কবি মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
১।     মার ভালোবাসা       
২।     
দুই পৃথিবীর মাঝখানে      
৩।     
ঘুম তাড়ানি ছড়া      
৪।      
মনে রেখো    
৫।      
জননী যন্ত্রণা        
৬।     রক্ত      
৭।     
বুকের মধ্যে   
                   
      
*
আমার ভালোবাসা



আমার দিনমান আপন মনে শুধু মনের পথ হাঁটা
আমার সারা রাত মনের তারাভরা আকাশে তারা গোনা
এমনই লোকে লোকারণ্য সংসার আমি ছিলাম একা,
ঘরের কোণে ছিল একটি মুখ সে-ই আমার ভালোবাসা |

মনের অন্দরে বন্দী পাখি ও যে থাকতো চোখে-চোখে
নিজেকে ঠুকরিয়ে নিজেকে নিয়ে বড় ব্যস্ত---মুখে-মুখে
গোপন জানাজানি আমাতে-ওতে শুধু, শুধু আমাতে-ওতে,
ঘোমটা টানা মুখ ঘরের কোণে সে-ই আমার ভালোবাসা |

সূর্য বার বার দিতেছে হানা ; দিন দগ্ধ পথরেখা
হৃদয় ফেরি ক'রে ফিরেছে দোরে রাত উতল তারাহারা
আকাশ ফিরে গেছে বাতাস হাহাকার হেঁকেছে এসো, এসো,
ঘরের কোণে মুখ লুকিয়ে তবু সে-ই আমার ভালোবাসা |

আজ কি হাহাকার হাজার হাতে তার ভেঙেছে খিল---আসে
প্রবল কলরব বন্যা বাঁধভাঙা বাহিরে ঘরে আসে
হাসির হলকায় দমকা অভিমানে হাওয়ায় দিশেহারা
ঘোমটা খ'সে গেছে তুলেছে মুখ সে-ই আমার ভালোবাসা |

আ মরি! আজ বুঝি সারাটা সংসার মুখেরই সমারোহ
যেদিকে চাই মুখ স্নিগ্ধ ধারা স্নান মুগ্ধ দক্ষিণা
যেদিকে যাই মুখ শান্ত নীলাকাশ মাটির শ্যামলিয়া
ঘোমটা-খসা মুখ তুলেছে তার সে-ই আমার ভালোবাসা |

আ মরি! সেই মুখ কখন চাপা ঠোঁটে চণ্ড বৈশাখী
দীপ্ত বিদ্যুত্চমক দুই চোখে---ঝড়ের নাগিনী সে
ফুঁসছে এলোচুলে ক্রুদ্ধ কালো মেঘ হৃদয়ে দুন্দুভি
সারাটা সংসার একটি মুখ সে-ই আমার ভালোবাসা |


.                     ****************                                                    
উপরে


মিলনসাগর
*
দুই পৃথিবীর মাঝখানে

আমি দুই পৃথিবীর মাঝখানে। এদিকে পাহাড়
অন্তর্দাহে পৃথিবীর বুকের তোলপাড়, চোখ নদী
অন্যদিকে কালো জল স্থির জল হৃদয় অবধি-
স্বপ্নের তরঙ্গে তরী ? ডুবে হই স্মৃতির আহার ?
শরীর না মন ? দুই মহাদেশ আমাকে দ্বিধায় ।
চিবুক চমকানো, স্তন, হাসির দু-গালে রুজরঙ ?
নাকি সেই বর্ণরিক্ত বাষ্পখন্ড নাম যার মন ?
দুই প্রকৃতির আমি মাঝখানেঃ কে আমাকে চায় ?

তুমি এলে। স্বপ্ন হল স্মৃতি। দ্বিধা নির্দ্বিধা। চিনিনি।
এক সঙ্গে নিদ্রা গেল ঝড় ঝরাপাতা- তুমি এলে
ক্ষিতিতে পেলাম তেজ, স্রোতের শিকড়ে গূঢ় জল।
সমস্ত শরীরে শিউরে তীব্র স্তব্ধ বেগ, শরীরিণী,
যেই অশরীরে এলে- হাসির ওড়না খসে গেলে
সম্পূর্ণ আমার হাতে রমণীর মন অচঞ্চল।


.                ****************                                                    
উপরে


মিলনসাগর
*
ঘুম তাড়ানি ছড়া


ঘুম    আয়রে আয়।  ঘুম    আয়রে আয়। ঘুম   আয় মেঘের
সুর    সাততলার।   মেঘ    রূপকথার    দূর   পথ শুধাও
মন    ওঠরে ওঠ     মন   ছোটরে ছোট   চল   এই দেশের
পার    ক্ষেত খামার।  পথ   নেই খামার    আর   মন উধাও।
ঘুম    আয়রে আয় ।  ঘুম   আয়রে আয়।  ঘুম    পথ শেষের।


ঘুম    আসছে না।    ঘুম   আসছে না।   ঘুম    সাততলায়
মন    উড়তে চায়    আর   পথ না পায়। মাঠ    ঘাট জাঙাল
এই    বাংলাদেশ      এর    স্বপ্নশেষ-    এর    প্রাণ জ্বালায়
সব    পঙ্গপাল।      ভাই    ধান সাফল।  ভাই   মান সামাল
ঘুম    আসছেনা।     ঘুম    আসছে না।   ঘুম-   তাই পালায়



.                          ****************                                                  
উপরে


মিলনসাগর
*
মনে রেখো

মনে রেখো আমি ঝড় ঝাপটায় মানুষ |
যদিও দাওয়ায় শীতলপাটির ছায়ায়
গুরুজন-মানা স্ত্রী-পুত্র আঁকড়িয়েই
কাটালাম বহুদিন--- ফসলিয়া দিনের
বেড়ার ফাকেও চোখে ছায়া মেলে আকাশ
মাঠপার নিল পথভুলো-পথে টেনেও ;
সেই পথে উঠএ এল মেঘ, এল তুফান,
ছুঁয়ে-ছুঁয়ে গেল মেঘে-মেঘে বেগ আবেগ---
মনে রেখো আমি সয়েছি আরও ঝড়ের ঝাপট |

জেনো  নদী নই, নদী শেওলায় সবুজ
পোড়ো ভিটের গা ধুইয়ে চুইয়ে চলায়,
মাটি নই, পচা পাতায় কাদায় পিছল
মাটি নই---মন পলিমাটি, যার আমন
আগুন ফলায় বছর-বছর, আউশ
আকাশকে ছোঁয় আসেপাশে, হাত ছড়াই
মুঠো-মুঠো তুলি খুশির ফসল, ঝরাই
ঘাসের শিশির---হঠাৎ কি বটছায়ায়
গান গেয়ে উঠি বাউলে ঝুমুরে ঝড়ের?

আর ঝড় ওঠে | ঘরভাঙানিয়া ঘৃণার
ধিকিধিকি ছাইচাপা আগুন কী কুটিল!
গোখরোর মত বাস্তুহৃদয় ধোঁয়ায়
তিল-তিল জমা আক্রোশে ধাঁধা চোখের---
সে কই? কই সে? দুশমন কই? কোথায়?
কোথায়?---নাগাল না পেয়ে আপন ঘরের
ভাইকেই দোষে, গাল পাড়ে আর কুটিল
ধিকিধিক ছাইচাপা আগুনের আখায়
ঘর পোড়ে দোর পোড়ে---আসে ঝড়ঝাপটা

ঘরপোড়া ছাই কুড়োই ছড়াই কুড়োই
বুক ফাটে আর মুখে রা-কাড়ি না---আমায়
চিনবে না আজ--- আমাকেই আমি কখন
খুঁজে ফিরি দোরে-দোরে মনে-মনে, কখন
ডাইনে ও বাঁয়ে হাতড়াই, পায়ে-পায়েই
ভাঙা হাটে ফের জমেছি কীর্তনীয়াও |
আর জেনো আমি ঝড়ঝাপটায় মানুষ,
যুগসন্ধির দাউদাউ দাবদাহেই
পুড়ে খাক্ তবু আকাশে মশাল জ্বালাই |
মনে রেখো আমি যুগান্তরের মানুষ |



.                          ****************                                                  
উপরে


মিলনসাগর
*
জননী যন্ত্রণা

জন্মে মুখে কান্না দিলে, দিলে ভাসান ভেলা
একূল-ওকূল কালি ঢালা কালনাগিনী দ'য়
রাত মজাল ডোবাল দিন ঢেউয়ের ছেলেখেলা
সামনে-যে জল, জল পেছনে ভরাডুবির ভয় |
জীবন চেয়ে পেলাম কেবল হাওয়ার হা-হা-হা-হা
পাহাড় থমকে পাথর, নদীর পা-টিপে পথ ভাঙা
বাপের চোখের অভিসম্পাত দূর আকাশের চাওয়া
একটি পাশে আছড়ে পড়ে মূর্ছা বোন : ডাঙা |
ঘাট চাইতে হাট পেরোলাম, গান চেয়ে কান্না,
রাতের জন্য ঘর যা পেলাম---পা তো টানে না
ছায়ার মত এক কোণে বউ, দুয়োরে তার ছা---
হাসতে জানে না বাছা কান্না জানে না |
.                এক যে ছেলে, জোয়ান ছেলে, কই সে-ছেলে মা
.                ঘর-যে তোমার ঘরে-ঘরে, জননী যন্ত্রণা ||

জন্মে মুখে কান্না দিলে, দিলে ভাসান ভেলা
একূল-ওকূল দু'কূল-মজা কালনাগিনীর দ'য়
জলকে দিলাম সাঁতার দিলাম ঢেইকে দিলাম হেলাফেলা
ভয়কে দিলাম ভরাডুবি---কান্না আমার নয় |
কালি ঢালা নদী, বাঁকে ও-কার নৌকা, আলো
নেই-মনিষ্যি তেপান্তরে পথ চিনে কে যায়?
সে আমি সেই আমরা--- আমরা কে মন্দ কেউ ভালো
কেউ মাঠে কেউ ঘরে কেউ-বা কলে-কারখানায় |
একটি তারা-পিদিম কখন হাজার তারা জ্বালে :
েক ছেলে হারালে--- ছেলে এলাম হাজারজনা
একটি আশা অনেক মুখের পাপড়িতে মুখ মেলে :
এক নামে যেই ডাকলে--- অনেক হলাম যে একজনা |
.                ক্ষুদিরামের মা আমার কানাইলালের মা---
.                জননী যন্ত্রণা আমার জননী যন্ত্রণা ||


.                  ****************                                                                
উপরে


মিলনসাগর
*
ক্ত

কালো মেঘে বাষ্পের খেলাতে
বৃষ্টির কী নরম গন্ধ
|
.                শিরা আর ধমনীর গলিতে
.                নোনা ঢেউ আছে বুঝি জ্বলিতে :
.                দেহময় দুটো সাপ দু'মুখো
|

.                হুঁশিয়ার, বকুলের আঁধারে
.                কঙ্কাল কামনার বাঁ-ধারে
.                বিষজর্জর সাপ দু'মুখো |

হৃদস্পন্দনে মৃত ছন্দ
লাল ঢেউয়ে ভেসে যাই ভেলাতে |


১৯৪১


.                  ****************                                                    
উপরে


মিলনসাগর
*
বুকের মধ্যে

ক যে ছিল ছোট্ট ছেলের বরিশাল
স্মৃতির নূপুর ঝুমুর দুপুর তারিখ সাল

গলায় হলুদ নদীর মালা সুবিশাল
বেরোয় টিয়ে সবুজ বনের বরিশাল

সকাল আসে গায়ে রোদের পশম-শাল
পায়ে পায়ে অচিন ছায়া বরিশাল

ইশ্ কুলে  যায় মাঠে খেলায় সাতসকাল
ছোট্ট ছেলের সঙ্গী দুষ্টু বরিশাল

ঘোলা স্রোতের ঘুর্ণি তবু কি উত্তাল
অগ্নিযুগে নিশির ডাকের বরিশাল

স্বদেশ-স্বদেশ করে মিছিল টালমাটাল
ফাঁসির চেরাগ মুখ দ্যাখে তার বরিশাল

রূপশালি ধান স্তন্যদানে ইন্দ্রজাল
নারিকেলের চামর-হাতে বরিশাল

কোথায় গেল---কোথায় ছেলে কই সেকাল
কতকাল রে ছিল কোথায় বরিশাল

আজকে হঠাৎ দেশান্তরের পঙ্গপাল
উড়ে এসে বসল জুরে বরিশাল

শস্য চিতাভস্ম হা-হা মাঠ-জাঙাল
তাল-সুপারির রক্তশিখা বরিশাল

রক্ত খালি রক্ত---স্মৃতি স্বপ্ন লাল
লক্ষ নদীর রক্তস্নানে বরিশাল

রক্তে বাঁধে রাখী রাখীর রঙ গুলাল
দূরের মানুষ জাগে --- জাগায় বরিশাল

বুকের মধ্যে দাপায় বাংলাদেশ দামাল
বুকের মধ্যে ভূগোল-ভোলা বরিশাল
|

১৯


.                  ****************                                                    
উপরে


মিলনসাগর