কবি ডঃ নবারুণ ঘোষালের কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
নবরূপে খাই খাই          

একশো বছর আগে কবি সুকুমার রায়
দুনিয়ার খাওয়া সবই ধরেছেন কবিতায়।
একশো বছরে বহু খেয়োখেয়ি বেড়েছে,
শত নয়া খানাপিনা তবু মন কেড়েছে।
নতুন যুগের নানা খাবারের ডালি ভরে  
এনেছি সাজিয়ে, থাকো একটু সবুর করে।  
বার্গার, পিৎজা ও ম্যাকারনি, চাউমিন —    
আমেরিকা, ইতালির স্বাদে মেশে নয়াচীন।
চীনা ডাক্‌রোস্ট খেয়ে গায়ে লাগে গত্তি;  
ভাজা মাছ মুখ নাড়ে, এও নাকি সত্যি!  
কাঁচা সে মাছের ডিম, নাম তার কাভিয়ার  
জাতীয় খাবার নাকি শুনেছি তা রাশিয়ার।
ফুগু মাছ খেয়ে মিছে জাপানীরা দেয় প্রাণ
অক্টোপাসের ঝোল খাঁটি ইউরোপীয়ান।    
জলভরা তালশাঁস, ফিশরোল, এগরোল,  
কলকাতাবাসীদের পেটেতে বাধায় গোল।   
বিহারে লিট্টি খায়, বোম্বেতে ভেলপুরি   
ভুটানে কুকুরভাতি, শুনে ঘাঁটে নাড়িভুঁড়ি।  
পিছিয়ে পড়েছে আজ ডাব-ঘোল-শরবৎ,
চা-কফি ও কোকাকোলা খুশ করে তবিয়ৎ।
তেষ্টায় ছাতি ফাটে? চিবোও বাব্‌লগাম;
পান খাওয়া নয় বাপু ভদ্রলোকের কাম।
সিগার খেলেই তুমি হবে বুঝি চার্চিল?
খৈনী খেয়েই লালু জয় করে নেন দিল।  
বেক্‌ড্‌ বীন্‌স্‌, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, মাশরুম, পাস্তায়,
ক্রিকেট আর রাজনীতি, ডিনারে কি নাস্তায়।
ক্যাম্প ডেভিডেতে গিয়ে অনেকে খায়নি গোশ্‌ৎ
জবাই না ঘ্যাচাং, তা কি করে বুঝব দোস্ত?
বুশ বলে, বেশি খায় ইন্ডিয়া-চায়না
মার্কিন দেশে লোকে তাই খেতে পায়না
হেরোইন খেয়ে শিবু হয়ে গেছে হাবাগোবা
আদর দিয়েই মাথা খেয়েছিল তার বাবা।
ল্যাং খেয়ে কাঁদে বসে ও পাড়ার দেবদাস,
দেশী মাল খেয়ে শুধু ফেলে দীর্ঘশ্বাস।
বার খেয়ে বেরিয়েছ হাতে নিয়ে ঝান্ডা?
ঝাড় খেয়ে কর্তার হবে ফের ঠান্ডা।
গিন্নীর গ্যাস খেয়ে যাচ্ছ যে দোকানে
ঢপ খেয়ে দোকানীর ঠকে যাবে সেখানে।
শক্‌ খেয়ে মরে শুনি মাঝে মাঝে তার চোর
চশমা খেলে কি তাকে বলব চশমখোর?
পরের মুখেতে ঝাল খেয়ে করো সুবিচার?
কোন দোষে চাকরিটি খেলে তুমি নমিতার?
তেল খেয়ে খেয়ে পাকা হয়ে ওঠে লাঠিখান
বেশি তেল খাওয়া গাড়ি কিনলেই লোকসান।
রোদ খেয়ে, জল খেয়ে, কাঠ হয় পোক্ত
ঘষা খেয়ে, ছাল উঠে বেরোল কি রক্ত?
চাপ খেয়ে বাপ বলে অনেক আপিসবাবু
সাপ খেয়ে সাঁওতাল হয়না মোটেই কাবু।
খুন চোষে জমিদার, চোষে খোকা চুষিকাঠি
ঝিনুকের শাঁস চোষে সাহেবরা পরিপাটি।
বাঙালীর খাওয়া আজ হয়ে গেছে দুইভাগ —
শামসুর, নীরেনের মাঝেতে পড়েছে দাগ।
দেশেতে বড় আকাল, সুকুমার কেউ নেই
খাবারের কবিতায় হাসির আর ঢেউ নেই।
নিখাদ সে খাবারের স্বাদ আর নেই তো —
ছানাতেও মিশে গেছে ময়দার লেই তো।
গাওয়া ঘি তো স্বপ্নের পোলাওয়েই ঢালি রোজ
বাস্তবে ডালডার লুচিতেই মহাভোজ।
তাই রেপসীড তেলে ভাজা এই ব্যঞ্জন
সুকুমার চরণেতে দিয়ে করি তর্পণ।


.          ***********************                                            
পরে


মিলনসাগর
বাংলা আমার মা


নিজভূমে পরবাসী                                           ঝাড়খন্ডের বঙ্গভাষী
নববর্ষ, পূজো আসে শুধুই স্মৃতি নিয়ে
ধনতেরসের কুৎসিত ধন                               কালো টাকার ঝন্‌ঝনাঝন্‌
হালখাতা আর কোলাকুলি দিয়েছে ভুলিয়ে।
সিংভূম, দুমকার পাহাড়ে,                                 চট্টগ্রামে আর কাছাড়ে
পদ্মা থেকে দামোদরের তীর জুড়ে এক দেশ —
রাজনীতি আর টাকার খেলায়                           ধর্ম-জাতের ধ্বংসলীলায়
লালমুখো আর কালো সাহেব করল তাকে শেষ।
শেষ হলো গান দোয়েল শ্যামার                     টুকরো করে কাটলো আমার
শ্যামল বরণ বাংলা মায়ের কোমল করুণ দেহ ;
ছড়িয়ে ভেদাভেদির জহর                               বিষিয়ে দিল শান্তির ঘর
ঘুচিয়ে দিল মিলন মধুর ভাইয়ের মায়ের স্নেহ।
শাঁখের আওয়াজ, উলুধ্বনি                              আজানের সে মধুর বাণী
ছাপিয়ে উঠে আজকে শুধুই হিন্দী গানের ধুম
টুসু-বাউল-ভাটিয়ালি                                       ছৌ-ঝুমুরের মঞ্চ খালি
নজরুল আর রবিঠাকুর ঘুমিয়ে নিঃঝুম।
মা কেন আজ এ হীন বেশে                           এই দুনিয়ার কোন সে দেশে
কাদের ঘরে আছে এমন সোনার চাঁদের দল ?
সাহিত্য আর নৃত্য-গীতে                                 খেলাধূলায়, রাজনীতিতে,
বিজ্ঞানে কি কোন বিভাগে পিছিয়ে মোরা বল্‌ ?
চন্ডীদাস আর গোবিন্দদাস,                                 শ্রীচৈতন্য বা কৃত্তিবাস
রামমোহন আর বিদ্যাসাগর কাদের ঘরের ছেলে?
হেম-নবীনের রণ-আবাহন                                      দীনবন্ধুর নীল দর্পণ
মাইকেল আর বঙ্কিম বল্‌ কোন দেশেতে মেলে?
মাষ্টারদা, ক্ষুদিরাম বোস,                                নেতাজীর বল-বীর্য-সাহস,
বিনয় বাদল দীনেশ বলো কোন সে মায়ের ধন —
শ্রীরামকৃষ্ণ, বিবেক-বাণী                                কোন মা দিল ধরায় আনি
অরবিন্দ, মা সারদায় কে দিয়েছে স্তন?
প্রফুল্ল রায়, জগদীশ বোস,                            মেঘনাদ সাহা, সত্যেন বোস,
অমর্ত্য সেন, মহলানবীশ কার কোল আলো করে?
সুকুমার রায়, শরৎচন্দ্র,                                 ত্রৈলোক্যনাথ কি উপেন্দ্র,
বনফুল আর পরশুরাম এল কাদের ঘরে?
সুকান্ত সেই কিশোর নেতা,                                  আশাপূর্ণা, মহাশ্বেতা,
শিব্রাম আর নারায়ণে বসিয়ে চাঁদের হাট
বিষ্ণু-সুনীল-শক্তি-নীরেন                                শামসুর আর শঙ্খ-প্রেমেন
কলম-কালির দাপট দিয়ে চালায় রাজ্যপাট।
হাসান রাজা, আব্বাসউদ্দিন,                            পূর্ণ দাস আর আলাউদ্দিন,
শচীন কর্তা কার সুরেতে ধরেছিলেন তান?
হেমন্ত বা রবিশঙ্কর                                     আরতি কি সন্ধ্যা-কিশোর,
মান্নাকে কে শুনিয়েছিল ঘুমপাড়ানি গান?
ফরাসী এক রাষ্ট্রপ্রধান                                    সত্যজিতের বাড়িতে যান
দেশের সেরা পদকটিকে নিজের হাতে বয়ে —
সৌরভ দাঁত চেপে দাঁতে                                   অপমানের বদলা নিতে
শক্ত হাতে ব্যাট ধরে ফের ফিনিক্স পাখী হয়ে।
আনন্দমোহন যে তিনি                                       ঈশ্বরেরই আসন ছিনি
নিজের হাতে সৃষ্টি করেন প্রথম অণুজীব
বাবুল-শ্রেয়া-অনীক-শানু                                        নচিকেতা ও শান্তনু
সুরের রাজ্যে বয়ে চলেন নতুন যুগের দীপ।  
এমন চাঁদের হাটের মাঝে                                বাঙালী তুই কিসের লাজে
বাংলা মায়ের মুখের থেকে মুখ ফিরিয়ে র’স?
অমর্ত্য আর রবির সাথে                               ইউনুস জ্বলে তোর মাথাতে
তিনটি নোবেল নিয়েও হ’বি হিংলিশেরই বশ?
মন্ডল আর মাহাতো ভাই                                 পশ্চিমীদের পায়ে সদাই
সেলাম ঠুকে ধূয়ো তোলেন, “হিন্দী হ্যায় হাম”
আন্‌সারি-শেখ-কাজীর দলে                              মায়ের মুখের ভাষা ভুলে
উর্দুভাষী বলে তোলেন ভোটের খাতায় নাম।
চ্যাটার্জী-বোস সাহেব মিলে                            পিৎজা সমেত ভদ্‌কা গিলে
     নাকীসুরে আমেরিকান ভাষায় কথা কয়
সোনার কাঠির গল্প ভুলে                            হ্যারি পটার, জ্যাক এন্ড জিলে
বাংলা ভাষায় মা-বাবা ডাক শুনতে লজ্জা হয়।
এমনি করে রাখবি কি ভাই                              বাঁচিয়ে নিজের মর্যাদাটাই
পায়ের নীচে থাকবে কি তোর এক ছটাকও জমি?
সংখ্যাগুরু হয়েও কি তাই                                   সংখ্যালঘু রইবি সদাই
প্রথম হয়েও দ্বিতীয় ভাষার স্থান পেতে চাও তুমি?
পষ্ট গলায় বাংলা বলে                                      গর্বেতে শির উচ্চে তুলে
জগৎসভায় চেঁচিয়ে বলো “বাংলা আমার মা”
শেকল ভাঙার শপথ হাতে                           মায়ের চোখের জল মোছাতে
লক্ষ ছেলের আত্মবলি ভুলতে পারি না।
ঝাড়খন্ডে, কামতাপুরে,                                 আর কেটোনা বাংলা মা-রে
রক্ত যে তার ঝরে ঝরে শুকিয়ে গেছে হায় —
বুকের দুধ আর কে দেবে বল্‌                                মাতৃঘাতী ওরে পাগল
চোখের উপর স্বদেশ তোমার লুঠ তো হয়ে যায়।
বাইশ কোটি বাঙালী ভাই                             একসাথে ফের জুটলে সবাই
কাটবে এ ঘোর রাতের আঁধার, দুঃখ হবে শেষ –
ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা                                       আমাদের এই বসুন্ধরায়
ঝলমলিয়ে উঠবে আবার বাংলা নামে দেশ।


.                                                 ***************                                           
পরে


মিলনসাগর
যত মত তত পথ    


ওসামা বিন লাদেন
তার নিজের মতন করে
ঈশ্বরকে পেতে চায়।

কন্ডোলিজা রাইস চায়
আবু ঘ্রাইব্ আর গুয়ান্তানামো কারাগারের
ধর্ষকামী সৈন্যদের ক্রুসেডের রথে চড়ে
ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে।

হজরত মহম্মদের
প্রেম আর সহাবস্থানের বাণী
অশ্বের হ্রেষা আর অসির ঝলকানিতে
প্রচারিত হয় এশিয়ায়, ইউরোপে, আফ্রিকায়।

ধর্ম সংস্থাপনার ছুতোয়
“তস্মাদ্‌ যুধ্যস্ব ভারত” বলে
স্বজন হত্যায় উস্কানি দিয়ে
গীতার ভগবান
আঠারো অক্ষৌহিনী মানুষকে
আঠারো দিনের মধ্যে
নিশ্চিহ্ন করে দেন।

পবিত্র বাইবেলের
প্রথম স্যামুয়েলের পঞ্চদশ পরিচ্ছেদে
জিহোভা আদেশ দেন
আমলেক আক্রমণ করে
নারী-পুরুষ, দুগ্ধপোষ্য শিশু,
বৃষ-মেষ, উষ্ট্র-গর্ধভ সবকিছুকে
ধ্বংস করে ফেলতে।

দ্বিতীয় স্যামুয়েলের দ্বাদশ পরিচ্ছেদে
অধার্মিকের উদ্দেশ্যে
ঈশ্বর ঘোষণা করেন —
“তোমার নিজের গৃহে আমি
তোমার বিরুদ্ধে
অশুভ শক্তিকে জাগ্রত করিব।
তোমার স্ত্রীকে বাহির করিয়া আনিব
এবং তাহাকে
তোমার প্রতিবেশীর হস্তে প্রদান করিব।
সে সমগ্র ইজরায়েলের সমক্ষে
তোমার স্ত্রীর সহিত সঙ্গম করিবে”।

“ইসলামের তরবারি” তৈমুর লঙ্‌
আর হিন্দুত্বের খড়্গধারী নরেন্দ্র মোদী
ইতিহাসের পাতায় আসন সংরক্ষিত করে ফেলে
গর্ভিনী মায়ের গর্ভ চিরে
সন্তানকে বের করে এনে
তাকে তরোয়ালের ডগায় বিঁধে নাচানোর
অতুলনীয় বীর্যে।

ইন্‌কুইজিশনের অন্ধকুপে
হাত-পা গুটিয়ে
মাসের পর মাস,
বছরের পর বছর
প্রতিনিয়ত মৃত্যুর কামনারত মানুষের
অধার্মিক আত্মাকে
ঈশ্বরের প্রতি অনুগত করে তুলতে,
ধর্মযাজকদের কাঁটা বসানো চাবুকের শিস্‌
উঠতে বসতে
দয়াময় যীশুর
প্রেমের বাণী শুনিয়ে যায়।

জীবন্ত জিওর্দানো ব্রুনোর
পোড়া মাংসের গন্ধ
গালিলিওর তত্ত্বকে ছড়িয়ে দেয়
আকাশে বাতাসে –
বাইবেলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বয়ে।

হাজার হাজার বৌদ্ধ ভিক্ষু্র
বুকফাটা আর্তনাদ
ব্যর্থ হয়ে আছড়ে পড়ে
ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পুনরুত্থানের নায়ক
অজাতশত্রুর
কারাগারের যন্ত্রণাকক্ষে।

গরম লোহার শলাকায়
শত শত কাফেরের
চোখ উপড়ে নিয়ে
আল্লাহ্‌তালার খিদ্‌মতে পেশ করেন
ধর্মপ্রাণ ঔরংজীব আলমগীর।
মজহব নাকি
আপস মেঁ  বৈর রাখতে শেখায় না?

অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণা
ভারতের নারীজাতির আদর্শ
গর্ভবতী সীতাকে
মিথ্যা বনভ্রমণের ছলনায়
হিংস্র পশুদের মাঝে নির্বাসন দিয়ে
ব্রাহ্মণদের অনুমোদনে
স্বর্ণসীতাকে পাশে বসিয়ে
গদি রক্ষা করেন
মর্যাদাপুরুষোত্তম
ভগবান শ্রীরামচন্দ্র।

মন্দিরের সেবায়েত আর মহন্ত
অসহায়া দেবদাসীর কান্নাভেজা যৌবন
দলে মুচড়ে একাকার করে
ধীরে ধীরে
স্বর্গের সোপান বেয়ে উঠে যায়।

ঠিক যে জায়গাটিতে
রাম নাকি ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন
সেখানে
সবার অলক্ষ্যে দাঁড়িয়ে থাকা
এক অব্যবহৃত বিস্মৃতপ্রায় মস্‌জিদ ভেঙ্গে
লোকসভার আসনসংখ্যা
দুই থেকে দুশো উনিশে উঠে আসে
অবশ্য সামান্য কয়েকশো প্রাণের বিনিময়ে।

ক্যাম্প ডেভিডে পরিবেশিত
মাংসের পশুগুলিকে
জবাই করা হয়েছে,
না কোপ দিয়ে কাটা হয়েছে,
এই নিয়ে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে
বিশ্বনেতাদের আসর –
রাজনীতির সঙ্গে নাকি ধর্মের যোগাযোগ নেই?

ঘৃত-চন্দন ধূপ ধুনোর স্বর্গীয় সুবাসে
মন্ত্রের গম্ভীর স্বননে
আজানের সুরেলা আহ্বানে
উন্মত্ত নৃত্যের বিভীষিকায়
গাঁজা-ধুতরো-কারণবারির
রাসায়নিক প্রভাবে
আধুনিক মিডিয়ার সম্মোহক প্রচারে
আদিম ওঝা গুনিন থেকে
ফারাও-অবতার-কর্পোরেট গুরুর দল
যুগোপযোগী দক্ষতায়
মানবমস্তিষ্কের স্নায়ুগুলিকে বশীভূত করে
আনুগত্য তৈরী করে
দেবতা, পুরোহিত আর শাসকের জন্যে।
অন্যায় নিয়ম আর আইনগুলিকে
শ্বাস প্রশ্বাসের মতন স্বাভাবিক করে তুলে
অস্থি-মজ্জায় ঢুকিয়ে দেয় চুঁইয়ে চুঁইয়ে।

আর্চবিশপের শিক্ষা সুনিশ্চিত করে
রাজার প্রতি আনুগত্য –
রাজার আইন আর তরবারি পুষ্ট করে
আর্চবিশপের প্রতিপত্তি।
কর্পোরেট হাউস আর টি ভি-র চ্যানেল
গ্ল্যামারে সম্পৃক্ত করে
আধুনিক বাবা আর কর্পোরেট গুরুদের দাড়ি—
বাবাদের সৎসঙ্গের নেটওয়ার্কে
এক্‌জিকিউটিভদের আদানে প্রদানে
ম্যানেজমেন্ট শক্তিশালী হয় –
আরও ফুলে ফেঁপে ওঠে কর্পোরেট কারবার।
কোন যুগে, কোন ধর্ম
লেন দেন মুক্ত ছিল বলতে পারেন?

মুম্বইয়ের বিস্ফোরিত রেলের কামরায়
কাশ্মীরের জ্বলন্ত বাসে
বেস্ট বেকারির লেলিহান চুল্লীর মাঝে
ইন্‌কুইজিশনের যন্ত্রণাকক্ষে
যুগে যুগে মানুষের পাপিষ্ঠ আত্মাকে
অগ্নির পবিত্র পরশে শুদ্ধ করে
ঈশ্বরের প্রতিনিধি আর পুণ্যাত্মার দল
পরম করুণাময়ের দ্বারে পৌঁছে দেয়
আর তার বিনিময়ে
অক্ষয় স্বর্গলাভের
গ্যারান্টি অর্জন করে।

গীতার ভগবান থেকে
ওসামা বিন লাদেন পর্যন্ত
নানান রঙের অবতার ও মসীহা
স্বর্গপ্রাপ্তির লোভ দেখিয়ে
মানুষকে উন্মত্ত করে
নরহত্যায় প্ররোচিত করে।

মানুষে মানুষে বিভেদই
নিরঙ্কুশ ক্ষমতার চাবিকাঠি —
তাই কুটিলের মন্ত্রে
আব্রাহামের সন্তানরা বিভাজিত হয়
ইহুদি, খ্রীষ্টান আর মুসলমানে
মনুর অপত্যরা হানাহানি করে
বৈষ্ণব, শাক্ত, শৈব
জৈন, বৌদ্ধ আর শিখ নাম নিয়ে।

নাস্তিক তীর্থঙ্কর মহাবীর
দেবতার মূর্তি ধরে
পূজো নিয়ে চলেন
মন্দিরে মন্দিরে
প্রতিদিন, প্রতিরাতে।
মার্ক্‌স-লেনিনের মূর্তিপূজার সূচনা হয়
ধর্মতলায়, লেনিনগ্রাদে।
ধর্ম আর রাজনীতি
ওতপ্রোত হয়ে থাকে
মেসোপটামিয়া থেকে
ইন্‌কার প্রাসাদ ঘুরে
খোমেইনির মজলিস
আনন্দময়ী মা আর
চন্দ্রস্বামীর আখড়ায়।

প্রকৃতির রহস্যকে উন্মোচিত করার
প্রথম সোপানে
এ গ্রহের প্রথম যুক্তিবাদী প্রাণী
নিজেরই মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষ আর
দেহের পেশীকোষগুলির
বৈদ্যুতিক-রাসায়নিক সমন্বয়ে গড়া
চিকীর্ষা আর কর্মশক্তির আদলে
এক অনন্ত ব্রহ্মান্ডব্যাপী
চিকীর্ষা আর কর্মশক্তির কল্পনা করে
তাকে “ঈশ্বর” বলে ডেকেছিল।
তারই এজেন্ট হয়ে কু-চক্রীর দল
পুরোহিত অবতার ফারাও রাজা সেজে
মানুষের বিজ্ঞানের প্রথম পাতার সেই
অপরিহার্য ভুলটিকে কৌশলে জীইয়ে রেখে
নানা ন্যায় নীতি স্বর্গ নরক
যাগ-যজ্ঞ আর জন্মান্তরের
মায়াজাল গড়ে
সযত্নে নিজেদের আখের গুছিয়ে চলে।

নন্দনকানন আর পারিজাত ফুল
দোজখের রক্তলাল তপ্ত বিভীষিকা
ইহলোকে প্রতিহিংসা, পরলোকে বেহেস্তের হুরী
এসবের ধোঁয়াশায়
ক্ষমতালোভী রক্তপিপাসুরা
সাধারণ সৎ শান্ত নাগরিক ভেঙে
হিংস্র দানব গড়ে তোলে।

এ মিথ্যার হাতছানি থেকে
স্বর্গ-মোক্ষ-ঈশ্বরের মোহজাল ছিঁড়ে
মুক্ত একটি মানবসন্তানও কি
‘অধার্মিক’ বলে,
শুধু ‘মানবিক’ বলে
সগর্বে নিজেকে ঘোষণা করতে পারে না?


.           ***************                                                 
পরে


মিলনসাগর
অস্তিত্বহীন মঙ্গলময়    


ঈশ্বর কোন পক্ষে?
বাঘ না হরিণ,
মাছ না বেড়াল,
মানুষ না জীবাণু?

যে হরিণী সিংহের থাবায়
টলমল পা ছেড়ে সদ্য লাফিয়ে ওঠা
সন্তানকে হারিয়েছে,
তার নীরব চোখের জল কি
ঈশ্বরের হৃদয়কে বিগলিত করে?

অথবা যে চিতা মা
শিকারের অভাবে
সন্তানের মুখে
এক টুকরো মাংস দিতে না পেরে
তাকে তিলে তিলে শুকিয়ে মরতে দেখে,
ঈশ্বর কি তার ব্যথায় সমব্যথী হন?

কলেরায় আক্রান্ত রোগীর শরীরে
অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করে
যখন আমি
কোটি কোটি জীবাণুকে হত্যা করে
একটিমাত্র প্রাণকে রক্ষা করি,
তখন কি আমি
ঈশ্বরের ন্যায়নীতিকে লঙ্ঘন করি না?

যে বীরপুঙ্গব
প্রণয়মুগ্ধা নারীর নাক কেটে নিয়ে
বীরত্ব প্রদর্শন করে –
সে বেশি পাপী,
নাকি যে ব্যক্তি
বোনের অপমানের বদলা নিতে
সেই বীরপুরুষের স্ত্রীকে হরণ করে –
সে বেশি পাপী?

যে রাজা –
রাজত্ব রক্ষার জন্য
দরিদ্র প্রজার সন্তানের মুখের অন্ন
কেড়ে নিয়ে রাজভান্ডারে
জমা করতে বাধ্য হয়,

অথবা যে কৃষক –
শতাব্দীর পর শতাব্দী
সন্তানের অনাহার সইতে সইতে
যুগান্তের অত্যাচারের শেষ সীমায় পৌঁছে
শেষে জমিদারকে হত্যা করে
তার গোলা ভেঙ্গে ধান বের করে আনে,

ঈশ্বরের চোখে
এদের মধ্যে
কে বেশি অপরাধী?



.           ***************                                                 
পরে


মিলনসাগর
আমার সোনার হরিণ চাই না    

আমার সোনার হরিণ চাই না
রক্তমাংসের হরিণ নিয়ে আমি বেশ আছি।
তার দীঘল কালো চোখ,
ধূসরে সাদায় ছোপানো আঙরাখা,
শাখা প্রশাখায় বিভক্ত অপূর্ব মুকুট,
থির্‌ থির্‌ কেঁপে চলা ছোট্ট লেজের পতাকা
আর চপল বিদ্যুতের গতি
আমার চেতনায় চেতনায় ছড়িয়ে আছে।

তোমার সোনার হরিণ কি
তোমার টালমাটাল পায়ে চলা
ছোট্ট সোনার খেলার সাথী হবার জন্য
সুন্দর শাবক উপহার দেয়?
আমার হরিণ দেয়।

আমার হরিণ
বহুযুগ ধরে
আমার ক্ষুধার সময়ে
তার দেহ দান করে এসেছে।
আমার জ্বরে কাঁপা দেহটাকে
তার চন্দনরঙে ছোপানো
চামড়া দিয়ে আগলে রেখে
লক্ষ লক্ষ শীত গ্রীষ্ম বর্ষা পার করে
অরণ্য গুহার অনিশ্চিত আশ্রয় থেকে
জনপদের দোরগোড়ায় এনে
পৌঁছে দিয়ে গেছে।
সেদিন তোমার
সোনার হরিণ কোথায় ছিল?

তোমার সোনার হরিণের
কাল্পনিক রূপের তীব্র ছটায়
অপ্রাপ্তির অপরিসীম তৃষ্ণায়
আর মায়াবী ভোগের অপার্থিব আনন্দে
তোমার চেতনা আচ্ছন্ন হয়ে থাকে;
আমার হরিণের চপল ছন্দ
আর চঞ্চল চোখের হাতছানি
আমার চেতনাকে জাগ্রত করে রাখে।

আমি তো অলীক স্বপনের মধুর ছলনার
নেশায় বুঁদ হয়ে ঘুমোতে চাই না
আমি তো জেগে থাকতেই চাই –
পৃথিবীর আঘাত আর স্নেহ
দুই-ই ভাগ করে নিতে চাই
আমার থ্যালামাস আর হাইপোথ্যালামাসের
স্নায়ুবর্তনীগুলির মধ্যে।

তাই আমার সোনার হরিণ চাই না
আমি আমার রক্তমাংসের হরিণকেই চাই
যে আমায়
বেঁচে থাকতে খেতে পরতে দেয় –
মরণে অনন্তসুখের
মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেয় না।



.           ***************                                                 
পরে


মিলনসাগর