কবি করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
১।      কাণে কাণে       
২।      
সন্ধ্যালক্ষ্মীর প্রতি   
৩।      
শেষ-বাসরে      
৪।      
দ্বিপ্রহরে      
৫।      
শ্রীক্ষেত্র    
৬।      
রেবা         
৭।      
ছাড়া    
৮।      
মৃণু     





*
কাণে কাণে

হের, সখি আঁখি ভরি’ শুভ্র নীরবতা
পাহারের দু’টি পার্শ্ব, জ্যোত্স্না আর মসী |
নিথর নিশার ক্ঠে কি দিব্য বারতা,---
কাণ পেতে শোন’ হেতা বালুতটে বসি |
নীরবে নদীর জল চলে সাবধানে,
সূর মিলাইয়ে ওই তারকার সাথে |
পথ চেয়ে চেয়ে বায়ু, মগ্ন কার ধ্যানে---
সন্তর্পণে হাতখানি রাখ মোর হাতে!
যাদুকর চন্দ্রকর তালের বাগানে---
হেথা হোথা তুলিয়াছে রূপার ফলক ;
মাধবী লতার ফাঁকে বকুলের তলে,
কে তরুনী মুঠি ভরি ধরে চন্দ্রালোক !
পাখী লুকায়েছে আঁখি পালক সিথানে---
আজিকার কথা বঁধু, কহ কাণে কাণে |



.              ****************                                                
উপরে   


মিলনসাগর
*
সন্ধ্যালক্ষ্মীর প্রতি


তোমার আলো           সব ভুলালো
.      লো অমরী বালা,
তোমার চেলীর              ঝিলিমিলি
.      চুলের তারার মালা ;
পাখীর গানে            কাঁকণ তোমার
.      বাজে কানন ছেয়ে,
শিউরে ফোটে             শিউলি-কলি
.      তোমার সোহাগ পেয়ে |


.                        অলক ঢাকা                  কোমল পলক
.                                       নয়ন গরবী---
.                        কাঙাল বায়ু                  যাচে তোমার
.                                       চুলের সুরভি |
.                        কোহিনুরের                   টিপটি ভালে
.                                       কাণে রতন দুল
.                        বরণ কালের                     তরুণ বধু
.                                       রে দুলালী ফুল !


এস নেমে                আমার ঘরে
.         তালী-বনের তলে !
এস মানস                নন্দিনী মোর
.        এস আমার কোলে |
সংসারে নাই               ঠাঁই-ঠিকানা
.         একলা কাটাই দিন,
কৈফিয়তের                ভয় রাখি না---
.           সব দায়িত্ব-হীন |
বনের ফাঁকে                কুড়িয়ে বেড়াই
.          শুকনো ঝরা ফুল |
হিজিবিজি                লেখা খাতায়
.           কাটি কতই ভুল |



হের, দিগ্বলয়ে                বেগুনি-নীল
.         গিরিশ্রেণীর চূড়ায়,
পরীরা ওই                   সারি সারি
.         মণির ফানুস উড়ায় |
হেথায় যাহা                  ভাবে আঁকা
.           রূপে হোথায় রাজে
জলধনুর                      বীণার তারে
.         আলোর সুরটি বাজে |
এস মানস                    দুলালি মোর
.           আমার খেলার ঘরে,
তোমার রঙের                  ইন্দ্রজালে
.           দাওগো নয়ন ভরে’|
তুহার আলো                   সবভুলালো
.            লো অমরী বালা,
এস এস                        চঞ্চলিয়া
.            চুলের তারার মালা |


.              ****************                                               
উপরে    


মিলনসাগর
*
শেষ-বাসরে

ঝরিয়াছ তুমি অশ্রু-ধারায়
.       আমার তরে,
জড়ায়েছ মোরে ফুলের মালায়
.       সোহাগভরে ;
প্রভাতে প্রদোষে সুখে দুখে মোর
পরায়ে দিয়াছ প্রণয়ের ডোর,
কল্যাণভরা কঙ্কণপরা
.       দু’খানি করে---
এস, সখি, আজি যৌবন-স্মৃতি-
.        শেষ-বাসরে |

.                  মনে পড়ে আজি আমাদের সেই
.                                 বিবাহ-রাতি,
.                  স্পন্দিত-বুকে হইনু দু’জনে
.                                 জীবনে সাথী ;
.                  চারিদিকে দোলে আলো আর ফুল,
.                  পল্লী-সখীরা প্রমোদে আকুল,
.                  দীপ্ত-ভূষণ রঙ্গমহল,
.                                রূপের ডালি,
.                  মধু-পরিহাস-রস-উচ্ছল
.                                ‘বাসর’ রাতি|

মনে পড়ে সেই ‘কনকাঞ্জলি’
.                পিতার হাতে,
হৃদয়ে ঝঞ্ঝা, বিদায়-সজল
.                আঁখির পাতে ;
সীমন্তিনীরা শিবিকা-দুয়ারে,
চোখে জলভার, ঘিরিল তোমারে---
তোরণ-মঞ্চে অদূরে শানাই
.                ধরিল ‘তোড়ী’---
গমকে গমকে সুর-মূর্চ্ছনা
.                কোমলে-কড়ি |


.                        মনে পড়ে সেই ধূসর অলকে
.                                        দাঁড়ালে এসে---
.                        পা দু’টি ডুবায়ে দুধে-আল্ তায়
.                                        বধূর বেশে ;
.                        পথ-ধূলি-ম্লান সুকুমার শ্রীটি,
.                        লজ্জাবতীর সম নত দিঠি,
.                        অয়ি মঙ্গলা, আলয়-কমলা
.                                        ভুলালে মোরে,
.                        পুরলক্ষ্মীরা লইল তোমারে
.                                        ‘বরণ’ করে |


ফুলশয্যার দিব্য হাসিটি
.                যাইনি ভুলে,
ঝল্ মল্ দু’টি পান্নার ‘দুল’
.                কর্ণমুলে |
বক্ষঃ-কারায় রুদ্ধ উতলা,
প্রেম-নর্ম্মদা, পূত-নির্ম্মলা,
ভাঙ্গি’ সরমের মর্ম্মর-গিরি
.                তূর্ণ ধায়---
মোতিয়া বেলার গন্ধ-বিলাসী
.                মন্দ বায় !

.                                মনে পড়ে সেই নব যৌবন-
.                                                গরবী গ্রীবা---
.                                মুকুরে দীপ্ত বয়ঃসন্ধি-
.                                                বিজুলী বিভা---
.                                তখন তরুণী, ছিলে না বুকের,
.                                ছিলে না মরমী দুখের সুখের---
.                                হেরেছিনু শুধু মঞ্জু ভ্রূযুগ
.                                                নিন্দি’ ‘রতি’,
.                                স্বর্ণ-অতসী-তনু-লতিকার
.                                                পেলব জ্যোতিঃ !

মনে পড়ে সেই মধু-মালতীর
.           বীথিকা দিয়া
চলে’ যেতে প্রিয়া ভুজ-বল্লরী
.           চঞ্চলিয়া---
মাথার উপরে কোজাগর শশী,
পল্লব-ছায়ে বসিতে রূপসি,
রূপালি আলোর আলিপনা-আঁকাঃ
.           বেদীর ‘পরে---
ধ্যানের রাজ্যে প্রীতি-পারিজাত
.           মেখলা প’রে |
কতদিন সেই কাঁপায়ে কাঁকণ
.           ক্ষণিকা সম,
চাবির ‘রিং’টি বাজায়ে আসিতে
.           সমুখে মম;
হেরেছি প্রতিমা, প্রীতি-ভ্রূভঙ্গ,
লাজ-সঙ্কোচে মুদিত অঙ্গ,
পরশি’ অধরে শিশুর অধর
.            দাঁড়াতে হেসে’;
লুটিত আঁচল নীলাম্বরীর
.            চরণে এসে’ |


.                        মনে পড়ে সেই তুলসীর মূলে
.                                        ‘সন্ধ্যা’ দিতে,
.                        মাটির ‘দেউটী’ যতনে ঢাকিয়া
.                                        আঁচলটিতে;
.                        ভক্তি-উজল মুখ-উত্পল,
.                        আঁখি-পল্লব ঈষত্সজল,
.                        চোখাচোখি দোঁহে দাঁড়ানু থমকি’
.                                        পাটল সাঁঝে,
.                        গৃহ-দেবতার ধূপ-সুরভিত
.                                        দেউল মাঝে |


হের, সখি, সেই দিনান্ত-তারা
.                তেম্ নি জ্বলে,
ডালিম-ফুলের রংটি ফলান
.                মেঘের কোলে!
খেলাঘর ভরি’ উঠে কলরব,
ছেলেমেয়েদের ধূলা-উত্সব---
মিছা পরিণয় চতুর্দ্দোলায়
.          উলুর রবে;
জীবন-উষায় বিনোদ ভূষায়
.          সেজেছে সবে |


.                আজি    পূর্ব্বরাগের ফেনিল তুফান
.                                         গেছে গো সরি’
.                           যুগ্ম-হৃদয় স্বচ্ছ সলিলে
.                                         উঠেছে ভরি’---
.                           আগে যা’ বুঝিনি আজি তা’ বুঝেছি,
.                           কাছে যা’ ছিল তা’ স্বপনে খুঁজেছি,
.                           দু’জনে দোঁহার হৃদয়ে মিশেছি
.                                   পুলকভরে---
.                           এস, সখি, আজি যৌবন-স্মৃতি-
.                                          শেষ-বাসরে |


.                                        ****************                                 
উপরে   


মিলনসাগর
*
দ্বিপ্রহরে

সুদূর স্মৃতি জাগায় আজি
.                ভাঁটের ফুলের গন্ধ মিঠে---
লাজুক মেয়ে উঠ্ ল নেয়ে
.                চুলের গোছা ছড়িয়ে পিঠে|
নীলাম্বরীর তিমির টুটে’
রংটি তোমার উঠ্ ল ফুটে---
কামিনীবন ফুটিয়ে গেল
.                সজল তোমার রূপের ছিটে |


.                        কাণের পিঠে তিলটি তোমার
.                                        এড়ায়নি এই মুগ্ধ চোখে---
.                        দীঘির ঘাটে ওই যে আঁকা
.                                        দীপ্ত তোমার অলক্তক |
.                        নারিকেলের কুঞ্জ-শিরে,
.                        পদ্ম-ফোটা দীঘির নীরে,
.                        ভাঁজটি খুলে’ ছড়িয়ে প’ল
.                                        পাখীর পাখার স্বর্ণালোক|

তোমায় সখি দেখেছিলাম,
.          সবম-রাঙ্গা মধুর মুখ---
অন্তরাত্মা উঠ্ ল কেঁপে
.          কন্টকিয়া উঠ্ ল বুক |
মৌমাছিদের গুঞ্জরণে
জাগ্ ল শ্যামা কুঞ্জবনে---
কালো মেঘের রৌপ্য-পাড়ে
.          জরির মতন রৌদ্রটুক্ |
.                        স্বপ্ন সম তার কাহিনী---
.                                        আজ্ কে প্রিয়ে দ্বিপ্রহরে
.                        নোনা-আতার সোণার গায়ে
.                                        রবির কিরণ পিছ্ লে পড়ে ;
.                        দূর্ব্বা-শ্যামল নিন্বতল,
.                        দীপ্ত নো নীলোজ্জ্বল,
.                        ঢেউয়ের মাথায় মাণিক ভাঙ্গে
.                                 গাঙ্গের বুকে স্তরে স্তরে |



.                                        ****************                                  
উপরে   


মিলনসাগর
*
শ্রীক্ষেত্র

ভো মহার্ণব, নীল-ভৈরব, গর্জদ্-জলভঙ্গে,
.         দূর অম্বুদ-মন্দ্র-সমান
.         তুলিতেছে কার বন্দনা-গান ?
নক্তন্দিব উদ্ধোধনের দুন্দুভি বাজে রঙ্গে |

নীল-কন্ঠের বিরাট্ পিনাক টঙ্কারে অহোরাত্র,---
.         আজো কি ভোলনি মন্থন-রোল,
দেব-দানবের উন্মাদ-দোল?
ইন্দিরা আজি উরিবেন বুঝি কক্ষে অমৃতপাত্র!


দাঁড়ায়ে তোমার বেলা-বালুকায়, হেরি বিহ্বল চিত্তে,
.          যোজনান্তরে গগণ-সীমায়,
.          ঢালিয়া পড়েছে মহানীলিমায়,
তরলোজ্জ্বল ফেনিলোচ্ছল পন্নগ-ফণ-নৃত্যে |---


হে দুনিবার ,মুক্ত-উদার, হে পূর্ণ, অফুরন্ত,
.          চেয়ে’ চেয়ে’ ওই বিপুল উরসে,
.          অসীমের ভাষা অন্তরে পশে,
হেরি’ নেপথ্যে অন্তবিহীন কল্পলোকের পন্থ |
খেলিছ এমনি লীলা-উদ্বেল, অমলিন-মণি-দীপ্ত,
.          কত না ভাবুক তব পাশে আসি’
.          এমনি ঙরষে আলোড়ি উছাসি’
সঁপেছে তোমারে অনঘ অর্ঘ্য, বিভোর অপরিতৃপ্ত |

এই সেই পুরী, এইখানে ডোবে নবদ্বীপের চন্দ্র,
.          তীর্থে তীর্থে ঘুরি’ অবশেষে
.          উদাসীন প্রাণে এইখানে এসে
সমাহিত ওই নীল অনন্তে ভুঞ্জিত ভূমানন্দ |

জগ-জনে তিনি দিয়াছেন কোল, কেহ নাই অস্পৃশ্য,
.          হোক্ না সে দ্বিজ, হোক্ চন্ডাল,
.          বিশ্বের স্রোতে ক্ষুদ্র, বিশাল,
সবারে সাদরে আলিঙ্গে কাল,---বর্জনে প্রেম নিঃস্ব |

একদা জগদ্ গুরু শঙ্কর ভারতের বুধবৃন্দে,
.          নিস্প্রভ করি’ মনীষা-কিরণে
.          এইখানে আসি’ তৃতীয়-নয়নে
হেরিয়াছিলেন মহামানবের মিলনের অরবিন্দে|


ধন্য এখানে মানব-আত্মা পূজি’ শাশ্বত-সত্যে,
.          একাকার হেথা অখিল ধর্ম,
.          টুটি’ বিচারের কঠিন বর্ম,---
সব ব্যবধান ডুবে গেছে ওই পাবন সলিলাবর্তে |

কবীর, নানক, হরিদাস হেথা অবিনাশ বাক্-ছন্দে
.          উদ্বোধিলেন শুভ আহ্বানে
.          চির-মুমুক্ষ মানবের প্রাণে,
লভি’ সাধনার মধুমান্ সেই ধ্রুব সচ্চিদানন্দে |


এই শ্রীক্ষেত্রে লুটাও ভক্ত, অভিমান হোক্ চূর্ণ,
.          হউক নিরাস ভেদ-জ্ঞান-ভ্রম,
.          জগন্নিধান পুরুষোত্তম
নীলমাধবের চরণোপান্তে হোক্ মনোরথ পূর্ণ |


ভো মহার্ণব, ভীম-ভৈরব, উত্তাল লীলাভঙ্গে,
.          গর্জি’ মেঘের মন্দ্র-সমান,
.          গাও,---গাও তাঁরি বন্দনা-গান,
নক্তন্দিব মাঙ্গলিকের ওঙ্কারধ্বনি-সঙ্গে |




.                 ****************                                                         
উপরে   


মিলনসাগর
*
রেবা

জল-বেণী-রম্যা রেবা হিল্লোলিয়া বরকান্তি, উন্মাদিনী প্রায়,
অরণ্য-নেপথ্য-পথে তরঙ্গিছে শিলাঙ্গনে তুরন্ত ধারায় ;
কুন্দবর্ণ বারি-ধুমে আবরি’ সীমন্ত-বাস ধায় আত্মহারা---
কবে তুমি হে নর্মদা ! বিদারিলে মন্ত্রবলে মর্মরের কারা ?

ফাল্গুন-রজনীমুখে গুঞ্জরে তোমার বুকে অমরী-মঞ্জীর,
মানস-রঞ্জন হাস্য ভাসে গো কমল-আস্যে নিসর্গ-লক্ষ্মীর ;
ইন্দ্রনীল-রথ-চূড়ে চন্দ্রিকা-কেতন উড়ে অন্তরীক্ষ-পথে,---
হেন স্বপ্ন-লীলা-ভূমি অবহেলি’ ধাও তুমি দুর্নিবার স্রোতে |
কার আলিঙ্গন আশে অনরাগ-রসোল্লাসে, হে বরবর্ণিনি,
ধাও রঙ্গে কলস্বরা, পারাবার-স্বয়ংবরা বিন্ধ্যের নন্দিনী?


কোথা মাহিষ্মতী পুরী ?মর্মর-সোপানোপরি রাজ-অঙ্গনার
বিলাসের মৃগমদে দৃপ্ত পদ-কোকনদে চকিত ঝঙ্কার !
পৌর্ণমাসী অর্ধরাতে, জ্যোত্স্নালোকে তন্দ্রালসে অলিন্দের ‘পরে,
দ্রাক্ষা-রসে টলমল স্বর্ণপাত্রে শশি-বিম্ব চুম্বিত অধরে |
আবর্ত-শোভন-নাভি অলংকৃত কটি-তট হংস-মেখলায়---
কোথায় রূপসী রেবা ভুলাইলে কালিদাসে যৌবন-বিভায়?

পুষ্পিতা মাধবী সঙ্গে মধুপ মাতিলে রঙ্গে ফাল্গুনের দিনে
শ্বেতভুজা সারদার আরতির দীপালোকে উনমদ-বীণে,
আসমুদ্র-হিমাচল প্রকৃতির রম্য পট, রাজন্বতী মহী,
কি সৌন্দর্যে উদ্ধোধিলা, অতুলনা ইতিকথা মহৈশ্বর্যময়ী |
কোথায় সে অবন্তিকা, কোথা নব-রত্নপ্রভা প্রাচ্যের গৌরব?
অস্ত জ্ঞান-বিভাবসু ভারত-হৃদয়-কেন্দ্র সমাধি-নীরব!
দয়-বিলয়-ভরা আবর্তিছে বসুন্ধরা, নাহি ক্ষোভ-কণা,
কোরকে প্রসূনে ফলে মঞ্জু কিসলয়-দলে অনন্ত-যৌবনা |
প্রনষ্ট বিভব তরে, তবু খেদ-অশ্রু ঝরে বিধৌত শ্মশানে,
শোনে না বধির-মতি মৃত্যুর মঙ্গলারতি আনন্দ-বিধানে |


পাষাণ-পুলিনে তব কত যতি-তাপসের পূত নিকেতন
হরীতকী-বনভূমে সুরভিত হোমধুমে সঘৃত ইন্ধন |
ত্রিকালজ্ঞ, মহাযোগী ভৃগুর সাধনাক্ষেত্র তীর্থ সনাতন,
যাঁর পূজ্য পদরজঃ মাধবের বক্ষে রাজে ভূবন-পাবন |
প্রাণায়াম-পরায়ণ সিদ্ধবাক্ ঋষিগণ ভাঙি’ মঠাকাশ
নিভৃতে তোমারি পাশে, মিশেছেন মহাকাশে চিন্ময় সকাশ |


আজি যেন মূর্তি লভি’ কত প্রজ্ঞাচক্ষুঃ কবি সন্মুখে আমার,
মুরলীর মূর্ছনায় নিবেদিছে আরাধ্যায় স্তোত্র উপহার,---
যুগান্তের সিংহাসনে আজি তাঁরা পুণ্যশ্লোক, অমৃতায়মান,
লোকালোক-প্রান্ত থেকে রটিতেছে দিকে দিকে প্রতিষ্ঠার গান|


এ জীবনে কভু রেবা, ভুলিব না অভিরাম ভঙ্গিমা তোমার,---
সন্মোহন ধ্বনি তব বিহরিবে অন্তরের অন্তরে আমার,
করপুট ভরি’ আজি স্ফটিকবর্তুল-রাজি করিনু সঞ্চয়,
সূর্যকান্তমণিসম রাজিবে যা’ বক্ষে মম উজ্জ্বল অক্ষয় |



.                 ****************                                                      
উপরে     


মিলনসাগর
*
.                                ছাড়া

.        চেনা মানুষ বদ্ লে গেছে, নাই সে চোখের চাওয়া ;
.        ফুরিয়েছে আজ তাহার  ‘পরে প্রাণের দাবি-দাওয়া  !
স্বপ্ন মাঝে রই গো বেঁচে ,         বুকের ভিতর শুকিয়ে গেছে,----
.        নতুন সাগর নতুন সুরে জাগায় জোয়ার-হাওয়া |

.        ছিঁড়ে দে আজ বেসুরো বীন্, সংসারীদের গান ;
.        ভুলে যা মন ভোলা দিনের যেচে-সোহাগ-মান  ;
পিছন-পানে চাস্ নে ফিরে,          উড়িয়ে দে তুই ছড়িয়ে ছিঁড়ে
.        নিন্দা-যশের আবছায়াতে আশার খতিয়ান  |

.        বাঁধন যখন লাগত মধুর বেঁধেছিলাম বাসা,
.        বাঁশির সুরে বাসন্তী মোর করত যাওয়া-আসা,
আমার বাড়ি, আমার ভিটে           কতই তখন লাগত মিঠে,
.        ফুটিয়ে দিত মুখখানি কা’র ঊষার ভালবাসা  |

.        আকাশ-ভাসা অরুণ-আলো দেয় রে আমায় সাড়া,
.        দুনিয়ার এই ভরা হাটে আজ পেয়েছি ছাড়া  ;
অভিমানীর তিরস্কারে                   ঘর জুড়ে আর রইব না রে,
.        চুকেছে আজ পাঁজর-তলে হাজার তোলাপাড়া |

.        চিনেছি তাই, জীবন-গাঙে কোন্ তীরে নীর ছোটে,
.        কোন্ বাঁকে তার চোরা-বালির পাহাড় জেগে ওঠে ;
থাকতে বেলা ভাসল ভেলা,         আর না সাজে নোঙর  ফেলা,
.        এই পারে এই ফুলের হারে বিষের কাঁটা ফোটে |

.        সোনার গড়ি’ যে হাত-কড়ি পরেছিলাম হায়,
.        কে আজ তারে চূর্ণ করে আঘাত-বেদনায়-----
ঘনঘটায় তড়িৎ আঁকা,               কাঁপায় ধরা পাষাণ-পাখা,
.        ভাঙল রে মোর ধূলির দেউল ধূলির সীমানায়  |
.        কে আছে গো কোন্ অরূপে, তারার চেয়ে দূর ?
.        হৃদ্ গগনে উঠছে একি প্রতিধ্বনির সুর !
গভীর হতে গভীরতরে                      কে আমারে নীরব করে ?
.        দিন-যামিনীর কোন্ রাগিণী সুধায় সুমধুর ?

.                 ****************                                                       
উপরে     


মিলনসাগর
*
মৃণু

আকাশ যথন আবীরে ভরিল, অথচ তারকা নাই ;
মেঠো পথ দিয়ে ধূলি উড়াইয়ে ফিরিল পাটল গাই |
নধর চিকন বাছুরের গায় বিগলিত যেন মোম,
ক্বচিৎ উরুতে কভু বা উদরে শিহরি উঠিছে রোম |

এমনি সময়ে একেলা  বাহির হইল মৃণাল-বালা ;
এখনো তাহার গলায় দুলিছে বাসর-কুসুমমালা ;
চোখের কোনায় অতি সাবধানে নিপুন তূলিকা ধরি’
ভুবন-ভোলানো রেখা কে টেনেছে পলাশ-বরনে মরি !

ভিন্ গাঁ হইতে নববধূ কেউ শ্বশুর-বাড়িতে এলে---
মৃণু হয় তার প্রাণের দোসর, বাঁচে সে মৃণুরে পেলে ;
কিশোরী বালিকা পাপড়ি মেলিছে, অথচ বালিকা সে----
যারেই শুধাই তারেই মৃণাল সবচেয়ে ভালবাসে |

চুলটি বাঁধিতে কিলটি তুলিতে চুল্ বুলে হাত দু’টি----
খোকা-খুকি পেলে ও বুকে আগলি’ হাসিয়া পলায় ছুটি’ |
মৃণুর মুখের হাসিটুকু, তার কোঁকড়া কেশের রাশি----
নিমেষে নিমেষে নবরূপ ধরে, মৃণুরে দেখিতে আসি |

ঘাসের উপরে বসেছে মৃণাল তালপুকুরের তীরে,
দোলে গোধূলির সোনার নিশান দূর বনানীর শিরে |
ঢেউয়ের সোহাগে শতদল-বধূ নিরুপায় প্রাণে নাচে,
কোনোটি এখনো মুদিছে চক্ষু, কোনোটি বা মুদিয়াছে |

মৃণু সে মোদের চাহিয়া চাহিয়া শ্যাম সলিলের পানে,
কি যেন একটা আকুলি-ব্যাকুলি পুষিল আপন প্রাণে ;
মিষ্ট গলায় গাহিয়া উঠিল পল্লীর প্রেম-গীতি----
অথচ মৃণাল বোঝে না কিছুই বঁধূর মধুর প্রীতি |


সরল গানের কথাগুলি লঘু বাণের মতন বিঁধে
চোখের জলের বাঁধ ভেঙে দেয় ভাবগুলি সাদাসিধে |
লুকায়ে লুকায়ে দেখিনু প্রতিমা তালগাছতলা থেকে,
পিয়াস না মিটে যতবার দেখি চেয়ে চেয়ে দেখে দেখে  |

শুষ্ক পাতার খস্ খস্ ধ্বনি---- পলাল মৃণাল ধেয়ে----
রক্তিম সাঁঝে মুক্ত চিকুরে পলায় গ্রামের মেয়ে |
সে অনেকদিন দেখা হয়েছিল তালপুকুরের ঘাটে ;
আর আজ হেথা শাক বেচে মৃণু ‘সর্ষে-জোড়ে’র হাটে |

অঙ্গে অঙ্গে যৌবনরাগ ছাপায়ে পড়িছে লুটে,
রঙ্গে ভঙ্গে রবির রশ্মি রোমে রোমে ফুটে উঠে ;
ধূলা ঝুলিতেছে রুক্ষ অলকে, আলুথালু কেশপাশ,
মৃণুকে দেখিয়া থমকি চমকি দাঁড়ানু তাহার পাশ,

কি দেখিনু চেয়ে মানসী প্রতিমা, অচল হইল আঁখি,
বুকের শোণিতে আশার ফলকে লিনু চিত্র আঁকি’ |
বিধবা-বিবাহ ?  মৃণুকে বিবাহ ? --- কাঁপিল হৃদয়-তলে ;
প্রাণ-পতঙ্গ ঝাঁপ দিতে চায় জলন্ত প্রেমানলে |

চলিলাম গৃহে, গ্রাম-পথে ধূলা, সাপ গেছে পার হয়ে,
কোথাও পাখীর নখের ভঙ্গী চোখে পড়ে র’য়ে র’য়ে |
সমাজের ভয় ?   বিধবা-বিবাহ ?   মানিব কি পরাজয় ?
জ্বালিনু মৃণুর রতন-দীপটি জীবন-রজনীময়  |

জ্বালাতন হয়ে গ্রামের খোঁটায় ছাড়িয়া গেলাম গ্রাম,
আঁধারে আলোকে, পথে ঘাটে মাঠে, মৃণালকে ঢাকিলাম ;
মুখপানে তায় চাহিয়া দেখিনু কি দিব্য জ্যোতি ঢালা !
সমাজের শরে ঢাল সম হয়ে দাঁড়াল মৃণাল-বালা |

ঘর বাঁধিলাম পাহাড়ের গায় সাঁওতালদের সাথে,
পাটল একটি গাভী ক্রয় করি সঁপিনু মৃণুর হাতে ;
মৃণুর স্নেহের লতার তন্তু আঁকড়িল গিরি-শিলা ;
পা ডুবাতে মৃণু স্বচ্ছ নদীতে আনন্দ-লঘু-লীলা |


সোনার শলাকা বুনিত গগনে রেশমী বসন-স্তর,
অস্ত-তপন মুদিত নয়ন মহুয়া-বীথির ‘পর |
সকাল হইতে মাঠে খাটিতাম, মৃণু যেত ভাত নিয়ে,
পরীর মতন মেয়েটি আমার অবাক রহিত চেয়ে  |

চুড়ির সহিত জড়াইত হাতে মায়ের আঁচলখানি ;
মাঠের মাঝারে কেহ নাহি, শুধু আমরা তিনটি প্রাণী ;
চাহিতাম দূর দিগন্ত পানে---- সোনায় ফেলেছে সোনা,
সার্থক ওগো উপত্যকায় কমলার আলিপনা |

খাইতাম ভাত, চাহিতাম ভুলে মৃণুর মুখের দিকে-----
কি যেন মন্ত্রে জাদু করেছিল মৃণু মোর মনটিকে ;
মউল ফুলের মধুর গন্ধ, স্তব্ধ দ্বিপ্রহর,
ক্কচিৎ পাখীর করুণ কন্ঠ পলাশ ফুলের ‘পর |

ধরিতাম চাপি’ মৃণুর হাতটি, হাসিয়া চোখের কোণে,
চুমু দিত মৃণু মেয়েটির গালে, মোদের স্নেহের ধনে |
মৃণুর প্রাণের নির্মল রস চোখের দুয়ার দিয়া
ঝরিয়া পড়িত মুকুতা-ধারায়---- মৃণু সে আমারি প্রিয়া |

এত গুণবতী মাধুরীর নদী, তরুণী হেরি নি আর,----
হাসির ছাইতে ভ্রূকুটিতে তার ঝরিত সুধার ধার !
আর একদিন, সেই শেষ দিন , তখন অনেক রাতি,
মেঘের লীলায় শিহরি’ মিলায় রৌপ্য-চাঁদের ভাতি ;

মযূর-কন্ঠি চেলীর মতন কুয়াসা গিরির শিরে,
সহসা উঠিয়া বাতায়ন-দ্বার খুলিয়া দিলাম ধীরে ;
হেরিনু মৃণুর বাহুটি বেড়িয়া ঘুমায়ে পড়েছে কেশ,
চুম্বন দিনু কপোলে তাহার, ভুলিনু লজ্জালেশ-----

কি এক আবেশ-মুগ্ধ জীবনে হেরিনু কান্ত মুখ,
করপটুখানি ভরিয়া দিলাম বনফুল-যৌতুক ;
ঢলিয়া পড়িনু বক্ষে মৃণুর ----জীবন-মরণ মৃণু ;
অধর-বাঁধুলি শোষণ করিয়া নূতন মদিরা পি’নু ;

মনে হল সেই বালক-কালের তাল-পুকুরের ঘাট,
মনে হল সেই বিজুলি-বিভাস ‘সর্ষে-জোড়ে’র হাট |
ঢলিয়া পড়িনু অবশ অঙ্গে, জাগিল না মৃণু আর----
স্বপনের রূপ ধরিল আমার জাগরণ-অভিসার |

শেষ করি তবু, শেষ নাহি হয়, অফুরান তার কথা,
অফুরান সেই চোখের ভঙ্গী কালো কটাক্ষ-লতা |
এখনো, এখনো গভীর দুপুরে সেই সে গিরির গায়ে,
একেলা একাকী শালের বনের রৌদ্র-খচিত ছায়ে

হেরি তার মুখ, কন্ঠ-কাকলী কানটি ভরিয়া যায়----
উত্তর থেকে হুহূ হুহূ ক’রে আসে এলোমেলো বায় ;
সুদূর মাঠের প্রান্ত উজলি’ রূপার তাবিজ প্রায়
পাহাড়ে’ নদীর চিকন রূপটি সে মোরে দেখাত হায় |


আজ আমি একা, কাছে নাই তুমি----কই, কোথা প্রাণাধিকে,
এইখানটিতে বেড়াতে যে তুমি এই পথে এই দিকে |
অলকের ফাঁদে রৌদ্র খেলিত, দুলিত মুক্তবেণী,
আসিতে লীলায় উড়িয়ে আঁচল, পেরিয়ে শালের শ্রেণী |
তোমার চুলের ফুলের গন্ধ আকূল করিত মন,
কখনো সোহাগ, কখনো শরম, কখনো কঠিন পণ |

ওই বাজে তার চাবির রিংটি----মুখে হাসি, চোখে লাজ ;
নীল পাহাড়ের পইঠায় বসি’ পরো আজি ফুল-সাজ |
আনমনে ওগো ঘুমাইয়া পড়ি, ঘুম যে সুখের বাড়ি,
ঘুম ভেঙে দিয়ে সে ওই পালায়, পিছে ধাই তাড়াতাড়ি-----
কই কই কই  ?  ওই যায় ওই ----হায় হায় করে হাওয়া  !
ঝলসিয়া যায় প্রাণের ভিতর ---হারালে যায় কি পাওয়া ||

.                 ****************                                                       
উপরে     


মিলনসাগর