একুশ শতক
কবি ডলি দাশগুপ্ত

‘ক্ষান্ত বুড়ির দিদিশাশুড়ির তিন বোন থাকে কালনায়
শাড়িগুলো তারা উনোনে শুকায়, হাঁড়িগুলো রাখে আলনায়।’
এমনি উল্টো কাণ্ড ঘটছে একুশ শতকে এসে,
এও নাকি এক পরিবর্তন উলট-পূরাণ দেশে।
ধাড়ি মেয়েগুলো শাড়ি ছেড়ে দেখ টান মারে ছোট ফ্রকে,
ছোট মেয়েগুলো ফ্রক ছেড়ে শেষে কামিজে শরীর ঢাকে।
ধেড়ে খোকারাও ধরেছে যে আজ হাফ প্যান্ট নাকি বারমুডা!
ছোটরা তাদের লজ্জা ঢাকতে প’রে ফুলপ্যান্ট অকাল বুড্ঢা।

ট্রামে বাসে দেখি তরতাজা ছোট শিশুরাই করে সিট আলা (আলো),
দাদু-দিদারা তো পায় না কল্কে--- প্রবীণ-আসনও বে-দখলা।
শিশুর মায়েরা ফিটফাট সাজে---দেয়না শিশুকে স্নেহের কোল,
শিশুরাও তাই অধিকার বলে আঁকড়ে ধরেছে আসন-কোল।
উলট-পূরাণ দেশেতে এখন এসেছে জোয়ার---পরিবর্তন,
ভালোমন্দের বিচার বিহীন--- ‘স্বাগত’ ‘স্বাগত’ বিবর্তন।

.                     ******************     
.                                                                               
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
কবি ডলি দাশগুপ্তর কবিতা
*
গানের গুঁতো
কবি ডলি দাশগুপ্ত

গান নয়, গান নয়,
gun-এর গুঁতো রে।
রবীন্দ্র গানে সুর
তোলে “রহমান”রে।
ভয়হীন চিতে আজ
গান গান এ নিলাজ ;
নিজেরে সম্রাট ভাবে
গানের এ জগতে।
ভাষা ও সুরের ঘায়
ছিঁড়ে খুঁড়ে গীতিকায়
হনন করেছে যে রে
সঙ্গীত রাজারে।

.  ******************     
.                                                                               
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
জন্মদিন
কবি ডলি দাশগুপ্ত

জন্মদিন জন্মদিন
তা-ধিন্ ধিন্, তা ধিন্ ধিন্।
হচ্ছ বড় মনে আশা
কতদিনে হবে স্বাধীন!
স্বাধীন দেশে জন্ম তোমার
হতে চাওনা তাই পরাধীন।
অধীন থাকার সুখ যে কত
মায়ের স্নেহের স্নিগ্ধ ছায়ে,
বুঝবে সেদিন, যেদিন তুমি অনেক বড়
স্বাধীনতার খরবায়ে।

.  ******************     
.                                                                               
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
একুশের গান
কবি ডলি দাশগুপ্ত

“আপনারে বড় বলে বড় সেই নয়
লোকে যারে বড় বলে বড় সেই হয়॥”

এ সব শিক্ষা বৃথা আজ ভাই আধুনিক পরিবেশে,
উনিশ-বিশের এই সব নীতি মানিনা একুশে এসে।
এখন সবাই বেড়ে ওস্তাদ পেটায় নিজের ঢাক ;
সবার প্রতিভা জয়ঢাক---সেটা যত হোক মিছে জাঁক॥
রিয়ালিটি শো-তে সবাই মাতে---দুগ্ধপোষ্য শিশুরাও
শিক্ষা যাদের হয়নিকো শেষ, শিশু-জনচিত মহরাও॥
প্রেম-গীতি-সনে নাচে গানে আনে লাস্য-ভঙ্গি মরি হায়,
এই শিশু কবে শিশু আর হবে অকালে মজেছে ডেঁপোমোয়॥
অবোধ শিশুরা বোঝে না কিছুই, ভালো-মন্দের নেই জ্ঞান ;
অপত্য-স্নেহে জ্ঞানী গুরুজন আহ্লাদে হন আটখান।
দেখনদারির দুনিয়ায় ভাই শিশুদের নিয়ে ছেলেখেলা,
ছেলেদের খেলা কেড়ে নিয়ে দেখ বুড়োরা মেতেছে জুয়োখেলায়॥

এই দুনিয়াটা ভরেছে যে আজ কেবল নকলে নকলে
বিশ শতকের ক্লাসিক-সৃষ্টি তাইতো রিমেকে ফেরালে।
সাহিত্য আর চিত্রজগত, শিল্প-ললিতকলাকে---
পুরোনো আসব অর্বাচীনেরা নতুন মোড়কে ঢাকে।
নব সৃষ্টির প্রেরণা কোথায় ক্ষয়িষ্ণু এই দেশে,
করি নবযুগ-রবি উদয়ের আশা অমারাত্রির শেষে।

.  ******************     
.                                                                               
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
নববর্ষ
কবি ডলি দাশগুপ্ত

নববর্ষের নবীন প্রভাতে আলোয় ভরেছে মন
সেই আলো মেখে ধরায় আজিকে খুশি ভরা এ জীবন।
মোর খুশি তাই দিলাম তোমায় নববর্ষের প্রাতে
শুভ হোক “আজ” শুভ হোক এই নবীন জীবন স্রোতে।

.  ******************     
.                                                                               
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
বিজয়ার ছড়া
কবি ডলি দাশগুপ্ত

সময়-স্রোতে ভেসে চলে মোদের জীবন তরী
দুর্গাপুজোর আমোদ শেষে বিষন্নতায় ভারী।
বছরভর অপেক্ষাতে যে আনন্দ পাওয়া
সেই খুশিতেই জানাই তোমায় --- “শুভ বিজয়া”।

.  ******************     
.                                                                               
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
জগা খিচুড়ি
কবি ডলি দাশগুপ্ত

‘দোল’ কেন ‘হোলি’ হল জানা নেই ভাই,
কেন ‘দেওয়ালি’তে পরিণত কালি পুজোটাই।
দুর্গাপুজোটা কবে হবে ‘দশহরা’,
সেই কথা ভেবে ভেবে আমি দিশাহারা।
ত্রয়োদশী তিথিটাতো ছিল চিরকাল,
‘ধনতোরাস’ নামে সে যে চলে আজকাল।
হুজুগের বাংলায় বাঙালি যে মাতে,
‘মেহেন্দি’ পরে সাজে তাই দুই হাতে।
বাঙালির প্রিয় ছিল ‘পৌষ-পার্বন’,
সে প্রথা বিলোপ ভাই হয়েছে এখন।
পিঠে পুলি পায়েসেতে নতুন পাটালি,
সে সব স্বপ্ন-সম বৃথা আজ খালি।
বাঙালির সংস্কৃতি বসেছি যে হারাতে,
নিয়েছি বদল করে অবাঙালি ধারাতে।
ভাষাতেও ধীরে ধীরে করছে প্রবেশ,
হিন্দী বলয়ের কিছু কিছু রেশ।
‘কিঁউ কী’-র বাঙলায় বলি ‘কেন কী’,
‘কারণ’ শব্দটাকে ভুলে মেরে দিই।
প্রেমের দিবস হল ‘ভ্যালেন্টাইন’,
‘রাসলীলা’ উত্সব হারালো যেদিন।
বড়দিন নয় শুধু পার্কস্ট্রীট-টাতে,
হিন্দু বাড়িও সাজে ‘খ্রীস্টমাস-ট্রী’তে।

আর কত বলি ভাই আজব এ দেশে,
বিয়েতে ব্রাত্য কনে বেনারসী বেশে।
সনাতন বর-বেশ ত্যাগ করে বর বেস---
পরে ‘শেরোয়ানি’ আর ‘চোগা চাপকান’।
ইংরাজ গেছে চলে, তাদের পোষাক ফেলে---
কোট-প্যান্ট, জিনস-টপ, গাউন ও শর্টস।
আমরা নিয়েছি তুলি সেসব পোষাকগুলি
ত্যাগ করে আমাদের বেশ সনাতন।
আজ আর একবার ভুলেছে বাঙালি তার
নিজের সাবেকি বেশ ধুতি আর শাড়ি পাছাপাড়।
সালোয়ার-কামিজের অবাঙালি বেশটাই,
আজ তার মনোমত, সাথে সাহেবী পোষাকটাই।
বিশ্বায়নের সাথে আমরা উঠেছি মেতে
আগাগোড়া করে নিতে পরিবর্তন।
বসন-ভূষণ আর অশনে এখনো
যেটুকু বাঙালিয়ানা আছে অবশেষ---
ইঙ্গ-বঙ্গ আর হিন্দী মিলিয়ে
এসো তাকে করে দিই একেবারে শেষ।

.           ******************     
.                                                                               
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
“পাখি সব করে রব”
কবি ডলি দাশগুপ্ত

বসন্ত সমাগমে বিহঙ্গ আগমনে ভরে ওঠে আমার আঙ্গিনা
ভাগ করে নিতে সাথে আকাশ-তরঙ্গ পথে তার কিছু দিলাম নমুনা।
বসন্তের দূত যে গো কোকিল কুহরে
মসৃণ চিক্কন কালো অপূর্ব বাহারে।
ল্যাজ ঝোলা, রাঙা চোখ, কুহু কুহু গানে
বসন্ত-সখা নামে জানে জগজনে।
বুলবুলি চুলবুলি ঝুঁটিটি মাথায়---
দল বেঁধে উড়ে ফেরে জগত মাতায়।
দোয়েল কোয়েল ফিঙে বসন্ত-বাউড়ি,
অপরূপ রূপ কিবা আহা মরি মরি।
দোয়েলের কালো রূপে ধবল রেখায়
দেখ কি বিচিত্র রূপ ধরেছে পাখায়।
বসন্ত-বাউড়ির রূপ বর্ণনা-অতীত---
সজল শ্যামল দেহ, কণ্ঠে নীল উপবীত।
মাথায় রক্তিম টুপি মনে হয় যেন---
লাল-নীল-সবুজের বাহার কী হেন।
কোথা পাবে এ জগতে এ বিচিত্র পাখিসব,
আমি হেন ভাগ্যবান, মোর আঙিনায় করে রব।

.           ******************     
.                                                                               
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*
নিষফলা
কবি ডলি দাশগুপ্ত

যেদিন জানলে জমি অনুর্বর অফলা
সেদিন থেকে একবিন্দু বীর্য-সারও করনি
অহেতুক অপচয়। অথচ কে বলতে পারে,
অকারণ বর্ষণই হয়তো আনতে পারতো একদিন
অনন্ত ফসলের সম্ভাবনা।
জমি তৈরির আনন্দই তো আসল।
তৈরি জমিতে ফসল ফলানোর চেয়ে
অনুর্বর অবহেলিত জমিতে সৃষ্টির আনন্দ
ঢের বেশী।
তুমি থাকলে না তার অপেক্ষায়,
চলে গেলে ফেলে অবহেলায়।
সোনার ফসলের অনন্ত সম্ভাবনা গেল হারিয়ে।

.           ******************     
.                                                                               
সূচিতে . . .   


মিলনসাগর
*