কবি দেবেশ ঠাকুরের কবিতা
মোকস্
কবি দেবেশ ঠাকুর

বই কাঁধে দল বেঁধে যাচ্ছে কারা
সব পাওয়ার দল? সর্বহারা?
সিলেবাস ভারে কুঁজো দুব্বোঘাস
কাঁধে পৃথিবীর বোঝা ক্ষুদে এ্যাটলাস।
হিস্ট্রি জিওগ্রাফি নীতিবিজ্ঞান
অংকে আশঙ্কায় নৌকা ভাসান।
ইঁদুরের দৌড়ে ছন্নছাড়া
চক্রব্যুহের মাঝে হায় বেচারা।
ইস্কুলে যাবে না গিলোটিনে?
কেউ কেউ ফিরে আসে রাস্তা চিনে।
সাড়ে সাতটায় স্কুল বিকেলে কোচিং
সন্ধ্যায় দিদিমণি অংক ম্যাচিং।
শনিবার গান শেখা রবিবার নাচ
অ্যাকুয়ারিয়ামে রাখা লাল নীল মাছ।
সুইমিং আছে, আছে আবৃত্তিটাও
ড্রয়িং না শিখলে কচুপোড়া খাও।
যোগ ব্যায়ামের ক্লাস প্রতি রোব্বার
বেস্পতিবার আছে কম্পিউটার।
কেরিয়ার-কেরিয়ার –প্রতিষ্ঠা চাই
কেরিয়ার ছাড়া কিছু অভিধানে নাই।
দেখোনা নীল আকাশ বৈশাখী ঝড়
প্রয়োজনে হতে হয় স্বার্থপর।
ধর্ম-অর্থ-মোকস্ জয়টিকা
মা-বাপ কে ছেড়ে সোজা আমেরিকা।
পিতৃসত্য তরে পঞ্চবটি বন
আজ তার নয়া রূপ ওয়াশিংটন।

.         ****************                 
.                                                                            
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
বর্ণপরিচয়
কবি দেবেশ ঠাকুর

প্রকৃতির খেয়ালিপনায় কোথাও উঁচু পাহাড়, কোথাও সমুদ্র ,
খুব উঁচু পাহাড় কিম্বা খুব গভীর সমুদ্র
প্রায় একসঙ্গে দেখা যায় না
তবু

তুমি আছো বলেই আজও গভীর নিবিড় বর্ণমালা
সন্দিপনী পাঠশালাতে ভুবনমালা – কুন্দমালা
তুমি আছো বলেই সাদা থানের বুকে পলাশ ফোটে
হাজা মজা দহের বুকে জীবন জয়ের তুফান ওঠে
বর্ণপরিচয়ে আমার পুব আকাশে নতুন ভোরে
সূর্য এসে ঘুম ভাঙাবে পর্ণকুটির আলো  করে
তুমি আছো বলে আছে কলম আমার বর্শা হয়ে
উপেক্ষিতার বুকে আছো বেঁচে থাকার ভরসা হয়ে

কন্যাদায় গ্রস্ত এক পিতার আমন্ত্রণে তুমি ভোজনে বসেছিলে ,
অতি কষ্টের আয়োজন , বিদুরের খুদকুঁড়ো ,
হায়রে , তোমার পাতে পড়ল একটি আরশোলা
দু-পাশে উপবিষ্ট অর্কফলা কম্পিত করে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে
জানতে চাইলেন , পাতে ওটি কী!
তুমি কীটটিকে গিলে ফেলে বললে , লঙ্কাভাজা
বাঁচিয়ে দিলে সেই দরিদ্র ব্রাহ্মনের মান
দেনায় জর্জরিত মধুসূদনকে ফিরিয়ে আনলে প্যারিস থেকে
রক্ষা করলে কারান্তরাল থেকে।
মধুসূদনকে বাঁচাওনি, বাঁচাওনি হেনরিয়েটা বা তার সন্তানদের
বাঁচালে বাংলা ভাষাকে, বাংলা সংস্কৃতিকে , ভারতীয় রীতিকে
‘ তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জিথা মা গৃধ কস্যসিদ্ধনম’-
মধুসূদন ঋনশোধ করে লিখলেন,
‘...করুণার সিন্ধু তুমি সেই জানে মনে। দীন যে দীনের বন্ধু’-

শত গালাগাল শত কুৎসা সয়েও
মাথা উঁচু করে বেঁচেছো, বাঁচতে শিখিয়েছো আমাদের
বিধবা বিবাহের বিরুদ্ধে দরখাস্তে দশ হাজার জন স্বাক্ষর করেছিলেন
তাঁরা হারিয়ে গেছেন, যেমন দিনের সূ্র্যালোকে জোনাকি হয় অদৃশ্য

সমালোচনার আঘাতে জর্জরিত , নিন্দিত
তবু নন্দিত আজ বাংলার ঘরে ঘরে
আমার প্রথম প্রেমিক আজো ‘বর্ণপরিচয়’
দুহাতে জড়িয়ে বুকে চুমু খেয়ে আজো কাছে টানি

আদর্শের সঙ্গে সংঘাতে একমাত্র পুত্রকে ত্যাগ করেছ ,
ভয় করোনি পুন্নামের ,
আদর্শের জন্যই সরকারী চাকরি , স্বগ্রাম ,
এমনকি গর্ভধারিণীকেও ত্যাগ করতে পিছপা হওনি
সত্য যে সব লোকাচারের উর্ধে
কে বুঝেছে তোমার মতন !

‘বেঁচে থাকো বিদ্যাসাগর চিরজীবী হয়ে’
প্রতিটি শাড়ির পাড়ে প্রতিটি নারীর জাগরণে
সত্যের সারথ্যে, প্রতিটি নিবিড় যুদ্ধজয়ে
শিক্ষায় আদর্শে, সভ্যতার নব উত্তরণে ।

.              ****************                 
.                                                                            
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
setstats
নির্বাচনী
কবি দেবেশ ঠাকুর

ভোট আসিয়াছে।
আমাদের সাত ঋতু – গ্রীষ্ম বর্ষা শরৎ হেমন্ত শীত বসন্ত ও ভোট
ভোট বসন্ত অপেক্ষা রঙিন ও বর্ণময়
বর্ষা অপেক্ষা বর্ষণমুখর
গ্রীষ্ম অপেক্ষা অগ্নিময়
এতো মিথ্যাচার লিপিবদ্ধ হইলে কোটি পর্ব
মহাভারত রচনা করিতেন বেদো – ব্যাস
যুধিষ্ঠির মহাপ্রস্থানের পথে সর্বাগ্রে দেহত্যাগ করিতেন ,
মিথ্যা নির্বাচনের সদাব্রত , কুৎসা অনুব্রত

নির্বাচন রাজসূয়
শুয়োরের মাংসের মত ব্যবহৃত হতে হতে –
অথবা অশ্বমেধ, খচ্চর জিতিয়া ঘোড়া হয়,
শোনপুর মেলায় তারা ক্রীত হয় , বিকৃতও হয়
নির্বাচন আছে তাই নরক দেখিতে পায়  দান্তে ভার্জিন ,
নির্বাচন আছে তাই প্রনামী ছাড়াই হয় দেব – দর্শন
জনগণেশের মধ্যে ভয় বাসা বাঁধে , বুথকেন্দ্র কারগিল ,
বীরের আস্ফালন, আবিরের আকাশ রামধনু
লাল সবুজ নীল গৈরিকের বড়ো হুড়াহুড়ি
চা- তক কখনো যায়, কখনো ঘা – তক

কেউ না জানিতে পারে আত্মপরিচয়
বড়ো ভয় বড়ো ভয় বড়ো বেশি ভয়
ভোটার খাইবে যত মানুষ নিচয় -

.           ****************                 
.                                                                            
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
অইখানে যেওনাকো তুমি
কবি দেবেশ ঠাকুর
হোক কলরব আন্দোলনের প্রেক্ষিতে লেখা। কবিতাটি হোক কলরবের কবিতার দেয়ালেও
রয়েছে।

অভিজিৎ!
ওইখানে যেওনাকো তুমি
কথা কয়ো নাকো অই বালকের সাথে
কি কথা ওদের সাথে, উহাদের সাথে
অই সব চপলমতি অর্বাচীন তরল প্রকৃতি
নব শ্মশ্রু কিশোরের সাথে

তোমার হৃদয় আজ সমুদ্রের ঢেউ
তোমার দুমুঠোতে আজ ভাদর আকাশ
নীল-সাদা আকাশের গায়ে
দেবদ্যুতি মরালীর ছায়া

কতগুলি ব্রিজ পার হয়ে
তুমি ধরেছ গেলাস
দুর্গাপুর দামোদর
হাওড়া থেকে ঢাকুরিয়া ব্রিজ
গেলাস ঠোঁটের মধ্যে সামান্য ফারাক
যে টুকু ফারাক থাকে মানুষে- নবান্নে
অভিজিৎ তোমার হৃদয় আজ ঘাস
তোমার হৃদয় ঘাসফুল

.           ****************                 
.                                                                            
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
মঙ্গলবার...রাত দু’টো
কবি দেবেশ ঠাকুর
হোক কলরব আন্দোলনের প্রেক্ষিতে লেখা। কবিতাটি হোক কলরবের কবিতার দেয়ালেও
রয়েছে।

সাবাস পুলিশ! পেটাও ওদের অন্ধকারে
হিঁচড়ে টেনে লাথিকষাও
( হিজড়ে গুলোর বন্ধকী ধন মেরুদণ্ড – বঙ্গভূষণ ) মেরে ফাটাও
ফোটায় যারা শিমুলতুলো
কুড়ি টাকার আলু যখন বাজার উধাও
কুড়ি টাকায় বোনলেস সাত চিকেন চাপ্ –ও অভিমন্যু একাই লড়ে একাকারে
কুড়ি টাকায় খরিদ হবে মেয়ের বাপ্- ও?
তোদের দেখে হৃৎপিণ্ডে বলিভিয়া
মনে হচ্ছে আবার ফিরি যযাতিতে
উট পাখি আর শামুক হয়েই থাকতে হবে!
কবে আবার ফিরব মানব প্রজাতিতে?

ফুল নয় রে মুঠো ভরে অঙ্গার দিই

মুঠো খুলে দ্যাখ দধীচি বজ্র পাঠায়
প্রতি বিন্দু রক্তে তোদের ফিনিক্স পাখি
রাষ্ট্র যতই ক্রোধে তোদের অঙ্গ ফাটায়-

.               ****************                 
.                                                                            
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
গীতশ্রী
কবি দেবেশ ঠাকুর
হোক কলরব আন্দোলনের প্রেক্ষিতে লেখা। কবিতাটি হোক কলরবের কবিতার দেয়ালেও
রয়েছে।

তোর জন্যে শ্রদ্ধায় নিচু হচ্ছে মাথা
যেভাবে অনায়াসে হাসিমুখে ফিরিয়ে দিলি পদক
আমরা যারা খেতাব কিনতে ঘাড়কুঁজো সব শব
আমরা যারা ‘রত্ন’ পেতে ডোবায় দিচ্ছি ডুব
তুই যে কেন আকাশ ফুঁড়ে বর্শা হতে গেলি!
কোন সাহসে ভুবনমালা- কুন্দমালা হলি!
যেখানে যে ছা- পোষা ক্লীব গোষ্ঠ- পাদ দেশে
আপোস করতে করতে যারা পা-পোষ হয়ে যায়
তোকে দেখে খুলে ফেলবে উলের বাঁদর টুপি
নাচতে নাচতে গীতশ্রীকে দেখেই অংক শুরু
এই মেয়েটা কী হারাবে করে খাওয়ার যুগে!
হায়রে আমার সীতা- স্বদেশ বেহুলা – বাংলা।
করে খাওয়ার চর্যাপদে লড়ে বাঁচার মেয়ে।

.               ****************                 
.                                                                            
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
পাঠানকোট ১
কবি দেবেশ ঠাকুর
১.১.২০১৬ তারিখের পাঠানকোটের জঙ্গী হামলায় জবানদের বলিদানের প্রেক্ষিতে লেখা।

যারা যারা লড়তে যাচ্ছে পরের ভোটে
একবারটি যেতেই হবে পাঠানকোটে
একবারটি দেখতে হবে রক্তমাটি
নির্বাচনে গড়ের খেলা গড়ের মাঠে

পুত্রহারা বাবার চোখে রক্তপলাশ
পিতৃহারা সন্তানদের তত্ত্বতালাস
শহিদজায়া বৈতরণী নিচ্ছে জপে?
একবার হও মুখোমুখি পাঠানকোটে

যার যা গেল ফিরিয়ে দেবে রাষ্ট্রনীতি?
গানস্যালুটে  একমিনিটের নীরব স্মৃতি!
কয়মরণের ইক্যুয়েশনে পদ্মফোটে
সীমান্তে আয় সীমন্তিকার পাঠানকোটে

আর কতদিন দেশপ্রেমে স্বাধীনতা?
আর কতদিন নিজের দেশে আলোকলতা!
আর কতদিন আইনসভায় প্রশ্ন ওঠে
উত্তর কি মিলতে পারে পাঠানকোটে!

পাঠানকোটে নিরাপত্তার রঙিন ফানুস
কেমন করে চুপসে গেল দেখছে মানুষ
পাঠানকোটে সংবিধানের মলাট ঢাকা
লজ্জা-স্বদেশ ঘুরিয়ে দেবে কালের চাকা!

.               ****************                 
.                                                                            
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
পাঠানকোট ২
কবি দেবেশ ঠাকুর
১.১.২০১৬ তারিখের পাঠানকোটের জঙ্গী হামলায় জবানদের বলিদানের প্রেক্ষিতে লেখা।

তোমাদের মৃত্যুতে
লজ্জায়
মরেছে বিশ্বাস
মজ্জায়
ভুলবো শহিদের
প্রাণদান?
বাঁচলো রাষ্ট্রের
খানদান!
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক জিরিয়ে
কী দামে দেবে প্রাণ
ফিরিয়ে?
শিখণ্ডী রাষ্ট্রের
সামনে
খাদ্য দিয়েছিস
দাম-নে

এ মহাজীবনের কর্জ
মরণে দধীচির বজ্র-

.     ****************                 
.                                                                            
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
নিলামবালা পাঁচ পাঁচ লাখ
কবি দেবেশ ঠাকুর

শীতের রাতে ওম নিচ্ছে নিম আঁচে কে!
মন্ত্রী নেতা কিনতে পারো লাখ পাঁচেকে

ভিক্ষুকেরও মর্যাদা আজ স্ব-স্বীকৃত
বারাঙ্গানাও অনেকখানি অবিক্রীত

লাখ পাঁচেকে কিনবে নেতার ঘিলু-মগজ?
কেঁচোর মত শিরদাঁড়া যার ময়লা কাগজ!

যাদের ভাবছো শুভ্রপালক, অবোধ বালক
নালক ভাবছো? এরা সবাই এঁটো না-লোক

শ্রমে ফসল ফলায় চাষি কতটা লাভ!
নেতা-মন্ত্রীর গর্ভ সরেস শাঁসাল ডাব।

ইন্দোরে যে গান-বাহারী, হিপ নাচে কে?
নীলনয়নী হাওয়াই চটি লাখ পাঁচেকে!

.                ****************                 
.                                                                            
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
রোহিত
কবি দেবেশ ঠাকুর
হায়দেরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রোহিত ভেমুলার আত্মহত্তার পর লেখা

ছেলেটা গেল অভিমানে
চ্যাঁচালো সাথী পরিজন
যায়নি মেরু অভিযানে
আদতে ছিল সে হরিজন?

রাষ্ট্র এখনো বামুন
আই পি সি পরে উপবীত
যতো বলো একটু নামুন
যত যাক ভোট লেপ শীত

রোহিত কি চণ্ডাল- জাত?
চিতা কি দশাশ্বমেধ?
কাশী কি শিখা সঞ্জাত
শাস্ত্র মানে আজও বেদ!

অপেক্ষা ছিল ছোকড়ার
উপেক্ষা কিঞ্চিৎ বেশি
বামুনে নীলা-পোখরাজ
দলিত এখনো ভিনদেশি।

ছেলেটা সরে গেল ম’রে
কোথা গেল সে শুদ্রযুগ
টান কে দেবে গোঁড়া ধরে
জাত তো ভোটের হুজুগ।


.             ****************                 
.                                                                            
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*