কবি হেমলতা দেবীর কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
কবি ও যোগী
কবি হেমলতা দেবী

কবি ভালবাসো ছবি যোগী ভালবাসে যোগ,
কবিতে যোগীতে কভু এক নহে ভোগ।
কবি চাহে আপনারে বাজাইতে ছন্দে,
যোগী চাহে মিলাইতে “একের” আনন্দে।
কবি দেখে তাসে তালে বাজে বিশ্ব সুর,
যোগী দেখে সবই “একে” আছে ভরপূর।
কবি চাহে রূপ মাঝে হইবারে লয়,
রূপের অভাবে তার প্রাণ নাহি রয়।
যোগী চাহে সর্ব্বরূপ করিয়া মন্থন,
উঠে যে মহান সত্য আত্মা মহাধন,
তারি মাঝে আপনারে করিতে বিলীন ;
কবিতে যোগীতে এই ভেদ চিরদিন।

একদিন যোগী সনে পে’ল কবি দেখা,
ললাটে দেখিল তার যোগানন্দ লেখা,
বলিল হে যোগী তুমি পাও কোন্ রস
চিত্ত যাহে নিত্য তব হয় হেন বশ ?
যোগী কন, তারে আমি কহিতে না জানি
রূপারূপ যোগে সেথা নাহি ফুরে বাণী।
শুনিয়া কবির চিত্তে ভাতিল যে ছবি
কবি হ’ল যোগী, তাহে যোগী হল কবি।

.          ****************  
.                                                                                
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর
*
সুন্দর
কবি হেমলতা দেবী

একটি সন্ধ্যায় মোর সুন্দর করিয়া,
একটি তন্দ্রার ঘোর স্বপনে ভরিয়া,
এস হে প্রাণের মাঝে পরম সুন্দর,
ক্ষণ তরে তব হেরে জুড়াক্ অন্তর।
একটি পরাণে ক্ষণ-মিলনের সুখ,
সহিতে পারে যে চির বিরহের দুখ।

.          ****************  
.                                                                              
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর
*
সাগরকূলে
কবি হেমলতা দেবী

সাগরের কূলে উপল খণ্ড
.                পড়ি রহে দিনরাত
ঢেউগুলি তার চরণের মূলে
.                করে আসি প্রণিপাত।
প্রণমি তাহারা দূরে চলে যায়
.                অতল সাগর পানে,
ধৌত করিয়া পাষাণের কায়া
.                পাষাণ তাহা না জানে।
যবে পাষাণের শিলাময় দেহ
.                গলিয়া হইবে ক্ষয়,
জলরাশি সনে মিলায়ে আপনা
.                অকূলে হইবে লয়।
ঢেউ হ’য়ে পুনঃ ফিরিয়া আসিবে
.                যেথা সাগরের কূল,
ধৌত করিবে নিশিদিন ধরি
.                শত উপলের মূল।

.          ****************  
.                                                                                
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর
*
ভুল
কবি হেমলতা দেবী

সাগর তীরে          বালুকা ঘিরে
বাঁধিনু যে রে ঘর,
কেমনে তনূ          রাখিবে অণু
মানিনু নাহি ডর।
উঠিল যবে          ভাঙ্গন রবে
দুলিয়া ফুলি জল,
নিমেষ পাতে          আপন সাথে
লইল মোরে তল।
অতল তলে          সাগর জলে
পড়িয়া আজি হায়,
কাতরে স্মরি          কেমনে তরি
কেমনে দিন যায়।
সাগর যবে          শুকাবে তবে
পাইব আমি কূল,
ফিরিব দ্বারে          হেরিব যারে
জানাব মম ভুল।
আজি এ আশা          অকূলে ভাসা
দুকূলে সীমা নাই,
বালুকা পরে          কেহ যেন রে
না রচে গৃহ ভাই।


.          ****************         
.                                                                                
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর
*
সাগরে সূর্য্যোদয়
কবি হেমলতা দেবী

নীল সাগরে সোণার তরী
.                কে ভাসালে বল্,
এই তরীতে পারে নিতে
.                কে ডাকেরে চল্।
তরণী তার আগাগোড়া
বাইরে ভিতর সোণা মোড়া
সোণার রঙে সাগর জোড়া,
.                আলো ঝলমল্।
নেয়ে তরী নাচায় সুখে
নীল সাগরের কালো বুকে
আমার পরাণ সুখে দুখে
.                করে টল্ টল্।
তরণী ঐ যায় রে বেয়ে,
সোণার হালে সোণার নেয়ে,
আমার পরাণ রয়’ যে ছেয়ে
.                ঘন কালো জল।

.          ****************  
.                                                                                
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর
*
সাগরে সূর্য্যাস্ত
কবি হেমলতা দেবী

.        উদয় অস্তে তোমার হস্তে
.                ন্যস্ত বিশ্বভার,
ওহে    বিশ্বরূপের দীপ্ত আধার
.                তিন ভূবনের সার।
.        বন্দি তোমার সান্ধ্য কিরণ
.        ত্রিতাপ আমার হয় যে হরণ
.        সুপ্তি আমার মুক্ত-স্বপন
.                শান্তি পারাবার।
.        সবার নয়ন আপন হাতে
.        লও হে তোমার অস্তপাতে
.        ডুবাও তাদের আপন্ সাথে
.                কোন্ সাগরের পার ?
.        কোথায় তোমার সে রাজধানী
.        মিলাও যেথায় সকল প্রাণী
.        যেখান হ’তে আবার টানি
.                আন এ সংসার।

.                 ****************  
.                                                                                
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর
*
মহাপ্রসাদ
কবি হেমলতা দেবী

কবির মত হৃদয় আমার
.                নয়কো সদাই তরঙ্গিত
কথায় কথায় হয় নাকো তাই
.                মরমখানি উচ্ছসিত।
তাইতে আমার সকল কাজে
.                নাইক লীলার মন্দগতি
দু’এক আখর টানতে গেলেই
.                অমনি পতন ছন্দ যতি।
কাব্যে আমার নাই অধিকার
.                কবি সাজাই বিড়ম্বনা
সভ্য হলে কবির দলে
.                সাজা পাবার সম্ভাবনা।
ভয়ে ভয়ে তাইতে আমি
.                সরিয়ে নিলেম আসনখানি
বিনয় ভরে ভাবের ঘরে
.                দিলেম সুখে আগল টানি।
সেদিন হতে কাজের স্রোতে
.                যাচ্ছিল মোর মনটি ভেসে
কেমন করে লাগল আজি
.                ভাবের তুফান তাইতে এসে।
কেমন করে কাজের ঘরে
.                জমল এসে ভাবের পাড়ি
হাল ধরেছে কাজের নেয়ে
.                যাচ্ছে বেয়ে ভাবের দাঁড়ি।
স্থান ছিল না কবির সভায়
.                ছিলেম সেথায় ভাগ্য হত
তাই বলে কি আনন্দ মোর
.                বিদায় হবেন জনম মত ?
গুপ্ত আমার আনন্দটি
.                লুপ্ত হবার নাই ভাবনা,
অহর্নিশি হিয়ায় বসি
.                করছিল সে কাজ সাধনা।
সকল কাজে হিয়ার মাঝে
.                নিত্য তাঁরে স্মরণ করি,
চিত্ত ভাবের “মহাপ্রসাদ”
.                পান করেছে কণ্ঠ ভরি।

.                 ****************  
.                                                                                
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর
*
ভারত সন্তান
কবি হেমলতা দেবী

আন্তর মাঝে যত বাঁকা আছে
.        করেছে যে তারে সোজা,
চিন্তার মাঝে যত আঁকা আছে
.        ফেলেছে যে তার বোঝা,
শূণ্য হইতে পূর্ণ আসিয়া
.        করেছে যাহাতে বাস,
আগু পাছু আর বাধা নাহি যার
.        মুক্ত চিত্তাকাশ,
শ্রেয়ের সাধনা, শ্রেয় আরাধনা
.        জাগিছে যাহার প্রাণে,
উন্মুখ হয়ে ভারত তাকায়ে
.        রয়েছে তাহার পানে।
সুখ দুখ যারে পরশিতে নারে
.        ভয়ের নাহিক লেশ,
সারা ধরণীর রাজা হয়ে বীর
.        ধরে যে ফকির বেশ,
হেলায় তুচ্ছ করে যে রাজ্য,
.        বীর্য্য যাহার দানে,
উন্মুখ হয়ে ভারত তাকায়ে
.        রয়েছে তাহার পানে।
কিবা জাতি নাম কোথা তার ধাম
.        নাহিক তাহাতে কাজ,
হেন সন্তানে আপনার জেনে
.        বরিবে ভারত আজ।
দেখাবে ভারত চরম লক্ষ্য
.        রেখেছে মোক্ষ পানে,
জগত্পূজ্য তাহার কার্য্য
.        জগৎবাসী তা জানে।

.          ****************  
.                                                                                
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর
*
কামনার ধন
কবি হেমলতা দেবী

সকল প্রকাশ আপনায় যিনি
.                রেখেছেন করি জড়
যাঁহার অধিক ছোট নাই কিছু
.                নাহিক যাঁহার বড়।
কুঁড়িটি ফুটিলে আপনায় যিনি
.                আনন্দে হন ভোর,
তৃণ সনে যাঁর বাঁধা আছে প্রাণে
.                অক্ষয় প্রেম-ডোর।
সুদূর হইতে আসন যাঁহার
.                মানবের দুখে টলে,
প্রসারিত যাঁর অবাধ বক্ষ
.                শূণ্যে জলে স্থলে।
সবার আঘাত দিনরাত যাঁর
.                আপনার বুকে বাজে,
ব্যাকুল হৃদয় তাঁহারেই চায়
.                তাঁহারেই শুধু খোঁজে।

.                ****************  
.                                                                                
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর
*
মাল্যদান
কবি হেমলতা দেবী

চির পুরাতন                সেজেছ নূতন
বেজেছ মরম
বীণার তারে,
অনাদি যুগের                দুঃখ সুখের
বারতা গেঁথেছ
নিত্য-হারে।
দিয়েছ হে সুখ                দিয়েছ হে দুখ
ভেঙ্গেছ হৃদয়
বেদনা-ভারে,
গেঁথেছ দোহায়                আপন হিয়ায়
সুখ দুখ আজি
লয়েছ পারে।
হাসায়ে কাঁদায়                কত না সাধায়
এনেছ হে আজি
তোমার দ্বারে,
এত সাধনার                মালাটি আমার
তোমা বিনা আর
পরাব কারে ?


.          ****************           
.                                                                                
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর
*
নারীর জীবন
কবি হেমলতা দেবী

নারীর জীবনে নাই প্রয়োজন
স্বাধীনতা, হেন সুখের কথা
বলেছিল সে গো কোন্ জন ?
বুঝছিল সে কি নারীর ব্যথা ?

জেনেছিল সে কি নারীর জীবনে
মরেছে গুমরি বেদনা কত ;
কত দিবসের কত কল্যাণ
দিনে দিনে সেথা হয়েছে হত ?

হেরেছে কি সে নারীর ললাট
কুঞ্চিত কত করেছে কালে ;
কত জনমের বঞ্চনা-রেখা
সঞ্চিত তার হয়েছে ভালে ?

বিধাতার বল, নাহি যাহে ছল,
নাহি যাহে হেলা কাহার তরে,
যার মহাদান সবারে সমান,
কহে নারী আজি তাহারি ভরে---

নারী কি মায়ার ছলনা-মূর্ত্তি ?
নারী কি কেবলি নরের ভোগ্যা ?
নহে কি জননী, নহে কি ভগিনী,
নহে কি বিশ্বহিতের যোগ্যা ?

নারীর জীবনে নাই কি সাধনা ?
পশে নাকি সেথা জ্ঞানের রশ্মি ?
জানেনা কি নারী জ্ঞানের আলোকে
ফেলিতে আপন কামনা ভস্মি ?

নারী কি তাহার বাসনা-বিকার
জানে না ঊর্দ্ধে করিতে লয় ?
সে কি গো জানেনা আগন চেতনা
করিতে ব্যপ্ত বিশ্বময় ?

নারীর জীবনে প্রেমের বসতি,
একথা জানেনা আছে কি কেহ ?
ক্ষণকাল ধরা পারে না রহিতে
না থাকিলে হেথা নারীর স্নেহ।

নারীর হৃদয়ে প্রেমের জনম ;
সেথা আসি, প্রেম, প্রকাশ তুমি।
প্রেম কহে আমি ফুটিতে পারি না
না পেলে মুক্ত স্বাধীন ভূমি।

.          ****************  
.                                                                                
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর
*
যোগীবেশে
কবি হেমলতা দেবী

দুঃখ সুখের ওপারটিতে বাঁধব আমি ঘর,
সেথায় গিয়ে তোমার সাথে মিলব যোগীবর।
আমার মনের এই আশাটি বিফল হবার নয়,
যতই কঠিন হোক না কেন দুঃখ সুখের জয়।
সকল ত্যাগি তোমার লাগি দুঃখের ভাগী হব,
এই কথাটি মনে আমার রয় গো যদি ধ্রুব ;
তবেই আমার মনের আশা বিফল হবার নয়
যতই কঠিন হোক না কেন দুঃখ সুখের জয়।
তুমি যোগী তোমার মনে নাইকো কোন আশা
তাইত সেথা দুঃখ সুখে বাঁধতে নার বাসা
তোমার মনের সঙ্গে আমার মনটি করি লয়
অনায়াসে করব আমি দুঃখে সুখে জয়।
তোমার সাথে ধরবে আমার ধরবে যোগীবেশ
সুখে দিয়ে জলাঞ্জলি দুখের পর্ব্ব শেষ।
ওহে যোগী তোমায় মাগি---শুধু তোমায় চাই
দুঃখ সুখের বালাই আমার তার সীমানা নাই।

.                ****************  
.                                                                                
সূচিতে . . .   



মিলনসাগর
*