কবি শ্রীমতী ক্ষীরদা মিত্রর কবিতা
*
কৃতজ্ঞতা ও প্রার্থনা
কবি শ্রীমতী ক্ষীরদা মিত্র

ওহে বিশ্বনাথ,                    করি প্রণিপাত,
তোমার চরণে আমি।
তুমি বিনা আর                কে আছে আমার,
তুমি জগতের স্বামী॥
তোমার কৃপায়,                   জন্মেছি ধরায়,
তুমি সর্ব্ব সুখদাতা।
তোমারি সৃজিত,                তোমারি পালিত,
তুমি মম পরিত্রাতা॥
কতই যতনে,                      রেখেছ এজনে,
জন্মাবধি চিরকাল।
পড়িলে বিপদে,                  রাখি নিজ পদে,
ঘুচায়েছ সে জঞ্জাল॥
রোগেতে যখন,                    হয়ে অচেতন,
তোমার শরণ লই,
তুমি বিনা আর,                 কে করে উদ্ধার,
গতি নাই তোমা বই॥
কতবার কত,                     বিঘ্ন শত শত,
হইতে করেছ পার।
করি সুরক্ষণ,                      রেখেছ জীবন,
নাহি কোন দুঃখ ভার॥
যেরূপ আমায়,                    অজস্র কৃপায়,
রেখেছ হে কৃপাধার।
কর সেই মত,                     অধর্ম্মে বিরত,
হয় যেন সদাচার॥
সতত এখন,                       করিহে প্রার্থন,
কর মোর আত্মোন্নতি।
তোমারি চরণ,                     করিহে স্মরণ,
তোমাতেই থাকে মতি॥
তোমারি আদেশ,                পালি সবিশেষ,
তোমাকেই করি ধ্যান।
তোমারি কৌশল,                   সকলি মঙ্গল,
ইহা যেন থাকে জ্ঞান॥
পড়িলে বিপদ,                    না ভুলি ও পদ,
বিরাজিত থাক মনে।
ওহে দয়াময়,                      দিও পদাশ্রয়,
অন্তে এই পাপীজনে॥

. *************************  

.                                                                                          
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
সুমতির জন্য প্রার্থনা
কবি শ্রীমতী ক্ষীরদা মিত্র

পাপেতে পতিত হয়ে কাহারে জানাই,
তোমা বিনে ওহে নাথ গতি আর নাই।
জন্মাবধি যত পাপ করিয়াছি আমি,
অজ্ঞাত নাহিক কিছু ওহে অন্তর্যামী।
কত পাপ করিয়াছি সংখ্যা নাহি তার,
সদসৎ বোধ কিছু নাহিক আমার।
অধিনী পাপের লাগি করিছে রোদন,
কৃপাকণা বিতরিয়ে করহ গ্রহণ।
এইরূপ শুভমতি দেহ কৃপাময়,
সর্ব্বদাই মন যেন সাধু পথে রয়।
পরনিন্দা পরপীড়া করি বিসর্জ্জন,
সর্ব্বদাই থাকে যেন পরহিতে মন।
পরের সুখেতে মন না হয় কাতর,
পরদুঃখে দুঃখী যেন হই নিরন্তর।
অন্ধ খঞ্জ মূক আদি দেখি দুঃখি জনে,
উথলিয়া ওঠে যেন শোক-সিন্ধু মনে।
তাহাদের দুঃখ সদা করিতে মোচন,
হস্ত যেন ক্ষান্ত নাহি হয় কদাচন।
সকলেই তব পুত্র ভাবি অহরহ,
সদ্ভাব করিহে যেন সকলের সহ।
অধর্মের পথ হতে কর মোরে ত্রাণ,
সর্ব্বদাই করি যেন ধর্ম্ম অনুষ্ঠান।
এই কৃপা কর নাথ এদাসীর প্রতি,
তোমার চরণে সদা থাকে যেন মতি।
হৃদয় মাঝেতে মোর থাক নিরন্তর,
অন্তর হইতে যেন না হও অন্তর।
ব্রহ্মানন্দরসে যেন পূর্ণ হয় মন,
যাহাতে পাইব সুখ যাবৎ জীবন।
অচির আমোদে মন হয় বিমোহিত,
চিরধনে যেন পিতা না হই বঞ্চিত।
ধন মান সুখ আদি কিছু নাহি চাই,
এই কৃপা কর যাতে তোমারে হে পাই।
একেত অবলা তায় নাহি কিছু জ্ঞান,
কেমনে পাইব নাথ না জানি সন্ধান।
কিন্তু এই আশা সদা আছে মম মনে,
পাপী তাপী সকলেরে লইবে যতনে।
ওহে দীননাথ তুমি পতিত পাবন,
এ দীনার ভরসা হে তোমার চরণ।

.
      *************************  

.                                                    
                           সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
স্তোত্র
কবি শ্রীমতী ক্ষীরদা দাসী

বার বার ধন্যবাদ করিহে তোমায়।
তোমার সৃজন হেরে নয়ন জুড়ায়॥
এই পৃথিবীর কিবা শোভা মনোহর।
হেরিলে সুধাংশু হয় প্রফুল্ল অন্তর॥
তারাগণ হীরা প্রায় যেন আকাশেতে।
অনন্ত কৌশল তব, কে পারে বর্ণিতে?
যখন প্রখর রবি উদিত গগণে।
পক্ষিগণ গান করে আনন্দিত মনে॥
গাছের কেমন শোভা ফল আর ফুলে!
পরিশ্রান্ত হয়ে জীব বসে তরুতলে॥
যখন মেঘেতে চতুর্দিক অন্ধকার।
বিদ্যুতের আলো তাহে কিবা চমত্কার॥
ঝাঁকে ঝাঁকে মাছগুলি জলোপরি খেলে।
সুন্দর দেখায় তায় কমল ফুটিলে॥
কেবা সাজাইল রঙ রামধনিকেতে।
সকলি তোমার সৃষ্টি যা পাই দেখিতে॥
তোমার আদেশে অগ্নি প্রজ্বলিত হয়।
তুমিহে পরম গতি পরম আশ্রয়॥
নিমেষ, মুহূর্ত্ত, পক্ষ, মাস, সংবত্সর।
তোমার নিয়মে আসে যায় নিরন্তর॥
বিচিত্র জগৎ তব আশ্চর্য্য রচনা।
প্রার্থনা সাপেক্ষ নহে তোমার করুণা॥
সকল জীবেরে দয়া করহ সমান।
জননী পালন করে যেমন সন্তান॥
অজ্ঞান প্রযুক্ত কিবা বলিতেছি আমি।
যাঁহার তুলনা নাই যিনি বিশ্বস্বামী॥
মনুষ্য সহিত নহে তুলনা তোমার।
ক্ষুদ্র জীব হয়ে আমি কি বলিব তার॥
অনন্ত শকতি তব মহিমা অপার।
কৃতজ্ঞ হৃদয়ে আমি করি নমস্কার॥

.       *************************  

.                                                                               
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
দূষিত দেশাচারে নিমিত্ত বিলাপ
কবি ক্ষীরোদা মিত্র

ওহে পিতা জ্ঞানদাতা অনাথের নাথ,
অভাগা নারীর প্রতি কর গৃষ্টিপাত।
তোমা বই দুঃখ আর জানাই কাহারে,
তোমার সমান বন্ধু কে আছে সংসারে ?
কৌলিন্য কুপ্রথা আর বৈধব্য আচারে,
চির দুঃখে দহিতেছে হিন্দু অবলারে।
আহা! কত দিন আর রবে এ সকল,
অবলার দুঃখানল করিতে প্রবল!
অসভ্যতা কুসংস্কার আর দেশাচার,
করিতেছে ক্রমে ক্রমে দেশ অধিকার।
বিদ্যাহীনা জ্ঞানহীনা যত নারীগণ,
রয়েছে সকলে বন্য পশুর মতন।
অজ্ঞান তনয়াগণে কর জ্ঞানদান,
যাহাতে করিতে পারে ধর্ম্ম অনুষ্ঠান।
অজ্ঞানবশতঃ হায় তোমারে না জানে,
কাল্পনিক দেব দেবী স্রষ্টা বলি মানে।
আহা কবে এই ভ্রম হবে দূরীকৃত,
সকলেই হইবেক ঈশ্বরেই প্রীত,
সত্যের উজ্জ্বল জ্যোতিঃ হইবে বিস্তার,
নাশিবেক অবলার অজ্ঞান আঁধার।
আহা! কবে ভগ্নীগণ! হয়ে একমত,
পিতার আদেশ মোরা পালিব সতত।
এস হে ভগিনীগণ! কর মনোযোগ,
বিমল আনন্দ সুধা করিতে সম্ভোগ।
ওহে পিতা তুমি বিনা কারো সাধ্য নয়,
ঘুচাইতে আমাদের দুঃখ সমুদয়।
যখন তোমার কৃপা করিহে স্মরণ,
আনন্দেতে উচ্ছ্বসিত হয় মম মন।
তখনি আশ্বাস পায় হৃদয় আমার,
ঘুচাবেন নারী দুঃখ সত্য সারাত্সার।
নারী হিতকারী যত মহোদয়গণ,
করিছেন যত্ন সুখ করিতে বর্দ্ধন।
তাঁহাদের শুভ ইচ্ছা হউক সফল,
হইবে হইবে তাহে দেশের মঙ্গল।

.       *************************  

.                                                                               
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর