রাজকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
১।     স্তাচলগামী চন্দ্র       
২।     
ভারতমাতা      
৩।     
কালে বিজয়া        
         
*
অস্তাচলগামী চন্দ্র
( "কবিতামালা (১৮৭৭)"  থেকে নেওয়া)


(১)
ওই দেখ দাঁড়াইয়া আকাশের পাশে যামিনীবিলাসী ;
পাণ্ডুবর্ণ কলেবর,                                 কাঁপিতেছে থরথর,
কপোলনয়নজলে যাইথেছে ভাসি ;
ছাড়িতে প্রাণের প্রিয়া,                           ব্যাকুল প্রণয়িহিয়া ;
প্রেম বিনা এ সংসার অন্ধকাররাশি ;
কেন রে গোকুলচাঁদ ভুলিল আমারে?
বিষের জ্বলনে জ্বলি ভব-কারাগারে |


(২)
বিরহরাহুর ভয়ে শশীর এ দশা গগনমণ্ডলে ;
দেবতার বুদ্ধি হত,                                   মানুষের সহে কত,
দুর্বল মানবকুল সকলেই বলে ;
অবলা সহজে নারী ;                                যন্ত্রণা সহিতে নারি ;
জীবন জ্বলিছে যন বাড়ব-অনলে ;
বল সজনী লো বল বাঁচিব কেমনে?
অথবা মরণ ভল শ্যামের বিহনে |


(৩)
প্রেমের কমল, হায়, মানসসরসে ফুটিবে কি আর?
হৃদয়-গগন-রবি,                                    সংসার-রঞ্জন-ছবি,
ঊষার সহিত দেখা দিবে কি আবার?
লোকে মোরে কমলিনী,                      বলে কেন নিতম্বিনী?
আমারে ঘেরিয়া আছে চির অন্ধকার |
এ নিশার অবসান হবে কি লো সই?
আর কার কাছে মোর মনকথা কই |


(৪)
কেন সই তোর আঁখি করে ছল ছল বল না আমারে?
কি ভাবি হৃদয়ে তোর,                              উথলে যন্ত্রণা ঘোর?
কিসে তোর ফুল্লমুখ গ্রাসিল আঁধারে?
বুঝিলাম মোর দুখ,                                 হরিয়াছে তোর সুখ,
সুখ সুখ, দুখ দুখ, চৌদিকে বিস্তারে |
যেখানে বসন্ত যায়, ফুটে ফুলকুল ;
যথায় শীতের গতি, সৌন্দর্য্য নির্মূল |


(৫)
সজনি লো সরোবরে দেখনা কাঁপিছে ভয়ে কুমুদিনী,
নয়ন মুদিত প্রায়,                                   যেন অবসন্ন কায়,
নাথ যায়, বলি হায়, এমন মলিনী |
না আইল মোর নাথ,                               কেবল বিরহ সাথ,
যাপিতে হইল মোর বিষম যামিনী |
নিশা তো হইল গত, বিরহ না যায় |
কেন হরি নিদারুণ হইলে আমায়?


(৬)
বলিতে আমারে তুমি কত ভালবাস, বৃন্দাবনধন |
কত প্রেমকথা কয়ে,                              আমারে হৃদয়ে লয়ে,
করিতে পুলককায়ে সাদরে চুম্বন |
একোবারে স্বপ্নবৎ,                                     হইল কি সে তাবৎ?
অবলা ছলিতে তুমি পার কি কখন?
অথবা কপালগুণে---আমি অভাগিনী---
অমৃত হইল বিষ, লো প্রিয় ভগিনী |


.                                                    ****************                                           
উপরে


মিলনসাগর
*
ভারতমাতা
( "কবিতামালা" কাব্য থেকে নেওয়া)


"ম্লান মুখচন্দ্র ভারতি তোমারি,
হেরি দিবানিশি ঝরে নেত্রবারি,
নিয়ত যে কান্তি, বরষিত শান্তি,
আজি তা কেমনে এমন নেহারি ;
দুখ-পারাবারে, নিরখি তোমারে,
হৃদয়ে ধৈরজ ধরিতে না পারি |"

মধুর বচন করিয়া শ্রবণ
চকিতা দুখিনী ফিরায় নয়ন
অমৃতভাষিনী তরুণী পানে ;
অদৃষ্টের ফের, হায়, দৃষ্টিহারা
পূর্বতেজস্বিনী নয়নের তারা ;
কিছু না হইল জ্ঞানের উদয় ;
পুনঃ কমলিনী ভাষ সুধাময়
বর্ষিলা মধুর মধুর তানে |

"দেখ গো ভারতি তোমারি সন্তান
ঘুমায়ে রয়েছে সবে হতজ্ঞান ;
বলবীর্যহীন, অন্ন বিনা ক্ষীণ,
দেখিয়া দুর্দশা, বিদরয়ে প্রাণ ;
হেরিতে না পারি এ দশা তোমার,
দেশের সুখের মুখে দিয়া ছার,
হইয়া অপার জলনিধি পার,
চলিলাম আজি ত্যজি এই স্থান |"

দুখিনী আবার চাহিলা চকিতে,
কিন্তু সংজ্ঞা তাহে না হইল চিতে ;
দেখিয়া চপলা অদৃশ্য হইল ;
অমনি আলোকমালিকা নিভিল |

কতক্ষণ পরে আর্তনাদ করি
উঠিলা দুখিনী, যেন চোরে হরি
লয়ে গেছে তাঁর মাথার মণি ;
সন্তানগণেরে চান জাগাইতে
আলস্যে কেহই না চাহে উঠিতে,
যে জাগে সে পুনঃ যায় ঘুমাইতে,
করেন জননী রোদনধ্বনি |

অবশেষে জাগি উঠিল সকলে,
"কি খাব মা, খাব" ক্ষুধাভরে বলে,
কহেন জননী "কি বলিব, হায়,
গিয়াছেন লক্ষ্মী ছাড়িয়া আমায় ;
অন্ন আর কোথা পাইব এবে ;
কমলা এখন সাগরের পারে,
বিরাজেন মহারাণীর আকারে,
অন্ন ক বাছা তাঁহায় সেবে |"

"জয় মহারাণী জয় জয় জয়,
বিপদ-সময় দেহ মা আশ্রয়",
হৃদয় ভরিয়া, উত্সাহ করিয়া,
কহিল কাতরে তনয়চয় |

হেনকালে শ্বেতকান্তি মহাবীর,
জ্বলদগ্নি কোপে কম্পিতশরীর,
বিদ্রোহী বলিয়া, ভর্ৎসিয়া গর্জিয়া,
পদাঘাত করে,                            নিষ্ঠুর অন্তরে,
সন্তানগণের গায় |
দেখিয়া দুঃখিনী জানুন্যস্তভূমি,
বলে "অহে বিধি, কোথা আছ তুমি?
ছাড়িলেন লক্ষ্মী আমায় যে কালে,
কেন না গেলাম ডুবিয়া পাতালে?
কোথায় হরিশ,                       কোথায় গিরিশ,
কোথা ফেলি গেলি মায় |"


.                                                ****************                                            
উপরে


মিলনসাগর
*
অকালে বিজয়া
("কবিতামালা" কাব্য থেকে নেওয়া)


                      (১)
কেন রে অকালে কাল বিজয়া আইল, রে?
সোনার প্রতিমা মম সহসা ডুবিল, রে |
হৃদয়ের সিংহাসনে, না তুলিতে সযতনে,
না পূজিতে প্রেমফুলে, এমনি হইল, রে |
এ কথা কহিব কায়, দুখে বুক ফাটি যায়,
আমার মনের আশা মনেই রহিল, রে |


                      (২)
তুমি, দেবী, স্বর্গপুরে গিয়াছ ত চলিয়া
অভাগারে অসুখের ধরাধামে ফেলিয়া,
দেখি সব অন্ধকার, দেহে বল নাহি আর ;
কি কারণে গেলে মোরে মায়া করি ছলিয়া?
মনেরে প্রবোধ দিব কোন্ কথা বলিয়া?


                      (৩)
ভ্রমিতেছিলাম আমি সংসার প্রান্তরে,রে
মেঘাচ্ছন্ন নিশাকালে চিন্তিত-অন্তরে, রে ;
সহসা হাসিলে তুমি, উজলিয়া মর্ত্যভূমি,
সৌদামিনী হাসি যথা অন্ধকার হরে, রে |
দেখিতে পেলাম পথ, ভাবিলাম মনোরথ
পথহারা পথিকের এবার পূরিবে, রে |


                      (৪)
পুনরায় কি কারণে লুকাইলে আঁধারে,
দ্বিগুণ তিমির মাঝে ফেলাইয়া আমারে?
না পূরিল মনোরথ, পুনঃ হারালেম পথ ;
বিষম সঙ্কটে রক্ষা কে করিবে তাহারে,
আরাধ্য দেবতা, হায়, তেয়াগিল যাহারে?


                      (৫)
একেবারে সুখাশায় জলাঞ্জলি দিয়েছি,
জীবনের অভিলাষ বিসর্জন করেছি,
সেই তপ, সেই ধ্যান, সেই জপ, সেই জ্ঞান,
অন্য সব বিষয়েতে উদাসীন হয়েছি ;
সেই বেদ, সেই তন্ত্র, সেই গুরু, সেই মন্ত্র,
সেই নাম লয়ে মুখে অবিরত রয়েছি |


                      (৬)
অন্তরেতে সেই মূর্তি নিরন্তর জাগিছে |
সেই সুমধুর বোল কর্ণে যেন বাজিছে,
বীণার বিনোদতান, বসন্ত-কোকিল-গান
তার সহ তুলনায় মিষ্ট নাহি লাগিছে |
কুত্রাপি মাধুর্য নাই, হলাহল বর্ষিছে |


                      (৭)
আমার জীবন, হায়, বিফল হইল, রে |
আমার মাথার মণি খসিয়া পড়িল, রে |
আমার হৃদয় ধন, কে করিল বিসর্জন?
প্রেমের প্রতিমা মম সহসা ডুবিল, রে |
কেন রে অকালে কাল বিজয়া আইল, রে |


.            ****************                                                
উপরে


মিলনসাগর