রাজা রামমোহন রায়                                                                সূচিতে ফেরত
জন্ম গ্রহণ করেন অধুনা পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলার খানাকুল-কৃষ্ণনগরের নিকটবর্তী রাধানগর গ্রামের এক
সম্ভ্রান্ত বৈষ্ণব ব্রাহ্মণ পরিবারে | তাঁদের আদি নিবাস ছিল মুর্শিদাবাদ জেলায় এবং কৌলিক পদবী ছিল
"বন্দ্যোপাধ্যায়" | রামমোহনের অতিবৃদ্ধ পিতামহ পরশুরাম অথবা রামমোহনের বৃদ্ধ পিতামহ কৃষ্ণচন্দ্র
প্রথম নবাব সরকারের চাকুরী গ্রহণ করেন | এই সরকারী চাকরি গ্রহণের পর থেকেই তাঁরা "বন্দ্যোপাধ্যায়"
পদবীর পরিবর্তে নিজামত প্রদত্ত "রায়" উপাধি দ্বারা পরিচিত হলেন |

রামমোহনের পিতামহ ব্রজবিনোদ যথেষ্ট কৃতিত্বের সঙ্গে নবাব আলিবর্দি খাঁর অধীনে চাকরি করেন | মুঘল
সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম এর ভাগ্য বিপর্যয়ের পূর্বে ব্রজবিনোদ সম্রাটকে যথেষ্ট সাহায্যও করেছিলেন |
ব্রজবিনোদের পঞ্চম পুত্র রামকান্তের দ্বিতীয়া পত্নি তারিণী দেবীর এক কন্যা ও দুই পুত্রের কনিষ্ঠ পুত্র
রামমোহন | রামমোহনের মাতামহ শ্যাম ভট্টাচার্য ছিলেন শ্রীরামপুরের চাতরা পল্লীর অধিবাসী এবং শাক্ত-
তান্ত্রিক সম্প্রদায়ভুক্ত পুরোহিত | তাই রামমোহন জন্মসূত্রে বাংলার দুই প্রভাবশালী ধর্মীয় ঐতিহ্যেরই
উত্তরাধিকারী হয়েছিলেন |

পিতা রামকান্ত রায় সিরাজ-উদ-দৌলার অধীনে কিছুকাল চাকরি করার পর অবসর নিয়ে  নিজগ্রাম
রাধানগরে এসে বসবাস করতে থাকেন | ১৭৯২ সালে তিনি সপরিবারে পার্শ্ববর্তী গ্রাম লাঙ্গুলপাড়ায় তাঁর
নবনির্মিত বাড়িতে উঠে আসেন | ১৭৯৬ সালে তাঁর অধিকাংশ স্থাবর সম্পত্তি তাঁর তিনপুত্র জগমোহন,
রামমোহন ও রামলোচন-এর মধ্যে ভাগ করে দেন |  রামমোহনের ভাগে পড়ে কলকাতার জোড়াসাঁকোর
বাড়িটি এবং দাদা জগমোহনের সঙ্গে যৌথভাবে লাঙ্গুলপাড়ার বাড়ি | ১৭৯৭ সালে রামমোহন কলকাতায়
তেজারতি ও কোম্পানির কাগজের ব্যবসা শুরু করেন | তিনি স্বোপার্জিত অর্থে ১৭৯৯ সালে বর্ধমান জেলায়
গোবিন্দপুর ও রামেশ্বরপুর নামক দুটি তালুক কিনেছিলেন | ১৮১০ এর মধ্যে তিনি আরও চারটি পত্তনী
তালুক কেনেন | ১৮১৪ সালে তাঁর লাঙ্গুলপাড়ার বাড়ির ভাগ লিখে দেন তাঁর ভাগ্নে গুরুদাস মুখোপাধ্যায়কে
এবং ১৮১৭ সালে পার্শ্ববর্তী গ্রাম রঘুনাথপুরে নতুন বাড়ি করে সপরিবারে বসবাস শুরু করেন |

তাঁর মহত্ত্ব এই যে তিনিই সর্বপ্রথম উপলব্ধি করেন যে দেশে নবপ্রতিষ্ঠিত বিদেশী (ইংরেজ) শাসনের পেছনে
আধুনিক-জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রয়োগবিদ্যা সমৃদ্ধ এক বিরাট সভ্যতা ক্রিয়াশীল এবং ভারতবর্ষকে আধুনিক যুগে
পদার্পণ করতে তার নিজস্ব আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধগুলিকে নবাগত এই জ্ঞানবিজ্ঞানের নিকষে
পরীক্ষা করে কিছু গ্রহণ ও কিছু বর্জনের মাধ্যমে যুগোপযোগী এক ভবিষ্যৎ-মুখী জীবনদর্শন গড়ে নিতে হবে |
তাই তিনি ইংরেজদের অধীনে ১৮০৩ থেকে ১৮১৪ সাল পর্যন্ত সরকারী ও বেসরকারী চাকরি গ্রহণ করেন,
নিজস্ব ব্যবসা ও সম্পত্তি থেকে যথেষ্ট আয় থাকা সত্ত্বেও | ১৮১৫ সালে তিনি ইংরেজ সরকারের দূত রূপে
ভুটান পরিদর্শন করেন |

১৮২৯ সালে তত্কালীন ব্রিটিশ পেনশন ভোগী দিল্লীর মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় আকবর, তাঁকে ইংল্যাণ্ডে দূত
নিযুক্ত করেন | এই উপলক্ষ্যে সম্রাট তাঁকে "রাজা" উপাধি দান করেন এবং ইংল্যাণ্ডে কতৃপক্ষের সঙ্গে
সম্রাটের পেনশন বৃদ্ধির বিষয়টি আলোচনার ভার তাঁর উপর ন্যস্ত করেন | তাঁর চেষ্টায় সম্রাটের পেনশন ৩
লক্ষ টাকা বৃদ্ধি পায় |

ভগ্ন স্বাস্থ নিয়ে কলকাতা থেকে ১৯ নভেম্বর ১৯৩০ যাত্রা শুরু করে ৮ এপ্রিল ১৮৩১ তিনি ইংল্যাণ্ড পৌঁছান |
সেখানে অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে ২৭ সেপ্টেম্বর ১৮৩৩ সালে ব্রিস্টলে তাঁর জীবনাবসান হয় | তাঁকে ব্রিস্টলের
আর্নস ভ্যালে সিমেটারিতে সমাধিস্থ করা হয় | পরবর্তীতে ব্রিটেনে বসবাসী ভারতীয়রা তাঁর সমাধিতে একটি
স্মৃতি সৌধ নির্মাণ করেন |

শিক্ষা -                                                                                            সূচিতে ফেরত
বাল্যকাল থেকেই  রামমোহনের তীক্ষ্ণ বুদ্ধি এবং অসাধারণ স্মৃতিশক্তির পরিচয় পাওয়া গিয়েছিল | তাঁর
প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় রাধানগর গ্রামের পাঠশালায় | এর পর তিনি সেখানেই সেকালের প্রথানুযায়ী ফার্সী
শিক্ষা করেন | পরে ইসলামীয় বিদ্যায়, বিশেষতঃ আরবী ভাষা ও মুসলিম শাস্ত্রে উচ্চ অধিকার অর্জন করেন
তখনকার ইসলামী বিদ্যাচর্চার পীঠস্থান পাটনায় | সংস্কৃত শিক্ষা শুরু হয় কলকাতায় এবং তা উত্তরকালে
পরিণতি লাভ করে কাশীতে | কৈশোর ও যৌবনে পাটনা ও কাশীতে শিক্ষালাভের প্রমাণ পাওয়া যায় নানা
পারিবারিক মামলা-মোকদ্দমার নথিপত্র থেকে | রামমোহনের শিক্ষার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল টোল-চতুষ্পাঠি-
মক্তব-মাদ্রাসায়, তত্কালীন বিশুদ্ধ ভারতীয় পাঠ্যক্রমের উপর, ইংরেজী ভাষা ও পাশ্চাত্য বিদ্যার রাজ্যে
প্রবেশের আগে |  ফলে তিনি হিন্দু ও মুসলিম  উভয় শাস্ত্রে ও ঐতিহ্যে অসাধারণ অধিকার অর্জন
করেছিলেন |

ধর্মীয় প্রভাব -                                                                                সূচিতে ফেরত
পাটনায় ইসলাম ধর্মের কোরাণ, হাদিস পুঙ্খানুপুঙ্খ অধ্যয়ন করার ফলে বিশুদ্ধ একেশ্বরবাদে তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস
জন্মায় | ইসলামের যুক্তিবাদী মগজিলা ও কট্টর বিশুদ্ধিমার্গী মুত্তহাহিদিন সম্প্রদায়ের মতবাদও তাঁকে যথেষ্ট
প্রভাবিত করে | সূফী মরমীয়তাবাদের প্রতি তাঁর অনুরাগও উত্তরোত্তর গভীর হয়ে ওঠে | এর ফলে হিন্দু
ধর্মের মূর্তিপূজায় তাঁর বিশ্বাস চলে যায় | এই নিয়ে পিতার সঙ্গে মতবিরোধ বাড়তে থাকে ১৯৮৮ সালে
তিনি গৃহত্যাগ করেন | পরবর্তি তিন চার বছর কেটেছিল ভ্রমণে | এই সময় তিনি নাকি উত্তর ভারতের নানা
স্থান ও তিব্বত পর্যটন করেছিলেন | এর পর পিতার আহ্বানে আবার গৃহে ফিরে আসেন | এর পর তিনি
কাশিতে হিন্দু শাস্ত্রের মোক্ষশাস্ত্র, বেদান্তের প্রস্থানত্রয় উপনিষদ, ব্রহ্মসূত্র ও গীতা, ভাষ্যটীকা সমেত অধ্যয়ন
করেন | ফলে তাঁর প্রত্যয় জন্মায় যে ঈশ্বরসত্তার অখণ্ডতা এবং ঐক্য প্রতিপাদনই হিন্দুধর্মের উদ্দেশ্য এবং
প্রচলিত প্রতিমা পূজা সেখানে উত্তর কালের এক প্রক্ষিপ্ত অধ্যায় মাত্র |  

সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদ -                                                                    সূচিতে ফেরত
হিন্দু বিধবা নারী তাঁর মৃত পতির চিতায় জীবন্ত অবস্থায় স্বেচ্ছায় সহমরণে যাবেন, এই প্রাচীন প্রথাটিই
মধ্যযুগীয় হিন্দুসমাজে, বিশেষত বাংলায়, সতীদাহ প্রথা নামে জাঁকিয়ে বসেছিল | রামমোহন এই অমানবিক
প্রথাটিকে নির্মূল করার চেষ্টায় এক সফল সংগ্রাম করেছিলেন |
ব্রিটিশ সরকারের দৃষ্টি এই কুপ্রথার উপর আগেই পড়েছিল, কিন্তু কোন পদক্ষেপ নেবার আগে তারা এ
বিষয়ে শাস্ত্রীয় মত সংগ্রহ করা শুরু করেছিলেন | ১৮০৫ সালে সরকার কতৃক আদিষ্ট হয়ে পণ্ডিত ঘনশ্যাম
শর্মা এবং ১৮১৭ সালে পণ্ডিত মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকার বিধান দেন যে স্বামীর মৃত্যুতে তার চিতায় প্রাণ
বিসর্জ্জন দেওয়া বিধবা স্ত্রীর পক্ষে বাধ্যতামূলক নয় | কিন্তু তাঁরা কেউই প্রকাশ্যে এই প্রথাকে নিন্দা
করতে বা এর বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে প্রস্তুত ছিলেন না | রামমোহনই প্রথম এই প্রথার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে
বিদ্রোহ ঘোষণা করেন | সম্ভবতঃ ১৮১২ সাল থেকেই তিনি সতীদাহের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে আন্দোলন শুরু
করেন
তাঁর দ্বারা প্রকাশিত পত্রিকায় এবং বিভিন্ন গ্রন্থে লেখালেখি করে জনমত তৈরী করার কাজ দিয়ে |
১৮১৮ সালে কলকাতার কিছু উদারপন্থী মানুষকে সংগঠিত করে সতীদাহের বিরুদ্ধে এক দরখাস্ত দেন
গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস এর কাছে | সরকার, জনসাধারণের বিক্ষোভের ভয়ে এই কুপ্রথাকে
নিষিদ্ধ করতে দ্বিধা করছিলেন | অবশেষে রামমোহনের আন্দোলনের দ্বারা তৈরী তীব্র সতীদাহ-বিরোধী
জনমতের আবহাওয়ায়, ১৮২৯ সালে গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক সতীদাহ উচ্ছেদ আইন
প্রবর্তন করেন | এই আইন চালু হলে রামমোহন ও তাঁর বন্ধুবর্গ, দেশীয় প্রগতিশীল হিন্দু গোষ্ঠির পক্ষ থেকে
বেন্টিংককে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন | এর পরে সতীদাহ সমর্থক রক্ষণশীল হিন্দুসমাজ এই আদেশের
বিরুদ্ধে ইংল্যাণ্ডে প্রিভি কাউনসিলে আবেদন করলে রামমোহন স্বয়ং ইংল্যাণ্ডে গিয়ে তার বিরুদ্ধে আর এক
আবেদন পেশ করেন ও সে দেশে সতীদাহ বিরোধী জনমত তৈরী করার জন্য সেখানে এক গ্রন্থ প্রকাশ করেন |
প্রিভি কাউনসিলে এই রক্ষণশীল সমাজের আবেদনের শুনানী চলাকালীন প্রতিদিন তিনি অতন্দ্র প্রহরীর মত
উপস্থিত থাকতেন | শেষ পর্যন্ত ১৮৩২ সালে প্রিভি কাউনসিল সেই আবেদন খারিজ করে দিলে পরে তিনি
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন |

প্রমাণ সাপেক্ষ :  শোনা যায় যে সতীদাহ প্রথার করাল গ্রাস থেকে তিনি তাঁর দাদার মৃত্যুর পর পরম
স্নেহময়ী বৌদিকেও রক্ষা করতে পারেন নি | সে সময় তিনি বাড়ি ছিলেন না | তাঁর অনুপস্থিতির সুযোগ
নিয়ে তাঁর বৌদিকে সহমরণে বাধ্য করা হয় | এর পরই নাকি তিনি এই বর্বর প্রথা লুপ্ত করার শপথ নেন |
(বসন্ত চৌধুরী অভিনিত "রামমোহন" নামক ছায়াছবিতে তেমনই দেখানো হয়েছিল )

সমাজ সংস্কার এবং ব্রাহ্ম সমাজ -                                               সূচিতে ফেরত
১৮১৪ সালে কলকাতায় পাকাপাকিভাবে বসবাসের সঙ্গে সঙ্গেই নিজস্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী হাত
দিলেন সমাজ সংস্কারের কাজে |  ১৮১৪ ~ ১৫ সালে কলকাতায় প্রতিষ্ঠা করলেন "আত্মীয় সভা" | সেই সময়
এই সভাই ছিল কলকাতায় সবরকম জনকল্যাণমূলক সংস্কারকর্মের প্রধান উত্স | এই সভার মধ্যে ছিলেন
প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর, প্রসন্ন কুমার ঠাকুর, ব্রজমোহন মজুমদার, কৃষ্ণমোহন মজুমদার, হলধর বসু,
রাজনারায়ণ সেন, বৃন্দাবন চন্দ্র মিত্র, বৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায়, নন্দকিশোর বসু, তারাচাঁদ চক্রবর্তী প্রমুখ |
পালা করে সদস্যদের বাড়িতে অধিবেশন হত | কর্মসূচিতে থাকতো বেদ, উপনিষদ্ প্রভৃতি শাস্ত্রপাঠ, ব্রহ্ম
সংগীত এবং হিন্দু ধর্ম ও সমাজ সংক্রান্ত নানা আলোচনা --- যেমন প্রতিমা পূজার অসারতা, জাতিভেদের
অনিষ্টকারিতা, সতিদাহ, বহুবিবাহ প্রভৃতি সামাজিক অনাচার উচ্ছেদের উপায়, বালবিধবার পুনর্বিবাহের
আবশ্যকতা | এঁরা বিশ্বাস করতেন যে ধর্মীয় বিশুদ্ধি ও সামাজিক বিশুদ্ধি পরস্পর নির্ভর --- একটিকে বাদ
দিয়ে অন্যটির কল্পনা করা যায় না | সুতরাং ধর্ম সংস্কারকেই এঁরা সমাজ সংস্কারের ভিত্তিরূপে গহণ
করেছিলেন |

তাই ১৮২৮ সালে রামমোহন, একটি সার্বজনীন ধর্মের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করলেন "
ব্রাহ্ম সমাজ", যে ধর্ম মানুষের
মধ্যে কোন ভেদ স্বীকার করবে না এবং যার লক্ষ্য হবে এক যোগে সর্বমানুষের ইহলৌকিক কল্যাণ ও
আধ্যাত্মিক মুক্তি | যেখানে উপাসনা হবে একমাত্র অদ্বিতীয় নিরাকার পরব্রহ্মের | কোন সৃষ্ট বস্তু, প্রতিমা,
ছবি, মূর্তি বা কোনোপ্রকারের প্রতীক যেখানে পূজিত হবে না | রামমোহন প্রতিষ্ঠিত ব্রাহ্ম সমাজ ১৮০ বছর
অতিক্রান্ত করেছে | আধুনিক ভারতবর্ষের তথা বাংলার রেনেসাঁ বা নবজাগরণে রামমোহন থেকে
রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক ইতিহাসে ব্রাহ্ম সমাজের মহান অবদান সর্বজনস্বীকৃত |

অধিকারের লড়াই -                                                                       সূচিতে ফেরত
এত সব কাজের মধ্যেও রামমোহন দেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করে গেছেন |
সেই সময় জুরি অ্যক্টের অন্তর্গত, বিচার ব্যবস্থায়,  হিন্দু মুসলমানের মধ্য থেকে জুরি নির্বাচন করা হত না |
১৮২৬ সালে তিনি হিন্দু মুসলমান উভয়পক্ষের হয়ে তত্কালীন জুরি অ্যাক্টের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে এক
দরখাস্ত করেন ব্রিটিশ সরকারের কাছে | হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়ের থেকে জুরি নির্বাচনের দাবী এতে করা
হয়েছিল |

পৈত্রিক সম্পত্তিতে নারীর অধিকারের পক্ষে এবং বহু বিবাহের বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার হয়েছিলেন | তাঁর
ব্যক্তিগত উইলে তিনি শর্ত রেখেছিলেন যে তাঁর পুত্রদের মধ্যে কেউ এক স্ত্রী বর্তমানে আবার বিবাহ করলে
সে পৈত্রিক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হবেন |

তাঁর ইংল্যাণ্ড সফর কালে ব্রিটিশ সংসদ থেকে আমন্ত্রণ জানানো হয় ভারতের রাজস্য বিভাগ এবং বিচার
বিভাগীয় শাসন সংক্রান্ত বিষয়ে সাক্ষ্য দেবার জন্য | এ সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য ১৮৩২ সালে ইংল্যাণ্ড থেকে
গ্রন্থাকারে প্রকাশিত করেছিলেন | সেখানে সে সময়কার ব্রিটিশ প্রবর্তিত ভূমিব্যবস্থায়, ভারতীয় কৃষককূলের
ক্রমবর্ধমান দুর্দশার কথা তিনি স্পষ্ট করে বর্ণনা করেছিলেন | তাই, বিশ্বের দরবারে অসহায় ভারতীয়
কৃষককূলের ঐতিহাসিক প্রথম মুখপাত্র রামমোহনই |

প্রথম বাংলা সংবাদপত্র -                                                              সূচিতে ফেরত
ভারতবর্ষে রামমোহনই প্রথম যিনি জনকল্যাণের ক্ষেত্রে সংবাদপত্রের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন |
তাঁর প্রেরণায়, বাংলা ভাষায় সর্বপ্রথম সংবাদ পত্র "
বঙ্গাল গেজেটি" (সাপ্তাহিক), তাঁর ঘনিষ্ট সহযোগী
"আত্মীয় সভা"-র সদস্য হরচন্দ্র রায় এবং গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য প্রকাশ করেন ১৫ মে ১৮১৮ সালে | এ ছাড়া
রামমোহন পরিচালিত আরও দুটি সংবাদ পত্র হল বাংলা সাপ্তাহিক "সংবাদ-কৌমুদী" (১৮২১) এবং ফার্সী
সাপ্তাহিক "মিরাৎ উল আখবার" (১৮২২) | এ ছাড়া ১৮২৯ সালে অতি অল্প সময়ের জন্য রামমোহন ও তাঁর
কয়েকজন বন্ধু "বেঙ্গল হেরাল্ড" নামক একটি চতুর্ভাষী ( ইংরেজী-বাংলা-হিন্দুস্থানী-ফার্সী ) সাপ্তাহিক পত্রের
স্বত্বাধিকারী হয়েছিলেন | তাঁর সংবাদপত্রের পরিচালনের উদ্দেশ্য ছিল জনসাধারণের অভাব, অভিযোগ, দাবী
প্রভৃতি কর্তৃপক্ষের গোচরে আনা, সমাজে উদার শিক্ষাসংস্কৃতির এক পরিমণ্ডল সৃষ্টি করা, বিশ্বরাজনীতিতে
জনমতকে শিক্ষিত করে তোলা এবং সর্বোপরি সতীদাহ ও অন্যান্য সামাজিক অনাচার ও জাতীয় কলঙ্কের
বিরুদ্ধে জনমত গঠন করা |

সাহিত্যকর্ম এবং কবিতা -                                                             সূচিতে ফেরত
রামমোহনের প্রধান পরিচয় সমাজ সংস্কারক এবং ধর্মনায়ক রূপে | সমাজ ও ধর্ম বিষয়ক আলোচনার
প্রয়োজনেই তাঁর লেখার সূত্রপাত  |  তিনি ফার্সি, ইংরেজী এবং বাংলা, এই তিন ভাষাতেই রচনা
করে গেছেন | তাঁর প্রথম গ্রন্থ "তুহফাৎ-উল-মুত্তহাহিদিন" (১৮০৩-০৪) ফার্সিতে রচিত এবং এর ভূমিকা লেখা
হয়েছিল আরবীতে | এখানে তিনি বহুদেববাদ ও পৌত্তলিকতার সমালোচনা করেন |

তাঁর হাতে বাংলা গদ্য ধর্মালোচনা এবং সমাজ-সংস্কার বিষয়ক তর্ক বিতর্কের বাহন হয়ে উঠেছে | তাঁর
গদ্য শিল্পীর গদ্য নয়, কর্মীর গদ্য | তাঁর বাংলা রচনায় অনুবাদ সাহিত্যে আছে "বেদান্ত গ্রন্থ" (১৮১৫), "কেন",
"ঈশ", "কঠ", "মাণ্ডুক্য" ও "মুণ্ডক" উপনিষদের অনুবাদ (১৮১৬-১৭) | তর্ক বিতর্কমূলক রচনায় আছে
"ভট্টাচার্যের সহিত বিচার" (১৮১৭), "গোস্বামীর সহিত বিচার" (১৮১৮) | একদিকে হিন্দু রক্ষণশীলদের সাথে
শাস্ত্রীয় বিতর্ক, অন্যদিকে খ্রিস্টিয় মিশনারিদের সাথে সংগ্রাম --- এই দুই প্রয়োজনেই তাঁর রচনার বিকাশ |
ইংরেজীতে লিখেছিলেন যীশু খ্রিস্টের উপদেশাবলী নিয়ে "
The Precepts of Jesus" (1820) | সহমরণ প্রথার
নিবারণে রচনা করেছেন "সহমরণ বিষয়ক প্রবর্তক ও নিবর্তকের সংবাদ" (১৮১৮, ১৮১৯), রামমোহনের
অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনা | "পাদরি-শিষ্য সংবাদ" (১৮১৬) রামমোহনের ব্যঙ্গ ও কৌতুকময় রচনা |
রচনা করেছেন "গৌড়ীয় ভাষার ব্যাকরণ" (১৮৩৩) নামে একটি বাংলা ভাষার ব্যাকরণ |

রামমোহন অনেক গান রচনা করেন | সেগুলি "ব্রহ্ম সংগীত" (১৮২৮) নামে সংকলিত হয় | ব্রাহ্ম সমাজে
প্রচলিত যেসব গান পরে "ব্রহ্ম সংগীত" নামে একটি বিশিষ্ট ধর্মীয় রচনা রূপে পরিচিতি ও খ্যাতি লাভ করে,
তার সূচনা হয় রামমোহনের রচনায় | আমরা রামমোহনের সেই ব্রহ্ম সংগীত থেকে কয়েকটি গান এখানে
তুলে দিচ্ছি |


.                                          ---
উত্স: দিলীপ কুমার বিশ্বাস, বাংলার মনীষা (প্রথম খণ্ড), শরৎ
.                                                      পাবলিশিং হাউস,
.                                                      
ডঃ শিশির কুমার দাশ, সংসদ সাহিত্য সঙ্গী ২০০৩,



মিলনসাগর                                সূচিতে ফেরত  
রাজা রামমোহন রায়
আধুনিক ভারতের জনক
( Father of Modern India )
১০ অথবা ২২. ০৫. ১৭৭৮ ~ ২৭. ০৯. ১৮৩৩
সংক্ষিপ্ত জীবনী . . .  
শিক্ষা . . .    
ধর্মীয় প্রভাব . . .     
সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদ . . .    
সমাজ সংস্কার এবং ব্রাহ্ম সমাজ . . .   
অধিকারের লড়াই . . .  
প্রথম বাংলা সংবাদপত্র . . .   
সাহিত্যকর্ম  এবং কবিতা . . .
*
*
*
*
*
*
*
*
রামমোহনের
সমাধি
RAM MOHAN ROY ER SAMADHI