কবি কনকভূষণ মুখোপাধ্যায় – জন্মগ্রহণ করেন বর্ধমান জেলার, পানগড় ও রাজবাঁধ শহরের
মাঝামাঝি, জি.টি.রোডের ডান দিকে অবস্থিত বিরুডিহা গ্রামে। পিতা অমৃতলাল মুখোপাধ্যায় ও পিতামহ
ঈশ্বরচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। কবির স্ত্রী অন্নপূর্ণা দেবী ছিলেন সোনামুখীর মেয়ে।

একসময় বিরুডিহা ম্যালেরিয়া প্রবণ এলাকা ছিল। একবার কবির তিন সন্তানেরই একসঙ্গে ম্যালেরিয়া হয়।
ডাক্তারের পরামর্শ মত তাঁরা হাওয়া বদলের জন্য বেনারসে যান। সে জায়গাটা তাঁর ভালো লাগে এবং তিনি
বেনারসের নারায়ণনগরে পুরো পরিবারের জন্য একটি বাড়ি তৈরী করেন। গৃহপ্রবেশ হয়ে গেলেও তাঁর সেই
বাড়িতে বিশেষ থাকা হয়নি কিন্তু তাঁর স্ত্রী ও পুত্রেরা সেখানেই থেকে যান।

তিনি পানগরে মিলিটারী কনট্র্যাক্টরের কাজ করতেন। তাঁর অফিস ছিল বুদবুদ-এ। এছাড়াও তিনি “কুষ্ঠিয়া
ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক”-এর ব্যানারস শাখার ডাইরেকটর ইন চার্জ ছিলেন। মাত্র ৩৮ বছর বয়সে বুদবুদ্ থেকে
বর্ধমান যাবার পথে তাঁর গাড়িটি গলসী ব্রীজের উপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নীচে পড়ে যায়। তখন তিনি
নিজেই গাড়িটি চালাচ্ছিলেন। শোনা যায় যে আগে থেকেই সেই গাড়ির স্টিয়ারিং-এ গণ্ডোগোল ছিল এবং সে
বিষয়ে তাঁকে কিছু জানানো হয় নি। তিনি সাত দিন ফ্রেজার হাসপাতালে চিকিত্সাধীন থেকে মারা
যান ১৯৪৪ সালে।

কবির মৃত্যুকালে তাঁর তিন ছেলের বয়স ছিল যথাক্রমে আট, চার এবং দুই বছর। তাঁর বড়ছেলে
কবি
কাঞ্চনকুমার, মেজ ছেলে শ্যামলকুমার এবং ছোট ছেলে যুগলকুমার।

ছেলেরা তাঁদের পিতাকে জ্ঞানবয়সে দেখেননি বললেই চলে।  মার কাছ থেকে শুনেছিলেন যে বাবা উদাত্ত
কণ্ঠে খুব ভালো গান করতে পারতেন। তিনি স্বদেশী আন্দোলনেও জড়িত ছিলেন।

কবির পরিবার আর্থিক ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল। কবির সঙ্গে সেকালের খ্যাতনামা কবি-
সাহিত্যিক ও বিশিষ্টজনদের পরিচয় ও হৃদ্যতা ছিল। তাঁদের মধ্যে ছিলেন
গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,
যতীন্দ্রমোহন বাগচী, কুমুদরঞ্জন মল্লিক, কালিদাস রায়, করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায়, সুরেন্দ্রনাথ মৈত্র,
বর্ধমানের মহারাজকুমার উদয়চাঁদ মহাতাব্, রবীন্দ্রনাথ সেন,
নরেন্দ্র দেব, রাধারাণী দেবী, বিজয়প্রসাদ
সিংহরায়, সুরেশ বিশ্বাস, কাদের নওয়াজ, বৈদ্যনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, হরিপদ গুহ বিদ্যারত্ন, রামকৃষ্ণ শাস্ত্রী
কাব্য-ব্যাকরণ তীর্থ, সুরেন্দ্রনাথ নিয়োগী, সুরেন্দ্রনাথ চৌধুরী, প্রভাবতী দেবী সরস্বতী, ফণীন্দ্রনাথ
মুখোপাধ্যায়, গোপাললাল দে, এবনে গোলাম নবী, এম. সুলতান, আশালতা দেবী, কামাক্ষীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়,  
হেমচন্দ্র বাগচী, লীলা দেবী প্রমুখ। এঁদের কাছ থেকে কবির জ্যেষ্ঠ পুত্র কাঞ্চনকুমারের নামকরণ এবং
অন্নপ্রাশন ও অন্যান্য অনুষ্ঠানে আশির্বাদসূচক মঙ্গলবার্তা এসেছিল! বিশিষ্ট ব্যক্তিদের এই।দীর্ঘ তালিকা
থেকেই আমরা ধারণা করে নিতে পারি,  কবি কনকভূষণ মুখোপাধ্যায়ের  কবি-পরিচিতির ব্যপ্তি।
কবি
নজরুল ইসলাম তাঁদের বাড়িতে এসেছিলেন।

জীবিত অবস্থাতেই,
কবি কালিদাস রায়ের লেখা ভূমিকা নিয়ে “চারণ” নামে তাঁর একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত
হয়েছিল, ১৯৩০ সালের মে মাসে। স্বধীনতাপূর্বের স্বদেশপ্রীতির ভাবনায়, রাজপুতানার গাথা নিয়ে রচিত এই
কাব্যগ্রন্থটি বর্ধমান অঞ্চলে যথেষ্ট সমাদর লাভ করেছিল। বর্ধমান শহরে কবিকে এই কাব্যগ্রন্থের জন্য একটি
সম্বর্ধনাও দেওয়া হয়। এই কাব্যগ্রন্থের সঙ্গে কবির নামটি এমনভাবে জড়িয়ে যায় যে তারপর থেকে তিনি
ওই অঞ্চলে “চারণ কবি” নামেই খ্যাত হন। বর্ধমানের সম্বর্ধনা পাবার সময় তাঁকে “চারণ কবি” উপাধীতেও
ভূষিত করা হয়। তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশিত দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থের নাম “লীলাময়ী”। এই বইটি আমরা পাইনি।

এছাড়াও তাঁর ৭০টি কবিতা  ও গান সম্বলিত একটি নোটবই রক্ষা করে রেখেছিলেন তাঁর ছেলেরা। এর
মধ্যে অপ্রকাশিত কবিতাও ছিল। এই কবিতাগুলির মধ্যে বহু কবিতাই বিভিন্ন পত্র-পত্রিকাতে প্রকাশিত
হয়েছিল, যার মধ্যে রয়েছে  “কল্লোল”, “বঙ্গলক্ষ্মী”, “কুরুক্ষেত্র”,  “বিজলী”, “সম্মিলনী”, “স্বদেশীবাজার”,
“পূর্ণিমা”, “বিকাশ”, “গল্পাঞ্জলি”, “নবশক্তি”, বর্ধমান থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক “শক্তি”, “মাতৃমন্দির”, “উপাসনা”,
“যুগদীপ” প্রভৃতি।

এই কবিতার খাতার বাইরে বঙ্গশ্রী পত্রিকায় কবির চারটি কবিতা পাওয়া যায়। ১৯৪৪ এর জুনে ভারতবর্ষ
পত্রিকায় আমার শেষের দিন নিয়ে সাতটি কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল। এই কবিটাটি ১৯৪৫ এর নভেম্বরে
শেষের দিন নামে পুনঃপ্রকাশিত হয় কবির নামের সঙ্গে        যোগ করে। এইভাবে কবি যে আর নেই সেই
সংবাদ পাঠকদের পৌঁছে দেওয়া হয়।

আমরা কৃতজ্ঞ কবির পুত্রদের কাছে, তাঁর সব কবিতা আমাদের ওয়েবসাইট মিলনসাগরে প্রকাশিত করার
অনুমতি দেবার জন্য। তাঁদের অনুমতিক্রমে আমরা “চারণ” কাব্যগ্রন্থের যে কয়টি কবিতা পাওয়া গেছে
এবং হাতে লেখা নোটবইয়ে সব ক’টি কবিতাই এখানে প্রকাশিত করছি। এই পাতার প্রকাশ শুরু, ভারতের
৬৭তম স্বাধীনতা দিবসে --- ১৫ই অগাস্ট ২০১৩।

কবিপুত্র
কবি কাঞ্চনকুমার আমাদের আরও জানান যে কবির মৃত্যুর পর “ভারতবর্ষ” পত্রিকার সম্পাদক
ফণীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, “কবি কনকভূষণ মুখোপাধ্যায়” নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন “সংহতি” পত্রিকায়। সেই
লেখাটিও আমরা পাইনি।

এছাড়া কবির বন্ধু শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের অনুরোধে কবি “সংসার” নামক একটি সিনেমার গল্প
লিখেছিলেন। কিন্তু লেখাটি তাঁকে দেওয়ার আগেই তাঁর জীবনাবসান ঘটে। অভিনেতা কমল মিত্রও ছিলেন
কবির বন্ধু।  

এই অকালে স্তব্ধ হয়ে যাওয়া  কবির, কবিতার ভাষা, ছন্দ, ভাব এত সুন্দর হওয়া সত্ত্বেও তিনি বাংলা
সাহিত্যে অপরিচিত একটি নাম। আজ অবধি আমাদের সংগ্রহে আসা কোনো কবিতা সংকলনেই এই কবি
বা তাঁর কবিতার উল্লেখ চোখে পড়ে নি। এটা কি এই জন্য যে তিনি কলকাতা কেন্দ্রিক ছিলেন না ?  আমরা
আশা রাখি যে এই কবি ও তাঁর কবিতা ভবিষ্যতে বাংলার কাব্যপ্রেমী ও গবেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে
এবং বাংলা সাহিত্যে যথাযত মর্যাদা ও প্রতিষ্ঠা লাভ করবে।  

আমরা
মিলনসাগরে  কবি কনকভূষণ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা তুলে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে
পারলে এই প্রচেষ্টার সার্থকতা।


উত্স –
কবি কাঞ্চনকুমারের  সৌজন্যে পাওয়া তথ্য ও কবিতা।      

কবি কনকভূষণ মুখোপাধ্যায়ের মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন


আমাদের ই-মেল -
srimilansengupta@yahoo.co.in     



এই পাতার প্রথম প্রকাশ - ১৫.০৮.২০১৩,  ৬৭তম স্বাধীনতা দিবসে মিলনসাগরের শ্রদ্ধার্ঘ্য
ভারতবর্ষ এবং মাসিক বসুমতী পত্রিকাতে প্রকাশিত কবিতা নিয়ে এই পাতার পরিবর্ধিত সংস্করণ - ২৮.৫.২০১৬   
বঙ্গশ্রী এবং কল্লোল পত্রিকাতে প্রকাশিত কবিতা নিয়ে এই পাতার পরিবর্ধিত সংস্করণ - ৯.১১.২০১৬
পরিচিতির সম্পাদিত সংস্করণ - ৯.২.২০১৭
...