কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে। www.milansagar.com
আমরা এখানে কবিকঙ্কণ মুকুন্দরামের কবিকঙ্কন চণ্ডী কাব্যের কিছু অংশ
তুলে দিচ্ছি :---

১।  গ্রন্থ উত্পত্তির কারণ (কবিকঙ্কণের আত্মপরিচয়)
২।  সতীর দেহত্যাগ    
৩।  
সতীস্কন্ধে শিবের ভ্রমণ              
৪।  
ফুল্লরার বারমাস্যা   
৫।  
কালকেতুর নিকটে ভাঁড়ুদত্তের আগমন          
৬।  
কালকেতুর প্রতি ভাঁড়ুদত্ত             
৭।  
মুসলমানগণের আগমন        
৮।  
মুসলমানদিগের শ্রেণী-বিভাগ                   
                
*
গ্রন্থ উত্পত্তির কারণ  
(কবিকঙ্কণের আত্মপরিচয়)

শুন ভাই সভাজন                    কবিত্বের বিবরণ
এই গীত হইল যেন মতে |
উরিয়া মায়ের দেশে              কবির শিয়র-দেশে
চণ্ডিকা বসিলা আচম্বিতে ||
সহর সিলিমাবাজ                তাতে সজ্জন-রাজ
নিবয়ে নিয়োগী গোপীনাথ |
তাঁহার তালুকে বসি                 দামিন্যায় চাষ চষি
নিবাস পুরুষ ছয় সাত ||
ধন্য রাজা মানসিংহ                বিষ্ণুপদাম্বুজ-ভৃঙ্গ
গৌড়-বঙ্গ-উত্কল-অধিপ |
সে মানসিংহের কালে              প্রজার পাপের ফলে
ডিহিদার মামুদ সরিপ ||
উজির হল রায়জাদা               বেপারিরে দেয় খেদা
ব্রাহ্মণ বৈষ্ণব হল্য অরি |
মাপে কোণে দিয়া দড়া               পনর কাঠায় কুড়া
নাহি শুনে প্রজার গোহারি ||
সরকার হৈলা কাল                খিল ভূমি লেখে লাল
বিনা উপকারে খায় ধুতি |
পোদ্দার হইল যম              টাকা আড়াই আনা কম
পাই লভ্য লয় দিন প্রতি ||
ডিহিদার অবোধ খোজ           কড়ি দিলে নাহি রোজ
ধান্য গরু কেহ নাহি কেনে |
প্রভু গোপীনাথ নন্দী                 বিপাকে হইলা বন্দী
হেতু কিছু নাহি পরিত্রাণে ||
পেয়াদা সবার কাছে                প্রজারা পালায় পাছে
দুয়ার চাপিয়া দেয় থানা |
প্রজা হইল ব্যাকুলি                  বেচে ঘরের কুড়ালি
টাকার দ্রব্য বেচে দশ আনা ||
সহায় শ্রীমন্ত খাঁ                         চণ্ডীবাটি যার গাঁ
যুক্তি কৈলা মুনির খাঁর সনে |
দামুন্যা ছাড়িয়া যাই                  সঙ্গে রমানাথ ভাই
পথে চণ্ডী দিলা দরশনে ||
ভেঠনায় উপনিত                     রূপরায় নিল বিত্ত
যদু কুণ্ডু তিলি কৈল রক্ষা |
দিয়া আপনার ঘর                    নিবারণ কৈল ডর
দিবস তিনের দিল ভিক্ষা ||
বহিয়া গোড়াই নদী                  সদাই স্মরিয়ে বিধি
তেউট্যায় হইলুঁ উপনীত |
দারুকেশ্বর তরি                     পাইল বাতন-গিরি
গঙ্গাদাস বড় কৈলা হিত ||
নারায়ণ পরাশর                      এড়াইল দামোদর
উপনীত কুচট্যা নগরে |
তৈল বিনা কৈল স্নান                 করিলু উদক পান
শিশু কাঁদে ওদনের তরে ||
আশ্রম পুখরি আড়া             নৈবেদ্য শালুক পোড়া
পূজা কৈনু কুমুদ-প্রসূনে |
ক্ষুধা-ভয়-পরিশ্রমে                 নিদ্রা যাই সেই ধামে
চণ্ডী দেখা দিলেন স্বপনে ||
হাতে লইয়া পত্র মসী               আপনি কলমে বসি
নানা ছন্দে লিখেন কবিত্ব |
যেই মন্ত্র দিল দিক্ষা               সেই মন্ত্র করি শিক্ষা
মহামন্ত্র জপি নিত্য নিত্য ||
দেবী চণ্ডী মহামায়া                 দিলেন চরণ ছায়া
আজ্ঞা দিলেন রচিতে সঙ্গীত |
চণ্ডীর আদেশ পাই                শিলাই বাহিয়া যাই
আড়রায় হইলুঁ উপনীত ||
ড়রা ব্রাহ্মণ ভূমি                 ব্রাহ্মণ যাহার স্বামী
নরপতি ব্যাসের সমান |
পড়িয়া কবিত্ব বাণী                  সম্ভাষিনু নৃপমণি
পাঁচ আড়া মাপি দিলা ধান ||
সুধন্য বাঁকুড়া-রায়                 ভাঙ্গিল সকল দায়
শিশুপাছে কৈল নিয়োজিত |
তার সুত রঘুনাথ                  রাজগুণে অবদাত
গুরু করি করিল পূজিত ||
সঙ্গে দামোদর নন্দী              যে জানে স্বরূপ সন্ধি
অনুদিন করিত যতন |
নিত্য দেন অনুমতি                  রঘুনাথ নরপতি
গায়নেরে দিলেন ভূষণ ||
বীরমাধবের সুত                  রূপে গুণে অদভুত
বীর বাঁকুড়া ভাগ্যবান |
তার সুত রঘুনাথ                  রাজগুণে অবদাত
শ্রীকবিকঙ্কণে রস গান ||


.                                             ****************                                        
উপরে
[ একটি অনুরোধ - এই সাইট থেকে আপনার ব্ লগ্ বা সাইটে, আমাদের কোন তথ্য, লেখা,
কবিতা বা তার অংশবিশেষ নিলে, আমাদের মূল পাতা http://www.milansagar.com/index.html এ
দয়া করে একটি ফিরতি লিঙ্ক দেবেন আপনার ব্ লগ্  বা সাইট থেকে, ধন্যবাদ ! ]
*
ফুল্লরার বারমাস্যা  

পাশেতে বসিয়া রামা কহে দুঃখবাণী |
ভাঙ্গা কুড়্যা ঘরখানি পত্রের ছাওনী ||
ভেরাণ্ডার খাম তার আছে মধ্য ঘরে |
প্রথম বৈশাখ মাসে নিত্য ভাঙ্গে ঝড়ে ||
অনল সমান পোড়ে বৈশাখের খরা |
তরুতল নাহি মোর করিতে পসরা ||
পদ পোড়ে খরতর রবির কিরণ |
শিরে দিতে নাহি আঁটে খুঞার বসন ||
বৈশখ হৈল আগো মোরে বড় বিষ |
মাংস নাহি খায় সর্ব্ব লোক নিরামিষ ||
পাপিষ্ঠ জৈষ্ঠ মাসে প্রচণ্ড তপন |
খরতর পোড়ে অঙ্গ রবির কিরণ ||
পসরা এড়িয়া জল খাত্যে যাত্যে নারি |
দেখিতে দেখিতে চিলে লয় আধা সারি ||
য়ন্য নাহি মেলে এই পাপ জষ্ঠি মাসে |
বেঙছির ফল খেঞা থাকি উপবাসে ||
ভূবন পুর্ণিত হৈল নবমেঘজল |
হেন কালে মৃগ মারে পাপ কর্মফল ||
মাংসের পসরা লয়্যা বুলি ঘরে ঘরে |
কিছু খুদ-কুড়া মিলে উদর না পূরে ||
কি কহিব দুঃখ মোর কহনে না যায় |
কাহারে বলিব কি দূষিব বাপ মায় ||
শ্রাবনে বরিষে মেঘ দিবস রজনী |
সিতাসিত দুইপক্ষ একই না জানি ||
চারি মাসে বস্ত্রখানি হইয়া গেল তুণ্ডা |
পালটিতে নাহি মোর একখানি মুণ্ডা ||
আচ্ছাদন নাহি অঙ্গে পড়ে মাংস-জল |
কত মাছি খায় অঙ্গে করমের ফল ||
অভাগ্য মনে গুণি অভাগ্য মনে গুণি |
কত শত খায় জোঁক নাহি খায় ফণী ||
ভাদ্রপদ মাসে বড় দুরন্ত বাদল |
নদনদী একাকার আটদিকে জল ||
পসরা করিয়া সিরে ফিরে ঘরে ঘরে |
য়নলে পুড়এ অঙ্গ ভিতরে বাহিরে ||
ফিরাত পাড়াতে বসি না মেলে উধার |
হেন বন্ধুজন নাহি যেবা সহে ভার ||
দুঃখ কর অবধান দুঃখ কর অবধান |
লঘুবৃষ্টি কুড়াতে সদাই বহে বান ||
আশ্বিনে অম্বিকা পূজা করে জনে জনে |
ছাগল মহিষ মেষ দিয়া বলিদানে ||
উত্তম বসনে বেশ করয়ে বনিতা |
অভাগী ফুল্লরা করে উদরের চিন্তা ||
ব্যাধের হরিণ মাংস কে নিব মন্দিরে |
দেবীর প্রসাদ-মাংস সবাকার ঘরে ||
কার্ত্তিক মাসেতে হৈল হিমের জনম |
করয়ে সকল লোক শীত নিবারণ ||
নিয়োজিত কৈল বিধি সবার কাপড় |
অভাগী ফুল্লরা পড়ে হরিণের ছড় ||
মাস মধ্যে মার্ঘসিসু আপনি ভগবান |
হাঠে মাঠে গৃহে গোঠে সবাকার ধান ||
কত দুঃখ শহে গায় কত দুঃখ শহে গায় |
নিরামিশ করে লোক মাংস না বিকায় ||
উদর ভরিয়া অন্ন দৈবে দিল যদি |
যম সম শীত তথি নিরমিস বিধি ||
দুস্খ সুন ঠাকুরানি দুস্খ সুন ঠাকুরানি |
ফুল্লরার সমান য়ার নাহি য়ভাগিনি ||
বড় দুঃখ মনে গুণি বড় দুঃখ মনে গুণি |
পুরাণ খোসলা গায় দিতে করে পানি ||
কত নিবেদিব দুঃখ কত নিবেদিব দুঃখ |
বিপাক পাইল স্বামী বিধাতা বৈমুখ ||
পৌষে সকল ভোগ সুখী সর্ব্বজন |
তুলি পাড়ি পাছুড়ি শীতের নিবারণ ||
তৈল তুলা তনূনপাত্ তাম্বুল তপন |
করয়ে সকল লোক শীত নিবারণ ||
হরিণী বদলে পাইনু পুরাণ খোসলা |
উড়িতে সকল অঙ্গে বরিষয়ে ধুলা ||
বৃথা বনিতা জনম বৃথা বনিতা জনম |
ধূলি বয়ে নাহি মেলি শয়নে নয়ন ||
দুঃখ কর অবধান দুঃখ কর অবধান |
জানি ভানু কৃশানু শীতের পরিত্রাণ ||
মাঘ মাসে অনিবার সদাই কুজ্ঝটী |
আন্ধারে লুকায় মৃগ না পায় আক্ষটী ||
ফুল্লরার কত আছে কর্মের বিপাক |
মাঘ মাসে কাননে তুলিতে নাহি শাক ||
দুস্খে কর য়বগতি দুস্খে কর য়বগতি |
জনম য়বধি য়ামি ক্লেশে করি মতি ||
শুন মোর বাণী রামা শুন মোর বাণী |
কোন সুখে মোর সাথে হইবে ব্যাধিনী ||
সহজে শীতর ঋতু ফাগুন যে মাসে |
পোড়ায়ো রমণীগণ বসন্ত বাতাসে ||
মধুমাসে মলয়-মারুত বহে মন্দ |
মালতীর মধুকর পিয়ে মকরন্দ ||
বনিতা পুরুষ যত পীড়য়ে মদনে |
ফুল্লরার অঙ্গ পুড়ে উদর-দহনে ||
দারুণ দৈব-দোষে গো দারুণ দৈব-দোষে |
একত্র শয়নে স্বামী যেন ষোল ক্রোশে ||
অনল সমান পোড়ে চৈত্রের খরা |
চালুসেরে বান্ধা দিনু মাটিয়া পাথরা ||
ফুল্লরার কত আছে করমের ফল |
মাটিয়া পাথরা বিনে অন্য নাহি স্থল ||
দুঃখ কর অবধান দুঃখ কর অবধান |
আমানি খাবার গর্ত্ত দেখ বিদ্যমান ||
ফুল্লরার অভিলাষ বুঝিয়া পার্ব্বতি |
আশ্বাস করিয়া তারে বলেন ভারতী ||
আজি হইতে মোর ধনে আছে তোর অংশ |
শ্রীকবিকঙ্কন গীত গান ভৃগু বংশ ||

.            ******************                                         
উপরে
*
সতীস্কন্ধে শিবের ভ্রমণ

বৈরাগে চলিলা ত্রিলোচন |
ব্রহ্মা আদি পুরন্দরে              রহাবারে যত্ন করে
নাঞি শুনে কাহার বচন ||
সতীকে লইয়া শূলে              তুলিয়া স্কন্ধের মূলে
ত্রিভূবন করেন ভ্রমণে |
কাটিতে সতীর শব                জগতের নাথ দেব
অনুমতি দিল সুদর্শনে ||
চক্রকীট কূপ ধরি                শরীরে প্রবেশ করি
গ্রন্থে গ্রন্থে কাটিতে লাগিল |
বামা চরণ নিলা                  পড়িল যে ঘাটশিলা
তার নাম রুক্মিণী হইল ||
দক্ষিণ চরণবরে                  পড়িল যে যাজপুরে
তার নাম হইল বিরজা |
দেবতা সকল মেলি              সিদ্ধপাঠ তারে বলি
সুরপতি তার করে পূজা ||
চক্রে সব্য হাত কাটে            পড়ে রাজবোলহাটে
বিশাল-লোচনী মাহেশ্বরী |
সতীর দক্ষিণ হাথ             বালিডাঙ্গায় হইল পাত
রাজেশ্বরী বলি নাম ধরি ||
তবে সদাশিব রায়                  মহা পরিশ্রম পায়
ক্ষীরগ্রামে করিলা বিশ্রাম |
তাহে পৃষ্ঠদেশ পড়ে             দেবের আনন্দ বাড়ে
যোগাদ্যা হইল তার নাম ||
তবে প্রভু ধূর্জ্জটে                 গেলেন নগর কোটে
দিবসেক রহিলা পিনাকী |
মস্তক কাটে চক্রকীট              সেই মহা সিদ্ধপীঠ
তার নাম হইল জ্বালামুখী ||
তবে ত দেবের রাজ              উত্তরিলা হিংলাজ
নাভিস্থল পড়িল তথায় |
দেব করে তন্ত্রমান                সেই মহা সিদ্ধস্থান
জপিলে পাতক নাশ পায় ||
ঈশানে ঈশান যায়               উত্তরিলা কামাখ্যায়
তথা হৈল দেবী প্রিয় স্থান |
মধ্য অঙ্গে কাটে কীট              সেই মহা সিদ্ধপীঠ
কামরূপ-কামাখ্যা তার নাম ||
তবে ত কৈলাশবাসী               উত্তরিলা বারাণসী
বক্ষঃস্থল পড়িল তাহাতে |
বিশালাক্ষী রূপ হৈল             সর্ব্বদেবে পূজা কৈল
উঠে শিব শূল করি হাতে ||
প্রভু শূল শূণ্য দেখি              স্নেহেতে সজল আঁখি
অস্থিখণ্ড পাইল শূল-আগে |
কারুণ্য-পদান্য (?) বলি          সেই অস্থি কণ্ঠে ধরি
ধ্যান করি বসিলেন যোগে ||
সিদ্ধপীঠ যত স্থান                   শঙ্কর সাধয়ে জ্ঞান
কার্যসিদ্ধ হয় জপগুণে |
শুন রে সাধক ভায়া               এই স্থানে জপ গিয়া
শ্রীকবিকঙ্কণ রস ভণে ||

.                                               ************                                         
উপরে
*
সতীর দেহত্যাগ  

অণিমাদি করিয়া যাহার অষ্টসিদ্ধি |
যাহার চরণ-রজঃ বাঞ্ছা করে বিধি ||
প্নাক ধনুক যার অনন্ত শিঞ্জিনী |
যাহাতে হইলা শর দেবচক্রপাণি ||
সমুদ্র-মন্থনে ঘোর উঠিল গরল |
ত্ন লোক দহে যেন প্রলয়-অনল ||
হেন বিষ পিয়ে শিব রাখিল জগত্ |
সম্পদে মাতিয়া মূঢ় না জান মহত্ ||
চরণ-নিছনী যার চরণে রজ |
দুর্লভ জানিয়া যার বাঞ্ছা করে অজ ||
সহস্র কমলে হরে পূজা করে হরি |
একটি কমল তার শিব কৈল চুরি ||
মন্ত্র আছে পুষ্প নাহি ভাবে গদাধর |
ডানি চক্ষু দিল নিয়া শিবের উপর ||
কপালে ধরিয়া চক্ষু হইল ত্রিলোচন |
কমল-নয়ন হৈলা দেব নারায়ণ ||
দেব নাগ নর শিবে করয়ে পূজন |
তোমা বিনী দ্বেষভাব করে কোন্ জন ||
লোক-রিপু ত্রিপুর দহন কৈল হর |
কি কারণে হেন জনে বল কটূত্তর ||
শিবনিন্দা-শ্রবনে করিব প্রতিকার |
তোমার অঙ্গজ তনু না রাখিব আর ||
গুরুজন-নিন্দা শুনি আচ্ছাদি শ্রবণ |
যেই নিন্দা করে তার করিয়ে শাসন ||
সেই স্থান ছাড়ি কিংবা যাই অন্য স্থান |
পাপ-প্রতিকার হেতু তেজিয়া পরাণ ||
হৃদয় সরোজে চিন্তি শিবের চরণ |
দৃঢ় করি মহামায়া পরিলা বসন ||
যোগেতে তেজিলা তনু জগতের মাতা |
মুকুন্দ রচিল গৌরী-মঙ্গলের গাথা ||

.            ******************                                         
উপরে
*
কালকেতুর নিকটে ভাঁড়ুদত্তের আগমন

ভেট লয়্যা কাঁচকলা               পশ্চাতে ভাঁড়ুর শালা
আগে ভাঁড়ুদত্তের পয়ান |
ভালে ফোঁটা মহাদম্ভ               ছেঁড়া ধুতি কোঁচা লম্ব
শ্রবণে কলম খরশাণ ||
প্রণাম করিয়া বীরে                   ভাঁড়ু নিবেদন করে
সম্বন্ধ পাতায়্যা বলে খুড়া |
ছেঁড়া কম্বলেতে বসি                  মুখে মন্দ মন্দ হাসি
ঘন ঘন দেয় বাহু নাড়া ||
আমি বড় প্রতিআশে              এসেছি তোমার দেশে
আগুয়ান ডাকিবে ভাঁড়ুরে |
যতেক কায়স্থ দেখ                  ভাঁড়ুর পশ্চাতে লেখ
কুলে-শীলে মহত্ব বিচারে ||
কহি যে আপন তত্ব                      আমলহাঁড়ার দত্ত
তিন কুলে আমার মিলন |
দুই নারী মোর ধন্যা                     ঘোষ বসুর কন্যা
মিত্রে কৈল কন্যা-সমর্পণ ||
গঙ্গার দুকূল কাছে                     যতেক কুলীন আছে
মোর ঘরে করয়ে ভোজন |
ঝারী থালা অলঙ্কার                    দিয়া করি ব্যবহার
কেহ নাহি করয়ে রন্ধন ||
বহু পরিবার মেলা                     দুই নারী চারি শালা
চারি পুত্র বহিনী শাশুড়ী |
ছয় জামাই ছয় ঝি                        বিশেষ বলিব কি
ধান্য দিবে নাহি দিব বাড়ি ||
হাল বলদ দিবে খুড়া                    দিবে হে বিছন পুড়া
ভান্যা খাত্যে ঢেকী কুলা দিবে |
আমি পাত্র রাজা তুমি                আগে পূজা পাব আমি
পরিণামে ভাঁড়ুরে জানিবে ||
ভাঁড়ুর বচন শুনি                         মহাবীর মনে গুণি
করিল তাহার বহু মান |
দামুন্যা-নগরবাসী                         সঙ্গীতের অভিলাষী
শ্রীকবিকঙ্কণ রস গান ||

.                                               ************                                         
উপরে
*
কালকেতুর প্রতি ভাঁড়ুদত্ত

সঘনে নাড়িয়া শিরে                  গাঙ্গুটি প্রবন্ধে ধীরে
ভাঁড়ুদত্ত কহে কাণ-কথা |
যে হৈলে প্রজা বৈসে               কহি আমি সবিশেষে
একে একে সকল বারতা ||
দেহ মোরে সর্ব্ব ভার              তাড়বালা আদি হার
তুমি থাক নিশ্চিন্তে নিশয় |
বহু প্রজা বসাইব                     এক ছাইয়াপত্র লব
বন্দে বন্দে যেন প্রজা রয় ||
যখন পাকিবে খন্দ                   পাতিবে বিষম দ্বন্দ্ব
দরিদ্রের ধান্যে দিব নাগা |
খাইয়া তোমার ধন                    না পালায় প্রজাগণ
শেষে যেন নাহি পাও দাগা ||
দেওয়া ভেটের বেটা                  বহিত আমার চিঠা
যারে বল বুলান মণ্ডল |
থাকিতে সকল প্রজা                 আগুয়ান মোর পূজা
কহিলাম প্রকার সকল ||
পরি দু-পণের কাচা                  ভানিত আমার ভাচা
সেই বেটা হবে দেশমুখ |
নফরের হাতে খাণ্ডা                  বহুড়ীর হাতে ভাণ্ডা
পরিণামে দেই অতি দুখ ||
শুনিয়া ভাঁড়ুর বাণী                     মহাবীর মনে গুণি
মনে ভাবি না দিল উত্তর |
করিয়া চণ্ডিকা ধ্যান                      শ্রীকবিকঙ্কণ গান
নায়কেরে দেহ চণ্ডী বর ||

.                                               ************                                         
উপরে
*
মুসলমানগণের আগমন

কলিঙ্গ-নগর ছাড়ি                   প্রজা লয় ঘর বাড়ী
নানা জাতী বীরের নগরে |
পাইয়া বীরের পান                 বৈসে যত মুসলমান
দিলেম পশ্চিমদিক তারে ||
আইল চড়িয়া তাজি                 সৈয়দ মৌলানা কাজি
খয়রাতে বীর দেয় বাড়ি |
পুরের পশ্চিম পটি                বোলয়ে হাসন হাটী
বৈসে কলিঙ্গ দেশ ছাড়ি ||
ফজর সময়ে উঠি                বিছায়ে লোহিত পাটী
পাঁচ বেরি করয়ে নমাজ |
ছোলেমানী মালা করে                   জপে পীর পেগম্বরে
পীরের মোকামে দেয় সাঁজ ||
দশ বিশ বেরাদরে                 বসিয়া বিচর করে
অনুদিন কেতাব কোরান |
কেহ বা বসিয়া হাটে                  পীরের শীরিনি বাঁটে
সাঁঝে বাজে দগড় নিশান ||
বড়ই দানিসবন্দ                না জানে কপট ছন্দ
প্রাণ গেলে রোজা নাহি ছাড়ি |
যার দেখে খালি মাথা               তার সনে নাহি কথা
সারিয়া চেলার মারে বাড়ি ||
ধরয়ে কম্বোজ বেশ                  মাথাতে না রাখে কেশ
বুক আচ্ছাদিয়া রাখে দাড়ি |
না ছাড়ে আপন পথে              দশ রেখা টুপি মাথে
ইজার পড়য়ে দৃঢ় দড়ি ||
আপন টোপর নিয়া               বসিলা গাঁয়ের মিয়া
ভুঞ্জিয়া কাপড়ে মোছে হাত |
শেরানি নোহালি পানি               কুড়ানি বিটুনি হুনি
পাঠান বসিল নানা জাত ||
বসিল অনেক মিঞা              আপন তরফ নিঞা
কেহ নিকা কেহ করে বিয়া |
মোলনা পড়ায়্যা নিকা                দান পায় সিকা সিকা
দোয়া করে কলমা পড়িয়া ||
করে ধরি খর ছুরি                  কুকুড়া জবাই করি
দশ গণ্ডা দান পায় কড়ি |
বকরি জবাই যথা              মোল্লারে দেই মাথা
দান পায় কড়ি ছয় বুড়ি ||
যত শিশু মুছলমান                 তুলিল দলিজখান
মখদম পড়ান পড়না |
রচিয়া ত্রিপদী ছন্দ              পাঁচালী করিয়া বন্ধ
গুজরাট-নগর-বর্ণনা ||

.                                               ************                                         
উপরে
*
মুসলমানদিগের শ্রেণী-বিভাগ

রোজা নমাজ না পড়িয়া কে হৈল গোলা |
তাসন করিয়া নাম ধরাইল জোলা ||
বলদে বাহিয়া নাম ধরাল্য মুকেরি |
ফিঠা বেচি কেহ নাম ধরাল্য পিঠারি ||
মত্স বেচিয়া নাম ধরাল্য কাবাড়ি |
নিরন্তর মিথ্যা কহে নাহি রাখে দাড়ি ||
হিন্দু হইয়া মুছলমান হৈল গরসাল |
কেহ রাত্রিকাণা হৈয়া মাগে নিশাকাল ||
সানা বান্ধিয়া ধরে সানাকার নাম |
সুন্নত্ করিয়া নাম ধরয়ে হাজাম ||
পট্টা পড়িয়া কেহ ফিরয়ে নগর |
তীরকর হয়্যা কেহ নির্ম্মাণয়ে শর ||
কাগজী ধরিলা নাম কাগজ করিয়া |
নানা স্থানে বুলে কেহ কলন্দর হৈয়া ||
কাটিয়া কাপড় সিয়ে দরজীর ঘটা |
নেয়াল বুনিয়া নাম ধরয়ে বেনটা ||
রঙ্গরেজ নাম ধরে রঙ্গণ করিয়া |
ধরিলা হালান নাম কুদ্দুর ধরিয়া ||
গোমাংস বেচিয়া নাম ধরয়ে কসাই |
এই হেতু যমপুরে তার নাই ঠাঁই ||
নানা বৃত্তি করিয়া বসিলা মুছলমান |
অবধান করি শুন হিন্দুর আখ্যান ||
অভয়ার চরণে ইত্যাদি ||

.              ************                                             
উপরে
               



মিলনসাগর