জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রর কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
*
প্রথম মেজাজে ছুটি সুরের আলাপ মেশে
বার্লিনের হাত ধরে সুরের মেজাজে
জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র      

.                     ১
প্রথম মেজাজে ছুটি সুরের আলাপ মেশে
অস্থায়ী আভোগে | ভোর দিল্লির মাঠ
পালামের অন্তরায় উড্ডীন আকাশে |
কিছু ঘুম, কিছু হাই-তোলা শ্লথ আরামের নেশা |
মিষ্টি ঠান্ডা আবরণে কুয়াশার স্বপ্ন ঢাকা
বিরাট জটায়ু প্লেনে এখনই তো পাখা-মেলা ছুটি |
আকাশে-আকাশে মাখে অন্য রং মেঘে লীন |
মস্কৌ | বার্লিন |

.             ****************                                                         
সূচিতে    




মিলনসাগর
*
অনেক উঁচুতে দেখি নম্র কলোনিতে
বার্লিনের হাত ধরে সুরের মেজাজে
জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র      
.                   ২

অনেক উঁচুতে দেখি নম্র কলোনিতে,
সূর্যের উজ্জ্বল হাত ছুঁয়ে-ছুঁয়ে এসে গেছে
আমার কাছের সব চৈতন্যের মূর্তিদের পাশে |
যেন কোন ইতিহাস থেকে দেখা ইতিহাস হয়ে
সুউচ্চ চূড়ার স্বর্ণ-ঈগলের চিন্ময় সোনায় |
নিচে দেশ মহাদেশ একাকার যাত্রা বেগে
ভৌগলিক সত্তার মন্থনে |  চিত্রল আবেগ
সর্বংসহ রচনায় নানা ছকে
উন্মীলিত নিমীলিত মিনিটে-মিনিটে |

.             ****************                                                         
সূচিতে    




মিলনসাগর
*
মস্কৌর  সংলাপ
বার্লিনের হাত ধরে সুরের মেজাজে
জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র      

.                        ৩
         
কিছু ভাঙা-ভাঙা রোদ |  মেঘছায়া এয়ারপোর্ট,
লাউঞ্জে বিরতি | পাসপোর্ট নিয়ে
কিছু প্রশ্নের উত্তর এই পৃথিবীর পরিচয়ে
উজ্জ্বল স্বদেশ | ভারতীয় বন্ধু,
এই সব অসম্পূর্ণ অস্তিত্বের কঙ্কাল পাথর চড়া
মজা নদী চোরাবালি---- পাহাড় গলিতে
গাঁজা ভাং জুয়াড়ি আড্ডায়---- ছড়াব নূতন বীজ !
আশ্বাসের ঝড় নিশ্বসিত জনতার বুকে, বস্তির শরীরে
আনবে ক্ষেতে মাঠে কারখানায় রূপান্তর অতন্দ্র আয়াসে |
নূতন স্বপ্নের মূর্তি ভাস্কর্যেই প্রাণ পাবে
প্রত্যেকের হাতে-হাতে যুগান্তের রূপকার শৈলীর প্রসাদে
কাস্তে হাতুড়ি ছেনি লাঙলের ফাল | আর ক্লান্তির সকাল
প্রত্যয়ের মুষ্টি তুলে আনে প্রতিশ্রুতি |
ভেদাভেদ মতামত উত্সন্নের সীমা
নূতন নায়ক সত্তা দুঃসাহসী অজর উল্লাসে
নির্ভুল পেরিয়ে যাবে অন্য প্রান্তে গান্ডীবী শিবিরে |
এখন তো ক্লান্তি নেই, বার্লিনের উত্সব শিরায়,
স্বর্মপ্রাণ পৃথিবীকে প্রেয়সীর মতো বেঁধে রাখা
বাহুবন্ধে আলিঙ্গনে, বীরের চুন্বনে |
নূতন ফুলের গন্ধে, শিশুদের কলস্বনে ভরা আঙিনায়
মায়েদের মমতায় বিশ্বমানবের লক্ষ্ণী
পদ্ম-পা ফেলে-ফেলে আঁকবে আলপনা
দেশে-দেশে নগরে বা গ্রামের প্রাঙ্গণে |
অনেক উচ্ছাস আর কাব্যের পরও
বাকি থাকে সশস্ত্র প্রস্তুতি,
বিপ্লবের গুলিবিদ্ধ যন্ত্রণার গানে,
সমস্ত নেতির প্রতিবাদে |
কারণ এখনও আছে নরকের দাবদাহ, শিশুমৃত্যু, অনাহার
পৈশাচিক ধ্বংসের বিদগ্ধ শিল্পীরা |
তাই তো সৈনিক হই পদে-পদে বহুমুখী কাজে,
বার্লিনের হাত ধরে সুরের মেজাজে |
তবু জ্বলন্ত মমতায় সাবধানী চক্ষু মেলে দ্যাখে |
ছবিতে মেলায় চারিচক্ষু মিলনের প্রতিকৃতি |
তারপর খাদ্য কিছু, পানীয় কিছু বা |
বেদুইন, খর্জুরকুঞ্জের বিশ্রামে
সমাধিস্থ প্রতীক্ষায় স্থবির মননে,
স্মৃতিতে অঢেল ঢেউ উদ্বেল উত্তাল |
ইতিহাস ভাঙে গড়ে, সময়ের ঘন্টা বাজে------
মস্কৌ ! মস্কৌ  !!

.             ****************                                                         
সূচিতে    




মিলনসাগর
*
লিন্ডেনাউ
বার্লিনের হাত ধরে সুরের মেজাজে
জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র      

.                   ৪
.                         
জার্মানির যৌবনের নাম-----লিন্ডেনাউ |
প্রথমেই বন্ধু হয়েছিল সেই পালামের ভিড়ে |
জার্মানির যৌবনের সাথী হলে অনেক হাঙ্গামা মেটে |
ভাষার হোঁচটে হাত ধরে নিজে পার করে
বার্লিনের ঘাটে | মস্কৌ ছাড়লাম |
ইন্টারফ্ল্যুগ উড়ে চলে | পাশে লিন্ডেনাউ |
নূতন যৌবনের গান, হাইনে-র রসে মজা
লিন্ডেনাউ---- জি ডি আর, রোমাঞ্চ সংবাদ |
পথে যেতে-যেতে সোনালি শস্যের গান |
সোনালি চুলের ক্ষেতে রূপকথা পাতা ছিঁড়ে-ছিঁড়ে
ওড়ায় হালকা মেঘে |
নিচে ফার-বন বার্চ আর চেস্টনাট সারি-সারি পপলার-----
দেওদার বুঝি বা, কিংবা ঝিলমের এপার-ওপার |
মানুষ আত্মীয় সব অরণ্যের সাথে
বিপ্লবের শুশ্রূষায়, শ্রেণীহীন ছায়ার প্রপাতে |

.             ****************                                                         
সূচিতে    




মিলনসাগর
*
বোধন
বার্লিনের হাত ধরে সুরের মেজাজে
জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র      

.                  ৫
                 
মেঘ ভেঙে নিচে নেমে এসে,
ঝুঁকে-পড়া প্লেন থেকে হঠাৎ চকিতে দেখা |
মনে হয় চাঁপাডাঙা অথবা সে কেষ্টপুর ভাঙড়ের বাঁক |
ওডার নদীর পাশে কাটা খাল, চষা মাঠ,
ছোট-ছোট গ্রামের ঘরোয়া বাড়ি | নীল-নীল
দেয়াল-দরজা | নীল চোখ সুশ্রী সুঠাম মেয়ে----
অপরূপ  ভঙ্গির শায়কে আকাশকে বেঁধে |
এই তো সেই ! এরাই তো ! গ্যয়েটে-কে হাইনে-কে
গীতিময় করে তুলেছিল |
আরও নিচে স্পষ্ট হয় গ্রামের কুটির সব,
কাঠ খড় মাটি | কিছু মেলে, কিছু বা মেলে না,
তবু মেলে পৃথিবীর পুরাণের ছবির কথারা
মধ্যাকর্ষণেই বুঝি, পায়ে-চলা মানুষের
অসংখ্য সূর্যের দিন,
অসংখ্য আলোকবর্ষ রাত্রির মেলায় |

.             ****************                                                         
সূচিতে    




মিলনসাগর
*
দুই কন্যা
বার্লিনের হাত ধরে সুরের মেজাজে
জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র      

.                        ৬                        

এই বার বার্লিন সন্ধ্যায় হাওয়াই আড্ডায় |
আপাতত সঙ্গী নেই, ভাষা নেই লিন্ডেনাউ ছাড়া |
কাস্টমস, পাসপোর্ট, সিকিউরিটি তোরণগুলি
একে-একে পার হই তার হাত ধরে |
মাইকে ঘোষণা ----- ‘ভারতীয় অতিথি হাজির’-----
এ কালের চাঁদ বণিক এল বার্লিনে |
সঙ্গে-সঙ্গে ছুটে আসে ফুরফুরে উত্তুরে হাওয়ার মতো
বার্লিনের অভ্যর্থনা, দুই কন্যা, আঞ্জেলিকা, মিলি |
সংস্কৃতি মন্ত্রকের মন্ত্রণায় তারাই হাজির |
প্রথম যৌবনের,
অনেক রাত্রির সব আকাঙ্খিত ছবি থেকে
নেমে এসে দুই হাত ধরে বলে------
প্রতীক্ষায় অনেক ক্ষণ বসে আছি, প্লেন লেট ছিল----
এবার চলুন------ |
এই বার ইয়োরোপের ইতিহাস ঘটনার পথে-পথে
মোটরে উধাও | সঙ্গে দুই কন্যার দুই তারে
খাম্বাজ ঠাটে, মধুর আলাপ------
অস্থাযী অন্তরা, আঞ্জেলিকা, মিলি |

.             ****************                                                         
সূচিতে    




মিলনসাগর
*
আলেকজান্ডার প্লাট্ স : হোটেল স্টাট বার্লিন
বার্লিনের হাত ধরে সুরের মেজাজে
জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র      

.                        ৭

বিরাট উচ্চগ্রীব আকাশছোঁয়া সাঁইত্রিশ তলাই হবে বা-----
বার্লিনের সাম্যবাদী সমাজে আদৃত, অভিজাত উচ্চতায় |
তারই কাছে আরও অনেক উঁচু টিভি টাউয়ারের চূড়ো |
মাথায় গোলক বিরাট, কাফেটারিয়া | আস্তে-আস্তে
ঘন্টায় একবার ঘোরে |  লিফটে উঠে তড়িৎ গতিতে ওঠো
স্ন্যাক বারে কফি বা পানীয় কিছু, কেক ক্রিম ইত্যাদি-ইত্যাদি |
সঙ্গে নিয়ে দোভাষিণী মধুর সঙ্গিনী, ধীরে ধীরে ঘুরে-ঘুরে
বার্লিনের চতুর্দিক দ্যাখো----শহর ছাড়িয়ে আরও দূর-দূর
প্রান্তসীমার পরিচ্ছন্ন পল্লীর শ্যামল কোমল কান্তি |
মার্শাল-ফোর্ডের ক্রুর দাক্ষিণ্যের ফাঁদ অস্বীকার করে
ভাস্বর প্রাণের বেগে হিটলারের ধ্বংসাবশেষ থেকে
উঠে আসে এক অপরূপা সুন্দরী বার্লিন |
নির্নিমেষ হয়ে যায় চোখ তন্ময় নেশায় |
.       সেই হোটেলেরই এক সুসজ্জিত খুপরিতে
বাসা নিল বিদেশি কপোত |
.           অন্য দেশ অন্য অরণ্যের ছায়া
পক্ষপরিবহনেই ওদেশে ছড়াবে |
বার্লিনের, সমস্ত, সাম্যবাদী জার্মানির
সংস্কৃতির নৈমিষারণ্যে স্নেহের অতিথি |

.             ****************                                                         
সূচিতে    




মিলনসাগর
*
জাতিস্মর
বার্লিনের হাত ধরে সুরের মেজাজে
জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র      

.                    ৮                         

শিহরিত মনে ভাবি রাস্তায় নেমে,
প্রথম তাকানো মুখ উজ্জ্বল বার্লিনের-----
এখানেই হয়তো বা এ রাস্তারই এধারে-ওধারে,
কোন অলিতে গলিতে-----লন্ডন থেকে এসে
শ্রমিক পল্লীতে, আরও অনেক রাস্তায়
বিরাট যুগান্তকারী পদক্ষেপ পুনঃপুনঃ পূত করে গেছে |
সম্ভাব্য সে বিপ্লবের হাত ধরে-ধরে
কার্ল মার্কস অথবা লেনিন, এঙ্গেলস----
ঐ তো কাছেই সেই রোজা লুক্সেমব্যুর্গ স্ট্রাসে !
রোজার বাড়িতে রাত্রে বিপ্লবের গুপ্ত অভিসারে
নিষিদ্ধ পুস্তিকা, ইসক্রা-র বিদ্রোহের ডাক |
জাতিস্মর বর্ণণায় আরও সব চিত্রাবলি ফোটে----
উন্টারডেন লিন্ডেন, ঐ দূরে ব্রুন্ডেনব্যুর্গ তোরণের ছায়া
গুস্ স্টেপস---- হিটলারি দম্ভের স্পর্ধিত পদক্ষেপে কাঁপে----
আর্নস্ট থেএলমান হিটলারের বলি,
নাৎসি অষ্টমীর শত ছাগবলি রক্তের উল্লাস |
সে সব পায়ের ছাপ নিশ্চিহ্ন মুছে গেছে আজ |
হাইমার লাইপজিগে গ্যয়েটে ও শিলার
আর হাইনে-র কাব্যলীলাপীঠ |
হুমবোলট বিদ্যাপীঠ, পট্ সডাম প্রাসাদের ঘর
সব চিত্র জাতিস্মর আলোতে উজ্জ্বল মুখর |
আরও সব চিত্র রেখে যায়,
বাখের নিজস্ব গ্রাম থুরিঙ্গিয়ায় |
বিটোফেন মোৎসার্ট হাইডেন ব্রাম্ স হানডেল
বন, ম্যুনশ্যেন থেকে সেই ভিয়েনায়----
একই পল্লী একই স্বরগ্রাম যেন
ঐকাত্ম্যের গ্রামে |

.             ****************                                                         
সূচিতে    




মিলনসাগর
*
নীলে নীলে আকাশের সুনীলে
বার্লিনের হাত ধরে সুরের মেজাজে
জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র      

.                    ৯                         

গ্যুলডেনাউয়ার ভেগ ৪৯, ক্যুপেনিক ---- ঠিকানা দিলাম |
থাকে সুনীল---রামু যাকে বলি, আর বারবারা
বাংলাভাষী  রামু-পত্নী |
আপেলের বাগানে-বাগানে ছয়লাপ,
টারনিপ্ লেটুশের মেলা |
মাটি খোঁড়ে, বাগানের কাজ করে
অবসরের ফসল ফলায়---রামু,বারবারা |
আমরাই দুই ভাইবোন যেন সেই সুদূর বার্লিনে
তুলে আনা বাংলার গ্রামে |
তাদের শিশুর নাম ‘অসীম’-------
টিউলিপ বলে ডাকি আদরের ঢঙে |
অসীম বিস্তার সেই স্নেহ মহাদেশে
অনেক অসীম |
.        আর-এক প্রান্তে থাকে আর এক সুনীল-----
সেনগুপ্ত সে | সুনীলভার্যা সুশ্রী কারিন এবং
সন্তান---- দুই ভাইবোন----
বেড়ে ওঠা লিন্ডেন, বার্চের মতো, কিশোর-কিশোরী |
তাদের গৃহের মনে উপভোগ্য সুস্বাদু ফলের ঘ্রাণ |
যেন বাংলার আমজামকাঁঠালের ফলের বাগানে |
জার্মান অনুবাদে লাগে পাকা আপেলের রং,
অথবা পীচের | আতিথেয়তায়
মশলা ফোড়ন দিয়ে কার্প রাঁধে, জার্মান রুই বা মৃগেল |
সুনীলের হাতে পাই স্বদেশের ব্যঞ্জনা স্বাদে ও ভাষায় |
রামু-বারবারা আর সুনীল-কারিন একই কবিতার চার কলি----
প্রবাসের রম্য পদাবলি |
নিচে নেমে দেখি,
পান্নারং পার্কের মাঠে, নানা রং ঘুড়ি ওড়ে অপূর্ব বাহারে |
মাঠে-মাঠে শিশুরা ওড়ায়, হাততালি দিয়ে হাসে |
.         ঘরে-ঘরে ঘুড়ির স্বদেশ মুক্তির হাওয়ায় বিলীন |
.        নীলে-নীলে আকাশের সব নীলে আনেক সুনীল |

.             ****************                                                         
সূচিতে    




মিলনসাগর
*
অক্টোবর ক্লাব : বার্লিন
বার্লিনের হাত ধরে সুরের মেজাজে
জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র      

.                   ১০                        

ঢুকে দেখি সব তরুণ-তরুণী নদী হয়ে গেছে |
সুরে-সুরে নানা যন্ত্রের মতো বেজে উঠে তারা উত্তাল |
রিহার্সাল উত্সবের ! অক্টোবর রিহার্সাল !
ফোকলোর, নানা শস্যের গান,
ফলের বাগান, প্রেয়সীর নাম
শুনে চুন্বনে প্রেমিকের গান----
নূতন জীবন প্রেমিকের গান |
জ্যাজ ঢঙে সব কন্ঠ মেলায় |
গিটার পিয়ানো রাখালের বাংশি
ড্রাম ট্রমবোন ব্যালালাইকা
একাকার সব স্রোতের মাথায় |
মধূকর মাঝি সপ্তডিঙায়,
অনুভবে নানা রং লাগে, তোলে
পাল সাত রং মত্ত হাওয়ায় |
কথাবার্তায় হৃদয়ে হৃদয়
মেশে | আমাদের জীবনের গান
গ্রাম মাঠ নদী সাগরের তান
শুনতে চায় ও বুঝতে চায়  |
আমিও তো নদী, পদ্মায় ভরা গাঙে জোয়ারের
কন্ঠ ভাসাই,
নবজীবনের তরঙ্গ তুলি----
একাকার নদী, নদীতে জীবন সপ্তডিঙা |

.             ****************                                                         
সূচিতে    




মিলনসাগর
*
আলেকজান্ডার প্লাট্ স : ফেস্টিভ্যাল সন্ধ্যা
বার্লিনের হাত ধরে সুরের মেজাজে
জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র      

.                ১১

এখানে সকলে প্রত্যয়ে নামে রাস্তার ট্রামে |
স্থির বিশ্বাস, অন্ধতা নয় | যেন মনসার ঠানেতে
রেখেছে মানত, নিজের জান দেবে প্রাণ দেবে |
নিজের যা আছে সব কিছু দিয়ে জীবন গড়বে |
তাই কি সকলে প্রত্যয়ে নামে রাস্তার ট্রামে,
রেলে বাসে চাপে | প্রত্যহ তাপে
হৃদয়ে হৃদয় উষ্ণ ছোঁয়ায় কর্মকুশল |

সবটা আকাশ সূর্যমূখর হোক বা না-হোক,
কখনও মেঘ এসে ছায়, কুয়াশার প্রাকার ঘেরে |
টিপটিপ বৃষ্টির ছাট, ছোটে তীক্ষ্ণ বাতাস-----
ধারালো ফুঁয়ে সোনালি চুলের স্রোতে লাগে ঢেউ |
কিশোর যুবক হাসি হাসি মুখে কর্মমুখর
হঠাৎ কেউ বা ছুটে এসে চুমু খেয়ে যায় কোন কিশোরীমুখে-----
( অবশ্য জানি সারা ইয়োরোপই চুম্বনপূত ! )
প্রাণ চায় তাই চক্ষুও চায়, দুঃসহ নয় কোন লজ্জায় |
সকলেই তাই প্রত্যক্ষেই চুমু খায় কাজ করে গান গায় |
কী যেন একটা জগদ্দল পাষাণ সরেছে |

দেশের বুকেতে চেপে-বসা সেই হিংস্র কামড়
রক্তপিপাসু ----এখন তো নেই |
গুঁড়ো হয়ে গেছে পাষাণদুর্গ, আর্য দানব |

মুক্ত হয়েছে প্রাণের ফোয়ারা, যৌবনেরই আলোকোজ্জ্বল
আলেকজান্ডার প্লাট্ সে অথবা সারা বার্লিনে |

সকলে ব্যস্ত উত্সববেশে | সারা সোশ্যালিস্ট দেশই জমেছে
এই প্রাঙ্গণে, আলোকোজ্জ্বল ফোয়ারাকে ঘিরে |
নিষ্ফল নয় জীবন-জাগানো আনন্দগান |

সকলে ব্যস্ত তবু গান গায় |  কোরাসে কোরাস
মেশে সকলের সুরের ভাষায় | পান করে আর
নৃত্যে মাতায়--- সারা পৃথিবীর মানুষকে টানে |
প্রবল আবেগে জড়িয়ে ধরেছে নূতন জীবন
নূতন প্রাণের স্বপ্নসফল কর্মে গানে |

.             ****************                                                         
সূচিতে    




মিলনসাগর
*
হাইদে মিলিনস্কি এসে নিয়ে যায়
বার্লিনের হাত ধরে সুরের মেজাজে
জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র      

.                 ১২

হাইদে মিলিনস্কি এসে নিয়ে যায় এখন সকাল
পেরাগামন্ অলটারের কাছে গিয়ে দেখি
স্তম্ভিত পুরাকাল |
অবাক বিশ্ময়ে দেখি, স্তম্ভে
পাথুরে পেসীতে তোলে গ্রিসের রোমের কত
স্তব্ধ কথকতা | কোরিনথিয়ান বেদি
প্রাচীন পুরাণ থাম ধরে রাখে ভাস্কর্যের ফুল |
যুদ্ধের তান্ডবে কিছু ভেঙে পড়ে | কিছু ছিঁড়ে যায়
সেই পুরাণের মর্মরমালা |
অসীম মমতায় নিয়ে যায়, আবার ফিরিয়ে দেয়
বৈজ্ঞানিক গ্রন্থনায় সোভিয়েট শুশ্রূষা
জার্মানিরই হাতে |

.             ****************                                                         
সূচিতে    




মিলনসাগর
*
ট্রেপটাউ পার্ক
বার্লিনের হাত ধরে সুরের মেজাজে
জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র      

.             ১৩   

বীরের সমাধি |  প্রায় পাঁচ হাজার লাল ফৌজ
মৃত্যুর কোরাসে গায় মৃত্যুহীন গান,
বার্লিনের পতনের মুখে
মৃত্তিকার মমতায় নম্র ঘাস হয়ে |
দুই গ্রিক বন্ধুর সঙ্গী হয়ে নিয়ে যাই
শ্রদ্ধার ফুল -----
লাল টিউলিপ লাল ডেলিয়া গোলাপ |
অর্ঘ্য নেয় প্রকান্ড শৌর্যের সৈনিক |
উচ্চশির মূর্তি তার আকাশকে ছোঁয়----
অজেয় প্রহরী |
হাতে তার মুষ্টিবদ্ধ শত্রুঘ্ন অসি-----
আনে বরাভয়, গান |
অশৃঙ্খল হাওয়ার জোয়ারে মাথা নাড়ে
পাতা ঝিলমিল সাড়া দেয় ডাকে ট্রেপটাউ পার্ক |
নির্ভয় শিশুরা খেলে  |  ঘিরে থাকে
বিশ্বজয়ী স্নেহের মতন,
দীর্ঘদেহ বার্চ ফার পপলার সেডার |

.             ****************                                                         
সূচিতে    




মিলনসাগর
*
রঙ্গমঞ্চে প্রেমিকের মতো
বার্লিনের হাত ধরে সুরের মেজাজে
জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র      

.                        ১৪

.          রঙ্গমঞ্চে   প্রেমিকের   মতো
যেখানে মানুষ শুধু মাংস বস্তুপিন্ড নয়
শোষণের আবর্জনা পরাজিত হলে


উন্মুক্ত আকাশ পায় |  সে আকাশ ধরে রাখে
মানুষের সভ্যতার বর্ণচ্ছদ পট |


উজ্জ্বল রৌদ্রের গন্ধে নেশা লাগে
শিরায়-শিরায় |


সমস্ত দিন শুধু রাস্তায় ঘুরে-ঘুরে
ব্যস্ত নরনারী শিশু যুবকযুবতী দেখে কেটে যায় |
ইয়োরোপীয় ইতিহাস স্থাপত্যের ছায়ায়-ছায়ায়
কলাবতী সন্ধ্যা নামে |


সামনে আলো জ্বলে ----
Komische Opera----
কমিক অপেরাগৃহ |

ঢুকে পড়ি | শুনি,
এদেশি ফুলের স্তবে সুরধন্য যৌবনের স্নানে
বসন্ত মঞ্চস্থ হয়,
‘ফিগারো’র বিবাহের মজাদার গানে |


মোৎসার্ট পাশে বসে যেন শোনে খুশির সে পালা
আমাদেরই কানে |
অন্য দিন, মেট্রোপোলে ‘জুপিটার সিম্ফনি’----


গান সুরযন্ত্রের বায়োলিন ভিওলার তানমূর্ছনার
সমুদ্রে উত্তাল  ঢেউ | সৈকতে হাসির ফেনা----
Cosi Fan Tuttle,  অথবা পোলান্ডের দল
বিখ্যাত পজ্ নান কয়ার কন্ঠকলা চাতুর্যের
অমেয় চূড়ায় ছড়ায় ফুলের মতো রৌদ্রের সৌরভ |

অথবা, হঠাৎ নেচে ওঠে সেই লেনিনগ্রাদের
মিনিয়েচার কোরিয়োগ্রাফিক দল |


দেহের পেশীতে লাগে বহুভঙ্গ ছন্দের আবেগ-----


ছোট-ছোট বিস্ময়ের স্পুলিঙ্গে বাজিকর
বাজিমাত করে |


এই সব নানা রং গানের স্ফুলিঙ্গ ফুল সমুদ্র আকাশ
সমগ্র মানবজাতি হাতে হাত দিয়ে বসে দেখে,
মহান বিপ্লবপূত জীবনের রঙ্গমঞ্চে প্রেমিকের মতো |

.             ****************                                                         
সূচিতে    




মিলনসাগর
*
ব্রেশট থিয়েটার
বার্লিনের হাত ধরে সুরের মেজাজে
জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র      

.               ১৫              

টিকিট পাঠায় মিলিনস্কি |
জীবনের কুরুক্ষেত্রে হাসিকান্না সংঘর্যের
বিপ্লবের যন্ত্রণার নাট্যপীঠে যাত্রা |
প্রেক্ষাগৃহে বিনম্র ছাত্রের মতো ঢুকি
অনেক দিনের আকাঙ্খা পূর্ণ হবার আশায় |
পাশে বন্ধু শ্রীলঙ্কার নাট্যকার এলসন |
গোর্কির মাদার | পর্দা উঠে গেল |
দেখলাম স্টেজটা ঢালু সামনের দিকে ঝুঁকে-পড়া |
উইঙের একধারে বক্সের পাশে বিবেকের মতো
ঘোষক গায়ক, তীব্র দুই চশমা-পরা চোখ |
ফ্ল্যাট আলো স্টেজের উপর, এবড়োখেবড়ো
শ্রমিক পল্লীর ছাপ, মালিন্য, বিদ্রোহরুক্ষ |
চলতে-ফিরতে লোহার পাতের তীক্ষ্ণ আওয়াজ
আবহ সৃষ্টি করে| ঘোষকের প্রত্যেক গানের আগে
ড্রামের ঝনঝনা  |  ঝড়ের সংকেত |
সেই ছেলেবেলায় পড়া গল্পের ব্রেশট-ভাষ্য |
গুপ্ত ষড়যন্ত্র স্ট্রাইক বিদ্রোহ-স্তুতি |
জারের পুলিশদের দৃপ্ত পায়ে ভেঙে গুঁড়ো
করে দিয়ে-যাওয়া
নিষিদ্ধ রাজদ্রোহী ইশতেহার ছাপার প্রেসটা |
মাদারের চরিত্র--- উদ্বিগ্ন মমতায় কোমল অথচ দৃঢ় |
এবং আবেগবিচ্ছিন্ন,
আজকাল অবশ্য আমাদের দেশেও ব্রেশট-চর্চা
সনিষ্ঠ সরব সশ্রদ্ধ |
কিন্তু এখানে এই ব্রেশটের দেশে
তার আসল ভাবমূর্তিটা যেন দেখতে পেলাম |
প্রত্যেক নট-নটী আবেগের ঝড়ে-পাওয়া নদীর মধ্যে
চলাফেরা করে ওয়াটারপ্রুপ -ঢাকা নৌকোর মতো
দোলে কাঁপে উত্তাল হয় অথচ ভেজে না |
এ এক অভূতপূর্ব বিচ্ছিন্নতার তপস্যা | অসাধ্য সাধন !
একটা দৃশ্যে দেখি, মাদার, আবেগবিচ্ছিন্ন ভাবে শোনে
ছেলের ওপর পুলিশের অত্যাচার |  ছেলের বন্দিদশা দেখে
জেলে | হঠাৎ একটা হাহাকার আর্তনাদ ওঠে |
তারপর হঠাৎই চুপ | মাদার সোজা
দর্শকদের কাছে চলে আসে
বেদনায় স্থিরচক্ষু, পাথর | নিজের দুঃখের কাহিনী
শোনায়, মন্তব্য করে নিরাবেগ ঘোষণার মতো  |
.        অনেক সংঘর্ষে যুঝে, মাদার এখন ক্লান্ত
বিধ্বস্ত | বেদনার নেশায় ঘুমিয়ে পড়েছে |
ওদিকে জারের পুলিশের অত্যাচারে পার্টি বিপর্যস্ত |
ছেলের দল, কর্মীর দল ধরা পড়ছে একে-একে |
বন্দিশালায় নির্যাতিত তারা  | নির্বাসিত দেশের যৌবন |
সমস্ত দেশের পার্টির হয়ে ঘোষক গেয়ে ওঠে
মাদারকে জাগানোর গান তীব্র দীপ্ত কন্ঠে :
.                 বড়ই বিপদ পার্টির,
.     আর ঘুমিও না, ওঠো | -----কশাইদের কারখানায়
ভয়ঙ্কর তীক্ষ্ণ প্রতীক ( জীবনে ভোলবার নয়  )------
একেবারে উপর থেকে ঝুলিয়ে দেওয়া শিকে বেঁধা
আস্ত ছাল-ছাড়ানো লাল মাংসরং গরুর দেহটা |
ছুরি নিয়ে মাংস কেটে-কেটে নিচ্ছে |  ছুরি শানিয়ে নিচ্ছে
মাঝে-মাঝে | কশাইদের কথাবার্তা বিতর্ক বিদ্রোহ |
স্ট্রাইকের জল্পনা ----জারের অত্যাচারের প্রতিস্পর্ধী |
তীব্র নিষ্ঠুর এক ব্যঙ্গের প্রতীক !
ব্রেশট-ভাষ্যে মনে হয় যেন, জার-ই কশাই----
শানানো ছুরিটা নিয়ে
রক্তমাখা দেশের দেহ থেকে মাংস কেটে-কেটে নিচ্ছে,
সুস্বাদু আহার্যের মতো |
.        শেষ দৃশ্যে সমস্ত কুশীলব কাহিনীর বর্ণনায়
বিদ্রোহের জয়গান করে ওঠে----
অবিস্মরণীয় এক বজ্রকন্ঠ উজ্জ্বল কোরাসে |
.        তারপর একে-একে মাদার কারেজ
থ্রি-পেনি অপেরা-----
সবেতেই আছে সেই বিচ্ছিন্ন আবেগের
অবিচ্ছিন্ন তপস্যারভাষা, গানে অভিনয়ে |
আলোচনাচক্র বসে | যোগদান করি |
ভারতের রঙ্গমঞ্চে নাট্যচর্চার ধারা ওদের জানাই |
বিতর্ক চলে, নানা প্রশ্নও ওঠে | প্রশ্নের উত্তর ঘোষিত হয়----
স্তানিশ্লাভস্কি আর ব্রেশট----
পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী পরিপন্থী নয় তো মোটেই |
স্তানিশ্লাভস্কি-ই এক স্রোতে ভেসে
বিপ্লবের প্রবাহে এগিয়ে গিয়ে ব্রেশট হয়ে গেছে |


.             ****************                                                         
সূচিতে    




মিলনসাগর
*
ড্রেসডেন
বার্লিনের হাত ধরে সুরের মেজাজে
জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র      

.                ১৭
.                        
ট্রেনের জানালা অফুরান মাঠ গাছ গম্বুজ
অতিদ্রুত ধাবমান ছবিরং স্বপ্ন সবুজ |
হাত তুলে সহযাত্রী দেখায় সমবায় ক্ষেত
ট্র্যাকটর গরু নবীনধবল |   দূর সংকেত-----
এই বার বুঝি পৌঁছবে এই রূপকথা-ট্রেন,
দুই চোখ দুই শবরীর মতো, দূরে ড্রেসডেন |
প্রতীক্ষা শেষ | শ্লথগতি গাড়ি থামবে এখন
এ কী ! এ যে সুন্দর রূপবান প্রাসাদ স্টেশন !
প্ল্যাটফর্ম নয়, যেন অভিজাত অতিথিশালা |
কাঁচে রং আঁকা পুরাণ-ছবির চিত্রমালা |
হাতে ব্যাগ নিয়ে হোটেল ছুঁয়েই বেড়িয়ে পড়ি |
অনেক দেখার অনেক ছবির স্বপ্ন গড়ি |
ছবির গ্যালারি, পুতুলের দেশ মুগ্ধ অবাক !
পোর্সিলেনের তুলনাবিহীন কারুকৃতি পাক
স্মৃতির তীর্থে অমরতাপীঠ | কলালক্ষ্ণীর
সুষমা-হরিণ, শিকার হয়েছে | শান্তিশিবির
বোমা বিদীর্ণ, ইতিহাস জ্বলে--- সকলেই জানে
আমেরিকান আর ব্রিটিশ বোমারু ধ্বংস হানে |
কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার এ এক অমোঘ প্রীতি |
মাৎস্যন্যায়ের -----
অথচ ফ্যাশিস্টবিরোধী যুদ্ধে জানায় প্রীতি |
এ ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করেছে লাল সেনানী |
ভন্ড প্রেমের ভান্ড ভেঙেছে | আমরা জানি
দিয়ে গেছে সব, ফিরিয়ে দিয়েছে অটুট করে
লেনিনের দেশ | এ ইতিবৃত্ত যাবে না ঝরে |

.             ****************                                                         
সূচিতে    




মিলনসাগর
*
লাইপজিগ
বার্লিনের হাত ধরে সুরের মেজাজে
জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র      

.                ১৮.                        

.       বেশি দূর নয় ড্রেসডেন থেকে |
উদ্ গ্রীব মন এখনও সে মুখচ্ছবি দেখেনি----বাঁশিশোনা প্রেম |
এই বার লাইপজিগের ইতিহাস গুহা কান্ত নদীর উৎস মিলবে
পৌরাণিক স্মৃতিদের স্রোতে |


সঙ্গে আছে কারিন হোলডার ----যুবমনঃপূত এক বনের হরিণী,
পাশে থেকে দেখায় শহর,
বাখের, গ্যয়েটের আর শিলারের কথামালা গলি |
পথে নেমে সন্ধ্যা নামে | টমাস চার্চের ----Vespers---
সান্ধ্য সঙ্গীতের পাইপ-অর্গ্যান যেন
স্বরের কোরাসে নীল পূর্ণিমার মতো,
জীবনমৃত্যুর পলিমাটির ওপারে এক সমুদ্রের মন
ডুবে যায় বাখের সত্তায় |
.        পরে, উন্মোচিথ হয় উচ্চারিত আলোকের প্রেমিক সকাল
অষ্টাদশ শতাব্দীর চৈতন্য -মেলায় |


পথে-পথে ঘুরি এক রোম্যান্টিক স্নেহে
প্রাক্-বৈপ্লবিক এক ইন্দ্রধনু স্মৃতির বাহারে |


গ্যয়েটে বাল্যলীলা টেভার্ন পানশালায়
ফাউস্টের প্রবল আবৃত্তিগুলি মদমত্ত আবেগের
সোনালি অক্ষরে লেখা দেয়ালে-দেয়ালে |
পথ থেকে নেমে বেশ কয়েক ধাপ নিচে গিয়ে
সেই পানাগার |  য়থাযথ | একেবারে  সেই যুগে
ফিরে যাওয়া আবহ আভায়-----
স্মরণের মুষ্টিভিক্ষা ঝুলি ভরে নেওয়া |
তারপর, লাইপজিগের মেলা চার্চ ডোম
বারোক স্তাপত্য আর বিপণি অপেরা হাউস----
একে-একে পট খুলে দেখা |
কয়েক মাইল দূরে লেনিনের সেই ইসক্রা ছাপার
প্রেসবাড়ি | সবই ঠিক যেমনটি | শ্রদ্ধার চৈত্যে রাখা
স্ফুলিঙ্গের উত্তাপের আরোগ্য শুশ্রূষা |
তোমার হৃদয়ে যদি জ্যামিতিক ছক থাকে স্নেহের মন্তাজে
হে লাইপজিগ ! তবে মনে রেখো --- তোমাকে করেছি ধন্য,
তোমারই বুকের পথ ছুঁয়ে-ছুঁয়ে অমর শ্রদ্ধায় |

.             ****************                                                         
সূচিতে    




মিলনসাগর
*
বার্লিনের হাত ধরে সুরের  মেজাজে
বার্লিনের হাত ধরে সুরের মেজাজে
জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র      

.                ১৯

এ বার প্রত্যাবর্তন --- বার্লিনের পাতাঝরা বার্চবন থেকে |
সমবাদী বিবাদী আর আরোহী অবরোহীর
শততন্ত্রী ঝঙ্কারের রেশ কানে রেখে
এ বার উজানে চাঁদ বণিকের দেশে ফেরা |
মনের বাণিজ্যে জ্বলে অনেক পসরা
সারা দীবনের লক্ষ মুহূর্তের পথে, সাম্যবাদী সমে |
হয়তো বারবারা নেই, মিলি নেই, কারিন সঙ্গিনী নয়,
বাখের প্রসন্ন গান পথে-পথে ছড়াবে না অমর মহিমা |
তবু সব থেকে যাবে বিপ্লবের কুরুক্ষেত্রে
মানসের চৈত্যে-চৈত্য় আস্তীর্ণ সবুজে |
.        এ বারে নূতন নায়ক হয়ে দেশে ঘরে ফেরা |
এখানে এসেই গুপ্ত মালের গুদামে
নগরমূষিকদের স্বর শুনতে পাব |
হয়তো বৃদ্ধ ঘোড়ারা সব অদৃশ্য হয়েছে জানি
অন্য সভ্যতার বোঝা টেনে |
ঘুমন্ত কুকুরের কাশি শুনতে পাবে অপরিচ্ছন্ন শহরগলিতে |
বাজার ফোড়ে হন্যে শ্বাপদের পলিটিকস---
অর্ধাসন কঙ্কালসার শিশুদের কান্না রবে ফুটপাথ জুড়ে-----
সকলেই টেনে-টেনে যন্ত্রণায় গান করে,
আকস্মিক শস্তা মাল-এর ফুর্তি জমে
কান্নার কোরাসে |

.             ****************                                                         
সূচিতে    




মিলনসাগর