>
কবি রঞ্জিত গুপ্তর কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
*
কুটুম

কবিতা, তোমাকে বুঝি চেনাই যাবে না
রামভদ্রপুরের মাঠে, খালধার দিয়ে হাঁটতে গিয়ে
যেন মনেই না হয়,
তুমি রামভদ্রপুরের ধেনু নন্দী বা দুলাল ছাড়া অন্য কেউ

বাদায় কাঁকড়া ধরতে ব্যস্ত দুলালের বাপ
যেন ভুলেও বিদেশী ভেবে প্রশ্ন না করে
বাড়ী কোনখানে, যাবে কদ্দুর ?
যেন ভাবে ---- থাক এই গাঁয়ে কিংবা পাশেই
ধান্যকাটা কিংবা বলরামপুরেরই ছাওয়াল
খুদ বেচো কিংবা ফিরি কাজ কর
আর পাঁচজনের মত খুব ভোরে সব্জীর ট্রেনে
সংগ্রামপুর থেকে শ্যালদা যাও

কবিতা বলো তো, কবে বিষ্ণুপুরে
নিতাইয়ের বাড়ী গেলে
নিতাইয়ের বৌ নিকানো দাওয়ায়
বসবার জায়গা করে দেবে
নিতাইয়ের মা, বুড়ী মা
খুদ বেচে ফিরে, পয়সা গুনতে গুনতে
বলবে---বাবা তোদের ওখানে এবছর চাষ কিরকম
আমাদের এদিকে তো এবছরও সব ভেসে গেল
আর নিতাই বাড়ী ফিরে
পা ধুতে ধুতে বলবে-----
দাদা এলে কতক্ষণ, বস,
চরণের কাছে আজ তার কেটে গেছে বলে
বহুক্ষণ ট্রেন বন্ধ ছিল

সমস্ত পড়শীরা বুঝবে
এ বাড়ীতে কুটুম এসেছে, কুটুম এসেছে, কুটুম এসেছে
বাড়ী বকুলতলা |

.                ****************                                                             
উপরে   


মিলনসাগর
*
ডাক দাও মানুষের মা


দারুণ গভীর থেকে ডাক দাও মানুষের মা
ঘুম-ঘোর যেন ভেঙ্গে যায়
আমরা তো ঘুমের শিশু
গাঢ় ঘুম অঙ্গে লেগেছে
তুমি ঘুম ভেঙ্গে দাও

ডাকো----
যেন মেঘ ডেকে ওঠে
ডাকো----
যেন সমুদ্র গর্জায়
ডাকো---
ডাকে যেন বেজে ওঠে শাঁখ |

চারিদিকে মৃত্যুর হানা
বর্গী এসেছে বলে ঘুম পাড়িও না |
মাগো ঘুম ভেঙ্গে দাও-----
দারুণ গভীর থেকে ডাক দাও মানুষের মা
ও মাটির মা |

.                ****************                                                             
উপরে   


মিলনসাগর
*
মনের মধ্যে রাজা

ইচ্ছে দিয়ে লালন করি তাকে
মনের মধ্যে এক যে থাকে রাজা |
লুকিয়ে রাখি কেউ যাতে না দেখে
বাইরে বলি, রাজাকে দাও সাজা |

বাইরে হাজার রাজার সাথে যুদ্ধ
মুকুট ভাঙ্গি ফেলে পায়ের তলে |
নিজের ঘরে নিজেই সাজি রাজা
চক্ষু জুড়াই আর্শী খানা মেলে |

রাজ্য ভাঙ্গে, ভাঙ্গে রাজত্ব
আমার রাজার রাজ্য ভাঙ্গেনা |
স্বপ্নে যে তার প্রাসাদ উঁচু হয়
ছেড়া কাঁথার বাঁধন মানেনা |

শব্দ ওঠে ভীষণ শব্দ হয় :
রাজ রাজাদের পালা এবার শেষ |
চমকে দেখি রাজা আমার রাজা
সিংহাসনে জাঁকিয়ে আছে বেশ |

রাজার বাড়ী ভাঙ্গে, আবার গড়ে
সিংহাসন ভেঙ্গেও থাকে তাজা |
মুকুট পড়া রাজার সাথে লড়ে
মুকুটবিহীন রাজা, আমার রাজা |

.                ****************                                                             
উপরে   


মিলনসাগর
*
শুধু পটে লিখা

দিবসগুলি পালিত হয়
শপথগুলি নয় |
নকল বুঁদীর কেল্লা গড়ে
নকল শত্রু জয়

দিবস তুমি শুধুই ছবি
শুধু পটেই লিখা |
দিবসগুলি হাওয়ায় হারায়
বিলীন জয়টিকা |

বারো মাসে তের পাবন
তবুও বাংলা দেশ
বারোমাস্যার দুঃখিনী তুই
কেঁদে ভেজাস কেশ |

.                ****************                                                             
উপরে   


মিলনসাগর
*
পাথর প্রতিমা

নদী পেরিয়ে, পাহাড় পেরিয়ে
আমি তোমার কাছে যেতে পারি,
কিন্তু তোমাকে পেরিয়ে আমি কোথায় দাঁড়াব     মানুষ !
তুমি যদি বল, না-----
তুমি যদি নিষেধের কাঁটা
বিঁধে রাখ আমার যাত্রাপথের মাটিতে, পাথরে !

ভারতবর্ষ, আমার নামের মালায়
তোমার সবকটি নদীর নাম
ভারতবর্ষ, আমার নামের মালায়
তোমার সবকটি নদী, অরণ্য, পাহাড় আর অববাহিকার নাম ;
নদীগুলি, পাহাড়গুলি,অরণ্যগুলি
আমি কখনও দেখিনি
তবু জানি এ আমার নদী
.                আমার পাহাড় |


আমার বাড়ীর পাশেই
.            ছোট্ট তটিনী
সে আমাকে বলে, সে নাকি
অনেক দূর থেকে, অনেক অনেক দূরে যাবে
আমি বলি, নদী
তুমি যতদূরে যেখানেই যাও
সেও তো আমারই দেশ
.              আমারই স্বদেশ |

স্বদেশ
কেমন স্বদেশ !
হাজার সুরের পাখী নিয়ে পাখীর সমাজ
হাজার রঙের ফুল নিয়ে ফুলেদের দেশ
মেঘে  মেঘে সাতটি রঙের টানে
যেমন ইন্দ্রধনু ফোটে
নানান ভাষার
নানান রীতির
নানান রূপের
মানুষকে একসাথে বেঁধে
আমাদের এ মহাজীবন


তবু শৈশবের ভূগোল ছেড়ে
জীবনের মানচিত্রে পা রাখতে গিয়ে
দেখি, সব কিছু ভুল হয়ে গেছে
তোমার বিখ্যাত জনপদে, শহরে নগরে
যেকানেই রাখি পা
কে এক নৃসিংহমূর্ত্তি
সহসা প্রবেশপথে পথরোধ ক’রে
আমাকে প্রশ্ন করে
কে তুমি
কোনখানে দেশ ?
আমি ভারতবর্ষ
আমি গঙ্গা-ভাগিরথীর নরম পলির বাংলাদেশ
.                                        এবং ভারতবর্ষ
আমি দুটি পাতা একটি কুঁড়ির আসাম
.                                        এবং ভারতবর্ষ
আমি শাল মহুয়ার সাঁওতাল
.                                        এবং ভারতবর্ষ
আমি সমুদ্রতটভূমি নারকেলকুঞ্জ ঘেরা সাগরকন্যা মালাবার
.                                        আমি ভারতবর্ষ----
বলতেই, হো হো শব্দে হেসে উঠে
সে আমাকে স্পর্শ করে দেয় !
আমি পাথর হয়েছি
ভারতবর্ষ
তুমিও পাথর !

.                ****************                                                             
উপরে   


মিলনসাগর
*
বীরপুরুষের দেশে

সে মরে প্রমাণ করল
সে বেঁচেছিল
এক বীরপুরুষের দেশে
কারও নারী হয়ে
অগ্নি সাক্ষী রেখে যাকে বলা যেত
তুমি আমার
আর সাক্ষ্যহীন আগুনে পুড়িয়ে বলা যায়
তুমি কারও না |

.                ****************                                                             
উপরে   


মিলনসাগর
*
ছায়ার তাঁত

এখান থেকেই গাছেদের পাড়া শুরু ; বৃক্ষের পল্লী
ঘরে ঘরে সেখানে ছায়া তৈরী হয়
অষ্টপ্রহর শিরশির ঝিরঝির হাওয়ায় শোনো
ছায়ার তাঁত ঘুরছে
চারপাশে আলোর কার্পাস
তাকে পিঁজে সুতো করে
গাছগুলো বানিয়েছে মোটা, মিহি ছায়ার চাদর
বড় বড় গাছগুলো
বড় বড় ছায়ার ব্যাপারী
নিম শাল বটের উঠোনে
ডাঁই করা ছায়ার পাহাড়
দূর থেকে লোক আসে ; ছায়া কেনে
কথা বলে
সারাদিন ফিস ফিস, ছাড়া ছাড়া
ছায়া ছায়া কথা--------------------


ছায়া যায় দূর দূরান্তরে

.                ****************                                                             
উপরে   


মিলনসাগর
*
মরুভূমি

এই ভীষণ বালির প্রান্তরই
এক সময় তার বন্ধু হবে
সে জানত ;
দূরে কাছে খুব গভীর করে খুঁড়লেও
কোনো জলের আশা নেই
তাই নিজের ভেতরে
নিজেই সে বানিয়ে নিল
থলি ;
তাতে রেখে দিল তৃষ্ণার আদিম কলস |
সে টের পাচ্ছিল
তার পায়ের নীচে
বালি তেতে উঠেছে
আর একটু পরেই
বিশাল মরুভূমি সীসের সমুদ্র হয়ে যাবে |
এও জানত
আরো কিছুদূর হাঁটলে
এই মরুভূমিই তাকে দেবে
আশ্চর্য পাদুকা------
পায়ের মাপের অবিকল
এক জোড়া খুর


মরুভূমি সব দেয়
সব দিতে পারে
ভীষণ বালিঝড়ে
মুখ গুঁজে থাকার
অনন্ত  ধৈর্য্যের মণীষা
আর
ক্ষুধায় কাঁটাগাছ চিবানোর পরিতৃপ্তি


মরুভূমি সব দেয়
সব দিতে পারে
যে জানে
এই দুস্তর বালির দিগন্তে
বালিই একমাত্র সত্য
নির্মম বালি

.                ****************                                                             
উপরে   


মিলনসাগর
*
হিমযুগ

এক

উত্তর মেরুর শীত
যখন আছড়ে পড়ল
তাদের গায়ে
তখনও কিছু অতিকায় প্রাণী ভেবেছিল
খোরাক কমিয়ে
কিছুটা দৌড়ঝাঁপ করে
যদি বাড়তি মেদ ঝরানো যেত
কিন্তু মহাহিমযুগ সেকথা বলেনি


দুই

একটা অশ্বখুরাকৃতি গহ্বর দেখিয়ে
তিনি বললেন :
এইখানেই এক সময় একটা
বরফের হ্রদ ছিল
কারণ শেষ হওয়ার আগে
সমস্ত লুপ্ত প্রাণীদের মতই
প্রতিটি ডায়নোসারই কেঁদেছিল
------  তারপর কি হল ?
সেই হাড়গলানো শীতে
তাপ যেখানে হিমাঙ্কেরও নিচে
চোখের জলও বরফ
ডায়নোসাররা কাঁদল
আর ততই তাদের শীত করল
আর যত তাদের শীত করল
তারা কুঁকড়ে গেল


তিন

এক মেরুরাত্রির নিচে
আমরা সবাই এসে দাঁড়ালাম
সীমাহীন তুহিন প্রান্তরে
কিছু মেরু শেয়াল
যারা আশেপাশে ওঁত পেতে ছিল
শুধু তারা এই অদ্ভুত কথোপকথন
শুনতে পেয়েছিল :
কাল কখন সূর্য উঠবে ?
এই দীর্ঘতম রাত্রির দেশে
প্রতিদিন সূর্য ওঠে না |
ভালবেসে নাম লেখা হবে কোথায় ?
তুষারে |
আমাদের মৃত্যুর সাক্ষী কে হবে ?
চিরতুষারের নির্জন |

চার

অর্ধেক পৃথিবী যখন
হিমযুগের বিশাল বরফের নিচে
তলিয়ে যাচ্ছে
তখন শীতের কবি
অদ্ভুত গান ধরলেন :
পৃথিবী এবার গর্ভবতী হবে
সবলতর প্রাণী
সবলতর প্রাণ
সবলতর মানুষ আসছে

.                ****************                                                             
উপরে   


মিলনসাগর
*
মৃত্যু

শৈশবে মৃত্যুকে তার মনে হত
বাপ-মার গ্রামসুবাদের কোন দূর আত্মীয়
দিগন্তরেখার শেষে কোন অস্পষ্ট কুয়াশায়
.                           তার বাড় যেন

ডাকাত বিলের ধারে
বাবার সাথে মায পেরোতে গিয়ে
শিয়ালডাকা বাঁশবনের ওপারে
রাত্রিময় তারার আকাশে
সে দেখেছিল-----একটা অদ্ভুত !
কি যান সরে গেল |
‘তারা খসা, মাঝে মাঝে হয়’
বাবা বলেছিলেন |
মৃত্যুকেও তার মনে হয়েছিল
এরকমই
ক্কচিৎ, কখনো
তারপর সময়ের নির্লিপ্ত বিজ্ঞান
তাকে শিখিয়েছিল
ষড় ঋতুর ক্রম-আবর্তনের মত
মৃত্যুও আরেক নিয়ম----
ফিরে ফিরে আসে
আর পাতা ঝরে
বহুদিন পরে আজকে হঠাৎ
কালো রাত্রির গায়
সে দেখল অমনি হাউই
তারাদের ঝাড়লন্ঠন আতসবাজীর মত
টুপটাপ ঝরে পড়ছে
কোনোটা বুকের কাছে
কোনোটা গায়ের কাছে
কোনোটা পায়ের ঠিক কাছে
খুলে হেলে পড়েছে নীলরাত্রির কানাত
দূর দিগন্তরেখার কুয়াশা ক্রমে কাছে,
.                        ক্রমে আরো-----

সে এখন মৃত্যুর প্রকাশ্য সন্ত্রাসের মধ্যে দাঁড়িয়ে

.                ****************                                                             
উপরে   


মিলনসাগর
*
আদম

এক

কোন অভাবিতের সামনে
তুমি এসে দাঁড়াবে
তার জন্য কোন পূর্বসূচনা
কোন আগামী সংকেত তোমার জানা থাকবে না
গ্রহণলাগা সূর্যের নিচে
পৃথিবীতে যেভাবে দীর্ঘ ছায়া নামে
আর বৃক্ষচূড়ায় পাখী
তারপর কুকুর ডাক দিয়ে ওঠে
মানুষও ডেকে উঠবে
কিন্তু সে কোন ভাষা নয়
শব্দ
পৃথিবীর প্রত্ন-পাথরে কোন আদি মানবের
ভয় ত্রাস আতঙঅকের
বিপদকালীন চিৎকার
মানুষ ভয় পাবে
যেমন সে পেয়েছিল
লক্ষ বছর আগে
যেমন তাকে ভয় দেখিয়েছিল
অরণ্যভূমির আগুন
ধোঁয়ামুখের পাহাড়
প্রাগঐতিহাসিক রাত্রি
অপদেবতার ছায়া
পূর্বপুরুষের মৃত আত্মা
কোন অভাবিতের সামনে তুমি এসে দাঁড়াবে


বনের পশুদের কারা যেন
গভীর অরণ্যে তাড়িয়ে নিয়ে গেছে
জোৎস্নায় হাতির পাল জল খেতে আসেনি
আমি খুঁজতে খুঁজতে
সময়ের হাঁ-মুখে কখন
তপ্ত বালির দেশ দেখতে পেয়েছি
দেখেছি বিষুবক্রান্তি জুড়ে
পশুকীট বৃক্ষলতা দীর্ঘ পরিযান
বৃষ্টি অরণ্যের জোঁক
উষ্ণস্রোতের শুশুককে বলছে
বরফ ঢাকা তুন্দ্রাভূমির বল্গাহরিণ
জলাভূমির সারসকে বলছে
বাতাসহীন মরাগ্রহের প্রান্তরে
হাওয়া কিভাবে শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছিল
কিভাবে সব জলাশয়
মরা মাছ, লক্ষ মৃত প্লাংক্টনে ভরে গেছে
আর সমুদ্রপাখীরা চক্রাকারে শোকসংগীত গাইছিল


মূল মধ্যরেখা থেকে পূ্র্ব পশ্চিম
মানুষের কৃষ্ণকলঙ্কের মত দীর্ঘ দ্রাঘিমা রেখায়
যেখানে যুগ যুগ আলো পড়ে না
সেই সব মরা খাত, অতল গহ্বর উজিয়ে যারা এল
জৈব বিবর্তনের অনেকটা ধাপ সরে
তারা তখন উপকথার প্রতীক-পাখী
কিংবদন্তির হরিণ
অবিকল মানুষের স্বরে
কথা বলেছিল
মানুষের জন্য

দুই

আমি এক মৃত শহরের কথা জানি
চাপের মুখে যা ভেঙে পড়েছিল
একটা খরস্রোতের মুখে
বেঁচে ওঠার মুহূর্তে
প্রতিস্রোত যাদের ছিনিয়ে নিয়ে গেছে
কারণ সত্যকে তারা কেউ কোনদিন
একা একা লালন করেনি
তাদের ভয় ছিল একাকীত্বে
গভীর বনে ছায়ার মত
যা পদে পদে হরিণকে ত্রস্ত করে রাখে
প্রবল দুঃসময়ের দিনগুলিতে
তারা চেয়েছিল চিরহীন খুব শক্ত কিছু
এত নিরেট
যে মুষ্টিমেয়র কাৎরানি, সন্দেহ , প্রশ্নের মত
এতটুকু ফাঁকও তাতে
ধরা পড়বে না
সময়টা ছিল সংখ্যার আর প্রতীকের
আর প্রতীকপ্রিয় মানুষেরা মিথ্যার বিরুদ্ধে
এক একটা প্রতীকের আড়ালে
বড়সড় সংখ্যার ভেতরে জয় খুঁজত
ফলে প্রথম আর্তনাদ
উঠেছিল শরীরসন্ধিতে
সেই সব ব্যক্তিগত জোড়গুলিতে
যেখানে সবাই খুব একা
জনান্তিকে যে কথা কেউই কাউকে
কোনদিন বলতে পারেনি
ভয়
একা হওয়ার ভয়
সমষ্টির আদলে
তারা বসিয়েছিল এক পশুযুথকে
আত্মজিজ্ঞাসার বদলে
যে জানত শুধু সমবেত স্তোত্র
সংঘবদ্ধ জয়গান
আর সমবেত শোকে  ভাসতে ভাসতে
যারা ভয় পেত
সেই আদিম পাপের
যেখানে একটি প্রশ্নময় তরু
তার মঞ্জরিত নিষিদ্ধ শাখায়
চিরকাল আদমকে ডাকে

.                ****************                                                             
উপরে   


মিলনসাগর
*
সক্রেটিস

হ্যাঁ, একটা অদ্ভুত অপ্রাকৃত স্বর
আমি মাঝে মাঝে শুনতে পেতাম
প্রথম ডেলফির প্রাচীরগাত্রে
দ্বিতীয়বার তুষার পাতের রাতে
বন্ধ সরাইখানার হিম নির্জনতায়
একটা ভরাট দূরাগত স্বর
আমরই গহন থেকে উঠে এসে আমাকে ডাকত :
-----বিজ্ঞ সক্রেটিস
জাগো, প্রশ্ন করো
কারণ তুমি সেই একমাত্র অজ্ঞান
অন্তত যে জানে ----সে কিছুই জানে না
আর আমি যন্ত্রণার নামে
মানুষের যন্ত্রণাকে করাঘাত করে ডাকতাম


এথেন্সের সুরম্যপণ্যবীথি, ব্যস্ত জাহাজঘাটা
স্নানাগার, বণিককারুসংঘে সরগরম
রাস্তার ভিড়ে দাঁড়িয়ে
আমি কতবার ভেবেছি
মানুষ নামের মেদমাংসের
এই অপরূপ থলথলে থলিটার কথা
কি অদ্ভুত কল
সমস্ত অপকর্মের শেষে
দিনান্তে একবার এইখানে সেঁধোতে পারলে
সব শান্তি
এখানে সে একা
অন্তত এখানে কোন সংশয়ী উট
অনধিকারের গলা বাড়িয়ে প্রশ্ন করে না :
কাজটা কি ভাল হল
অন্তত এখানে সে একা
প্রতিপক্ষহীন, নিরাপদ, একা
আর দেখতাম
ভূরিভোজনের আকন্ঠ মদ
মশলা কাইয়ে মাখামাখি চর্বি গিলে
প্রতিটি এথেনীয় কী নিরপরাধ ঘুমে নাক ডাকায়
আর ভোর হয়
এথেন্সের আর একটি সকাল


নিজস্ব চোরকুঠুরির দুর্ভেদ্য আরক্ষায়
প্রথম আমি সিঁধ কাটি
তারপর আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলাম
যতক্ষণ না সেই আগুনে ভেতরের সবাই পুড়ে মরছে
নরম মাংসের নিচ কেটে বসে যাওয়া
আমার প্রতিটি কামড়ের নেপথ্যে ছিল
দুরভিসন্ধির সেই সুক্ষ কারুকাজ
যেখানে প্রতিটি নিরেট আর অবিভাজ্য মানুষ
দ্বৈধতায় দুই বিপরীত মেরুতে ভাগ হয়ে
দুটি মুখোমুখি প্রতিপক্ষ
প্রশ্ন আর প্রতিপ্রশ্ন
ক্রিটো, এখন তুমিই বলতে পার
ন্যায়, ভালত্ব, আর সুন্দরের পলকা সংজ্ঞাগুলোকে
কেন ধুলো ঝেড়ে কথোপকথনের ছলে
বার করে এনেছিলাম শহরের প্রকাশ্য রাস্তায়
পানশালার মোচ্ছব, পথচলতি আলাপচারি
আর তোমাদের মত কিছু উদভ্রান্ত দলছুট যুবকসংঘে


আত্মরতির আচ্ছন্ন দিনগুলিতে
আমি চিনেছিলাম এথেন্সকে
দুই উত্তুঙ্গ সময়ের মাঝখানে
পায়ের ফালির মত সরু এক চিলতে জমিতে দাঁড়িয়ে
আমি দেখেছিলাম দুই চরমের তান্ডবআর অসারতা
সময়ের সার সার ফটকে
দশহাত অন্তর
কোথাও মুগুরধারী দশাশই লৌহপুরুষ
কোথাও আঠালো ক্কাথের মত বর্ণহীন অর্ধতরল
একটা দঙ্গল
তাদের মাথাগুনতি বিশ্বাস
আর সংখ্যাধিকের চিলচিৎকার
দূর হেলাজ আর সমস্ত এটিকার দীর্ঘ পাথর বেছানো পথে
গোলমরিচ, মণিপাথর, জলপাই বোঝাই পণ্যশকট
দীর্ঘ পথের ধকলে
শকট মালিক মাঝে মাঝে চাকা পাল্টাতো
কিন্তু শকটবাহী গর্দভ বা ঘোড়া
তার কোন বিকল্প  ছিল না
সামান্য খড়জলের জলযোগের শেষে
তারা আবার হাঁটতো
আমি সময়কে দেখেছিলাম
অন্তহীন গর্দভআর অশ্ববাহিত পথে
সমস্ত আপাতরূপান্তরের খোলনলচের ভেতরে
সেই একই হুজুগপ্রিয়, আকারহীন
দেখনদার এক চটজলদি ঠুনকো মানুষ
মুহুর্মুহু ভাবান্তরে পারদের মত অস্থির
জলের মত যে কোন আধারে যুতসই
অসহ্য আর অসহায়
দৌড়বাজিতে যারা প্রত্যেকেই তাদের মাথার জন্য
একটি করে অলিভ মুকুট আশা করত
কিন্তু কেন দৌড়ব এ প্রশ্ন করেনি


আমার ছিল যন্ত্রণার বর্ণমালা
কোন ইলীয় আইয়োনীয় জ্ঞান
কোন পরিত্রাতার অমোঘ নিদান
----আমার ছিল না
মূক মেষশাবকের সংঘে
বিজ্ঞ রাখালের তুলনা আমাকে খাটে না
আমার মা
ধাত্রী মা
পরিচর্যাপ্রবণ এলোমেলো হাতের চাপড়ে
যেভাবে শিশুকে তার প্রথম জন্মের কান্না
চিনিয়ে দিতেন
আমিও মানুষকে প্রথম
আত্মার ক্ষুরস্য ধারা
দুঃখের গুপ্তদ্বার চিনিয়ে দিয়েছি
এক আত্মপীড়নের প্রজ্ঞা
এক কীটজন্মের হাহাকার
----- এখন বুঝতে পারছ
তোমাদের সমবেত উপরোধ সত্বেও
কেন এক মিনার বেশী জরিমানা দিতে
আমি কার্যত রাজি হইনি


এই হেমলকই আমার নিয়তি
কারণ নগরীর জটলায়, সান্ধ্য মজলিসে
এর চেয়েও আরো ঘাতকপাত্র
আমি তাদের প্রত্যেকের হাতে তুলে ধরেছি
যে বিষে তারা, তাদের পুত্র পৌত্র, সন্তান সন্ততি
জন্ম জন্ম কাঁদবে
চুল ছিঁড়বে
বুক আঁচড়াবে
কিন্তু কেউ মরতে পারবে না
ক্রিটো, এই হেমলক আর পাহাড়ের পেছনে
সূর্যাস্তের মাঝখানে যেটুকু ছায়া
যেটুকু সময়
এসো, সংযম প্রসঙ্গে আমাদের পুরোনো তর্কে ফিরে আসি
বাকিটা-----------

.                ****************                                                             
উপরে   


মিলনসাগর
*
পাভলভের কুকুর

একটা পাভলভীয় কুকুর
খাবারের বদলে রোজ দুবেলা যাকে শোনানো হত
.        দূরসংবেদী কোন ঘন্টাধ্বনি
আর কুকুরটার লালা ঝরত
.        তার মনে হত অসংখ্য রুপোলি বিন্দু
.        ছুটে আসছে
.        এক একটা মুহূর্ত সময়ের জোড় খুলে
.        প্রথম বিন্দু থেকে উজ্জ্বল গোলক
.        তারপর এক একটি প্রতিস্থাপিত প্রতিবিশ্ব
.                      সেই বিযুক্ত তলে
.                      ভারহীন শূন্য ইথারে
.                      একটা কাল্পনিক প্রাণী
.                      সেই সুদৃশ্য মোড়ক
.                      মাঝখানে কিছু নেই

হ্যাভ এ ব্রেক
হ্যাভ এ কিটক্যাট
টেলিব্র্যান্ড, প্যানোরামা, সামসাঙ
তোমাদের জন্য হাফ চকলেট
.        বাকিটা পরে
পাভলভীয় কুকুরটা দেখে
.                আর লালা ঝরায়
.        একসময় ঘেউ ঘেউ করতে করতে
গরাদ গলিয়ে নেমে আসে নিচে
মেগাহিট, টাইমেক্স, টু-ইন-ওয়ান
এডিডাস, ল্যাকমে, ওপেল
.        গ্রাইন্ডার, জুসার, মিক্ সার
.        আলট্রা, এক্সট্রা, সুপার, সুপ্রীম
একরাশ ফিচেল সারস তার হাত ফসকে
তাকে ছুঁয়ে উড়ে যাচ্ছে
তার মুখময় পালকের ছায়া

.                কুকুরটা লাফায় ঝাপায় চেঁচায়
.        তারপর ঘুমিয়ে পড়ে
.        স্বপ্নের ভেতর সমস্ত ঘুমন্ত জলাভূমি, লোকালয়
.        আদিগন্ত মাঠ, ক্ষেতজমি, হাওড়, বাওড় পেরিয়ে
আবছা দূর সুবিন্দুতে যেখানে সময় তিনমুখে
তিনটে প্রপাতের মত নামছে
.        সেইখানে মায়াকুন্ডে, জলে
.        সে দেখে-----
ক্রুদ্ধ মারমুখী হেরে ফতুর
পৃথিবীর শেষ বাজির আরেক জুয়াড়ি
.                তারই মত আরেকটা কুকুর
‘এই সেই সারসের নিষিদ্ধ পাইকার’-----
মস্তিষ্কের তীব্র প্রদাহে, ক্ষোভে জিঘাংসায়
সমস্ত কাঁচ আঁচড়ে কামড়ে
ভেঙে চৌচির করে
.                   সব ফক্কা
.                   কই কিচ্ছু নেই !
.        কুকুরটা পাগল হয়ে গেল
আর দূরসংবেদী ঘন্টা তখনও বেজেই চলেছে :
.        হ্যাভ এ কিটক্যাট
.        হ্যাভ এ ব্রেক

.                ****************                                                             
উপরে   


মিলনসাগর
*
মাছকন্যা        

কোন দূর উপকথার পথ ধরে এসেছিল
ভোরের আলোয় আমার কুড়োজালি
আলো করে দেখি
রুপো, রুপো
তার নীল রুপোলি আঁশের নিচে
মনে হল কোন মানবী শরীর
পৃথিবীর ভোরে কাঁপছে
জলঝাঁজি, ঝিনুক, সমুদ্রলতায় মাখামাখি দীর্ঘচুলে
সে ঢেকে রেখেছিল অপার্থিব লজ্জা
আর একটা স্থির জলবিন্দু
টলটল করছিল বুকের ওঠাপড়ায়
বোধগম্যতার পারে
দৃষ্টির ভাষা ছাড়া আর কোন সেতু
আমাদের ছিল না
কোন দূর শূন্যের তারা যেমন
.     কোটি-আলোকবর্ষ পেরিয়ে
একলাটি আমারই জানলায় এসে দাঁড়ায়
.     আর আমি দেখি


তারপর তাপ বাড়ল
বালির তাত, বরফচালানি, নুলিয়া, মাঝি, পাইকারের
হল্লায়, উতোরচাপানে
দিন ক্রমে দিনের খোঁয়াড়ে ঢুকে গেল
তেরছা রোদের আগুনবৃষ্টি
তার জলজশরীরে ছুঁচের মত বিঁধছিল
আর পৃথিবীর সমুদ্রপারের সব হাওয়া
.       ভারি হয়ে চেপে বসেছিল
আঁশটে গন্ধের শিকারীরা
ততক্ষণে মাছির মত তাকে ছেঁকে ধরেছে
তাদের পাথুরে দৃষ্টি
কালচে মাড়ি, সোনা বসানো দাঁত
আর কড়া পড়া অসম্ভব নিস্প্রাণ
দশ আঙ্গুলের চাপে
জলের মেয়ে জড়সড়
.     এক হাট লজ্জার মাঝখানে
.     দেখলাম কেমন আস্তে আস্তে মাছ হয়ে যাচ্ছে


.     পাহাড়ের ওপারে পাহাড়
আমাদের দেখা হয়েছিল সেইসব মিথোজীবী সময়েরও আগে
.     যখন কোন আদি পক্ষী
.     কোন প্রথম উদ্ভিদ
.     ভুমিষ্ট হয়নি
আমাদের দেখা হয়েছিল
.     সেই দূর উভচর সময়ের আগে
যখন মাছ মানুষ হতে জানত না
.                  আর মানুষ মাছ

.                ****************                                                             
উপরে   


মিলনসাগর
*
খোজা


দুদিন দুরাত
মাত্র একটা মরা গাছের ডাল সঙ্গী করে
.                        আমি বেঁচেছিলাম
ঘন কুয়াশার আবছা চাদরে
যখন দূরে জেগে উঠেছিল হার্মাদের মাস্তুল
হাড়--করোটির প্রতীকে
ফুলে ফুলে উঠছে-----
পাটাতনের নিচে জাহাজের অন্ধকার ঘুপচির ভেতর
একপাল শুয়োর হাস মুরগীর পাশে ঠাসাঠাসি
হাত পা বাঁধা আনি কত অনন্তকাল পড়েছিলামকে জানে
একটা বোম্বেটে জাহাজ
আর আমি বেঁচেছিলাম দাসত্বের শর্তে

আমাদের জাহাজ যেদিন ভিড়ল
তখন ছিল রমজানের মাস
গোলবাজারের বিশাল চত্বরে
বড় বড় চাঁদোয়ার নিচে
গালিচা সুর্মা পানজর্দা আতর শামদান
পেল্লাই পেল্লাই ডেকচিতে রুটি কাবাব
.                            হালুয়া সিমুই
আর সব্জীমন্ডীর ডাঁই করা খরমুজার পেছনে
একসার উট আর তাজাকি খচ্চরের পাশে
আমরা দাঁড়িয়েছিলাম দুনিয়ার
সার সার যত তামাম কিসিমের বাওদী আর বান্দা

আমিরের ইয়ারদোস্ত পিরজাদা
এসেছিলেন শখের বাজারে
হুজুরের মন খারাপ
মনপসন্দ কিছু চাই-ই-চাই
চোখ পড়ল বেটে খাটো কুতকুতে চোখের
.                            এই আমার দিকে
----জান্নাত কি বেহস্ত জানিনা
মিনে করা ঝিকমিকে দেওয়াল
কাচস্বচ্ছ সিড়ির পালিসে
হুমড়ি খেতে খেতে
আমি হাজির হলাম
চারকোণে চারটে থাম-বরাবর
ধবধবে ফরাসে
আধশোয়া আমির
সবুজ দাড়িতে----
একটা ছোট্ট এলাচদানা ভাঙছেন
‘এই অজিব সি চিড়িয়া
.                কোথা থেকে এল’
তারপর পান্না পোখরাজের তর্জনী তুলে
ইঙ্গিতে বোঝালেন ----  গাছে উঠতে
কাছে পিঠে একটা নিমগাছ
চড়তেই  --- ডালে বসা একটা বাঁদর
কোথা থেকে আমাকে আচমকা খামচে দিল
‘হুম বোঝা গেল
ঠিক মানুষ নয়
আবার পুরো জানোয়ারও নয়
নাহলে আপন ভাই-বেরাদরির মধ্যে
কেউ কাউকে খামোকা কামড়ায়
এটা এখানেই থাকবে
আমার পেয়ারা হয়ে
নাচবে কুদবে
আর মাঝে মধ্যে
আমার হাত থেকে দু-চারটে দানা খেয়ে যাবে’
সেই মৌজ ফুর্তির রাতে
ওস্তাদের তারযন্ত্রের একটানা পিড়িং
আর তবলচীর একঘেয়ে বোলের ফাঁকে
ঘুংঘটওয়ালী ঘুংঘট খুলছে
সবার চোখ আমেজে নিবু নিবু
আমার চোখ ঝলসে গেল
ওড়না সরাতেই কাঁচুলির ফাঁকে
একটা আস্ত মাংসল ঘূর্ণি---
একটা ভারি মোমের গোল গম্বুজ উপচে উঠছে
.        ওড়না সরাতেই ঘুংঘটওয়ালীর বুক------
চটকা ভাঙল
‘ইনসা আল্লা এতো জানোয়ার নয়
ইনসান ইনসান
নাহলে অমন জুলজুল করে তাকাবে কেন ?’
তারপর যেন কিছুই হয়নি
এমনভাবে গলা নামিয়ে
অদ্ভুত স্বাভাবিক স্বরে আমির বললেন----
‘তুই আমার বড় ন্যাওটা রে
তোকে কাছছাড়া করতে মন চাইছে না’
গমগমে ধাতব আওয়াজ হল
‘ছোটে আগা, একে কাল থেকে
আমার জেনানা ফটকে বহাল কর’

চারটে যমদূতমার্কা হাবসী তদ্দন্ডেই
আমাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে গেল
আমি জ্ঞান হারিয়েছিলাম
যখন হুঁশ ফিরল
দেখলাম আমারই ছিন্ন অন্ডের রক্তের ভেতরে
ভেসে যাচ্ছি
খোজা-------
মুর্ছা------ঘোর-------সংজ্ঞা-----
সংজ্ঞা----ঘোর------মুর্ছা----
দিনরাত্রির অনুভবহীন চেতন অবচেতনের পাঁকে তলিয়ে
ভেসে আবার তলিয়ে
আমি জেগে উঠলাম
সম্পূর্ণ আরেক
খোজা
খোজা মইনুদ্দিন
রাত বারোটার শাহিদরওয়াজার পেটা ঘড়িতে ঘন্টা পড়ে
কোতওয়ালির রাস্তা সুনসান
শেষ সওয়ারির চলন্ত এক্কার মিহি ঘন্টি
আর কয়েকটা ভিখমাঙ্গা জিন্দালাশের গোঙানির ফাঁকে
পাহারাবুরুজের সিপাহি হাঁকে
.                        --- খবরদার
.                                   হোসিয়ার-----
আমি খোজা মইনুদ্দিন রাত জাগি
জেনানা ফটকের ভারি পর্দার ওপারে
রাত্রি আমাকে বিচিত্র শব্দ শোনায়
প্রথমে চুড়ির রিনরিন
তারপর খিলখিল
তারপর নিভন্ত বাতিদানের দপ শব্দ
তারপর রেশমী জরির খসখস
তারপর ঘাঘরা পাজামার
সরীসৃপ বুকে হাঁটা
তারপর কিছু না
শুধু হিসহিস ফিসফিস হিসহিস
দমচাপা ভারি নিঃশ্বাস আর অস্ফুট গোঙানি
একটা ঋজু রেখাকে ঘিরে ঘুরে ঘুরে তরঙ্গ উঠছে
দুটি ধনুকের প্রান্ত জুড়ে জুড়ে বৃত্ত
বাকি রাতটুকু একটা প্যাঁচালো দ্বিতন্ত্রী পড়ে থাকে
এরাতে কেউ ঘুমায় না
এরাতে কিলার ভ্যাপসা গরমে বুরুজের ফোকর থেকে
একটা পুরুষ  বিছে বেড়িয়ে পড়েছে সঙ্গিনীর খোঁজে
লতায় পাতায় বনের পশুরা
রেখে দিচ্ছে তীব্র গন্ধের সংকেত
জলের গভীরে তরঙ্গে তরঙ্গে
রুপোলী মাছের যৌন নাচ
ঝিঁ ঝিঁ আর রাত্রির অজস্র শব্দের ভেতর
আকশের আধ খোলা চন্দ্রাতপের নিচে
দুটো বুনো দাঁতাল পরস্পর লগ্ন হচ্ছে
.                   এরাতে কেউ ঘুমোয় না
.                   এরাতে কেউ ঘুমোয় না
আমার মনে হল একই চাঁদ সুরজের নিচে
তিনরকমের দিনরাত্রি
একটা মালিক, একটা বান্দার আর একটা খোজার
ভাঙা ঘাটলার ওল্টানো পৃথিবীর ছায়া আমি
একটা ভারি মৌল নিজস্ব সারাংস নিয়ে
পৃথিবীর আগুনকেন্দ্রে নেমে যাচ্ছে


একরাত দুরাত তিনরাত
সহস্র এক আরব্য রজনীর বদ্ধ দরজার ওপারে
দমবন্ধ বোতলের ভূত আমি
একদিন আমার হয়ে কথা বলে উঠলাম
পর্দা ফাংক করতেই ------দেখলাম---কি দেখলাম
.                                    কিছু মনে নেই
শুধু ঘাড় ঘোরাতেই
এক ডজন ডালকুত্তা
নমকহারাম
.              জলিল
.                     বদমাস
মারতে মারতে আধমরা
একটা বেওয়ারিস লাশ আমাকে
ওরা ফটকের ওস্পার একটা আস্তাকুড়ে ছুঁড়ে দিল
সর্বাঙ্গে যন্ত্রণা
কাঁদতে কাঁদতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি
স্বপ্নের ভেতরে দেখলাম
সমস্ত অন্তরীক্ষ স্বর্গীয় আলোয় ভেসে যাচ্ছে
আর মেঘের পাদানে পা রেখে
সপ্তম আকাশ থেকে ধাপে ধাপে
নেমে আসছেন ফেরিস্তা
তার বাঁ হাতের অঙ্গুরীয় থেকে বিচ্ছুরিত সাদা আলো
তরবারির মত পৃথিবীতে নেমে আমার কলিজায় বিঁধে গেল
ফেরিস্তা দাঁড়িয়ে
তার দিব্য আলখাল্লাটা কখন খসে পড়েছে
আর নাভির নিচে তলপেটের অনেকখানি জুড়ে
.                         বিরাট এক অনাবৃত ক্ষত
সেই অন্ধ বিবর থেকে উঠে আসছে শব্দ :
যুগান্তসঞ্চিত তালগোলপাকানো বিকৃত গোঙানির স্বর
নাদান বাচ্চা, দুঃখ কোর না
আসমান জমিনের মাঝখানে অগ্নিজাতক ফেরিস্তা
আর মিট্টিকা আওলাদ
কোথাও কোন ফর্ক নেই
সবই খোজা
এমনকি আল্লাতালা নিজেও
অসম্পূর্ণতা থেকেই পৃথিবীর সৃষ্টি
একটা মিহি জালের সুক্ষ ঢাকনি আমাদের মুখের ওপরে
ছোট ছোট ঘুলঘুলির ঘুপচি ফোকরে আপনা আপনা পরছাই
এই দুনিয়া, এই দুনিয়াদারি
এক অদ্ভুত অন্ধতা ! আমরা দেখি কিন্তু দেখতে পাই না
অদ্ভুত বধিরতা !  আমরা শুনি ----কিছু শুনতে পাই না
অসাড় আমরা ----স্পর্শ করেও কাউকে
কিছু অনুভব করিনি
মিলতে পারি না, মিলতে পারি না
বোবা বোধ, ভোঁতা অনুভবের খোজা আমরা সকলে’
স্বপ্ন ভেঙে গেল
হেঁচকা টানে শরীরটাকে তুলে
চোখ কচলে দেখলাম
তেরছা রোদের আলোয়
তেজী ঘোড়ার সওয়ার ছুটছে
.                        গোলবাজারের পথে
তাজিয়া, দুলদুল ঘোড়ার জুলুস, শোর মচাও
রাস্তার দুধারে ঘিঞ্জি ঘরবাড়ি, আলিশান মঞ্জিলের ওপরে
.                                      মাথা, অগুণতি মাথা
কাছে পিঠে একটা উঁচু মত জায়গা বেছে
আমি চেঁচিয়ে উঠলাম---- খোজা ভাইসব
এক অদ্ভুত জন্ম আমাদের
কিন্তু পয়লা গুনাহ এই
আমরা কেউই তা কবুল করিনি----
প্রথম পাথরটা বাঁ কাঁধের আস্তিন ছিঁড়ে ছিটকে গেল
দ্বিতীয় পাথরটা চোয়ালে
তৃতীয় পাথরে একরাশ রক্তের সাথে ফিনকি দিয়ে
বেরিয়ে এল হড়হড়ে গরম ঘিলুর মতো কিছু
রক্তে মাখামাখি দৃষ্টির প্রায়ান্ধকারে
আমি আবছা দেখলাম
মারমুখী দঙ্গলটা
এবার থমকে দাঁড়িয়েছে
কি একটা দেখে
তারা স্পষ্টত ভয় পেয়েছে
তাদের একহাতে উৎক্ষিপ্ত পাথর
অন্যহাত নিম্নাঙ্গ ঢেকে কোনো কিছু আড়াল করছে
ঘৃণায় না ক্ষোভে
না অপরিসীম বেদনায়
একটা প্রাণান্ত স্বর
রক্ত থুতু শ্লেষ্মা জড়ানো একদলা কফের মতো
আমার শরীর ছিঁড়ে বেরিয়ে এল
খোজা-----খোজা-----খোজা-----
শেষ পাথরটা ততক্ষণে ছোঁড়া হয়ে গেছে

.                ****************                                                             
উপরে   


মিলনসাগর