কবি কনকভূষণ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা
*
বিশ্বের-রূপ
কবি কনকভূষণ মুখোপাধ্যায়
রসিকচন্দ্র ভট্টাচার্য সম্পাদিত বঙ্গশ্রী পত্রিকার শ্রাবণ ১৩৪৯ ( আগস্ট ১৯৪২ ) সংখ্যায়
প্রকাশিত |


বেদনায় পরিম্লান ক্ষুব্ধ যেন বিশ্বের আকাশ
প্রখর রৌদ্রের দীপ্তি প্রদীপ্ত করিল ধরাতল—
বিদগ্ধ সুন্দর দেখি মৌন ম্লান কোশ ও পলাশ
প্রিয়ার আঁখির তীরে প্রস্ফুটিছে ব্যথার কমল |

আষাঢের মেঘলোক ভরে যেন বিপুল ব্যথায়
যে-দিকে নয়ন মেলি “প্লেন্” দেখি মাথার উপর—
বিধ্বংসী বিষের বাষ্পে খিন্ন প্রাণ ভরিছে জ্বালায়
জার্ম্মাণ বোমারু দূরে ধ্বংস করে সুন্দর নগর |

প্রকৃতির রম্যভূমি রহস্যের আনন্দ নিলয়
গভীর-অরণ্য-রাজি শূন্য হোল রণের দাপটে—
উল্লসিছে দিকে দিকে পশুত্বের ব্যর্থ পরিচয়
বিশ্বের ধ্বংসের রূপ কম্পমান মূর্ত্ত স্মৃতিপটে |

রুদ্রের প্রচণ্ড রোষে পৃথ্বী যেন হারাইছে দিশা—
দুর্য্যোগের সন্ধিক্ষণে হে যোগীন্দ্র শান্ত কর তৃষা |

.               **********************     


.                                                                             
সূচিতে . . .    




মিলনসাগর
*
বিস্মরণী
কবি কনকভূষণ মুখোপাধ্যায়
সচ্চিদানন্দ ভট্টাচার্য সম্পাদিত “বঙ্গশ্রী” পত্রিকার জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৭ ( জুন ১৯৪০ ) সংখ্যায়
প্রকাশিত |


ধান্যের ক্ষেতে চাষার গানের সুর,
ভাসিছে আজিকে আমার মনের বনে—
নগণ্য গ্রামে,  দূরে লাগে সুমধুর
শহর ভোলায় সে মোরে সঙ্গোপনে |

চাষারা সেথায় হিংলি ধানের ক্ষেতে
কাস্তে চালায়,  পাশে হাসে দুধে নোনা—
সোনার ধানের আলোয় উঠিছে মেতে
প্রাণগুলি যেন সোনার স্বপনে বোনা |

এতদিন ছিল এমনি সোনার দিন
চলিতাম আমি শ্যামদাসপুর মাঠে—
খুশীর লহরে হাসিত বুকের বীণ
হাসিত সে রূপ-মাধুরী পরাণ নাটে |

ভরি ভরি ধান গাড়ীর উপর তুলি
চ’লত কিষাণ তাহার খামার পানে---
বলদ-হাঁকানো মুখে হৈ হৈ বুলি
দূর পরবাসে আজিও আমার টানে |

মাঠভরা আজ পাকিল আউস ধান
শ্রীহীন মায়ের ঝলিছে সোনার সাং –
হিয়ার গোপনে আগে কার আহ্বান
কাঁদায় যেন সে জননী তোমার লাজ |

.               **********************     


.                                                                             
সূচিতে . . .    




মিলনসাগর
*
নতুন দিনের আলোক
কবি কনকভূষণ মুখোপাধ্যায়
সচ্চিদানন্দ ভট্টাচার্য সম্পাদিত “বঙ্গশ্রী” পত্রিকার বৈশাখ ১৩৪৭ ( মে ১৯৪০ ) সংখ্যায়
প্রকাশিত |


দূর বেলাভূমে ফেলিয়া এসেছি অতীতের দিনগুলি
শিশু-হৃদয়ের স্বপন মাখান ; কিশোরের বুল্ বুলি—
হঠাৎ কখন থামিয়াছে মোর যৌবন মধু-বনে—
মুখর যেন সে হইল মৌন হৃদয়ে সঙ্গোপনে |
 #               #                #
অধুনা-লুপ্ত বিগত জীবন--- কোথা এর প্রয়োজন ?
বর্ত্তমানের পথে যেতে হবে, অতীত সে অকারণ |
তরুণ সে কয়, ---‘পুরাণো দিনের বঞ্চিত সঞ্চয়---
ইতিহাস তার অক্ষম লাগি---শক্তিমানের নয় |’
#               #                #
হয় তো বা হবে মিছা ও ধরণী---আমার কবিতা লেখা—
দূর আগ্ রার যমুনার বুকে স্মরণের গত রেখা ;
রাণা প্রতাপের মেবার-কাহিণী মহিমার রূপচ্ছবি—
অতীত বলিয়া ভুলিবে কে তারে ? আমি ভুলি নাই কবি |
#               #                #
দৃষ্টির মোড় ফিরাও তরুণ বেদনার পারাবারে
তোমারই বৃহৎ মহাদেশ যেথা গভীর অন্ধকারে |
দেখিবে সেথায় ডুবেছে মানুষ আঁধারের কোলাহলে—
মূক ভারতের আশার স্বপন ডুবেছে চোখের জলে |
#               #                #
নতুন দিনের কই সে আলোক বাঁচিবার নব আশা—
সকলের লাগি ভুবন-ভুলানো মমতা ও ভালবাসা ?
মহাশ্মশানের শিবাদল মাঝে শকুনির চীত্কার—
শিহরণ হানে আজিকে নেহারি পরাণে বারংবার |
#               #                #
অমৃত-লোকের কই সে ভারত, প্রেমের ভারত কই ?
অধুনা দিনের দীনতার মাঝে আঁধারে ডুবিয়া রই |

.               **********************     


.                                                                             
সূচিতে . . .    




মিলনসাগর
*
শরতের রূপ
কবি কনকভূষণ মুখোপাধ্যায়
সচ্চিদানন্দ ভট্টাচার্য সম্পাদিত “বঙ্গশ্রী” পত্রিকার আশ্বিন ১৩৪৫ (অক্টোবর ১৯৩৮ )
সংখ্যায় প্রকাশিত |


বর্ষার প্লাবনে আজ দিকে দিকে ভরে হাহাকার
.        কুঁড়ে ঘর ডুবিয়েছে জলে,
সর্ব্বহারা জীবনের সান্ত্বনার ভাষা কোথা আর
.        শান্তি যার ডুবিল অতলে |

দু-মুঠা অন্নের লাগি চেয়ে থাকা অন্য মুখ পানে
.        বাঁচিবার এই প্রয়োজন,
সুতীব্র দৈন্যের গ্লানি ক্ষণে ক্ষণে লজ্জা ডেকে আনে
.        মৃত্যু-পথে বাঁচা কি ভীষণ !

“অন্ন দাও বস্ত্র দাও--- ছিল সব ভেসেছে বন্যায়”
.         কানে বেঁধে তীব্র হাহা-স্বর,
ব্যাধির কবলমাঝে যন্ত্রণার করাল ছায়ায়
.        আর্ত্তজন ভাবে--- “অতঃপর ?”

শরতের আগমনী ----তাহাদের ভগ্ন মনোবীণ
.        আনন্দের কোথা অবকাশ ?
মৃত্যুর তুহিন স্পর্শে প্রাণ যেন নীলিম মলিন
.        ব্যথাতুর বিপুল আকাশ |

.               **********************     


.                                                                             
সূচিতে . . .    




মিলনসাগর
*
একটুক্ রো  রুটী (গাথা)
কবি কনকভূষণ মুখোপাধ্যায়
দীনেশরঞ্জন দাশ ও গোকুলচন্দ্র নাগ সম্পাদিত “কল্লোল” পত্রিকায় ১৩৩৩,আষাঢ় (জুলাই
১৯২৬) সংখ্যায় প্রকাশিত। আমরা পেয়েছি অরুণ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “কল্লোল
কবিতা সমগ্র” থেকে |


কাঁদিয়া উঠিল অবোধ বালিকা পাঁচ বছরের মেয়ে
‘বাবা গো কি খাব কিছু আর নেই’ চোখে জল পড়ে বেয়ে,
‘কাঁদছিস্ কেন মা আমার হেমা কেনা আঁখি ছল-ছল’
কহিল প্রতাপ, ‘আমি তোর বাপ কি মোরে হয়েছে বল’ ?
রাজার ঝিয়ারি উঠিল ফুকারি লাল হল গাল কেঁদে,
‘ঘাসের রুটিটী বেড়ালে নিয়েছে আনো বাবা তারে বেঁধে’ |
ছেড়ে দিয়ে হাল ঠুকিয়া কপাল কহিলেন মহারাণা,
‘শান্তির কোলে নাও ওগো প্রিয় ব্যথিতের প্রাণ-খানা’  |
চমকি চাহিয়া দেখেন প্রতাপ আন্ মনে কাঁদে প্রিয়া,
হাসি-মাখা মুখ হতাশ মলিন ব্যথার আকুল হিয়া ;
ধৈর্যের বাঁধে ধরেছে ভাঙন করিবে কে তার রোধ,
লিখি কি না লিখি ভাবিছেন রাণা জাগিছে আত্ম-বোধ,
চঞ্চল মন নেই কিছু ঠিক করিলেন শেষ স্থির,
মনের বেদনা জানাবেন রাণা নোয়ায়ে ‘মোগলে’ শির—
ক্ষুৎ- পিপাসায় যার মেয়ে কাঁদে হায় কোথা তার মান
যাক্ মান ডুবে অতল পাথারে যায় যাক্ যদি প্রাণ,
রাণার আদেশে আনিল বাহক কাগজ কলম কালি,
লেখনী-হস্তে নীলাকাশ পানে চাহিছেন রাণা খালি,
লিখিলেন শেষে সাহ্ আকবরে ‘ছেলেদের দিও খেতে ;--
ডাকে মোরে শ্যাম বনানীর ছায়া স্নেহের আঁচল পেতে,
রাজার-প্রাসাদ চাহি না আমার চাহি না সিংহাসন
প্রতাপের কাছে তূণের শয্যা বড় আদরের ধন’,

রুদ্ধ-কন্ঠে বৃদ্ধ-মন্ত্রী ভাম্-সাহ্ কহে, ‘রাণা’
মেবারে’র ভালে এই ছিল লেখা কুমারী পায় না দানা !
‘মহারাণা বলি করোনা’ক’ আর মেবারে’র অপমান’ |
কহিছেন রাণা, ভিক্ষুক হয়ে চেয়েছি দয়ার দান,
‘রাণা’ – কথা মোর বড় বাজে বুকে মনে হয় উপহাস,
জননীর পদ পূজা বিনিময়ে হেনেছি সর্বনাশ |
সিংহের মত পাহাড়ের বুকে কাঁপিলেন তেজে বীর
লক্ষ বেদনা বিঁধিছে বক্ষে শিহরিছে তাঁর শির---
ক্ষণ পরে মনে ভাসিয়া উঠিল একটি করুণ-মুখ
রুদ্ধ ব্যথার হাহাকারে তাঁর কাঁপিয়া উঠিল বুক ;
বিছুটির মত হানিছে চাবুক নয়নে জ্বলিছে জ্বালা,
বিদ্রোহী-বীর ভাবেন লিপিকা নিভালো মেবার-আলা |

বন্দিল ‘ভীল’ লিপিকা লইয়া রাণার চরণদুটি
ঝিল্লী-মুখর প্রখর রৌদ্রে চলিল দিল্লী ছুটি |
সভা মাঝে বসি “সাহ্-আকবর” আলোকি সিংহাসন,
‘বীরবল’ সবে ছল করি তাঁর করিছে ফুল্ল মন,
এ হেন সময়ে লিপিকা হস্তে কুর্ণিশ করে ভীল ,
‘মোগল বাদশা’ পড়ে বার বার ভরে না কিছুতে দিল্ |
দিল্লীশ্বর আপনার পাশে আঁকিছে মোহন-ছবি—
কৃপার-ভিখারী মেবারের রাণা তাঁহার অঙ্ক লভি |
বাদশাহ-মুখে প্রতাপের কথা শুনিল পৃথ্বীরাজ,
ভাবিল, এখনো নিখিলের পতি হাসিছে পৃথ্বী—মাঝ,--

রাজপুত কবি প্রতাপসিংহ ভরিয়া অগ্নি-বাণী
লিখিলেন, বীর তোমার লাগিয়া ধন্য মিবার রাণী,
মানের বাজারে সকল রাজারে রেখেছে বাদশা কিনে,
শুধুই প্রতাপ মিবারের মান একলা রেখেছে চিনে,
কালের প্রভাবে হিমালয় শির হয় যদি শেষে লয়
চিতানল জ্বালি ‘বাপ্পা’র নামে জীবন করিও ক্ষয়’ |
কবি-লিপি নিয়া চলিয়াছে দূত আরাবলী পথ বাহি---
মেবারের ভূত-গরিমার গানে অনিমিখ যায় চাহি,
রাণার চরণ বন্দিল শেষে কত চলি গিরিপথ,
সার্থকতার সফল গরবে পুরিয়াছে মনোরথ |

পড়িয়া লিপিকা মেবার গরিমা উজলে রাণার বুকে,
‘জানায়ো কবিরে’ কহিলেন দূতে, ‘প্রতাপ রহিবে ভূখে’ |
বীর-সন্ন্যাসী হল প্রদীপ্ত নমিল জন্ম-ভূমি
‘কবি-পৃথ্বীরে’ ধন্য মানিল ‘মেবার’ চরণ-চুমি |

.               **********************     


.                                                                             
সূচিতে . . .    




মিলনসাগর
*
ভীরু আছে --- তাই গর্ব্বে দুলিছে
চারণের গান
দেশ পত্রিকার পৌষ ১৩৪৫ (জানুয়ারী ১৯৩৯) সংখ্যা থেকে গানটি আমরা পেয়েছি।
গানটিতে কবির নামের জায়গায় “চারণের গান” লেখা হয়েছে। আমরা তিন জন কবি পাই
যাঁদের নামের সাথে চারণ কথাটি যুক্ত রয়েছে। প্রথমত
চারণকবি মুকুন্দদাস। দ্বিতীয়ত
সেই সময়ে পানগর-বর্ধমানের কবি কণকভূষণ মুখোপাধ্যায়-কেও অনেকে চারণ কবি বলে
সম্বোধন করতেন কারণ তাঁর  “চারণ” নামক একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল।
ভারতবর্ষ, মাসিক বসুমতির মতো পত্রিকায় তাঁর কবিতা প্রকাশিত হোতো। তৃতীয়ত
নদীয়ার কবি
বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়, যিনিও চারণ কবি নামে খ্যাত হয়েছিলেন। ১৯৩৩
সালে দেশ পত্রিকার প্রকাশের পেছনে এই কবির সক্রীয় ভূমিকা ছিল। গানের কথা এবং
ভাবগত বৈশিষ্ট্য থেকে গানটি
চারণকবি মুকুন্দদাস অথবা বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়ের রচনা
বলেই মনে হচ্ছে। তবুও আমরা তিনজন কবির পাতাতেই কবিতাটি রাখছি।


ভীরু আছে --- তাই গর্ব্বে দুলিছে
.                অত্যাচারির জয়-নিশান।
ক্লৈব্য রয়েছে --- অন্যায় তাই
.                নিঃস্বের করে রক্ত পান॥

দুঃখের ভয়ে কাঁপে সদাই---
মানুষ আজিকে বন্দী তাই---
জীবনেরে বড়ো ভালবাসি ব’লে
.                শয়তান এত শক্তিমান॥

গগন-বিদারী বজ্রকণ্ঠে
.                গর্জ্জিয়া বলো --- ‘রে অন্যায়
মরে যাবো তবু মস্তক কভু
.                নত করিব না তোমার পায়॥

দেখিবে নূতন অরুণোদয়
রাঙিয়া তুলিবে দিগ্বলয়---
মৃত্যুর পাশ ছিন্ন করিয়া
.                জাগিয়া উঠিবে বিজয়ী প্রাণ॥

.               **********************     


.                                                                             
সূচিতে . . .    

মিলনসাগর