রাজা রামমোহন রায়সূচিতে ফেরত জন্ম গ্রহণ করেন অধুনা পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলার খানাকুল-কৃষ্ণনগরের নিকটবর্তী রাধানগর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত বৈষ্ণব ব্রাহ্মণ পরিবারে | তাঁদের আদি নিবাস ছিল মুর্শিদাবাদ জেলায় এবং কৌলিক পদবী ছিল "বন্দ্যোপাধ্যায়" | রামমোহনের অতিবৃদ্ধ পিতামহ পরশুরাম অথবা রামমোহনের বৃদ্ধ পিতামহ কৃষ্ণচন্দ্র প্রথম নবাব সরকারের চাকুরী গ্রহণ করেন | এই সরকারী চাকরি গ্রহণের পর থেকেই তাঁরা "বন্দ্যোপাধ্যায়" পদবীর পরিবর্তে নিজামত প্রদত্ত "রায়" উপাধি দ্বারা পরিচিত হলেন |
রামমোহনের পিতামহ ব্রজবিনোদ যথেষ্ট কৃতিত্বের সঙ্গে নবাব আলিবর্দি খাঁর অধীনে চাকরি করেন | মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম এর ভাগ্য বিপর্যয়ের পূর্বে ব্রজবিনোদ সম্রাটকে যথেষ্ট সাহায্যও করেছিলেন | ব্রজবিনোদের পঞ্চম পুত্র রামকান্তের দ্বিতীয়া পত্নি তারিণী দেবীর এক কন্যা ও দুই পুত্রের কনিষ্ঠ পুত্র রামমোহন | রামমোহনের মাতামহ শ্যাম ভট্টাচার্য ছিলেন শ্রীরামপুরের চাতরা পল্লীর অধিবাসী এবং শাক্ত- তান্ত্রিক সম্প্রদায়ভুক্ত পুরোহিত | তাই রামমোহন জন্মসূত্রে বাংলার দুই প্রভাবশালী ধর্মীয় ঐতিহ্যেরই উত্তরাধিকারী হয়েছিলেন |
পিতা রামকান্ত রায় সিরাজ-উদ-দৌলার অধীনে কিছুকাল চাকরি করার পর অবসর নিয়ে নিজগ্রাম রাধানগরে এসে বসবাস করতে থাকেন | ১৭৯২ সালে তিনি সপরিবারে পার্শ্ববর্তী গ্রাম লাঙ্গুলপাড়ায় তাঁর নবনির্মিত বাড়িতে উঠে আসেন | ১৭৯৬ সালে তাঁর অধিকাংশ স্থাবর সম্পত্তি তাঁর তিনপুত্র জগমোহন, রামমোহন ও রামলোচন-এর মধ্যে ভাগ করে দেন | রামমোহনের ভাগে পড়ে কলকাতার জোড়াসাঁকোর বাড়িটি এবং দাদা জগমোহনের সঙ্গে যৌথভাবে লাঙ্গুলপাড়ার বাড়ি | ১৭৯৭ সালে রামমোহন কলকাতায় তেজারতি ও কোম্পানির কাগজের ব্যবসা শুরু করেন | তিনি স্বোপার্জিত অর্থে ১৭৯৯ সালে বর্ধমান জেলায় গোবিন্দপুর ও রামেশ্বরপুর নামক দুটি তালুক কিনেছিলেন | ১৮১০ এর মধ্যে তিনি আরও চারটি পত্তনী তালুক কেনেন | ১৮১৪ সালে তাঁর লাঙ্গুলপাড়ার বাড়ির ভাগ লিখে দেন তাঁর ভাগ্নে গুরুদাস মুখোপাধ্যায়কে এবং ১৮১৭ সালে পার্শ্ববর্তী গ্রাম রঘুনাথপুরে নতুন বাড়ি করে সপরিবারে বসবাস শুরু করেন |
তাঁর মহত্ত্ব এই যে তিনিই সর্বপ্রথম উপলব্ধি করেন যে দেশে নবপ্রতিষ্ঠিত বিদেশী (ইংরেজ) শাসনের পেছনে আধুনিক-জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রয়োগবিদ্যা সমৃদ্ধ এক বিরাট সভ্যতা ক্রিয়াশীল এবং ভারতবর্ষকে আধুনিক যুগে পদার্পণ করতে তার নিজস্ব আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধগুলিকে নবাগত এই জ্ঞানবিজ্ঞানের নিকষে পরীক্ষা করে কিছু গ্রহণ ও কিছু বর্জনের মাধ্যমে যুগোপযোগী এক ভবিষ্যৎ-মুখী জীবনদর্শন গড়ে নিতে হবে | তাই তিনি ইংরেজদের অধীনে ১৮০৩ থেকে ১৮১৪ সাল পর্যন্ত সরকারী ও বেসরকারী চাকরি গ্রহণ করেন, নিজস্ব ব্যবসা ও সম্পত্তি থেকে যথেষ্ট আয় থাকা সত্ত্বেও | ১৮১৫ সালে তিনি ইংরেজ সরকারের দূত রূপে ভুটান পরিদর্শন করেন |
১৮২৯ সালে তত্কালীন ব্রিটিশ পেনশন ভোগী দিল্লীর মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় আকবর, তাঁকে ইংল্যাণ্ডে দূত নিযুক্ত করেন | এই উপলক্ষ্যে সম্রাট তাঁকে "রাজা" উপাধি দান করেন এবং ইংল্যাণ্ডে কতৃপক্ষের সঙ্গে সম্রাটের পেনশন বৃদ্ধির বিষয়টি আলোচনার ভার তাঁর উপর ন্যস্ত করেন | তাঁর চেষ্টায় সম্রাটের পেনশন ৩ লক্ষ টাকা বৃদ্ধি পায় |
ভগ্ন স্বাস্থ নিয়ে কলকাতা থেকে ১৯ নভেম্বর ১৯৩০ যাত্রা শুরু করে ৮ এপ্রিল ১৮৩১ তিনি ইংল্যাণ্ড পৌঁছান | সেখানে অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে ২৭ সেপ্টেম্বর ১৮৩৩ সালে ব্রিস্টলে তাঁর জীবনাবসান হয় | তাঁকে ব্রিস্টলের আর্নস ভ্যালে সিমেটারিতে সমাধিস্থ করা হয় | পরবর্তীতে ব্রিটেনে বসবাসী ভারতীয়রা তাঁর সমাধিতে একটি স্মৃতি সৌধ নির্মাণ করেন |
শিক্ষা - সূচিতে ফেরত বাল্যকাল থেকেই রামমোহনের তীক্ষ্ণ বুদ্ধি এবং অসাধারণ স্মৃতিশক্তির পরিচয় পাওয়া গিয়েছিল | তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় রাধানগর গ্রামের পাঠশালায় | এর পর তিনি সেখানেই সেকালের প্রথানুযায়ী ফার্সী শিক্ষা করেন | পরে ইসলামীয় বিদ্যায়, বিশেষতঃ আরবী ভাষা ও মুসলিম শাস্ত্রে উচ্চ অধিকার অর্জন করেন তখনকার ইসলামী বিদ্যাচর্চার পীঠস্থান পাটনায় | সংস্কৃত শিক্ষা শুরু হয় কলকাতায় এবং তা উত্তরকালে পরিণতি লাভ করে কাশীতে | কৈশোর ও যৌবনে পাটনা ও কাশীতে শিক্ষালাভের প্রমাণ পাওয়া যায় নানা পারিবারিক মামলা-মোকদ্দমার নথিপত্র থেকে | রামমোহনের শিক্ষার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল টোল-চতুষ্পাঠি- মক্তব-মাদ্রাসায়, তত্কালীন বিশুদ্ধ ভারতীয় পাঠ্যক্রমের উপর, ইংরেজী ভাষা ও পাশ্চাত্য বিদ্যার রাজ্যে প্রবেশের আগে | ফলে তিনি হিন্দু ও মুসলিম উভয় শাস্ত্রে ও ঐতিহ্যে অসাধারণ অধিকার অর্জন করেছিলেন |
ধর্মীয় প্রভাব - সূচিতে ফেরত পাটনায় ইসলাম ধর্মের কোরাণ, হাদিস পুঙ্খানুপুঙ্খ অধ্যয়ন করার ফলে বিশুদ্ধ একেশ্বরবাদে তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস জন্মায় | ইসলামের যুক্তিবাদী মগজিলা ও কট্টর বিশুদ্ধিমার্গী মুত্তহাহিদিন সম্প্রদায়ের মতবাদও তাঁকে যথেষ্ট প্রভাবিত করে | সূফী মরমীয়তাবাদের প্রতি তাঁর অনুরাগও উত্তরোত্তর গভীর হয়ে ওঠে | এর ফলে হিন্দু ধর্মের মূর্তিপূজায় তাঁর বিশ্বাস চলে যায় | এই নিয়ে পিতার সঙ্গে মতবিরোধ বাড়তে থাকে ১৯৮৮ সালে তিনি গৃহত্যাগ করেন | পরবর্তি তিন চার বছর কেটেছিল ভ্রমণে | এই সময় তিনি নাকি উত্তর ভারতের নানা স্থান ও তিব্বত পর্যটন করেছিলেন | এর পর পিতার আহ্বানে আবার গৃহে ফিরে আসেন | এর পর তিনি কাশিতে হিন্দু শাস্ত্রের মোক্ষশাস্ত্র, বেদান্তের প্রস্থানত্রয় উপনিষদ, ব্রহ্মসূত্র ও গীতা, ভাষ্যটীকা সমেত অধ্যয়ন করেন | ফলে তাঁর প্রত্যয় জন্মায় যে ঈশ্বরসত্তার অখণ্ডতা এবং ঐক্য প্রতিপাদনই হিন্দুধর্মের উদ্দেশ্য এবং প্রচলিত প্রতিমা পূজা সেখানে উত্তর কালের এক প্রক্ষিপ্ত অধ্যায় মাত্র |
সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদ - সূচিতে ফেরত হিন্দু বিধবা নারী তাঁর মৃত পতির চিতায় জীবন্ত অবস্থায় স্বেচ্ছায় সহমরণে যাবেন, এই প্রাচীন প্রথাটিই মধ্যযুগীয় হিন্দুসমাজে, বিশেষত বাংলায়, সতীদাহ প্রথা নামে জাঁকিয়ে বসেছিল | রামমোহন এই অমানবিক প্রথাটিকে নির্মূল করার চেষ্টায় এক সফল সংগ্রাম করেছিলেন | ব্রিটিশ সরকারের দৃষ্টি এই কুপ্রথার উপর আগেই পড়েছিল, কিন্তু কোন পদক্ষেপ নেবার আগে তারা এ বিষয়ে শাস্ত্রীয় মত সংগ্রহ করা শুরু করেছিলেন | ১৮০৫ সালে সরকার কতৃক আদিষ্ট হয়ে পণ্ডিত ঘনশ্যাম শর্মা এবং ১৮১৭ সালে পণ্ডিত মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকার বিধান দেন যে স্বামীর মৃত্যুতে তার চিতায় প্রাণ বিসর্জ্জন দেওয়া বিধবা স্ত্রীর পক্ষে বাধ্যতামূলক নয় | কিন্তু তাঁরা কেউই প্রকাশ্যে এই প্রথাকে নিন্দা করতে বা এর বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে প্রস্তুত ছিলেন না | রামমোহনই প্রথম এই প্রথার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন | সম্ভবতঃ ১৮১২ সাল থেকেই তিনি সতীদাহের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে আন্দোলন শুরু করেন তাঁর দ্বারা প্রকাশিত পত্রিকায় এবং বিভিন্ন গ্রন্থে লেখালেখি করে জনমত তৈরী করার কাজ দিয়ে | ১৮১৮ সালে কলকাতার কিছু উদারপন্থী মানুষকে সংগঠিত করে সতীদাহের বিরুদ্ধে এক দরখাস্ত দেন গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস এর কাছে | সরকার, জনসাধারণের বিক্ষোভের ভয়ে এই কুপ্রথাকে নিষিদ্ধ করতে দ্বিধা করছিলেন | অবশেষে রামমোহনের আন্দোলনের দ্বারা তৈরী তীব্র সতীদাহ-বিরোধী জনমতের আবহাওয়ায়, ১৮২৯ সালে গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক সতীদাহ উচ্ছেদ আইন প্রবর্তন করেন | এই আইন চালু হলে রামমোহন ও তাঁর বন্ধুবর্গ, দেশীয় প্রগতিশীল হিন্দু গোষ্ঠির পক্ষ থেকে বেন্টিংককে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন | এর পরে সতীদাহ সমর্থক রক্ষণশীল হিন্দুসমাজ এই আদেশের বিরুদ্ধে ইংল্যাণ্ডে প্রিভি কাউনসিলে আবেদন করলে রামমোহন স্বয়ং ইংল্যাণ্ডে গিয়ে তার বিরুদ্ধে আর এক আবেদন পেশ করেন ও সে দেশে সতীদাহ বিরোধী জনমত তৈরী করার জন্য সেখানে এক গ্রন্থ প্রকাশ করেন | প্রিভি কাউনসিলে এই রক্ষণশীল সমাজের আবেদনের শুনানী চলাকালীন প্রতিদিন তিনি অতন্দ্র প্রহরীর মত উপস্থিত থাকতেন | শেষ পর্যন্ত ১৮৩২ সালে প্রিভি কাউনসিল সেই আবেদন খারিজ করে দিলে পরে তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন |
প্রমাণ সাপেক্ষ : শোনা যায় যে সতীদাহ প্রথার করাল গ্রাস থেকে তিনি তাঁর দাদার মৃত্যুর পর পরম স্নেহময়ী বৌদিকেও রক্ষা করতে পারেন নি | সে সময় তিনি বাড়ি ছিলেন না | তাঁর অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে তাঁর বৌদিকে সহমরণে বাধ্য করা হয় | এর পরই নাকি তিনি এই বর্বর প্রথা লুপ্ত করার শপথ নেন | (বসন্ত চৌধুরী অভিনিত "রামমোহন" নামক ছায়াছবিতে তেমনই দেখানো হয়েছিল )
সমাজ সংস্কার এবং ব্রাহ্ম সমাজ - সূচিতে ফেরত ১৮১৪ সালে কলকাতায় পাকাপাকিভাবে বসবাসের সঙ্গে সঙ্গেই নিজস্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী হাত দিলেন সমাজ সংস্কারের কাজে | ১৮১৪ ~ ১৫ সালে কলকাতায় প্রতিষ্ঠা করলেন "আত্মীয় সভা" | সেই সময় এই সভাই ছিল কলকাতায় সবরকম জনকল্যাণমূলক সংস্কারকর্মের প্রধান উত্স | এই সভার মধ্যে ছিলেন প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর, প্রসন্ন কুমার ঠাকুর, ব্রজমোহন মজুমদার, কৃষ্ণমোহন মজুমদার, হলধর বসু, রাজনারায়ণ সেন, বৃন্দাবন চন্দ্র মিত্র, বৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায়, নন্দকিশোর বসু, তারাচাঁদ চক্রবর্তী প্রমুখ | পালা করে সদস্যদের বাড়িতে অধিবেশন হত | কর্মসূচিতে থাকতো বেদ, উপনিষদ্ প্রভৃতি শাস্ত্রপাঠ, ব্রহ্ম সংগীত এবং হিন্দু ধর্ম ও সমাজ সংক্রান্ত নানা আলোচনা --- যেমন প্রতিমা পূজার অসারতা, জাতিভেদের অনিষ্টকারিতা, সতিদাহ, বহুবিবাহ প্রভৃতি সামাজিক অনাচার উচ্ছেদের উপায়, বালবিধবার পুনর্বিবাহের আবশ্যকতা | এঁরা বিশ্বাস করতেন যে ধর্মীয় বিশুদ্ধি ও সামাজিক বিশুদ্ধি পরস্পর নির্ভর --- একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটির কল্পনা করা যায় না | সুতরাং ধর্ম সংস্কারকেই এঁরা সমাজ সংস্কারের ভিত্তিরূপে গহণ করেছিলেন |
তাই ১৮২৮ সালে রামমোহন, একটি সার্বজনীন ধর্মের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করলেন "ব্রাহ্ম সমাজ", যে ধর্ম মানুষের মধ্যে কোন ভেদ স্বীকার করবে না এবং যার লক্ষ্য হবে এক যোগে সর্বমানুষের ইহলৌকিক কল্যাণ ও আধ্যাত্মিক মুক্তি | যেখানে উপাসনা হবে একমাত্র অদ্বিতীয় নিরাকার পরব্রহ্মের | কোন সৃষ্ট বস্তু, প্রতিমা, ছবি, মূর্তি বা কোনোপ্রকারের প্রতীক যেখানে পূজিত হবে না | রামমোহন প্রতিষ্ঠিত ব্রাহ্ম সমাজ ১৮০ বছর অতিক্রান্ত করেছে | আধুনিক ভারতবর্ষের তথা বাংলার রেনেসাঁ বা নবজাগরণে রামমোহন থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক ইতিহাসে ব্রাহ্ম সমাজের মহান অবদান সর্বজনস্বীকৃত |
অধিকারের লড়াই - সূচিতে ফেরত এত সব কাজের মধ্যেও রামমোহন দেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করে গেছেন | সেই সময় জুরি অ্যক্টের অন্তর্গত, বিচার ব্যবস্থায়, হিন্দু মুসলমানের মধ্য থেকে জুরি নির্বাচন করা হত না | ১৮২৬ সালে তিনি হিন্দু মুসলমান উভয়পক্ষের হয়ে তত্কালীন জুরি অ্যাক্টের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে এক দরখাস্ত করেন ব্রিটিশ সরকারের কাছে | হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়ের থেকে জুরি নির্বাচনের দাবী এতে করা হয়েছিল |
পৈত্রিক সম্পত্তিতে নারীর অধিকারের পক্ষে এবং বহু বিবাহের বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার হয়েছিলেন | তাঁর ব্যক্তিগত উইলে তিনি শর্ত রেখেছিলেন যে তাঁর পুত্রদের মধ্যে কেউ এক স্ত্রী বর্তমানে আবার বিবাহ করলে সে পৈত্রিক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হবেন |
তাঁর ইংল্যাণ্ড সফর কালে ব্রিটিশ সংসদ থেকে আমন্ত্রণ জানানো হয় ভারতের রাজস্য বিভাগ এবং বিচার বিভাগীয় শাসন সংক্রান্ত বিষয়ে সাক্ষ্য দেবার জন্য | এ সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য ১৮৩২ সালে ইংল্যাণ্ড থেকে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত করেছিলেন | সেখানে সে সময়কার ব্রিটিশ প্রবর্তিত ভূমিব্যবস্থায়, ভারতীয় কৃষককূলের ক্রমবর্ধমান দুর্দশার কথা তিনি স্পষ্ট করে বর্ণনা করেছিলেন | তাই, বিশ্বের দরবারে অসহায় ভারতীয় কৃষককূলের ঐতিহাসিক প্রথম মুখপাত্র রামমোহনই |
প্রথম বাংলা সংবাদপত্র - সূচিতে ফেরত ভারতবর্ষে রামমোহনই প্রথম যিনি জনকল্যাণের ক্ষেত্রে সংবাদপত্রের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন | তাঁর প্রেরণায়, বাংলা ভাষায় সর্বপ্রথম সংবাদ পত্র "বঙ্গাল গেজেটি" (সাপ্তাহিক), তাঁর ঘনিষ্ট সহযোগী "আত্মীয় সভা"-র সদস্য হরচন্দ্র রায় এবং গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য প্রকাশ করেন ১৫ মে ১৮১৮ সালে | এ ছাড়া রামমোহন পরিচালিত আরও দুটি সংবাদ পত্র হল বাংলা সাপ্তাহিক "সংবাদ-কৌমুদী" (১৮২১) এবং ফার্সী সাপ্তাহিক "মিরাৎ উল আখবার" (১৮২২) | এ ছাড়া ১৮২৯ সালে অতি অল্প সময়ের জন্য রামমোহন ও তাঁর কয়েকজন বন্ধু "বেঙ্গল হেরাল্ড" নামক একটি চতুর্ভাষী ( ইংরেজী-বাংলা-হিন্দুস্থানী-ফার্সী ) সাপ্তাহিক পত্রের স্বত্বাধিকারী হয়েছিলেন | তাঁর সংবাদপত্রের পরিচালনের উদ্দেশ্য ছিল জনসাধারণের অভাব, অভিযোগ, দাবী প্রভৃতি কর্তৃপক্ষের গোচরে আনা, সমাজে উদার শিক্ষাসংস্কৃতির এক পরিমণ্ডল সৃষ্টি করা, বিশ্বরাজনীতিতে জনমতকে শিক্ষিত করে তোলা এবং সর্বোপরি সতীদাহ ও অন্যান্য সামাজিক অনাচার ও জাতীয় কলঙ্কের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করা |
সাহিত্যকর্ম এবং কবিতা - সূচিতে ফেরত রামমোহনের প্রধান পরিচয় সমাজ সংস্কারক এবং ধর্মনায়ক রূপে | সমাজ ও ধর্ম বিষয়ক আলোচনার প্রয়োজনেই তাঁর লেখার সূত্রপাত | তিনি ফার্সি, ইংরেজী এবং বাংলা, এই তিন ভাষাতেই রচনা করে গেছেন | তাঁর প্রথম গ্রন্থ "তুহফাৎ-উল-মুত্তহাহিদিন" (১৮০৩-০৪) ফার্সিতে রচিত এবং এর ভূমিকা লেখা হয়েছিল আরবীতে | এখানে তিনি বহুদেববাদ ও পৌত্তলিকতার সমালোচনা করেন |
তাঁর হাতে বাংলা গদ্য ধর্মালোচনা এবং সমাজ-সংস্কার বিষয়ক তর্ক বিতর্কের বাহন হয়ে উঠেছে | তাঁর গদ্য শিল্পীর গদ্য নয়, কর্মীর গদ্য | তাঁর বাংলা রচনায় অনুবাদ সাহিত্যে আছে "বেদান্ত গ্রন্থ" (১৮১৫), "কেন", "ঈশ", "কঠ", "মাণ্ডুক্য" ও "মুণ্ডক" উপনিষদের অনুবাদ (১৮১৬-১৭) | তর্ক বিতর্কমূলক রচনায় আছে "ভট্টাচার্যের সহিত বিচার" (১৮১৭), "গোস্বামীর সহিত বিচার" (১৮১৮) | একদিকে হিন্দু রক্ষণশীলদের সাথে শাস্ত্রীয় বিতর্ক, অন্যদিকে খ্রিস্টিয় মিশনারিদের সাথে সংগ্রাম --- এই দুই প্রয়োজনেই তাঁর রচনার বিকাশ | ইংরেজীতে লিখেছিলেন যীশু খ্রিস্টের উপদেশাবলী নিয়ে "The Precepts of Jesus" (1820) | সহমরণ প্রথার নিবারণে রচনা করেছেন "সহমরণ বিষয়ক প্রবর্তক ও নিবর্তকের সংবাদ" (১৮১৮, ১৮১৯), রামমোহনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনা | "পাদরি-শিষ্য সংবাদ" (১৮১৬) রামমোহনের ব্যঙ্গ ও কৌতুকময় রচনা | রচনা করেছেন "গৌড়ীয় ভাষার ব্যাকরণ" (১৮৩৩) নামে একটি বাংলা ভাষার ব্যাকরণ |
রামমোহন অনেক গান রচনা করেন | সেগুলি "ব্রহ্ম সংগীত" (১৮২৮) নামে সংকলিত হয় | ব্রাহ্ম সমাজে প্রচলিত যেসব গান পরে "ব্রহ্ম সংগীত" নামে একটি বিশিষ্ট ধর্মীয় রচনা রূপে পরিচিতি ও খ্যাতি লাভ করে, তার সূচনা হয় রামমোহনের রচনায় | আমরা রামমোহনের সেই ব্রহ্ম সংগীত থেকে কয়েকটি গান এখানে তুলে দিচ্ছি |