কবি গোবিন্দচন্দ্র দাসের কবিতা
*
বিরহ সঙ্গীত
কবি গোবিন্দচন্দ্র দাস


মিলন হইতে দেবী বরঞ্চ বিরহ ভাল,
দেখিব বলিয়া আশা মনে থাকে চির কাল !
নিরাশা নাহিক জানি,
সদা শুনি দৈববাণী,
মৃত-সঞ্জীবনী ভাষা---"বাসিভাল ! বাসিভাল !"
যেদিকে---যেদিকে চাই,
তোমারে দেখিতে পাই ,
অনন্ত ব্রহ্মাও বিশ্ব বিশ্বরূপে কর আলো !
মিলনে বিরহ-ভয়,
আকুল করে হৃদয়,
চুম্বিতে চমকি উঠি নিশি বা পোহায়ে গেল !

.                  ****************               
.                                                                                            
সূচীতে . . .   



মিলনসাগর
সামান্য নারী
কবি গোবিন্দচন্দ্র দাস


সামান্য নারীটা তার কত পরিমাণ ?
শূণ্য করে গেছে যেন সমস্তটা প্রাণ !
একটু গিয়াছে হাসি,
একটু গিয়াছে কান্না,
একটু আঁখির জলে মাখা অভিমান !
একটু চুম্বন গেছে,
একটু নিশ্বাস দীর্ঘ,
একটু আলিঙ্গন তৃণের সমান !
যা গেছে, সে ক্ষুদ্র গেছে,
প্রকাণ্ড ব্রহ্মাণ্ড আছে,
তবে যে ভরে না কেন তার শূণ্য স্থান ?
সামান্য নারীটা তার কত পরিমাণ ?

.                  ****************               
.                                                                                            
সূচীতে . . .   



মিলনসাগর
রমণীর মন
কবি গোবিন্দচন্দ্র দাস


রমণীর মন
কি যে ইন্দ্রজালে আঁকা,                   কি যে ইন্দ্রধনু-ঢাকা
কামনা-কুয়াশা-মাখা মোহ-আবরণ
কি যে সে মোহিনী-মন্ত্র রয়েছে গোপন !
কি যে সে অক্ষর দুটি,                    নীল নেত্রে আছে ফুটি,
ত্রিভূবনে কার সাধ্য করে অধ্যয়ন ?
কত চেষ্টা যত্ন করি,                          উলটি পালটি পড়ি,
কিছুতে পারি না অর্থ করিতে গ্রহণ !
কি যে সে অজ্ঞাত ভাষা,                দেব কি দৈত্যের আশা,
ঝলকে ঝলকে যেন করে উদ্গীরণ !
অতি ক্ষুদ্র দুই বিন্দু,                          অকুল অসীম সিন্ধু,
উথলি উঠিছে তাহে প্রলয়-প্লাবন !
ত্রিদিবের সুধা নিয়া,                           ধরণীর ধুলা দিয়া,
রসাতল নিঙাড়িয়া করিয়া মিলন,
ঢালিয়াছি কত ছাঁচে,                       মৃত্তিকা কাঞ্চন কাঁচে,
পারিনি তোমার আর করিতে গঠন,
রমণীর মন !

.                  ****************               
.                                                                                            
সূচীতে . . .   



মিলনসাগর
কে বেশী সুন্দর ?
কবি গোবিন্দচন্দ্র দাস



কে বেশী সুন্দর ?
বালিকা যুবতী দুই,                      কারে দেখি কারে থুই
আমার নিকটে লাগে দুই মনোহর !
লাবণ্যে সৌন্দর্যে দোঁহে,                প্রাণ মোহে, মন মোহে,
বাঁশবনে ডোম কানা ! তেমনি ফাঁফর !
কারে বেশী ভালবাসি, কে বেশী সুন্দর ?


কে বেশী সুন্দর ?
যুবতীর ভরা গায়,                         লাবণ্য উছলে যায়,
নয়নে নলিন নীল, মুখে শশধর !
বালিকা তারকা হাসে,                      নিষ্কলঙ্ক নীলাকাশে,
সদা শুক্লপক্ষপূর্ণ ক্ষুদ্র কলেবর !
কারে রাখি কারে দেখি, কে বেশী সুন্দর ?


কে বেশী সুন্দর ?
শত মুখে ভালবাসে,                     তরঙ্গে মাতঙ্গ ভাষে,
যুবতী পদ্মার মত বহে খরতর !
ফুলবনে করে খেলা,                     প্রদোষ প্রভাত বেলা,
অনাবিল প্রেমধারা বালিকা নির্ঝর !
কারে থুয়ে কারে দেখি, কে বেশী সুন্দর ?


কে বেশী সুন্দর ?
প্রভাতের শতদলে,                           পরিপূর্ণ পরিমলে,
যুবতী সহস্র করে ফোটে
শিশিরের সেফালিকা,                  নিশি শেষে সে বালিকা,
খসে পড়ে ছোঁয় পাছে একটি ভ্রমর !
কারে থুয়ে কারে দেখি কে বেশী সুন্দর ?


কে বেশী সুন্দর ?
যুবতী বিজলীবালা,                          ত্রিভূবন করে আলা,
সগর্ব্বে চরণাঘাতে ভাঙে ধরাধর !
বালিকা জোনাকী হাসে,                     স্নেহের কিরণে ভাসে,
শিখেনি অশনি-লীলা আঁখি ইন্দিবর !
কারে বেশী ভালবাসি, কে বেশী সুন্দর ?
.                                                                                            
উপরে

কে বেশী সুন্দর ?
পদ্মবন পায়ে ঠেলি,                     রাজহংসী করে কেলি,
যুবতীর ঢেউয়ে কাঁপে মানসের সর !
লাজুক বালিকা টুনি,                      চুরি ক'রে গান শুনি,
ত্রিদিবের এক ফোঁটা দ্রব সুধাকর !
কারে বেশী ভালবাসি, কে বেশী সুন্দর ?


কে বেশী সুন্দর ?
আরক্ত সন্ধ্যার রবি,                        যুবতীর মুখ-ছবি,
অভিমানে হয় ম্লান বিপদে কাতর !
বালিকা ঊষার মত,                  ফোটে যত শোভা তত,
রাঙ্গা মুখে দেখা যায় ভাঙ্গা ভাঙ্গা ডর,
কারে বেশী ভালবাসি, কে বেশী সুন্দর ?


কে বেশী সুন্দর ?
রাহু যেন উর্দ্ধশ্বাসে,                       দু'বাহু তুলিয়া আসে,
রমণী তেমনি হাসে বুকের উপর !
দূরে যদি শব্ দ  শোনে,                 বালিকা লুকায় কোণে,
খনির মণির মত ম্লান মনোহর !
কারে বেশী ভালবাসি, কে বেশী সুন্দর ?


কে বেশী সুন্দর ?
চুমার রাক্ষসী নারী,                         শতজন্ম অনাহারী,
দিনে রাতে খেয়ে চুমা ভরে না উদর !
বালিকা অত না বোঝে,                চুমা খেতে চোখ বোঁজে,
ছুঁইতে শিহরি উঠে কদম্ব-কেশর !
কারে বেশী ভালবাসি, কে বেশী সুন্দর ?

১০
কে বেশী সুন্দর ?
যুবতী আসিতে ঘরে,                     গৃহ কাঁপে পদভরে,
বিজয়ী বীরের মত নির্ভয় অন্তর !
বালিকা বলে না কথা,                   কোলের বালিশ যথা,
পিছ দিয়া ফিরে থাকে লাজে জড়সড় !
কারে বেশী ভালবাসি, কে বেশী সুন্দর ?

.                  ****************               
.                                                                                            
সূচীতে . . .   



মিলনসাগর
আমার চিতায় দিবে মঠ  
কবি গোবিন্দচন্দ্র দাস


     ১

ও ভাই বঙ্গবাসী, আমি মর্লে,
তোমারা আমার চিতায় দিবে মঠ !
আজ যে আমি উপাস করি,
না খেয়ে শুকায়ে মরি,
হাহাকারে দিবানিশি
          ক্ষুধায় করি ছট্ ফট্ |
সে দিকেতে নাইক' দৃষ্টি,
কেবল তোমাদের কথা মিষ্টি,
নির্জলা এ স্নেহ-বৃষ্টি,
          শিল পড়িছে পট্ পট্ |
ও ভাই বঙ্গবাসী, আমি মর্লে,
তোমারা আমার চিতায় দিবে মঠ !

     ২

দুধটুকু নাই নারীর বুকে,
মাড়টুকু নাই দিতে মুখে,
ক্ষুধায় কাতর শিশু ছেলে
          ধুলায় লুটে চট্ পট্ !
শুষ্কচোখ কণ্ঠতল,
এক বিন্দু নাইক জল,
লোল-রসনা, ভাম-লোচনা,
চাহিছে নারী কট্ মট্ !
শতছিন্ন বসন গায়ে,
শত চক্ষে লজ্জা চায়,
এমনি দৈন্য এমনি দুঃখ,
          যোটে মোটে ছালার চট্ !
নীলগিরি নাহি সে খোপা
শুকনা মরা বিন্না ছোপা,
তৈল বিনা রুক্ষ কেশ
          অযতনে শিবের জট্ !
শুষ্ক জীর্ণ শ্মশানকালী
সারিন্দার খোল পেটটি খালি,
আকাল ভারে বাঁচান দেহ
কাঁকাল-ভাঙ্গা কটিতট্ !
আমি মর্লে,
তোমারা আমার চিতায় দিবে মঠ,
         ও ভাই বঙ্গবাসী, !

      ৩

পাখীও ত গাছের ডালে,
আপন বাসায় শাবক পালে
আমার নাই সে আশা, নাই সে বাসা,
      কেমন বিপদ, কি সংকট |
আমি থাকি পরের বাড়ী,
নিয়ে ছেলেপপুলে নারী,
নাই যে ডালা কুলা হাড়ী,
বাপ-দাদার সে ভাঙা ঘট্ !
ও ভাই বঙ্গবাসী, আমি মর্লে,
তোমারা আমার চিতায় দিবে মঠ !

      ৪

  আমি আজ
স্বদেশ-চ্যুত বিদেশবাসী
পরদেশ পর-প্রত্যাশী,
না জানিয়া মর্লেম আমি,
ব্যাস-কাশী --- এ পদ্মার-তট্ !
দেখিনি এমন দারুন জা'গা,
লক্ষ্মীছাড়া হতভাগা
তিন পয়সা এক বেতের আগা,---
   কি মহার্ঘ, কি দুর্ঘট !
আমি মর্লে, তোমারা আমার চিতায়
     দিবে মঠ !                                       
উপরে

      ৫

হেথা ছলনা বঞ্চনা খালি,
কে কার ভোগে দেবে বালি |
এ কিষ্কিন্ধ্যায় সবাই "বালী"
    আত্মম্ভরী মর্কট !
জানেনা এরা সত্য বাক্য,
ব্যবসা এদের মিথ্যা সাক্ষ্য,
চোর গেরস্থ দু'জনারি পক্ষ,
    উভচর সব কর্কট !
এরা, শিকড়ে শিকড়ে বাঁশি বাঁধা,
সকল কলার এক ছড়া---কাঁধা,
এদের, অসাধ্য নাই,---স্বার্থে আঁধা,
    আকাশে "ব" নামায় বট,
কুক্ষণে হেথা আসিয়াছি,
এখন, পালাতে পার্লে প্রাণে বাঁচি |
এরা জন্তুর চেয়ে অধম পশু
    আত্মগুপ্ত কূর্ম কর্মঠ !
আমি মর্লে, তোমারা আমার চিতায় দিবে মঠ !

       ৬

কথার বন্ধু অনেক আছে,
কথায় তুলে দিবে গাছে,
বিপদ কালে পাইনে কাছে
     কেমন স্নেহ অকপট,
অভাব দুঃখ শুনলে পরে,
পাছে কিছু চাইব ডরে,
স্বভাব-দোষে স'রে পড়ে
      চোরের মত দেয় চম্পট !
কত বন্ধু দেশের নেতা,
মূখবন্ধ স্বাধীন-চেতা,
কাজের বেলায় আরেক কেতা
      হৃদয় ভরা ঘোর কপট,
লেখক মেরে অনাহারে,
লুঠবে টাকা উপহারে,
সাহিত্যের যে কসাই বন্ধু
      বিষম ধূর্ত, বিষম শঠ |
আমি মর্লে, তোমারা আমার চিতায় দিবে মঠ !
      ও ভাই বঙ্গবাসী !

     ৭

যা হোক, আমি শত ধন্য,
কৃতজ্ঞ কৃতার্থমন্য
তোমাদের এ স্নেহের জন্য
      আজ তোমাদের সন্নিকট |
চিতায় মঠ বা দিবে কেহ,
গড়বে "স্ট্যাচু" অর্ধ-দেহ',
ছায়া-চিত্র রাখবে কেহ
কেউ বা তৈল চিত্রপট !
করবে তোমারা শোক-সভা,
চোখে চসমা স্বেতজবা,
ওষ্ঠে চুরুট ধূম্রপ্রভা,
       করতালি চট্ পট্,
স্বর্গ কিম্বা নরক হ'তে,
আসব তখন আকাশ-পথে,
দেখতে আমার শোকসভা,
       সঙ্গে নিয়ে অলকট !
সত্যই কি লজ্জা শরম
       বাঙালীরে করেছে বয়কট্ ?

.             ****************               
.                                                                               
সূচীতে . . .   



মিলনসাগর
দিগ্বিজয়ী বীর
কবি গোবিন্দচন্দ্র দাস



এ দেশে এসেছে এক দিগ্বিজয়ী বীর !
এ নহে নাদির সা,                                এ নহে জঙ্গীস্ খাঁ,
এ নহে তৈমুরলঙ্গ চীন তাতাবীর,
আসেনি হিমাদ্রি লঙ্ঘি,                       নাহি সৈন্য সাথী সঙ্গী,
নাহি হাতে তরবার নাহি ধনু তীর |
পথে পথে হাহাকারে,                      আসেনি কাঁদায়ে কারে,
আসে নাই দেশে দেশে বহায়ে রুধির,
আসিয়াছে পুষ্প রথে,                            সুমেরুর স্বর্ণপথে,
উড়ায়ে কনকরেণু কিরণে মিহির !
একাকী এসেছে "ভোলা",                      মমতার হাত খোলা,
করুণা গলিয়ে পড়ে আঁখি নিলে নীর !


এ দেশে এসেছে এক দিগ্বিজয়ী বীর !
কোথা হ'তে এসেছে সে,                        ঘর বাড়ী কেন দেশে,
নাহি জানি পরিচয় শিশু বিদেশীর,
নাহি বোঝে কপটতা,                         বোঝে না মোদের কথা,
বোঝে না সে কোনো ভাষা এই পৃথিবীর !
এসেছে উলঙ্গ বেশে,                             বস্ত্র নাই তার দেশে,
কেমনে সরম তবে বহে রমণীর ?
উলঙ্গ ভগিনী ভাই,                            কিসে থাকে এক ঠাঁই ?
থাকুক জ্যাকেট বডির নাহি মিলে চীর ?
কুরুচি-কবির ছেলে,                              এসেছে বসন ফেলে,
লজ্জায় ভাঙিয়া পড়ে রুচির মন্দির !


এ দেশে এসেছে এক দিগ্বিজয়ী বীর !
এসেছে মোদের বাড়ী,                          নয় মাস---দিন চারি,
টলমল করিতেছে কাঙ্গাল-কুটির !
ত্রিদিব করিয়া জয়,                              আসিয়াছে মনে লয়,
এনেছে মন্দার-মধু অধরে মদির,
এনেছে পাপদ কল্প,                                প্রকৃতই---নহে গল্প,
ও ক্ষুদ্র হৃদয়ে ভরা স্নেহ সুগভীর !
লুণ্ঠিয়া অলকা শত,                            আনিয়াছে রত্ন কত,
কে পারে করিতে তাহা গণনায় স্থির ?
আঙ্গিনার মাটি ধূলা,                            তাও মণিরত্ন গুলা,
অযত্নে পড়িয়া আছে ঘরের বাহির !


এ দেশে এসেছে এক দিগ্বিজয়ী বীর !
তার হামাগুড়ি দিতে,                          কুলায় না পৃথিবীতে,
অতি ক্ষুদ্র আঙ্গিনা সে ক্ষুদ্র পরিধির,
তার সে চরণ দাপে,                          বিশাল ব্রহ্মাণ্ড কাঁপে,
অতি ক্ষুদ্র ধরণী সে আকুল অস্থির !
বাছে না আগুন জল,                           বুকে তার এত বল,
তার কাছে সমতুল্য সমুদ্র শিশির,
বোঝেনা সে সাপ বাঘ,                         সে যাহার পায় লাগ,
অবহেলে সাপটিয়া ধরে গ্রীবা শির |
সে ত' গো জানেনা ভয়,                         মরণ কাহারে কয়,
সে বুঝি অধীন নয় নব-নিয়তির !

.                                                ৬                                           
উপরে
এ দেশে এসেছে এক দিগ্বিজয়ী বীর !
সে মানেনা জাতিভেদ,                         মানেনা কোরাণ বেদ,
মানেনা আচার ধর্ম মুনি মৌলবীর,
সে মানে না খাদ্যাখাদ্য,                        সে নহে কিছুর বাধ্য,
খায় সুখে বিষ্ঠা মুত্র মাখন পনির !
সে মানেনা পূণ্য পাপ,                             অশ্রুজল অনুতাপ,
সে মানেনা আমাদের আলোক তিমির,
সে এক সম্রাট্---প্রভু,                             সে নহে অধীন কভু,
সে করে চরণে চূর্ণ রীতি পৃথিবীর !
তাহার উলঙ্গ অঙ্গে,                             সুরুচি কুরুচি সঙ্গে,
গরু বাঘে পান করে এক ঘাটে নীর,


এ দেশে এসেছে এক দিগ্বিজয়ী বীর !
প্রতাপ প্রভুত্ব তার,                           নাহি বিশ্বে তুলনার,
কি ছার লঙ্কার সেই রাজা দশশির |
জুড়াইতে তাহার হিয়া,                       শীতল পরশ দিয়া,
আসিয়া রয়েছে আগে মলয় সমীর !
তাহারি পানের তরে,                         নদী হৃদ সরোবরে,
নীরদ রেখেছে ভরি সুশীতল নীর !
তারি আসিবার তরে,                         রজত সুবর্ণ করে,
উজলিয়া আছে ধরা শশাঙ্ক মিহির !
তারি আগমন জন্য,                            ধরণী হয়েছে ধন্য,
আর কোনো প্রয়োজন নাহি পৃথিবীর |
তুষিতে তাহারি মন,                            বসন্তের ফুলবন,
ফুটায়ে রেখেছে ফুল সুধা সুরভির |
ফল শস্যে হয় নত,                         তরু তৃণ আছে যত,
পোষিতে অমৃত খাদ্যে তাহারি শরীর |
তারি তরে আমি তুমি,                     অনন্ত আকাশ ভূমি,
সৃষ্টির গম্ভীর অর্থ হয়েছে গম্ভীর |


এ দেশে এসেছে এক দিগ্বিজয়ী বীর !
প্রমদা পাইয়া তারে,                      কি আনন্দ অহঙ্কারে,
চুমিতেছে বার বার রোমাঞ্চ শরীর !
এ বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড গুলা,                       আজি তার পদধূলা,
সে জেন রাণীর রাণী শত ইন্দ্রাণীর !
আজি তার ছিন্নবাসে,                    কি লাবণ্য অট্টহাসে,
কে জানে কি ভাগ্যোদয় আজি অভাগীর,
দশ হস্তে দশভুজা,                     আদি তারে করে পূজা,
বাণী সে বন্দনা গায় গীত গায়ত্রীর !
লক্ষ্মী তার পদ সেবে,                       প্রণমে অনন্ত দেবে,
ছেলে কোলে মহিমা কি এত জননীর |
কবিতা কৃতার্থ হয়,                         লেখনীর জয় জয়,
তাহারি বিজয়-গাথা গাহিয়া কবির !

.                  ****************               
.                                                                                            
সূচীতে . . .   



মিলনসাগর
ঊষার শিশির
কবি গোবিন্দচন্দ্র দাস


শরতের সোনা ঊষা ঘুম ভেঙে চায়,
জগত্ ভিজিয়া আছে শিশিরের জলে |
সুন্দর সবুজ মাঠ কিবা শোভা পায়,
সাদা পুঁতি গাঁথ যেন শ্যামল আঁচলে |
ঝোপে ঝাপে পাতা আছে মাকড়ের জাল,
তাহাতেও হিমকণা পড়িয়াছে কত |
মনে লয়ে তারা বুঝি বিহান সকাল
জাল ফেলে তুলিয়াছে মোতি শতশত |
বাগানে চাহিয়া দেখ ফুলে ফুলে ফুলে
এর চেয়ে শোভা পায় নিশির নীহার,
রজনী চলিয়া গেছে তাই শোকাকুলে,---
আঁখিনীরে ভাসে মূখ ফুল-বালিকার |
সত্যই স্নেহের অশ্রু এত মনোহর,
চুম্বনে শুষিছে উষা করিয়া আদর ||

.          ****************               
.                                                                               
সূচীতে . . .   



মিলনসাগর
আমার ভালবাসা
কবি গোবিন্দচন্দ্র দাস


আমি তারে ভালবাসি অস্থিমাংস সহ,
অমৃত সকলি তার---মিলন বিরহ।
বুঝু না আধ্যাত্মিকতা,                দেহ ছাড়া প্রেম-কথা,
কামুক লম্পট ভাই যা কহ তা কহ।
কোথায় স্থাপিয়ে মূল                ফোট্ প্রেম-পদ্মফুল ?
আকাশ-কুসুম সে যে কল্পনা কলহ ?
আত্মায় আত্মায় যোগ,                বুঝি না সে উপভোগ,
অদেহী আত্মারে আগে কিসে ছুঁয়ে লহ ?
তোমাদের রীতি নীতি                বুঝি না পবিত্র প্রীতি,
তোমরা কি পৃথিবীর মরলোক নহ ?
আমি ভাই ভালবাসি অস্থিমাংস সহ।


আমি তারে ভালবাসি অস্থিমাংস সহ।
আমি ও নারীর রূপে,                আমি ও মাংসের স্তুপে,
কামনার কমনীয় কেলি-কালীদহ---
ও কর্দমে---অই পঙ্কে,                অই ক্লেদে---ও কলঙ্কে,
কালীয়নাগের মত সুখী অহরহ,
আমি তারে ভালবাসি অস্থিমাংস সহ।


আমি তারে ভালবাসি অস্থিমাংস সহ।
ধরার মানুষ আমি,                আমি ভাই মহাকামী,
আমার আকাঙ্খা সে যে মহা ভয়াবহ।
আমিঙ্গনে ভাঙে চূরে,                শ্বাসে হিমালয় উড়ে,
চুম্বনে ঘুর্ণিত হয় গ্রহ উপগ্রহ।
আমাদেরি কেলিভরে                পৃথিবীটি উলটি পড়ে,
ও নহে সাগরের বান তোমরা যা কহ।
মর্দনে মন্থনে বুকে,                অগ্নি উঠে গিরিমুখে,
ভূমিকমেপে কাঁপে বিশ্ব ভয়ে অহরহ।
আমি তারে ভালবাসি অস্থিমাংস সহ।


আমি তারে ভালবাসি অস্থিমাংস সহ।
আমি মহাকাম-পতি,                সরলা সে মহারতি,
মরিলে মরণ নাই নাহিক বিরহ।
অনঙ্গ---অনঙ্গ-রঙ্গে,                সদা থাকে এক সঙ্গে,
সে আমার আমি তার মহা গলগ্রহ।
মোদের নির্বাণ নাই,                আমরা না মুক্তি চাই,
অনন্ত ধ্বংসের বর তোমরাই লহ।
আমাদের ভালবাসা অস্থিমাংস সহ।


আমি তারে ভালবাসি অস্থিমাংস সহ।
জানি না নিষ্কাম কর্ম,                বুঝি না নিষ্কাম ধর্ম,
বুঝি না “ঘোড়ার ডিম” তোমরা কি কহ।
আমি শুধু চাই---চাই,                চাহিতে বিরক্তি নাই,
না পেলে অনন্ত-ভিক্ষা জীবন দুর্বহ।
হায় হায় কেবা জানে,                কি মহা গহ্বর প্রাণে,
কোটি বিশ্বে নাহি ভরে সে পোড়াদহ।


এস ভাই মহা সুখে,                তোমাদের (ও) লই বুকে
শত্রু মিত্র অবিভেদে যে যেখানে রহ।
এস সুধা, এস বিষ,                এস পুষ্প কি কুলিশ,
এস অগ্নি, এস জল, এস গন্ধবহ।
আমার স্বার্থের আশা,                মহাস্বার্থ ভাসবাসা,
এস হে আমার বুকে করি অনুগ্রহ।
অরূপ আত্মায় ভাই,                ভরে না এ গড়খাই,
আমি ভালবাসি তাই অস্থিমাংস সহ।
এস হে আমার বুকে করি অনুগ্রহ।

আমি তারে ভালবাসি অস্থিমাংস সহ।
সুন্দর কুত্সিত হৌক,                উলঙ্গ আবৃত রৌক,
কুরুচি বলিয়া কর কলঙ্ক-নিগ্রহ।
থাক তার মহা কুষ্ঠ,                আমি যে তাতেই তুষ্ট,
তোমরা দেখো না, নয় ভয়ে দূরে রহ!
চন্দন আতর সম,                তার পুঁয প্রিয় মম,
শরীরে মাখিলে যায় যাতনা দুঃসহ।
থাক্ তার শত পাপ,                থাক্ শত অভিশাপ,
সে আমার বিধাতার মহা অনুগ্রহ।
আমি তারে ভালবাসি অস্থিমাংস সহ।


আমি তারে ভালবাসি অস্থিমাংস সহ।
আজো তার ভস্মছাই,                বুকে রেখে চুমা খাই
আজো সে গায়ের গন্ধ বহে গন্ধবহ।
আনন্দে উল্লাসে খুলি                আজো তার চুলগুলি,
গলায় বাঁধিয়া আহা জুড়াই বিরহ।
আজো তার প্রতিচ্ছায়া,                ধরিয়া নূতন কায়া,
স্বপনে আসিয়া করে সপত্নী-কলহ।
আজো সে-লাবণ্য তার,                সুধা মন্দাকিনী-ধার,
ভরে ব্রহ্মা-কমণ্ডলু আদি পিতামহ।
আমি তারে ভালবাসি অস্থিমাংস সহ।

.                  ****************               
.                                                                                            
সূচীতে . . .   



মিলনসাগর
স্বদেশ
কবি গোবিন্দচন্দ্র দাস
রচনা - ময়মনসিংহ, ১৩১৪ বঙ্গাব্দ (১৯০৭)। যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত সম্পাদিত গোবিন্দ চয়নিকা
কাব্য সংকলন (১৯৪৮) থেকে নেওয়া।


.                        ১
স্বদেশ স্বদেশ কর্চ্ছ কারে? এদেশ তোমার নয় ;---
এই যমুনা গঙ্গানদী, তোমার ইহা হ’ত যদি,
পরের পণ্যে, গোরা সৈন্যে জাহাজ কেন বয় ?
গোলকুণ্ডা হীরার খনি, বর্ম্মা ভরা চুণি মণি,
সাগর সেঁচে মুক্তা বেছে পরে কেন লয়?
স্বদেশ স্বদেশ কর্চ্ছ কারে, এদেশ তোমার নয়!

.                        ২
এই যে ক্ষেতে শস্য ভরা, তোমার ত নয় একটি ছড়া,
তোমার হ’লে তাদের দেশে চালান কেন হয়?
তুমি পাও না একটি মুষ্টি, মরছে তোমার সপ্ত গোষ্ঠি,
তাদের কেমন কান্তি পুষ্টি---জগৎ ভরা জয়।
তুমি কেবল চাষের মালিক, গ্রাসের মালিক নয়!

.                        ৩
স্বদেশ স্বদেশ কর্চ্ছ কারে, এদেশ তোমার নয়,
এই যে জাহাজ, এইযে গাড়ী, এইযে পেলেস্---এইযে বাড়ী,
এইযে থানা জেহেলখানা---এই বিচারালয়,
লাট, বড়লাট তারাই সবে, জজ মাজিষ্টর তারাই হবে,
চাবুক খাবার বাবু কেবল তোম্রা সমুদয়---
বাবুর্চি, খানসামা, আয়া, মেথর মহাশয়!

.                        ৪
স্বদেশ স্বদেশ কর্চ্ছ কারে, এদেশ তোমার নয়
আইন কানুনের কর্ত্তা তারা, তাদের স্বার্থ সকলধারা,
রিজার্ভ করা সুখ সুবিধা তাদের ভারতময়,
তোমার বুকে মেরে ছুরি, ভর্ ছে তাদের তেরজুরি,
তাদের তারেচে তাদের নাচে তাদের “বলে” ব্যয় ;
একশ রকম টেক্স দিবা, ব্যায়ের বেলায় তোমার কিবা,
গাধার কাছে বাধার বল বাঘের কবে ভয়?
স্বদেশ স্বদেশ কর্চ্ছ কারে এদেশ তোমার নয়!

.                        ৫
স্বদেশ স্বদেশ করিস্ কারে, এদেশ তোদের নয়,
যেদেশ যাদের অধিকারে, তারাই তাদের বল্ তে পারে,
কুকুর মেকুর ছাগল কবে দেশের মালিক হয়?
যে সব বাবু বিলাত গিয়ে, ‘বাবুনি’দের সঙ্গে নিয়ে,
প্রসবিয়ে আনছে তাদের শাবক সমুদয়,
‘বৃটিশ বরণ’ ব’লে দাবী---কর্লে নাকি বিলাত পাবি?
লজ্জাহীনের গোষ্ঠি তোরা নাইক লজ্জা ভয়!
এই যদিরে ‘বৃটিশ বরণ’ মরণ কারে কয়?

.                        ৬
স্বদেশ স্বদেশ করিস কারে, এদেশ তোমার নয়,
কা’র স্বদেশে কাদের মেয়ে, এমনতর পথে পেয়ে,
জোর-জবরে গাড়ীর ভিতর শাড়ী কেড়ে লয়।
নপুংসকের গোষ্ঠি তোরা, জন্ম-অন্ধ কানা খোঁড়া,
ভিস্তিয়ালাস পাঙ্খাকুলি---পীলা ফাটায় ভয়!
কার স্বদেশে সর্ব্বনেশে এমন অভিনয়?

.                        ৭
স্বদেশ স্বদেশ করিস্ কারে, এদেশ তোদের নয়!
যাহার লাঠী তাহার মাটী, চিরদিনের কথা খাঁটি,
এত নহে চা’র পেয়ালা চুমুক দিলে জয়!
রুখতে যারা কাঁপে ডরে, মারবার আগে আপ্ নি মরে,
খুসির বদল খুসি করে---‘সেলাম মহাশয়!’
স্বদেশ স্বদেশ করিস্ কারে, এদেশ তোদের নয়!

.                        ৮
স্বদেশ স্বদেশ করিস্ কারে, এদেশ তোদের নয়!
সোনার বাঙ্গলা সোনার ভূমি, হীরার ভারত বল্লে তুমি,
ভারত তোমার আসবে কোলে, এই কি মনে লয়?
‘সোনা’ ‘যাদু’ মিষ্টি ভাষে, ছেলে মেয়ে কোলে আসে,
স্বরাজ তাতে নাহি নারাজ, চাহে কাজের পরিচয়!
কবির কথায় তুষ্ট নাহে ‘ভবি’ মহাশয়!

.                        ৯
স্বদেশ স্বদেশ করিস্ কারে, এদেশ তোদের নয়,
তাদের রাজ্যে তোদের থাকা, তাদের বেঙ্কে তোদের টাকা,
তাদের নোটে ভারত ঢাকা---বিশাল হিমালয়!
তাদের কলে তোরাই কুলি, তারাই নিচ্ছে টাকাগুলি,
তোদের কেবল ভিক্ষার ঝুলি---ক্ষুধায় মৃত্যু হয়!
তারাই রাজা, তারাই বণিক, তারাই সমদয়!

.                        ১০
স্বদেশ স্বদেশ করিস্ কারে, এদেশ তোদের নয়,
কিসের বা তোর নেপাল ভুটান, সবাই তাদের পায়ে লুটান,
কুত্তার মতন পুচ্ছ গুটান---শিয়াল দেখে ভয়!
ওই যে ওদের ‘কাটমুণ্ডু’ সত্যই ও কাটামুণ্ডু,
রাহুর যেমন মরা তুণ্ডু হা করিয়ে রয়!
কেতুর মতন পুচ্ছ লুটান ভুটান মহাশয়!

.                        ১১
স্বদেশ স্বদেশ করিস্ কারে, এদেশ তোদের নয়,
করদ মিত্র---নবাব রাজা, সবাই দেখি দক্ষ সাজা,
একটাও নয় মানুষ তাজা---অজার মাথা বয়,
ওগুলা সব মানুষ হলে, কোন্ দিকে কে যেত চলে,
ডেনিস পেনিস টেনিস খেলে ভারত ভূমি লয়?
মরু দেশের গরুকাটা ভারত কর জয়?

.                        ১২
স্বদেশ স্বদেশ করিস্ কারে, এদেশ তোদের নয়,
যখন বাদশা মুসলমান, তখন তাদের ‘হিন্দুস্থান’,
ইংরেজ ‘ইণ্ডিয়া’ বলে এখন কেড়ে লয়!
অযোধ্যা কই---‘আউধ’ এযে, দাক্ষিণাত্য---ডেকান সে যে,
‘সিলনে’ গিলছে লঙ্কা---মুক্তা মণিময়!
ডমাউন আর ডিউ গোয়া, চুণি পান্না সোনার মোয়া,
যায় না তাদের ধরা ছোঁয়া, কে দেয় পরিচয়?
বারণাবত---ইন্দ্রপ্রস্থ, কই সে তোদের সমস্ত,
‘দিল্লী’র পরে ‘ডীল্লি’ হলো, আরো বা কি হয়!
স্বদেশ বলে কর্লে দাবি, আর কি তোরা এদেশ পাবি?
এ নয় তোদের ভারতবর্ষ চির-হর্ষময়!

.                        ১৩
স্বদেশ স্বদেশ করিস্ কারে, এদেশ তোদের নয়,
কই সে শিল্প, কই সে কৃষি, কই সে যজ্ঞ---কই সে ঋযি,
কই সে পুণ্য তপোবনে ব্রহ্ম-বিদ্যালয়?
কোথায় বা সে ব্রহ্মচর্য্য, অসীম স্থৈর্য্য, অসীম ধৈর্য্য,
কই বা উগ্র সে তপস্যা---ইন্দ্রে লাগে ভয়?
কোথায় অসীম শৌর্য্যে-বীর্য্যে অসুর পরাজয়?
স্বপ্নে দেখে গোলাগুলি, চমকে উঠিস্ ভেড়াগুলি,
উইয়ের ঢিবি দেখে তোদের শিবির বলে ভয়!
প্তিজনের প্রতি বক্ষে, কোটি কোটি লক্ষে লক্ষে,
কই সে তোদের দেশ ভক্তির দুর্গ সমুদয়,
বিশ্বগ্রাসী অগ্নিসিন্ধু, কই সে বুকের রক্তবিন্দু,
ষ্পর্শ থাকুক দর্শনে তার শত্রুকুল ক্ষয়!
লোহার চেয়ে মহাশক্ত, ভক্ত-বীরের মাংস রক্ত,
তাদের বুকের অস্থি দিয়া বজ্র তৈয়ার হয়,
ব্রহ্মাবর্ত্তে প্রথম আসি, তাইতে তারা দৈত্য নাশি,
পুণ্যভূমি ভারতভূমি প্রথম করে জয়!
তাদের ‘স্বদেশ’ ভারত ছিল, তোদের স্বদেশ নয়!

.                ********************


তেরজুরী - ট্রজারী
(Treasury)
বলে - বল নাচে
মেকুর - বিড়াল
বাবুনী - বাবুর স্ত্রী
বৃটিশ বরণ - বিলাতে ভুমিষ্ঠ সন্তান

.                  ****************               
.                                                                               
সূচীতে . . .   



মিলনসাগর
বাঙালী
কবি গোবিন্দচন্দ্র দাস
রচনা - লত্পদি, ঢাকা, ১৩০৩ বঙ্গাব্দ (১৮৯৬)। যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত সম্পাদিত গোবিন্দ চয়নিকা কাব্য
সংকলন (১৯৪৮) থেকে নেওয়া।



বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়?
এমন অধনম জাতি,
বুকে মার শত লাথি,
মুখে মার শত ঝাঁটা, অনায়াসে সয়!
না দেখিতে লেইয়ে পুঁ’ছে,
সে ফেলে যে দাগ মু’ছে,
যাহারে মেরেছে এ যে সে-যন সে-নয়!
তার নাই স্পর্শ বোধ,
ঘৃণা পিত্তি হর্ষ ক্রোধ,
শূয়রের চেয়ে চর্ম স্থুল অতিশয়।
মেড়ার ডলিলে কাণ,
সেও করে অভিমান,
সে-ও এসে মারে ঢুস্ , নাহি করে ভয় ;
@@@@@@@@@@@@@
বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়?


বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়
মানুষের মত নহে,
এদের শোণিতে বহে,
নরক-নর্দ্দমা শিরা পচাগন্ধময়।
কেবলে হৃৎপিণ্ড উহা,
নীচতার অন্ধগুহা,
পাতিত্যের প্রস্রবণ, প্রাণ উহা নয়!
অস্থিতে ও-নহে মজ্জা,
ভরা শুধু ঘৃণা লজ্জা,
কলঙ্কে গাঢ় ক্লেদ হয়েছে সঞ্চয়!
প্রতি লোম কূপে কূপে,
অপমান অনুরূপে,
করেছে অনন্ত ছিদ্র নাহিক সংশয়!
বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়?


বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়?
কি আছে মানবধর্ম্ম,
কি করে মানবধর্ম্ম,
কি দিয়ে চিনিব বল পশু এরা নয়?
এ-কি মত খায় @@
আর কাযে নাহি লাগে,
এদের জীবন শুধু বিষ্ঠামূত্রময়।
নাহি বীর্য্য নাহি তেজ,
উদরে গুণ্ঠিত লেজ,
বিলুণ্ঠিত পরপদে সকল সময়!
অলস শিথিল অতি,
স্খলিত জীবন-গতি,
আখিভরা অশ্রুজল বুকভরা ভয়,
বিচার বিতর্কহীন,
আত্মজ্ঞানে উদাসীন,
অবিচারে পরবাক্যে করিবে প্রত্যয়!
এমন পশ্চাদ্গামী,
সদা ঘৃণা করি আমি,
@ মাখিয়া মারি ঝাঁটা যত মনে লয়!
বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়?


বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়?
যত মুসলমান হিন্দু,
পতনের মহাসিন্ধু,
নাহি ধর্ম্ম এক বিন্দু অতি নীচাশয়!
বৃথা ও তিলক ফোটা,
পাঁচ ওক্ত মাথা-কোটা,
ধূর্ত্তামি ভণ্ডামি ওটা নিশ্চয় নিশ্চয়!
একমেবাদ্বিতীয়ং,
সে-ও থিয়েটারি সং,
কলেজি নলেজি ঢং আর কিছু নয়।
শত ভাল কীট কৃমি,
এরা নরকের তিমি,
ইহাদের আদি অন্ত অনন্ত নিরয়!
অধম পিশাচগুলি,
গর্দ্দভের পদধূলি
মাথায় মাখিয়া ছি ছি বড়লোক হয়,
বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়?


বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়?
হেন ঘোর মিথ্যাভাষী,
অনুগ্রহ অভিলাষী,
জগতে ধনীর দাস আর কেহ নয়।
হ’তে তার কৃপা-পাত্র,
কি শিক্ষক কিবা ছাত্র,
উকীল ডাক্তার আদি সম্পাদক-চয়,
যারা বড় মান্য গণ্য,
দেশের উদ্ধার জন্য,
“বঙ্গের উজ্জ্বল আলো” যাহাদের কয় ;
যত তার অবিচার,
যত তার ব্যভিচার,
যত তার ভয়ঙ্কর কার্য্য পাপময়,
জানিয়া নাহিক জানে,
শুনিয়া শোনেনা কাণে,
তাহারি প্রশংসা গানে করে জয় জয়।
এমন সাহস-হীন,
ভীরু কাপুরুষ ক্ষীণ,
বলিতে উচিত কথা সঙ্কুচিত হয় ;
পাপেরেও বলে পুণ্য,
হেন মনুষ্যত্ব শূন্য,
এমন করিয়া করে বিবেক-বিক্রয়।
এ নীচ নিরয়গামী,
সদা ঘৃণা করি আমি,
দেখিলে এদের মুখ মহাপাপ হয়,
বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়?


বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়?
বৃথা ও ইংরাজী শিক্ষা,
বৃথা ও পাশ্চাত্য দীক্ষা ;
প্রসবে যে বি.এ., এম.এ. বিশ্ব-বিদ্যালয়,
কি বলিব শেম্ শেম্,
রাস্কেল ফুল্ ডেম্,
গোল্ড্ পাম্প্ কিন সব আর কিছু নয়!
বৃথা অই হেট্ কোট্.
বিজাতী কথার চোট্,
হৃদয়ে নাহিক মোটে জ্ঞানের উদয় ;
আপনার প্রতিবেশী,
আত্মীয় স্বজন দেশী,
দরিদ্র দীনের দুঃখে গলে না হৃদয়,
করে না জীবন-পণ
উদ্ধারে বিপন্নজন,
অত্যাচারে যদি দেশ ছারখার হয়।
বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়?


বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়?
এই যে ভাওয়ালবাসী,
নিত্য অশ্রুজলে ভাসি,
অবিচারে ব্যভিচারে ভস্মীভূত হয়,
কে করে তাহার খোঁজ,
অসুরেরা রোজ রোজ,
কত যে কূলের বধু চুলে ধরি লয়!
দিবালোকে দ্বিপ্রহরে,
পতিরে বাঁধিয়া ঘরে,
কোলের কাড়িয়া লয় কত কুবলয়।
কত যে জননী বোন্,
কাটিয়া ঘরের কোণ,
চুরি করে পিশাচেরা নিশীথ সময়।
কি ব্রাহ্মণ কিবা শুদ্র,
কিবা বড় কিবা ক্ষুদ্র,
@@@@@@@@@
তিলে তিলে পলে পলে পুড়িছে হৃদয়,
এরা আহা চক্ষু খেয়ে,
একটু দেখে না চেয়ে,
ইহাদেরি একদেশী প্রতিবেশী হয়!
ও উচ্চ শিক্ষায় ধিক্,
আমি যা’ দিয়েছি ---ঠিক্,১
জগতে জঘণ্য হেন নাহি নীচাশয়,
বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়?


বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়!
কোথায় সাগর পারে,
তুরুকে আর্মাণি মারে,
ইংরেজ রুষের তারা কেহই ত নয়!
এক গোষ্ঠি এক জাতি,
নহে তার এক জাতি,
কেবল খৃষ্টের সনে এক পরিচয়!
তবু যে আর্মাণি-নারী,
ত্যজিল আখির বারি,
তাহাতে ডুবিল ‘আল্প্’ অল্প কি বিস্ময়!
অবিচারে ব্যভিচারে,
তাহাদেরি হাহাকারে,
বিলাতী আকাশ ভেঙ্গে চূরমার হয়!
তাদেরি---তাদেরি জন্য,
কি হৃদয় ধন্য ধন্য,
খেপিয়াছে খৃষ্টানের জাতি সমুদয়,
শিক্ষিত বীরের প্রাণ,
কি মহান্! কি মহান্!
করুণায় যেন এক কালান্ত প্রলয়!
নাহি বুঝে আত্মপর,
নাহি বুঝে দেশান্তর,
বিপন্ন উদ্ধারে তারা প্রাণ করে ব্যয়,
না ছাড়ে সম্রাট রাজা,
পাপীরে প্রদানে সাজা,
উত্পীড়িত নারী নরে দিতেছে অভয়!
স্বাধীন তুরষ্ক---রুম,
সুলতানের সিংহভূম,
এস্ লামের প্রিয় পূজ্যস্থান পুণ্যময়।
আশী বছরের বুড়া২
তাহারে করিতে গুড়া
করিয়াছে পদাঘাত সহস দুর্জ্জয়!
মোদের শিক্ষাভিমানী,
নব্য বাবু সভ্য জ্ঞানী,
থাক্ তার পর-দুঃখে গলিবে হৃদয়,
রেলে কি জাহাজে গেলে,
কেহ তারে ঠে’লে ফে’লে
নিলে তার মা বোনের চুপ্ করে রয়।
জুতা, লাথি, ঝাঁটা বেতে,
এরা না কিছুতে চেতে,
অচেতন জড়ে কবে ব্যথা বোধ হয়?
দেও তারে শত গালি,
দেও গালে চূণ কালী,
বেহায়ার তাতে কিবা লোক-লাজ-ভয়।
বাঙালী মানুষ যদি, প্রেত কারে কয়?

.           ************              

১ - ‘আমি যা দিয়েছি---ঠিক’ - কবি মগের মুল্লুক নামক পুস্তিকায় ভাওয়ালের রাজা ও ম্যানেজারের
ব্যভিচার-অবিচারের যে কাহিনী লিখিয়াছিলেন, এখানে ঐ পুস্তিকার প্রতি ইঙ্গিত করিয়াছেন। মগের মুল্লুক
বাজেয়াপ্ত।                                                                             
২ - গ্ল্যাডস্টোন, ইংলণ্ডের মন্ত্রী                                                                              
লেইয়ে - লেহন                                                                                                
ডলিলে - মলিলে                                                                                               
@ - এই অক্ষরগুলি ছাপা নেই বা পড়া যাচ্ছে না।                                                        

.                  ****************
                        
.                                                                               
সূচীতে . . .   



মিলনসাগর