কবি নরেন্দ্র দেব-এর কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে। www.milansagar.com
*
আকাশ প্রদীপ  

কুহেলি-আচ্ছন্ন-ঘন শিশির সন্ধ্যার অন্ধকারে
কে যেন প্রসারি দীপ আকাশের নীহারিকা পারে
মেলিয়া সাগ্রহ দৃষ্টি অণ্বেষিছে কোথা শূণ্য-সীমা
সন্ধানে ব্যাকুল যেন নিঃশেষিয়া অনন্ত নীলিমা |
অনিমেষ প্রতীক্ষায় আছে চাহি ছায়া পথ পরে |
সময় গিয়েছে চলি ; কে যেন ফেরেনি ঘরে
গগহ গহন হতে ;
             তারায় তারায় সে কি তার
তুলিয়া প্রদীপখানি খুঁজিয়া ফিরিছে বারে বার
হারানো সে বন্ধুটিরে?
             বহু যুগ হয়েছে অতীত |
ঋতু-চক্র এল ঘুরে ; দূরে ওই আসে বৃদ্ধ শীত,
রজনী বাড়িয়া চলে বিদলিয়া স্বল্প-আয়ু দিনে ;
প্রভাতের অশ্রুকণা কাতরে লুটায় তৃণে তৃণে ;
কেঁপে ওঠে চ্যুত পত্রে অতি মৃদু পদশব্দ কার |
অরণ্য মর্মরে যেন রণি উঠি ধ্বনি বেদনার |
শরতের স্বর্ণ-আভা ঝলমলি কাঁপে যে লগনে
সদ্য ধৌত ধরণীর শ্যাম স্নিগ্ধ নির্মল প্রাঙ্গণে
অজস্র কাশের হাসি শুচি-শুভ্র ওঠে বিকশিয়া
নন্দিত আনন্দিত রসে নিখিলের বেদনার হিয়া |
শুধু তব অন্তরের অবরুদ্ধ পাষাণ মন্দিরে
নিঃসঙ্গ সমাধি কার তিতিয়া উঠেছে অশ্রুনীরে |
লোকে লোকে শুরু হল হেমন্তের হিম অভিযান,
স্পর্শে অকস্মাৎ --- উচকিত হয়ে ওঠে প্রাণ ---
তোমার মর্মের মাঝে |
             আকাশে প্রদীপ জ্বালি তাই,
গৃহবলভির চূড়ে তুলে ধরি ভাব যদি পাই ---
নক্ষত্র নগর পথে আচম্বিতে তাহার সন্ধান?

তোমার ও দীপশিখা দীপ্ত হয়ে করিবে আহ্বান
অখণ্ড আঁধারে তারে, কে তোমারে হেন আশা দিল --- |
খোঁজা কি করেছ শেষ --- সেথা তার যত দেশ ছিল |

.                    ******************                                 
সূচিতে . . .
          রসলক্ষ্মী   

.              ওগো ঊষার আলোকে হেসে,
কে তুমি আজি এ শিশির প্রভাতে দাঁড়ালে দুয়ারে এসে?
.              তোমারে কখনো দেখিনি ত আগে,
.              তবুও ও মুখ বড় চেনা লাগে ;
কী যেন অসীম স্নেহ অনুরাগে দেহ মন যায় ভেসে ;
দুয়ার আমার কে এলে গো আজ এমন দীপ্ত বেশে?

.              ওগো, তোমার চরণতলে,
আঙিনা আমার ভরি যে উঠিল ফুলে ফলে তৃণদলে |
.              মরি মরি দেবী, এ কি বিস্ময়!
.              নিমেষেই এসে করে নিলে জয়,
আমার কঠিন সুপ্ত হৃদয় না জানি এ কোন্ ছলে!
আঁধার মনের মন্দিরে আজ তোমারই প্রদীপ জ্বলে!

.              দেবী! অবাক এ আগমন,
বিশ্বের এই নিঃস্বেপ দ্বারে তোমার পদার্পণ!
.              হাসিতে যাহার সহাস্য দিক,
.              আঁখিতে উজল নবীন নিমিখ,
কোমল কণ্ঠে কূজে কোটি পিক চঞ্চল ত্রিভূবন ;
দীনের দুয়ারে দাঁড়ালে সে কোন নিখিল পূজিত ধন |

.              দেবী! তোমার করুণাকণা,---
যেন অযাচিত, আশার অতীত আনন্দ-মূর্ছনা |
.              জ্বেলে দিল প্রাণে এ কি অপরূপ
.              নব জীবনের সুগন্ধ ধূপ,
অমৃত সরস প্রতি রোমকূপ, যৌবন উন্মনা!
আমার চিত্তে নিত্য তোমার আরতি ও উপাসনা |   

.                  ******************                                
সূচিতে . . .
*
আমার দেবীর দেউলের দ্বারে এ যুগের যত কবি    
এই কবিতাটি কবি নরেন্দ্র দেব সম্পাদিত "কাব্য দীপালির" ভূমিকার সাথে দেওয়া হয়েছিল!


আমার দেবীর দেউলের দ্বারে এ যুগের যত কবি
এনেছে তাঁদের পূজার অর্ঘ্য --- যজ্ঞের হোম-হবি,
.       প্রতিভার যত উজ্জ্বল-শিখা,
.             কালের ফলকে অক্ষয়-লিখা
চলেছে আঁকিয়া কল্প-লোকের ছন্দ-রঙীন ছবি ---

তাদেরই ভাবের সাগর ছানিয়া মনের মানিক তুলি
গড়েছি আমার এই দীপালির দীপ্ত প্রদীপগুলি!
.        চিত্ত যাদের সবুজ সরস
.              যাদের তুলির তরল পরশ
স্বপন-পুরীর দখিন-দুয়ার জগতে দিয়াছে খুলি ---

আলোকে পুলকে ভূলোকে ঢালিয়া অলোক-অমৃত ধারা
বর্ত্তমানের-মর্ত্ত্য-মরুরে স্বর্গ করিল যারা
.         যাদের ছন্দ-বন্দনা-গীতে
.               জাগে উন্মদ আনন্দ চিতে
ভাব-বিহ্বল আবেশে অবশ নিখিল আত্মহারা ---

শত-বিস্মৃত-লুপ্ত-স্মৃতিরে জিয়াইয়া যারা তোলে,
যাদের আঁখির আগে অনুরাগে প্রকৃতি ঘোমটা খোলে,
.         অরূপে যাহারা দেয় নানা রূপ,
.               ভাব-শতদল-কমল-মধুপ ---
যাদের মেদুর-মৃদু গুঞ্জনে পরাণ উলসি দোলে ---

অখিল-মনের অনুভূতি মাঝে যাহারা জাগায় সাড়া
যাদের কণ্ঠ-নিঃসৃত-গীত বিশ্বেরে দেয় নাড়া,
.         যাদে মুরলী-সুর-মুর্চ্ছনা
.                মর্মরি 'তোলে মর্ম-বেদনা,
ধ্যান-লোক-পথে বন্দী-হৃদয় আনন্দে পায় ছাড়া ---

গেয়ে যায় যারা--- গত ---সমাগত --- অনাগতদের গান,
ত্রিকালদর্শী ত্রলোকস্পর্শি যাহাদের অবদান,
.          রচি 'অভিনব প্রকাশের ধারা
.                 মূকেরে মুখর করিয়াছে যারা
হতাশের বুকে তুলে দুরাশা নব-নব-কল-তান ---

অন্ধে দানিয়া আনন্দ-আলো, অকূলে মিলায়ে তীর
পাষাণেরও বুক চিরিয়া যাহারা বহায়েছে ক্ষীর-নীর
.          সেই যোগী-জন-অমৃত-মন্ত্র
.                 চির-তরুণের জীবন-তন্ত্র
দিয়াছে আজিকে উজলি 'আমার দীপ-শিখা আরতির!

দেবী-মন্দিরে ওই শোন উঠে তাহাদেরই কলরব,
জ্বলে দীপমালা --- রত্নাবলীর --- দীপালি মহোত্সব!
.          জ্বলে কৌস্তুভ-মণি মনোহর
.                  বৈদূর্য্যের জ্যোতি সুন্দর
শত বিচিত্র বরণ-বিভায় এপরূপে অনুভব!

ঝলকিছে কত মতি, মরকত, নীলার নিলাঞ্জন,
হিরণ্য-দ্যুতি, পান্না-প্রবাল, রজতাভা, কাঞ্চন,
.          শ্যাম-সেতারের চমকিছে সুর
.                   হাসে পোখ্ রাজ, গোমেদ মধুর,
ফিরোজার ফিকে রোসনাইটুকু, চূণী-মণি অগণন!
*         *         *        *
দেবীর ললাটে পরায়েছে যারা নবীন ঊষার টিপ,
চরণে দিয়েছে বকুল চম্পা, সজল কেতকী নীপ |
.           এই আরতির শতেক শিখায়
.                   কণ্ঠ তাদের শোন 'গো কি গায়?
জ্বেলেছি আজি এ নব-দীপালিতে তা'দেরই প্রাণের দীপ!

এ মোর দীপ্ত-দীপালি-প্রভার দর্পণে দে'ছে ধরা
কতনা দয়িত-দিঠির দেউটি প্রাণের দরদে ভরা!
.          এ যেন গগনে গোধূলি-দীপালি
.                     চন্দ্র তারার ছন্দ-মিতালি
ভূবন-জনের অন্তর-লোক আনন্দে আলো করা!

.                         ******************                                     
সূচিতে . . .
*
পথের মাঝে    

উপোস করে' চলব তবু
.             কিছুর ভয়ে টলবো না,
মনের কথা লুকিয়ে মুখে
.             শত্রুকে আর ছল্ বো না |

বিঁধ্ ছে কাঁটা? ফুট্ ছে কাঁকর?
.             ফুটুক তবু ছুট্ বো হে,
ইন্দ্রদেবের স্বর্গটাকে
.             সবাই মিলে লুটবো হে |

চাঁদের ঘরে কী ধন আছে
.             উট্ কো চলো দেখবো রে,
ধাক্কা দিয়ে তারায় তারায়
.             সূর্যে গিয়ে ঠেক্ বো রে |

.              ******************                                
সূচিতে . . .
*
কনকাঞ্জলি    
কবি নরেন্দ্র দেব

এ কি ঢেলে দিলে অমৃত মদিরা অধীর অধরে মোর ;
বহে বিদ্যুৎ বেপথু অঙ্গে আঁখিতে ঘনায় ঘোর।
বিপুল পুলক-শিহরণে ঘন দেহ মন ওঠে কেঁপে,
জাগে আনন্দ-অনুভূতি অতি সব অন্তর ব্যেপে!
এ কি অনুরাগ নিবিড় সোহাগ নিবেদিয়া দিলে তুমি।
কোন্ হোম-হবি সোম-রস-ধারা তৃষিতে করালে পান ?
কোন্ দুর্লভ দ্রাক্ষ-আসব বুভুক্ষে দিলে দান ?
তোমার অধর ভৃঙ্গারে এ কি শৃঙ্গার-সুধা ভরা!
গাঢ় মিলনের মোহন মুদ্রা, অন্তর-ক্ষুধা-হরা ?
নন্দন-বন-বসন্ত যে গো বক্ষে উঠিল ফুটে,
নিখিল কোকিল-কুহরণে যেন শ্রবণ ভরিয়া উঠে!
কি ছিল লুকানো কোন্ মায়ামধু সীধু-ধারা বিধুমুখে,
পান করে প্রাণ মেতে ওঠে আজ অসহ্য কোন্ সুখে।
এ কি অপূর্ব প্রীতি-রোমাঞ্চ জাগে প্রতি রোম-কূপে
সুখ-স্বপনের গোপন কুঞ্জে ডাকে যেন চুপে চুপে!
শোণিতে সহসা জ্বলে ওঠে এ কি রঙীন ফাগুন-বিষ
তোমার অধর-আদর আমার কামনা-অহর্নিশ!
পদ্ম-অধর-মন্থন-মদে উন্মাদ আজি প্রাণ।
এ কি অকুণ্ঠ নীলকণ্ঠের আকণ্ঠ বিষ-পান ?
তোমার সরস অধর পরশ করে কি সঞ্জীবিত,
নিখিল সৃজন কামনার বীজ, জীবন অনিন্দিত ?
তাই কি ও মুখ-মধু-আস্বাদে লুব্ধ কাঙাল সম
তীব্র তৃষার হাহাকারে মরে লালায়িত চিত মম ?
শরম দ্বিধার সব সংকোচ নিমেষে হয়েছে দূর
মর্ম বীণার তারে তারে আজ অবাধ মিলন-সুর!
অধর-তীর্থে দুটি চিত্তের বিচিত্র বিনিময়,
বন্দিত ঘন মনোমন্দিরে শাশ্বত প্রেম জয়!
তরুণ তনুর চৌদিকে আজ যৌবন যেন জাগে,
সার্থক করি সকল সাধনা বিহ্বল অনুরাগে!
জীবন-ঊষার অভিষেক আজ অধর-প্রয়াগ তীরে!
তোমার প্রণয়-প্রসাদ-মুকুট গৌরবে শোভে শিরে!
তব চুম্বন-প্রেম-চন্দনে রঞ্জিত দুটি আঁখি,
ললাটে চিবুকে কপোলে কণ্ঠে ধন্য হয়েছি মাখি!
ওগো, এ মিলন-মহামুহুর্তে দেহ মনে শুধু চাই,
তোমাতে আমাতে বুকে মুখে যেন নিঃশেষ হয়ে যাই।

.              ******************      
.                                                                                 
সূচিতে . . .    




মিলনসাগর    
*