রবীন রায়চৌধুরীর কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।  www.milansagar.com
১।     নির্বাসন কি শুধুই নিরুদ্দেশ যাত্রা?            
২।     
সে কাছে এলেই মনে হয়          
৩।     
আল্লা ম্যাঘ দে পানি দে             
৪।     
সদরে কড়া নাড়ার শব্দে     
৫।     
মুহুর্তে কালরক্ত মুছে        
৬।     
দানিং প্রায়ই মনে হয়         
৭।     
নে হয় তোমরা সবাই        
৮।     
ঙ্গী বুড়োর সঙ্গে দেখা হলেই    
৯।     
র সংসার নাবাল জমি         
১০।    
ওঙ্গীরাজা আপন মনে সকাল সন্ধ্যা     
 
      
ওঙ্গী - আন্দামানের একটি উপজাতির নাম
     
*
নির্বাসন কি শুধুই নিরুদ্দেশ যাত্রা?
স্মৃতি কি কখনও প্রতারক হতে পারে?
চরম বৈরাগ্যেও কি কেউ স্মৃতিহারা হয়?
প্রবাসে সবাই আত্মমূখী তাই আশ্রয় খুঁজে ফেরে |

যাযাবর পাখিরা যেমন স্বেচ্ছায় গৃহহারা হয়
অনুকূল বাতাসে গা-ভাসি ভিন্ন সুখ খোঁজে
দুর্বৃত্ত সময় যখন বিভ্রান্তি জাগায়
দিকভুল পাখিরা খুঁজে নেয় অমর্ত্য আশ্রয় |

আতিথ্য যখন বড় দুর্লভ হয়ে ওঠে
সান্নিধ্য যখন শুধু দূরত্ব বাড়ায়
প্রত্যেককেই কখনও না কখনও প্রবাসী হতে হয়
স্মৃতির আশ্রয়ে মানুষ সন্তোষ খুঁজে পায় |

.                    ******************                                        
উপরে
[ একটি অনুরোধ - এই সাইট থেকে আপনার ব্ লগ্ বা সাইটে, আমাদের কোন লেখা, কবিতা
বা তার অংশবিশেষ নিলে, আমাদের মূল পাতা
http://www.milansagar.com/index.html
দয়া করে একটি ফিরতি লিঙ্ক দেবেন আপনার ব্ লগ্  বা সাইট থেকে, ধন্যবাদ ! ]
*
সে কাছে এলেই মনে হয়
.          গোপন আতরে ভেসে যাচ্ছে শরীর
নিঃশব্দে খুলে যায় জানালা কপাট
দক্ষিণী বাতাস ছুঁয়ে যায় জ্বরতপ্ত বুক
সে কাছে এলে মনে হয়
.                     এখন বসন্ত!

সে কাছে এলে
.          প্রত্যুষের ছায়া দুহাত বাড়িয়ে দেয়
সে কাছে এলে
.          জ্যোত্স্না শিশির কেমন ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে
.          ধানক্ষেত ঢেকে ফেলে ভোরের কুয়াশা
.          শরীরে ওম নেবার আশায়
.                      ছুটে আসে দিকভুল পাখি
সে কাছে এলে মুহুর্তে জন্মান্তর ঘটে যায় |

সে কাছে এলেই মনে হয়
.                      আজ মধুমাস
হৃদয়ে গোপন ডাক দেয় বসন্তের কোকিল
কার যাদু স্পর্শে চমকিত সমস্ত শরীর
দৃষ্টিতে কার প্রশ্রয়, মিথ্যা এই জগত সংসার
সে কাছে এলে ---
.                     নিজেকে বড় তুচ্ছ মনে হয় |

.                    ******************                                                
উপরে
*
"আল্লা ম্যাঘ দে পানি দে"---ফাটা কাঁসির এ আওয়াজ
আর কতকাল, আব্বাসউদ্দীন, আর কতকাল
.                বিবেক ধরে নাড়া দেবে?
দীর্ঘশ্বাসে জমে ওঠে মেঘ ঈশ্বরবৃষ্টিতে আর মাঠ ভরে না
প্যাডক পপিতা চুঁই কার অভিশাপে নিষ্প্রাণ
কার কালোহাত ছুঁয়ে থাকে স্তব্ধ বনস্থলী?

নির্মল বাতাস পেতে হলে আজ পরবাসী হতে হয়
সৌখিন জুতোর তলায় পিষ্ট হয় মুকুলিত ভ্রূণ
বাহারী বৃক্ষের ছায়ায় মত্ত হয় উদ্ভ্রান্ত যুবা
দুহাতে দলিত হয় আজন্ম সম্প্রীতি!

অথচ যে হাত ঈশ্বরের পাদমূল ছুঁয়ে থাকে
যে হাত প্রতিবাদে উদ্যত হয়
যে হাতের কররেখা ছুঁয়ে থাকে করুণা ও প্রীতি
সে হাতেই দুর্বৃত্তের কুঠার কেমন আত্মঘাতী হয়ে ওঠে!

স্বপ্নে আজও জানালার ধারে শিউলি ফুটে থাকে
বুকের মধ্যে গোপন পাখিরা সব গান গায়
শিশিরে পা ফেলে ফেলে আজও যেন
.                              স্মৃতি ফিরে আসে
নক্সি কাঁথার মাঠে বনস্পতিরা সব
.                           হাতে হাত মিলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে |

.                    ******************                                                
উপরে
*
সদরে কড়া নাড়ার শব্দে আচমকা ঘুম ভেঙে যায়
অস্ফুটে কে যেন ডাকছে হৃদয় হৃদয়
কার কণ্ঠস্বর? অনুমানে কেটে যায় দীর্ঘ সময়
নিজের নামই কখনও কখনও ভীষণ অপরিচিত মনে হয়

অলক্ষ্যে কে যেন অপেক্ষা করছে, তার শ্বাস-প্রশ্বাস
আমাকে সন্ত্রস্ত করে তোলে, নিয়ত অবিশ্বাস
আমার নিশ্চল শরীর ছুঁয়ে যায়
তখন নিজেকে মনে হয় বড় বিপন্ন অসহায় |

নিরুত্তর দেখে সে দীর্ঘ দুহাত বাড়িয়ে দেয়
সেখানে উল্কি দিয়ে আঁকা এক যুবকের মুখ
মুহুর্তে জেগে ওঠে চেতনা, মধ্যাহ্নের সুখ
তুলোট কাগজের মতো কার বিচ্ছেদে ভরে ওঠে বুক |

.                    ******************                                                
উপরে
*
মুহুর্তে কালরক্ত মুছে এ হাতেই বন্ধুত্ব ও বিদ্বেষ
.                চিনে নেওয়া যায়
কিংবা ভালোবাসার মতো এক শ্বেতপত্রে
.        এ হাতেই আমি সর্বস্ব বিলিয়ে দিতে পারি
কারণ এই কররেখায় আমার মৃত্যু ও মুক্তি লেখা আছে |

দিনশেষে অবকাশ কেমন আততায়ীর মতো ঘনিষ্ঠ হয়
সম্মুখ দেওয়াল জুড়ে নোনা বাতাসের ক্ষতচিহ্ন
কুটিল ধাঁধার মতো নিয়ত বিবেক ভ্রুকুটি করে ওঠে
অথচ শুদ্ধতার নামে এখনও
.                বুকের মধ্যে ঝর্ণার সাড়াশব্দ জাগে |

এই অহংকারে মানুষের মুখের দিকে তাকালে
.         নিজেকে বড় পবিত্র মনে হয়
এই অহংকারেই কোন নারীর চোখের দিকে
.                নিষ্পলক তাকানো যায়
এখনও ম্রিয়মান জলছবি দেখে
.                ভিন্ন প্রতিক্রিয়া জাগে না |

সারাজীবন নিজেকে নিষ্কলুষ রাখার জন্যে
.                এত সব প্রস্তুতি
নিয়ত দহনের মধ্যে নিজেকে নির্মল করে তোলা
সত্যবটের কাছে নতজানু ক্ষমা প্রার্থনা
এ জীবনে সব স্মৃতি মিথ্যে হয়ে যায়
.                 যদি তুমি নির্বাসন দাও |

.                    ******************                                                
উপরে
*
ইদানিং প্রায়ই মনে হয়
এবার তার কাছে যাওয়া দরকার
সত্যবটের ছায়ায় পাশাপাশি
দুহাতে দুহাত, শুধু কিছুকাল
তার আসঙ্গে দিনযাপন
সে হয়তো এখনও প্রতীক্ষা করে আছে |

.              সময় কত দ্রুত পাল্টে যায়
.              শিকড় নামে মূল শিকড় ছাড়িয়ে
.              হারিয়ে যায় পর্ণমোচী বৃক্ষের শোভা
.              স্মৃতি যেমন নিঃশব্দে বিস্মৃতি হয়
.              আমাদের বেঁচে থাকা কী রকম
.                              অর্থহীন হয়ে ওঠে |

এবার তাই তার কাছে যাওয়া দরকার
সত্যবটের ছায়ায় সব হিসেব নিকেশ মিটিয়ে
যে যার ঠিকানায় ফিরে যাব
যাবার আগে শুধু কিছুকাল
.              তার আসঙ্গে দিনযাপন |

.                    ******************                                                
উপরে
*
মনে হয় তোমরা সবাই---
সেই হিমঝরা মাঠ
তাজা শস্যের মতো দেহ
সূর্যের অনন্ত সুষমা
উদার আকাশ আর
ঝর্ণার উচ্ছ্বলতা---
এদের আসঙ্গে তোমরা সবাই বেঁচে আছ |

আর আমার দুঃখ ও ভালোবাসা
অভিমান ও নির্জনতা
নির্ণিমেষ দৃষ্টি ও
প্রচ্ছন্ন কামনা---
আমি বেঁচে আছি এ কথা বলার মধ্যে
কিছু নষ্ট সুখ
.            আমাকে বিপন্ন করে তোলে
নিজের মুখোমুখি
.            সমস্ত সন্তোষ বড় নিস্ফল মনে হয় |

নির্বাসনে একাকী---
.            দূর সমুদ্র থেকে ছুটে আসে বৃষ্টি
.            কোন দিকভুল পাখির একান্ত বিলাপ
.            ফুঙিচঙে হঠাৎ ঝড়ো বাতাসে ঘন্টা বেজে ওঠে
তখন কেবলই মনে হয়
.             কেউ বুঝি ডাকছে কোথাও
অস্ফুটে কেউ যেন বলছে, কেমন আছ?

আসলে সবই ভ্রম |
নির্বাসনে একাকী
.             এ যেন অন্তরীণ হয়ে থাকা |
আমি বেঁচে আছি এ কথা বলার মধ্যে |
আজ আর সুখ বা সন্তোষ কিছু নেই |

.                    ******************                                                
উপরে
*
ওঙ্গী বুড়োর সঙ্গে দেখা হলেই গল্প শোনাত
.          অদ্ভুত এক রূপকথার গল্প---
বলতে বলতে তার দুচোখ জ্বলে উঠত
ফ্যাকাসে ঠোঁটে ফুটে উঠত বিদ্বেষ
শীর্ণ দুহাত শূণ্যে ছুঁড়ে বলে উঠত---
এইখানে এই লাল ধূলোর মধ্যে মিশে আছে সেই দেশ
বনজ্যোত্স্নায় নীলপরীরা নাচত গাইত
বনে বনে চঞ্চল হরিনীর মতো ঝর্ণার সাড়া শব্দ
ওঙ্গী নারী পুরুষ উদ্বেল খুশীতে মেতে উঠত
আকাশ চুঁয়ে নেমে আসত কুয়াশা শিশির |

বিশাল প্যাডক পেমা মাথা দুলিয়ে বলত
.                                  আমি আছি
অতর্কিতে কেউ কুঠোর শানাত না |
সাগর থেকে ছুটে আসা প্রসন্ন বাতাস
বুকে হিল্লোল তুলে বলে উঠত
.                                  আমি আছি
কারুর দুর্বৃত্ত হাত তর্জনী তুলত না |
বাখরা হরিণ হরিণীর গন্ধে মাতাল হয়ে জানাত
.                আমি আছি
আচম্বিতে শিকারী ছুরি তাঁকে খুঁজে ফিরত না |
সমস্ত ওঙ্গীর রক্তে দ্রিমি দ্রিমি বাজত দামামা
আমি আছি, আমি আছি, আমি আছি...........

অথচ উত্তরের বাতাস অতর্কিত কেড়ে নিল স্মৃতি
কালের সাক্ষী গাছগুলো মাটিতে লুটিয়ে পড়ে
দিকভুল পাখি বলে ওঠে---নেই নেই
বোধহীন ওঙ্গীবুড়ো আপন মনে গল্প বলে
.                অদ্ভুত এক রূপকথার গল্প
যার শেষটা আছে শুরুটা নেই |

.            ******************  

.
ওঙ্গী - আন্দামানের একটি উপজাতির নাম                                 উপরে
*
ঘর সংসার নাবাল জমি
.           চিকন কালো মাঠ
ঘর সংসার পদ্মদিঘি
.           জল থৈ থৈ ঘাট!
.                           আসঙ্গ সুখ পোয়াতি নারী
.                                       কাঁখ জুড়ে বারোমাস
.                           নিকানো উঠোন লক্ষ্মীপাটা
.                                       দুচোখে আশ্বাস |
ভালোবাসা অন্তঃসলিল
.           নদীর মতো সচ্ছল
ভালোবাসা উথাল পাথাল
.           রোদ বৃষ্টির আদল |
.                           শরীর জুড়ে বাজছে মাদল
.                                        রক্তে ওঠে তুফান
.                           শরীর জুড়ে আশ্বিনেরই
.                                        আগমনী গান |
কিন্তু যখন ভিড় করে ঐ
.           কালো মেঘের দল
জীবন জুড়ে প্রতিধ্বনি
.           হাপিত্তেশ কেবল |
.                           জীবন যেন শুকনো নদী
.                                        শূণ্য বিষম খাত
.                           জীবন যেন ব্রহ্মডাঙা
.                                        স্তব্ধ নিথর রাত |
তাই সময় বুঝে সঙ্গ সুখের
.            দৃশ্যান্তর ঘটে
বিসর্জনের বাজনা বাজে
.            নক্সীকাঁথার মাঠে |

.            ******************                                                        
উপরে
*
ওঙ্গীরাজা আপন মনে সকাল সন্ধ্যা
.         এক একটা গাছ খুঁজে জল ঢালে
সে বলত পারিজাত
আমরা দেখতাম বনতুলসী
.                         পথ জুড়ে আছে
পথচারীকুকুর পর্যন্ত সমীহ করেনা তাকে
মানুষ তো নির্বিবাদে হত্যা করে
.          পদদলিত হয় তার রক্তাক্ত শরীর |

অথচ সেই মানুষ কী গভীর স্নেহে জল ঢালে
বিড় বিড় করে কত আদর জানায়---
কখনও দুহাতে জড়িয়ে নিশ্চুপ বসে থাকে
ঝড় জল রৌদ্রে তার দুচোখে আতঙ্ক ফুটে ওঠে
শূণ্যে দুহাত বাড়িয়ে প্রার্থনা জানায়
এই শিশুগাছ একদিন মহীরূহ হবে
মাথায় আকাশ আর পদতলে পৃথিবী
এই বিশাল রাজ্যপাট---
.                  জীবন বড় অর্থময় হয়ে ওঠে |

অথচ এক একটা মৃত্যু কেমন ছিনিয়ে নেয় বিশ্বাস
ভালোবাসা মৃত বনতুলসীর মতো মাটিতে লুটায় |

.            ******************

.   
ওঙ্গী - আন্দামানের একটি উপজাতির নাম                                উপরে