কবি পূর্ণপ্রভা বর্মন-এর কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।  www.milansagar.com
*
ছোট্ট নদী রুবিকণ             

অতীত, তুমি কথা বলো |
চুপ করে থেকো না,
সব কথা, অসংখ্য ঘটনা,
খুলে বলো অতীত |
ইতিহাসের অধ্যাপকেরা,
ভাবনার বাতায়ণে,
জুলিয়াস সিজারের
ছোট্ট নদী রুবিকণ
পার হয়ে যায় |
হিমালয়ের হিমেল হাওয়ায়,
তপ্ত নিঃশ্বাসের উষ্ণতা,
বারে বারে করে উত্তপ্ত,
বিচ্ছিন্নতার উত্তপ্ত লাভাস্রোতে,
বিশ্বাসের দাবীপত্র হলো ভস্মিভূত ;
কে পারবে জবাব দিতে ||
যারা একবুক বিশ্বাস নিয়ে,
আজীবন আশা ভরসা কে পাথেয় করে,
বিনম্র শিরে কথা বলতে অভ্যস্ত,
নীরবে কথা শোনে,
জীবন প্রবাহে,
"আজ্ঞাবহ প্রজাতিরূপে"
যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকার
নীরব প্রতিশ্রুতিতে ?
সেই প্রজাতির রক্তচক্ষু,
ঠিকরে বেরিয়ে আসছে আজ!
গোপনে লুকিয়া রাখা,
সোনার কাঠি রূপোর কাঠি,
কোথায় গেল হারিয়ে ?
ইচ্ছে হলে ঘুমিয়ে পড়ত
ইচ্ছে হলে জাগত
হায়! জোর করে কেড়ে নিয়েছে তারা---
মালিক সেজে দোহাই দেয় যারা ||

.        *************************                                        
উপরে

এই কবিতাটি জলপাইগুড়ি থেকে "জলপাইগুড়ি বইমেলা ২০০৮"-
এ প্রকাশিত "কিরাত ভূমির" কবিদের কবিতা সংকলন "কাব্য বৈদুর্য"-এ
প্রথম প্রকাশিত হয় |


মিলনসাগর
১।   ছোট্ট নদী রুবিকণ              
২।   
রপারের ডাক         
৩।   
  
৪।   
সুখ যদি পেতে চাও          
৫।   
সান্ত্বনা       
৬।   
আমাকে এগিয়ে নিয়ে যায়    
৭।   
আমাদের গ্রাম    
*
পরপারের ডাক             

যাবার সময় হল,
যেতেই হবে |
মিলে যাবে দেহখানি
পঞ্চভূতে লীন হয়ে যাবে ||
ছেড়ে যেতে হবে, সাধের বাড়ি,
হরিতকী, আমলকী, পেয়ারার সারি
নারকেল, জামগাছ, মানকচু, বাতাবী লেবুর সাথে
ছিন্ন হবে সম্পর্ক সব |

স্পন্দনহীন দেহখানি,
জলাধারের সুশীতল হাওয়ায় মিশে যাবে ||
কোথা যাবে, জানা নেই তা,
অস্তাচলের সিন্ধু পারে,
অথবা সাগরের ঢেউয়ে ---
মনে পড়ে ছোট বেলার স্মৃতিভরা কথা |
কখনো বৈশাখের ঝঞ্ঝা বাতাসে,
কখনো চৈত্রের উত্তপ্ত দুপুরে,
ক্লান্ত শরীর মন, হয়েছে অক্ষম,
তবুও হয়েছে পরিতৃপ্ত
সব কিছু নিয়ে জীবন হয়েছে আপ্লুত |
একটু বাদে পেছনে ফিরে
বিনম্র চিত্তে ;
হাত জোড় করে বন্দনা জানাবো
আদি গুরুজনে
জীবনের শেষ প্রণাম ||

.        *************************                                        
উপরে


এই কবিতাটি জলপাইগুড়ি থেকে "জলপাইগুড়ি বইমেলা ২০০৮"-এ
প্রকাশিত "কিরাত ভূমি"-র কবিদের কবিতা সংকলন "কাব্য বৈদুর্য"-
এ প্রথম প্রকাশিত হয় |


মিলনসাগর
*
আগ             

কার্ত্তিক মাসের সন্ধ্যায়
আকাশ প্রদীপ জ্বলে,
মৃত্যুহীন প্রাণ
চারদিকে ফেরে |

স্নিগ্ধ প্রদীপের আলো---
মনকে দোলায়
মৃত্যুহীন প্রাণে
শ্রদ্ধা জানায় |

শঙ্খ বাজে, ঘন্টা বাজে,
উলুধ্বনির রোল
তুলসী তলায়---
পল্লী রমণীর ঘোমটা মাথায়
আঁচল টেনে ধরে |

কার্ত্তিকের শেষ সন্ধ্যায়
আরাধনায় মত্ত তারা,
সন্তানহীন জনে
আঁচলে ভিক্ষা মাগে
ময়ূর বাহনের কাছে |

পরদিন অগ্রহায়ণের ঊষালগ্ন,
"আগ" নেওয়ার উত্সবে
লক্ষ্মীদেবীকে আবাহন |

ক্ষেত ভরা সোনালী গাছে
শিশির বিন্দুর সদ্যস্নাতা,
মুঠো মুঠো ধানগাছ তুলে
বরণডালায় সাজিয়ে
তুলসী তলায় পূজায় মত্ত পল্লী বধূ
ফুলের মালার শাড়ী
দীপ, ধূপ শঙ্খ ধ্বনিতে
সোনালী ধানের শিষ কেটে নিয়ে,
বাস্তু স্তম্ভে রাখে ঝুলিয়ে |

"আগ" নেওয়া হলে,
লক্ষ্মী দেবীর আসনে
নতুন করে সাজিয়ে
উত্সব চলে,
অগ্রহায়ণের প্রথম দিবসে |

.        *********************                                            
উপরে


এই কবিতাটি জলপাইগুড়ি থেকে প্রকাশিত পশ্চিম বঙ্গ বাংলা
আকাদেমির পুরস্কার প্রাপ্ত ছোট পত্রিকা "কিরাত ভূমি"-র ২৩বর্ষ শীত(২য়)
সংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত হয় |


মিলনসাগর
*
সুখ যদি পেতে চাও             

ঘৃণাকে রেখে দূরে
দুঃখ আসতে দিও না কাছে,
সাধারণ জীবন যাপন,
সুখ যদি পেতে চাও |

গান গাও খুশিতে
ভালবাস প্রাণ উজাড় করে
অহর্নিশ নিজের ভাবনায়
না থেকে ব্যস্ত
অন্যের কথা ভাব |

গদ্যময় জীবন
হবে কাব্যময়
সুন্দর হবে এ ত্রিভূবন |

.        ************                                                    
উপরে



মিলনসাগর
*
সান্ত্বনা             

আবদ্ধ ছন্দহীন গদ্যময় জীবন
.          প্রবাহহীন বিলের মতো |
বদ্ধ জীবন ছেড়ে
.          চঞ্চলা তটিনীর মতো
.                      মন চাইছে
.                               সাগরে মিলতে |

বৃথাই আশা
.           কত কাঙ্খিত জীবনের
.                    এ প্রয়াস
.                       কখনো হবে না
.                                  সার্থক |

জানি আমি,
.       তবুও চলার চেষ্টা
.                       জীবন ভরে |

প্রকৃতির ষড়যন্ত্রে
.       আমার পথ হয়েছে
.                       রুদ্ধ |
ঈর্ষা না প্রতারণা ?
.       ইস্পাত সম চাবুক
.                  আমাকে করেছে
.                       জর্জরিত |
তাই চাই না সাগরে
.                 যেতে |
আমার অচল বিলে
.            ফুটবে শাপলা
বধূরা সকাল সন্ধে
.       আসবে ফুল তুলতে
কেউ ছিপ ফেলে
.        ধরবে মাছ |
তবুও তো তারা থাকবে কিছুক্ষণ!

আমার অচল জলার ধারে!
সেটাই যে আমার যন্ত্রণা ভরা হৃদয়ের
.                        গভীর সান্ত্বনা |

.                     ************                                                       
উপরে



মিলনসাগর
*
আমাকে এগিয়ে নিয়ে যায়             

বিশ্বাসের হাতছানি
আস্বাসে ভরা এক প্রত্যয় |

আত্মীয়স্বজন যাক দূরে
একটি সমাজের বুক ভরা ভালবাসার
দায়িত্ব নিতে করেছিলাম দৃঢ় অঙ্গীকার |

আপনজনেরা অট্টহাস্যে
আমার দিকে পেছন ফিরে তাকিয়ে
আস্তে আস্তে চলে যায় |

কেবল থাকলাম আমি
আর গুটি কয়েক শেষ প্রত্যাশী
যারা আমাকে আজও ভালবাসে |

অহিফেন নেশার অসার অতি,
অগ্নিস্রাবের অসংবরণীয় জ্বালায়
আত্মপ্রকাশের দুর্বার গতি |

আজ মূর্তি কিংবা ডায়নার
.             খরস্রোতা কল কল
আমাকে করে না উন্মত্ত অথবা দুর্বল |
সমগ্র গোষ্ঠির প্রাণ স্পন্দন
আমাকে করে কেবলই বিহ্বল |
সমাজ বিন্যাসের মূলতত্ত্ব ও প্রেরণ
স্বচ্ছ দর্পণের ন্যায়
হয় না কেন উত্ক্ষেপণ |

যারা গ্লানির কথা বলে,
হতাশাকে আড়াল করতে চায়
সেই সব ব্যক্তির জীবনচিত্র
কোনোদিন কি অঙ্কিত হয় ?

তবুও বিশ্বাসের হাতছানি
আশ্বাসে ভরা প্রত্যয়
আমাকে এগিয়ে নিয়ে যায় |

.          ************                                                                  
উপরে



মিলনসাগর
*
আমাদের গ্রাম             

আমি অনেক দিন পরে
ভাল মন্দ মিলে
চেষ্টা করছি
সবকিছু বুঝতে |

জৈষ্ঠের সংক্রান্তি ও
আষাঢ়ের প্রথম দিবস,
প্রকৃতি পড়েছে যেন
বৃষ্টির মুখোশ |

মুশলধারা বৃষ্টির শব্দে
ঘুমটা গেল হঠাৎ ভেঙে
আটের দশকে মাকে হারিয়েছি
নয়ের দশকে পিতা
তারপর একে একে
স্নেহ, মায়া, মমতা,
মহাজনের ঘরে
সুদে আসলে দিয়েছি জমা |

সদ্য অবসর প্রাপ্ত শিক্ষক,
ইজিচেয়ারে গা এলিয়ে,
কোন ভাবনায় বিভোর ?
জানতে বড় ইচ্ছা করে,
ব্যস্ত সে কি ?

অতীত কিংবা বর্তমানের
হিসাব মিলাতে ?
আমার মতই ভাবছে সে কি ?
চিলারায়ের গড়,
কোচবিহার থেকে চলেছে
অসম প্রান্তর
আহোম রাজার রাজ্য
করিতে বিজয় |

আজ রাজা নেই,
নেই প্রজা
চিলা রায়ের গড়ের উপর
আছে শুধু
নিপিড়িত জনতা |

খড়ের ঘরে জ্বলছে কুপি
টিপ টিপ করে,
হ্যারিকেন আলো করছে
অনেকের ঘরে |
চার দিকেতে খেতে ভরা
সবুজ ধানের গাছ---
তার মাঝেতে শুনতে পাই
ব্যাঙদের গ্যাঙর গ্যাং আওয়াজ |

কিছুদিন আগেও
চিলা রায়ের গড়ে,
গভীর জঙ্গল
আর বাঘ ছিল ভরে |

সন্ধ্যাবেলা উদ্বাস্তু বৌ
দেয় উলুধ্বনি,
ঘন্টা বাজে,
শঙ্খ বাজে,
মাঝে মাঝেই ভেসে আসে
হরিনাম সংকীর্তন |

তার পর এসেছে
"গণ পরিষদ" "ছাত্র পরিষদ"
ছিল তাণ্ডব প্রকট
যুবকের মতিভ্রম
গ্রামটিতে এনেছে সঙ্কট |

"জয় আই অসম" বলে---
চারদিকে রব তোলে
এইভাবে কত পিতা
হয়েছে পুত্রহারা
সরকার দেয়নি কোনদিন সারা |

এসেছে আলফা গোষ্ঠী
রাত বেরাতে বন্দুকধারী
প্রত্যেক বাড়িতে খায়---
থাকে আত্মীয়ের মত করি |

গ্রামটিতে উন্নতি হয় নি
দুঃস্থ বুড়ো অসুস্থ রোগী
উদাস ক্লান্ত ভাবে,
ভ্যানে করে যায়
থানার কোনো হাসপাতালে

পিরনো সংস্কৃতি অব্যাহত,
বাঁশঠাকুরের নৃত্য,
সত্য ঠাকুর সোনারায়ের
কত যে গীত বাদ্য |
সেছে শেষে "বিহু"
যৌবনের প্রতীক রূপে
জাগছে মানুষ দেবতা
পারে নি মন কেড়ে নিতে |

ফুটবল খেলা মাঠটির পাশে
তৈরী হয়েছে একটি শিব মন্দির
একদিকে অনেক পুকুর,
উল্টোদিকে গ্রামের
হায়ার সেকেণ্ডারি স্কুল |
আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা
মন্দিরে যায় দিতে পূজা
রাতে চলে গাজা ভাং
দিনের বেলায় শিবের গাজন |

এসব নিয়ে, নেই কারো মাথাব্যথা |
মানব জীবন পরিপূর্ণ হবে
হৃদয় বৃত্তি গড়ে উঠবে
যেখানে ন্যায়ের শাশ্বত আদর্শ
হবে পরিপূর্ণ |

.      ************                                                                    
উপরে



মিলনসাগর