শাড়ী বদলানো
.                না গোছানো থাক বাক্স।
শুধু পায়ে চটি গলিয়ে নিতে
যতটা সময় চাই
.                     ততটাই যদি দিই?
.                                আসবে?
গন্তব্যের ঠিকানা না থাক -
বর্তমানের নিশ্চয়তা, ভবিষ্যতের আশ্বাস ,
না থাক অতীতের সঞ্চয় -
শুধু আমার বাড়িয়ে দেয়া হাতে তোমার হাত ,
পায়ের তলায় পৃথিবী
আর আজীবন সাথে চলার সঙ্কল্প
এই সব -
বলো আসবে ?

.             *************************      
.                                                                                        
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর   
*
ভিতু
কবি দেবব্রত সান্যাল
“নিজের খেয়াল খুব রাখছি” কাব্যগ্রন্থ থেকে

আমি সেই  ভিতু ছেলেটি, যে যাত্রা পথে স্টেশন এলে ভয় পেত ,
এই বুঝি তার  নতুন পাওয়া বন্ধুটি  নেমে হারিয়ে যাবে।
আমিই সেই, "যদি ভুল ভাবে" ভেবে কখনই,
সেই প্রথম দিন লাল পাড় শাড়ী পরা
সদ্য বড় হয়ে ওঠা কিশোরীকে বলতে পারেনি
"কাল রাতে তোমাকে স্বপ্নে দেখেছি।"
সেই ভয়, যদি অংকে বেশী নম্বর পেয়েছি বলে
সবাই চাপ দিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি করে দেয়।
এখন সেই ভিতু ছেলেটা বড় হয়েছে ,
গলায় এখনো খচখচ করে ভয়ের কাঁটা,
কাল আয়নায় হটাত দেখি,
ভিতু ছেলেটা এখন ভিতু লোক হয়ে উঠেছে।

.             *************************      
.                                                                                        
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর   
*
পশুদের এবার একটু খ্যামা দিন
কবি দেবব্রত সান্যাল
“নিজের খেয়াল খুব রাখছি” কাব্যগ্রন্থ থেকে


আর কেনো? পশুদের এবার একটু খ্যামা দিন।

কোনদিন শুনেছেন, তিনটে বাঘ মিলে
একটা বাঘিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পরে,
আপনাদের ভাষায় পাশবিক অত্যাচার করেছে?
এক মাস ধরে ছাগল পুষে তাকে কাঁঠাল পাতা খাইয়ে মোটা করে,
তার পর তার মাংসে ফিস্ট করেছে?
গর্ব করার জন্য মানুষ বা হরিন মেরে
গুহার পাশে সাজানোর জন্য টাঙিয়ে রেখেছে?   

লিখুন না গল্প , কবিতা, প্রতিবাদের গান
দয়া  করে পাশবিক শব্দটাকে একটু সমঝে ব্যবহার করুন।
ভালো থাকুন সুখে থাকুন আপনাদের কৃমি কীটের সভ্যতায়।
শুধু পশুদের এবার একটু খ্যামা দিন।

.             *************************      
.                                                                                        
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর   
*
পশুদের খাওয়ার দেওয়া নিষেধ
কবি দেবব্রত সান্যাল
“নিজের খেয়াল খুব রাখছি” কাব্যগ্রন্থ থেকে

স্যার, দয়া করে পশুদের খাওয়ার দেবেন না ,
এই খাঁচায় পোরা জন্তুদের জন্য
আমাদের চিড়িয়াখানার নিয়মটা একটু কড়া।
জানি স্যার, আপনার সাতটা পোষা কুকুর আছে,
তাদেরও আপনি নিয়মিত মাংস খাওয়ান,
পা চাটার জন্য পোষা বিড়ালকে মাছের কাঁটা,
শেখানো বুলি বলার জন্য পোষা কাকাতুয়াকে ছোলা,
এসব আপনিই যোগান।
ছোবল দেবার জন্য দুধ কলা খাইয়ে কালসাপ
আপনার অনেক পোষা আছে।
আপনার কারখানায় যে মজুরগুলো
দিনরাত গাধার মত খাটে,
তাদের ও আধপেটা খাওয়ার আপনিই তো যোগান!
আপনাকে কি স্যার প্রথম দেখছি ?
প্রতিবছরই তো আপনি একজন অল্পবয়েসী  মহিলাকে সাথে করে আনেন।
মুখগুলো পাল্টায় , ওদের ভাগ্য পাল্টায় না।
জানি স্যার আপনিই আপনার আইন ,
কিন্তু ওই যে, এখানে বেজায় কড়াকড়ি।
তা না হলে আমি কবে আপনাকে
বাঘের খাঁচায় ফেলে খাইয়ে দিতাম !

.             *************************      
.                                                                                        
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর   
*
এতদিন কোথায় ছিলেন
কবি দেবব্রত সান্যাল
“নিজের খেয়াল খুব রাখছি” কাব্যগ্রন্থ থেকে

এতদিন কোথায় ছিলেন ?
এতদিন ?
শুধু তো হাজার বছর, রমণীর মন যে সহস্র বর্ষ সাধনার ধন।
কেমন ছিলাম জানতে চাওনা ?
তোমার পাখির নীড়ের মতো চোখের আশ্রয় ছাড়াই!
কোথায় ?
জানা কি খুব প্রয়োজন ?
ধরে নাও এখানে, ওখানে, অন্য কোনো খানে বা কোথাও নয় ।
থেমে থাকলে যে খোঁজাও থেমে  যায়।   
ছিলেন!
না এই আমি, আমি ছিলাম না।
তবে জেনে রাখো এর পর থেকে আমি আছি , আমি থাকবো।

.                 *************************      
.                                                                                        
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর   
*
সোয়েটার
কবি দেবব্রত সান্যাল
“নিজের খেয়াল খুব রাখছি” কাব্যগ্রন্থ থেকে

শীত আসতে বেজায় আলসেমি করছে,
দেখো আমি তবু আজ সেই সোয়েটারটা পরে এসেছি।
তোমার মনেই নেই হয়ত।
আমি কিন্তু প্রতি বছরের মতো
দুর্গা পূজোর আগেই রোদ খাইয়ে
ন্যাপথলিনের গন্ধ কমানোর কাজটা করে রেখেছি।

কথা বলতে বলতে অভস্ত্য হাতে তুমি যখন
উলের ওপর কাঁটা চালাতে,
তোমাকে কোনো যাদুকরী মনে হোতো।
আমার পিঠে ফেলে যখন আধ তৈরী সোয়েটারের  মাপ ঠিক করতে,
এক আপ্লুত উষ্ণতা আমাকে ঘিরে ফেলত।

আজ এতদিন পর যদি আবার প্রশ্ন কর' ভালবাসা মানে কি,
কেনই বা এমন  হলো, ভালবাসার পরিনতি কি ?
বিয়ে না বিচ্ছেদ
পাওয়া না হারানো ?
কি লাভ, আজ তো কোনো পরীক্ষা দেবার নেই,
কারো কাছে কিছু প্রমান করার নেই
এসব নিয়ে না হয় অন্যরা বিবাদ করুক।   
তুমি আরও সুন্দর সুন্দর সোয়েটার বানাও
তোমার বরের জন্য,
নাকি স্যুট ছাড়া ওনার  চলেনা !
আমার কাছে তো ভালবাসা আজ ও
সেই নীল সাদা সোয়েটারে ঘেরা উষ্ণতা ।

.            *************************      
.                                                                                        
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর